১৫ মে, ২০২২

বাংলার লৌকিক দেবদেবী / গন্ধেশ্বরী

কলকাতায় গন্ধেশ্বরী পুজো / সূত্র ইন্টারনেট 

 বুদ্ধ পূর্ণিমা আসে যায়। কিন্তু এই দিনে গন্ধেশ্বরীর পুজো হয় তা জানতাম না। বাঁকুড়ায় 
গন্ধেশ্বরী নদী আছে জানতাম। সেখানে গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের খুব রমরমা। তাঁরা গন্ধদ্রব্যের ব্যাবসা করেন। কিন্তু বাকীটুকু মানে পুরাণকথা অজানা ছিল। ব্রতপিডিয়া-২ তে বাংলার লৌকিক দেব দেবী নিয়ে লিখতে গিয়ে জানলাম এতসব। 

গন্ধবণিক সম্প্রদায় গন্ধেশ্বরী পুজোর দিন তাঁদের হিসেব খাতা এবং ওজন পরিমাপের যন্ত্র দেবীর সামনে সাজিয়ে রাখেন।সারা বছরের বিভিন্ন সুগন্ধি প্রসাধনী, ধূপ, দেশবিদেশের মশলাপাতির কারবারে যাতে সমৃদ্ধি হয় । ধনপতি, শ্রীমন্ত, চাঁদসওদাগরের সময় থেকেই বাংলায় বাণিজ্যে খ্যাতি অর্জন করেছে এই গন্ধবণিক সম্প্রদায়। বৌদ্ধ ধার্মালম্বীরাও এই পুজো পালন করে থাকেন। বাংলাদেশের পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে, অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে গন্ধেশ্বরীরও একটি মূর্তি আছে। 


বেদব্যাস রচিত, মহানন্দীশ্বর পুরাণে গন্ধেশ্বরীর একটি আখ্যান আছে। 

গন্ধাসুর নামে এক দানব সমগ্র বণিককুলের ওপর যাকে বলে ক্ষেপে ব্যোম একেবারে। তার এমন বেনে-বিদ্বেষী হয়ে ওঠার মূলে তার বাবা সুভুতি। তাই সে প্রতিজ্ঞা করেছিল বেনে সম্প্রদায়ের শেষ রাখবেনা। প্রবল তপস্যায় শিবকে সন্তুষ্ট করে বর পেয়ে যারপরনাই বলবান হয়ে উঠল সে।

সুভুতি মোটেও সুবিধের ছিলনা। নিজের বউ থাকতেও সে বেনেবাড়ির মেয়ে সুরূপাকে হরণ করতে গেল কিন্তু ধরা পড়ে গিয়ে মারধর খেয়ে চূড়ান্ত বিড়ম্বনার স্বীকার হল। বাবার এই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই গন্ধাসুর উগ্রচণ্ডা।  

একদিন গন্ধাসুরের নির্দেশে তার সঙ্গোপাঙ্গরা সুবর্ণবট নামে এক গোবেচারা বেনেবাড়িতে হানা দিয়ে সুবর্ণকে তো হত্যা করলই, সেইসঙ্গে তার বউ চন্দ্রাবতীকেও হত্যার জন্য উদ্যত হল। তখন চন্দ্রাবতী পূর্ণগর্ভা। বেনেবংশ ধ্বংস হবে সেই আশায়। 

বাড়িতে অসুরদের হানায় চন্দ্রাবতী তার গর্ভস্থ সন্তানটিকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হল। সে খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে এক গহীন অরণ্যে গিয়ে প্রবেশ করল। ছুটছিল সেই আসন্নপ্রসবা গর্ভের সন্তান নিয়ে। 

অতঃপর তলপেটের অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বুনো ঘাসের ওপর শয্যা নিল। কিছুক্ষণ পর সেই অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তার একটি ফুটফুটে কন্যা জন্মাল। কিন্তু প্রসবের পরিশ্রমে চন্দ্রাবতীর মৃত্যু হল। 


ঋষি কশ্যপের তপোবন ছিল অনতিদূরেই।   

ধ্যানযোগে দেবী মহামায়ার আদেশ পেয়েছেন কশ্যপ। জানলেন, দেবী বসুন্ধরা সেই অরণ্যে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। জন্মলগ্নেই মাতৃহীনা পিতৃহীনা এই অভাগিনীকে আশ্রমে এনে কশ্যপ যেন নিজকন্যার মতো লালনপালন করেন, তেমনি আদেশ দেবীর। তপোবন ছেড়ে ঋষি জঙ্গলের মধ্যে গেলেন সেই সদ্যোজাতা কে আশ্রমে এনে প্রতিপালন করবেন বলে। 

তপোবন থেকে বেরোতেই আচমকা এক দিব্য সুগন্ধ ঋষিকে চরম আকৃষ্ট করল। সেই সুগন্ধ যেন সমগ্র অরণ্যকে আমোদিত করে রেখেছে। ঋষিকেও টেনে নিয়ে গেল সেই উৎসের দিকে। 


নাড়ী বন্ধন ছিন্ন অপূর্ব, নিষ্পাপ কন্যা তখন মৃত মায়ের পাশে খেলা করছে। মুগ্ধ কশ্যপ তাকে আদরে কোলে তুলে নিতেই কন্যার শরীর থেকেই যে সেই সুগন্ধ আসছিল, বুঝলেন!


আশ্রমিকরা চন্দ্রাবতীর সৎকার করল। কন্যাটি আশ্রমজীবন শুরু হল। সুগন্ধার দেহটি মন মাতানো গন্ধের আকর । তাই ঋষি তার নাম দিলেন গন্ধবতী। 

ঋষির বাৎসল্য ও শিক্ষাদীক্ষায় গন্ধবতী ধীরে ধীরে একদিন শৈশব পেরিয়ে যৌবনে পা দিল। রূপেগুণে, লাবণ্যে দশদিক আলো করল।

ঋষি তাকে জানালেন তার জন্মদাতা পিতা-মাতার মৃত্যুর নৃশংস কারণ। অসুরদের সেই নৃশংসতা জেনে গন্ধবতীর বুকেও ভয়ানক প্রতিশোধস্পৃহা জন্মালো। তপোবনের মধ্যে যজ্ঞাগ্নি জ্বেলে সে এক কঠোর তপস্যায় রত  হল।

ওদিকে গন্ধাসুরের অত্যাচারে বেনে সম্প্রদায় অতিষ্ঠ হয়ে প্রায় শেষ হতে বসেছে। তাদের ত্রাহি আর্তরবে দেবতাদের দোরে হত্যে দিয়ে নিত্যই চলছে উদ্ধারের উপায়। ঠিক তখনই গন্ধাসুরের কানে গেল অসামান্যা গন্ধবতীর অঙ্গসৌরভ ও অপরূপ সৌন্দর্যের কথা। 


সে তখন আকুল হয়ে গন্ধবতী কে খুঁজতে খুঁজতে ঋষি কশ্যপের আশ্রমে এসে দাঁড়ালো। 

ধ্যানমগ্ন গন্ধবতীকে নিজের চোখে দেখেই সে বাকরহিত। কিন্তু গন্ধবতীর ধ্যান ভাঙল না। 


অধৈর্য গন্ধাসুর বারবার ব্যর্থ হতেহতে তার ক্ষমতাপ্রদর্শনে ব্যস্ত হল। টেনে হিঁচড়ে তাকে নিয়ে যাবার জন্য তেড়ে গিয়ে গন্ধবতীর চুলের মুঠি ধরল বটে কিন্তু গন্ধবতীকে একচুল নড়াতে পারল না। গন্ধবতী তখনও অটল ধ্যানে। ধূমায়িত হয়ে উঠল তার যজ্ঞকুণ্ড। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সমস্ত চরাচর।তা দেখে ভয় পেল অসুরকুল। গন্ধবতীর কেশ ছেড়ে গন্ধাসুর হতচকিত হয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

