২৯ জুন, ২০১১

বৃষ্টি-সহজাত

সেবার ছিল আমার প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা । তরতর করে আমার স্কুলের ক্লাস এগুচ্ছে আর এগুচ্ছে আমার কৈশোর থেকে প্রথম বয়ঃসন্ধির  গোল্লাছুটের  দিনগুলো। বর্ষার মেঘের কাছে নতজানু হয়ে বলে চলেছি "একটিবার তাকে দেখব, সুযোগ করে দাও নীলমেঘ "
চুলোয় গেল পড়াশুনো, গিটার বাজানো, ছবি আঁকা । সেই পাশের বাড়ির ছাদে একবার দেখেছিলাম এলোচুলে সেই মেয়েটাকে । মামারবাড়ি এসেছিল নাকি ...দেবলা ঝি বলছিল মা'কে । বর্ষার প্রথম মেঘ ডাকানিতে অঙ্কখাতা ফেলে রেখে ছুট্টে গেছিলাম ছাদের আলসের ধারে , যদি তাকে দেখতে পাই ! খোলাচুলে,  আকাশ নীল  খড়কে ডুরে গাছকোমর দিয়ে বাঁধা , মনে হল নাকে ছোট্ট নাকছাবিও । দুধে আলতা পায়ের গোছে বিছুয়াও ছিল যেন । মায়েরা বলত " নাক মাটা মাটা চোখ ভাসা, সেই মেয়ে খাসা " ঠিক তেমনি হবে বোধ হয় । কি জানি এর আগে কোনো মেয়ের দিকে তেমন করে তো আর তাকাইনি । মায়ের গন্ধ তখনো আমার নাকে । সবে হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুল ধরেছি । 
বৃষ্টির বিরাম নেই সেবার । কিন্তু তার আর দেখা নেই । আবার মন ভারি করে পড়াশুনোয় মন । ছুটতে লাগল ফুটবলের বিকেল, গিটারের ক্লাস , উপপাদ্যের অনুশীলন আর বর্ষামঙ্গলের অপেক্ষা । হঠাত পাশের বাড়ি পুজোর আওয়াজ । পূর্ণিমার রাতে বৃষ্টি থামা ছাদে উঠে পায়চারি করছি । ছাদের আলসের কাছে যেতেই নূপুরের সিঞ্জিনি । ঐ বুঝি সে এয়েছে । কাছে যেতেই কোনো আওয়াজ নেই । মা বুঝি গেছে ঐ পাশের বাড়ির পুজোতে । কি যেন বলছিল সকালে মা । শান্তি স্বস্ত্যয়ন আছে সে বাড়িতে । মা ফিরে এল কিছুপরেই । সে চলে গেছে সকলকে ছেড়ে । মা বলল ।  ধূপ জ্বেলে পড়ার টেবিলে পা দোলাচ্ছিল । শাড়ি থেকে আগুণ এসে হঠাত তাকে নিয়ে চলে গেছে । নাইনটি পার্সেন্ট বার্ণ । 
আমি আমার চুপকথার গোপন দুপুরগুলোকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম । মনে মনে বললাম, বৃষ্টি কেন পারলিনা সে আগুণ নেবাতে ?  এত ফোঁটা তোর আছে, এত জলভরা মেঘ থেকে ঝরে পড়লি, এত ভেজালি আমাকে তবুও পারলিনে তাকে আগলাতে  !

২০ জুন, ২০১১

" রঞ্জনা আমি আর আসব না "


"রঞ্জনা আমি আর আসবনা" গত শনিবার ১৮ইজুন আইসিসিআর হলে অঞ্জন দত্তের ৪র্থ বাংলা মিউজিকাল ছবি " রঞ্জনা আমি আর আসবনা " র প্রোমোশানাল রিলিজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল সারেগামা এবং তারা মিউজিক চ্যানেল । পুরো টিম অর্থাত লিড বোকালিস্ট অঞ্জন দত্ত , তাঁর পুত্র নীল দত্ত, বেস গিটারে সঙ্কেত ভট্টাচার্য, এক্য়ুস্টিক গিটারে " হিপপকেট" খ্যাত অমিত দত্ত, ফিমেল ভোকালিস্ট সোমলতা আর ড্রামার ( নাম জানা নেই ) সকলেই উপস্থিত ছিলেন । যথারীতি অনুষ্ঠানের শুরুতে অঞ্জন দত্ত " পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব বলেছে পাড়ার দাদারা, অন্য পাড়া দিয়ে যাচ্ছি তাই, রঞ্জনা আমি আর আসবনা ..." বলতে বলতে মঞ্চ কাঁপিয়ে অবতীর্ণ হলেন ।  ঐ সিনেমার গান ছাড়াও বংকানেকশানের বিখ্যাত গান " মাঝিরে, ও মাঝি ( যেটি রূপঙ্কর ও শান গেয়েছিল ) অঞ্জন দত্ত এবং পুত্র নীল গেয়ে মাত করে দিলেন । দুই গিটার ও ড্রামের সহযোগে সোমলতার কন্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত " জাগরণে যায় বিভাবরী" বেশ অন্যরকম লাগল । যদিও জিনস আর কেপরি তে সোমলতা বেশ স্বাছন্দ্য ছিল কিন্তু তার বিশাল লম্বা খোলা চুল একটু বিব্রত করছিল তাকে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই । গিটারিস্ট অমিত দত্ত এবং অঞ্জন দত্তের যুগলবন্দী অনবদ্য লাগল সে দিনের সন্ধ্যায় ।   অনেকদিন ধরে ইচ্ছে ছিল অঞ্জন দত্ত মানুষটিকে দেখার । কারণ তিনি একাধারে গান লেখেন, সুর করেন, মিউজিক কম্পোজ করেন, অভিনয় করেন  আর সিনেমা পরিচালনা করেন । এই একজন মানুষ যে কত ক্রিয়েটিভ তা লক্ষ্য করে আসছি বিগত তিরিশ বছর ধরে । কিন্তু এই বয়সে ওনার জীবনীশক্তির তারিফ না করে পারিনা । সামনে থেকে দেখার বড় ইচ্ছে ছিল ।  সাধপূরণ ও হয়ে গেল । " রঞ্জনা আমি আর আসবনা " ছবিটির সাফল্য কামনা করি । ছবির ঘটনা, চরিত্রায়ণ কেমন জানা নেই তবে শুধু গানের জন্যে উতরে যাবে ছবিটি এ আমার বিশ্বাস ! 

৮ জুন, ২০১১

জামা-e-ষষ্ঠী

যষ্টি হাতে জামাইবুড়ো ষষ্ঠী খেতে চায়
টাকের ওপর ছত্র ধরে বুড়ো শ্বশুর তায় ।
কষ্টিপাথর ঘেমো টাকে বিন্দুবিন্দু ঘাম
আগুণ গরম ফলের বাজার আম-লিচু-কালোজাম ।
গুষ্টিশুদ্ধ শালাশালী ষষ্ঠীবুড়ির কৃপা
খুড়োর কলে জামাইবুড়ো মেজাজ ব্রহ্মক্ষ্যাপা
শ্বশ্রূমাতা পষ্টাপষ্টি মেসেজ দিয়ে খালাস
আগুণ বাজার e-ষষ্ঠী বাতিল তত্ত্ব-তালাস ।
সৃষ্টিছাড়া জামাইবুড়ো তুষ্টি খোঁজে নেটে
মিষ্টি হেসে শ্বশ্রূমাতা ওয়েবক্যামে সেঁটে ।
ফষ্টিনষ্টি শালাশালী কষ্টিপাথর টাক
জামাইবাবুর খরচা বাঁচে আনন্দ জয়ঢাক ।
গুষ্টি শুদ্ধ অনলাইনে চটরপটর চ্যাট
জামা-e-ষষ্ঠী তর্ক বৃষ্টি বকর বকম্‌ ভাট  ।

৩০ মে, ২০১১

জয় ইউনিকোডের জয়!


