৯ আগ, ২০১১

প্যাটিপিসির আর্মানি আরশি [ "দেশ" পত্রিকায় প্রকাশিত (১৭ই জুন ২০১১) ]



পরমার আজ খুব ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেছে । ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই মনে পড়ে গেল কাল দুপুরের সেই ঘটনা । সেটা সত্যি না মিথ্যে, স্বপ্ন না দু:স্বপ্ন এখনো সেটাই বুঝে উঠতে পারছেনা পরমা । কেবলই মনে হচ্ছে তার, কেন কাল সে গেল সেই চিলে কোঠার ছাদের ঘরে; দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজোর পেতল কাঁসার বাসন বার করতে মা পাঠিয়েছিলেন তাকে ঐ ঘরে । বড় একটা কর্পূরকাঠের বাক্সে রাখা থাকে সব পূজোর জিনিষ পত্র । 
প্রতিবছরই পরমার কাজ সেগুলোকে বের
করে আনা । মা সরমাদেবীর বাতের ব্যথায় আর ছাদের ঘরে গিয়ে বাসন বের করে আনা পোষায় না । পরমাকে বাসন বের করতে বলে সরমাদেবী প্রতিদিনের খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন আর টিভির সিরিয়াল দেখতে দেখতে মাদুর পেতে দিবানিদ্রা গেলেন কিছুক্ষণের জন্যে আর পরমা সেই দুপুরে তার অতি চেনা এই চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে হারিয়ে গেল ঘন্টা দুয়েকের জন্যে । পরমার বাবা গেছেন নাতি-নাতনীদের জন্যে বাজী-বাজারে বাজার করতে । দুদিন বাদেই কালীপূজোর লক্ষ্মীপূজোয় বাড়িভর্তি লোক জন আসবে । এই একটা দিন পরমাদের বাড়িতে খুব ধুমধাম করে পূজো হয় আর হয় একটা পারিবারিক গেট-টুগেদার ।সরমাদেবীর বড় মেয়ে পর্ণা আসছে মাস ছয় পর । তার স্বামী, ছেলে মেয়ে নিয়ে । পরমার জ্যাঠামশায়ের ছেলে, বড়পিসির মেয়ে সকলেই আসবে ঐ দিন । আসবেন পরমার বাবার বিজনেস ফ্রেন্ড, পারিবারিক বন্ধু মিষ্টার সেন । তিনি অকৃতদার । আরো দুচারজন বন্ধুবান্ধবও আসবে । সরমা নিজে হাতে ভোগ রান্না করেন । পশ্চিমবাংলায় অনেকের রীতি কালীপুজোর বিকেলে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজো করে অলক্ষ্মী বিদেয় করা হয় । সংসারে সারাবছর যাতে শ্রীবৃদ্ধি হয়, ধনাগম হয় সেই আশায় । লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পূজো হয় । পিটুলি দিয়ে সরমা তাঁর নিপুণ হাতে তৈরী করেন সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী পুতুল, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল
নারায়ণ পুতুল, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের পুতুল । কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন । আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী । চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় । সরমা দেবী তাঁর শাশুড়িমায়ের খুব প্রিয়পাত্রী ছিলেন । সব রীতি নীতি মেনে প্রতিবছর পূজো করেন তিনি নিখুঁত ভাবে । এদিন ভোরে পরমাদের বাড়িতে পরমার দিদি পর্ণা, জ্যাঠামশায়ের ছেলে প্রমিত, বড়পিসির মেয়ে এষা ছাড়াও আসবে পরমার ছোট পিসি প্যাটিপিসি । প্যাটিপিসির নীলচে চোখ আর দুধের মত ফর্সা গায়ের রঙ | আদর করে পরমার ঠাকুর্দা তার ছোট মেয়ে পত্রলেখাকে ডাকতেন প্যাট্রিসিয়া বলে । আর ছোটরা সংক্ষেপে ডাকত প্যাটিপিসি বলে । পরমার চুল একটু বাদামী বাদামী, স্ট্রেট হেয়ার । সরমার খুব গরব তাই মেয়েকে নিয়ে । সরমার মত মাটা মাটা নাক, ভাসা ভাসা চোখ আর ছোটপিসির মত গায়ের রং । ছেয়ালো ছেয়ালো গড়ন । ঠিক যেন পুতুল পুতুল ভাব । পরমা যেমন পিসির মত কাজের তেমনি মায়ের মত গোছালো । পিসি ভাইঝি একেবারে হরিহর আত্মা । কতবার প্যাট্রিসিয়া বলেছেন "বৌদি দাও না বাপু, তোমার তো দুটি মেয়ে , আমি একটাকে মানুষ করি " কিন্তু সরমার তো প্রাণ ! তাঁর বড় মেয়েটিকে তাড়াতাড়ি বিয়ে থা দিয়ে দিয়েছিলেন কালনার জমিদার বাড়ির ছেলের সাথে । বর্ধিষ্ণু পরিবার, একমাত্র ছেলে । সংসারে কোনো ঝক্কি নেই । গ্র্যাজুয়েশানের পরপরই সরমার ভাই সম্বন্ধ এনেছিলেন আর এক দেখাতেই মেয়ে দেখে পছন্দ হয়ে ঝপ করে বিয়ে হয়ে গেছিল পর্ণার । তা সে ভালই হয়েছে । পর্ণা বিয়ের পর এম.এ করেছে । এখন নাতি-নাতনীর গৌরবে আটখানা সরমা আর তার স্বামী । পরমাকে এখুনি বিয়ে দেবেন না ঠিক করেছেন তারা । পরমা ম্যাথমেটিকসে এমএসসি করছে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে ।
লেখাপড়ার সাথে সাথে মেয়েকে সবকাজও শিখিয়েছেন সরমা । প্যাটিপিসির মত অনূঢ়া থাকবেনা অবিশ্যি সে । কিন্তু মনে মনে মাঝে মাঝে প্রমাদ গনেন সরমা । সত্যি সত্যি তার ছোট ননদটির মত আইবুড়ো হয়ে থাকতে হবে না তো তার পরমাকে ? প্যাট্রিসিয়া তাদের সাবেকী বাড়ি বারাসতে একা থাকেন । বয়স প্রায় শেষ ষাটের কোঠায় । এখনো যেমন সুন্দরী তেমনি কর্মঠ । এই বিয়ের পরেই বোধ হয় সব মেয়েরা বুড়িয়ে যায় । ছেলেপুলে হয়ে রূপের দফা গয়া হয়ে যায় । সংসারের কাজের চাপে মাঝে মাঝেই এ কথা সরমা চিতকার করে বলে ওঠেন স্বামীকে "দেখো দিকিনি এই ছোট্‌ঠাকুরঝিকে, বেশ কাটিয়ে দিল জীবনটা । যখন খুশি যেখানে খুশি বেড়িয়ে আসছে, নেই তার কোনো পিছটান । আমাদের মত ? সেই কবে পায়ে শেকল পরেছি । ব্যাস!" স্বামী, শ্বশুর বাড়ি আর মেয়েদুটিকে মানুষ করতে করতেই তাঁর দিন কাবার ! জম্মের বুড়ি কম্ম বিয়ের পর একবার দেওঘর আর একবার পুরী ব্যাস ! গত বছর তবু তার বড় জামাই কালনা নিয়ে গেছিল গাড়ি করে জন্মাষ্টমীর সময় । রাধা-দামোদরের পুজোতে ।
সরমার স্বামী সারাদিন ব্যস্ত থাকেন বিজনেসের কাজকর্ম নিয়ে । সেই কোন ছোট্টবেলা থেকে পরমা আর পর্ণা এসব দেখে আসছে । বাবা ভোরে বেরিয়ে পড়েন আর হঠাত করে একদঙ্গল বন্ধু নিয়ে বাড়ি এসে হাজির হন । মায়ের সামলাতে হয় সে ঝক্কি । কোনোদিন বাবার সাথে আসেন মিষ্টার সেন । এখানেই স্নানখাওয়া সারেন । বিকেলে চা খেয়ে সূর্যাস্তের পর আবার গাড়ি নিয়ে চলে যান দুই বন্ধু মিলে অফিসে । সরমার অবিশ্যি এসব খুব যে খারাপ লাগে তা নয় । খাবার টেবিলে বাবা, মিষ্টার সেন আর সরমা তিনটিতে মিলে কত গল্প হয় । কতবার তো কলেজ থেকে ফেরত এসে চায়ের টেবিলে পরমাও যোগ দিয়েছে তাদের সাথে । একঘর জলখাবারে মাত করেছেন সরমা তাঁর ডাইনিং টেবিল । পরমা বলেছে তার মা'কে "মা, তুমি পারো বটে! বাবা বলল আর তুমি একাহাতে এতসব বানালে! "অভিযোগের সুর নিয়ে মা'কে বলেছে, "লোককে আপ্যায়ন করতে পারলে আর তুমি কিছু চাও না তাই না মা ? একটু নিজের কথা ভাবো না মা, চলো না আমরা দিন কয়েক কোথাও ঘুরে আসি"
পরমা সেই কখন ভাত খেয়ে চিলেকোঠার ছাদে গেছে ঠাকুরের বাসন কোসন বের করতে । বিকেলের কাজের বৌকে দিয়ে মাজাঘষা করতে হবে সেগুলোকে । সরমা অনেকটা কাঁচা তেঁতুল সেদ্ধ করে রেখেছেন বাসনগুলো চকচকে করে মাজার জন্যে ।কর্পূরের বাক্সে বাসন ছাড়াও থাকে ঠাকুরের আরতি করার চামর । আসল চমরী গাইয়ের লেজ দিয়ে বানানো চামর । পোকা লাগবে না বলে কর্পূরের বাক্সে রাখা থাকে সেটি । বাক্সের ঢাকা খুলেই কেমন যেন হারিয়ে যায় পরমা । কর্পূরের ভুরভুরে গন্ধে মনে পড়ে যায় প্যাটিপিসির কাছে শোনা তাদের বাড়ির পুরোণো সব গল্প । এই বাক্সটি এনেছিলেন তাদের ঠাকুর্দার বাবা যুদ্ধের সময় জাপানে গিয়ে । আর্মিতে ছিলেন তিনি । আসল চমরী গাইয়ের লেজ থেকে বানানো এই চামরটি এনেছিলেন তাদের ঠাকুর্দা কোন এক ঠান্ডার দেশ থেকে । তার ঠাকুমার অর্থাত প্যাটিপিসির মায়ের বিয়ের দানের পরী-পিলসূজ, কাঁসার জাম্বো থালা যেটিতে প্রতিবার মালক্ষ্মীকে ভোগ বেড়ে দেন সরমা । যতদিন প্যাটিপিসি বেঁচে থাকবে পরমাও যেন এই গল্প গুলো শুনবে তার পিসির কাছ থেকে । আর এই বাক্সের ঢাকা খুলেই আবার মন কেঁদে উঠল তার প্রিয় প্যাটিপিসির জন্যে । কাল কখন সকাল হবে আর বাবা গাড়ি পাঠাবে প্যাটিপিসিকে নিয়ে আসার জন্যে । একে একে পরমা বের করল সব পূজোর বাসন কোসন । ছোট্টবেলা থেকে মায়ের সাথে বছরে এই একটিবার কর্পূরবাক্স খুলে সব কিছু বের করতে করতে মুখস্থ হয়ে গেছে পরমার । নিমেষের মধ্যে সব বের করে পরমা চেয়ে চেয়ে সব দেখতে লাগল । চিলেকোঠার এই ঘরখানা খুব পছন্দ ছিল একদিন পরমার । সারাবাড়ির থেকে বিছিন্ন এই ঘরটায় ছোটবেলা পুতুল খেলতে আসত পরমা তার দিদি পর্ণার সাথে । দিদির বিয়ে হয়ে যাবার পর পরমার ও পড়াশুনোর চাপ