তখন যজ্ঞকুণ্ডের ধোঁয়া ভেদ করে সিংহের পিঠে চড়ে এক জ্যোতির্ময়ী চতুর্ভুজা দেবীর আবির্ভাব হল। 


গন্ধবতীর ধ্যানভঙ্গ হল। সম্মুখে আবির্ভুতা দেবীকে সে প্রণাম করে বন্দনা করতেই দেবী তাকে অভয় দিয়ে ক্রুদ্ধনয়নে  তাকালেন গন্ধাসুরের দিকে। বিশালাকায় গন্ধাসুর প্রচণ্ড হুঙ্কারে দেবীকে আক্রমণ করল। শুরু হল ঘোরতর যুদ্ধ। ত্রিভুবন কেঁপে উঠল। অসুরেরা ভয়ে লুকিয়ে পড়ল। সমগ্র বণিক সম্প্রদায় গন্ধাসুরের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে করজোড়ে দেবীর নিকট প্রার্থনা জানালেন। 


তুমুল যুদ্ধের শেষে অপরাজেয় দেবীর ত্রিশূলে বিদ্ধ হয়ে অচিরেই দুরাচারী গন্ধাসুরের মৃত্যু হল। দিনটা ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা।  


গন্ধাসুরকে বধ করে জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কারণে আদ্যাশক্তি দুর্গার নতুন অবতার 'গন্ধেশ্বরী' খ্যাত হলেন বণিক সম্প্রদায়ের কাছে। 

দেবীর ইচ্ছায় সমুদ্রে পতিত গন্ধাসুরের বিশাল মৃতদেহ পরিণত হল একটি বিশাল দ্বীপে। যেখানে উদ্ভূত হল মশলা ও সুগন্ধদায়ী বৃক্ষ-লতা-বিটপী । দেবী সেই দ্বীপের নাম দিলেন, গন্ধদ্বীপ। বেনে-সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠীকে দেবী এই দ্বীপ থেকে গন্ধদ্রব্য আহরণ করে বাণিজ্যের অধিকার দিয়ে তাদের নাম দিলেন 'গন্ধবণিক'।


প্রাচীনকালে বণিকরা ময়ূরপঙ্খী ভাসিয়ে আড়ম্বরপূর্ণ বাণিজ্যযাত্রায় যেতেন। পথে ঝড়বৃষ্টি, দুর্যোগ ছাড়াও জলদস্যু ও বন্য জীবজন্তুর ভয় ছিল। এই সবের থেকে মা গন্ধেশ্বরী তাঁদের রক্ষা করবেন, এই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় গন্ধেশ্বরীর পুজো।

সিংহবাহিনী, অসুরদলনী, শঙ্খ, চক্র, ধনুর্বান ধারী গন্ধেশ্বরী অনেকটাই জগদ্ধাত্রীর মতই। 



















২২ মার্চ, ২০২২

রসনামঙ্গল / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 রসনামঙ্গল বইটি রান্নাবান্নার রেসিপি ছাড়াও আরও অনেককিছু। সংগ্রহ করতে রা প্রকাশনার ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করতে হবে। 


বাংলার ব্রত, পার্বণের পুরাণভিত্তিক লোকগাথার ১ম খণ্ড ব্রতপিডিয়া

বইটি পাওয়া যাবে কলিকাতা লেটারপ্রেসের কলেজস্ট্রীট দফতরে। প্রকাশক - পলাশ বর্মণ । যোগাযোগের নাম্বার+91 7439791511, 9831402331 (whatsapp)  


১৪ ফেব, ২০২২

আমার প্রথম ভ্যালেন্টাইন / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


আমার প্রথম ভ্যালেন্টাইন / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

এই তো সেদিন তার সাথে কফিহাউজের 
দুধসাদা টেবিল লিনেনে হাত রেখে। 
এই তো সেদিন ট্রামের সিটে... 
মিউজিয়ামের করিডোরে। বইমেলার চাঁদের হাটে। 
ল্যাবের প্রতিটি দরজা, কাচ সর্বস্বতা ছুঁয়ে, 
দিব্যি দিয়ে। ছিল তবু সে আমার হয়ে। হাত ধরে। 
 
আমার ইগো, পাগলামি, পাপপুণ্যের ফিরিস্তি, 
ধোপা-কাগজওয়ালার হিসেব থেকে শুরু করে সব কিছুই 
আমাপা দিয়েছিলাম তাকে উপুড় করে ।  

অস্পষ্ট কৈশোরের আবছায়ায় এসেছিল না একদিন? 
পাগলের মত নীল খুঁজে চলেছিলাম তখন কপার সালফেটে
বিষ ভেবে নয়। ফুল ভেবে। 
সবুজ খুঁজে চলেছি তখন হিরাকষের ক্রিস্টালে। 
রঙের মোহে, তার চিকন স্ফটিকে। 
নিউমার্কেটে হাতড়ে মরছি নিকেল সালফেট রঙা শাড়ি। 
প্যারামাউন্টের শরবতে খুঁজছি পার্কিন সাহেব কে। 
আলাদা আলাদা ফ্রুটি স্মেল চিনছি কুলে, কলায়... 
পচা আমণ্ড বাদামের তেতো গন্ধ? সেও তো তার জন্যেই। 
সুগন্ধি মাথা ধরার বাম? উইন্টার গ্রিন তেলের? 
তাও আমার বাঁহাতের খেল তখন। 
আমি সবই দিয়েছিলাম তাকে উজাড় করে। তবু সে আর আমার রইল কই? 
মঙ্গলকাব্য সে রঙ চেনে না। ম্যাজিক রিয়ালিজম সেই মজা বোঝে না। 
সাইফাই গল্প? সে তো সেসব সূক্ষ্ম গন্ধও পায়না। 
সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর ধুলোপড়া জার্নালে খুঁজেলে হয়ত পাবে তারা।  
কফিহাউসের নিঃস্ব টেবিলেও 
কিন্তু আমায় তো আর পাবেনা সে। 
যদিও সে ই ছিল আমার প্রথম ভ্যালেন্টাইন। 





 


৫ ফেব, ২০২২

একলা একলা গোটাসেদ্ধ

 মা, আমি এই প্রথম না গতবারেও একাহাতে সব বাজার করে গোটাসেদ্ধ করেছিলাম। তুমি তখন বিছানায় পড়ে।বারব্রত, স্ত্রীআচার, বিচার কিছুতেই হুঁশ ছিলনা। তবুও ছিলে একপাশটায় পড়ে। এবছর আমি আরও একা। তবুও সব মেনেছি মা। ঠিক যেমনটি শিখেছি তোমার কাছে। সব পেলেছি একাহাতে ঠিক যেমনটি এবাড়ির আচারবিচার। আমি বেছে বেছে ছোটো ছোটো গোল আলু, লাল আলু, শিম, কড়াইশুঁটি, কুলি বেগুণ সব এনেছি মা। একটার গায়েও দাগ নেই। বেঁকা ট্যারা নয়। তোবড়ানো বা ঠসকে যাওয়া নয় কেউ। সবুজ গোটা মুগ আনিয়েছি মা। সঙ্গে টকটকে লাল বড়বড় শুকনো লঙ্কা। ঠিক যেমন তুমি বলতে। নতুন সরষের তেলের প্যাকেট কেটেছি দিন কয়েক আগেই। নুনও তাই। অত তুমি মানতে না। বলতে সংসারের জিনিষই তো মা ষষ্ঠীর। এঁটোকাঁটা আবার কী? তোমার নিষ্ঠা ছিল কিন্তু ছুতমার্গ ছিলনা একদম। সেটাই আমার ভালো লাগত বড়। 

