১০ মে, ২০১৬

বুধনবাবুর হিরোগিরি

দেবগুরু বৃহস্পতির বাড়ি অধ্যয়নে যায় চন্দ্র। সেখানে গুরুপত্নী  তারার দিকে আকৃষ্ট হয়ে চন্দ্রের ফষ্টিনষ্টি শুরু হতেই বিপদ হল ।   
চন্দ্র তারাকে নিভৃতে বলাত্কার করতে গেলেই বৃহষ্পতি গেলেন ক্ষেপে। দৈত্যাচার্য শুক্রদেব এসে চন্দ্রের পক্ষ নিলেন আর দেবতারা দাঁড়ালেন বৃহস্পতির পাশে। যুদ্ধ থামলে  দেবতারা তারাকে  ফিরিয়ে দিলেন
বৃহস্পতির কাছে । 

কিছুকাল পর, 


রোহিণীর গর্ভে চন্দ্রের একটি ছেলে হয়েছিল তার নাম বুধ। শান্ত, সুদর্শণ এই ছেলের নাম দেওয়া হল সৌম্য।  কেউ বলল বুধন। ছেলেটি ছিল অতীব শান্ত এবং সুশীল। তার ছেলেমানুষির জন্য সকলে তাকে বালখিল্য বলত।  ছোট থেকেই সে বুদ্ধিমান। বুধ ছিল এক অদ্ভূত চরিত্রের অধিকারী। একাধারে বিনয়ী, অন্যধারে জ্ঞানী । যেমনি সরল তেমনি বক্তা। তার গায়ের রং ছিল পান্নার মত সবুজ। 


বুধ বড় হয়েই  নিজের পিতা চন্দ্রের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হিমালয়ে কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। তারপর বিষ্ণুর আশীর্বাদে অচিরেই  সমগ্র বেদ ও শাস্ত্রসমূহে অগাধ ব্যুত্পত্তি লাভ করলেন।  সৌরমন্ডলের এহেন  খুদে, সুদর্শণ, বুদ্ধিমান, স্থিতধী, পন্ডিতপ্রবর সদস্যটি শ্রীমান বুধ বিয়ে করলেন বৈবস্বত মনু ও শ্রদ্ধার সন্তান ইলাকে। ইলা বা ইড়া হল বাক্‌-দেবী। তাই বুধের খুব মনে ধরেছিল বুঝি।  সূর্যের খুব কাছাকাছি এদের ঘরকন্না শুরু হল ।  


সূর্যের উপর দিয়ে গ্রহের এমন সরণের অর্থ কী?
ছবিঃ নাসা


এমন শান্তশিষ্ট প্রাজ্ঞ বুধ নড়াচড়া করতে করতে মানুষ নামক জীবটির অঙ্কের খাতায় যেইমাত্র ধরা পড়ে গেল তখনি শুরু হল মাতামাতি। মানুষ কত কিছু শিখে ফেলেছে আর বুধের গতিবিধি জানবেনা?   

আর এ তো সূর্যগ্রহণের মত আকচার ঘটনা নয়। এ দৃশ্য নাকি বিরল। সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে একটি সরলরেখা বরাবর কোনও গ্রহ বা উপগ্রহের উপস্থিতিতে হয় সূর্যগ্রহণ। কিন্তু গ্রহণে তো সূর্য যেন ঢাকা পড়ে যায়!আঁধার ঘনিয়ে আসে। তা বুধ সূর্যের কাছে এলেই বা কি?  

পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব তুলনায় কম। ফলে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝামাঝি চাঁদ এলে জ্যামিতিক কারণেই সূর্যকে চাঁদের আড়ালে চলে যেতে হয়। আবার পৃথিবী থেকে বুধের দূরত্ব অনেক বেশি। তাই
সূর্য, বুধ আর  পৃথিবী এক সরলরেখায় এলে বুধকে দেখায় সূর্যের বুকে কালো বিন্দুর মতো।

বুধের সরণ নাকি বুধ-ইলার দাম্পত্য জীবনের কোনো অশুভ ইঙ্গিত? 