বেড়ে যায় তাই বছরে এই একটা দিনই আসা হয় । আর আসে ভূত চতুর্দশীর দিন এই চিলেকোঠার দরজায় বাড়ির চোদ্দতম প্রদীপ দিতে । সারাবছর সরমাই কাজের লোককে বলেন চাবিখুলে ঘর পুঁছে আসতে । ঐ কর্পূরবাক্স ছাড়া আর বিশেষ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিষ নেই সেখানে । আছে কটা পোঁটলা-পুটলি আর একখানা এলুমিনিয়ামের ইস্কুলবাক্স । কোনোদিন পরমার মনে হয়নি খুলে দেখার মানে তাগিদও অনুভব করেনি কিন্তু সেদিন যেন কিসের টানে সেই এলুমিনিয়ামের বাক্সটার দিকে চোখ যেতেই তার মনে হল খুলে দেখে তার মধ্যে কি আছে । যেই ভাবা অমনি কাজ । বাক্সটা হঠাত খুলে ফেলল সে । একখানা লালচে রঙের কাগজে মোড়া কি যেন সব রয়েছে । একখানা না, অনেক গুলো তো ! নিজের ঔত্সুক্যকে বশে রাখতে না পেরে খুলতে লাগল একটার পর একটা সেই লালচেরঙের মোড়ক । ভাঙা আর্শির টুকরো সব ! ধুর! হাত কেটে যাবে । কাল আবার পূজোর কাজকর্ম আছে । মা যদি রাগ করে ! কিন্তু এত গুলো ভাঙা আয়নার টুকরো সযত্নে কে রেখে দিয়েছে ঐ বাক্সের মধ্যে ? চিলেকোঠার ঘরেই বা রাখা কেন ঐ ভাঙা আর্শির টুকরো ! ভাঙা আয়না তো কারোর কোনো কাজে আসবে না । তাহলে? বাক্সের মধ্যে ঐ লালচে কাগজ খুলছে পরমা । এর মধ্যে একটা বোলতা এসে তার ডান হাতের ওপরে যেখানে কামিজের হাতাটা শেষ হয়েছে সেখানে মোক্ষম কামড় বসাল । উ:, :, বলে চিতকার করে বাসনের ঝাঁকাটা নিয়ে নীচে নেমে এল চুপিচুপি। তাদের কাজের মেয়ে রাধাকে বলা আছে তিনটের সময় এসে তেঁতুল সেদ্ধ দিয়ে মেজে চকচকে করবে সেই বাসন । রান্নাঘরের বারান্দায় একছুটে বাসনের ঝাঁকা নামিয়ে রেখে মায়ের ঘর থেকে হোমিওপ্যাথির বাক্স খুলে বোলতা কামড়ানোর ওষুধের পাঁচ-'টা গুলি খেয়ে, রান্নাঘরের তাক থেকে সোডি-বাই-কার্বের গুঁড়ো জলে গুলে হাতের ওপরে লাগিয়ে আবার চিলেকোঠার ঘরে দে ছুট ! ভাঙা আর্শিরটুকরো রহস্যের কিনারা করতে হবে তাকে । কি আর্শি, কেন আর্শি, কখন আর্শি ! আর তারপর কাল সকালে প্যাটিপিসি এসে পড়লেই কেল্লাফতে ! সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে ।
একলাফে চিলেকোঠার ছাদে পৌঁছে গেল পরমা কিন্তু ঢোকার মুখে ঘরের চৌকাঠে বেধড়ক হোঁচট খেল সে । ডান পায়ের নখ ভেঙে রক্ত বেরিয়ে একাকার । ছাদে কটা টবে গাঁদা ফুলের গাছ ছিল । কটা পাতা তুলে হাতে করে পিশে লাগিয়ে দিল পায়ের নখে । রক্ত বন্ধ হ'ল বটে তবে প্রচন্ড ব্যথা হল পায়ে । এবার সেই এলুমিনিয়াম বাক্স রহস্যের কিনারায় মন দিল । একটা লালচে কাগজের মোড়ক খুলে ভাঙা আর্শির টুকরোটাকে বের করে রাখল নিজের পাশে অতি সন্তর্পণে । আর তারপর পরের টুকরোটাকে, তারপর আরেকটাকে ... এই ভাবে বড়, মেজ, সেজ, ছোট সব টুকরোকে বের করে দেখল তখনো বাক্সের মধ্যে প্রায় আট-দশটা ভাঙা আয়নার টুকরো পড়ে রয়েছে । বের করে রাখা পিস গুলোকে ভালো করে দেখতে লাগল সে । অতি দামী আয়না । বাবা বলতেন পল কাটা । ইংরেজীতে বলে bevelled অর্থাত কিনা আলোক রশ্মি আয়নার পাশ থেকে গেলে প্রিজমের মত বিচ্ছুরণ ঘটায় । সে তো বিজ্ঞানের ছাত্রী । এসব বিষয়ে তার সম্যক জ্ঞান । হঠাত মোবাইল বেজে উঠল ! কে রে বাবা এই ভর দুপুরে ? মিসড কল একটা কিন্তু অচেনা নম্বর । ধুস মানুষের খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই । হয় ভুল নম্বর ডায়াল করে আর নয় তো ইচ্ছে করে মানুষকে বিরক্ত করে ।
আবার আয়না , ভাঙা আয়না , টুকরো টুকরো করা দামী আয়নায় পেয়েছে পরমাকে । চিলেকোঠার ঘর খুলে আবার সেই এলুমিনিয়াম বাক্সের ঢাকা খুলে উবু হয়ে বসে বের করতে লাগল ভাঙা আয়নার টুকরো গুলো একের পর এক । চকচকে আয়নার টুকরো কিন্তু কোনো কাজে লাগবে না আর কারণ এতো জুড়ে লাগিয়ে ব্যাবহার করা যাবে না । কেন যে বাড়ির মানুষেরা পুরোণো সব জিনিষ গুলো এভাবে জমিয়ে রেখে দেয় কে জানে ? নস্টালজিয়া ! পুরোণোকে ঝেড়ে না ফেলা ! যত সব ঘর দোর নোংরা করে রাখার প্রবণতা ... চিরকালের রোগ বুড়ো মানুষদের !
কেবল পুরোণো জিনিষ পত্র কে আঁকড়ে পড়ে থাকা ! কত কি ঘটে যাচ্ছে এ জগতে , কত গ্লোবালাইজেশানের ঢেউ আছড়ে পড়ছে শহরে, টেলিকমিউনিকেশনের কত অগ্রগতি হ', ইন্টারনেটে কত কিছু হচ্ছে তবু এই মানুষ গুলো পড়ে রয়েছে পুরোণো স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে ! বড় বড় শপিংমলের গ্রোসারী স্টোর গুলোতে যাবেনা বাজার করতে , এস এম এস পাঠাতে শিখবে না, ইন্টারনেট যেদিকে তার থেকে শত হস্ত দূরে থাকবে এরা । পরমা মনে মনে দূষলো তার বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ
দের । নয়তো কেউ এই ভাঙা আয়নাখানা এভাবে সযত্নে প্যাক করে শিকেয় তুলে রাখে ! "আজ ফেলে দেবই এই টুকরো গুলোকে, যত্তসব জঞ্জাল জমিয়ে রাখা " লালচে হয়ে যাওয়া কাগজের মোড়ক সরিয়ে একখানা আর্শির ভাঙা টুকরো বের করতে গিয়ে পরমার হাতটা খুব জোরে কেটে গেল । সে যাত্রায় আর চাপা দেওয়া গেল না ।ঘর বন্ধ করে নীচে নেমে এল সে । মা কে কিছুই বললনা এত সব । ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করে আয়োডিন লাগিয়ে ব্যান্ড এড দিয়ে বারান্দায় গিয়ে ভাবতে লাগল । আয়নায় কি আছে, কেন আছে ? সেই কারণেই কি বাড়ির লোকজন সেই আয়নার টুকরোগুলো ফেলতে পারেনি? পরদিন সকালবেলা কালীপুজোর ঠিক আগের দিন । ভূত চতুর্দশী । আজ প্যাটিপিসি আসবে । আসবে পরমার দিদি পর্ণা তার ছেলেমেয়ে নিয়ে । জামাইবাবু আসবে পুজোর দিন সকালে । আর সকলেও আসবে ঐ দিন । বেলা এগারোটা নাগাদ এলেন প্যাটিপিসি । গঙ্গাজল রঙের খোলের ওপর ইন্ডিগো ব্লু-রঙের পেটা জরিপাড় ফুলিয়ার টাঙ্গাইল শাড়ি পরে । সত্যি এখনো কি সুন্দরী ! ছিমছাম সাজগোজ । হাতে একগাছা করে চুনীর চুড়ি পরা আর গলায় একটা সরু চেন তাতে একটা ছোট্ট হীরের স্বস্তিকা জ্বলজ্বল করছে । দূর থেকে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে পরমা চলে গেল তার প্যাটিপিসিকে রিসিভ করতে একতলায় ।
"কি রে তোর হাতে কি হল পরী?" পরমাকে দেখেই বলে উঠলেন প্যাট্রিসিয়া ওরফে পত্রলেখা । " আরে ছাড় ছাড় প্যাটিপিসি , কতদিন বাদে এলে, আর এসেই যত বাজে কথা " পরমা বললে । পরমাকে পরী বলে ডাকেন তিনি । দুপুরের সকলে মিলে একসাথে খেল চোদ্দশাক , রাঙাআলু-মূলো-বড়ি দিয়ে কাঁচা তেঁতুলের টক, ভেটকির ফুলকপি দিয়ে কালিয়া আরো কত কি সরমা রেঁধেছেন... । প্যাট্রিসিয়া প্রতিবারের মত বৌদির রান্নার গুণকীর্ত্তণ করলেন । বারাসত