মা আমি পঞ্চমী তিথি না পেরোতেই গোটা সেদ্ধ, আতপচালের ভাত আর সজনে ফুল ছড়ানো কুলের অম্বল রেঁধে নিয়েছি। আমি ভাতের মধ্যে দুটো গোটা আলু সেদ্ধও দিয়েছি মনে করে। তুমি বলতে একটা তোমার ছেলের জন্য আরেকটা আমার ছেলের। রাতে শোওয়ার আগে ঠাণ্ডা ভাতে আজ জল ঢেলে দেব মনে করে ঠিক। তুমি তো নেই মনে করিয়ে দেবার তাই মনে রেখেছি গতবারের মত। কুলের অম্বলে সর্ষে ফোড়ন ভুলিনি মা। এবার সজনেফুলগুলো বাছতে হয়নি মা। কলেজ থেকে দিয়ে গেছে একদম জুঁইফুলের চেয়েও সাদা। গতকালের বৃষ্টিতে এক্কেবারে তাজা। আমি গোটাসেদ্ধর একটা আনাজ কিম্বা ডাল হাতায় করে টিপে দেখিনি মা। তুমি বকুনি দিতে। মনে আছে। বলতে ওগুলো আজ মা ষষ্ঠীর ছানা। টিপে মেরে ফেলবে না। ঢাকাচাপা দিয়ে রেখে দাও সারারাত। কাল দেখবে কেমন ন্যায়দম খেয়েছে। মুখ থেকে পাছে থুতু পড়ে তাই আমি কথা বলিনি মা, গোটাসেদ্ধ করতে গিয়ে। 

ও হ্যাঁ, মিষ্টি দই এনেছি মা। কাল ষষ্ঠীর শেষপাতের জন্য। মনে করে। সব ঠাণ্ডা। সব ঠান্ডাঠুন্ডি করলে এই ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীর খারাপ হবেনা। গোটাসেদ্ধ দিয়ে পান্তা খেয়েই তুমি ছটফট করতে সেদিন দুপুরঘুমের জন্য। শেষবার মানে ২০২০ তে আমি যাব বইমেলায়। তুমি বললে, এই চলল মেয়ে আবার। কোথায় পান্তা খেয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে জম্পেশ ঘুম দেবে তা না। মনে পড়ছে সব। মনে আছে সব। ভুলতে তো পারছিই না আমি। কাল ভোরে আবার কনকনে ঠাণ্ডায় শিলনোড়া চান করিয়ে তেল, হলুদ, সিঁদুর জল...ভেজা গামছা গায়ে শিল... তাঁর কোলের কাছে জোড়া শিম, কড়াইশুঁটি... সব করতে পারি এখন একা একা। আমার একলা ঘরে। 

তবে আমি কিন্তু আমার ছেলে, বৌ দুজনের জন্যেই ষষ্ঠীর পয়সা তুলে রাখি কৌটোয়। দুর্গাষষ্ঠীতে একসঙ্গে সব ষষ্ঠীর পুজো দেব বলে। তুমি কিন্তু শুধু তোমার ছেলের মাথায় কয়েন ঠেকিয়ে কৌটোবন্দী করতে। আমার তাই দেখে খুব অভিমান হত মা। তুমি বলেছিলে সেবার "তোমার জন্য তোমার মা আছে"। বুক ফেটে গেছিল আমার সেদিন।    

১৩ জানু, ২০২২

ধাপধাড়া গোবিন্দপুর টা ঠিক কোথায়?

ধাপধাড়া গোবিন্দপুর টা ঠিক কোথায়? 

ধাপধাড়া বা ধ্যাধধেড়ে সে যাইহোক না কেন বাংলা সাহিত্যে গোবিন্দপুর জায়গাটির পেছনে এমন বিশেষণ বসে সেই স্থানকে অখ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বহুকাল আগে থেকেই। এমন কী ঠাকুমা, দিদিমার মুখে কোনও জ্ঞাতির বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে যাবার অনীহা প্রকাশেও ব্যাঙ্গার্থে এই শব্দবন্ধের প্রয়োগ হতে দেখেছি। বিশেষ করে বিয়ের কনে দেখতে গিয়ে পাত্রপক্ষের যেন পাত্রীপক্ষের সেই পিত্রালয়ের অক্ষাংশ - দ্রাঘিমাংশ কে হেয় না করলেই নয়। অথচ তাঁরা জেনে বুঝেই যাচ্ছেন সেখানে। প্রত্যন্ত শহরতলী বা অচেনা, অনামা কোনও জায়গায় যাবার আগে আমরা আর এখন এসব বলিনা কারণ এখন আমাদের হাতের মুঠোয় গুগল ম্যাপ আছে দিশা দেখানোর জন্য। 

আমাদেরই এই কোলকাতার অন্যতম একটি গ্রাম ছিল এই গঙ্গার ধারের গোবিন্দপুর। এখনকার বউবাজারের আশপাশের অঞ্চলই সেসময়ের গোবিন্দপুর। সেখান থেকে একটা খাল প্রবাহিত ছিল অধুনা ইস্টার্ন মেট্রোপ্লিটান বাইপাসের পাশে ধাপা অবধি। এই খাল ধাপার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যুক্ত ছিল বিদ্যেধরী নদীর সঙ্গে। আজকের বাইপাসে চিংড়িহাটা অঞ্চলে এই খালটির পাশে ধাড়া (একরকম ট্যাক্স) আদায় করার জন্য জমিদারের পেয়াদা পাহারায় থাকত। সব বাণিজ্য নৌকোকেই এই অঞ্চলের ক্যানাল দিয়ে যাওয়ার সময় এই ট্যাক্স দিত।

এ স্থান ছিল সেসময় বেশ দুর্গম, তাই ক্রমে ধাপধাড়া গোবিন্দপুর হয়ে ওঠে পাণ্ডববর্জিত জায়গা। 

আজ যেখানে উত্তর কলকাতার ক্রিক রো, সেখান দিয়েই বয়ে গেছিল এই খাল। ক্রিক শব্দের অর্থ হল সংকীর্ণ নদী বা খাল। তখন বিদ্যেধরী বড় নদী ছিল। মাতলা নদীতে গিয়ে পড়ত। কালে কালে তা মজে গেছে। বর্তমানের দ্রুত শহরায়নের ফলে এসব রাস্তাঘাট ভরাট হতে হতে আগেকার সেই প্রত্যন্ত জায়গা বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে ঠিকই কিন্তু সে যুগে মানুষ সেসব জায়গায় যেতে বেশ ভাবনাচিন্তা করত। আজ হয়ত আমরা তুমুল শহরায়নের সামিল হয়ে জল জঙ্গলের বিপদসংকুল কোলকাতা কে ভুলেছি কিন্তু এই শব্দবন্ধ আজও মনে করায় পুরনো কলকাতা কে। 


৭ জানু, ২০২২

রম্যরূপেণ সংস্থিতা / বই আলোচনা করলেন রীতা ঘোষ


অতিমারীর এই ভয়ানক সময়ে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের রম্যরূপেণ সংস্থিতা মনকে ভারী আরাম দিল। লেখিকা অত্যন্ত সহজ ভাষায় ও সূক্ষ্ম কৌতুকের ছোঁয়ায় আমাদের প্রতিদিনের নানা রকমের ঘটনাকে মেলে ধরেছেন।  অতি সাধারণ ঘটনাও অসাধারণ হয়ে গিয়েছে লেখিকার কলমের জোরে। সকাল থেকে রাত অবধি কত অভিজ্ঞতাই না আমরা সঞ্চয় করে থাকি, কিন্তু সেই ঘটনাগুলিকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করা ক' জনই বা পেরে থাকেন? শুধুমাত্র রচনা বা গল্প নয়, বইয়ের প্রতিটি রম্যগল্পের শিরোনামগুলি খুবই আকর্ষণীয়। শিরোনাম দেখেই মূল গল্পটি পড়তে ইচ্ছে করে।  

