১১ জুন, ২০১২

বিপন্ন বাঁশবেড়িয়ায়

-->
কোলকাতা ছেড়ে আমরা তখন বিটি রোড ধরেছি । হুগলীর বাঁশবেড়িয়ায় আমার শ্বশুরমশাইয়ের পিতামহ শ্রী সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়ের তৈরী বসতভিটে পরিদর্শনে । একে একে পেরোলাম বালি, উত্তরপাড়া, কোন্নগর, ভদ্রকালী, রিষঢ়া, শ্রীরামপুর পেরোতে পেরোতে জৈষ্ঠ্যের রোদ তখন প্রায় আলম্ব মাথার ওপর । তারমধ্যেই শহরতলীর বাজারে হৈ হৈ করে বিকোচ্ছে আম-কাঁঠাল-লিচু । রবিবারের সরগরম বাজারে ঠা ঠা রোদেও বিকিকিনির খামতি নেই ।
জিটি রোড ছেড়ে এবার পুরোণো দিল্লী রোড ধরে সোজা মগরা হয়ে বাঁশবেড়িয়া । হংসেশ্বরী রোড ধরে রঘুদেবপুরে থামা ।
দেড়শো বছরের পুরোণো মুখুজ্যে বাস্তুভিটে এখন জঙ্গলাকীর্ণ । লোকাল ক্লাব, লোকনাথ বাবার মন্দির গড়ে উঠেছে এই জমিতেই । 

দোতলাবাড়ি ভেঙে গেছে বহুদিন আগেই ।জানলা দরজা ভেঙে ভেঙে নিয়ে গেছে কেউ । কড়িবরগার ছাদের নীচে একতলায় বাস করছে তিনটি পরিবার । পাশে দুটো পুকুরে এখনো জল থৈ থৈ । সংলগ্ন বাড়ি উঠেছে আমাদের জমির ওপর দিয়েই । প্রকান্ড বাড়ির সামনে বারমহল এখনো কিছুটা ভগ্নাবস্থায় দাঁড়িয়ে । পাশে ছিল উঁচু করা খানিক জমি যেখানে প্রতিবছর জগাদ্ধাত্রী পুজো হত ।
এখন পরিত্যক্ত ভিটের কুলুঙ্গিতে চামচিকের আনাগোনা । ক্লান্ত দুপুরে এ ভিটে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ কুবো-ঘুঘুদের ছায়াসাথী ।  পোড়া ইঁটের সুরকি নিয়ে রান্নাবাটি জমিয়ে দেয় পাড়ার ছোট ছেলেমেয়েরা ।  বারমহলের লবি চু-কিত্কিত প্রেমীদের অবারিত দ্বার ।  


 এরপর যাওয়া হল হংসেশ্বরী মন্দির ।  


পুরোণো হুগলীজেলার শিল্পনগরী ব্যান্ডেল এবং ত্রিবেণীর মাঝামাঝি অবস্থিত হংসেশ্বরী মন্দির । রাজা নৃসিংহদেব রায় এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীকালে ওনার বিধবা পত্নী রাণী শংকরী সেই কাজ সমাপ্ত করেন । হংসেশ্বরী মন্দিরের অদ্ভূত গড়ন । বাংলার অন্যান্য মন্দিরের থেকে ভিন্নরকমের । পঞ্চতল এই মন্দিরে তেরোটি উঁচু মিনার আছে যাকে বলে রত্ন । প্রতিটি মিনার যেন এক একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের আকৃতিতে তৈরী । হংসেশ্বরী মন্দিরের গঠনশৈলীকে বলা হয় তান্ত্রিক সাতচক্রভেদ ।


 পাশেই অনন্ত বাসুদেবের মন্দিরটি ও নজর কাড়ে । সেটি বাংলার চালাঘরের আদতে পোড়ামাটির তৈরী । গায়ে টেরাকোটার অভিনব স্থাপত্য ।নিঁখুত কারুকার্য এই টেরাকোটার । কোনোটিতে রাধাকৃষ্ণ, কোনোটিতে দশাবতার, কোনোটিতে হনুমান । 


 এই দুই মন্দিরই এখন আরকিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনে ।কাছেই ত্রিবেণী হল তিন নদী গঙ্গা, সরস্বতী ও বিদ্যাধরীর সঙ্গমস্থল । কিন্তু সরস্বতী নদী মজে যাওয়ায় দুটি নদী এখন দৃশ্যমান ।
মন্দির এবং সংলগ্ন জমিদার বাড়ীর পুরো চৌহর্দির সীমানা বরাবর পরিখা খনন করে সুরক্ষিত করা রয়েছে এখনো ।

২৭ মে, ২০১২

শ্রীমান তীর্থরাজ এবং জলপরি


  (আনন্দবাজার পত্রিকা, শনিবার, ২৬শে মে ২০১২, ওয়ানস্টপ ভ্রমণের কলমে প্রকাশিত)  
বিলাসপুর থেকে ভাড়ার গাড়িতে উঠে যাত্রা শুরু মধ্যপ্রদেশের অনুপপুর জেলার অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে । মন্দিরময় পুরোণো শহর অমরকন্টক যার আরেক নাম তীর্থরাজ । যেখানে ভারতের দুই উল্লেখযোগ্য পর্বত বিন্ধ্য এবং সাতপুরা মিলিত হয়েছে মৈকাল পর্বতের সাথে । আর সেই অমরকন্টক হল নর্মদা এবং শোন নদীর উত্পত্তি স্থল ।
এই সেই নর্মদা নদী যে নাকি মৈকাল পর্বতের কন্যা । ভরা বর্ষায় তার জল থৈ থৈ রূপলাবণ্য নিয়ে পূব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে গাল্ফ অফ খাম্বাতে গিয়ে তার আত্ম সমর্পণ । তার এই যাত্রাপথের সঙ্গী হয়েছে কত কত উপনদী, মিলিত হয়েছে তার সাথে হিরণ, তিন্ডোনি, কোলার, হাথনী, গোয়ী, তাওয়া, এবং গাঞ্জাল.. বন্ধুনদী হয়ে তার কোলে এসে পড়েছে । স্থান দিয়েছে তার তীরে কত কত কোল-ভীল-কিরাট-ব্যাধ উপজাতিদের । যাদের লালনে শিবমহিমা ব্যাপ্ত হয়েছে নর্মদার তীরে তীরে । মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে সেই অমরকন্টককে ঘিরে । নর্মদা যার উত্পত্তিস্থল । মহাকবি কালিদাসের রচনায় অমরকন্টককে "অমরকূট" বা যে পাহাড়ের শৃঙ্গের বিনাশ হয়না কিম্বা "আম্রকূট" বা যে পাহাড়ের চূড়া আমগাছের প্রাচুর্য্যে সমৃদ্ধ বলে আমরা জানি । নর্মদার একরাশ পাহাড়ী ঝোরায় মাঝেমাঝেই লুকিয়ে পড়া আর হঠাত হঠাত তার কলকল শব্দে গহিন জঙ্গলে বয়ে চলা দেখে মনে হল পাহাড় আর নদীর এই লুকোচুরি, নর্মদার তিরতির করে ঝরে পড়া কিম্বা দুধ-সাদা ফেনিল জলরাশির মধ্যে যে আনন্দ তা কিশোরী বালিকা বা যুবতীর হাসির মতই স্বতস্ফূর্ত এবং সাবলীল ।
অমরকন্টকের প্রাচীন মন্দিরগুলি পুরোণো ভারতীয় মন্দিরের ঐতিহ্য বহন করছে । অসাধারণ সুন্দর তার স্থাপত্য । কলচুরি মহারাজ কর্ণের আমলে তৈরী এই মন্দিরগুলি । সপ্তরথের আকৃতি বিশিষ্ট একটি শিব মন্দির রয়েছে যার তিনটি গর্ভগৃহ । একে বলে কর্ণ মন্দির । অমসৃণ লাল পাথরের তৈরী । কর্ণমন্দিরের উত্তরে ১৬টি স্তম্ভ বিশিষ্ট মাছেন্দ্র নাথ মন্দির । এছাড়া রয়েছে পঞ্চরথের আকৃতি বিশিষ্ট পাতালেশ্বর মহাদেও মন্দির । কেশব নারায়ণ মন্দির । ঠিক পাশেই রয়েছে সূর্যকুন্ড । কথিত আছে, একসময় নর্মদা এই স্থান থেকে উত্সারিত হত এবং তাই মহারাজ কর্ণদেব মহাভারতের ৩০০০বছর পর এই সূর্যকুন্ডটি এবং সংলগ্ন পাতালেশ্বর শিবমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। কুমারী নর্মদাকে আশ্রয় দেবার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরী করা হয় যার নাম রঙমহল ।
পুরোণো মন্দির দেখে এবার গন্তব্য নর্মদা উত্সস্থল বা নর্মদা-উদ্‌গম এবং যাকে ঘিরে রয়েছে একটি বিশাল কুন্ড ও তার আশেপাশে একরাশ নতুন মন্দির । রাজকীয় প্রবেশদ্বার এই মন্দিরের। এখন নর্মদার উত্সমুখ জলের ১২ফুট নীচে যেখানে নর্মদেশ্বর শিবলিঙ্গ রয়েছেন । মহাদেবের স্বেদগ্রন্থি থেকে সৃষ্ট এই নর্মদা । বছরে দু-একবার কুন্ডের পিছনে দরজা খুলে জল ছেঁচে ফেলে দিয়ে আবার কুন্ড ভর্তি করে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় । সেই সময় নর্মদেশ্বর এবং তার মন্দিরে প্রবেশ করা যায় ।
নর্মদার উত্তরতীরে কপিলধারা জলপ্রপাত যেখানে মহামুনি কপিল তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন । কপিলধারা থেকে ১কিমি পশ্চিমে রয়েছে দুগধারা জলপ্রপাত । ঋষি দুর্বাসা এখানে তপস্যা করেছিলেন । এছাড়াও রযেছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে শম্ভূধারা এবং দুর্গাধারা জলপ্রপাত । ঝরণার অবলীলায় ঝরে পড়া আর পাহাড়-মাটী-নদীর এত সুন্দর সখ্যতায় অমরকন্টক যেন হয়ে উঠেছে চির নবীন । নদীর উচ্ছলতায় পাহাড় যেন কথা বলে ওঠে এখানে ।
ভার্জিন নর্মদা সুন্দরীর যৌবনপ্রাপ্তি এই অমরকন্টকে । কুমারী নর্মদা তখনো মা নর্মদা হয়ে ওঠেনি । প্রাচীন মন্দিরের কিছু দূরেই পড়ে মাই-কি-বাগিয়া যেখানে রয়েছে চর্ণোদক কুন্ড । ঘন অরণ্যের মধ্যে ফল ও ফুলগাছের ছায়া সুনিবিড় ইকোসিস্টেমে কুমারী নর্মদা স‌ই পাতিয়েছিল গুল--বকোয়ালি ফুলের সাথে । অসাধারণ সুন্দর দেখতে এই ক্যাকটাসের ফুল । নর্মদার জোলো হাওয়ায় গভীর অরণ্যে ফুটে থাকে এই ফুল যার বৈজ্ঞানিক নাম এপিফাইলাম অক্সিপেটালাম। হিন্দীতে বলে নিশিগন্ধী বা গুল--বকোয়ালি । এটি একটি অত্যাশ্চর্য বনৌষধি ।
যাইহোক আমরা হলাম পরিদর্শক । কুমারী নর্মদা আর গুল--বকোয়ালির সখ্যতায় গড়ে ওঠা মা-কি বাগিয়া দেখে নিলাম চটপট । হোম, যজ্ঞ, পূজোপাঠ চলছে মহা ধূমধাম করে । খুব নাকি জাগ্র্ত এই স্থান ।
কিন্তু শীতে ফুলবন্ধুটির দেখা পেলাম না । মার্চমাসে আবির্ভাব হয় তার ।
মা কি বাগিচার ১ কিমি দক্ষিণে যাওয়া হল শোনমুডা বা শোন নদীর উত্সমুখ দেখতে । এটিকে অমরকন্টকের স্বর্গ বলা হয় । ব্রহ্মার বরপুত্র শোন । রাস্তা থেকে কিছুটা নেমে গিয়ে দেখা গেল একটি হনুমান মন্দিরের গায়ে শোনমুডা বা শোন নদীর উত্পত্তিস্থল । এখান থেকে অতি শীর্ণকায় শোন পাহাড়ের গা বেয়ে কিছুটা এগিয়ে তারপর প্রেসিপিসের ওপর দিয়ে পাহাড় থেকে লাফ মেরে নীচের উপত্যকায় জলপ্রপাত হয়ে ঝরে পড়ে বেরিয়ে চলে গেছে উত্তর দিকে সুদূর গঙ্গার সাথে মিলিত হবার জন্য । আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে দুটি বড় নদী এত নিকটবর্তী স্থান থেকে উত্সারিত হয়ে দুটি দুদিকে বয়ে চলে গেছে । নর্মদা আরব্যসাগরের দিকে আর শোন উত্তরদিকে গঙ্গার মধ্যে দিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে । প্রকৃতির এই ভৌগোলিক খেয়ালকে পুরাণে এক বেদনাদায়ক কাহিনীর মধ্যে লিপিবদ্ধ করা আছে । সেখানে বলা হয় নর্মদার সাথে শোনের বিবাহ নাকি কোনো কারণে বাঞ্চাল হয়ে যায় । আজীবনকাল এইভাবে নর্মদা ও শোন একে অপরের থেকে মুখ ঘুরিয়ে রয়েছে ।
ছোটবেলা থেকে যে মান্ধাতার কথা আমরা শুনে আসছি সেই পৌরাণিক সূর্যবংশীয় রাজা মান্ধাতা আনুমানিক ৬০০০ বছর পূর্বে অমরকন্টকের নিকটবর্তী ঋক পর্বতের গায়ে রাজত্ব করতেন । এও শোনা যায় যে মান্ধাতার পুত্র পুরুকুত্সার রাণী নদী নর্মদার নামকরণ করেছিলেন । তবে ইতিহাসে এর কোনো উল্লেখ নেই । 
 

