১৩ অক্টো, ২০১৯

কে তবে আসল লক্ষ্মী?


আমি বাংলার আদি অনন্ত সংস্কৃতি অর্থাত বারব্রত, পুজোআচ্চ্চা, স্ত্রী আচার কে মান্যতা দিয়ে থাকি বলে সবাই ভাবে আমি বুঝি খুব পুজোআচ্চা করি। বিশ্বাস করুন আমি হিপোক্রিসির ঊর্দ্ধে। আমার যেগুলি মনে হয় ন্যায়সঙ্গত সেটুকুনি‌ই পালন করি। আমার কাছে সনাতন ধর্মের সংজ্ঞাটা অন্যরকম। বারেবারে আমার লেখায় পুরাণ, পুজো, বারব্রত উঠে আসে তাই। এগুলি জানতে ভালো লাগে। মানুষকে জানাতে ভালো লাগে। তাই বলে আমি দীক্ষা, গুরু মানা কিম্বা নাক টিপে জপতপের ঘোর বিরোধী।
সক্কাল সক্কাল বন্ধুরা ফোন করে বলছে, " কি গো? আজ তোমার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় যেতে বললে না?" আমি তো অবাক! আমাদের ঘটিবাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হয়না। আমার বাবার বাড়িতে খুলনা কানেকশন থাকায় চিঁড়েমুড়কি, তালের ফোপল দিয়ে মা ছবিতে মালা দেন। ব্যাস ঐ টুকুনিই। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে আমার আধুনিকা শাশুড়িমাতার লক্ষ্মীপুজো নৈব নৈব চ। বরং সরস্বতী পুজোর নেমকম্মোটুকুনি আমি‌ই চালু করেছি। কারণ সরস্বতীর হাত ধরেই আমাদের গৃহে লক্ষ্মীর আগমন।প্রতি বেস্পতিবারে আমপল্লব দিয়ে, ক্যাঁঠালি কলা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে ঘট পাতার রেওয়াজ আমাদের বাড়িতে নেই। তবে কেউ ভালোবেসে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ালে নাচতে নাচতে যাই। অঞ্জলি দেবার স্কোপ থাকলে ভরপেটেই পূর্ণচাঁদের মায়ায় নিজেকে উজাড় করে দিতে খারাপ লাগেনা বৈকি।
তবে আজ মাংসের ঝোল ভাত খেয়ে গুমনামীর প্ল্যান। রাতে লাইভ হব। নব্য পাঁচালি পড়ব। কানে ঢোকাতে হবেনা? এত কষ্ট করে গুরুচন্ডালী আমাদের নব্য লক্ষ্মীর পাঁচা৯ প্রকাশ করেছেন । সেখানে আমরা কবি সাহিত্যিকরা সবাই বেশ প্রতিবাদী হয়ে নবীকরণ করেছি মান্ধাতা আমলের সেই মানসিকতার। পদে পদে যেখানে মেয়েরাই আবহমান কাল ধরে দুলে দুলে পড়ে সে পাঁচালি তার বদল হওয়া দরকার সেই তাগিদেই লেখা এই পাঁচালী। মেয়েরাই মেয়েদের বিপদ ডেকে আনে। মেয়েরা না বুঝে পুরুষতান্ত্রিক লেখকদের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বটতলার এই পাঁচালিটি পড়ে। স্বামীজি কে মনে পড়ে? বলেছিলেন, অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর নারীজাতির বিকাশ না হলে এসমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই এ আমাদের সমাজ সচেতনতার এক প্রয়াস।

আমাদের বাড়িতে কালীপুজোর দিনে লক্ষ্মীর সঙ্গে অলক্ষ্মীর পুজো হতে দেখেছি। অলক্ষ্মীর পুজো করে তবেই লক্ষ্মীর পুজোয় হাত দেবার রীতি। খুব ভালো কিন্তু এক আসনে নয় কেন? বাড়ির বাইরে, খোলা নর্দমার ধারে কলার পেটোতে পিটুলির তৈরী অলক্ষ্মী গড়ে এক খাবলা সিঁদুর দিয়ে মাথা আঁচড়ে চুলের নুড়ি আর গোবরের ওপর ভাঙা মোমবাতি জ্বেলে তাকে নামকোয়াস্তে দুটুকরো ফল, বাতাসা দিয়ে পুরুত যেন বিদেয় করতে পারলেই বাঁচে। লক্ষ্মীর পুজোয় শাঁখ ছাড়া কিছুই বাজেনা কিন্তু অলক্ষ্মী বিদেয় কালে চাটাই পেটানো হয় আর বলা হয় অলক্ষ্মী দূর হ', ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক। এই বলে অলক্ষ্মীকে ত্যাগ দিয়ে লক্ষ্মীর প্রধান পুজোয় সামিল হতেন সবাই। সেখানে মহা ধুম। ষোড়শ উপচার। আমার খুব কষ্ট হত সেই অলক্ষ্মীর বিদেয় বেলায়। ভাবতাম সমাজে, ঘরে ঘরে এমন কত মেয়েরাই অনাদরে কাল কাটায়। অছ্যুত, নীচু, ঝিমাগী, পাগলী, ডাইনি, বাঁজা আর বিধবা এরা কি তবে সবাই একঘরে? অলক্ষ্মীর দলে? কেন এমন হবে? কেউ উত্তর দিতে পারত না বিশ্বাস করুন। আমার মতে সবাই তো আমরা কন্যাশ্রী। শ্রী শব্দের অর্থ লক্ষ্মী। তার সঙ্গে বাচ্ছা হল কি না হল বা স্বামী মারা গেল কি না গেল জাতপাঁত কি হল এসব কেন দেখব? সধবাই কেন সিঁদুর খেলবে? বিধবারা কেন সিঁদুর দেবেনা? টিপ পরবে না? মাছ খাবেনা, লাল পরবে না এসব দোলাচলে জর্জরিত হতে হতে এই অবধি এসেছি।