দেশ জুড়ে পরিবর্তনের হাওয়া । পালাবদলের দিনে গ্লোবালাইজেশনের ঝোড়ো হাওয়াও বাঙালীর তনুমন প্রাণ জুড়ে। একদিকে শপিংমল কালচার তো অন্যদিকে মাল্টিপ্লেক্স টেম্পটেশন । মোটাফ্রেমের চশমা থেকে স্লিক ফ্রেম , সৌখিন রিমলেশ থেকে রেসিলেন্স এবং অবশেষে কনট্যাক্টস । কে জানে থ্রিডি চশমাও বুঝি পরতে হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে । শোনা যাচ্ছে থ্রিডি টেলিভিশনও আসবে ঘরে ঘরে । টুডি কম্পিউটার গেম ছিল বছর পনের আগে । এখন তো কচিকাঁচারাও থ্রিডি গেম দাপিয়ে খেলছে । নিজের অবতারের আইডেন্টিটিতে রীতিমত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ গেম সাইট থেকে ও গেম সাইট । ইন্টারনেটের কৃপায় শুধু গেমদুনিয়াই নয় বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয় । পশ্চিমবাংলায় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই হয়নি এবছর । দেরীতে কম্পিউটার এরাজ্যে প্রবেশ করেছে বটে কিন্তু শিল্প-সাহিত্য-কলার সনাতন পীঠস্থান কলকাতা তথা সারা পশ্চিমবাংলা আজ সাহিত্যচর্চায়, বাঙালীর আড্ডায় হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তাল দিয়ে চলেছে আন্তর্জালে । প্রিন্ট থেকে টেলিমিডিয়া ও সেখান থেকে ডিজিটাল মিডিয়াতেও বাঙালির এখন সদা বিচরণ । বঙ্গবধূদের দ্বিপ্রাহরিক আড্ডা একসময় ছিল গঙ্গার ঘাটে । সেখান থেকে গঙ্গাজল পাতানো, স‌ই পাতানো, তাসখেলারও পালাবদল হয়েছে বিস্তর । কিটিপার্টি হয়েছে অবসোলিট । বঙ্গবধূর উত্তরণ হয়েছে আন্তর্জালের ডিজিটাল আইডেনটিটিতে । ঢুকে পড়েছে তথাকথিত গেঁয়ো বঙ্গ বধূ কাম জননী আজ যন্ত্রজালের নেট-গন্ডী পেরিয়ে বিশ্বের দরবারে । এক ঘেয়েমির হেঁশেল তাত থেকে মেলাঙ্কলির দুপুরগুলো আছড়ে পড়েছে নেট-অবকাশে ।
খোলা হাওয়ায় মুক্তি হয়েছে তার আলোয় আলোয়, আন্তর্জালে । ব্লগঘরে সন্ধ্যেপ্রদীপ জ্বালে সে এখন । বাঙালী সাবালকেরা যেমন বেকারত্বের মুক্তি পেয়েছে বিপিওর বাতায়নে । ঠিক তেমনি চিরাচরিত রোয়াকের আড্ডাও এখন পূর্ণতা পেয়েছে অর্কুটের কমিউনিটিতে, ফেসবুকের সবুজ ফুটকি জানলায় । অর্কুট বারান্দা থেকে ফেসবুক অলিন্দ, ব্লগের উঠোন থেকে ট্যুইটারে ঘুলঘুলি সর্বত্র বঙ কানেকশান বিরাজমান । রবীন্দ্রচর্চা ইউটিউবে । নজরুল ও অতুলপ্রসাদ ও বাদ নন । কে জানে কোন দিন হয়ত বা ইউটিউব জলসা চলবে সারারাত ব্যাপী । ওপর থেকে বাঙলার ভাষাবিদ সাহিত্যিকরা আশীর্বাদ স্বরূপ চিতকার করে বলছেন "জয় ইউনিকোডের জয়!" "জয় বাংলাভাষার জয়"! 
 ভাষার মেলবন্ধনের যোগসূত্রে আন্তর্জালে দুই বাংলা মিলে মেশে একাকার হয়ে গেছে । দুইবাংলার ভৌগোলিক সীমারেখা উধাও হয়ে গেছে বন্ধুতার আবেশে । অবাধ প্রবেশ এর ওর ব্লগঘরে, আনলিমিটেড ব্লগবাজি ব্লগের ডেরায় । নেই কোনো ছাড়পত্রের মানামানি, আছে প্রবেশের অধিকার ব্লগবন্ধু হয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর হাত ধরে । ইউনিকোডের আওতায় বাঙালীর ব্লগাড্ডা তর্ক, গপ্পো সবকিছু ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে । যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবার হয়ে যে বাঙালী একদিন একা হয়ে গেছিল আজ সোশ্যালনেটে সেই সামাজিকতা এখন তাকে পেয়ে বসেছে । একাকীত্ব ঘুচেছে । ব্লগঘর সাজিয়ে গুছিয়ে ব্লগ মিতেনীর জন্য বংকানেকশন ঝালিয়ে নিচ্ছে তারা আন্তর্জালে । ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে স‌ইয়ের জন্য জিটকের সবুজ বাতিঘর জ্বেলে বসে আছে । নতুন প্রজন্ম বলছে :
আমপাতা জোড়াজোড়া ব্লগবাজিতে জাগবি তোরা । 
ওরে ব্লগার সরে দাঁড়া, মাতছে অর্কুট, ফেসবুক পাড়া । 
সারাদুপুর রকবাজি ভুলে ব্লগবাজিতে আর সারাপাড়া দলবাজিতে নয়, ব্লগবন্ধুদের টুইটুইটুইতে মেতে উঠেছে । ঝালেঝোলে অম্বলে বাঙালি সার্চ করছে হেল্থ-e ফুড। ব্লগকিচেন মাতছে সেই রসনায় । ব্লগার ডাক্তারবাবু ফেসবুকে স্টেট্যাস আপডেট করছেন হেলথ-e-টিপস্‌ এ । বং জ্যোতিষী জিটকে ক্লায়েন্টের e-কুষ্ঠির কাউনসেলিং করছেন । কালেকালে কতই হল বাঙালীব্লগার হল !!!

১৬ মে, ২০১১

ভোটপূজো শেষে

ভোটপূজোরই পরেপরে 
বৃষ্টি হবে তুমুল জোরে,
বেসামাল রাস্তাঘাটে 
বানভাসি কালীঘাটে..
গ্রামের ছেলে স্কুল যাবে কি?
স্কুলে গেলে বেঞ্চ পাবে কি ?  
বৃত্তি-পরীক্ষা পাশ  হবেকি ?
জলজমা পথ রদ হবেকি ?
জল-বাতি-পথ সুখ হবে কি ?
হাসপাতালে বেড পাবকি ? 
পবঙ্গে জব পাবকি?
কথারকথা কাজ হবেকি?
বেঘোরে প্রাণ যাবে নাতো ?
জয়েন্ট দিয়ে বাইরে নাতো?
সিলিকনময় সল্টলেকতো ? 
চাষও হবে, বাসও হবে,
শিল্প হবে, গল্প হবে 
তবেই হবে, গর্ব হবে
মনের সুখে বাঁচা হবে  !