থেকে মিষ্টি এনেছিলেন । সকলে খেল । পর্ণার দুই ছেলেমেয়ের জন্য বড় বড় ক্যাডবেরীর বাক্স , দুটো করে স্পেশাল তুবড়ী আরো কত কিছু মনে করে করে আনেন প্যাটিপিসি সকলের জন্যে প্রতিবার । বিজয়ার পরেই তো দাদার বাড়ি আসা আর ভাইফোঁটা সেরে একেবারে ফেরা । পয়সার অভাব নেই তার, বাবা অনেক নামী কোম্পানির কাগজ তার এই আইবুড়ো মেয়ের নামে দিয়ে গেছেন । সেই ব্লুচিপ কোম্পানির শেয়ারের ডিভিডেন্ডের টাকায় রাণির মত থাকেন তিনি । তার আদরের ভাইঝি পরীর জন্যে প্রতিবার সোনার কিছু আনেন । এবার তাকে দিলেন একটা বিলাতী হাফ গিনি । পর্ণার জন্যে একটা কাশ্মিরী শাল, বৌদি সরমার জন্যে শাড়ি, দাদার জন্যে ধুতি । বিয়েথা হয়নি তো কি প্যাটিপিসির কর্তব্যজ্ঞান ভীষণ । কার সাথে কি করে চলতে হয়, সমবয়সী বৌদির সঙ্গে কতটা মাত্রা রেখে চলতে হয় এসব তার কাছ থেকে শেখার মত । দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর পরমা গেল তার প্রাণের প্যাটিপিসির ঘরে একখাটে শুয়ে গল্প করতে ।
সরমা তাঁর বড় মেয়ে পর্ণা আর দুই নাতিনাতনীকে নিয়ে শুতে গেলেন । একলাটি এই জীবনটার
একঘেয়ে অলস দুপুরগুলো গড়িয়ে পার হয়েছে জীবনের অনেকগুলো বছর । এখন নাতিনাতনি অন্ত প্রাণ তাঁর । স্বামীকে পায়নি বেশি । জীবনের অনেককিছু ভালোলাগা পারিবারিক বন্ধু মিষ্টার সেনের সাথে শেয়ার করেছেন তিনি। টিভিদেখার ভালোমন্দে, চায়ের কাপে, কফির পেয়ালায় । দুপুরবেলার মনখারাপগুলো আছড়ে পড়েছে দক্ষিণের শোবার ঘরের দেওয়ালে । সরমার হাতের রান্নার যাদুর তারিফ করেছেন তিনি । ভালোভালো গল্পের ব‌ই এনে পড়িয়েছেন তিনি । সরমা তাই বলে স্বামীকে কিছু কম ভালোওবাসেননি সারা জীবন ধরে । সরমা কুড়িয়েছেন সেই ভালোলাগার নুড়ি পাথর আর আঁচলে ভরেছেন মিষ্টার সেনের ভালোবাসার আখরগুলি ।মিষ্টার সেন আজীবন ব্যাচেলর হয়েই থেকে গেছেন । কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া পার হন নি কেউ ।শুধু দুপুরগুলো ভরে উঠেছে বন্ধুতার আনুকুল্যে । এলোমেলো হয়েছে বিছানার ফুলফুল চাদর । ঘরের হালকা গোলাপী লেসের পর্দা উড়েছে আপন খেয়ালে । সুন্দরী সরমা অবিন্যস্ত চুল আর এলোমেলো শাড়ির আঁচল ঠিকঠাক করে আবার এসে চায়ের জল চাপিয়েছে । বিকেলে পরমাদের বাবা ফেরার আগেই ঘর গুছনোয়, চুলবাঁধার পারিপাট্যে, ঠাকুরঘরের সন্ধ্যেপ্রদীপে সংসারের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে । মিষ্টার সেনের প্রতি মায়ের এহেন দুর্বলতা পরমার বাবার চোখ এড়িয়েছে কিন্তু এক একদিন মায়ের সাথে সেনকাকুর এই ঘনিষ্ঠতা পরমার মত বুদ্ধিমতীর চোখ যে এড়ায়নি তা নয় । কিন্তু মাকে সেভাবে কখনো সন্দেহের চোখে দেখেনি সে ।
বিকেলে আবার সারাবাড়ি চোদ্দপ্রদীপ দেওয়ার পালা । সব সলতে পাকানো, পিদিমে তেল দিয়ে অতবড় বাড়ির সব গলিঘুঁজি দালান, তুলসীতলা, সে বাড়ির চিলেকোঠার থেকে শুরু করে গ্যারাজ অবধি । তারপর বারান্দায়, ছাদের আলসেতে মোমবাতি জ্বেলে সাজানো । "প্যাটিপিসি , আচ্ছা শোনো চিলেকোঠার ছাদের ঘরে একটা এলুমিনিয়ামের বাক্স দেখলুম , ওটা কার ছিল গো? " পরমা জিগেস করল । প্যাট্রিসিয়া বললেন "ওটা আমার ইস্কুল যাবার বাক্স ছিল রে, দাদা মানে তোর বাবা নিয়েছে তারপর আমাদের দিদি মানে তোর বড়পিসি আর তার পর আমি ইস্কুল গেছি রোজ ঐ বাক্সটা নিয়ে । আমাদের সময় অমন গোদা স্যুটকেস নিয়েই ইস্কুল যেতুম আমরা । দিদির আর আমার সাথে সুখরাম যেত ঐ বাক্স বয়ে নিয়ে । দাদা নিজেই হাতে করে নিয়ে যেত" "আর ঐ বাক্সের মধ্যে ভাঙা আয়নার টুকরো গুলো কেন রাখা আছে প্যাটিপিসি?" পরমা বললে । "সে অনেক কথা রে পরী । তুই বড় হয়েছিস | এতদিনে তোকে সব কথা বলার সময় এসেছে । আমি তখন বেথুন সাহেবের কলেজে পড়িরে । কোলকাতা তখন স্বাধীন পশ্চিম বাংলার শহর । কিন্তু বেশ কিছু আর্মেনিয়ানের বাস তখনো ছিল এ শহরে । বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে যেতাম অনার্সের ব‌ই আনতে । তোদের মত সব ব‌ই আমরা কিনতাম না । সেখানেই আলাপ আর্মেনিয়ান যুবক হেলমোজের সাথে । এশিয়াটিক সোশাইটিতে ইন্ডিয়ান হিষ্ট্রি নিয়ে রিসার্চ করত হেলমোজ । এমনিতে তখন আর্মেনিয়ানরা কোলকাতায় ব্যাবসা করতে এসেছিল কিন্তু এই হেলমোজ ছিল একদম দলছাড়া । চূঁচড়ো থেকে আসতো সে । ভালো বাংলাও শিখে গেছিল । আর আমরা তো ছোট থেকে ইংরেজী পড়ে এসেছি । রীতিমত ডেভিড কপারফিল্ড, শেকস্পিয়ার, শেলী-কিটস সব গুলে খেয়েছি তাই আমারো অসুবিধে হতনা হেলমোজের সাথে কথা বার্তা বলতে । যাইহোক কিছুদিনের মধ্যেই দুজনে দুজনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম রে । "তো বিয়ে করলে না কেন তোমরা প্যাটিপিসি" পরমা বললে । "জানিস ? সেবার বাবা-মা মানে তোদের ঠাকুর্দা-ঠাকুর্মা পশ্চিমে হাওয়া বদল করতে গেল আমাদের দাদা মানে তোর বাবাকে নিয়ে । দাদার বুকে জল জমেছিল অনেক চিকিতসার পর ডাক্তার বললে চেঞ্জে যেতে । মধুপুরে আমাদের সেই ভুতুড়ে বাড়িতে চেঞ্জে গেল সকলে । আমার বিএ ফাইনাল ইয়ার তাই বুড়ো চাকর সুখরাম আর পুরোণো সব কাজের লোকজন নিয়ে আমি রয়ে গেলাম বারাসতের বাড়িতে । হঠাত একদিন বৃটিশ কাউন্সিলে হেলমোজের সাথে দেখা হয়ে গেল । বাবা আমাদের পুরোণো ড্রাইভার কেশবকে বলে দিয়ে গেছিলেন । কেশববাবুই আমাকে কলেজ, লাইব্রেরী নিয়ে যেত । আর তখন তো কলেজে স্টাডি-লিভ, কেবল সপ্তায় একদিন যেতাম লাইব্রেরী তখন"
সেদিন ছিল ভরা বর্ষার একটা মুখ কালো করা গোমড়া দিন । দুপুরে লাইব্রেরী যাবে বলে সব ঠিক করে রেখেছে পত্রলেখা । কেশবকে গাড়ি বার করতে বলেও গাড়ি করে গেলনা সে । এসপ্ল্যানেড গেল বাসে করে । তারপর আবার একখানা বাসে চেপে বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী। যথারীতি বহুক্ষণ বসে অপেক্ষা করছে হেলমোজ তার বান্ধবী প্যাট্রিসিয়ার জন্যে । এ কথা সে কথার পর জানতে পারলো প্যাট্রিসিয়া যে তার বাবা-ঠাকুরদার যে বংশ পরম্পরায় ব্যাবসা রয়েছে লোহালক্কড়ের, সে গুলো ট্রেডিং করে আর্মেনিয়ান কোম্পানি হেলমোজ এন্ড গিবস । এই কোম্পানির অংশীদার আবার হেলমোজরা । প্যাট্রিসিয়াদের কোম্পানি বারাসত কাস্টিং এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের লোহার স্প্রিংলার লেদ মেশিনে ঘষে ফাইন করে পাঠানো হয় হেলমোজ এন্ড গিবস কোম্পানিকে যারা এগুলি ট্রেডিং করে । আরো কাছাকাছি এল তারা । হেলমোজ তাদের বংশের দলছুট । এই আর্মেনিয় যুবক ব্যাবসা বোঝেনা কিন্তু রীতিমত ইন্ডিয়ান হিষ্ট্রি নিয়ে চর্চা করে যেটা আকৃষ্ট করেছিল একুশ বছরের তন্বী, গৌরী প্যাট্রিসিয়াকে । এই নিয়ে বার দশেক এই লাইব্রেরীতে হেলমোজ আর প্যাট্রিসিয়া মিট করেছে । আদান প্রদান হয়েছে তাদের মত এবং অমতের । তারপর ছাব্বিশ বছরের হেলমোজ প্যাট্রিসিয়াকে আরো জানতে চেয়েছে । প্যাট্রিসিয়া বাড়িতে বলেছে তার কথা । হেলমোজও বলেছে তার বাড়িতে প্যাট্রিসিয়ার কথা । এখন মানে সেই ভরাবর্ষার দুপুর পালিয়ে ছুটে এসেছে তার বান্ধবী শুধু তার জন্য । ব‌ইপড়ার অছিলায় হাতে হাত ছুঁয়ে গেছে অনেক বার ।আলতো ছোঁয়া লাগার আবেশে আবিষ্ট হয়েছে দুটি মন । এক অদ্ভূত ভালোলাগায় মেতে উঠেছে তারা আর সহায় হয়েছে প্রকৃতি। বাইরে বেরিয়ে তারা দেখেছে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে আর সেদিন গাড়ি নেই সাথে । সত্যি সত্যিই হেলমোজের সাথে পথ চলতে চেয়েছিল পত্রলেখা আর সোজা বাড়ি এসেছে তাকে নিয়ে । সুখরামকে ছুটি দিয়ে রেখেছে তার দিদিমণি, হিন্দুস্তানি আড্ডায় যেতে বলেছে । বাড়ির সবসময়ের লোককে বলেছে চা আর আলুর টিকিয়া বানিয়ে রেখে চলে যেতে । সেদিনটা শুধু প্যাট্রিসিয়া আর হেলমোজের একান্তে পাওয়ার দিন । জীবনের প্রথম পুরুষের স্পর্শ পেয়েছে পত্রলেখা আর তারই মনের মত পুরুষ ; রূপবান, মেধাবী আর রীতিমত বিত্তশালী। অর্থাত সমানে সমানে কোলাকুলি! বাবা-মা আর যাই হোক অমত করবে না যদি তারা বিয়ে করে । হেলমোজের নাকে তখন পত্রলেখার একরাশ কালোচুলের সুগন্ধীতেলের হালকা গন্ধ, কানে পত্রলেখার একগোছা সোনার চুড়ির রিনরিন , আর চোখে শুধু বাংলাদেশের এক মেয়ের একজোড়া টানা টানা চোখ যার চোখের ঘন কালোপাতা গুলোয়