এবার আসি আজকের যুগে দাঁড়িয়ে অলক্ষ্মীর সত্যি ডেফিনিশনে।

আচ্ছা বলুন তো আজকের সমাজে যে মেয়েগুলো বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে পান থেকে চুন খসলে মিথ্যে ৪৯৮ এর মিস ইউজ করে? ফাঁসিয়ে দেয় শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেককে? ভেঙে ফেলে সংসার আর আইনের কারসাজিতে টাকা আদায় করে বিয়ের বন্ধনে রণে ভঙ্গ দেয় তারা কেমন লক্ষ্মী?
শাশুড়িমা বা নিজের মা'কে যারা "জ্যান্তে দেয় না দানাপানি, মরার পরে ছানাচিনি" টাইপ হয়ে বৃষোতসর্গ করে শ্রাদ্ধশান্তি করে? ত্সেসব লক্ষ্মীরা ঘরের কুল-অলক্ষ্মী। "রাণু মন্ডলের মেয়ের মত" যারা জীবনে নিজের মা বা শাশুড়ি কে একথালা ভাত বেড়ে দেয় না কিন্তু মা বা শাশুড়ির সোশ্যাল স্ট্যেটাস বাড়লে কিম্বা পোস্টাল কেভিপি কিম্বা এনএনসি ওথবা ব্যাঙ্ক এফডি ম্যাচিওর করলেই মায়ের কথা যাদের মনে পড়ে সেইসব অজ্ঞাতকুলশীল অলক্ষ্মীদের মাথায় পড়ুক বাজ!
আবার উল্টোটাও সত্যি। সমাজ সংসারে সেইসব শাশুড়ি বা ননদরা ? যারা নববিবাহিত বধূটির প্রতি অত্যাচার করে তাদের বাধ্য করে ঘর ছাড়তে? কিম্বা পণ না দিলে তাদের পুড়িয়ে মারে দেবযানী বণিকের মত? তাদের প্রকৃতপক্ষেই অলক্ষ্মীর আসনে বসাই আমি।
আনাচেকানাচে সত্যি রেপকেসের ফাঁকেফাঁকে যেসব মেয়েরা মিথ্যে ধর্ষণের অভিযোগ এনে গ্রামেগঞ্জে unnecessary হ্যারাস করে পুরুষকে? সেগুলোর কথা ভাবব না আজ? সেই মেয়েগুলো কি লক্ষ্মীমেয়ে?
আর সারাজীবন কপাল ঢেলে সিঁদুর পরে, লক্ষ্মীর ঘট পেতে দুলে দুলে পাঁচালী পড়া সেই মেয়েগুলো? যারা ঘরে শান্তশিষ্ট স্বামীনামক গৃহপালিতের চোখে ধুলো দিয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে স্বামীর প্রতি বেইমানি করে? ওপরে সাজানো সংসার আর নীচে পরকীয়ার কেত্তন গায়? নিজের স্বার্থসিদ্ধির আশায়? এরাও মা লক্ষ্মী? যে মেয়েগুলো "মি টু" বদনাম দিয়ে আপিসের বসের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা দাবী করে চাকরী থেকে ইস্তফা দেয়? সেই মেয়েরাও লক্ষ্মী ? আর ওপরে শান্তশিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট সেই রমণী? যার পরণে লাল পাড় শাড়ি, কপালে সিঁদুর, লক্ষ্মীপুজো করে সে গদগদভাসি। ঘরের লক্ষ্মী শ্বাশুড়িমা কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে অথবা সপরিবারে বেড়াতে চলে যায় শাশুড়িমা কে একটি ঘরে জল, বিস্কুট দিয়ে তালা বন্ধ করে রেখে? সে ও মা লক্ষ্মী তো? আর গ্রামেগঞ্জের মেয়েরা তো আজকাল শহরের এককাঠি ওপরে । ৪৯৮ বাদ দিন। বিয়ের একবছরের মধ্যে বাচ্ছা পেটে না এলে নীরিহ গোবেচারা বরটিকে " ধ্বজভঙ্গ" বলে ফাঁসিয়ে লক্ষটাকা দাবী করে বসে। শুধু বাপেরবাড়ির মা লক্ষ্মীটির প্ররোচনায়? এরাও মা লক্ষ্মী কি?
আর সর্বোপরি যে মেয়েগুলো শ্বশুরবাড়ির প্ররোচনায় বোকার মত নিজের পেটের কন্যাভ্রূণটিকে চুপুচুপি ওষুধ খেয়ে ন্যাকড়া জড়িয়ে বনের মধ্যে বা নর্দমায় ফেলে আসে? সেই মেয়েগুলো কেমন লক্ষ্মী? এদের নিজেদের কোনো সম্বিত নেই? কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? এযুগে দাঁড়িয়ে এই সব ধরণের অলক্ষ্মীদের আজ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তাই মা লক্ষ্মীর কাছে এইসব অলক্ষ্মীদের শুভবুদ্ধির জন্য প্রার্থনা করছি।