১৩ মে, ২০১২

"রাজা লিয়র"



 "ভগবান আপনাদের কি বার্ধক্য আসেনা না আপনারা বৃদ্ধলোকেদের কষ্ট দেখতে পান না" ....রাজা লিয়র ( নাম ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় )
গতকাল, মধুসূদন মঞ্চে দেখে এলাম সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় শেকসপিয়ারের নাটক  "রাজা লিয়র" 

অনবদ্য অভিনয় এবং দেবজ্যোতি মিশ্রের vibrant যন্ত্রানুষঙ্গ শেক্সপিয়ারিয়ান নাটকের আবহ তৈরী করেছিল । মেতে উঠেছিল মধুসূদন মঞ্চের নাট্যমঞ্চ । বিশ্বজিত চক্রবর্তী এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ের তারিফ না করে থাকা যায়না । সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় এই নাটক আরো চলুক বাংলা তথা ভারত তথা সারা বিশ্বের নাট্যমঞ্চে । টানটান সংলাপ । পোশাক-পরিচ্ছদে একশো শতাংশ ইউরোপিও ঘরাণা । যুদ্ধের বাতাবরণ সৃষ্টিতেও সমান পারঙ্গম পরিচালক । 
সর্বোপরি বৃদ্ধ পিতা রাজা লিয়রের সংলাপগুলি ভাবিয়ে তুলেছে আমাকেও । সত্যি কি বৃদ্ধ মানুষকে তাঁর সন্তানেরা শুধু চাটুকারিতার দ্বারা বশ করে যাবে চিরকাল পিতার সম্পত্তির লোভে? আর পিতার স্মৃতিভ্রম, বালখিল্য আচরণ , খিটখিটেপনা,মুড স্যুইং কি তাঁর রক্তের সম্পর্কের কাছেও  "ভীমরতি" বলে আখ্যা পাবে  ? এই চিন্তার জটগুলি আমাকেও কুরে কুরে খাচ্ছে প্রতিনিয়ত । 
"দাদাসাহেব" পুরষ্কার প্রাপ্ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দীর্ঘ এবং সুস্থ জীবন কামনা করি ! তিনিও একজন পিতা বলেই  বোধহয় এত সুন্দর ফুটিয়ে তুলযে সক্ষম হলেন রাজা লিয়রের চরিত্রটি; 
" ভুল করোনা পিতাগণ , কেউ তোমাকে চিনবেনা , এমন কি তোমার নিজের সন্তান ও " এরূপ সংলাপ এত বাস্তবিক ! মনটাকে একটা ঝাঁকুনি দিল !  
আর সকল কলাকুশলী এবং সহশিল্পীদেরো অভিনয় চমতকার লেগেছে ।
আরো এগিয়ে চলো কিং লিয়র্! চরৈবেতি! বৃদ্ধ হয়েছ বলেই আমরা তোমাকে এখনো সেলাম জানাই ! তিনি আশি ছুঁই ছুঁই ! তবুও তাঁর দাপুটে অভিনয় অনেক তাবড় জোয়ানকেও হার মানাবে । তাই আবারো বলি বৃদ্ধ বলে কারোকে ঠাট্টা নয় । 

শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর মনে কর !

৬ মে, ২০১২

"Hate Story"


"কাব্যকৃষ্ণা" ওরফে বাংলার পাওলি দামের ইনটেলেকচ্যুয়াল ব্যান্ড উইডথের ব্যাপ্তি টলিউড থেকে বলিউডে ছড়ানোর প্রয়োজন ছিল এবং "হেটস্টোরি" তা প্রমাণ করেছে । 
মূলচরিত্র কাব্যকৃষ্ণার উদীয়মান জার্নালিষ্ট থেকে কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ও সেখান থেকে বিতাড়িত   হয়ে শহরের নামকরা কলগার্ল হয়ে সেই কোম্পানিরই বোর্ড অফ মেম্বারর্সএ উত্তরণ   --  সত্যি সত্যি নিখুঁত স্টোরিলাইনের প্রশংসা কুড়োতে সক্ষম ।
এই গল্পে কেউ কারোকে ভালোবাসেনা  বরং ঘৃণাই করে । কেবল কাব্যর ফোটোগ্রাফার বন্ধু ভিকি ছাড়া ।  একসময় সেও ঘৃণা করতে শুরু করেছিল কাব্যকে তার গতিবিধি দেখে ।কিন্তু ভিকিই শেষ পর্যন্ত কাব্যের সাথে থেকে যায় । তাকে সাহায্য করে ।   
কাব্য কেন ঘৃণার পাত্রী তা বুঝতে দেখতে হবে হেটস্টোরি । "হেট" করা তো দূরের কথা, দেখেই তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে হবে  ।  
একটি বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ের বদলা নিতে নিতে সবশেষে জিতে যাওয়া দেখতে দেখতে বেশ পজিটিভ এটিটিউড প্রমাণ করে । প্রথম দিকে ঐ মেয়ে বেশ কয়েকবার ভুলও করে ঠকে যায় যেমন আমরাও মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকি । 