হারিয়ে গেছে সে । উজাড় করে দিয়েছে তার সবটুকু । উপুড় করে দিয়েছে ভালোলাগা । দুহাত পেতে নিয়েওছে সেই মেয়েটি সবটা । হেলমোজের গোলাপী ঠোঁটজোড়া আরো চেয়েছে । পত্রলেখা আরো দিয়েছে । যতক্ষণ না আশ মেটে দুজনের । বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে তখন । ফিরে চলে গেছে হেলমোজ তার বাড়ি। পত্রলেখা এক গভীর ভালোলাগার ঘোরে পড়াশুনো করে চলেছে । মা বাবা ফিরে এসেছে কয়েকদিন পর । পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে তার । লাইব্রেরী যাওয়া হয়নি আর । হেলমোজের সাথেও দেখা নেই । মাস দুতিন পর পত্রলেখা বুঝতে পেরেছে যে সে সন্তানসম্ভবা । মা কে জানিয়েছে । মা শোকে পাথর হয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই ম্যাসিভ কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়ে মারা গেছেন ।পত্রলেখা দাদার মাধ্যমে বাবার কাছে জানিয়েছে যদি শীঘ্রই বিয়েটা দিয়ে দেন তারা । কিন্তু বাবা তাকে বাধ্য করেছেন ভ্রূণ হত্যা করতে । চুপিচুপি এবর্শান করে এসেছে । তবুও বাবা হেলমোজের সাথে বিয়ে দিতে চাননি । লোকলজ্জার ভয়ে নষ্ট হয়ে গেছে তিন-তিনটে তরতাজা জীবন । হেলমোজ এসেছিল একদিন আবার পত্রলেখার কাছে । বিএ পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে তাই পত্রলেখাকে উইশ করতে আর সাথে নিয়ে এসেছে চারটে আরমেনিয়ান গোল্ড কয়েন আর সাথে একখানা আর্মানি আর্শি । তার প্যাট্রিসিয়াকে বলে গেছে "বিয়ে আমাদের নাই বা হোল, এই মিররে রোজ এবং সারা জীবন তুমি আমাকে দেখতে পাবে, আমাদের দেশে এটিকে বলে "মিরর অফ রিয়েলিটি" । তুমি যা বাস্তবে দেখতে চাইবে, আশা করবে তাই ফুটে উঠবে এই আয়নায় । আমাকে যখনই দেখতে চাইবে আমি এই আয়নায় তোমার চোখের সামনে এসে দাড়াব , তোমার হয়েই থাকবো আমি সারা জীবন । আর এই মিররে উদ্ঘাটিত হবে জীবনের কঠিনতম সত্য । যত্ন করে রেখে দিও এটি । ফিরে যাব দেশে কিন্তু আমার মনটা পড়ে থাকবে এই মিররে । শুধু তোমার জন্যে প্যাট্রি । আমি আবার আসব ফিরে এই বাংলায়"|
ঠিকানা দিয়ে গেছে আর চিঠি লিখতে বলে গেছে |চিঠি লিখেছে প্যাট্রিসিয়াও একসময়ে অনেক গুলো । খুব সুন্দর কবিতা লিখত হেলমোজ । সে গুলোকে বাংলায় অনুবাদ করে রেখেছিল প্যাট্রিসিয়া একসময় । তখনো যৌবন ছিল তার শরীরে । একটু ভারীক্কি তবুও নিটোল গড়ন । একটু আলগা বুড়িয়ে যাওয়া তবুও লালিত্যের ছোঁয়া ছিল শরীরে । আলমারি থেকে মাযের বিয়ের লাল কড়িয়াল খানা বের করে ঘোমটা দিয়ে লাল সিঁদুরের টিপ পরে তাকিয়ে ছিল পত্রলেখা সেই আর্মানি আর্শির দিকে । তার কেড়ে নেওয়া স্বপ্নগুলো বেঁচে ছিল তখনো । মনে মনে হেলমোজকেই স্বামীরূপে বরণ করেছিল সে । কিন্তু সেই আর্শির দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে । পত্রলেখা দেখেছিল তার পেছনে তার মৃত সিঁদুরপরা এয়োস্ত্রী মায়ের করুণ মুখখানি । মা বললেন "বড্ড কষ্টে আছি রে এখানে"। সযত্নে তুলে রেখেছিল আয়নাখানি । আর একদিন হেলমোজের জন্মদিনের ভোরে তার আশার আয়নাখানির মধ্যে হেলমোজকে জানিয়েছিল জন্মদিনের শুভেচ্ছা । সাথে সাথে দেখেছিল ভয়ঙ্কর
এক দৃশ্য । ট্রেন এক্সিডেন্টে আগের দিন হেলমোজ মারা গেছে । আর্শি শুনিয়েছিল সেই কথা আর দেখিয়েছিল হেলমোজের রক্তাক্ত মৃতদেহের ছবি । সাথে সাথে প্যাট্রিসিয়া ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল আর্শিখানা আর টুকরো হয়ে গেছিল তার আশার স্বপ্ন গুলো সেই সাথে । তারপরদিনই সেই আর্শির টুকরোগুলোকে কাগজে মুড়ে এলুমিনিয়াম বাক্সে বন্দী করে দাদার বাড়ির চিলেকোঠার ছাদে রেখে এসেছিল নিজে গিয়ে । তারপর থেকে কেউ খোলেনি সেই বাক্স|এদ্দিনে পরমা না হাত দিলে বুঝি আর কারো নজরও পড়ত না ঐ বাক্সের ওপর ।
পরমা অবাক বিস্ময়ে তার প্যাটিপিসির দিকে তাকিয়ে বললে ", তাই বুঝি যতবার এই আর্শির টুকরো আমি খুলতে গেছি ততবারই আমার কোনো না কোনো বাধা আসছে, বিপদের সঙ্কেত দিচ্ছে ঐ আর্শি আমাকে । আমার ঐ হাত কেটে যাওয়া, বোলতা কামড়ানো, হোঁচট খেয়ে পায়ের নখ উঠে যাওয়া, রবাহুত মিসড কল... এ সব‌ই কি তাহলে ঐ অভিশপ্ত আর্শির সতর্কীকরণ?" "প্যাটিপিসি তাহলে কেন রেখেদিলে ঐ আর্শিখানা ? আজ তো হেলমোজও নেই আর ঐ আর্শি দিয়ে তোমার কোনো কাজ ও হবে না বরং অকাজ হবে" "পারিনিরে পরী, পারিনি, আমি কিছুতেই হেলমোজের দেওয়া ঐ আর্শিখানাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারিনি রে; ওটা খোলার কি দরকার ? রেখে দে না তুলে যেমনটি ছিল ঐ বাক্সবন্দী করে । আমি মরে গেলে ফেলে দিস জঞ্জালের গাদায়" প্যাটিপিসি বললে । আলোচনায় ছেদ পড়ল; মা এসে ডাক দিলেন "কৈ রে তোরা ? নে এবার, সব চোদ্দপ্রদীপ জ্বালার তোড়জোড় কর ! সন্ধ্যের ঝুলেই সরাবাড়ি আলো দিতে হবে যে"
পরমা সলতে পাকাতে বসল, চোদ্দপিদিম দিল, বারান্দায় মোমবাতি দিয়ে সাজাল । কিন্তু মনে একটা খচখচ করা অনুভূতি তার...কি জানতে চাইবে সে, কি দেখবে সে ...কি গল্প শোনাবে ঐ আর্শি তাকে !
সবশেষে চিলেকোঠার দোরগোড়ায় প্রদীপ দিতে দৌড়ে এল পরমা সেখানে । ভূত চতুর্দশীর রাত । নিশুতি অন্ধকার নয় তবে আজ বেশ ছমছমে লাগছে পরমার । একে একে বাক্সখুলে একখানা করে আর্শির ভাঙা টুকরো বের করতে লাগল তিন দশকের পুরোণো কাগজের মোড়ক থেকে । সাহস করে একটা বড় ভাঙা টুকরোর ওপর ধরল সেই পিদিমের আলো আর দেখতে লাগল কতকিছু । চমকে উঠল কিন্তু ভয় পেল না । আজ তাকে জানতেই হবে কত না জানা তথ্য হয়ত উঠে আসতে পারে আয়নার মধ্যিখানে !পরমার নিজের মুখ আর তার পেছনে একজন বয়স্ক মানুষ, সৌম্য-সুদর্শন চেহারা, আবছা অবয়ব কিন্তু মুখটা পরিষ্কার দেখছে পরমা আর তার কথাগুলিও শুনছে স্পষ্ট...একি? এনাকে তো পরমা বিলক্ষণ চেনে । ইনি তো সেনকাকু । বাবার বন্ধু মিষ্টার সেন । তার মাথায় হাত ছুঁইয়ে বলছেন"এতদিনে এভাবে তোকে যে কতগুলো দরকারী কথা বলতে হবে তা ভাবিনি আমি । । বড় সাধ হয়েছিল তোকে দেখার । আজ দেখা হয়ে গেল । তুই যাকে বাবা বলিস সে তোর আসল বাবা নয় । আমিই তোর আসল বাবা । আমি তোর মাকে বড্ড ভালোবেসেছিলাম রে ! ভুল করেছিলাম হয়ত । হয়ত বা করিনি । আমাকে ভুলে যাস তোরা ।
"না, না, না,” পরমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল আর শুনতে পারলনা সে ।এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে সে । আগামীকাল দীপাণ্বিতা পুজোতেও তো প্রতিবারের মত আসার কথা সেনকাকুর । একমূহুর্ত্ত অপেক্ষা না করে সবকটা ভাঙা আয়নার টুকরো সে ছাদের ওপর থেকে বাড়ির পেছনের একটা পানা পুকুরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল এক এক করে । ভাঙা কাঁচের টুকরো ফালা হয়ে কেটে গেল হাত ভেসে গেল হাত সেই রক্তে, চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়তে লাগল সালোয়ারের কুর্তায় । ভূত-চতুর্দশীর আসন্ন অমাবস্যার অন্ধকারে ছেয়ে গেল তার মনের ভেতর ।কাল অলক্ষী বিদায়ের আগেই বাড়ির পুরোণো অলক্ষীর বিদায় হয়ে গেল তখুনি সেই ভূত চতুর্দশীর রাতেই |
 