বয়সের ভারে কুব্জ, জ্ঞানের চাপে ন্যুব্জ বুধ যেন চিরযুবক, এভারগ্রিণ। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থে সত্যি চিরসবুজ সে।  নয়ত এই বয়সেও কেউ শখ করে সূর্যের অত কাছ দিয়ে হাঁটে? সাহস তার বলিহারি।  তাও আবার অস্তরাগের সব রং নিজের গায়ে মাখবে বলে দিগন্তের বুকে ঢলে পড়া সূর্যের কাছাকাছি যাবে। আসলে উচ্চাশা থকলে কি না হয়!বুধের শখ বুধাদিত্য ডিগ্রীর। মানুষ যদি স্বীকৃতি না দেয় তবে কিসের এত জন্য এত বিদ্যাচর্চা,
জ্ঞানলাভ? 
রোজ‌ই কত গ্রহই তো  হাঁটছে, চলছে, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, তাদের সরণ হচ্ছে। কিন্তু ক'জন আর বুধের মত খবরের শিরোনামে আসছে। নাকি নিজেকে সূর্যের পায়ে সমর্পণ করে অতঃপর সূর্যাস্তে বুধ জানাল তার প্রণতি? 

আর তাই তো এই মুচমুচে গসিপ আজ সোনারতরীর পাতায় । বুধকুমার আজ সোনারতরীর সেলেব হলেন। বুধ পেলেন বুধাদিত্য ডিগ্রী!   

সৌরমন্ডলে সকলেই খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন ক'দিন। অমন একরত্তি বালখিল্য বুধন পারবে তো বেঁচে থাকতে? সূর্যের তাপে না জানি কি হাল হবে তার! কি আর হবে? বড়জোর হালকা পান্না রংয়ে একটু ট্যান হবে। এই বয়সে কে আর বুধের রূপ নিয়ে ভাবে?  ইলার অবিশ্যি কোনো হেলদোল নেই। বুধকে নিয়েছে শুষে। সেক্স চেঞ্জ করেছে শোনা যায়। এখন সে সৌরমন্ডলের অন্যতম সদস্য যে কিনা তৃতীয় লিঙ্গের কমিউনিটিতে নাম নথিভুক্ত করেছে । ইলার বর্তমান নাম সুদ্যুম্ন। তাই সূর্যের দিকে বুধের এই সরণ ইলার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া নয়ত?
আর সৌরমন্ডলের হতাকর্তা বিধাতার সাথে চিরটাকাল বুধের সম্পর্কটা এত‌ই সুন্দর যে তিনি সর্বদাই প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন একফোঁটা বুধকে। বুধ সবচেয়ে কাছের পড়শী বলে সূর্যের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা একটু বেশীই।
আর সূর্য, বুধ আর পৃথিবী এক সরলরেখায় এল বলেই না মানুষেরা দেখতে পেল বুধের গুটিগুটি সেই হেঁটে যাওয়া? নয়ত অমন আসাযাওয়া তো সে সারাজীবন ভর করেই চলেছে। 

অতিবেগুণী রশ্মির দাপটে বুধের রংটা পুড়ে দেলেও বুধ আজ সত্যি বুধাদিত্য। সূর্যের তাপমাত্রার প্রাবল্যে শরীর ঝলসে গেলেও বুধ আজ প্রকৃতপক্ষে জয়ী। তাই সাড়ে সাতঘন্টা ধরে সূর্যপাড়ায় হেঁটেও বুধ আজ হিরো। নিজের তিলোত্তমার সাথে আড়ি করে আজ বুধ তিলোত্তম।

।। প্রিয়ঙ্গুকলিকাশ্যামং রূপেণাপ্রতিমং বুধং, সৌম্যং সর্বগুণপেতং নমামি শশিনাং সুতং ।। 