মানুষ মাত্রেই ভুল করে । শুরুতে সেও ভুল করেছে । আর টানটান চিত্রনাট্যে একা পাওলি রক্ষা করে আসল ছবিঘর ! মাঝেমাঝে দু একটা আলগা সূতো থাকলেও টেনশানের পাল্লাই বেশি ।
  জেন-এক্স এর তুখোড় জার্নালিষ্ট কাব্যকৃষ্ণার  সিমেন্ট কোম্পানির করাপশানের ফর্দাফাঁস দিয়ে গল্পের শুরু । প্রশ্ন জাগে সেই তুখোড় মেয়ে কি করে আবার নিজেই সেই কোম্পানির ফাঁদে পা দিয়ে সেখানে চাকরি নেয় ! সেটাই আপত্তিকর । আবার বলি  টু আর ইজ হিউম্যান ! 
ফেঁসে যায় সেই চৌখশ মেয়ে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বে? এত বোকা হয় এখনকার জার্নালিষ্ট? এমন দু একটা আলগা বল আছে । তারপর সেই অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বিনাশ হয় সেই কুকর্মের ভিলেনের দ্বারা যে পুরোপুরি তাকে সারাজীবনের মাতৃত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে । তা জানতে পেরে কাব্যের আবার বদলা নেওয়া । সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে কাব্যের বাবা মাও তাকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে  । তাই আবার তা "হেট স্টোরি"  ।

 শিল্পপতি  বাবার ওপর ছেলের জড়সড় ভাব ।এহেন অপারগ ছেলের ওপর ভরসা করে কোম্পানির দায়িত্ত্ব দিয়ে কোম্পানিকে ডুবিয়ে দেওয়া দেখে  বাবার কাছে একমাত্র ছেলে ঘৃণার পাত্র । বাবা ঠকেছে ছেলেকে বিশ্বাস করে । তাই আবার "হেটস্টোরি" । বাবা বারবার ছেলেকে বোঝাতে চেষ্টা করে  যে বদলা নেওয়াই কোম্পানির উন্নতি নয় বা ভবিষ্যত লক্ষ্য নয় কিন্তু ছেলে ( সিদ্ধার্থ) কাব্যকৃষ্ণার ওপর প্রতিশোধ নেওয়াই জীবনের মূল উদ্দেশ্য । বিজনেস রসাতলে ততক্ষণে ।    
এদিকে কাব্যও তার সিদ্ধান্তে অটল । আর কেনই বা হবেনা ? উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের যুগে বিদ্যা বালান কহানীতে যদি পারে পাওলিই বা পারবে না কেন? আর? এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক মহলের সাথে শিল্পপতিদের ওঠাবসা -- কত কত  কোটিটাকার কেলেঙ্কারি! ঠিক যেমন হয়! আমাদের প্রতিদিনের "হেটস্টোরি"! খুব বাস্তব  চিত্র ।  
আবার কত কত কোম্পানির এজিএমএ আমন্ত্রিত শেয়ারহোল্ডারদের সামনে ডিভিডেন্ডের বড়সড় অঙ্ক দেখিয়ে, উপহারের প্রলোভন দেখিয়ে কোম্পানির উন্নতি দেখানোর চেষ্টা, আদপে যা ভুয়ো, আসলে যা মিথ্যের রূপোলী মোড়কে আবৃত । খাতায় কলমে সে কোম্পানির কোনো অস্তিত্ত্বই নেই । লাভের অঙ্ক খাতায় কলমে বেড়েই চলে ঠিক যেমনটি হয়ে থাকে । 
 ভিকির সাথে কাব্যকৃষ্ণার বন্ধুত্ব একবার কানে কানে বলে দেয় ট্রু লাভ স্টোরির কথা । 
তবে সবশেষে কাব্যর শরীর বুলেটে ঝাঁঝরা হ'ল কেন? তা জানতে হলে দেখতে হবে " হেটস্টোরি"!
 কাব্য মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই । বঙ্গতনয়া বলিউডে বাঁচিয়া থাকিবেই !

১২ এপ্রি, ২০১২

প্যাপিরাস : পয়লা বৈশাখ ১৪১৯

সোনারতরীর  পক্ষ থেকে প্রকাশিত হল প্যাপিরাস ওয়েব ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা  


১ এপ্রি, ২০১২

রামনবমী



অযোধ্যার রাজা দশরথ পুত্রশোকে অস্থির হয়ে পড়লেন । তাঁর চাররাণী । অথচ একটিও পুত্রসন্তান নেই ।  বংশরক্ষার চিন্তায় কালাতিবাহিত করছেন রাজা  । (এখনকার দিন হলে দশরথের মুন্ডপাত করতেন সকলে!)   
তাঁর রাজসভায় মহর্ষি বশিষ্ঠের আগমন হল  ।   ( এখনকার দিনে যেমন জ্যোতিষীরা যজ্ঞের বিধান দিতে সংসারে অবতীর্ণ হ'ন । ) 
তিনি রাজাকে বললেন 
" হে রাজন্‌! মিথ্যা শোক কর পরিহার ! ধর্মের হ‌ইবে জয় ভুল নাহি তার  ! অঙ্গদেশ থেকে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে নিয়ে আসুন । পুত্র্যেষ্টি যজ্ঞ করুণ । আপনার রাণীদের সন্তান লাভ হবে " (এখনকার দিনে মহা জ্যোতিষীও এমনি করে আউট সোর্স করেন । বয়সের ভারে তিনি কুব্জ । জ্ঞানের ভারে ন্যুব্জ । আর তরুণ ঋষিদেরও তো জায়গা করে দিয়ে যেতে হবে ।   কমিশন নেবেন অবিশ্যি )  
যথাবিধানে মহাসমারোহে পুত্র্যেষ্টি  যজ্ঞ হল । যজ্ঞের অনতিপরেই বড়রাণী কৌশল্যার গর্ভ সঞ্চার হল । ( আইভিএফ হোল বুঝি! অথবা সারোগেট পন্থা ।  যাই হোক ছেলে চাই ! )  

দশমাস দশ দিন পর চৈত্র মাসের শুক্লানবমী তিথিতে কৌশল্যার কোল আলো করে ভূমিষ্ঠ হলেন রামচন্দ্র । (বলুন তো, আজ রাম না জন্মালে  না হত রামায়ণ । না হত রামরাবণের যুদ্ধ ।  ভগবানদের আসরে হনুমান হয়ত পশুস্তর থেকে উন্নীত হয়ে সেলিব্রিটি স্টেটাস পেতেন না ! সো অল ক্রেডিট গোজ টু মহর্ষি বশিষ্ঠ  । প্যাকেজড  বংশোদ্ধারের প্ল্যানটা কেমন ফেঁদেছিলেন ! )   

রামচন্দ্রের জন্মের এই পুণ্যতিথি আজ রামনবমী নামে খ্যাত ।( গাইয়েরা শুরু করলেন " ঠুমক চলত রামচন্দ্র বাজত পায়জনিয়া...)

২৯ মার্চ, ২০১২

অশোকষষ্ঠী কথা


 বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল । 
একদিন সেই ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে অশোকগাছের নীচে এক সদ্য প্রসূতা কন্যাকে কাঁদতে দেখলেন । দৈবযোগে ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারলেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের । ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন করতে লাগলেন । তার নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল । যৌবনে উত্তীর্ণ হল  । 
এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ঐ পরমাসুন্দরী অশোকাকে একদিন দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন । ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষির আগমন হল সেই স্থানে । রাজপুত্র অশোকার পাণিপ্রার্থী হয়ে ঋষিকে অনুরোধ জানালে ঋষি যারপরনাই আনন্দিত হয়ে তাতে সম্মতি দিলেন । 
অশোকাকে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিয়ে ঋষি বললেন  :
" আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হ'লে কন্যা । যদি কখনো বিপদে পড় আশ্রমে চলে এস । আর রাজপুরী থেকে চিনে একাএকা এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তাই এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম । এখন যাবার সময় এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও । পরে কখনো প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে উত্পন্ন অশোকগাছ বরাবর   চিনে পায়েহেঁটে তুমি চলে আসতে পারবে "
অশোকফুলের বীজ  সযত্নে আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সাথে পতিগৃহে যাত্রা করল । যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা । রাজপুরীতে পৌঁছালে রাজা-রাণী সস্নেহে তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন । অশোকা আর রাজপুত্রের বাড়বাড়ন্ত সংসারে সুখের বন্যা । অশোকা ক্রমে সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল । অশোকার শ্বশুর রাজামশাই মারা গেলেন শ্রাদ্ধের দিন অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা । ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা । রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে । পরদিন ভোরে উঠে দেখল সাতছেলে-বৌ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে আশোকা তা দেখে ঋষির কথা ভাবলে । রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল । 
ততদিনে বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার শাখাপ্রশাখা । ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই  অশোকা ঋষিকে দেখে কেঁদে উঠলো । ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সাথে করে রাজবাড়ী ফিরে গেলেন । কমন্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে  দিলেন  অশোকার মৃত ছেলে বৌ নাতিপুতির গায়ে  । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল । 
ঋষি বললেন অশোকষষ্টীর ব্রত পালন করলে  কখনো শোক প্রবেশ করবেনা সংসারে ।