জগাদা covid  সিরিজ, কিংবা ঘটি ভার্সেস বাঙাল জ্যাঠামশাই, শিবদুগ্গার আধার কার্ড, ফেসবুকেন সংস্থিতা, হায়রে হিপোক্রিসি, কিংবা পেঁয়াজ পেয়াজির কিস্সা - কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। হেডঅফিসের বড়োবাবু যেন আমাদেরই আশেপাশের কেউ।  

এই বইটা একবার পড়তে শুরু করলে আর ছাড়তে ইচ্ছে করতে করেনা, আর শেষ হলে? তখনও মনের মধ্যে চরিত্রগুলি ঘুরঘুর করতে থাকে, বলতে থাকে, আমরা যে তোমাদেরই মনের এক্সটেনশন, তাই তো তোমরা আমাদের এতো ভালোবাসো। 

ফেসবুকেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের পোষ্ট থেকে জানতে পেরেছিলাম এই অভিনব বইটির কথা।  তখন থেকেই  ভাবছি কবে বইটি হাতে পাবো, তা অনলাইন অর্ডার করে হায়দ্রাবাদে পেতে পেতে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।  ইন্দিরার লেখা আগেও পড়েছি, ওর লেখা বই আমাদের বইয়ের আলমারিতে সামনের সারিতেই শোভা পায়।  ফেসবুকে তো মাঝে মাঝে অনেকের স্টেট্যাস আপডেটে হাস্যরসের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।কিন্তু কজন এমন একের পর এক গুছিয়ে মজার রচনাগুলি নিয়ে বই লিখে ফেলেন? 

শুধুমাত্র বিনোদন না, ইন্দিরা আমাদের দেখাচ্ছেন সমাজের করুণ দিকটাও, মানুষ কোথায় এসে থেমেছে আজ।  পয়মন্তী গল্পের শেষে -  জন্মেও কেউ সঞ্চয় করো না। যাবৎ বাঁচো তাবৎ খরচ করে চল। অর্থই অনর্থের মূল।  এমন সব মজার নীতিকথা বেশ সুখপাঠ্য। Covid আনন্দর গানখানি মনে পড়ছে। বিখ্যাত দ্বিজেন্দ্রগীতি তাও আবার করোনা ভাইরাসদের নিয়ে?  "আমরা এমনি এসে ভেসে যাই / হাওয়াতে জড়িয়ে , ফুলের রেণুতে / নিশ্বাসে আর প্রশ্বাসে ভাই। বাপরে বাপ, কী জব্বর গান।  

মনের ভেতর বাজতে থাকে এই প্রবাদ টি, a pen is mightier than a sword । সত্যি সত্যি সত্যি, একদম সত্যি।  

বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য শিল্পী শ্রী শুভম ভট্টাচার্য কে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আকর্ষণীয় প্রচ্ছদটি, ঝকঝকে প্রিন্ট কোয়ালিটি আর নির্ভুল বানান দেখে খুব ভালো লাগল।  

সবশেষে আমার এই সময়ের প্রিয় লেখিকা শ্রীমতি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে অভিনন্দন ও অনেক শুভেচ্ছা, প্রার্থনা করি, উনি সুস্থ থাকুন, আনন্দে থাকুন ও সারাজীবন এমনি রসবোধে টইটুম্বুর থাকুন।

পাণ্ডুলিপি পাবলিশিং এর ওয়েবসাইট ছাড়াও বইটি পাওয়া যাচ্ছে আমাজন এবং ফ্লিপকার্টে । 







লেখক পরিচিতি 

রীতা ঘোষ, হায়দরাবাদ  এর বাসিন্দা , একটি LPO তে কর্মরত এবং তার সঙ্গে অনেক সৃষ্টিশীল কাজেও যুক্ত আছেন

৫ নভে, ২০২১

সেই তো মল খসালি তবে কেন লোক হাসালি

 সেই তো মল খসালি তবে কেন লোক হাসালি

আগে কোন কাজ করতে অস্বীকৃত হয়ে পরে উপযাচক হয়ে এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেই কাজ করতে স্বীকৃত হলে এমন প্রবাদ আজও মুখে মুখে ফেরে। এমন অনর্থক ভণিতা করা আমাদের অনেকেরই অভ্যেস। তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক বা পারিবারিক ক্ষেত্র হোক। এসব হল মানুষের চরিত্র। তবে এই প্রবাদটির শুরু বা জন্ম হয়েছিল অন্যভাবে। তখন বলা হত সেই তো নথ খসালি তবে কেন লো হাসালি? 

সে যুগে পতিতাবৃত্তি এবং বেশ্যারা মানুষের মনোরঞ্জনের অন্যতম ব্যবহৃত পণ্য ছিলেন। অনেক বাঈজি তার অবাঞ্ছিত কন্যা কে গায়িকা এবং নর্তকী রাখার চেষ্টা চালাতে ব্যস্ত থাকতেন কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তা প্রকাশ করতেন না সর্বসমক্ষে। যেন বাঈজি কন্যা কিছুতেই বেশ্যাবৃত্তি করবেনা। তখন কুমারীত্বের লক্ষণ ছিল নথ আর নথ ভাঙার অর্থ হল কুমারীত্বের বিসর্জন দেওয়া। 

এবার অভাবের চাপে বাধ্য হয়ে মা বাইজীর মেয়ের সেই কুমারীত্ব বহু মূল্যে বিক্রীত হতে দেখলে অন্য রসিক সমালোচকরা ঈর্ষান্বিত হয়ে এই মন্তব্য করতেন। এ প্রায় অভ্যেসের পর্যায়ে চলে যেত সে যুগে। 

অভাবে সামিল হয়ে বাঈজী মা তার সেই কন্যার কুমারীত্ব ভাঙার জন্য চড়া ক্রয়মূল্য হেঁকে বসতেন যা সাধারণ রসিক জনের সাধ্যের বাইরে ছিল ।

যার ফলে পাতি রাজা বা জমিদার ধনীদের ভাগ্যে সেই কুমারী রত্ন জুটবেনা কারণ তাদের ভাগ্যে তা নেই বলে এমন ঈর্ষান্বিত মন্তব্য করে বসতেন। এখনও পরিস্থিতির চাপে কেউ নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলে আজও এরূপ মন্তব্য করা হয়।

অনেকেই হয়ত গায়ে মাখেন না এমন প্রবাদ। ভাবেন, নিন্দুকে যা বলছে বলুক, তাতে আমার কী? আমার কাজ উদ্ধার হওয়া নিয়ে কথা।রাজনীতির আঙিনায় এমন ঘটনা আমরা আকচার দেখি।মনে মনে বলেও থাকি উদ্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পর্কে। কিন্তু তাঁরা সেসব শুনতেই পান না।    

১৪ অক্টো, ২০২১

দুর্গার শক্তির মূলে কী রহস্য? / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