২ অক্টো, ২০১৯

পুজো এলো

মহানগরের চাদ্দিকে সাজোসাজো রব। এই এত আলো এত আকাশ তবুও যেন মনখারাপের রিন্‌রিন্‌ আমার বুকের মধ্যে আজো। অলিগলি, রাজপথ, খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার মাতৃবন্দনায় সর্বত্র মাতৃপূজার ধুম। আমার মায়ের মনে কিসের দুঃখ যেন। ছেলেমেয়ে কেউ থাকবেনা কাছে। আমারো সেই এক অবস্থা। অবিশ্যি অভ্যেস হয়ে গেছে। মানুষের মন আর শরীর যা স‌ইবে তাই-ই সয়ে যায়। দশবছর ছেলে থাকেনা কাছে। তবুও তিথি নির্ঘন্ট মেনে পুজো এসে কড়া নাড়বেই মনের দুয়ারে। এমনি নিয়ম সংসারের। কতবার ভেবেছি সে পুজোয় এলে গেয়ে উঠব সেই পুরাতনীখানা?
"কানে কানে কি কথা কয় বল দেখি সই, কানু এল পরবাসে আনন্দে থ‌ই থ‌ই"
না গাইতে পারিনা। আগমনীর রিহার্সাল, পত্রিকা সম্পাদনা, নিজের বিস্তর লেখালেখির চাপে ভুলেই থাকি। নিজেকে নিয়েই মেতে থাকি।
মনের মধ্যে কে যেন বারেবারে বলে ওঠে "পুজোটা কাটলে বাঁচি"
পাড়ায় মাইক বেজে উঠলে বুকের মধ্যে সেই মাদলের দ্রিমি দ্রিমি। ছোটোবেলার নস্ট্যালজিয়া। কোন্‌ বছরের কোন্‌ গান। এলপি রেকর্ড, শারদ অর্ঘ্য, এস্প্ল্যানেডের সিম্ফনি থেকে। পুজোর নতুন গানের ডালি। রঙীন ছবি শিল্পীদের্, লিরিক্স এর ব‌ই। মায়ের গান তোলা আর আমার সেই সুরে সুর মেলানো। আধুনিক গাইবিনা একদম এখন। গলা খারাপ হয়ে যাবে।
আমার দুই বিনুনীর টিন পেরুতে থাকে। হঠাত করেই সিনেমার হিট গানে গুনগুন। রেডিওর অনুরোধের আসরে কান পাতা। পাড়ার মন্ডপে আজো ভেসে আসছে সেইসব গান। "দীপ ছিল, শিখা ছিল অথবা কফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি...."
কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে লতা মঙ্গেশকরের সেবার পুজোর ফিট ফর্ম্যুলা, প্রিয়তম কি লিখি তোমায়? অথবা আজ নয় গুণ গুণ গুঞ্জন প্রেমে। নাহ্! আমার ফ্রিল দেওয়া ফ্রক, দুইবিনুনীর টিনে তেমন প্রেমে পড়ার স্মৃতি নেই। কিন্তু সেই প্রেমে না পড়ার দুঃখ ছিল। মা দুগ্‌গা কে নিয়ে মেতে থাকত সেই রাইকিশোরী। নিউমার্কেটের ফ্রকের ঝুলে আর ফুচকা গিলে। গানে গানে আর পড়ায় পড়ায়। আজ সেই কষ্টটা অন্যভাবে ধরা দেয় মরশুমের প্রথম শারদীয় ঢাকটা বেজে উঠলেই। একরাশ মনখারাপ আছড়ে পড়ে আমার ধনেখালি ডুরে শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে। ছোটছোট অনুভূতির খাঁজে খাঁজে।