১৭ মার্চ, ২০১২

আজে-বাজে-ট





এবার বাজেটে বাড়ল দাম সোনার, মেয়ের বিয়ে দিও না কো আর
প্ল্যাটিনামের দামও বাড়ল শুনি ? সে তো ব্রাত্য, আর যেন না কিনি ।
নিকোটিন, বিড়ি বিদেয় এবার, কমবে দূষণ ঘুচবে তবে ক্যানসার
সোয়াবিন জাতে উঠচে মনে হয়, সারের দাম না বাড়ালেই নয়?
মোটরবাইক টেলিভিশন সেট, ফ্রিজ, এসি ফোন সবই ছুঁতে ভয় ।
না, না, না আজ রাতে আর রেস্তোরাঁতে যাবনা, গাড়ী চেপে লঙ ড্রাইভেও নয়
টোল টেঁকশো চাইবে এবার জাদা, থাই-চাইনিজ মাথায় তোলো দাদা ।
সোলার বাল্ব যে সস্তা হল দাদু । ভরদুপুরে ছানিচোখে কাগজ পড়ার জাদু।
এল‌ইডি বাল্ব লাগাও শুধু কমবে বাতির বিল । ফিল্ম-ক্যামেরা পুষে রাখো, ডিজিক্যাম বাতিল ।
ক্যানসারের ওষুধ কম মাগ্যি এ বড় ভালোকথা, এডসের ওষুধ দাম কমলে বাড়বে বিরহব্যাথা ।
নুনের দাম কমবে বৈকি, সবাই কম খাচ্চে । প্রেসার বাড়ে, ফিগার ঝরে এখন লোকে বুঝচে ।
কয়লা কমলে ধোপা খুশি, ইস্ত্রীতে নিস্‌না বেশি । বিজলিবাতির খরচা বাড়ুক, গ্রামের ছেলে পড়ুক ।
কমল লোহার দাম, রিয়েল এস্টেট রমরমা, প্রোমোটারের নাম ।

২৫ ফেব, ২০১২

খড়দহ নামের উত্স



গত বছর ভাদ্রমাসে  আমরা উত্তর কলকাতার খড়দহতে শ্যামসুন্দরের মন্দির এবং সংলগ্ন গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম ।  মন্দিরে ভোগের ব্যাবস্থা ছিল । অসাধারণ সব নিরামিষ খাবার । প্রায় ১৪রকমের আইটেম যা ঠাকুরকে নিবেদন করা হয়  । এবং দুর্দান্ত সুস্বাদু সব ভোগ । মন্দির দেখে আমরা কিছুদূরে আগরপাড়ায় আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে গেলাম ও সেখানে থেকে গঙ্গার এত সুন্দর রূপ দেখলাম যে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না । অতি নির্জন ও মনোরম ঐ স্থান । খড়দহ গিয়ে জানতে পারলাম ঐ অঞ্চলের নামের ইতিকথা । নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বিবাহের পর ঐ স্থানে আসেন ও সন্ন্যাস ত্যাগ করে গার্হস্থ জীবনযাপনের জন্য সেখানকার তদানীন্তন জমিদারের কাছ থেকে একটুকরো জমি চেয়েছিলেন । জমিদার দর্পের সঙ্গে গঙাবক্ষে একটুকরো খড় ছুঁড়ে ফেলে এবং তা দেখিয়ে নিত্যানন্দকে বলেছিলেন ঐ টুকু খড়ের ওপরে যদি বাসা বেঁধে থাকতে পারো তবে থাক । নিত্যানন্দ বলেছিলেন ‘ঠিক আছে, আমি ওইটুকু স্থানেই ঘর বাঁধব’
মহাপুরুষের কথা । যেমন বলা ওমনি কাজ । পরদিন সকালে উঠে গাঁয়ের মানুষ দেখল যে গঙ্গার ওপরে একটুকরো চর ভেসে উঠেছে  এবং ঐ স্থানেই কুটির বেঁধে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বসবাস করতে শুরু করেন ।  এবং খড় ফেলার ঐ জায়গাটিতেই নদীর চর জেগে ওঠার  জনশ্রুতি নিয়েই ঐ স্থানের নাম খড়দহ হয়েছে ।

২৪ ফেব, ২০১২

ফাগুণ লেগেছে মনে মনে


 লিঙ্গরাজ টেম্পলে...

বেশ কয়েকবছর আগের কথা। আমার উনির ভুবনেশ্বর আইআইটিতে  পরীক্ষা নেবার ভার পড়ল শিবরাত্রির ঠিক আগেই। উড়িষ্যার নাম শুনলেই আমার পূর্বপ্রেমগুলো  উঁকি দিয়ে ওঠে। বুকের মধ্যিখান টা টনটনিয়ে ওঠে। এক জগাদা দুই সমুদ্র । এদের দুজন কে কিছুতেই ভুলতে পারিনা আমি। অতএব চলো লেটস গো। জগা দার পাড়ায় একটিবার হাই হ্যালো করব, সমুদ্রের জলে পা ভেজাব কিন্তু।  আর সেই ফাঁকে ভুবনেশ্বর ও ঘুরে নেব। শুনেছি খুব সুন্দর শহর। আর শোনো ভুবনেশ্বর থেকে পুরী যাবার পথেই পিপলি পড়বে। হ্যান্ডিক্রাফটস কিনব কিন্তু। আর যদি সময় থাকে তবে পুরী থেকে চিলকা যাব। ব্যাস! যে কথা সেই কাজ। ঝটিতি প্ল্যান। একগুচ্ছ গল্পের ব‌ই, আমার সঙ্গের সাথী ল্যাপটপ আর আমরা দুজনে ট্রেনে চেপে বসলাম। প্রথমে কাজ সারতে হবে মানে ভুবনেশ্বরের হোটেলে দুরাত বাস করতে হবে। উনি পরীক্ষা নেবেন আর আমি ঘরে বসে ব‌ইপত্র ঘাঁটব আর মনের সুখে ব্লগ লিখব। অফুরন্ত অবকাশ। কেউ কড়া নাড়বেনা। কেউ বিরক্ত করবেনা। চার বেলার খাবার চিন্তা নেই।  
ভুবনেশ্বরের হোটেলে ডেরা বেঁধে একদিন কাটল এভাবে। পরদিন ওনার সেকেন্ড হাফে ইনভিজিলেশান। অতএব ভোরবেলা উঠে, অটো ভাড়া করে কাছেই লিঙ্গরাজ মন্দির। শুনেছি অন্যতম বৃহত স্তম্ভাকৃতির শিবলিঙ্গ সেখানে। শিবরাত্রির ঠিক আগেই বেশ পুণ্যি হবে দর্শণ করে...মনে মনে সেই আশা পোষণ করেই পা বাড়ালাম। অদ্ভূত সুন্দর এক সকাল। হালকা ঠান্ডার রেশ সে ফাগুণেও। প্রাচীন মন্দির। অদ্ভূত কারুকার্য পঞ্চরত্ন মন্দিরের। অপূর্ব মন্দিরময়তা পুরো চত্বর জুড়ে। ছোট, বড়, মেজো, সেজো, রাঙা, ফুল, কুট্টো, আন্না...কত মন্দির! আমাদের সময় সীমিত। অতএব লিঙ্গরাজার জন্য মাটির ঘটে দুধ-জল সহ আকন্দ ফুল, বেলপাতা কিনে মন্দিরের দিকে চলি । 
ঊড়িষ্যার কোনো মন্দিরে দর্শনার্থীরা লিঙ্গের মাথায় জল, ফুল বা দুধ চড়াতে পারেনা । একদল পান্ডাদের স্বেচ্ছাচারিতা,  অহমিকা আর ট্যুরিষ্ট বিদ্বেষ জায়গাটির স্থান মাহাত্ম্যকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে । যারাই আসছেন দূর দূর থেকে সকলের মুখেই সেই এককথা । স্বয়ংভূ মহাদেব লিঙ্গরাজ যেন ঐ প্রদেশের পূজারী এবং মন্দিরের সেবায়েতদেরই সম্পত্তি । উত্তর বা পূর্ব ভারতের আর কোথাও এমনটি খুঁজে পাইনি ।
ঊড়িষ্যা যাবেন শুনেই আমার কেমন ছোঁক ছোঁক অবস্থা । আকুলিবিকুলি প্রাণ ; সমুদ্রের ঢেউ যেন ডাকতে লাগল আমাকে । ভাবলাম উনি হয়ত বলবেন "পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য ন‌ইলে খরচ বাড়ে"  কিন্তু পরদিনই দুটো টিকিট দেখালেন উনি । চোখ চিকচিক করে উঠল । তাহলে  এই ফাগুণেই দেখা হবে তার সাথে । ১৭ই ফেব্রুয়ারি খড়গপুর থেকে ট্রেনে চড়ে সোজা ভুবনেশ্বর । বিকেলে বিকেল হোটেলে যাওয়া । তারপরই প্ল্যান ছকে নেওয়া হল ।  ওনার পরীক্ষা নেওয়া ১৮তারিখে হোটেলের পিছনেই আইআইটি ভুবনেশ্বর সেন্টারে ।  হেঁটে ১৭তারিখেই আশপাশ দেখে নেওয়া হল । কোথায় অটোরিক্সা পাওয়া যায় , কোথায় ভাড়ার গাড়ি পাওয়া যায় ইত্যাদি । পরদিন ভোরে উনি পরীক্ষা নেবেন ১০টায় চলে যাবেন সেন্টারে । তার জন্য আমি প্রচুর ম্যাগাজিন , গল্পের ব‌ই আর আমার সর্বক্ষণের সাথী ল্যাপটপটিকে নিয়ে গেছি । হোটেলের ঘরে টিভিও আছে একখানি । সেখানে বাংলা চ্যানেল ও আসে খান কয়েক । কিন্তু ইন্টারনেট কানেকশান খুব হতাশ করল ।তবু একটু ব‌ইপড়া আর টিভি দেখা হল ।  ১৮তারিখে ভোরে উঠে স্নান সেরে আমরা দুজনে অটোরিক্সা করে ভোর সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ টেম্পলের উদ্দেশ্যে । 

