৪ এপ্রিল, ২০১০

ছুটি

১৯১৪ সালে পূজোর ছুটির পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গয়া থেকে বেলা যাবার পথে রেলওয়ে ওয়েটিংরুমে বসে লিখলেন পথের গান


"পান্থ তুমি পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কন্ঠে তোমারি গান গাওয়া"

জানি বিদায়ী ফাগুণের গায়ে এখন চোখঝলসানো চৈতী আগুণ কিন্তু ছুটির অমোঘ আকর্ষণ আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল গুডফ্রাইডের ভোরে খড়গপুর থেকে বোলপুরের পথে... "তোমায় নতুন করে পাবো বলে" |    দেখা হয়েচে বহুবার চোখ মেলে, তবুও ঘর থেকে দুপা ফেলেই আবার হাঁটি চেনা পথে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করি গ্রামবাংলাকে।পথের আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ি বারবার, কালের গাড়ি আরোহন করে। লিখে চলি পথের পাঁচালী । ভোর ৬টায় শুরু করি যাত্রা, সঙ্গে একথার্মোস চা, কিছু কুকিস, মাফিন  আর কয়েকটা কচি শশা নিয়ে ।




ন্যাশানাল হাইওয়ে ৬০ ধরে পূবের আলোয় পশ্চিম মেদিনীপুরের পথে, শহর মেদিনীপুরকে পাশ কাটিয়ে জঙ্গলমহলের রাস্তা ধরে । একে একে পড়ল সারি সারি শালগাছ অধ্যূষিত গোদাপিয়াশাল, শালবনী, গড়বেতা ইত্যাদি  গ্রামগুলি, পেরোলাম কংসাবতী আর শীলাবতী নদী । শুনেছি মাওবাদীদের জায়গা এই জঙ্গলমহল ।  সকালের মিষ্টিরোদ এসে পড়েছিল তখন শালবনের মাথায়, বসন্তের কচি সবুজপাতায় । চেনাপথ যেন আরো নবীন সজীবতায় ভরে উঠছিল । 




গড়বেতা পার হয়ে বিষ্ণুপুরের পথে পা বাড়ালাম । এই রাস্তা নাকি  হাতি পার হবার করিডোর  ...বালুচরীর জন্মস্থান, টেরাকোটার ঘোড়ার দেশ, গ্রামবাংলার চালার অনুকরণে তৈরী অত্যন্ত সুন্দর সব  মন্দিরের হাট এই বিষ্ণুপুরে। কত নাম না জানা মন্দির যত্রতত্র বিরাজমান ;  পোড়ামাটির নিখুঁত  স্থাপত্য মন্দিরের গায়ে এখনো শোভা পাচ্ছে । এইখানে হাতি দেখা কাপালে থাকতে হয় ; যাই হোক ভয়ে ভয়ে আমরা নিলাম প্রথম হল্ট,  ধূমায়িত চা আর মাফিন দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। আবার শুরু পথচলা। এবার বাঁকুড়ার রাস্তা ধরে কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেট হাইওয়ে ৯ ধরে বড়জোড়ার পথে.. আবার পেরোলাম শাল-ইউক্যালিপটাসের বন, হাতি পার হওয়ার করিডোর । শুনেছি বরজোড়ার "মন্ডা"  নাকি একটি বিখ্যাত মিষ্টি তবে এখন অনেক নকল বেরিয়েছে তাই সে পথে পা বাড়ালাম না । কিংবদন্তীর আড়ালে লুকিয়ে আছে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন তৈরী হবার সময়কার চিতাবাঘের গল্প।   এখন সেখানে শুধু মেজিয়া পাওয়ার প্ল্যান্টের  ধূসর  ফ্লাই-এশ বহনকারী ট্রাকের সারি। নগরায়ন তথা বিশ্বায়ন তো দূরের কথা এখন শিল্পায়নে ব্রতী হয়ে আমরা  "অরণ্যমেধ"  যজ্ঞে সামিল হয়েছি।