২৭ সেপ, ২০১৯

মহালয়া অমাবস্যা


ছবিঃ দেবযানী সাধু 


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

মৃত পূর্বপুরুষের সন্তুষ্টি এবং তৃপ্তির জন্য জীবিত বংশধরের জলদানকেই বলে তর্পণ।  

তর্পণ শব্দটি এসেছে ত্রুপ থেকে যার অর্থ হল তৃপ্তি। আশ্বিনমাসের কৃষ্ণপক্ষ এবং শুক্লপক্ষের সন্ধিক্ষণে মহালয়া অমাবস্যা তিথিটির গুরুত্ব আমাদের শাস্ত্রে বিপুল। পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনালগ্ন ঘোষিত হয় মহালয়ার পরেই। আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের একপক্ষকাল ধরে পিতৃপুরুষের তর্পণ করা হয়। মহালয়ার দিনে হয় মহাতর্পণ। মহালয়া অমাবস্যার অপর নাম সর্বপিতৃ অমাবস্যা। এই অমাবস্যায় চন্দ্রের মহান লয় বা ক্ষয় হয় এবং প্রতিপদ থেকে আবার চন্দ্রকলার বৃদ্ধি হতে শুরু করে শুক্লপক্ষের সূচনায়।    

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিনে শুরু হয় দুর্গা পুজো । এর আগের মহালয়া অমাবস্যার দিন পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও প্রতিপদ থেকে দেবীপক্ষের শুরু । হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুসারে পিতৃলোক থেকে আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা তখন অবতরণ করেন স্বর্গ থেকে মর্ত্যে । অর্থাত আমাদের আশেপাশে তাঁরা বিরাজ করেন । তাই আমরা এই একপক্ষকাল তাঁদের তুষ্ট করি তর্পণের মাধ্যমে ।

মহালয়া শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ। অমাবস্যা শব্দের বিশেষণ। এর অর্থ মহান আলয় বা আশ্রয়। শরতকাল পড়ে সূর্যের দক্ষিণায়নের আওতায়। দেবতাগণ তখন নিদ্রিত থাকেন স্বর্গলোকে। তাই দক্ষিণায়ন হল পিতৃযান মার্গ। আর উত্তরায়ণের সময় দেবতারা জাগ্রত থাকেন। তাই তখন দেবযান মার্গ।

মৃত্যুর পর জীবের পারলৌকিক জীবনগতির দুটি পথের কথা বলা আছে শাস্ত্রে। দেবযান বা উত্তরমার্গ ও পিতৃযান বা দক্ষিণমার্গ। 
দেবযান মার্গে গমন করলে মানুষের আর জন্ম হয়না। ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি হয় । আর পিতৃযান মার্গে গমন করলে পুনরায় তার মর্ত্যলোকে ফিরে আসতে হয়। ঠিক যেমন মহাভারতের ভীষ্ম কুরুক্ষেত্রে শরশয্যা গ্রহণ করেও প্রাণত্যাগ করার জন্য উত্তরায়ণ আসা অবধি অপেক্ষা করেছিলেন।


মহালয়া অমাবস্যায় পিতৃশ্রাদ্ধ করে, তিলতর্পণাদি কৃত্য করে প্রিয়জনের আত্মাদের যমলোক থেকে পিতৃযানলোকে মহা-আলয়ে পাঠানো হয়। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা আর তাঁদের স্বর্গলাভের উদ্দেশ্যেই এই তর্পণ ।

মহাভারতে দেখা যায় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর অগণিত ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাঁদের মৃত আত্মার উদ্দেশ্যে শান্তি-অর্ঘ্য বা স্মৃতিতর্পণ করার মত কেউ র‌ইলনা বেঁচে। তাই বুঝি আমাদের মর্ত্যলোকে এখনো মানুষ তার প্রিয়মানুষের স্মৃতিতর্পণের আগে মহাভারতের পিতামহ ভীষ্মতর্পণ করে।

ওঁ ভীষ্ম শান্তনবো বীরঃ সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয়ঃ
আভিরদ্ভিরবাপ্নোতু পুত্রপৌত্রে চিতাং ক্রিয়াম্‌।।

মহাভারতে বর্ণিত আছে সূর্যপুত্র কর্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে স্বর্গে গমন করেন কিন্তু সেখানে তাঁকে খাদ্য হিসাবে দেওয়া হয়েছিল সোনাদানা । কর্ণ তখন দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে দেবরাজ বলেন ‘ দাতাকর্ণ ! তুমি জীবদ্দশায় অনেক দানধ্যান করেছ কিন্তু কোনওদিন তোমার পিতৃপুরুষকে তাঁদের স্মৃতিতে কোনও খাদ্যদ্রব্য উৎসর্গ করনি । সেজন্য তোমার প্রতি এই বিধান’

কর্ণ তখন বলেন – ‘দেবরাজ‚ পূর্বপুরুষদের বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না । জন্মের পরেই আমার মা আমাকে ত্যাগ করেছিলেন । যাই হোক এখন আমাকে মর্ত্যে ফিরে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে সেই পিতৃকার্য করার সুযোগ দিন’ ।

ইন্দ্র সেই প্রার্থনা পূরণ করে সায় দিলে কর্ণ এক পক্ষকালের জন্য মর্ত্যে আসেন ও প্রতিপদ থেকে মহালয়া পর্যন্ত কালে পিতৃকার্য করেন । তাঁদের জল এবং খাদ্য দান করে তৃপ্ত করেন। তাই মহালয়াতে সমাপ্ত পক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়। কর্ণের মতোই আজও মর্ত্যলোকের মানুষদের দ্বারা মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে প্রণতি জানানো হয়। পিতৃপক্ষে তর্পণাদি শ্রাদ্ধ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা হয় । প্রকৃতপক্ষে এটি পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছু নয় ।

ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যান্ত ভুবনত্রয়মম্‌
আব্রহ্ম স্তম্ভ পর্যন্তং জগত্‍ তৃপ্যতু

সারা বাংলার সমস্ত নদীর তীরে মহালয়ার দিন দেখা যায় তর্পণরত ব্যক্তিদের ভীড়। আবার রামায়ণে রামসীতার বনবাসকালে দশরথের মৃত্যু সংবাদে মন্দাকিনীর তীরে তাঁদের তর্পণ করার কথাও পাওয়া যায়।

মহালয়ার পরদিন মা দুর্গা স্বর্গলোক থেকে অবতরণ করেণ মর্ত্যলোকে এবং পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের শুভ সূচনা হয় তখনি । কিংবদন্তী অনুসারে রামচন্দ্র রাবণ বধ করার জন্য দুর্গাপুজো করবেন স্থির করেন । কিন্তু তখন দেবলোক ঘুমন্ত ছিল । ঘুমন্ত দেবলোককে জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে অকালবোধন করেছিলেন । সেইকারণে রামেশ্বরে তিনি পিতৃতর্পণ করেছিলেন। তাই সেই অর্থে এই সময়ে প্রতিবছর দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই আমরা স্বর্গলোকে আমাদের পিতৃপুরুষদেরও জাগ্রত করি ।
তর্পণ করতে লাগে গঙ্গার জল, তুলসীপাতা এবং কালো তিল। তিল ব্যাবহারের কারণ হল তর্পণের সময় যাতে নেতিবাচক কোনো আসুরিক শক্তি পূর্বপুরুষের আত্মাকে কষ্ট না দিয়ে বিপত্তির সৃষ্টি করতে না পারে। শ্রাদ্ধকারিতেও তাই কালো তিলের ব্যাবহার। আত্মার তৃপ্তি‌ই কাম্য। তাঁরা যাতে কোনোভাবে কষ্ট না পান।

আশ্বিনমাসে সূর্য তুলারাশিতে প্রবেশ করে। হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয়, মরণোত্তর আত্মারা তখন পিতৃলোক ছেড়ে যার যার উত্তরসুরী আত্মীয়ের ঘরে বাস করেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন তাঁদের এই বসবাসের ডিউরেশান ঠিক একমাস, যতক্ষণ না পর্যন্ত সূর্য আবার তুলারাশি থেকে বৃশ্চিকে প্রবেশ করে। ঠিক মহালয়ার অমাবস্যার একমাস পরে আসে ভূত চতুর্দশীর অমবস্যা। কার্তিকমাসে বাড়ির ছাদে ছাদে আকাশপ্রদীপ জ্বালানো হয়। আত্মারা যাতে নিজ নিজ গৃহ থেকে আবারো পথ চিনে স্বর্গলোকে পৌঁছতে পারেন সেই কারণে এই পথনির্দেশিকা ।

মহালয়ার অমাবস্যা তিথিতে দেবদেবীরা জাগ্রত হ'ন এবং মাদুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তিতে ঐ দিন চক্ষুদান করা হয় ।

মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা প্রকৃতপক্ষে পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছুই নয় ।

ভারতকোষ গ্রন্থে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী মহালয়াকে ‘পিতৃপুরুষের উৎসবের আধার’ বলেছেন। লয় প্রাপ্তি অর্থাত চন্দ্রের লয় হয় এই অমাবস্যা তিথিতে আর দর্শণশাস্ত্র মতে আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি অর্থাত পরমাত্মার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ এই মহতাদির লয় হয় । তাঁরা তৃপ্ত হন তর্পণের দ্বারা । জাগতিক অনুভূতিগুলি থেকে মুক্ত হয়ে আত্মারা পরমানন্দে ফিরে যান স্বর্গলোকে। পিতৃপুরুষেরা নাকি এই সময়ে পরলোক থেকে ইহলোকে আসেন জল ও পিণ্ডলাভের আশায়। শাস্ত্রজ্ঞের অভিমতে, প্রয়াত পিতৃপুরুষদের জল-পিণ্ড প্রদান করে তাঁদের ‘তৃপ্ত’ করার উদ্দেশ্যেই এই তর্পণ ।

পণ্ডিত সতীনাথ পঞ্চতীর্থের মতে মহালয়ায় যে তর্পণ করা হয়, তা শুধুই পিতৃপুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেব তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য-পিতৃ তর্পণ ইত্যাদির সঙ্গে থাকে রাম ও লক্ষ্মণ তর্পণ এবং জগতে সকল প্রয়াতকে জলদানের মাধ্যমে তৃপ্ত করার কথা বলা আছে। এমনকি জন্ম-জন্মান্তরে যাঁদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ কোথাও নেই এরূপ সকল প্রয়াতকে জলদান করে তাঁদের আত্মার তৃপ্তি সাধন করা যায়।