৮ আগ, ২০১১

আজ ৭০তম ২২শে শ্রাবণ !


মেঘের কোলে রোদ হেসেছিল সেদিন, বৃষ্টি ছুটি নিল।
নাচের তালে তালে আমার শৈশব রঙীন তখন ।
রোদনভরা বসন্ত এসেছিল যেদিন, শীতের ছুটি হয়ে ।
তুমি দিলে গানের ইস্কুল, আমার মেয়েবেলা যখন ।
ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে, আমার যৌবন উপবন সবুজ হয়েছিল ।
আমি তারেই খুঁজে বেড়াই তখন ।
এমনি করেই কেটে গেছে বিরহের বেলা ।
তাকিয়ে দেখি পশ্চিম আকাশে অস্তরাগের বিপুল তরঙ্গ ।

৪ আগ, ২০১১

চল্‌ যাই


চল্‌ মুন বেড়াতে যাবি
বৃষ্টির সাথে বসেআঁকোতে?
বৃষ্টি ফোঁটার  ছবি আঁকার খেলাঘরে
বর্ষার জলে তুলি ডুবিয়ে মেঘ দুপুরে 
সাতরঙা আলপনার আকাশে

 চল্‌ মুন বেড়াতে যাবি 
প্যাষ্টেলের শেডে? 
কিম্বা অয়েল অন ক্যানভাসে,
চারকোলে কিম্বা কাদাজলে
একাডেমীতে, কেমোল্ড বা চিত্রকূটে

চল্‌ মুন ভিজতে যাবি
ভিক্টোরিয়ায় বা লেকের মাঠে?
ভরদুপুরে গড়িয়াহাটে  
কচুরিপানায়, তেঁতুলগোলায় 
সোঁদামাটির কদমতলায়, কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি ঝরায়  
যেখানে  বৃষ্টি আঁকছে একমনে, বসেআঁকোতে ..

২১ জুল, ২০১১

হালফিল



ব্রিগেডে ২১শে জুলাইয়ের শহীদ তর্পণ হল মহা সমারোহে । একই মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয় উত্সব পালন হল । দিনটা ছিল শ্রাবণের কোলকাতার ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের একটা বৃষ্টিদিন । তবুও ব্রিগেড ভেঙে পড়েছিল জনজোয়ারে । আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা বৃষ্টি উপেক্ষা করে পৌঁছে গেছিলেন সেই সমাবেশে । সমাজের সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন । রাজ্যসভার এমপি থেকে বিধানসভার এমএলএ , চিত্রশিল্পী থেকে সঙ্গীতশিল্পী, সিনেমার কলাকুশলী থেকে কবি এবং সাহিত্যিক সকলেই হাজির হয়েছিলেন । সাড়া দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর ডাকে । নচি থেকে কচি, দেব থেকে দেবী কেউ বাদ ছিলেন না । দশভুজা দিদির মাহাত্ম্যকীর্ত্তনে সকলের হৃদয়ের অলিন্দ-নিলয়ে বিগলিত প্রবাহ চলছিল । কেউ দিদি, কেউ বেটি, কেউ রাণী সম্ভাষণে দিদির গুণগান করলেন । ব্রিগেড এ যাবতকাল এমনটি দেখতে অভ্যস্ত নয়; সেদিন যেন দিদি এবং তাঁর ব্যাটেলিয়নকে যারপরনাই ব্যাতিবস্ত করবার জন্যই শ্রাবণের আকাশ বামেদের আদেশ অমান্য করেনি । দু হাত ভরে ঝরো ঝরো বর্ষেছে তার অকৃপণ বর্ষণ । কিন্তু অতিরিক্ত বর্ষণে দূর্বাদলরাজি সবুজ থেকে সবুজতর হয়ে উঠেছে প্রাণের স্পন্দনে । ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাইয়ের শহীদরক্ত বৃষ্টি দিয়ে ধুইয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে দেবশ্রী ফুলে ফুলে ঢলে পড়েছেন তাঁর নৃত্যশৈলীতে । শতাব্দী মাদলের তালে তালে ধিতাং ধিতাং বোল দিয়েছেন পায়ে । নচিকেতা গাইলেন পৃথিবী শান্ত হবার গান । দিদির আদেশে সমবেত স্বরে শান্তি ফিরিয়ে দেবার অঙ্গীকার নিয়েছে সকলে । শান্তনু আনন্দের বাঁধ ভেঙে গাইলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত । অনুপ ঘোষাল উদত্তকন্ঠে "দিনের আলোয় কাটে অন্ধকার"। চিরঞ্জিত "মাঝেমাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও' যেন দিদির ছোঁয়ায় তাঁর এই আজ্ঞাবহেরা রাতারাতি ম্যাজিক দেখাবেন বলে প্রস্তুত । প্রবীণ শিল্পী বিশ্বজিত ছুটে এসে গাইলেন বাংলামায়ের কোলে ফেরার গান । তাপস পাল উজাড় করে দিলেন গুরুদক্ষিণা । প্রণাম জানালেন গুরুকে ।
মহাশ্বেতা দেবী লাখ কথার এক কথা কয়ে দিলেন । বাংলার মানুষরাই সোনার বাংলা গড়ার আসল রূপকার । তাই কেবল মনে হতে লাগল যাদের নিয়ে দিদির কাজ কারবার , যারা দিদিকে বাংলার মসনদে বসিয়ে দিয়েছে তাদেরই তো নতুন করে বাংলা গড়ার জন্য অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে । দিদিতো তাঁর দু মাসের কর্মসূচীতে পাহাড় থেকে জঙ্গল, কৃষিজমি থেকে যুগপত্ভাবে শিল্প ও ফসল ফলানোয় পক্ষপাতী কিন্তু দিদি কি পারবেন পশ্চিমবাংলার ওয়ার্ক কালচারের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে ? তবেই তো ভোল পালটাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং উন্নয়নের পরিকাঠামো । বাংলার রাজনীতি প্রেমী মানুষ দিদি দিদি করে পাগলু হল । বদলের দিনে পালাবদলের গান গাইল । দিদির জন্য যাত্রাপালার স্ক্রিপ্ট হল । এতসবের পরে আবার দীর্ঘ তিনদশক ধরে বাংলার মানুষ শুধু দিদির পুজো নিয়েই ব্যস্ত থাকবে না তো ? নয়ত আবার সরকারি হাসপাতালে বেঘোরে মরবে শিশু । রোগীর খাদ্য চেখে দেখবে পাড়ার টমি । গাঁয়ের প্রাথমিক স্কুলে শিশু রোজ যাবে আসবে কিন্তু নিজের নাম লিখতে বললে বানানে ভুল করবে । আবার জয়েন্টে ভালো rank করে বাংলার ছেলেগুলো শিবপুর না গিয়ে অন্য রাজ্যে পাড়ি দেবে । ঘর পোড়া গোরুর মত সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাই। তাই মনে মনে বলি " আবার আসিব ফিরে, ধান সিঁড়িটির তীরে , এই বাংলায় " যেদিন অন্যরাজ্যের মত উন্নয়নে বাংলায় বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবে পাঁচটা ব্লু চিপ কোম্পানি । চন্ডীদাসের সেই কথা "সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই " মাথায় রেখে দিদি এগিয়ে চলুন তাতে ক্ষতি নেই । কিন্তু আবার সেই ভোটের রাজনীতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে না তো !!!