টেরাকোটার দুর্গা - লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ থেকে 


মহিষাসুর তখন অসুরগণের রাজা। দেবতাদের বলে অমরত্ব লাভ করে তার বিশাল প্রতিপত্তি। অত্যাচারী মহিষাসুর তখন দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ঠিক করেছে। স্বর্গ তার পাখির চোখ। যেনতেনপ্রকারেণ দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য তার দখলে আনতেই হবে। একশো বছর ধরে যুদ্ধ করে স্বর্গরাজ্য নিজের করায়ত্বে আনল সে। দেবসেনাবাহিনী পরাজিত হল আর মহিষাসুর হল স্বর্গের রাজা। দেবতাগণ একত্র হয়ে বিষ্ণু ও মহাদেবকে সঙ্গে নিয়ে প্রজাপিতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হল। একজন অসুরের কাছে তাঁরা কি করে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন সব কাহিনী জানালেন ব্রহ্মাকে। দেবতাদের মুখে মহিষাসুরের দ্বারা এমন লাঞ্ছনার ঘটনা শুনে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেব যারপরনাই ক্রুদ্ধ হলেন। তাঁদের মুখমন্ডল থেকে এক মহাতেজ নির্গত হল। হিমালয় অঞ্চলে ঋষি কাত্যায়ণের আশ্রমে সেই মহাতেজ থেকে জন্ম নিল এক দেবী। আশ্বিনমাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে তাঁর আবির্ভাব হল আর ঋষি কাত্যায়ণের আশ্রমে জন্ম বলে তাঁর নাম হল কাত্যায়ণি। 

অদ্রিজা মাদুর্গার আরেক নাম । অদ্রি অর্থাত পর্বত হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁকে এই নামে ভূষিত করা হয় ।

পুরাণ আর শাস্ত্রের পাতায় আমরা আবির্ভূতা হতে দেখি সেই অসামান্যা নারী কে যিনি একহাতে বরাভয় অন্যহাতে তুলে নেন অস্ত্র। দশপ্রহরেণ সেই দেবীশক্তির হাতে পরাজিত হয়েছিলেন মহিষাসুর। এবার দেখা যাক এই দেবীশক্তির রহস্যের পেছনে কোন্‌ ঘটনা ছিল।

শিবের তেজে দেবীর মুখ, যমের তেজে কেশপাশ, বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ, চন্দ্রের তেজে কুচযুগ, ইন্দ্রের তেজে শরীরের মধ্যভাগ, বরুণের তেজে জঙ্ঘা ও উরুদ্বয়, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল, সূর্যের তেজে পায়ের অঙ্গুলিসমূহ, এবং কুবেরের তেজে তৈরী হল উন্নত নাসিকা। অষ্টাবসুর তেজে তার হাতের আঙুল তৈরী হল। দক্ষাদি প্রজাপতিগণের তেজে তাঁর দন্তসকল এবং বহ্নির তেজে দেবীর ত্রিনয়ন সৃষ্টি হল। সন্ধ্যাদেবীদ্বয়ের তেজে ভ্রূযুগল ও বায়ুর তেজে উত্পন্ন হল কর্ণদ্বয়। দেবী এরূপে তেজসম্ভূতা হলেন কিন্তু মহিষাসুরকে বধ করবার জন্য তো তেজই যথেষ্ট নয়। তাই সকল দেবতারা এই দেবীকে অসুর বধের জন্য নানাবিধ দিব্যাস্ত্র যোগাতে লাগলেন। 

গভীর গর্জণে আকাশবাতাস ধ্বনিত হল। দেবীর সিংহনাদে দশদিশি কম্পিত হল। পৃথিবী ও পর্বতসকল বিচলিত হল। দেবগণ সানন্দে সিংহবাহিনী দেবীর জয়ধ্বনি দিলেন। মুণিগণ দেবীর স্তব শুরু করলেন। অসুরগণ ত্রিলোকবাসী দেবতাদের উদ্দেশ্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ধেয়ে এল। যুদ্ধ শুরু হল প্রবল।

যেহেতু ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর দেবাসুর-দানবের অবধ্য হলেও স্ত্রীবদ্ধ হবে তাই বুঝি ঋষি কাত্যায়ণ সকল দেবতার তেজ এবং ক্রোধানলের শক্তি ও দিগন্তব্যাপী সংহত তেজ দিয়ে তৈরী করলেন এই কাত্যায়ণীকে।

বিন্ধ্যপর্বতে এই তিলোত্তমা দেবী মহামায়া বা কাত্যায়ণি সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে অচিরেই বধ করলেন মহিষাসুর নামক দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ ঐ দৈত্যটিকে। আর এই মহিষাসুরকে বধ করে দেবীর অপর নাম হল মহিসাসুরমর্দ্দিণি ।


১৩ অক্টো, ২০২১

দুর্গাবাহিনীর বাহনকথা / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

মহিষাসুর - লেখকের নিজস্ব। পুরুলিয়ার চড়িদার ছৌ মুখোশ 
পশুপাখির ছবি ইন্টারনেট 

স্বজন পরিবৃতা মাদুর্গার যে রূপটি দেখতে আমরা অভ্যস্ত তেমনি ভাবে দুর্গা পুজোর প্রচলন ঘটেছিল গুপ্তযুগে।সিংহবাহিনী দুর্গার সঙ্গে আমরা দেখি একগন্ডা পশুপাখীকে। দেবীর বাহনরূপে পশুরাজ সিংহ, মহিষের দেহ থেকে নির্গত অসুর, লক্ষ্মীর পায়ের কাছে পেঁচা, সরস্বতীর রাজহাঁস, গণেশের পায়ের কাছে ছোট্ট ইঁদুর আর কার্তিকের পাশে ময়ূরকে। আদতে ঐ একরত্তি পাখীগুলি বা ইঁদুরের ওপরে চড়ে বসলে দেবতার ভারে তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাবার কথা। মাদুর্গা না হয় সিংহবাহিনী হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। অসুর না হয় স্ত্রী মহিষের পেটে জন্মেছিলেন আর পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে মায়ের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। তাই বলে অন্যদের সঙ্গে এত পশুপাখীর কি সম্পর্ক?    

  • মহিষাসুর =  মহিষ + অসুর

পুরাণে বর্ণিত আছে রম্ভাসুর ও গর্ভবতী এক মহিষীর মিলনে জন্ম হয়েছিল মহিষাসুরের । তার বৈশিষ্ট্য হল তার হাত-পা সব মানুষের মত কিন্তু মুখটি শিং সহ মহিষের মত । সে জন্মের পরেই স্বর্গরাজ্য লাভের আশায় তপস্যা শুরু করেছিল । বহুকাল কঠোর তপস্যার পর ভগবান ব্রহ্মা তুষ্ট হয়ে তাকে অমরত্ব ছাড়া যেকোনো  বরদান করতে সম্মত হলেন । এই বরে দেবতা, যক্ষ, রক্ষ, গন্ধর্বাদি কেউই তাকে হত্যা করতে পারবেনা  এবং কেবল কোনো অবলা নারীর হাতেই  সে ধ্বংস হবে এরূপটিই চাইলেন মহিষাসুর । তাই  তুমুল যুদ্ধের পর মা দুর্গাই একমাত্র পেরেছিলেন একে বধ করতে । মহিষ তমোগুণের প্রতীক । মহিষাসুর মহিষ থেকে জাত বলে সে ভয়ংকর এবং যুদ্ধে দুর্গার সত্ত্বগুণের দ্বারা সেই তমোগুণের বিনাশ হয়  ।

  • সিংহারূঢ়া দেবী

দেবীর বাহন সিংহ । তাঁর পায়ের নীচে সিংহের অবস্থান । দুর্গা হলেন সমস্ত শুভ শক্তির কান্ডারী । আর এমন গুণকে ধারণ করে দেবীর মন ।  সিংহ মানুষের জৈবপ্রবৃত্তি তথা পশুভাবকে লালন করে  । অরণ্যে ঘুরে শিকার সংহার করে । এহেন জৈব প্রবৃত্তির বিনাশ ঘটান মা দুর্গা । আর এরূপ পুরুষসিংহই  মা’কে শুভ কার্যে বহন করে নিয়ে চলে  । সে থাকে পায়ের নীচে অর্থাত দুর্গা হলেন জয়ী আর অশুভ সেই সংহার মনোবৃত্তি মায়ের পায়ের তলায় ধ্বংস হয় । সিংহরূপী মনকে বয়ে বেড়ান মা দুর্গা এবং অবশেষে তার পাশবিক স্বার্থপরতাকে গ্রাস করে তার শুভবুদ্ধির উদয় ঘটান ।