১৫ মে, ২০১১

নতুন যুগের ভোরে

ভোটের উত্তেজনার পারদ তখন তুঙ্গে; ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ , ২০১১ সালের মে মাসের গ্রীষ্মও তখন চরমে । পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনের সুনামির পূর্বাভাস পাওয়া গেছে । ভোটপূজো শেষ। শুরু কাউন্টডাউন । আগের দিন কোলাহলমুখর কোলকাতা ছেড়ে রবীন্দ্র সরোবরে সূর্যাস্ত হব হব করছে । দু একটা পাখি নিজের মনে গান গেয়ে কুলায় ফিরছে । লেকের আকাশে লাল ফাগের শেষরেশটুকুনি ধীরে ধীরে নিয়ে চলে গেল সেদিনের সূয্যিটা । শুধু কৃষ্ণচূড়ার কুচোকুচো কমলার ফুলঝুরি আর হলদে বাঁদরলাটির ঝুলনমেলা তখন আকাশে আর লেকের জমা জলের গা ঘেঁষে সবুজ সবুজ কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে দু একটা বেগনিরঙের ফুল যেন অনেক অনেক কাজের ফাঁকে একটু অবকাশ । লেকের ওপারে লম্বালম্বা সাউথসিটির দিক থেকে কুচোকুচো মিছরির মত সাদা আলোর চিকচিকে আভিজাত্য আর লেকের জলে রোয়িংক্লাবের গতিশীল দুএকটা স্কাল । এই ছিল সেই বিকেলে । আমরা হেঁটে চলেছিলাম লেকের জলের ধার দিয়ে , একটু ঠান্ডা হাওয়া মেখে সেই ঘামেভেজা বোশেখের গ্রীষ্মে । লেকের জলে বহুদিনের জমে থাকা শ্যাওলায় জলের বহমানতা কিছুটা হলেও রূদ্ধ ছিল সে বিকেলে । বাঁধানো সিমেন্টের চেয়ারে কত ভালোবাসা-বাসি চলছে তখন.. কলেজ ফিরতি পথে ঊনিশ-কুড়ির বানভাসি সন্ধ্যে নিয়ে, অফিস ফেরত মোনোটোনাস বান্ধবীর প্রতিশ্রুতি রাখায় ।
কেউ খুলে দিয়েছে ল্যাপটপ খোলা আকাশের নীচে । তার গানভাসি সাঁঝ তখন । আইপড কানে দিয়ে একমনে হেঁটে চরকিপাক খাচ্ছে কেউ । বেঞ্চেবসা ছেলেমেয়েগুলির জোড়ায় জোড়ায় একমন একপ্রাণ । গরমে নেই প্রেমের হেলদোল । পরিবর্তনের দোলাচলে প্রেমের বিরাম নেই । নেই সান্ধ্য অভিসারের বিরতি । অন্ধকার যত ঘন হয় প্রেম হয় ঘনিষ্ঠ ।
টিন-প্রেমের পরবে আহুতিপর্ব চলছে । ভালোবাসা ভাসছে লেকের জলে, ভালোবাসা উড়ছে লেকের হাওয়ায় । লেকের মধ্যিখানের একফালি আইল্যান্ডটিকে সেই মূহুর্ত্তে মনে হল সবুজদ্বীপের রাজার রাজধানী । আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই সবুজদ্বীপে । সব অন্ধকারের ঘোর কেটে যাচ্ছিল। অন্ধকারের পরতগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে আলো ঠিকরে আসছিল সেই দ্বীপের মধ্যে থেকে । দ্বীপের নাম টিয়ারং ... একটা ছবি হয়েছিল । মনে হচ্ছিল সেই সবুজদ্বীপকে এই নামটি দিলে বেশ হয় । একঝাঁক সবুজ টিয়া উড়ে ঐ আইল্যান্ডের ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে পড়ল ।আমার মনে হল জেগে উঠলাম রবীন্দ্রসরোবরের উপকূলে ।
নতুন বছরে আমাদের মেঘ সোনারতরীতে উঠেছিল " বাতিঘর এক সবুজ" নিয়ে । আমার হাঁটতে হাঁটতে কেবল মনে হতে লাগল ফেসবুকের সেই সবুজ ফুটকির কথা চুঁইয়ে পড়ছে সবুজ আলো সেই ছোট্ট ফুটকি দিয়ে । একে একে হাতবাড়িয়ে সক্কলের বাতিঘর তখন সবুজ আলোর ফোঁটায় দৃশ্যমান হল । মেঘের সাথে রোদ্দুর, বৃষ্টি অভ্র, আবীর, শুভ্র , শুভ সকলেই তখন মাত করছে ফেসবুকের আড্ডাঘর । আমিও সেই জনস্রোতে সামিল হয়েছিলাম । আড্ডাঘরে তখন সবুজ গন্ধ, নতুন গন্ধ । আমার একবার মনে পড়ে গেল পাঞ্জাবের সবুজ বিপ্লবের কথা । ভয় হ'ল একবার । পরেই মনটা বলে উঠল " হৈ হৈ বিপ্লব ? হোক !বাংলার সবুজ, বাংলার পথঘাট ভরুক সবুজ আনন্দের জোয়ারে । হুজুগে নয় । রবিঠাকুরকে মনে পড়ে গেল " আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব " ভোলাব স্বচ্ছতার আবীরে, সবুজে নয় । সন্ত্রাসের শিবিরে নয়, শান্তির আবহে । সুনামি হয়ে শিল্প আসুক! আয়লার ঝোড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে চলে যাক বন্ধ্যা, নঞর্থক রাজ্যনীতিকে। বাংলা তুমি আবার এসো গো ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায় ।
রবীন্দ্র সরোবরের লাগোয়া নজরুল মঞ্চে তখন কোনো এক বিদ্যামন্দিরের ছেলেমেয়েরা রবিপ্রণাম জানাচ্ছে " বাজে বাজে রম্য বীণা বাজে..." পরদিন অর্থাত ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থের প্রভাতফেরীর রিহার্সাল মনে হল !!!

৮ মে, ২০১১

"রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাউলের প্রভাব"


 "রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাউলের প্রভাব" এই প্রবন্ধটি  রবীন্দ্রনাথের জন্ম সার্ধশতবর্ষে   আটল্যান্টার "অঞ্জলি" ম্যাগাজিনে  (৭ইমে ২০১১) প্রকাশিত হয়েছে ।

৪ মে, ২০১১

জগন্নাথ বসুর "বেতারের কথকতা এবং"( আনন্দ পাবলিশার্স)


 জগন্নাথ বসুর "বেতারের কথকতা এবং"  ব‌ইটি পড়ে যারপরনাই ঋদ্ধ হলাম । বর্তমানের বাচিক শিল্পী জগন্নাথ বসুর অতীতের   কর্মজগত এবং তাঁর অভিজ্ঞতা, সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক আর সর্বোপরি আকাশবাণী ও দূরদর্শনের অনেক না জানা কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখায় ।  ব‌ইটি  উতসর্গ   করেছেন তাঁর সহধর্মিণী শ্রীমতী ঊর্মিমালা বসুকে আর সেখানেও সেই মঞ্চে শ্রুতিনাটকের খুনসুটি অনুভূত হয় " না দেখলে র‌ইতে নারি , দেখলে কাটাকাটি এহেন....." গৌরচন্দ্রিকায় লেখনীর সাবলীলতা মুগ্ধ করে । তারপর সাদাকালোয়, লেখকের সংগ্রহের দুষ্প্রাপ্য সব  পুরোণোদিনের  ছবিগুলি  নিজের সংগ্রহে থেকে গেল এই ভেবে মনে হয় ব‌ইটির মূল্য মাত্র ১৫০টাকা কেন? তারপর শুরু হয় বেত্তান্ত । আকাশবাণী কেমন করে আকাশবাণী হয়ে উঠেছিল এবং বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং বাণীকুমারের মহিষাসুরমর্দিণি এই প্রোডাকশানটি কেমন ভাবে তৈরী হয়েছিল তা জানার সুপ্ত ইচ্ছে আমাকে এতদিনে তৃপ্তি দিল । কারণ আমি নিজেও এই প্রোডাকশানটির অন্ধ ভক্ত ।এই তিনজন প্রবাদপ্রতিম মানুষের জন্য তিনি উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর শ্রদ্ধার ঝুলি আর এনারা যে কতবড় মানুষ হয়েও ভর্তি করতে পারেন নি তাঁদের প্রাপ্ত মর্যাদা  বারবার তাঁর লেখার মাধ্যমে উঠে আসে ।জানতে পারি পঙ্কজ মল্লিকের বেতারজগত থেকে অপসারণের  কাহিনী আর  স্বনামধন্য রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের  সেই শূন্যস্থানে স্থলাভিষেক । মহানায়ক উত্তমকুমারের মহালয়া তৈরী এবং সেখানে আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মহিষাসুরমর্দিণির জয়লাভ উঠে এসেছে । বীরেন্দ্রকৃষ্ণের উত্তমকুমারের প্রতি স্নেহ বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ না করে রোমান্টিক নায়কের সংলাপে  অজানা কথা "হাফনোটের" ব্যঞ্জনা আমাকে ভাবিয়ে তুলল ।
বেতার-নাটকের নেপথ্যের  কুশীলবেরা   কেমন করে তৈরী হয়েছিলেন এবং প্রতিনিয়ত তাদের সাথে ওঠাবসার সাথে নিজের স্মৃতির পাতা থেকে অজানা সব তথ্যের অবতারণা পাঠকমনকে আনন্দ দেয় । একজায়গায় উনি লিখেছেন " শ্রুতি এদেশের আদিমতম শিল্প" অর্থাত বেদপাঠ । আর সেই শ্রুতিশিল্পকে ভালবেসে সেই চারাগাছটিকে এতদিন ধরে লালন করে চলেছেন তাঁরা দুজনে তা তো আমরা দেখতে পাই বাচিক শিল্পী জগন্নাথ-ঊর্মিমালার শ্রুতিনাটকে ।  উঠে এসেছে সত্যজিত রায়ের সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে সঙ্গে তাঁর নাটকের প্রোডাকশান নিয়ে ওঠাবসা ও কতকিছু গবেষণার গল্প ।   মঞ্চ বা বেতারে সহশিল্পীদের অগ্রণী ভূমিকার কথা জানতে পারি আমরা "শব্দের দোকানি" অংশে।  এই মানুষগুলিকে নিয়ে কেউ কখনো কিছু লিখেছেন বলে আমি তো জানিনা ।  আর আছে নেপথ্যের প্রম্পটারদের কথা যারা না হলে নাটক মঞ্চস্থ হয় না অথচ তারা থেকে যান অধরা হয়ে । " দর্শক্ঃ দেবাঃ ন জানন্তি" পড়ে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যায় । কারণ আমিও আম দর্শকের আসনে বসি । মঞ্চে গান করে থাকলেও নাটক? নৈব নৈব চ !  জগন্নাথদার  দর্শকের শ্রেণীবিভাগ এবং সিটে বসে তাদের আচরণ পড়ে মনে হল তিনি স্টেজে বসে সব কিছু লক্ষ্য করেন এবং অমন মনোজ্ঞ শ্রুতিনাটকও করেন !  "অন্যদেশে, বিদেশে"  বিভাগটি পড়ে মনটা ভারি হয়ে যায় । সরকারী ব্যুরোক্রেসির যাঁতাকলে তাঁদের মত মানুষেরাও যে আজীবন পিষ্ট হয়েছেন ভাবলে খারাপ লাগে । বেতার থেকে দূরদর্শনে এসে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা আর নিজের সাথে প্রতিনিয়ত সংঘাতের কাহিনী পাঠকের আসনে বসে পড়ে চলেছি আমরা কিন্তু তিনি স্বয়ং কেমন করে সেই দুস্তর পথ অতিক্রম করেছেন তা বোঝা যায় । সম্পূর্ণ ব‌ইটিতে তাঁর আনন্দের মূহুর্ত হয়ত আছে পর্দার নেপথ্যে কিন্তু কর্মক্ষেত্রে খ্যাতনামা মানুষদের সঙ্গে তাঁর   সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে প্রকটভাবে ।    সবশেষে একটাই কথা বলতে ইচ্ছে হয় , জগন্নাথ বসু কিন্তু অনেকের সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছেন কিন্তু কোনো বিবাদের সুরে নয় , অপমানের ভাষায় নয় ঘৃণার শব্দে নয় । তাঁর লেখার মধ্যে রয়েছে সুপ্ত অভিযোগ, প্রচ্ছন্ন অভিমান আর আমলাতন্ত্রের ওপর বিতৃষ্ণা । 
যাইহোক গদ্যকার জগন্নাথ বসুকে শুভেচ্ছা এমন একটি ব‌ই লেখার জন্য ।আমরা ছোটবেলায় রেডিওতে বাবা মায়েদের নাটক শুনতে দেখেছি কিন্তু আমরা তো টেলিভিশনের যুগের টিনএজারদের দলে ছিলাম । তাই নাটক্, বেতার এবং দূরদর্শন কি এবং কেন সে সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম । ধন্যবাদ আমার বন্ধু মৌসুমী গুপ্তকে যে আমাকে এই বইটির কথা বলেছিল  আর একটি টিভি চ্যানেলের লাইভ টকশোতে জগন্নাথদাকে কথা দিয়েছিলাম ব‌ইটি পড়ে কেমন লাগে তা অবশ্যই জানাব,  তাই এই রিভিউ লেখা ।    আর এর পরের ভাগ আছে " বেতারের গ্রীণরুম" এ। সেটির অপেক্ষায় আছি । ভাগ্যি নেট ছিল এই খড়গপুরে তাই তো বাড়ি বসে বসে ফ্লিপকার্টে অর্ডার দিয়ে দু দিনে ব‌ই এসে গেল হাতে । আবার সাথে  কমিশান আর ফ্রি হোম ডেলিভারি । পরের ব‌ইটি আউট অফ মার্কেট.. এত বিক্রি হয়েছে বলে । ক'দিন বাদে হাতে পাব বলেছে তারা ।