মন্দিরময় ভুবনেশ্বরে এটি একটি অন্যতম বৃহত মন্দির ।  কলিঙ্গ স্থাপত্যে একে পঞ্চরথের আদল বলা হয় ।  ১১ th century তে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন  সোমবংশীয় রাজা জজাতি কেশরী ।  ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে বড় মন্দির এটি ।

ঊড়িষ্যার কোনো মন্দিরে দর্শনার্থীরা লিঙ্গের মাথায় জল, ফুল বা দুধ চড়াতে পারেনা ।একদল পান্ডাদের স্বেচ্ছাচারিতা,  অহমিকা আর ট্যুরিষ্ট বিদ্বেষ জায়গাটির স্থান মাহাত্ম্যকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে । যারাই আসছেন দূর দূর থেকে সকলের মুখেই সেই এককথা ।   লিঙ্গরাজ যেন ঐ প্রদেশের পূজারী এবং সেবায়েতদেরই সম্পত্তি । উত্তর বা পূর্ব ভারতের আর কোথাও এমনটি খুঁজে পাইনি ।      ভূবনেশ্বরী, কালী, সাবিত্রী, যমরাজ ইত্যাদি কয়েকটি মন্দিরে প্রবেশ করলাম ।   মন্দিরের ভেতরে  সেলফোন ও ক্যামেরা নিষিদ্ধ । এযুগেও এত রক্ষণশীলতা । যারপরনেই অবাক হলাম ।
 মন্দিরের প্রবেশদ্বার 
আসার পথে রামেশ্বর মন্দির দেখলাম আর দূর থেকে দেখলাম বিন্দুসাগর ।   হোটেলে ফিরে এলাম সাড়ে আটটার মধ্যে । এসে নিরামিষ ব্রেকফাস্ট । দুধ কর্ণফ্লেক্স, ফল, এবং পুরী সবজী । এবার উনি চলে গেলেন পরীক্ষা নিতে আর আমার অখন্ড অবসরের সঙ্গী তখন ব‌ইমেলায় কেনা একরাশ ব‌ই । গৌতম ঘোষদস্তিদারের "পুরুষ ও প্রকৃতি" ব‌ইখানি পড়লাম । দারুন আনন্দ পেলাম ।  জয়দেব-পদ্মাবতী, চন্ডীদাস ও রজকিনী রামিনী এবং বিদ্যাপতির কাব্য রচনায় নারীর প্রভাব আর সেই নিয়ে এক নিখুঁত প্রেমের গল্প । এযুগের কবি ও লেখক গৌতম ঘোষ দস্তিদারের অপূর্ব লেখনীতে তা বড়ৈ সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে । বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস আমার একটি অতি প্রিয় বিষয় ছিল উচ্চমাধ্যমিকে । আবার বেশ ঝালিয়ে নিলাম সেই অবসরে । দুপুরে কোলকাতা দূরদর্শনে "কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী"  সিনেমাটি দেখলাম ।  টিভিতে সিনেমা বড় একটা দেখিনা । সেই অবসরে বেশ আনন্দ দিল । সন্ধেবেলায় উনি ফিরলেন সাড়েসাতটায় । ডিনার খেলাম । অনবদ্য এক কাবাব প্ল্যাটার নিলাম । চিকেন্, মাটন কাবাব এর সাথে স্যালাড, তন্দুরী চিকেন, একবাটি ডাল মাখানি ও নান । সব দু পিস করে খেতে খেতে পেট ভরে যায় । বেশ ভ্যালু ফর মানি ডিশ । শেষে একটু আইসক্রিম ।  আবার একটু হেঁটে আসা ফাগুণের হাওয়া গায়ে মেখে । পরদিন ১৯তারিখে একটু দেরী করে ঘুম ভাঙল । যথারীতি ব্রেকাফাস্ট খেয়ে ন'টার মধ্যে উনি চলে গেলেন শেষদিনের পরীক্ষা কন্ডাক্ট করতে  । আর আমার অবসর শুরু হল গীতগোবিন্দমের বাংলা অনুবাদের চেষ্টা নিয়ে । সেদিন দুটো বাংলা ম্যাগাজিন ছিল সঙ্গী ।  দুটোর মধ্যে হোটেল থেকে চেক আউট করে আমি নীচে হোটেলের লাউঞ্জে এসে বসলাম । উনি আসবেন দুটোনাগাদ । একখানা ভাডার গাড়ী করে এবার গন্তব্য ভুবনেশ্বর থেকে পুরী ।  
পথে পড়ল পিপলি ।
পিপলি ট্যুরিস্ট মার্কেট
ওড়িশার একটি গ্রাম আজ থেকে বহুবছর ধরে তাদের এপ্লিক শিল্পের সুচারু কারিগরীকে বাঁচিয়ে রেখেছে । হাইওয়ের দুধারে পিপলি আজ একটি ট্যুরিস্ট মার্কেট । ওড়িশার যাবতীয় দৃষ্টিনন্দন হ্যান্ডিক্রাফট পাওয়া যায় এখানে । তারপর পুরী পৌঁছলাম বিকেলে । সমুদ্রের ধারেই একটা হোটেলে ঢুকে চেক ইন করলাম । ঘর থেকে সমুদ্র দেখা যায় । ব্যস‌ ! আর কিছুই প্রত্যাশিত ছিলনা সেই মূহুর্তে ।  ব্যাগপত্র রেখে রিক্সো করে সোজা জগন্নাথ মন্দির । পান্ডার সাহায্যে একদম তিন জ্বলজ্যান্ত বিগ্রহের সম্মুখে আমি । শিহরিত, তৃপ্ত এক মাদকতায় আপ্লুত আমরা । পুজো দিলাম । প্রসাদ পেলাম । জগন্নাথের ভোগ খেলাম । আগুণ গরম ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, সুক্তো, অড়হর ডাল এবং পায়েস । সেই সন্ধ্যে বেলায় একসাথে লাঞ্চ এবং ডিনার হয়ে গেল জগন্নাথের কৃপায় । হোটেলে ফেরার পথে শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত পুরীধামের আশ্রমে গেলাম ।  তারপর হোটেলে ফিরে বিশ্রাম সেরাতের মত । পরদিন স্মার্টফোনের সাহায্যে জানা গেল পুরীর সি বিচে  সমুদ্রদয়ের সময় । সেই মত বিছানা ছেড়ে পায়ে পায়ে বালির চরে ।
 সেই চেনা বঙ্গোপসাগরের পুরীর সমুদ্রতট 
সূর্যদেব গুগলের নির্ঘন্ট মেনে যথারীতি উঠে পড়লেন ঘুম থেকে ।  পুবের আলো, লালচে আকাশ, সমুদ্রের রাশি রাশি ঢেউ, নোনাজলের ফেনা সবকিছু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিল সেই ভোরে । সেদিন ছিল শিবরাত্রি । পুরীতে কোনো শিবলিঙ্গ খুঁজে পেলামনা যে গিয়ে একটু জল ঢেলে পুজো করব । অগত্যা বালির চরে নিজেই বালি দিয়ে এক ঢিপি বানিয়ে মন্ত্র বলে জাল ঢাললাম তার মাথায় আঁচলা ভরে । তারপর জলযোগ করলাম কচুরী তরকারী দিয়ে । এবার হোটেলে ফিরে এসে স্নান সেরে একটা গাড়িভাড়া করে চিল্কার পথে । 
চিল্কায় পৌঁছে স্পীডবোটে ভাসমান.... ডলফিন, রেড ক্র্যাব ও পরিযায়ী পাখির  উদ্দেশ্যে 

১৫ ফেব, ২০১২

ওদেরো পরাণো যাহা চায়..




শীত এখন যাই যাই । বসন্তে এখন খুশির ভালোবাসাবাসির হাওয়া । সরস্বতী পুজোতেই সেই হাওয়া ব‌ইতে শুরু করে দিয়েছে । আশি নব্বুইয়ের দশকের হাওয়া ছিল একরকম । আর এখনকার হাওয়ায় অন্য মাদকতা । অর্কুট চৌকাঠ ডিঙিয়ে, ফেসবুকের উঠোন পেরিয়ে, ট্যুইটারের খুপরিতে সেই হাওয়া একটু অন্য স্বাদের । ছেলেমেয়েগুলোর ভাল্লাগেনা একটুতেই । বসন্তের হাওয়া মাখতেও ভাল্লাগেনা ওদের । সব সময়েই যেন ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে ।গায়ে হাওয়া মাখবে কি ! এক তো সরস্বতীর পেন্নামের নেমকম্ম সমাধা করেই লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে সঁপেছে মন । লক্ষ্য শুধুই কেরিয়ার । আর ডাইভারশান বলতে স্টেট্যাস আপডেট । খুব ডিজিটালি একটিভ হলে ব্লগে উগরে দাও মনের ব্যথা । ওদের ব‌ইপড়ার সময় নেই । ওরা ব‌ইমেলা যায় বিরিয়ানি খেতে আর শীতের মিঠে রোদে পিঠে পিঠ দিয়ে বসতে । ওদের বেগুণভাজায় আপত্তি । কি না ডিপ ফ্রায়েড । কিন্তু ফ্রেঞ্চফ্রাইতে ফ্যাশন ইন । ওদের পিত্জায় নাড়িকাটা কিন্তু লুচি? নৈব নৈব চ । ওরা ভালবাসে ভ্যালেন্টাইনসডের স্বীকার হয়ে কিউপিডের পায়ে অর্ঘ্য নিবেদন করতে । তার জন্য যা করতে হয় তাতে রাজী । কি আর করে ! আগে প্রেম একবার কি বড়জোর দুবার আসত নীরবে । এখন আসে বারবার এবং সরবে । আর শপিংমলের মার্কেটিং কি বিফলে যাবে? বিশাল বিশাল রক্তাক্ত হৃদয়নন্দন বনে নিভৃত এ নিকেতনে একাখানি ন্যানো হৃদয় যদি নাই বা দিতে পারে তাহলে কি আর র‌ইল ! সে হীরে হোক বা সেমিপ্রেসাস । নিদেন এক গেলাস সুশীতল গোলাপী পানীয়ের মাঝে ভাসমান একটুকরো বাসি ষ্ট্রবেরী । কিম্বা একপাউন্ড হার্টশেপের চকোলেট কেকের মাঝখানে প্রকান্ড এক চেরী ! তাও স‌ই । সেই কবেই বাংলাব্যান্ডের গানে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শিখে রেখেছে " ভালোবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি " ! ক্ষতি কি ! ভালোই বলেছিল তারা । কিন্তু ওরা তো গাছেরো খেল তলারো কুড়লো ।