পর্যাপ্ত  ধূসর উড়ন্ত ছাইকে সবুজ পথের সাথী করে আমরা পেরোলাম  দ্বারকেশ্বর আর গন্ধেশ্বরী নদীর সেতু।এই দ্বারকেশ্বর নদী সাহিত্যের পাতায় জনপ্রিয়  বিদ্যাসাগরের জন্য । মায়ের কাছে পৌঁছেছিলেন রাতারাতি দ্বারকেশ্বর সাঁতরে বাঁকুড়া থেকে মেদিনীপুর । বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি চিরস্মরনীয় ।  সেই কারণে দ্বারকেশ্বর পেরোতেই স্মরণ করলাম তাঁকে।
এরপর  গোল্ডেন কোয়াড্রি ল্যাটারালের কোলকাতা-দিল্লী শাখায়  ওরফে শেরশাহ সুরীর তৈরী গ্র্যান্ড- ট্রাঙ্ক-রোডে  পড়ে  পানাগড় অবধি গিয়ে মোরগ্রাম হাইওয়ের বাঁকে ঘুরে  ইলামবাজারের জঙ্গলে গিয়ে পড়লাম। মধ্যে পেরোলাম অজয় নদী। তারপরেই কবিগুরুর কর্মভূমিতে,  ছাতিম, শিমূল, পলাশের শহর শান্তিনিকেতনে।  বসন্ত নেই এখন আছে চৈতীর চোখ ঝলসানি রোদ আর রাতে একটু ঠান্ডা হাওয়া ।শ্র্রীনিকেতন, বিশ্বভারতীর আশ্রম পেরিয়ে বনপুলক, শ্যামবাটি, তালতোড়কে  সরিয়ে রেখে আমরা দুপুর সূর্যকে মাথার ওপরে রেখে পৌঁছলাম  প্রান্তিক। আমাদের "সোনারতরী" ফেজ ১, আবাসনের ক্ষুদ্র বাগান বাড়ি যার নাম "কৃষ্ণকলি" । রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ভাবতে পারিনা এখানকার কোনোকিছুকেই তাই বাড়ির নাম করণেও রাবিন্দ্রীক হয়ে পড়েছিলাম।


বাড়ির পাশেই ক্যানালের জল বয়ে চলেছে । যদিও ভরাবর্ষায় এই জলের অমোঘ আকর্ষণ আমাকে আরো টানে। সোনাঝুরির ছায়ায় প্রান্তিকের বনবীথি যেন ঘুরে ফিরে নতুন করে ধরা দেয় আমার কাছে। অনতিদূরে কংকালিতলায় মাকালীর মন্দিরের আকর্ষণও দুর্নিবার ।  ৫ সতীপিঠের একটি এটি; দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর খন্ড দেহাংশের কাঁখাল অর্থাত কোমরের অংশ বিশেষ পতিত হয় এখানে ...একটি কুন্ডে। আর পাশে উত্তরমুখে প্রবাহিনী কোপাই নদী সংলগ্ন এলাকায় শ্শ্মশান । আমি এই জায়গায় এলে কিছু মাহাত্ম্য অনুভব করি।  


প্রতি শনিবারে খোয়াইয়ের পথে হাট বসে । এটি ও আর কোথাও দেখিনি। সূর্যাস্তের ঠিক ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে বসে এই হাট। কত শিল্পীরা নিজ নিজ শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন সেখানে আর সাথে থাকে বাউলের গান । রাঙামাটির পথ ধরে আমরাও পৌঁছে যাই সেখানে । ডোকরার গয়না, কত রকম ফলের বীজ দিয়ে তৈরী গয়না, কাঁথার কাজের বাহার, পটশিল্প,  বাউলগানের আনুষাঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র, তালপাতা, পোড়ামাটির কাজ, বাটিকের কাজ আরো কত কিছু এনে তারা বিক্রি করে । কিন্তু অন্ধকার হবার পূর্বমূহুর্তেই পাততাড়ি গোটাতে হয় তাদের ।  


এই নিয়ে আমাদের ২৪ বার যাওয়া হোল শান্তিনিকেতন । তবুও সে পুরোণো হয় না। আমি কিন্তু কোলকাতার হুজুগের  আম জনতার মত পৌষমেলায় কিম্বা বসন্ত উত্‌সবে আসি না এখানে । কারণ ভীড় আমার ভালো লাগেনা । দু একবার দেখেছি পৌষমেলা, গেছি বসন্ত উত্‌সবে । কিন্তু আমাদের চিরসখা "নিরালা" কে তখন পাইনা,  কাব্যের উঠোনে হোঁচট খেতে হয়,  ব্লগের আঙিনায়  নতুন পোষ্টের জন্য কল্পলোকের ইশারা থাকেনা । এখানে আসি লিখতে, ভাবতে, লেবু ফুলের গন্ধ নিতে, পলাশের একটুকু লালকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে আর সর্বোপরি মাস তিনেকের বাঁচার রসদ আর শ্বাসবায়ু নিতে।  আমার ছোট্টবাগানের ফুলেদের সাথে কথা বলে আসি । পাখিদের সাথে গান গেয়ে যাই ।  আর খবর নিয়ে যাই কৃষ্ণকলির, তাকে ভালো থাকতে বলি,  সবুজে আর নীলে মিশে সুন্দর থাকতে বলি ।

কোন মন্তব্য নেই: