৮ মে, ২০১৬

রবিঠাকুর তোমাকে নিয়ে

ন্মের একশোটা বছর পেরিয়ে গেল। সালটা ১৯৬১। অভিজাত মহলে রবীন্দ্রচর্চা হয়। গান, কবিতায় শিক্ষা নেয় তাদের ছেলেপুলেরা। পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিশান রায়ের জমানা তখন। ঠিক হল রবীন্দ্রজন্মোত্সব পালন হবে। শতবর্ষে সরকারী আনুকুল্যে রাজ্যজুড়ে রবীন্দ্রভবন, রবীন্দ্রসদন, রবীন্দ্র নামাঙ্কিত অডিটোরিয়াম হল।সুলভ মূল্যে সম্পূর্ণ রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশিত হল মাত্র ৭৫টাকায়।  এই শতবর্ষ উদ্‌যাপনের হিড়িক হল সর্বত্র। কোচবিহার থেকে কলকাতা সহ প্রতিটি জেলাতেই রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনে বেশ উত্সবের মেজাজ তখন। জারি হল সরকারী আদেশনামা। সরকারী আদেশনামা পাবার পর প্রতিটি জেলার বিডিওদের মত কোচবিহারের বিডিও এলাহী অয়োজন করলেন। ঢাক ঢোল পিটিয়ে সর্বত্র প্রচারিত হল যে,  আগামী ২৫শে বৈশাখ রবিঠাকুরের জন্মশতবর্ষ পালনের জন্য নির্দ্দিষ্ট সময়ে, নির্ধারিত স্থানে সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হল। ঐ দিন সকালে সেই উত্সবে উপস্থিত হয়ে বিডিও সাহেব দেখলেন, মানুষজনের ঢল নেমেছে। অতএব তাঁর প্রচার সার্থক। সমবেত জনতার সিংহভাগ মহিলা। মনে মনে তিনি খুশি হলেন আত্মতুষ্টিতে। কিন্তু অচিরেই তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হল। বিডিওসাহেবকে দেখেই মহিলারা জনায় জনায় প্রশ্ন করতে লাগলেনঃ 
" কোথায় তোমার ঠাকুর? কোথায় হবে পূজা? আমরা সেই কখন থেকে দুধভর্তি ঘটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এসব ঢালব কোথায়?" 
ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল বিডিও সাহেব তাদের বোঝালেন, এ ঠাকুর তোমাদের পুজো করার ঠাকুর নন।   
এনার পুজোর রকমসকম প্রথাগত পুজোর থেকে ভিন্ন। সেই শুনে উপস্থিত মহিলার দল নিরাশ হয়ে একে একে প্রস্থান করেছিলেন।    কারণ এমন ঠাকুরের  পুজোয় তাঁরা অংশ নিতে চান না। দুদিন পর আনন্দবাজার পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি প্রকাশিত হয়। কোচবিহারের এই ঘটনার পর থেকেই নাকি রবি নামক ঠাকুরটিকে অভিজাত সরণী থেকে জনতার দরবারে নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হল সেদিন থেকে। মানুষের মনে তাঁকে স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেবার প্রক্রিয়াকরণ আজো অব্যাহত। 
তিনি মিশে গেলেন আমজনতার মাঝে। আকাশেবাতাসে আজ শুনি রবীন্দ্রগানের অণুরণন। রবীন্দ্রকবিতায় আজ সাধারণ মানুষ বিভোর। আমাদের ড্র‌ইংরুম থেকে বেডরুম, গাড়ির সাউন্ড সিষ্টেম থেকে ট্রাফিক সিগনাল, কলেজ ফেষ্ট থেকে নবীনবরণ, চলচিত্র থেকে চালচিত্র সর্বত্র তাঁর অবাধ বিচরণ। কারণ তিনি রবীন্দ্রনাথ।    

তথ্যসূত্রঃ রবীন্দ্রনাথ ও মানুষ ছিলেন 
আবদুস শাকুর 
(দীপ প্রকাশন)