প্রথমে তাম্রপাত্রে কৃষ্ণ তিল এবং অন্য আরেকটি তাম্রকুন্ডে তর্পণের জল ফেলতে থাকে ব্রতী । মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা প্রথমে সে তার জল নিয়ে পৌঁছে যায় দেবলোকে...ওঁ ব্রহ্মা, ওঁ বিষ্ণু, ওঁ রুদ্র, ওঁ প্রজাপতিস্তৃপত্যাম্‌। তারপর ঋষিলোকে সপ্ত ঋষিকে প্রণতি পূর্বক তর্পণের দ্বারা তৃপ্ত করে।
দেবলোক, ঋষিলোকের পর "এতত্‌ সতিলোগঙ্গোদকং ওঁ যমায় নমঃ' ...এই বলে মন্ত্রোচ্চারণ করে যমতর্পণ । এবার মহাভারতের সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ভীষ্ম পিতামহের তর্পণ, রামতর্পণ এবং সবশেষে স্বর্গত আত্মীয় পরিজনের নামে জলদান করার রীতিএই তর্পণে।









৯ সেপ, ২০১৯

বাংলার বারোমেসে নারীপুজো




প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের বারব্রত পালনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল দেবীরা। মেয়েরা মেয়েদেরই পুজো বেশী করত।
মানুষের জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন পৌরাণিক এবং লৌকিক দেবীর পুজো। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জীবনযাপনের প্রতিনিয়তঃ অনিশ্চয়তা, খাদ্যাভাব, কৃষিকাজ, সন্তানধারণ, পালন, রোগব্যাধির হাত থেকে  রক্ষে পাওয়া আর সর্বোপরি অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চিন্তায় মানুষ শরণাপন্ন হত বারব্রতর। লোকসমাজে মানুষের জীবনধারণের অনিশ্চয়তা থেকেই একসময় জন্ম নিয়েছিল তাদের প্রকট ধর্মভীরুতা। বাংলার অগণিত পালপার্বণে দেবীদের পাল্লাই বেশী। যেন মাতৃস্বরূপা দেবীই নারীশক্তির মূর্ত প্রতীক রূপে সকলের মঙ্গলকামনায় বিরাজমানা। সেই সমাজে শিশুদের ধারণ, পালন এবং রক্ষায় মা দুর্গা স্বরূপিণী ষষ্ঠীদেবীর মাহাত্ম্য প্রচলিত হয়। তিনি বৈদিক দেবী নন। তবে বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারাটি বজায় রাখতে লোকসমাজে বহুল প্রচলিত ষষ্ঠীর ব্রতকথাগুলি আজো মানুষের কথা বলে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কথা, লিঙ্গবৈষম্যের কথা জানায়। তার ফাঁকে দেবীরা নিজেদের মাহাত্ম্য প্রচার করে সমাজে স্থায়ী আসন পেতে নেন। 

আদিম মাতৃপুজোর একটি বিশেষ অংশ হল ষষ্ঠীপূজা। মূলতঃ প্রজনন শক্তির দেবীরূপে ষষ্ঠী প্রাধান্য পেতে থাকেন। জনসমাজে প্রতিমাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতিথিতে দেবীর পুজো চালু হয়।

পুরাণ বা অভিধান যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন শিশুর রক্ষয়িত্রী এবং পালনকর্ত্রী ষষ্টীদেবী আজো নাকি সন্তান জন্মের পর নবজাতকের মাথার শিয়রে এসে শিশুর ভাগ্যলিপি লিখে দিয়ে যান। সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার ছ'দিনের মাথায় তাই এখনো অনেক স্থানে নবজাতকের আঁতুড়ঘরে সূতিকাষষ্ঠী বা পুকুরপাড়ে ঘাটষষ্ঠী অর্চিত হয়। কেউ বলেন ষেঠেরা বা ষাটষষ্ঠী।   ছ'দিনের পরে ও একুশদিনের মাথায় হয় শুদ্ধ ষষ্ঠী বা ষষ্ঠীপুজো বা একুশ্যাও ।
এছাড়াও বারোমাসের প্রতিটি শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে হয় মা ষষ্ঠীর আবাহন।


    • বৈশাখে গ্রীষ্মের দাবদাহে ফুটিফাটা বাংলার মাঠঘাটে মা মঙ্গলচন্ডীর পুজো হয় বর্ষার  আশায়। কৃষিপ্রধান বাংলার শস্যভান্ডারটিও ফুলে ফেঁপে উঠবে । অন্যদিকে এই সময়টা রোগভোগের প্রকোপও নিদারুণ। তাই সংসারে যাতে সেই প্রাদুর্ভাব না হয় তার খেয়াল ও রাখেন গৃহকর্ত্রী। ঘরে ঘরে এই শীতলা, ষষ্ঠী, চন্ডীর প্রতিমাসে পুজো তো আর কিছুই নয়। মা দুর্গা বা কালীর শরণ নেওয়া। 
 জাপানীভাষায় এই দেবীর নাম “চনষ্টী”। এই চনষ্টী শব্দটি সংস্কৃত শব্দ চন্ডীর অনুরূপ। সুকুমার সেনের মতে চন্ডী শব্দটি এসেছে চান্ডী থেকে। চান্ডী একজন অনার্যা দেবী, যিনি ওঁরাও, বীর, হোড়দের দ্বারা পূজিতা।চন্ডীমঙ্গলে আমরা ওরাঁও উপজাতিদের দ্বারা পূজিতা দেবীদুর্গার এই চান্ডী রূপটিই পাই।  বাংলার সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা মাটির বুকে শক্তির আরাধ্যারূপে পূজিতা চণ্ডীর সঙ্গে শীতলা, মনসা, বাশুলির পুজো হয়  ।