  • পেঁচা

লক্ষ্মীর বাহন নিশাচর পেঁচা । অন্ধকার যার আশ্রয় । লক্ষ্মী সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির  আলোর দিশা দেখান  পেঁচাকে সাথে নিয়ে  অর্থাত অন্ধকার ও আলোর মধ্য থেকে জীবজগত আলোর দিশা খুঁজে নেবে । কারণ জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের লড়াইতে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য উভয়ই থাকবে কিন্তু  সব পরিস্থিতিতেই অবিচল থেকে আলোর পথ যাত্রী হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলতে হবে । জাগতিক সত্ত্ব ও তমগুণের মধ্য থেকে সত্ত্বটুকুকে বেছে নিতে হবে । তাই বলে তমকে বাদ দিলেও বাদ দেওয়া যাবে না তাই এই নিশাচর ।

  • রাজহাঁস

সরস্বতীর বাহন শ্বেত রাজহংস ।  সরস্বতী পুরাণে বর্ণিত গঙ্গার মত এক পুতঃসলিলা নদী । তাই সরস্বতীর সাথে রাজহংস অনুষঙ্গটি  মনে করিয়ে দেয় নদীর জলপ্রসঙ্গকে । এবার রাজহংস জল ও দুধের মিশ্রণ থেকে সারটুকু অর্থাত কেবলমাত্র দুধটুকু গ্রহণ করে । তাই বিবেকমান জীবজগত সংসারের অসার বা অনিত্যকে সারটুকু গ্রহণ করার বারতাই বোধহয় ছড়ায় রাজহাঁস । আর সবকিছু সাদা রং বহন করে অমলিনতা যে শ্বেত রাজহংসের গায়ে কখনো অবিদ্যারূপ মলিনতা স্পর্শ করতে পারেনা ।

  • ইঁদুর

বিশালাকার গণপতির বাহন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুষিক । এখানে গণেশ নেতা বা গণশক্তির প্রতীক । আর তার অনুপাতে অতি ক্ষুদ্র ইঁদুর জীবের ছোট ছোট কর্মফলের কর্তনকারী । অর্থাত অতি বৃহত শুভ কর্মের দ্বারা কৃত সুফল বিনষ্ট হয়ে যায় ছোট্ট কোনো মন্দ কর্মের দ্বারা । তাই ষড়রিপু বা কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ইত্যাদির মত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কর্মফল বিনাশ করে ইঁদুর যাতে কিনা বৃহত সিদ্ধিলাভে বাধা না ঘটে ।

  • ময়ূর

কার্তিকের বাহন আমাদের জাতীয় পাখী আলস্যহীন ময়ূর। ময়ূর অত্যন্ত সজাগ এবং কর্মচঞ্চল পাখী । সৈনিক কার্তিকের সবগুণ গুলি সে বহন করে। মেঘ দেখলেও সে  উত্ফুল্ল হয় এবং তার মত ধীর স্থির হয়ে  যুদ্ধক্ষেত্রে নিরলস লড়াই করে যাবেন সৈনিক কার্তিক এবং সেইসঙ্গে লোকশিক্ষাও যোগাবে তার কর্মোদ্দীপনা ।

১২ অক্টো, ২০২১

বোধন থেকে বিসর্জন / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

দুর্গার ছবিঃ অনুকরণে শিল্পী নিলয় বিশ্বাস 

বোধন 

দাশরথি রায়ের আগমনী গানে পাই বোধনের কথা। বোধনেই হয় মায়ের পুজোর শুরু। 

"বিল্ব বৃক্ষ মূলে পাতিয়া বোধন, গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন" 

কেন মহাষষ্ঠীর সূচনালগ্নে বোধন হয়? 

সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ করে লঙ্কায় হাজির হলেন। ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে। সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই। তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে অকালে অর্থাত শরতকালে  (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত)  

কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং। তাই তো অকাল বোধন। ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ব বৃক্ষমূলে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন। সেই দিনটিই ছিল শুক্লপক্ষের মহাষষ্ঠী ।

রামচন্দ্র স্তব করলেন :

নমস্তে ত্রিজগদ্বন্দ্যে সংগ্রামে জয়দায়িনী

প্রসীদ বিজয়ং দেহি কাত্যায়নি নমোহস্তুতে ।।

পূজা শুরু হল । পিতামহ  ব্রহ্মা  রামচন্দ্রের সঙ্গে বললেন

“হে দেবী! যত দিন না পর্যন্ত রাবণ বধ হয়, রাক্ষসকুল ধ্বংস না হয় আমাদের পূজা গ্রহণ করে তুষ্ট হোন ”   

মিথিলার কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী গ্রন্থে ষষ্ঠীতে মায়ের বোধনের উল্লেখ আছেঃ 

"ষষ্ঠ্যাং বিল্বতরৌ বোধঃ সায়ংসন্ধ্যাসুকারয়েত্‌" 

 বসন্তকালের দুর্গাপুজোয় বোধনের প্রয়োজন হয়না কারণ দেবতারা ঐ সময় জাগ্রত থাকেন। সমগ্র দেবকুলকে শরতকালে জাগানোর উদ্দেশ্যেই এই বোধন। বোধনের অর্থ হল জাগরণ। কালিকাপুরাণে পাওয়া যায় এই বোধন নিয়ে...

"বোধয়েদ্বিল্ব্শাখায়াং ষষ্ঠ্যাং দেবীফুলেষু চ"

এবার সব গাছ বাদ দিয়ে বিল্ব বা বেল গাছের নীচে বোধন কেন? কারণ মা দুর্গার প্রিয় ফল হল ওষধি গুণ সম্পন্ন বেল। নবপত্রিকার অন্যতম উদ্ভিদও বেল চারা আর মায়ের স্নানের সময় চার আঙুল পরিমাণ বেল কাঠিও তাঁর দন্ত মার্জনার জন্য ব্যবহৃত হয়। 

নবপত্রিকা স্নান 

"ওঁং উত্তিষ্ঠ পত্রিকে দেবী অস্মাকং হিতকারিণি" 
মহাসপ্তমীর ভোরের সূচনা হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব দিয়ে । নবপত্রিকা দেবীদুর্গার প্রতিনিধি । শ্বেত অপরাজিতা লতা এবং হরিদ্রাক্ত সূতা দিয়ে ন'টি উদ্ভিদ {কলা–ব্রহ্মাণী(শক্তিদাত্রী), কালো কচু– কালিকা (দীর্ঘায়ুদাত্রী),হলুদ– ঊমা( বিঘ্ননাশিনী),জয়ন্তী–জয়দাত্রি,  কার্তিকী(কীর্তিস্থাপয়িতা), বেল–শিবাণী(লোকপ্রিয়া), ডালিম–রক্তবীজনাশিনী( শক্তিদাত্রী), অশোক–দুর্গা(শোকরহিতা), মানকচু– ইন্দ্রাণী (সম্পদদায়ী), ধান–মহালক্ষ্মী( প্রাণদায়িনী)}চারাকে একত্রে বেঁধে নদীতে স্নান করানো হয়। নদীতে নবপত্রিকা স্নানের পূর্বে কল্পারম্ভের শুরুতে দেবীর মুখ ধোয়ার জন্য যে দাঁতন কাঠি ব্যাবহৃত হয় তাও আট আঙুল পরিমিত বিল্বকাঠেরই। মন্ত্রের মাধ্যমে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয় । শস্যোত্পাদনকারিণি দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী । স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে  বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে, মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সাথে স্থাপন করা হয় । এই তিনটি ঘটের  একটি মাদুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট। নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা । মহাসপ্তমীর ভোরে বিল্ববৃক্ষের পূজা, নবপত্রিকা এবং জলপূর্ণ ঘটস্থাপন এর দ্বারাই দেবীপূজার সূচনালগ্ন ঘোষিত হয় । 

দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তির পাশেই নবপত্রিকা কে স্থাপন করে আহ্বান করা হয় এই বলে... 