২৯ এপ্রি, ২০১১

যদিদং হৃদয়ং


টেমস নদীর বাতাস আজ বড়ই সুখকর  । নদীতীরের শহর লন্ডনে  আজ রাজবাড়ির "শাহী-বিবাহ" অনুষ্ঠিত হ‌ইতেছে ।  রাণীমা এলিজাবেথের বড়নাতির বিবাহ । মাতৃহারা নাতি রাজকুমার উইলিয়ামের সহিত তার ইউনিভারসিটির আটপৌরে  সহপাঠিনী কেট মিডলটনের শুভ পরিণয়ে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হ‌ইতেছে সানাইয়ের অণুরণন । সর্বত্র উড়িতেছে ইউনিয়ান জ্যাকের নীলে লালে শুভেচ্ছা বার্তা । দশ বছরের ঘনীভূত প্রেম আজ পূর্ণতা পাইতে চলিয়াছে । চারিদিকে সাজোসাজো রব । পৃথিবীর  বিভিন্নপ্রান্ত হ‌ইতে নিমন্ত্রিত রাজদূতেরা আসিয়াছেন  । উপস্থিত পাঁচশত সংবাদগ্রাহকেরা । যাঁরা রাজকীয়তাকে অতি রাজকীয় করিবার জন্য আসিয়াছেন । রাজবাড়ির পারিবারিক সমারোহে মোট দুই বিলিয়ন দর্শক উপস্থিত হ‌ইয়াছেন । নবজীবনে প্রবেশের ঠিক পূর্ব মূহুর্ত্তে রাজকণ্যা সকলকে হাত নাড়িয়া অভিবাদন জানাইয়াছেন গতকাল যখন সে আইবুড়ো ভাত  খাইতে ছিল সেই ফাঁকে  পাত্র উইলিয়াম তার বন্ধুদের সহিত দক্ষিণ লন্ডনের ব্যাটার্সি পার্ক-প্রাঙ্গণে ফুটবল খেলিয়াছে ।
 বিমাতা ক্যামেলিয়া তা জানিয়া প্রমাদ গনিলেন " বিবাহের প্রাক্কালে কি প্রয়োজন খেলিবার্? " 
উপর হ‌ইতে গর্ভধারিনী  স্বর্গতঃ ডায়না  হুঙ্কার  ছাড়িয়া কহিলেন " উহুঁ উ উ!  না বিয়াইয়া কানাইয়ের মা আইলেন !"  আশীর্বাদ করিলেন " আহা ! উহারে একটু খেলিতে দাও! বিবাহের পর যে কিরূপ রাজকীয় মুষিক-দৌড় শুরু হ‌ইবে !  না জানি আমার ভাবী পুত্রবধূ উইলিয়ামের নাসিকায় দড়ি লাগাইয়া কতকিছু করাইবে!"    
"জানা আছে ! পনের বত্সরের  পুত্রটিকে তো ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলে , এতদিন তো এই আমিই ছিলাম তাহার সাথে; সেন্ট এন্ড্রুজ ইউনিভার্সিটি যাইবার সময় তাহার সেলফোন, রুমাল, টাই , ওযালেট আগাইয়া দিলাম । তাহার শুভ পরিণয়ের সংবাদ পাইবামাত্র চার্চে গিয়া বাতি দিলাম । এত বিশাল ঝক্কি সব একাহাতে সামলাইলাম আর উনি এখন উপর হ‌ইতে ফাঁকা মাঠে গোল দিতেছেন " উইলিয়াম-বিমাতা কহিলেন  
ডায়না বলিলেন " এ আর এমন কি ! "" রাজমাতা যদি সমর্থ হ‌ইতেন একা হাতে এই যজ্ঞ্যি সামালাইবার ক্ষমতা রাখিতেন" ক্যামিলিয়া বলিলেন " হ্যাঁ,  তাঁর তো বাতজবেদনা আর ক্ষণেক্ষণে স্মৃতিভ্রম বর্তমানে,  আর আজকাল রাজবাড়ির দাসদাসীরাও পূর্বের মত নাই । অতএব ফ্যাশন ডিজাইনার হ‌ইতে ভূষণ-পালিশ, সসেজের মশলার অনুপান হ‌ইতে কেকের ব্যাটার সবকিছুই আমাকে দেখিতে হ‌ইতেছে ।  তোমার কনিষ্ঠ পুত্র হ্যারি তো বধূমাতা কেটের ভগিনী পিপার পিছনে ছোঁক ছোঁক করিতেছে । কোনো কাজেই সে লাগিল না । আর তোমার আমার সাধারণ পতিদেব চার্লস মহাশয় তো বার্ধক্যের কারণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! তিনি শুধু  একটি কাজ‌ই করিতে পারেন । পানশালায় অতিথিদের ঠিকমত পানসামগ্রীর  দ্বারা আপ্যায়ন হ‌ইতেছে কিনা আর এক আধ সুরাপাত্র চুক চুক করিয়া চুমুক দিয়া আমাকে আসিয়া ঘ্ন্টায় ঘন্টায় চুম্বন করিয়া চলিয়া যাইতেছেন । " 
ডায়না বলিলেন " এ আর নতুন কথা কি ? আমি থাকিলে এতটা না বাড়িলেও তাঁর ছোটপুত্রের মত তোমার পিছনে ছোঁক ছোঁক করিতেন ইহা তো সর্বজনবিদিত ।আমি কি সাধে পলায়ন করিয়াছিলাম ! ডোডির সাথে না পালাইলে আমার জীবন দুর্বিসহ হ‌ইয়া উঠিত এতদিনে " যাক আজ আমার গর্ভের প্রথম সন্তানের বিবাহ ;  এসব অলুক্ষুণে কথা বলিব না " 
এতক্ষণে রাজবাটির দাসদাসীগণ বাকিংহাম প্যালেস হ‌ইতে গায়ে হলুদের তত্ত্ব ল‌ইয়া ওয়েষ্টমিনস্টার এবে অভিমুখে যাত্রা করিয়াছে । বধূমাতার গোলাপী গাউনের সহিত জরির ফিতা বাঁধিয়া, শ্যানেল এইট শিক্ত করিয়া ; রৌপ্য রেকাবে হীরক খচিত ব্রোচ, বিবিধ মণিমুক্তার অঙ্গুরীয় , রতনচূড়, মানতাশা, ইত্যাদি অলঙ্কার ল‌ইয়াছে । কেহ বহন করিতেছে তাহার  কেশ সামগ্রী । কেহ তাহার প্রিয় খাদ্য । বাকিংহাম প্রাসাদের প্রহরীগণ উচ্ছ্বসিত । নতুন লাল পোশাক পাইয়াছে সাথে নতুন কালো লোমের টুপিও ।  রাণীর সভাকবি ক্যারল এন ড্যাফি "রিং" নামক    বিবাহের কবিতা লিখেয়াছেন । দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রীটের ল্যারি নামক বিড়াল ক্যাবিনেটের টেবিলে বসিয়া বিবাহ দেখিতেছে ।  সেও রাজবাড়ি হ‌ইতে গলায় বাঁধিবার  ইউনিয়ান জ্যাক ভূষিত ডিজাইনার বো উপহার স্বরূপ পাইয়াছে । বিবাহ সহ দীর্ঘায়িত অবকাশের সপ্তাহ শেষে লন্ডনের নরনারীগণের ফূর্ত্তি লক্ষ্য করা যায় পথিপার্শ্বের পানশালাগুলিতে । ফোয়ারা ছুটিতেছে সিঙ্গলমল্ট হুইশকির ; স্রোতের মত শ্যাম্পেন বহিতেছে । বিয়ারের ঝর্ণায়  সিক্ত হ‌ইতেছে হোটেলগুলির কার্পেট ।  বিয়েবাড়ির ভোজনশালায় নানা রকমের কেকবেকিং হ‌ইতেছে । রাজকীয় "হগ-রোস্টের" ম্যারিনেশন পর্ব চলিতেছে । একদিকে রাজকীয় বার্বিকিউয়ের ব্যবস্থা হ‌ইয়াছে ।   
জনা পঞ্চাশ রাষ্ট্রপ্রধান এবং দুইহাজার নিমন্ত্রিত অতিথির পদার্পণ হ‌ইয়াছে ।  মহিলা অতিথিদের  টুপির বৈচিত্র্যে বিবাহালয় বৈচিত্রময় হ‌ইল । কাহারো মস্তকে একগুচ্ছ গোলাপের চূড়া । কাহারো পাখির বাসার মত লিলিফুলের বেড়া, কাহারো আবার জরির প্রজাপতি । কেউ আবার রংবেরংয়ের পালক সাজাইয়াছেন মস্তকে । এদিকে লন্ডনের বাসন্তী মেঘলা আকাশ; ড্যাফোডিল ও ফুটিয়াছে । দু এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়িয়াছে উহার পাপড়িতে । আম জনতা পথ-উতসবে সামিল হ‌ইয়াছে । কেহ শিবিরে আশ্রয় ল‌ইয়াছে ,   নবদম্পতির মঙ্গল কামনা করিতেছে ।  অবশেষে রোলসরয়েসে চাপিয়া রাজপুত্র লাল পোশাকে  অবতরণ করিল । সাথে বরকর্তা  কনিষ্ঠভ্রাতা হ্যারি । রাণীমা আসিলেন  ডিউক অফ এডিনবরা , ফিলিপের সাথে  । ভ্রূযুগল ঈষত্‌ কুঞ্চিত । তাঁর পুত্র চার্লস সস্ত্রীক উপস্থিত হ‌ইলেন । কিন্তু বিবাহের বধূর দেখা নাই । ভোর ছয় ঘটিকায় শুরু হ‌ইয়াছে তাহার কেশ পরিচর্যা । পাঁচজন  বিশেষ কেশ বিশারদ আসিয়াছেন । 