১৭ জুল, ২০১১

কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভি, কন্ট্রোল এক্স



প্রথমে অর্কূটে, তারপর ফেসবুকে, আর সবশেষে বিবাহ ডট কমের সূত্র ধরে তিথির সাথে আলাপ, রাজের দিদি রাণীর ।
ফলে বছর দুয়েকের ডিজিটাল ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তিথির সঙ্গে রাণীর । কারণ একটাই ; একমাত্র ভাই রাজের জন্য উপযুক্ত পাত্রী বলে মনে হয়েছিল তিথিকে। আজকাল যে হারে ডিভোর্সের ঘটনা কাগজে কলমে পড়ছে রাণী, তার চেয়ে বাবা কয়েকবছর ধরে বাজিয়ে নিয়ে তারপর না হয় বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া যাবে। সেইমত দুবছরের ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতার পর ঠিক হল উভয় পক্ষের পরিবারের সাথে ভেট হওয়ার প্রয়োজন; কারণ পাত্র রাজ তখন বিদেশে পাঠরত। ছবি ও ইমেলের বিনিময়ে তিথিকেও পছন্দ করল রাজ এবং তিথিও রাজকে ।
আরো একটা বছর রাজ আসতে বাকী |তাই রাণীর মধ্যস্থতায় দুইবাড়ির মধ্যেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠল। যাওয়াআসা, খাওয়াদাওয়া সবকিছু সামাজিকতার সাথে তিনজনের স্ক্র্যাপ আর ফেসবুক মেসেজরা বেঁচে র‌ইল সুখেদুখে, হাসিকান্নায়, ছন্দে গানে। আর দোল-দুর্গোত্‌সব, জন্মদিন, ক্রিসমাসের রামধনুতে রেঙে উঠল রাজ, তিথি আর রাণীর মেলবক্স। আর তাছাড়াও আছে ফোন আর এসেমেস । তিথি আর রাজের প্রেমপর্বের অনুঘটক হিসেবে রাণীও রয়ে গেল জি-টকের ছোট্ট কুঁড়েতে...
হঠাত অনুষ্টুপ-গায়ত্রী ছন্দের বিদায় ! হল অপ-ছন্দের আবির্ভাব।

অনেক দিন রাণী আর রাজকে তিথি না করে স্ক্র্যাপ, না পাঠায় কোনো ইমেল....না কোনো এসেমেস না মেসেজ । ফেসবুকেও কখনো সবুজ আলো জ্বলেনা তার ছবিঘরে... সোশ্যালনেটে তাদের কমন বন্ধুদেরো এই বিয়ে থা নিয়ে কিছু জানায়নি ওরা । অতএব ওদের জিগেস করে লাভ হবেনা ।

তিথির বাড়ির ফোন বলে "মজুত নেহি হ্যায়" আর মোবাইল বলে "সুইচড্‌-অফ্‌"। অগত্যা রাণী একদিন তিথির বাড়ি গেল । সেখানে গিয়ে সে তো স্তম্ভিত! বাড়িটাই নেই ।
ভাঙা হয়েছে । নতুন ঘটনা নয়; যে হারে দেশে প্রোমোটার রাজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তাতে বিচিত্র কিছু নয় । কিন্তু রাণীর খুব আশ্চর্য লাগল যে এসব তো তিথি কিছুই জানায়নি তাদের । এখন কি করবে রাণী? রাজের ফাইনাল ডিসার্টেশন, পিএইচডি সাবমিশন কয়েকদিনের মধ্যেই । প্রচন্ড কাজের চাপ, থিসিস সাবমিট করার সময় নাকি এমনই হয় সকলের ।তাকে জানালে সে তো যারপরনাই মর্মাহত হবে । বাড়ি ফিরে মাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে সব জানাল।
আর রাজকে বলল তিথির কি একটা গানের রেকর্ডিং আছে, তাই সে দিন কয়েক ব্যস্ত আছে আর তার মোবাইলটা হারিয়ে ফেলেছে, পরে নতুন নাম্বার পাঠাবে। নেট-কানেকশনও খারাপ তাই স্ক্র্যাপ্, ইমেল, চ্যাট, মেসেজ কোনোটাই কিছুদিন সম্ভব নয় তিথির পক্ষে, এসব যেন তিথি নিজেই জানিয়েছে রাণীকে ।
এদিকে রাজ তো ব্যস্ত তার পড়াশুনো নিয়ে আর রাণী শুধু উলটে পালটে দেখে নীল বালুচরীটা যেটা তিথির জন্য কিনেছিল সে বিষ্ণুপুর থেকে, দুধে-আলতা কাঁথাস্টীচের সালোয়ার-কামিজের পিস, পৌষমেলার ডোকরার দুল, টেরাকোটার পেন্ডেন্ট ...ভেবেছিল খুব মানাবে তিথিকে ।
তিথি বলেছিল রাজের জন্য সে একটা পাঞ্জাবীতে ফেব্রিক করবে ... ফোকের মোটিফ ; আর তাদের তো আর কদিনের মধ্যেই বিয়ে, তাই ফুলশয্যার বেডকভারে সে ফোঁড় তুলছে... যামিনীরায়কে নিয়ে। মেহেদী হাসানের গজল, শিবকুমার শর্মা, আর ওদিকে নাসিরুদ্দীন শাহ্‌-শাবানা আজমী, হেমন্ত-মান্নার চির কোঁদল, রবীন্দ্রসঙ্গীত বনাম বাংলাব্যান্ড, চাইনিজ না কন্টিনেন্টাল এই নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গ্রুপচ্যাটে তর্কের তুফান তুলতো তারা তিনটি মিলে । রাণীর খুব মনে ধরে ছিল, অন্তত: তিথি আর রাজের ওয়েভ-লেন্থটা তো ম্যাচ করেছে !তিন জনেরই প্রিয় খাবার লুচি আর আলুভাজা আর সাথে মচমচে করে ভাজা শুকনো লঙ্কা ।
বেশ তো চলছিল সব | হঠাত একটা দমকা বাতাস এসে সব যেন উল্টেপাল্টে দিয়ে গেল রাণীকে ।
মনে মনে রাণী ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল ।
কিন্তু কোনো সত্য উদ্ঘাটন করতে পারলো না । হাঠত একদিন গুগল সার্চে গিয়ে রাণীর কি যেন মনে হল সার্চ করল তিথির নাম, পদবী দিয়ে... দেখে পার্সোনাল ব্লগ বেরিয়ে এল যা
তিথি নামের একটি মেয়ের...হতেই পারে, তিথি নামতো কত মেয়েরই হয় ! কিন্তু এতো অস্ট্রেলিয়ার ঠিকানা, আর ফ্যামিলি এলবাম প্রথম পাতায় ... ক্লিক করল রাণী, বিয়ের রেজিস্ট্রেশানের ছবি, ...এই তো নীল বালুচরী পরে তিথি..আর রেজিস্ট্রি বিয়ের তারিখটি হল আজ থেকে বছর খানেক আগে ।
রাগে, অভিমানে, লজ্জায় ফেটে পড়ল রাণী।
তারপরেই কম্পোজ মেল "ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো"
অর্কুটে স্ক্র্যাপ "কনগ্র্যাচুলেশনস এবং সেলিব্রেশনস"
আর ব্লগের রেজিস্ট্রি বিয়ের ছবিটা, রাইটক্লিক...সেভ এজ...
...