মধ্যিখান থেকে একবার গাছের পাতা ঝরল মানেই দেশের জিডিপি হৈ হৈ করে বাড়ল কিছুটা । ইন্ডিয়া শাইনিং মশাই । রোজ ডে তে গোলাপ বিকল আগুণ দামে । প্রোপোজ ডে তো গ্রীটিং কার্ডস। কিসিং ডে তে চকোলেট । হাগ ডে তে ডিওডোরেন্ট । আরো কত কি ! যত্তসব ! দিন থাকলেই প্রেম, না থাকলে ঘোড়ার ডেম ! আর সন্ত ভ্যালেন্টাইন ওপর থেকে বলেন " কেমন দিন দিয়েছি বল্‌ "
মক্‌টেল থেকে চকোলেট, কফি থেকে কেক, সোনা থেকে জাঙ্ক সর্বত্র এক কথা " হিয়ার মাঝে লুকোনো একটাই কথা " ভালোবাসি, ভালোবাসি, এই শপিং মলে, মেট্রোরেলে, সুইমিংপুলে, তন্ত্রেমন্ত্রে ভালোবাসি ! সেই কবে কবি বলেছিলেন ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত ! তারা পলাশ চিনুক না চিনুক আজ কিন্তু ভালোবাসার দিন আগতপ্রায় । ভালোবাসায় মধু উবে যাওয়ার আগেই না ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করতে হবে মন্দারমণির বালুকাবেলায় লিখিনু সে লিপিখানি প্রিয়তমারে ।

পাড়ার গোপালবাবু বলছিলেন অশোকবাবুকে "মশাই নাতনিটা বিয়ে করতেই চায়না, বলালম, ঢের হয়েছে পড়াশুনো , অনেক রোজগার পাতি হল, অনেক ভালোবাসাবাসি তো হল, এবার আগে বিয়েটা সেরে ফেল" তা বলে কি জানেন ? " নিজের আখের আগে গুছোতে দাও, বাজারে নিজেকে আগে দাঁড় করাই তারপর বিয়ে । তার আগে বাজিয়ে, নাচিয়ে, কুঁদিয়ে বেড়িয়েচেড়িয়ে, খসিয়ে নাকি পরখ করে নিতে হবে মনের মানুষটিকে"
অশোকবাবু প্রত্ত্যুত্তরে বললেন "কি আর করবে গোপাল, ওকে ওর মত থাকতে দাও; যুগটাই এমন, এ কি ডি এল রায়ের যুগ যে এমনি এসে ভেসে যাবে? আলোর মতন, হাসির মতন, হাওয়ার মতন? এ তো নেশার যুগ এয়েচে । তোমার নাতনি ডিজিটাল ঢেউ আলবাত পেরুবে । গ্লোবালাইজেশানের ঢেউ এয়েচে না দেশে" !


১২ ফেব, ২০১২

ভীমবেটকা


কেমন স্থান এই ভীমবেটকা? কোথায় এই গুহা এবং তার গুহাচিত্র?  ভীমবেটকা  যেতে হলে কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কখন যাবেন সেই নিয়ে বিশদ আলোচনা  পড়ুন আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভে 
( " একটি প্রাগৈতিহাসিক চিঠি", প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা শনিবার,৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১২) 

২৯ জানু, ২০১২

শীতলষষ্ঠী


সরস্বতীপুজোর পরদিন গোটাষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী। পশ্চিমবঙ্গের রীতি । অনেক পূর্ববঙ্গের মানুষও শখে করেন । আমাদের অরন্ধন আজ । শ্রীপঞ্চমী তিথি থাকতে থাকেতেই গোটা রেঁধে রাখতে হয় । গোটা মুগডাল (সবুজ মুগকলাই ), গোটা শিম, গোটা মটরশুঁটি, গোটা রাঙা আলু, গোটা আলু, গোটা বেগুণ জোড়া সংখ্যায় দিয়ে  (কমপক্ষে ৬টি করে ) গোটা সেদ্ধ হয় নুন দিয়ে । সাথে গোটা শুকনো লঙ্কা আর নুন ।  গোটা মুগ ডালকে শুকনো খোলায় একটু নেড়ে নিতে হবে যতক্ষণ না হালকা গন্ধ বেরোয় । কিন্তু প্রেসারে রাঁধা চলবে না । আর কিছু পরে ঢাকা খুলে দেখতে হবে কিন্তু ডাল বা সবজীকে হাতা দিয়ে ফাটানো চলবেনা ।   সেদ্ধ হয়ে গেলে কাঁচা সরষের তেল দিয়ে নামিয়ে রাখা হয় ।    সাথে পান্তাভাত আর সজনেফুল ছড়ানো কুলের অম্বল ও টক দৈ । সরস্বতীপুজোর পরদিন আমাদের দুপুরের আহারে আর কিছু খাওয়া চলবেনা ।  সবকিছু বাসি রান্না আজ খাওয়ার রীতি । এ হ'ল আমার শ্বশুরবাড়ির রীতি ।
আমার বাবার বাড়িতে খন্ড গোটা । গোটা বিউলির ডাল পালংশাকের গোড়া, মূলো কেটে কেটে আর সাথে আর সব গোটা আনাজ ( শিম, মটরশুঁটি, আলু) দিয়ে   রাঁধা হয় । আমাদের বাড়িতে হয় টাটকা গোটা ।  গোটাসেদ্ধ নামানোর পর কাঁচা সরষের তেল ও আদামৌরী বাটা দেওয়া হয় । কারোর রীতি পঞ্চশস্যের গোটা বানানো ।
 আমাদের আজ শিলনোড়া হলুদ ছোপানো কাপড় পরিয়ে ঠান্ডা হলুদ জলে রাখা থাকে । শিলের কোলে থাকে তার নোড়াটি আর মাথায় জোড়া শিম ও জোড়া কড়াইশুঁটি ।   আজ বহুবছর ধরে বাংলার এই রীতি মেনে আসছেন মায়েরা তাদের সন্তানের মঙ্গলার্থে ।  

২৮ জানু, ২০১২

ফর্মূলানন্দ

ছোটদের ম্যাগাজিন "ইচ্ছামতী" শীতসংখ্যা ২০১২ তে প্রকাশিত 

ফর্মূলা ওয়ান ফ্লায়ার
২০১১ ভারতের খেলাধূলার জগতে এক নতুন অধ্যায় রচনা করল । তথাকথিত স্পোর্টসের পাশাপাশি এবছর উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির রেস ।  মনে হয় ভারতের মাটিতে যে স্পোর্টসের সূচনা হল এবার আগামী বছরগুলিতে এর উন্মাদনা অব্যাহত থাকতে বাধ্য । এখন নাকি ফুটবলের মাঠে ভীড় হয়না মোটে, ক্রিকেটের প্রচুর অবিক্রীত টিকিট পড়ে থাকে । কিন্তু ঐ তিনদিন অর্থাত ২৮শে অক্টোবর থেকে ৩০শে অক্টোবর  নয়ডায় জেকে গ্রীণ স্পোর্টস সিটিতে একলাখেরো বেশি উপচে পড়া মানুষের ভীড় দেখে সে কথা মনে হল না। 


"বুক মাই শো" তে অনলাইন টিকিট কাটার পর টানটান উত্তেজনায় ছিলাম ক'টা মাস । অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান হল । সারাদেশ জুড়ে একদিকে জ্বলছে দীপাণ্বিতার আলোকমালা আর নয়ডার 'জেপি গ্রীণ স্পোর্টস সিটি' তে তখন সাজোসাজো রব, ইনঅগুরাল ফর্মুলা ওয়ান গ্রাঁ প্রি' র।  বাতাসে হিমের ছোঁয়া নিয়ে ঊণতিরিশ এবং তিরিশে অক্টোবর হাজির হয়েছিলাম আমরা সেই বুদ্ধ ইন্টারন্যাশানাল সার্কিটে । কিছুদূর গাড়ি করে যাবার পর শাটলবাস আমাদের নিয়ে গেল স্টেডিয়ামে । নিজেদের টিকিট অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গায় বসে পড়লাম । প্রথমে ছিল বেশ কিছু প্র্যাকটিস সেশন এবং ফর্মুলা ওয়ান গাড়ি ছাড়া অন্যান্য গাড়ির প্রথাগত রেস। ৩০ তারিখে ফাইনাল রেসের ঠিক আগে হেলিকপ্টার আকাশ থেকে বারবার এসে ট্র্যাক পরিদর্শন এবং ছবি তুলতে লাগল । তারপর শুরু হল একে একে ড্রাইভারস প্যারেড । একটি করে ভিন্টেজ কারে এক একজন ড্রাইভার একে একে হাত নেড়ে রাজকীয় কায়দায়  ট্র্যাক পরিক্রমা করে চলে গেলেন । তারপর সেফটি কার এসে বারে বারে ট্র্যাকের নিরাপত্তা পরিদর্শন করে গেল । তারপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ।