রাণী এলিজাবেথ বলিয়া উঠিলেন " ঐ কেশ‌ই তাহার কাল হ‌ইল;   আমার বা উহার শাশুড়ি ডায়নার এরূপ তো দেখি নাই । আমাদের সময় এরূপ হ‌ইত না । ঐ জন্যই বলিয়াছিলাম  উইলিয়ামকে " যেমন-তেমন ঘর হ‌ইতে রাজবাটীতে মেয়ে ঢুকিলে সমস্যা হয় ! অমন প্রেম ঘনিষ্ঠতায় পূর্ণতা না পাইলেই নয়? তা পৌত্র আমার শুনিল না " 
চার্লস বলিল " আহ্‌, থাম না মা! যা হ‌ইয়াছে ভালোই তো " রাণী ক্রুদ্ধ হ‌ইয়া বলিলেন " মনে আছে ? আজি হতে তিরিশ বত্সর পূর্বে তোমারেও বলিয়াছি এতসব,  তুমি শুনিলে না , দেখিলে তাহার পরিণতি"   চার্লস হালকা হেসে বলিল  " থাক না মা আজ ওসব কথা "  
এরূপ বচসা হ‌ইতে হ‌ইতে যীশুর মন্দিরে পিতার হাত ধরিয়া প্রবেশ করিলেন রূপবতী কেট-কুমারী । সর্বশুভ্রা । মস্তকে হীরের টায়রা  পরিয়া এলোচুলে  । কানে হীরের দুল, গলায় হীরের ফুলফুল হার ।শুভ্র ফুল্ল কুসুমিত অর্কিড  হস্তে  ;  মুখ শুভ্র লেসের কারুকার্য করা উড়নিতে আচ্ছাদিত । ছিদ্র দিয়া সব দেখিতে পাইতেছেন কিন্তু তাহাকে কেহ স্পষ্ট দেখিতেছে না ।  সাদা ঘাগরার পিছনে যত্সমান্য রেশমী রেল । দেখিয়াই রাণি জ্বলিয়া উঠিলেন ।  
রুমালে চশমা মুছিয়া ভালো করিয়া দেখিলেন আর ফিলিপকে বলিলেন " আমি এত ঘটা করিয়া দ্বিপ্রাহরিক আহারের বিশেষ ব্যবস্থা করিলাম ।  আর আমার নাত-বৌ এর দাম দিল না ! বেনা ঘাসের অরণ্যে মুক্তা ছড়াইলাম ! হায় যীশু, তুমি কোথায়?"
 ফিলিপ বলিলেন " আহা, অত অধৈর্য্য হ‌ইলে চলিবে রাণী? অধুনাকালের পাত্রী, দিন বদলাইয়াছে । উহারা এখন বৈদ্যুতিন যুগ দেখিয়াছে ।  ফেসবুক করিতেছে । কত কত ডিজাইনারের পোশাক দেখিয়া শুনিয়া বানাইয়াছে ।  নতুন প্রজন্মের নরনারী এরা । তোমার সহিত তুলনা করিলে সংঘাত  হ‌ইবে। চক্ষু মুদিয়া যীশুর  প্রার্থণা কর । রাণি ভুলিবার নয় । বলিলেন " এমন জানিলে! অত মূল্যবান খাঁটি সোনার  হীরের অঙ্গুরীয় উহাকে না দিলেই হ‌ইত ! বানাইয়া দিলাম আমি "   
বিবাহ শুরু হ‌ইল । চার্চের আকাশ বাতাস ঘন্টাধ্বনিতে অণুরণিত হ‌ইল মেপলগাছের পাতাও শুনছে সেই শব্দ । বিউগ্‌ল বাজিতে শুরু হ‌ইল ।  সুরের মুর্ছনায় চার্চ মুখর । ক্যান্টারবেরী চার্চের ডিনের মধ্যস্থতায়  কেটের পিতা সম্প্রদান করিলেন । দুই হস্ত এক হ‌ইল । উইলিয়াম কেটের পাণিগ্রহণ করিলেন । কেটের চোয়াল দৃঢ় হ‌ইল । শপথ নিলেন বর-কনে । সম্মিলিত  প্রার্থনা সঙ্গীত হ‌ইল । ফিলিপ পৌত্রবধূর গর্বে গর্বিত পিতামহ । 
রাণিকে বলিলেন " দেখিলে রাণি? তুমি নাত-বৌয়ের নিন্দা করিতেছিলে , তোমার পুত্রবধূ  স্বর্গীয় ডায়ন র জন্য যে শপথ বাক্য " তোমার সকল আদেশ মানিয়া চলিব " পরিবর্তন করিতে হ‌ইয়াছিল , আমাদের নাত-বৌ  কিন্তু লক্ষীমেয়ের মত অবলীলাক্রমে তাহা উচ্চারণ করিয়া ফেলিল । দেখ এ আমাদের দেখিবে । সেবা করিবে । বড় বাধ্য মেয়ে । আমি উহার পিতামাতাকে জানাই"
রাণী বলিলেন " সাধে কি বলে  পুরুষের বুদ্ধি ! কদাপি মেয়ের প্রশংসা করিবে না, নতুন কুটুম মাথায় চড়িয়া বসিবে"  রাজবাড়ি প্রবেশ করুক তাহার পর যা বন্ধন দিবার আমি দিব । ভবিষ্যতের রাণী হ‌ইবার যোগ্যতা অর্জন করিতে হ‌ইবে না ? আমার যা শরীরের অবস্থা ! আমার উত্তরসুরীকে আমি স্বহস্তে লালন করিব "
চার্লস বলিলেন " মা, দেখ ডায়নাকে কেমন ধরিয়াছিলাম ! কেমন দীর্ঘকায় হ‌ইয়াছে আমার উইলিয়াম , বেশ মানাইয়াছে তাকে দীর্ঘাঙ্গী কেটের পার্শ্বে" 
এলিজাবেথ বলিলেন "  বাহ্‌, তুই না হয় নাতিদীর্ঘকায় ,  ভুলিয়া গেলি তুই কাহার পুত্র? তোর পিতার  উচ্চতার  জিনটি পাইয়াছে আমার নাতি " 
কলহের অবসান হ‌ইল । রাজরক্ষী আসিয়া রাণিকে গাড়িতে উঠিতে বলিলেন ।  দুধে আলতা পায়ে নতুন বধূ  লাল কার্পেটের উপর দিয়া চলিয়া চার্চের বাহিরে আসিল এবং ১৯০২ সালের প্রাচীন ঘোড়ার গাড়ি করিয়া বাকিংহাম রাজপ্রাসাদ অভিমুখে যাত্রা করিলেন ।  
রাজবাড়ির বারান্দায় , পোর্টিকোয়, অলিন্দে  চিলেকোঠার ছাদে এয়োস্ত্রীরা গল্পে, আলাপে আলোচনায় কত রঙ্গতামাশা করিতেছে । 
একজন বলিল " মডেলিং করা মেয়ে , দেখ আবার এ কেমন তর হয় ! "
 কেউ বলিল " " উইলিয়ামের কপালটা তার বাবার মত না হ‌ইলেই হয় , বিয়ের তারিখ দুজনের্‌ই ঊনতিরিশ " 
একজন স্মিত হাসিয়া বলিল " ইহারা নতুন প্রজন্মের বরকনে । দশ বছর ধরিয়া বাজাইয়া ল‌ইয়াছে " 
অন্য একজন খলখল করিয়া বলিয়া উঠিল " থামো থামো , মাঝে তো একবার ছাড়াছাড়িও তো হ‌ইয়া গেছিল"  
আরেকজন তো বলিয়া বসিল " কেনিয়ার গহন অরণ্যে তো সব হ‌ইয়া গেছে আজকের অনুষ্ঠান তো  প্রহসন মাত্র ।
এক রাজদাসী আসিয়া সংবাদ দিল " আসুন আপনারা বরকনে আসিয়া গেল্, উলু দিন, শঙ্খ বাজান"  
শ্যাম্পেন্-বৃষ্টি-ফোয়ারায়, হৃদয় বেলুন আকাশে উড্ডীয়মান । লন্ডনের  বসন্তে ড্য্যাফোডিল ফুটুক না ফুটুক শুভ পরিণয় সমাপ্ত হ‌ইল নিরাপদে । রাজ বারান্দা তখন চুম্বনময় !  
গুরুচন্ডা৯   ই-ম্যাগাজিনের  কূটকাচালি বিভাগ( ৩রামে, ২০১১) তে প্রকাশিত  