"ওঁং চন্ডিকে চল চল চালয় চালয় শীঘ্রং ত্বমন্বিকে পূজালয়ং প্রবিশ" 

সন্ধিপুজো 


রামায়ণে আছেঃ 

শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল । সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশ্বরে প্রবেশ করলেন । অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন । অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র ।

দেবী দুর্গা নাকি এই দুইতিথির মিলনক্ষণেই আবির্ভূতা হন দেবী চামুন্ডারূপে । চন্ড এবং মুন্ড এই দুই উগ্রমূর্ত্তি ভয়ানক অসুরকে বধ করেছিলেন এই সন্ধিক্ষণে । আশ্বিনমাসে রামচন্দ্রের অকালবোধন এবং অপ্রতিরোধ্য রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করার জন্য যে দুর্গাপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের রামায়ণে সেখানেও দেখি রামচন্দ্র সন্ধিপূজা সমাপন কালে দেবীর চরণে একশো আট পদ্ম নিবেদন করার আশায় হনুমানকে দেবীদহ থেকে একশো আটটি পদ্মফুল তুলে আনতে বলেন । হনুমান একশোসাতটি পদ্ম পেলেন । দেবীদহে আর পদ্ম ছিলনা । এবার প্রশ্ন কেন দেবীদহে একটি পদ্ম কম ছিল । তার কারণ স্বরূপ কথিত আছে , দীর্ঘদিন অসুর নিধন যজ্ঞে মাদুর্গার ক্ষত বিক্ষত দেহের অসহ্য জ্বালা দেখে মহাদেব কাতর হলেন । মায়ের সারা শরীরে একশো আটটি স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল । মহাদেব তাঁকে দেবীদহে স্নান করতে বললেন সেই জ্বালা জুড়ানোর জন্য । দেবীদহে মায়ের অবতরণে একশো সাতটি ক্ষত থেকে সৃষ্টি হয়েছিল একশো সাতটি পদ্মের । মহাদেব দুর্গার এই জ্বালা সহ্য করতে না পারায় তাঁর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু নিক্ষিপ্ত হল মায়ের একশো আটতম ক্ষতের ওপর । দেবীদহে স্নানকালে সেই অশ্রুসিক্ত ক্ষতটির থেকে যে পদ্মটি জন্ম নিয়েছিল সেটি মা নিজে হরণ করেছিলেন । কারণ স্বামীর অশ্রুসিক্ত পদ্মফুলটি কেমন করে তিনি চরণে নেবেন । আবার কৃত্তিবাসের রামায়নে পাই রাবণ নিধন যজ্ঞের প্রাক্কালে রামচন্দ্র বলছেন

যুগল নয়ন মোর ফুল্ল নীলোত্পল

সংকল্প করিব পূর্ণ বুঝিয়ে সকল ।।

রাম ধনুর্বাণ নিয়ে যখন নিজের নীলোত্পল সদৃশ একটি চক্ষু উত্পাটন করতে উদ্যত তখন দেবী রামচন্দ্রের হাত ধরে তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেন

“অকালবোধনে পূজা কৈলে তুমি, দশভুজা বিধিমতে করিলা বিন্যাস।

লোকে জানাবার জন্য আমারে করিতে ধন্য অবনীতে করিলে প্রকাশ ।।

রাবণে ছাড়িনু আমি, বিনাশ করহ তুমি এত বলি হৈলা অন্তর্ধান ”

দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হল এই সন্ধিপুজো। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীতিথির শুরুর ২৪ মিনিট....এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যেই  অনুষ্ঠিত হয়। মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পিছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিল দুই ভয়ানক অসুর চন্ড ও মুন্ড। দেবী তখন এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করেন। কেশরাজিকে মাথার ওপরে সু-উচ্চ কবরীতে বেঁধে নিয়ে, কপালে প্রজ্জ্বলিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি টিপ ও তিলক এঁকে, গলায় বিশাল মালা ধারণ করে, কানে সোনার কুন্ডল ও হলুদরঙা শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করেন। তাঁর রক্তচক্ষু, লাল জিহ্বা, নীলাভ মুখমন্ডল  এবং ত্রিনয়ন থেকে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকেন। ঢাল ও খড়্গ নিয়ে চন্ড ও মুন্ডকে বধ করেছিলেন দেবী এই সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে।   

সন্ধিপূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ বলি দেন । কেউ সিঁদুর সিক্ত একমুঠো মাসকলাই বলি দেন । সবকিছুই প্রতিকী । সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা । রক্তবীজ অসুর কুল বিনষ্ট হয় । ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠে যুদ্ধজয়ের ভেরীর মত । একশো আট প্রদীপের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয় ভারতবর্ষের আনাচকানাচ । উত্তিষ্ঠত ভারতবাসীর জাগ্রত মননে দুষ্কৃতের বিনাশিনী এবং সাধুদের পরিত্রাণ কারী মা দুর্গা কান্ডারী হয়ে প্রতিবছর অবতীর্ণ হন মর্ত্যলোকে ।

বিসর্জন 


বিজয়া কেন বলে? বিসর্জন হয়ে গেলেই তো বিজয়া হয়। এরপর অপরাজিতা দেবীর পুজো শেষে বিসর্জনের বাজনা বাজে। 

বিজয়ায় বিসর্জন মা দুর্গা কে ত্যাগ নয়, বরং বিশেষরূপে অর্জন। বিজয়া হলো আসুরিক শক্তির ওপর দৈব শক্তির বিশেষ প্রভাব বিস্তারে জয়লাভ। অসুর বধ করেছিলেন বলে মা দুর্গার আরেক নাম ও বিজয়া। 

ঢাকের তালে তালে প্রতিমা নিরঞ্জনের তোড়জোড়ের সঙ্গে "আসছে বছর আবার হবে" আর দেবী কে বলা হয়,  "ওং গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং স্বস্থানং দেবি দুর্গে! পুনরাগমনায় চ" অর্থাৎ নিজের ঘরে ফিরে যাও মা। আবার এসো।

দশমীর বিকেলে পাড়ার ঠাকুর বিসজর্ন হয়ে গেলেই কলাপাতার পেছনে লালকালি দিয়ে "শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়" লিখতাম আমরা। এ যেন আমাদের সংস্কার । বিজয়ার প্রথম চিঠি মা দুর্গার উদ্দেশ্যে লিখে গঙ্গায় ভাসানো। 





 



১১ অক্টো, ২০২১

দশপ্রহরণ দেবীর দিব্যায়ুধ / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ছবিসূত্র - আমাজন 


দুর্গা পুজোর অঞ্জলির মন্ত্রে আমরা বলি "সায়ুধায়ৈ নমঃ" । সায়ুধা ( স+ আয়ুধ) অর্থ আয়ুধ বা অস্ত্রের সহিত। 

এবার দেখি কোন্‌ কোন্‌ দেবতারা মা দুর্গাকে কি কি অস্ত্র দিয়ে "সায়ুধা"করলেন?   