    • জৈষ্ঠ্যমাসের শুক্লপক্ষের অরণ্যষষ্ঠী বা জামাইষষ্ঠীর দিনটিতে বিন্ধ্যবাসিনী পূজিতা হন।
আদিতে বনদেবী ছিলেন অরণ্যের অধিষ্ঠাত্রী। জ্যৈষ্ঠের প্রখর তাপে জ্বলে পুড়ে খাক মাটি, বন জঙ্গল। বৃষ্টির কামনায়,পর্যাপ্ত শস্য ফলনের আশায় বনে গিয়ে গান গেয়ে আর পুজো দিয়ে বনদেবীকে সন্তুষ্ট করা ছিল প্রাচীন পন্থা। তার ঠিক পরেই নারী আর কৃষি সমার্থক হয়ে উঠল। অরণ্যের দেবীও তো নারীর মত একপ্রকার প্রজননের দেবী। একে জামাই ষষ্ঠী বলার কারণটি মহাভারতের আমলের। অর্জুনের অজ্ঞাতবাসে মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে গান্ধর্বমতে অরণ্যের মধ্যে  জ্যৈষ্ঠের এই ষষ্ঠীতে তাঁদের বিয়ে হয়। মণিপুরবাসী সেই নতুন জামাতাকে নানা রকম ব্যঞ্জনে আপ্যায়ন করে বরণ করেন । তাই তেমন এলাহি আপ্যায়ন এখনও জামাইষষ্ঠীর অঙ্গ।


    • আষাঢ়মাসে শনি-মঙ্গলবারে মহা ধুম করে চালু বিপদতারিণীর পুজো। যা কর্দমষষ্ঠী বলে পরিচিত।

    • শ্রাবণমাসের শুক্লপক্ষের তিথিতে ধুমধাম করে হয় লোটনষষ্ঠী বা লুণ্ঠন ষষ্ঠীর পুজো। সন্তানদের অকালমৃত্যু রোধে এই ব্রত পালিত হয় সন্তানের কল্যাণে।  প্রত্যেক ষষ্ঠীই আসলে মা দুর্গার পুজো। মায়ের এক অঙ্গে বহু রূপ।
শ্রাবণমাসে শুধুই কি শিবের পুজো হবে? তাই বুঝি মা দুর্গা এগিয়ে আসেন নিজের পুজো নিতে। ষষ্ঠী রূপিণী হয়ে, পুরুষ তান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এ যেন তাঁর নীরব প্রতিবাদ । আবার শ্রাবণসংক্রান্তিতে  হয় অরন্ধন। হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে কারো ঘরে উনুন জ্বলে না তখন।  জলে জঙ্গলে সাপখোপেদের সঙ্গে  যাদের অহোরাত্র ওঠাবসা মনসার ভাসান গীত তারাই গায় । সাপেদের দেবী মা মনসার পুজো এটাই। মা মনসা তুষ্ট  হলে তবেই সাপেরা উত্পাত করবেনা। এই তাদের বিশ্বাস। সেখানেও মাতৃতন্ত্রের জয়।


    • ভাদ্রমাসে, দুর্গাপুজোর ঠিক এক মাস আগে শুক্লাষষ্ঠী তিথিতে হয় চাপড়াষষ্ঠীর ব্রত।  সন্তানের ধনলাভের কামনায় এই ব্রত । ভাদ্রে ওঠা নতুন ধানে ভাদ্র লক্ষ্মীর পাশাপাশি এই চাপড়া ষষ্ঠীর পুজো এখনো সমাদৃত।  রাঢ় বাংলায় ভাদ্রমাসের প্রথমদিন থেকে ভাদু পূজা আরম্ভ হয় । পয়লা ভাদ্র কুমারী মেয়েরা গ্রামের কোন বাড়ীর কুলুঙ্গী বা প্রকোষ্ঠ পরিষ্কার করে ভাদু প্রতিষ্ঠা করে । একটি পাত্রে ফুল রেখে ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে সমবেত কন্ঠে ভাদু গীত গায় । ভাদু লক্ষ্মী আঞ্চলিক লৌকিক দেবী। ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে ভাদুর মূর্তি ঘরে এনে সংক্রান্তির সকালে দলবদ্ধভাবে ভাদু মূর্তির বিসর্জন দেয়। ঘরে ঘরে হয় ভাদু পরব। কন্যাভ্রূণ হত্যার যুগে ভাদু কন্যাশ্রীটিকেও ঘরের মেয়ে রূপে পুজো করা হয়। এও শিক্ষামূলক পদক্ষেপ আজকের যুগে। আবারো ভাদ্র সংক্রান্তিতে মনসার পুজো হয়। দক্ষিণবঙ্গে বলে রান্নাপুজো।