বুধ ইন্টারন্যাশনাল সার্কিট


অবশেষে 'দিন আগত ঐ, ভারত তবু কই?'  হ্যাঁ, ছিলেন আমাদের শিবরাত্তিরের সলতে নারায়ণ কার্তিকেয়ণ  আর ফোর্স ইন্ডিয়া টিমে ছিলেন চালক সুটিল ।


খেলার মাঠে কারো লক্ষ্য বলের গতিতে কারো কবজির জোর টেনিস র‍্যাকেট এ, কারো আনন্দ পায়ে বল মারাতে  । কেউ চলে জলের স্রোতে সাঁতারাতে , কেউ ঘোড়ায় চড়ে পোলো খেলায়, কেউ দাবার চালে, কেউ ধনুর্বিদ্যায়।   কারো আবার আনন্দ এবং লক্ষ্য দুইই গতিতে এবং গতির আনন্দে ।    এবার আলোচনা করা যাক  ফর্মুলা ওয়ান কি এবং কেন এই সম্বন্ধে ।

 ফ্রান্সের সংস্থা "ফেডারেশান ইন্টারন্যাশানাল ডি লা অটোমোবাইল" (FIA)  এই বিশেষ রেসের জন্য  গাড়িগুলির জন্য যে আকার, আকৃতি এবং গঠনের  ফর্মুলা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই অনুসারে "ফর্মুলা ওয়ান" গাড়ি তৈরী হয় । এই ফর্মুলাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ
-গাড়ির মাঝখানে ইঞ্জিন থাকতে হবে,
-উন্মুক্ত ককপিট থাকবে,
-একটিমাত্র সিট থাকবে,
-উইং থাকবে সামনে ও পেছনে ,
-গাড়ির চালক সহ গাড়ির ওজন হতে হবে মাত্র ৬৫০কেজি
-গাড়িটি যেন ঘন্টায় শূন্য থেকে ১৬০কিমি যেতে পারে ও  ৫ সেকেন্ডের কম সময় যেন  ঐ স্পীড কমে  আবার যেন নেমে আসতে পারে

ফর্মূলা ওয়ান গাড়ি

এই স্পেসিফিক ফর্মুলায় তৈরী গাড়িকেই বলে ফর্মুলা ওয়ান গাড়ি । GP Motor Sports অর্থাত  Glitz & Glory, Power &  Precision, Man & Machine, Speed & Style এই চারটির সমন্বয়ে তৈরী হয় ফর্মুলা ওয়ান । এখানে গাড়ী এবং তার চালক হল প্রধান । গাড়ী শুধু জোরেই যায় না কিন্তু অসাধারণ কায়দা এবং কৌশলের বৈচিত্র্যে ভরা এই স্পোর্টস ।  বারটি টিমের চব্বিশটি ড্রাইভার সহ চব্বিশটি গাড়ি যেন প্রত্যেকটি এক একটি আইকনিক অবতার। গতিশীলতা যাদের শিরায় শিরায়, হৃত্স্পন্দনে সুস্থিরতা । গাড়ীর ইঞ্জিনের গর্জন যত বেশি গাড়ির চালকদের হৃত্স্পন্দন বা পাল্স রেট ততই ক্ষীণ ।  গাড়ির গতির ওঠানামায় ড্রাইভারদের উত্তেজনার পারদকে কঠিন নিয়ন্ত্রণে রেখে  অসাধারণ নৈপুণ্যে বিদ্যুত্গতির গাড়িগুলিকে অত্যন্ত জটিল পথ এবং পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে প্রতিঘন্টায়  সর্বোচ্চ  ৩০০ কিমি বেগে সবশুদ্ধ ৩০০কিমি পথ অতিক্রম করতে হয় । গাড়ি যে থামে না এমন নয় । এক অবিশ্বাস্য আট সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িকে থামিয়ে চারটি চাকা বদল করে এবং ট্যাঙ্কে জ্বালানী ভরে নিয়ে ধনুক থেকে তীরের মত ছিটকে বেরিয়ে পড়ে সেই গাড়ি আবার ট্র্যাকে গতিপ্রাপ্ত হয়ে । এ ওকে অতিক্রম করতে গিয়ে ঠোকাঠুকি লাগে এবং অনেক সময় গাড়ি ট্র্যাক থেকে বেরিয়ে যায়  । দুর্ভাগ্যবশত কখনো কখনো দুর্ঘটনার মুখে পড়ে গাড়ি ও তার চালক । হতাহত হয় চালক । দর্শক আহত হবার নজির ও আছে এই রেসে যখন গাড়ি লাফিয়ে এসে দর্শকাসনে পড়েছে । তাই বিশাল ফেন্সিংয়ের ব্যব্স্থা থাকে এখন । কিন্তু এ  সবকে তুচ্ছজ্ঞান করে ড্রাইভার্, মেকানিক  ও দর্শকরা এই অসাধারণ উন্মাদনায় মেতে ওঠেন কারণ ফর্মুলা ওয়ান একটি ক্রীড়া নয় এটি একটি জীবনধারার প্রতীক । যারা এই উন্মাদনায় মাতেন তারা অনেকেই ভাবেন যে তাদের ধমনীতে রক্ত নয় যেন পেট্রোলের তরঙ্গ বয়ে চলেছে এবং হৃত্পিণ্ডের বদলে ৬ সিলিন্ডার ও ৩ লিটারের  V-6ইঞ্জিন তাদের বুকের মধ্যে তোলপাড় করছে ।  আর চব্বিশটি গাড়ি যেন উচ্চৈঃস্বরে ছুটতে ছুটতে গিয়ে বলে আমাকে বাঁচতে দাও; তারস্বরে গগনভেদী চিত্কারে বলে ওঠে আমাকে আগে যেতে হবে, আমাকে শিখরে পৌঁছতে হবে কিম্বা হাম হোঙ্গে কামৈয়াব ।
 ভারতের দল


গতির ছন্দে মেতে উঠে গতির দুনিয়ায় পা রেখেছেন ভারতের নারায়ণ কার্তিকেয়ণ; ফর্মুলা ওয়ান রেস করেছেন ভারতের বাইরে । ভারতীয় মালিকানায় ফর্মুলা ওয়ান টিম ফোর্স ওয়ান আগে ছিল বিজয় মাল্যর । অধুনা সেটি যৌথ ভাবে বিজয় মাল্য এবং সাহারার  মালিকানায় । কিন্তু ভারতের মাটিতে ফর্মুলা ওয়ান টিম পা রাখল এই বছর অর্থাত ২০১১ র অক্টোবরে । ২০১১ সালের ১৭তম রেসটি হল ভারতের মাটিতে, উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডায়।  নয়ডার বুদ্ধ ইন্টার ন্যাশানাল সার্কিটে ২৮, ২৯ ও ৩০ শে অক্টোবর ফর্মুলা ওয়ান রেস হল ।    এবছর এই টিমে সবশুদ্ধ বারোটি দলের চব্বিশটি গাড়ির চব্বিশজন ড্রাইভার যথার্থই কাঁপিয়েছেন ভারতবর্ষের মাটি ।  প্রত্যেক টিমে দু'জন ড্রাইভার থাকেন ।

এবার ছিলেন

  •     রেডবুল টিমের সেবেষ্টিয়ান ভেটেল এবং ওয়েভার,
  •     ভোডাফোন ম্যাকল্যারেন মার্সিডিজের হ্যামিল্টন ও জেনসন বাটন্,
  •     মার্সিডিজ জিপির মাইকেল স্যুমাকার ও নিকো রসবার্গ,
  •     স্কুডেরিয়া ফেরারির ফেলিপ মাসা ও ফার্ণান্ডো এলোনসো
  •     ফোরস ইন্ডিয়ার পল ডিরেষ্টা ও এড্রিয়ান সুটিল,
  •     রেনোর  নিক হাইডফেল্ড ও ভিটালি পেট্রোভ, 
  •     লোটাস রেনোর হাইকি কোভালাইনন ও ইয়ারনো ট্রুলি
  •     উইলিয়াম কসওয়ার্থ টিমের রুবেন্স ব্যারিচেলো ও প্যাষ্টার মালডোনাডো
  •     এইচ আরটি কসওয়ার্থ টিমের নারায়ণ কার্তিকেয়ণ ও ভিট্যান্টোনিও ল্যুইজি
  •     ভার্জিন কসওয়ার্থ এর টিমো গ্লক ও জেরোম ডি এমব্রোজিও ,
  •     সবার ফেরারি টিমের কামুই কোবায়াশি ও সার্জিও পেরেজ এবং
  •     দ্বাদশ ও শেষ টিম টোরো রোসো ফেরারির  সেব্যাস্টিয়ান বুয়েমি ও জেইম এলগ্যুয়ার সুয়ারি ।