২৭ এপ্রি, ২০১১

অথ বিবাহ- উবাচ !

শুন শুন সর্বজন শুন দিয়া মন
রাণীর নাতির শাদীকথা করিব বর্ণন 
সেথায় পাত্র হল রাজপুত্র উইলিয়াম নাম
চার্লস-ডায়নার  জ্যেষ্ঠপুত্র , লন্ডন তার ধাম । 
অশীতিপর এলিজাবেথ রাণী সেথায় কর্ত্রী 
কেট নামে রাজকন্যা  নাতির পাণিপ্রার্থী
নাতবৌয়ের গাউন বানায় ডিজাইনার বুটিক 
সিকুয়েন্স, ফ্রিল, লেসের ঘটায় ঢাকিল রয়াল সিল্ক 
কেশবতী কেট কুমারী  ভাবিছেন বসিয়া
কেতার  কবরী বাঁধিব? না রাখিব কেশ খুলিয়া ? 
টায়রা শিরে রাখিব  নাকি পুষ্পে গাঁথিব মুকুট ? 
সোনার রিস্টলেট পরিব নাকি  শুধুই হীরের অঙ্গুঠ ? 
তালিম নিতেছে এখন সেথায় রাজবাটির গার্ডগণ
অসুস্থ হৈলেও কায়দা করিবে,  শিখিছে  সর্বখন ।
কোথায় হৈবে মধুচন্দ্রিমা কেনিয়া-সেশেলস-সিসিলি ?
প্যাপারত্জি পিছু নিবে তাই সত্য নাই বা বলি  !      
চতুর্দশ হীরকমন্ডিত বিশালাকার নীলা
এহেন  বিবাহ অঙ্গুরীয় পরিবে বধূবালা 
এটি পিতা চার্লসও যে ডায়নারে পরায়েছিল  
পরিয়া হতভাগীর বেঘোরে প্রাণ গেল  !
আমার দেশে নীলা যে বড় শুভ নয়
এ'কথাটি  রাণির কানে রাখিও নিশ্চয় ! 
এখনো সময় আছে ইমেল পাঠাও
ভনয়ে সোনারতরী রাণিরে জাগাও !

২৪ এপ্রি, ২০১১

তরাই তুমি


করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনকন্ঠ, ২৪শে এপ্রিল ২০১১ 

২২ এপ্রি, ২০১১

জন্মদিনের চিঠি-মা'কে

স্বাধীনতার বছরতিনেক আগে, দিনটা ছিল ৯ইবৈশাখ ।
তুমি দেখেছিলে প্রথম ভোরের আলো,
কোলকাতার হাসপাতালে, তখন শ্বেতাঙ্গিনী নার্স ।
তোমার ধবধবে ফর্সা তুলতুলে হাত-পা, মাথাভর্তি কালো চুল
কপালে বাদামী তিল, চিবুকে কালো তিল, পিঠে লাল জড়ুল
কেউ নাম দিল তিলোত্তমা, কেউ ডাকল কৃষ্ণা কেউ গৌরী বলে ।
তুমি তখন ঘুম, ঘুম আর ঘুম !
সেই একরত্তিটি বাড়ি এলে, বাড়তে থাকলে কলে কলে আর বড় হলে 
তারপর স্কুল, গান খেলাধূলোর ফাঁকে ফাঁকে আর পাঁচটার মত ।
ভালোবাসার রূপকথা তৈরী হল তোমার  ।
তুমি তখন বেথুনসাহেবের কলেজে, আর সে চাকরীতে ।
লুকিয়ে দেখা চিলেকোঠার বিকেলগুলোয়, ছায়াছবির অন্ধকারে..  
তুমি তখন আটপৌরে ফুলিয়ার তাঁতে বছর ঊণিশ কি কুড়ি ।
পরিপাটী দুটো বেণী, হাতে সোনার চুড়ি 
তারপর একে একে সানাই, সিঁথিময়ূর, শাঁখ, উলুধ্বনি,
লক্ষীমেয়ে গুটিগুটি, চললে তুমি তার হাত ধরে 
তোমাদের সেই হুটোপাটি, ছাদের ওপর হাসিঠাট্টায়,
ঝুল বারান্দায় হাত ধরাধরি, কোলে এল ফুটফুটে দুটি ।
আজো সেই হাত ধরা তোমাদের; কত ঝড়ঝাপটার রেলিংএ
মনখারাপের কার্ণিশে আর সেই পুরোণো ছাদের প্যারাপেটে