৮ মে, ২০১৬

রবিঠাকুর তোমাকে নিয়ে

ন্মের একশোটা বছর পেরিয়ে গেল। সালটা ১৯৬১। অভিজাত মহলে রবীন্দ্রচর্চা হয়। গান, কবিতায় শিক্ষা নেয় তাদের ছেলেপুলেরা। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিশান রায়ের জমানা তখন। ঠিক হল রবীন্দ্রজন্মোত্সব পালন হবে। শতবর্ষে সরকারী আনুকুল্যে রাজ্যজুড়ে রবীন্দ্রভবন, রবীন্দ্রসদন, রবীন্দ্র নামাঙ্কিত অডিটোরিয়াম হল।সুলভ মূল্যে সম্পূর্ণ রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশিত হল মাত্র ৭৫টাকায়।  এই শতবর্ষ উদ্‌যাপনের হিড়িক হল সর্বত্র। কোচবিহার থেকে কলকাতা সহ প্রতিটি জেলাতেই রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনে বেশ উত্সবের মেজাজ তখন। জারি হল সরকারী আদেশনামা। সরকারী আদেশনামা পাবার পর প্রতিটি জেলার বিডিওদের মত কোচবিহারের বিডিও এলাহী অয়োজন করলেন। ঢাক ঢোল পিটিয়ে সর্বত্র প্রচারিত হল যে,  আগামী ২৫শে বৈশাখ রবিঠাকুরের জন্মশতবর্ষ পালনের জন্য নির্দ্দিষ্ট সময়ে, নির্ধারিত স্থানে সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হল। ঐ দিন সকালে সেই উত্সবে উপস্থিত হয়ে বিডিও সাহেব দেখলেন, মানুষজনের ঢল নেমেছে। অতএব তাঁর প্রচার সার্থক। সমবেত জনতার সিংহভাগ মহিলা। মনে মনে তিনি খুশি হলেন আত্মতুষ্টিতে। কিন্তু অচিরেই তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হল। বিডিওসাহেবকে দেখেই মহিলারা জনায় জনায় প্রশ্ন করতে লাগলেনঃ 
" কোথায় তোমার ঠাকুর? কোথায় হবে পূজা? আমরা সেই কখন থেকে দুধভর্তি ঘটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এসব ঢালব কোথায়?" 
ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল বিডিও সাহেব তাদের বোঝালেন, এ ঠাকুর তোমাদের পুজো করার ঠাকুর নন।   
এনার পুজোর রকমসকম প্রথাগত পুজোর থেকে ভিন্ন। সেই শুনে উপস্থিত মহিলার দল নিরাশ হয়ে একে একে প্রস্থান করেছিলেন।    কারণ এমন ঠাকুরের  পুজোয় তাঁরা অংশ নিতে চান না। দুদিন পর আনন্দবাজার পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি প্রকাশিত হয়। কোচবিহারের এই ঘটনার পর থেকেই নাকি রবি নামক ঠাকুরটিকে অভিজাত সরণী থেকে জনতার দরবারে নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হল সেদিন থেকে। মানুষের মনে তাঁকে স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেবার প্রক্রিয়াকরণ আজো অব্যাহত। 
তিনি মিশে গেলেন আমজনতার মাঝে। আকাশেবাতাসে আজ শুনি রবীন্দ্রগানের অণুরণন। রবীন্দ্রকবিতায় আজ সাধারণ মানুষ বিভোর। আমাদের ড্র‌ইংরুম থেকে বেডরুম, গাড়ির সাউন্ড সিষ্টেম থেকে ট্রাফিক সিগনাল, কলেজ ফেষ্ট থেকে নবীনবরণ, চলচিত্র থেকে চালচিত্র সর্বত্র তাঁর অবাধ বিচরণ। কারণ তিনি রবীন্দ্রনাথ।    

তথ্যসূত্রঃ রবীন্দ্রনাথ ও মানুষ ছিলেন 
আবদুস শাকুর 
(দীপ প্রকাশন)