অনেক বছর কেটে গেছে , তিথি, রাজ আর রাণী নিজের নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত । সকলেই এখন থাকে কলকাতায় । রাণীর বিয়ে হয়ে গেছে এক ডাক্তারের সাথে । নিজস্ব ফ্ল্যাট । একটি ফুটফুটে মেয়ে তার । তিথি একটি হায়ার সেকেন্ডারি প্রাইভেট স্কুলের টিচার |তার স্বামী কর্পোরেট সেক্টারে উঁচু
পোষ্টে কাজ করে । প্রায়শ‌ই খবরের কাগজ ও টেলিভিশনে নাম শোনা যায় তার । প্রচুর ফরেন ট্যুর করেন তিনি । তার পেছনে মিডিয়া ছোঁক ছোঁক করে তার ইন্টারভিউ নেবার জন্য । সুপুরুষ, সুবক্তা আর প্রচুর কানেক্সান তার । তিথির নিজের কেরিয়ারের পেছনে দৌড়তে গিয়ে
পিএইচডি, বিএড এই সবে সময় চলে গেছে । ছেলেপুলে হবার ব্যাপারে আদৌ সে কোনো মাথা ঘামায়নি । যার পরিণতি স্বরূপ কোলকাতার নামজাদা ডাক্তার বাবুরা, কনসালট্যেন্ট গায়নোকোলজিস্টরাও হার মেনেছে তার সন্তান সম্ভাবনায় । দুজনেরই নাকি কিছু জটিলতা আছে । একে তো বয়স হয়ে গেছে তিথির, তা প্রায় তেত্রিশের কাছে আর তার স্বামীর অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন .. সিগারেট ও বিলিতি লিকারের প্রভাবে | এ ডাক্তার সে ডাক্তার ঘুরে অবশেষে তিথি আর তার স্বামি রণ এসে পৌঁছায় কোলকাতারই আর এক খ্যাতনামা ফার্টিলিটি ক্লিনিকে । সেখানে ডক্টর শ্রীরূপ রয়ের সাথে এপয়েন্টমেন্ট তাদের । ঘরে ঢুকে ডাক্তার বাবুর টেবিলে তিথির চোখে পড়ল রাণীর ছবি ; ডাক্তার বাবু রাণি আর তাদের ফুটফুটে মেয়ে রাধার বাঁধানো ছবি । ডক্টর শ্রীরূপ রয় রাণির হাসব্যান্ড ; সৌম্য, সুদর্শন, স্বল্পভাষী সার্জেন । প্রকৃতির এমনই খেয়াল যে পাকেচক্রে তিথিকে আবার সেই রাজের দিদি রাণীর স্বামীর কাছেই আসতে হয়েছে । আর এই কথাটা ভেবেই তিথির হাত-পা যেন অবশ হয়ে গেল । আর আজ এমন এক পরিস্থিতি সেখান থেকে পালাবার পথ নেই । টেস্ট শুরু হল, হল অনেক কথাবার্তা । ফাইনালি যা বোঝা গেল তা হল রণর যা স্পার্মকাউন্ট তাতে এই বয়সে তিথি কোনোদিন মা হতে পারবে না । যদি ডোনার কেউ হন তাহলে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন ট্রাই নিয়ে দেখা যেতে পারে । যদিও তা ব্যয়বহুল কিন্তু এই মূহুর্তে তিথি আর রণ সে ব্যাপারে দ্বিমত নয় । অঢেল টাকা রণর আছে । এটা তো জীবনমরণ সমস্যা ।
যদি সত্যি তিথি মা হতে পারে রণর চেয়ে আর কেই বা খুশী হতে পারে!
এবার ফরমালিটির পালা; কাগজ কলম, কন্ট্র্যাক্ট, স‌ইসাবুদ ইত্যাদি । রণ আর তিথির প্রশ্ন একটাই স্পার্মডোনার যেন ভাল পেডিগ্রির হয় । নিম্ন মধ্যবিত্ত বেকার যুবক আজকাল এই ডোনেশানে মোটা অঙ্কের টাকা পায় আর তাতো কিছু অসম্মানেরও নয় বরং কোনো কাজে লেগে যদি সত উপায়ে রোজগার করা যায় তাতে তো ক্ষতি নেই কিন্তু ভাল ফ্যামিলির শিক্ষিত কোনো চাকুরে ব্যক্তি কে এ ব্যাপারে রাজী করানো তো মুশকিল; ডাক্তারবাবুর হঠাত মনে পড়ে গেল তার শ্যালক রাজের কথা । রাজ এখনও অবিবাহিত । একটি সরকারি কলেজে সিনিয়র প্রফেসর । বিয়ে করেনি রাজ । মানে হয়ে ওঠেনি । তিথির কাছ থেকে সেই আঘাত সে কখনো ভোলেনি । আর তাই বোধ হয় "বিয়ে" নামক এই সামাজিক প্রহসনকে সে ঘেন্না করতে শুরু করেছে । সেই ঘটনার পর থেকে বিয়ের কথা উঠলেই রাজ এড়িয়ে চলে দিদি আর জামাই বাবুকে । আর মা-বাবা মারা গেছেন অনেকদিন, তাই সেই অর্থে কেউ এর চেয়ে বেশি জোরাজোরি করেওনি তার বিয়ের ব্যাপারে । রাজ দিব্য আছে তার অধ্যাপনা, রিসার্চ আর কলেজ স্টুডেন্ট, সেমিনার, সিম্পোশিয়াম আর মাঝেমধ্যে ছোটখাট বিদেশ ট্যুর নিয়ে । সেই ঘটনার পর থেকে তিথির সাথে কোনো যোগাযোগও রাখেনি সে এমন কি মন থেকেই কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভি, কন্ট্রোল এক্স...ভুলে গেছে জীবনের মত সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিদায় জানিয়েছে অর্কুট-ফেসবুককে চিরদিনের মত |
ফোন ঘোরালেন ডক্টর শ্রীরূপ রায় , রাজের জামাইবাবু ।
"আসতে হবে আমার ক্লিনিকে এখুনি , পারবে ? না ক্লাস আছে ?" শ্রীরূপদা রাজের ফ্রেন্ড-ফিলোজফার-গাইড ।
আর কেনই বা তা হবে না একমাত্র দিদির বর, বাবা মায়ের অবর্তমানে এরাই তো তার অভিভাবক, শুভাকাঙ্খী আর আত্মীয় ।
রাজ বলল "না, না ক্লাস তো এখুনি শেষ হল"
প্রায়ই ডাকেন এই ভাবে শ্রীরূপ তাকে; রাণীকে আসতে বলে, বিকেলে ক্লাবে টাবে গিয়ে তারা একসাথে চা-টা খায় । এমএসসি স্টুডেন্টদের প্র্যাকটিকাল ক্লাস জুনিয়র এক রিসার্চ স্কলারকে বুঝিয়ে দিয়ে রাজ বিরিয়ে এল সায়েন্সকলেজ থেকে | রাজ বলল "আসছি শ্রীরূপদা আধঘন্টার মধ্যে" গাড়ি করে রাস্তায় অনবরত ট্র্যাফিক সিগন্যাল আর ওয়ান ওয়ের চক্কোরে পড়ে ও রাজাবাজার সায়েন্সকলেজ থেকে মিন্টোপার্কে আধ ঘন্টার মধ্যে সে পৌঁছে গেল ডক্টর রায়ের ফার্টিলিটি ক্লিনিক । চেম্বারে ঢুকে স্তম্ভিত ।
একি তিথি না ? এক ঝলক তাকে দেখে নিয়েই জামাইবাবুর পার্সোনাল ঘরে ঢুকে গেল রাজ । সে তো ডাক্তার বাবুর পেশেন্ট নয় আত্মীয় । তাতে আবার একমাত্র শ্যালক । কিন্তু মনের ভেতর তিথি-প্রসঙ্গ তাকে খালি বিরক্ত করতে লাগল । কি ভারীক্কি চেহারা হয়ে গেছে তিথির । আগের সেই লালিত্য আজ অনুপস্থিত তার চেহারায় । তার দিদি রাণী তো মাত্র পাঁচ ছ' বছরের বড় তিথির চেয়ে, কিন্তু সে তো এমন বুড়িয়ে যায়নি । বরং মা হবার পর দিদির আরো রূপ হয়েছে, অনেকটা তাদের মায়ের মত দেখায় দিদিকে । মা এত সুন্দরী ছিলেন যেন বয়স মোটে বোঝা যেতে না মায়ের ।
তিথি আর তার স্বামী রণ সেই মূহুর্তে রাজের কৃপাপ্রার্থী । যেন রাজ অমত না করে , ডোনার হয়ে এ জন্মের মত তিথিকে মা হাওয়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত না করে । রাজ তো কিছুই জানেনা সেই মূহুর্তে ... আলাদা ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে জামাইবাবু শ্রীরূপদা তিথির সন্তানের ভ্রূণের জন্য স্পার্ম ডোনার হবার রিকোয়েস্ট করল ।
তার শ্রীরূপদার সাথে কথা বলে রাজ সেই ঘরের সংলগ্ন দরজা দিয়ে বেরিয়ে গাড়িতে ষ্টার্ট দিল । তখন গাড়ির রেডিও তে কোন একটা এফ এম চ্যানেলে বাজছে রাজের ফেভারিটা বাংলা ব্যান্ড ফসিলস এর গান "আমি কিছুতেই ভাববনা তোমার কথা বোবা টেলিফোনের পাশে বসে ... এই একলা ঘর আমার দেশ, আমার একলা থাকার অভ্যেস.... আর জ্যামে আটকে থাকা গাড়িটায় বসে বসে মনে হল দিদিকে একটা ফোন করি ।
তারপর দিদিকে বলল "বড্ড খিদে পেয়েছে রে, কিছু বানিয়ে রাখ দিদি, আজ তোর সাথে বসে চা খাব" রাণি বললে "কি খাবি বল চাইনিজ না কন্টি? তাহলে ক্লাবে ফোন করে দি, তোর শ্রীরূপদা আসার সময় নিয়ে আসবে"
রাজ বললে "না রে, আজ শুধু তোর হাতে বানানো লুচি আর আলুভাজা খাব, আর সাথে মচমচে করে ভাজা শুকনো লঙ্কা "
তিথির ততক্ষণে প্যালপিটেশন মাত্রা ছাড়িয়েছে । ক্লিনিকের এসিঘরের মধ্যে বসেও ঘামছে সে দরদর করে আর কিসের জন্যে যেন তার মনের চোখদুটি বেয়ে বয়ে চলেছে অবিরাম ধারা বর্ষণ ।

দিদির বাড়ি পৌঁছেই দিদির স্টাডিরুমে গিয়ে রাজ ল্যাপটপ অন করে দিল আর দিদি গেল লুচি ভাজতে । ট্যুইটারে, ফেসবুকে আর অর্কুটে রাজ সেদিনের স্টেটাস আপডেট করতে লাগল । 
কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভি.....কন্ট্রোল সি, কন্ট্রোল ভি, কন্ট্রোল এক্স.... 


  banglalive.com এর  বিশেষ সংখ্যা "২৫শে বৈশাখ , আজ মম জন্মদিনে" ২০১১ তে প্রকাশিত   

use Internet Explorer -9  to view Bangla Font in Banglalive. 