পৃথিবীতে ১৯৫০ থেকে ফর্মালি সব নিয়ম কানন মেনে আনুষ্ঠানিক ভাবে ফর্মুলা ওয়ান রেস হচ্ছে । সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ও সফিষ্টিকেটেড স্পোর্টস হল ফর্মুলা ওয়ান । ব্যয়সাপেক্ষও বটে। উন্নতমানের প্রযুক্তি এবংবিশেষ কৌশলে তৈরী হয়   এই ফর্মুলা ওয়ান গাড়িগুলি । বর্তমান যুগের গাড়িগুলি ৮সিলিন্ডারের ইঞ্জিন এবং ৩০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ।  সবমিলিয়ে টিম ফর্মুলাওয়ানের কোঅর্ডিনেশন দেখবার মত । গাড়ির সাথে ড্রাইভারের ,  তার সাথে পিটক্রুদের সহযোগিতা, সেফটি কারের পথ প্রদর্শন  বা ইয়ালো ফ্ল্যাগ দেখেই গাড়ি থামিয়ে রেস বন্ধ করে দেওয়া এও দেখার । এই ফর্ম্যুলা কারের চাকা এবং ইঞ্জিনই হল  গাড়ির আসল জিনিস । চাকার লজিষ্টিকস এর অবদান এই রেসে অন্যতম । ভিজে মাটির জন্য একরকম চাকা এবং শুকনো মাটির জন্য আরেকরকম চাকা বরাদ্দ থাকে । আবার কোন চাকা কতক্ষণ রেস করার পর কত দ্রুত  তাকে বদলাতে হবে তাও ভাবতে হয় । আর অবিশ্বাস্য হল গাড়ির চালকরা ।

  •     এদের রক্তচাপ খুব কম হয় ।
  •     নাড়ির বেগ বা পালস রেট হতে হবে অত্যন্ত কম ।
  •     শরীরের ওজন হতে হবে অনূর্দ্ধ ৭০ কেজি ।
  •     আর চশমা থাকলে নৈব নৈব চ ।
গাড়ি


 দুর্দান্ত রেসিং ট্র্যাকটি তৈরী হয়েছিল । পুরো ট্র্যাকটি হল একটি ল্যাপ যার দৈর্ঘ্য হল ৫.১৪ কিমি । এবার ফাইনাল রেসের দিন অর্থাত ৩০শে অক্টোবর দুঘন্টায় বারোটি টিমের চব্বিশটি গাড়ি ৬০বার ঐ ট্র্যাক প্রদক্ষিণ করল । তার আগে ২৮ ও ২৯ তারিখে প্র্যাকটিস রেস বা কোয়ালিফাইং হল ।

ভীড়


পর পর গগনভেদী চিত্কারে গাড়ীগুলি পিট থেকে বেরিয়ে মেইন ট্র্যাক ধরে চলতে শুরু করল  । এভাবে ৬০ বার পরিক্রমা চলতে লাগল ঘন্টা দুই ধরে । কি চরম উত্তেজনার সামিল আমরা তখন ! কখনো দুটি গাড়ি একে অপরকে ছুঁই ছুঁই, কখনো অবলীলায়  চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই হুস করে সামনে দিয়ে চলে গেল । বুদ্ধ সার্কিটে ফর্মুলার ওয়ানের আসরে আকাশ বাতাস তখন গাড়ির শব্দে মুখর । কানে ইয়ার প্লাগ তবুও কাজ হলনা । পাশের লোকের কথাও শোনা যায় না সেই আওয়াজে । গতির লড়াইয়ে ২৪জন চালক তখন একে অপরকে টেক্কা দিতে ব্যস্ত । আমরাও গতির রোমাঞ্চে রোমাঞ্চিত । কি হয় কি হয় ! আমাদের ট্র্যাকের সামনে দুবার অঘটন ঘটেছিল যা অবিশ্যি কিছুই নয় । কিন্তু চোখের সামনে দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম আমরা । ফিলিপ মাসা এবং লুইস হ্যামিলটন একে অপরকে ওভারটেক করতে গিয়ে চাকায় চাকায় স্পর্শ করে; স্পিন খেয়ে মাসার গাড়ি ট্র্যাকের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে আবার সে সাবলীল গতিতে   ঢুকে এসেছিল ঠিকমত, যেন কিছুই হয়নি এই ভাবে । দুঘন্টা পর দেখা গেল সেবেস্টিয়ান ভেটেলই এগিয়ে রয়েছে সকলের চেয়ে ।    ৬০ ল্যাপের পর সেবেষ্টিয়ান ভেটেলকেই চাম্পিয়ান ঘোষণা করা হল । সামনে বিশাল টিভির স্ক্রিনে শচীন তেন্ডুলকারের চেকার্ড ফ্ল্যাগ নাড়া দেখে বুঝলাম খেলা শেষ । 

২৬ জানু, ২০১২

আমার খেলাধূলো

  ছোটবেলা থেকে আমি স্পোর্টস সম্বন্ধে খুব একটা কৌতুহলী ছিলামনা । ক্রিকেট ও ফুটবল উত্তেজনার সামিল হয়ে বাড়িতে বসে টিভির সামনে একরাশ মুখরোচক খাবার নিয়ে গোলে হরিবোল দিয়ে " আউট",  "এলবিডব্লিউ"  কিম্বা "গোল"ও বলে দিতুম  বারবার । তবে কোনো খেলাধূলাতেই বেশী আগ্রহ ছিলনা । একেবারে খবর সম্বন্ধে আপডেটেড না থাকলে স্কুলে বা কলেজে একঘরে হয়ে যাব সেই ভয়ে যতটুকু হওয়া যায় আরকি। শুধু একবার ছেলের পাল্লায় পড়ে কোলকাতায় আই পি এলে নাইট রাইডার্সের খেলা দেখতে গিয়েছিলাম  ইডেনের মাঠে । কিন্তু সেখানে গিয়ে মনে হয়েছিল টিভিতে খেলা আরো বেশি উপভোগ্য । গ্যালারীতে বসে নাতিদীর্ঘ ব্যাটসম্যান ও খুদে খুদে খর্ব বোলার দেখে মন ভরেনি । কলেজে আমাদের যেমন বেশ কিছু ক্রিকেট আইকন ছিল । রবি শাস্ত্রী বা আজহার উদ্দীন বা ওয়াসিম আক্রম, বব উইলিস জ্বরে বান্ধবীরা আক্রান্ত সে যুগে । তাই এদের কেউ কেউ আমারো যে হাটথ্রব ছিলনা সে কথা বললে মিথ্যে বলা হবে ।  কিন্তু আইপিএল দেখতে গিয়ে মনে হল ধুস্‌ ! ক্রিকেটারদের সুঠাম, বলিষ্ঠ চেহারাটাই তো দেখতে পেলামনা ! একে তো খেলার কত বুঝি তার ঠিক নেই !  এতো গেল স্পোর্টস সম্বন্ধে নিরুত্সাহী আমার কথা । এবার যখন চল্লিশ পার হলাম তখন দেখলাম আমি হাঁটা, জগিং বা জিম এ আসক্ত হয়ে পড়ছি । তখন মনে হল আমার ব্যথা যখন আনে আমায় তোমার দ্বারে অর্থাত ক্রীড়ার দ্বারে, আমি আপনি এসে দ্বার খুলে দিয়ে ডাকি তারে ।  এখন ক্রিকেট, ফুটবল দেখলে মনে হয় খেলতে পারলে শরীরটা আরো বুঝি ফিট থাকত । 
ছেলে যখন ছোট তখন তার স্পোর্টসে যারপরনাই আসক্তি যেমন আর পাঁচটা ছেলের হয় । আমার ছেলের আবার তার বাবার মুখে গল্প শুনে শুনে আর নানারকম গাড়ির ব‌ই পড়ে পড়ে গাড়ির রেস, গাড়ির rallyর প্রতি আসক্তি জন্মাল । হেন ব‌ই নেই যে সে তার ছবি দেখেনি আর গাড়ির সম্বন্ধে হেন তথ্য নেই যে সে জানেনা । এখনো আমাদের বাড়িতে কেউ গাড়ি কিনবে বললে তার ভালোমন্দ তাকে জিগেস করা হয় । এরূপ ছেলের মা কেও অনেক কিছু খোঁজ খবরাদি রাখতে হয় গাড়ির সম্বন্ধে । অতিপ্রিয় টিভি সিরিয়ালটি দেখার লোভ সংবরণ করতে হয় তার মাকে যখন অন্য একটি চ্যানেলে অটো রেসিং হয় । নিয়মিত অটোকার এবং মোটরিং ম্যাগাজিন তার হাতে তুলে দিতে হয়  । মোটামুটি আমার বাড়িতে আমার শ্বশুরমশাইও তেমনি ছিলেন । সেই যুগে ব্যারাকপুরে গাড়ির রেস দেখতে নিয়ে যেতেন আমার স্বামীকে । বাড়িতে সব ভিন্টেজ কারের এলবাম ও রাখা আছে । ছেলের বাবাও ডালাসে পড়াকালীন Dallas Grand Prix দেখেছিলেন আর কোলকাতায়  শীতকালে ইষ্টার্ণ কম্যান্ড স্টেডিয়ামে প্রতিবছর  The Statesman আয়োজিত  The Vintage Car Rally র জন্য আমারো উতসাহ কিছু কম ছিলনা ।
এহেন আমি, শ্বশুরবাড়ির পরিমন্ডলে একদা ছিলাম হংস মধ্যে 'বক' যথা ।  কিন্তু সেই বকের দেখলাম এই গাড়ির স্পোর্টস সম্বন্ধে উতসাহ বেড়েই চলেছে । এতদিন টিভিপর্দায় যে গাড়ির রেস আমরা দেখতাম তা হত বিদেশে ।ছেলে বাবাকে জিগেস করলেই তিনি বলতেন " মন দিয়ে পড় এখন্, আমাদের দেশে হলে নিয়ে যাব তোমায়"  তাই গতবছর থেকে যখন দিল্লীতে ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির রেস হবে ঘোষিত হল তখন থেকেই মোটামুটি আমরা স্থির করেছিলাম মাঠে যাব । বেশি দামী টিকিট না কিনতে পারি সস্তার টিকিটেই দেখব....(ক্রমশঃ)