১৪ এপ্রি, ২০১১

পয়লা-সাহিত্য-পার্বণ


 বেশ চড়চড়ে গরম । সোনালী বিকেলে মেঘ এল । আরো গুমট গরম । নৌকোখানা নিয়ে মাঝি যাবে কেমন করে একা একা ?   দমকা ঠান্ডা হাওয়া দিল । এই বুঝি ঝড়  ওঠে নদীতে । মাঝির মনখারাপ । মাছ ধরে আনবে কথা দিয়েছিল বৌকে । বৌ তার বন্ধুদের ভাজামাছ খাওয়াবে কথা দিয়েছে । নতুন বছর বলে কথা ! যে বাবুদের বাড়ি মাছ দিতে যায় তাদের সব কত চেয়ার, কত টেবিল ! কত বড় বড় কাঁচের রেকাব ।
"আমাদের তো কিছুই নেই , এতসব" কোথায় বসতে দিবি আর কোথায় খাওয়াবি বৌ?
বৌয়ের সাধ "আমাদের নৌকোখানাতেই বসবে ওরা । একটা মোটে দিন তো । আমি নৌকোয় বসেই ভাজব মাছ । আর তুমি কলাপাতায় করে ওদের খেতে দেবেখন"
"আচ্ছা তবে তাই হবে"  
"শুভ দিন , নতুন বছর। বাবুরা যেমন মাছের অর্ডার দিয়েছে, আমরাও মাছ আনব, আর কি যেন বলে ? পার্টি দেব বাবুদের মতন"
নৌকো তখন মাঝ দরিয়ায় । প্রচুর মাছ উঠেছে আজ । মেঘ সরে গেছে । চাঁদ উঠেছে । মাঝি বৌয়ের  তুলসীতলায় পিদিম, শাঁখ, ঘটে সিঁদুরের স্বস্তিকা এঁকে আমের পল্লব হ'ল। 
রঙচঙে হয়েছে নৌকোখানা । ছ‌ই এর দোরে দুটো কলাগাছ হাওয়ায় দুলছে আপনমনে ।   খোলা হাওয়া লেগেছে তার পালে । বৌ পরেছে নতুন কড়কড়ে শাড়িখানা । পায়ে রূপোর বিছুয়া । নৌকোর পাটাতনে পা ছড়িয়ে মাছ ভাজছে বসে । এসে গেছে একে একে সকলে । পুরোণো নদী , পুরোণো চাঁদ , পুরোণো নৌকোখানি। বদলায়নি কিছুই । শুধু এক নতুন ভালোলাগা । নতুন করে ভালোথাকা । নিজের লোকেদের নিয়ে নিজের মত করে থাকতে চাওয়া !  
নদীর জলে কলকল করে জল কাটছে নৌকোর দাঁড় । আপনমনে নদী চলেছে নৌকোকে নিয়ে । আর খলখল করে হাসির রোল উঠেছে..
 ১ ব‌ই-শাখে, দেখা হল ২ জনায়..

 এসো Hey ব‌ই-শাখ ! s o, s o
ছবি: শুভেন্দু দাস 
কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট, 
আইবিএম  করপোরেট কমিউনিকশন 


আমাকে আমার মতো থাকতে দাও  
রেখা মিত্র
মহাদেবের আর্জি 
মধুমিতা ভট্টাচার্য
ভোঁকাট্টা 
সুতপা ভট্টাচার্য বারুই
আপনমনে আমায় থাকতে দে 
রমা চৌধুরী
মন 
অদিতি ভট্টাচার্য
আমাকে আমার মতন থাকতে দাও 
অনির্বাণ রায়
বাতিঘর এক সবুজ  
মেঘ
নববর্ষ ১৪১৮  
মহাশ্বেতা রায়
সোনালী আহ্বান 
নীল নক্ষত্র
২২ নভেম্বর, গোপন রহস্য উদ্ধার 
হামিদা রহমান
এক বৃদ্ধ ও এক যুবক 
আমিনুল ইসলাম মামুন
লিখিনু যে লিপিখানি 
ইন্দিরা মুখার্জি
ছবিতা 
সোমা মুখার্জি 
আমার পয়লা বৈশাখ   
আইভি চট্টোপাধ্যায়
আমাকে আমার মতো  
কল্যাণবন্ধু মিত্র
একটি কুকুরের বদলে যাবার গল্প  
মুরাদুল ইসলাম
আমার‌ই মত এই আমি 
সংঘমিত্রা নাথ  


পয়লায় ৯ ১লা 

আনলিমিটেড  ব্লগবাজি, ই-পাড়ায় টোটো-টোকলা, সোশ্যালনেটে টুইটুই,  ডিজিটাল সেলিবদের সঙ্গে চ্যাট-বিলাস, লিটলম্যাগের রিয়েলিটি শো       



  • হেল্থ-e-ফুড  
  • মান্থলি-e-ম্যাগাজিন  
  • চৈত্রসেলে-e-শপিং
  • এন্ড্রয়েড vs আইফোন তর্ক 
  • গুগ্‌লক্রোম, এক্সপ্লোরার, ফায়ারফক্সের রেস
  • ডিজিটাল বন্ধুত্ব 
  • রিয়েল vs  ভার্চুয়াল প্রোফাইল 
  • জি-টকে ঝগড়া 
  • সারারাতব্যাপী ইউটিউব-জলসা    
  • নতুন সোশ্যাল-মিডিয়া 
  • নতুন  ওয়েবম্যাগ 
  • নতুন ব্লগ-বিজ্ঞাপন    



মধুরেণ তুষ্টি তাম্বুলে
কাঁচামাল :

টাটকা পালংপাতা  
তেঁতুল আর গুড়ের মিষ্টি চাটনি
শুকনো খোলায় ভাজা চীনে বাদাম কুচি
কাঁচা আমের ঝুরি
পেঁয়াজ কুচি
কাঁচালঙ্কা কুচি
সেওভাজা
ধনেপাতা কুচোনো
চাট-মশলা 

কেমন করে ?

যেমন করে পান সাজে ঠিক তেমন করে | পালংপাতা ভালো করে ধুয়ে নিয়ে চুনের বদলে চাটনী মাখিয়ে আর সুপুরী, মৌরী, মশলার বদলে বাকী সব দিয়ে মুড়ে ফেলুন আর টপ করে মুখে পুরুন এই "দিল-জ্বলা" পানটি!   