১ জুল, ২০১১

রঞ্জনা আমি আর আসব না - একটি রিভিউ

আর সরকার প্রযোজিত এবং অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ” রঞ্জনা আমি আর আসব না ” ছবিটি একটি মিউজিকাল বা গীতিনাট্যের মত । স্টোরি লাইনটিও নিঁখুত আর নীল দত্তের পরিচালনায় এই সিনেমার গান আবার বহুদিন মনে রাখবে আশির দশকের সুরস্রষ্টা এবং গীতিকার অঞ্জন দত্তকে । ছবির দুটো ঝাঁ চকচকে  দিক রয়েছে ; এক হল কলাকুশলীদের অভিনয় আর দুই হল নতুন শিল্পী সোমলতা আচার্যর রক সঙ্গীতে সাবলীলতা ।  উপরি পাওনা অতিথি শিল্পী মমতাশংকর এবং কবীর সুমনের উপস্থিতি । রঞ্জনার ভূমিকায় পার্ণো মিত্র তার অভিনয়ে, চালচলনে, এবং সর্বোপরি রকষ্টার রূপে নিজেকে মঞ্চে ঠিকঠাক চেহারার সাথে সাযুজ্য রেখে উপস্থাপন করেছে এবং আগামীদিনে বড় পর্দায়  পার্ণো  যে জ্বলজ্বল করবেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই । ২০০৮ এ মুক্তি পেয়েছিল হিন্দী   মিউজিকাল ছবি রক-অন । কিন্তু তা বোধ হয় অনেক কাঁচা হাতের কাজ বলে মনে হয় । RAAAN দেখে মনে হল শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সাফল্যের নিরিখেই ছবিটি বানাননি অঞ্জন দত্ত । ছবি বানানো তাঁর নেশা এবং সেখানে তাঁর বানানো সঙ্গীতকে ঠিকমত শ্রোতার কানে পৌঁছে দেবার জন্যই এই ক্রিয়েটিভ মানুষটি চেষ্টা করে চলেছেন । বেছে নিয়েছেন উপযুক্ত কলাকুশলীদের এবং সঙ্গীত শিল্পী সোমলতাকে যারা এই ছবিটির জন্য তাদের কেরিয়ারে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়তে পারবে ।

সিনেমাটি শুরু হয় অঞ্জন দত্তের অসাধারণ গায়কীতে মেইন টাইটেল ট্র্যাকটি ” রঞ্জনা আমি আর আসব না ” দিয়ে আর শেষ হয় সোমলতার প্রাণ  উজাড় করে গাওয়া “তুমি আসবে বলে তাই ” গানটি দিয়ে । এই দুটি গানের জন্যই দর্শক ছুটে যাবে  সিনেমা হলে …এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ।  তবে রক সঙ্গীত বলতে আক্ষরিক অর্থে আমরা যা বুঝি তা “গানস এন্ড রোসেস”, “মেটালিকা”  কিম্বা “ডেথ মেটাল”  ব্যান্ডের মত হার্ড রক নয় । বাংলাভাষার ওপর পক্ষপাতিত্ব না করেই বলছি, অঞ্জন দত্ত এবং নীল দত্ত যে বাংলা রক সঙ্গীত যা সৃষ্টি করেছেন তা অনেক শ্রুতিমধুর এবং সংবেদনশীল ।
ছবির মুখ্য চরিত্র অবনী সেন যিনি বিগত ২৫ বছর ধরে দাপিয়ে মঞ্চে গেয়ে বেড়ান,  দস্তুর মত নিজে গান লেখেন এবং সুর করেন ।  স্ট্যানলি ওরফে কবীর সুমন অবনীর মৃত পত্নীর দাদা । উঠে এসেছে সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে এবং গান বাজনার সান্নিধ্যে অঞ্জন্- কবীর সুমনের চিরাচরিত বন্ধুত্বের দাবী । অবনী বেপরোয়া, উত্শৃঙ্খল, মদ্যপ  এবং চেইন স্মোকার । ঠিক আর পাঁচটা ক্রিয়েটিভ রকষ্টারের মত । গান্, সুরা আর সিগারেট তার জীবন ঘিরে । আসন্নপ্রসবা স্ত্রীকে নার্সিংহোমে ভর্ত্তি করতে গেছিল মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে । যার ফল স্বরূপ মর্মান্তিক   দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল স্ত্রী সহ শিশুটিকে । সেই থেকে অবনী নিজের চরিত্রকে সংশোধন করতে তো পারেননিই বরং তার হাতেই স্ত্রীর মৃত্যু বলে  স্ত্রীর শোকে হয়ে উঠেছেন আরো লম্পট এবং বেপরোয়া গোছের ।  এরমধ্যে কনসার্টে গিয়ে উদ্বোধন সঙ্গীত শিল্পী রঞ্জনার সাথে যেচে আলাপ করেন । তাকে রেকর্ডিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে, বাড়িতে থাকতে দিয়ে  ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন যে তার সাথে গান নিয়ে কাজ করতে হলে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক জীবন যাপন করতে হবে একটি হল যখনতখন তিনি মেয়েটিকে ভোগ করতে পারেন এবং অন্যটি গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্টেশন । এদিকে রঞ্জনার এক মাসী ছাড়া আর কেউ নেই এবং নিজে গান লিখে বড় হবার আশা সে না করলেও অবনী তা প্রমাণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । কিন্তু অবনীর পার্সোনাল ইগো এবং নতুন শিল্পীর গানের লিরিককে ছোট করে দেখা,  আর সর্বোপরি তার মনের কোণের প্রচ্ছন্ন বেদনা তার স্ত্রীকে হারানো এর টানাপোড়েনে মানুষটি ক্রমশ ক্ষিপ্র থেকে ক্ষিপ্রতম হয়ে ওঠে । যার স্বীকার হয় বাড়ির সার্ভেন্ট এলভিস ওরফে কাঞ্চন মল্লিক এবং নবাগতা রঞ্জনা ওরফে পার্ণো ।  প্রত্যহ আকন্ঠ মদ্যপান এবং তার সাথে ড্রাগস এর হাতে চলে যাওয়া অবনী সেন মানুষটির হঠাত হঠাত সংজ্ঞা হারানো এবং বাড়িতে আর কেউ না থাকায় রঞ্জনাও একসময়ে অবনীর প্রতি দয়াশীল হয়ে ওঠে । অবনী সে কথা বুঝতেও পারে আর মেয়েটিকে অযথা শারীরিক প্রলোভন দেখানোও বন্ধ করে । বরং তার লেখা গানের লিরিককে আরো উন্নত মানের করে তাতে সুর বসিয়ে কেমন করে ভালো করে গাওয়ানো যায় সেই কথাই অবনীর একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হয়ে ওঠে । এই প্রসঙ্গে বলি  “আমি বৃষ্টি দেখেছি” গানটিও বড্ড মিষ্টি লাগল শুনতে ।
অবনীর রকব্যান্ডের অনুষঙ্গ শিল্পীমন্ডলীর ভূমিকায় নন্দন বাগচী, প্রখ্যাত গিটারিস্ট অমিত দত্ত এবং লিউ হিল্ট ..এদের সকলের সাথেই রঞ্জনার গড়ে ওঠে একটা ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক । রঞ্জনা এবং তার গান তরতরিয়ে উঠে চলে অবনীর হাত ধরে । পার্কস্ট্রীটে একটি নাইটক্লাবে অবনী নিয়ে গেল রঞ্জনাকে । পারফর্মেন্স হল কিন্তু দর্শক-শ্রোতার হাততালি কুড়োতে পারলনা সে ।  কিন্তু অবনী তাকে দমিয়ে দিল না । কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে গানকে কেমন করে গান করে তুলতে হবে কেমন করে মানুষের মনে ছাপ ফেলতে হবে এই সব খুঁটিনাটি শিক্ষায় রঞ্জনার হাতেখড়ি শুরু হল । রেকর্ড কোম্পানীর সি.ই.ও মিঃ বক্সী ( আবীর চ্যাটার্জি) একটি মাত্র গানের সিঙ্গল এলবাম ও প্রযোজনা করেন রঞ্জনার মত অনাম্নী নবাগতা রকস্টারের জন্য । স্টার আনন্দ চ্যানেলের দীপাণ্বিতা অবনীর অনুরোধে এবং কাকুতিমিনতিতে সেই এলবামের প্রোমোশানের ব্যবস্থাও করে দেয় শুধু অবনী সেনের একনিষ্ঠ ফ্যান বলে । এইভাবে অবনী সেন নামক নামী রকষ্টারের ছত্রছায়ায় বাড়তে থাকে রঞ্জনা নামে উদীয়মান রকশিল্পী । কিন্তু একএকসময় সহ্যাতীত হয়ে ওঠে মদ্যপ অবনীর স্বেচ্ছাচারিতা । রঞ্জনা আশ্রয় নেয় একটি মেটাল ব্যান্ডে এবং মনস্থ করে সেখানেই গান  গাইবে । অবনীর লোকজন একটি মারপিটের মাধ্যমে ধরে আনে রঞ্জনাকে । এই মারপিঠটি বড্ড অহেতুক ও হাস্যকর লেগেছে ।
অবনী রকষ্টার হয়েও তার রবীন্দ্র প্রীতি থেকে সরে আসেন নি । সোমলতার কন্ঠে ” জাগরণে যায় বিভাবরী” গানটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে । মেটাল ব্যান্ডের ভোকালিষ্ট সানিকে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে বলে তিনি প্রমাণ করলেন যে রবীন্দ্র সঙ্গীতে হাতেখড়ি না হলে বাঙালীর সঙ্গীতসাধনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় ।
অবনীর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করেছে আরো দ্রুত । ইতিমধ্যে ডাক্তারের কাছ থেকে একঘন্টার জন্য ছুটি নিয়ে বন্ধু কবীর সুমনের সাথে দেখা করতে গিয়ে তাকে না দেখতে পাবার শকটি হজম করতে পারল না অবনী । সবশেষে এক কনসার্টে নাম দেবার পরও যেতে পারলনা অবনী । তখন তার শেষ সময় । রঞ্জনা সেই কনসার্টে ” তুমি আসবে বলে তাই ” গেয়ে মাত করছে । অবনীর শেষ নিঃশ্বাস পড়ল চিরকালের মত । রঞ্জনার দুচোখে তখন অন্তঃসলিলা ফল্গু নদীর ধারা । আজ যার জন্য সে এত বড় হয়ে উঠেছে সেই নামকরা অবনী সেন ততক্ষণে তাকে ছেড়ে বিদায় নিয়েছে ।
এইভাবে ছবির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একজন সঙ্গীত প্রেমীর সঙ্গীতশিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে অনেক টানাপোড়েনের গল্প থাকে , থাকে অনেক জীবনযুদ্ধের করুণ কাহিনী । দর্শকাসনে   বসে আমরা কেবল ঝকঝকে উপস্থাপনা দেখি, আলোর নীচে উদ্ভাসিতা শিল্পীটির আত্মপ্রকাশ আর নিজেকে ফুটিয়ে তোলার অদম্য চেষ্টা দেখি কিন্তু অনেককিছুই চাপা পড়ে যায় রূপোলী স্টেজ পারফর্মেন্সের ঝলকে যেগুলি সফল পরিচালক অঞ্জন দত্ত তুলে ধরেছেন “রঞ্জনা আমি আর আসবনা”য় । অন্যথায় একজন প্রথিতযশা শিল্পী কেমন করে উঠতি গায়িকাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেবার নাম করে কেমন করে তার সুযোগ নেন সেটিও চমতকার ভাবে ফুটে উঠেছে ।