  • মহাদেব তাঁর স্বীয় শূল থেকে সৃষ্ট একটি ত্রিশূল দিলেন। ত্রিশূলের তিনটি ফলা মানুষের তিনটি গুণ যথা সত্ত্ব, রজ এবং তম কে ব্যাখ্যা করে। 
  • বিষ্ণু তাঁর সুদর্শণ চক্র থেকে সৃষ্ট চক্র দিলেন। এই সুদর্শন চক্রের ১০৮ ফলা। চক্রের আবর্তন এর অর্থ হল থেমে না থাকা। হাতে চক্র থাকার অর্থ হল সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন দুর্গা আর তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে চলেছে সমস্ত বিশ্ব।
  • বরুণ দিলেন শঙ্খ ও নিজের পাশ থেকে তৈরী করে আর একটি পাশ। জীব জগতের স্পন্দন স্বরূপ এই শঙ্খ সৃষ্টির প্রতীক।পুরাণ মতে শঙ্খ থেকে উৎপন্ন শব্দেই প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে জীব জগতে।শঙ্খের ধ্বনি মঙ্গলময়। আবার যুদ্ধের আহ্বান জানাতে দেবী ব্যবহার করেছিলেন শাঁখ। 
  • অগ্নিদেব দিলেন আগুণ রূপ শক্তি যা জ্ঞান এবং বিদ্যার প্রতীক।তিনি প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিভূ। মানব সভ্যতার শুরুতেই রয়েছে আগুনের মহিমা। অগ্নি আজ পর্যন্ত পূজিত হন হোমশিখায়, দেবারতির প্রদীপে। দেবীর হাতে ধরা অগ্নি এক দিকে যেমন অস্ত্র, তেমনই আবার প্রজ্জ্বলিত অগ্নি দেবীর নিজস্ব শক্তিকেও বোঝায়। শাস্ত্র মতে অগ্নি যাবতীয় ক্লেদ থেকে জগৎকে উদ্ধার করে, শুদ্ধ করে। 
  • পবনদেবতা দিলেন একটি ধনুক ও দুটি বাণপূর্ণ তূণীর। তীর ও ধনুক উভয়ই ইতিবাচক শক্তির প্রতীক ৷ মানব শরীরের অন্তর্নিহিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ধনুর টঙ্কারে। ধনুকের সঙ্গে জুড়ে থাকে তীর যা ধনুর টঙ্কারে প্রকাশিত শক্তির ভারকে বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানে। ধনুক এখানে সম্ভাব্য শক্তির প্রতীক আর তীর প্রকাশিত গতিশক্তিকে বোঝায়। 
  • দেবরাজ ইন্দ্র দিলেন বজ্র ও ঐরাবত নামক স্বর্গের হাতির গলদেশের ঘন্টা থেকে ঘন্টা তৈরী করে দিলেন ঘন্টান্তর। মা দুর্গার হাতের এই বজ্র দৃঢ়তার প্রতীক। এর মাধ্যমেই জীবনে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হন মানুষ। দেবীর বাম হস্তের তুমুল ঘণ্টা ধ্বনি অসুরদের তেজকে দুর্বল করেছিল। বজ্র অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক শক্তি। দুর্গার বর্তমান রূপটির পিছনে বৌদ্ধতান্ত্রিক প্রভাব যথেষ্ট। বৌদ্ধ ব্যাখ্যা অনুসারে, বজ্র জাগতিক বন্ধন থেকে চেতনাকে মুক্ত করে।
  • মৃত্যুরাজ যম দিলেন কালদন্ড বা গদা যা আনুগত্য, ভালবাসা এবং ভক্তির প্রতীক। আবার এই গদা মানুষের মোহকে চূর্ণ করে বলে ব্যক্ত করে বিভিন্ন শাস্ত্র।
  • প্রজাপতি ব্রহ্মা দিলেন একটি রুদ্রাক্ষের মালা ও কমন্ডলু। কমণ্ডলুর মধ্যে ধৃত জল সৃষ্টির প্রতীক। শান্তির প্রতীক। 
  • দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার ও নানাপ্রকার অস্ত্র ও অভেদ্য কবচ।পুরাণে বিশ্বকর্মাকে অসংখ্য দিব্যাস্ত্র নির্মাণ করতে দেখা যায়। যার মধ্যে কুঠার একাধারে নির্মাণ ও ধ্বংসের প্রতীক। কুঠার দিয়ে কাঠ কেটে তৈরি হয় বিবিধ আসবাব থেকে শুরু করে বাড়িঘরও। সে দিক থেকে দেখলে, এটি সৃজনের প্রতীক। আবার কুঠার একটি প্রাণঘাতী অস্ত্রও বটে।
  • সূর্যদেব দেবীর লোমকূপে তাঁর তেজরাশি সমর্পণ করলেন। 
  • কালের দেবতা দিলেন একটি উজ্জ্বল ধাতব ঢাল ও প্রদীপ্ত খড়্গ। তলোয়ার বা খড়গ হল মানুষের বুদ্ধির ধারের প্রতীক ৷ যার জোরে সমস্ত বৈষম্য এবং অন্ধকারকে ভেদ করতে পারে মানুষ৷
  • দেবীর ডান হস্তে খড়গ বা খাঁড়া উদ্দত হয়ে থাকে। খড়গ হল বলি প্রদানের অস্ত্র। বলি হল, বিবেক বুদ্ধির মধ্যে নিহিত অশুভের নিধন যজ্ঞ। হিংসা, গ্লানি, ক্রোধ, অহং সহ ষড় রিপু থেকে নিজের আত্ম শক্তিকে পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া। তাই দেবীর হস্তে সজ্জিত খড়গ হল, পরম মোক্ষের প্রতীক। এই খড়গ সর্বদা উদ্দত অভয় প্রদানকারী। 
  • ক্ষীরসমুদ্র দিলেন পদ্মের মালা ও হাতে দিলেন পদ্মফুল। পাঁকে জন্মায় সুন্দর পদ্ম। তেমনই মায়ের আশীর্বাদে যেন অন্ধকারের মধ্যেও আলোর আবির্ভাব হয় সেই বার্তাই দেয় পদ্ম ফুল যা পূর্ণ চৈতন্যকে ব্যক্ত করে। দেবীকে তন্ত্রশাস্ত্র প্রকাশিত জগৎশক্তি হিসেবেই জ্ঞান করে। সেই কারণে তাঁর হাতে ধরা পদ্ম সামূহিক চৈতন্যকেই বোঝায়। 

  • হিমালয় দিলেন দেবীর বাহন সিংহকে।  
  • কুবের দিলেন একটি সুরাপূর্ণ পানপাত্র। 
  • নাগরাজ বাসুকি দিলেন একটি মহামণিশোভিত নাগহার। চেতনার নিম্ন স্তর থেকে উচ্চ স্তরে প্রবেশ এবং বিশুদ্ধ চেতনার চিহ্ন এই সাপ। সাপ হিন্দু ধর্মে কুলকুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক। যা জাগরিত হলে সাধকের সাধনা পূর্ণ হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। শাক্তধর্মে সর্পপ্রতীক বার বার ব্যবহৃত হয়। 
এছাড়াও নানাবিধ অলঙ্কার যেমন, মুক্তামালা, দিব্যচূড়ামণি, কর্ণকুন্ডল, হাতের বলয়, ললাটভূষণ, বাজু, নির্মল নূপুর, অত্যুত্তম কন্ঠহার ও সমস্ত অঙ্গুলিতে শ্রেষ্ঠ অঙ্গুরীয়। 

এইরূপে দিব্য আয়ুধে দশভুজা দেবীমূর্তি সজ্জিত হয়ে  প্রস্তুত হলেন সেই মহাসংগ্রামের জন্য। দশ হাতে ধৃত অস্ত্রগুলি বিভিন্ন ভাবে দশভুজা দুর্গার সাধনতত্ত্বকেই ব্যক্ত করে। হিন্দু অথবা বৌদ্ধ, যা-ই হোক না কেন, দেবীর এই দশপ্রহরণের আসল কাজ মানুষকে আসুরিক চেতনা থেকে মুক্ত করে ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ প্রদর্শন, পূর্ণজ্ঞান লাভের পথে নিয়ে যাওয়া।