লিখিনু যে লিপিখানি : ইন্দিরা মুখার্জি



বছর 
আবার বিনা নিমন্ত্রণে পা বাড়ালাম তোমার কাছে । তোমার চেহারাটাই কেমন জানিনা । তোমাকে দেখতে কেমনতুমি কতটা ভালকতটা খারাপ তা বুঝতে না বুঝতেই তোমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে যায় আর আমার তোমার কাছে যাবার সময় হয়ে যায় । প্রতিটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে যায়, তোমার নোটিশ এসে যায় বাড়ি ছাড়ার । আর আমার নতুন বাড়ির হাউস ওয়ার্মিং পার্টির তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় । সময়ের সাক্ষী হয়ে থেকে যায় প্রতিটি মূহুর্ত্ত। সময়ের দলিলে 
স্বাক্ষর রেখে চলে যাও তুমি । প্রতিটি মাসপ্র্তিটি দিনপ্রতিটি রাত তৈরী করে যায় নিজের নিজের নজির । ফুলের পাপড়ির মত একটা একটা করে খসে যায় প্রত্যেকটা দিন । জন্ম হয় নতুন দিনের । কেমন যেন চেনা আশপাশে অচেনা একটা দিন । কালের ছায়াপথ ধরে হেঁটে চলে যায় দিনেরা । একটা মাত্র চাঁদের ৩৬৫ দিন ধরে পর্যায়ক্রম হ্রাসবৃদ্ধি প্রতিদিনের জোয়ার-ভাটা 
 দিনরাতের খেয়ালখুশিরাহাসিকান্নারা চলে যায় তোমার হাত ধরে । তোমার ৩৬৫টা দিনের যেন রামধনু রঙ । ঝোড়ো হাওয়ায় রঙগুলোকে ফাগের মত উড়িয়ে নিয়ে যাও তুমি । কখনো দিয়ে যাও এক রাশ ঠান্ডা হাওয়াকখনো দুপশলা বৃষ্টির গন্ধ কখনো বা মুঠো মুঠো রোদের উষ্ণতা । তুমি কেড়ে নিয়ে যাও কত জীবন খালি করে দাও কত মায়ের কোলভেঙে দাও কত নদীর পাড়; আবার দুহাত ভরে দিয়ে যাও কত কিছু । ছুঁয়ে যাও মন; ভিজিয়ে দাও দুচোখের পাতাকে আনন্দের কান্না দিয়ে । তুমি তো চললে বছর একবারো কি ভাবলে তোমার পুরোণো বন্ধুর কথা 
বছর আমিও চললাম তোমার সাথে কারণ তোমার খেয়ায় পা দিয়ে তো বসেই আছি ।
তুমি আসবে বলে ঘর ঝাড়াপোঁছা । তুমি আসবে বলে সেই অছিলায় নতুন জামা । তোমার আসার আনন্দে হৈ হৈ করে হ্যাঙ আউটের প্ল্যান । তোমার জন্যে নবপঞ্জিকাহালখাতা আর নতুন ক্যালেন্ডার । 
ভালো থেকো বছরটা । ভালোটি হয়ে থাকব আমিও যদি তোমার ভালোটুকুনির মধ্যে থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি । একরত্তি এই জীবনটাকে ভালোবাসায়মন্দবাসায় ভরিয়ে রেখো । তোমার তো ৩৬৫রকম জীবন থাকবে কিন্তু আমার তো একটাই । কথা দিলাম ভালবাসব । কথা দিলাম তোমায় ভালো রাখব ।  আবার গরমের বিকেলে গা ধুয়ে পরে নেব মলমল শাড়িখানা বরষার সান্ড্যাক চটিজোড়া যত্ন করে রেখে দেবভাদ্রের রোদে পুরোণো বালুচরি রোদ খাওয়াবশীতের পশমিনা-বালাপোশ মথ বলের গন্ধে ভরপুর করবে । ফাগুনের আগুন নিভে যাবে দোলের সাথে সাথে আবার শুরু হয়ে যাবে তোমার যাওয়ার তোড়জোড় আর আমার বাড়ি বদলের পার্টি !
তোমার সাথে যাব বলে আমিও সেজেগুজেনতুন জামা কাপড় পরে বসে আছি আমার মত । শুধু তোমার অপেক্ষায় । তুমি যেমন খামখেয়ালি ইচ্ছেডানায় উড়ে চল রোজতেমনি করেই আমিও যাব কথা দিলাম । শুধু আমাকে আমার মত থাকতে দিওএই টুকুনি চাইলাম তোমার কাছে । তোমার যেমন বয়সটা এক এক করে বেড়ে যায় প্রতিবারের পয়লা বোশেখে আমারও তো বাড়ে । তাই যত না পাওয়ার গল্পটানষ্ট জীবনছারখার জাহাজ মাস্তুল সরিয়ে রেখে নিজেকে নিজের মত গুছিয়ে নাও । আর আমাকে আমার মত থাকতে দাও !
ইতি
তোমার নতুন নৌকোর পুরোণো যাত্রী   

ইন্দিরা মুখার্জি  
ব্লগার




















[ ১ম পাতায় ফেরত ]

আমাকে আমার মতো : কল্যাণবন্ধু মিত্র


আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমি কারোর সাতে-পাঁচে থাকি না। আশেপাশে কার ঘরে কি ঘটছে না ঘটছে সে নিয়ে মাথা ঘামাই না।বাজারদোকান,অফিস,ছেলে, মেয়ে, কুকুর, বউ, সিরিয়াল...ব্যস্‌ ,এর বাইরে আর কিছু জানিনা। কারণ আমি আমার মতো থাকতে চাই’। এই হলো আজকের গড়পড়তা মানুষের মনের ভেতরকার ছবি।
আধুনিক কাল আমাদের ‘স্বার্থের জমিটাকে’ এইভাবে ক্রমশঃ ‘ঊর্বর’ করে তুলছে।সেই ঊর্বর জমিতে ‘সবুজ ফসল ফলানো’র ধান্দাবাজি চাপা দেওয়ার ধামা হিসেবে এমন ধাপ্পাবাক্যের কোন জবাব নেই।“আমাকে আমার মতো থাকতে দাও”!
আমার বাবা প্রতিদিনই বাজার যাবার সময় একগোছা পোস্টকার্ড নিয়ে বেরোতেন ডাকবাক্সে ফেলবেন বলে। সে-সব পত্রপ্রাপকদের মধ্যে হাতে গোনা ক’জনের  উত্তর আসতো।যারা  চিঠির প্রাপ্তিস্বীকারটুকুও করে না,পয়সা খরচ করে বারবার কুশলবার্তা জানতে চেয়ে তাদের চিঠি লিখে কি হবে ? কী আশ্চর্য,অতোদিন আগে এই কথার জবাবে বাবা বলেছিলেন , ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’।
মাঝেমাঝে ভাবি, এই মানুষটা সত্যিই যদি  নিজের মতো থাকতেন,তাহলে কী বিপুল সম্পদ-ই না তিনি অর্জন করতে পারতেন!মধ্যবয়সে তার সামনে এসেছিলো এক সুবর্ণ সুযোগ।যে সুযোগ জীবনে একবারই আসে।কিন্তু সুযোগকে “হ্যাঁ” বলার বদলে তিনি সরাসরি “না” বললেন ।কারণ ঠাকুমা তখন পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছেন। বাড়িতে যদিও ঠাকুমা দৃষ্টিহীন চোখেই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন সর্বত্র,নিকটজনেরা আসেন তাঁর সাথে গল্প করতে, কিন্তু অচেনা পরিবেশে নির্বান্ধব অবস্থায় তিনি সারাটা দিন কাটাবেন কি করে ?শুধু এই কারণেই সুযোগপ্রাপ্তদের মধ্যে একমাত্র বাবা-ই রয়ে গেলেন কলকাতায়।বাকি জীবনটা কাটালেন পুরানো পদে-ই,অনেক কম বেতন ও সুযোগসুবিধাকে হাসিমুখে শিরোধার্য করে।
নিজের অপরিনামদর্শী ঋণজর্জর ভাইকে পাওনাদারের হাত থেকে রক্ষা করতে কী পরম মমতায় সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি ,সে তো বারবার-ই দেখেছি।একবার এইরকম পরিস্থিতিতে বাবার নিজেরই টাকার ভাঁড়ার শূন্য,তা-ও তিনি ভাইকে বিমুখ করেন নি,কিভাবে যেন সব সামাল দিলেন।নিজের কষ্টার্জিত অর্থের বিরাট অঙ্ক জলাঞ্জলি দিয়ে ভাইকে সম্মানহানি থেকে বাঁচালেন।তখন এমনটাই হতো।শুধু ভাই কেন,প্রতিবেশীর বিপদেও মানুষ নিজেকে আড়ালে রাখার অভিনব সব কায়দায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নি।তখনকার যুগের মুখে “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও” ধরণের নির্লজ্জ আত্মকেন্দ্রিক-বার্তাময় সঙ্গীত সত্যিই অকল্পনীয় ছিল।স্বার্থপর মানুষ কি তখন ছিল না ? সংখ্যায় কম হলেও তারা সেযুগেও জন্মগ্রহণ করতো।কিন্তু আপন-আপন স্বভাবের জন্য তারা প্রকাশ্যেই নিন্দিত হতো।অমানবিক কাজ অর্থকৌলীন্য দিয়ে ঢাকা যেতো না।   
আমার পারিবারিক গণ্ডিতে দীর্ঘদিন আমিই ছিলাম সবার স্নেহের একচ্ছত্র অধিরাজ। কিন্তু সেই সময় আমাকে আমার মতো করে থাকার শিক্ষা দেওয়া হয় নি। যে কোনো সুখাদ্য অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে খেতে শেখানো হয়েছিলো আমাকে।আজ প্রায় সব ছেলেমেয়ের কানে তার-তার নিজের মতো করে জীবনযাপনের মন্তর দেয়া হচ্ছে ঘরে বাইরে । সেই মন্তর প্রথমে ঘর ভরিয়ে দেয়,ধাঁধা লাগায় প্রাপ্তির চমকে-ঠমকে।তারপর  আসে এক মর্মান্তিক আবিষ্কারের লগ্ন।এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে চলচ্ছক্তিহীন একা নিজেকে দেখার পালা। অন্যরা সবাই,এমনকী আপনজনেরাও তখন যে যার নিজের মতো করে থাকছে ! তাদের আর অন্যদিকে তাকাবার সময় কোথায় ?

কল্যাণবন্ধু মিত্র
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের  বিধি নির্দেশক দফতরের বিশেষ দায়িত্ত্বপ্রাপ্ত অফিসার











[ ১ম পাতায় ফেরত ]