    • আশ্বিনের দুর্গাষষ্ঠী বা বোধন ষষ্ঠীর লোকগাথা বলে, স্বয়ং মা দুর্গা নিজের সন্তানকামনার্থেই এই ষষ্ঠী ব্রত পালন করেছিলেন । নিজের গর্ভজাত পুত্র নেই বলে মা দুর্গার আক্ষেপ ছিল । ষষ্ঠীদেবীর পুজো করে মা দুর্গার গর্ভে শিবের ঔরসে গণেশ এসেছিল।


    • কার্তিকমাসের শুক্লা ষষ্ঠীতে ছটপুজো সূর্যের পুজো হলেও মূলতঃ এটি গঙ্গাদেবীর পুজো। দুর্গার আরাধনা শুক্লাষষ্ঠীতেই হয় তাই বুঝি ষষ্ঠ>ষট> ছট কথাটি প্রচলিত। কারো মতে ছট্‌ অর্থাৎ ছটা বা সূর্যরশ্মির পুজো । কারো মতে সূর্যের দুই স্ত্রী  ঊষা এবং প্রত্যুষা কে স্মরণ করা হয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আবারো সেই নারীশক্তির আরাধনা।

    • অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে কুলুই চন্ডীর ব্রত, রবিবারে ইতুপুজো আর বৃহস্পতিবারে হেমন্ত লক্ষ্মীর পুজো হয় । আসলে যিনি কুলুই চণ্ডী, তিনিই ইতু তিনিই ষষ্ঠী রূপিণী মা দুর্গা, তিনিই হেমন্ত লক্ষ্মী।  বারেবারে স্মরণ মনন তাঁরই। লোকশিক্ষার মোড়কে নতুন নতুন গাথার জন্ম হয়। ইতু কৃষি দেবী। আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে ইতুপুজো দুর্গাপুজোর নবপত্রিকার মত । অঘ্রাণে সদ্য ওঠা নতুন ধানের উৎসবে মেতে ওঠার আরেক অর্থ হল হেমন্ত লক্ষ্মীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।

    • পৌষমাসে রাঢ়বঙ্গে টুসু পুজোর ধুম । ঘরের কন্যাশ্রী আদরের টুসুমণি লৌকিক দেবী। । আবার পৌষ মাসে নতুন ধানের গন্ধে পৌষসংক্রান্তিতে একদিকে টুসু পরব অন্যদিকে পিঠে পার্বণের ঘটায় পৌষলক্ষ্মীর জন্য নতুন শস্যের বরণডালা সাজানো। দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন। ধানের তুষ হল টুসুপুজোর প্রধান উপাচার। তাই বুঝি এই দেবীর নাম তুষু বা টুসু। 


    •  মাঘ মাসের শ্রী পঞ্চমীর পরদিন হয় গোটা ষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠীর অরন্ধন । আগের দিন রাঁধা হবে গোটাসেদ্ধ আর পান্তা ভাত। পরদিন খাওয়া হবে। তোলা থাকে শিলনোড়া ! শিলকে হলুদ জলে স্নান করিয়ে তেল হলুদ ছোপানো ঠান্ডা কাপড় পরিয়ে জোড়া শিম, জোড়া মটরশুঁটি রেখে তার কোলে রাখো তার সন্তান সম নোড়াটি। শীতলা বাংলার জনপ্রিয় লৌকিক দেবী। বসন্তরোগের দেবী হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে পূজিতা ।  শীতল বা বাসি নৈবেদ্যাদি শীতলার পছন্দের। তিনি রোগ-তাপ দূর করে শান্তি স্থাপন করেন । বাংলাদেশে শক্তির আরাধ্যারূপে পূজিতা দেবী শীতলা, ষষ্ঠী, সকলেই মা দুর্গার অংশ বিশেষ।

    • ফাল্গুন মাসে নীলের ব্রত কিন্তু তা ষষ্ঠী কারণ ষষ্ঠীর সঙ্গে সন্তান লাভ এবং সন্তানের কল্যাণ কামনার অনুষঙ্গ জড়িত । নীল কথাটি নীলকন্ঠ মহাদেবের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে। এ যেন দেবীর আকুতি। আমার সন্তানের কল্যাণ করো হে নীলকণ্ঠ, সব বিষ কণ্ঠে নিয়ে নিয়ে তাদের অমৃত দাও! আর মাদুর্গার বার্ষিক পুজোর ভীড়ে শিবঠকুরের ব্র্যান্ডভ্যালু যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে । মানে আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে পড়ে নিজের নামের পাশে ষষ্ঠী জুড়ে দিলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কর্তাব্যাক্তিরা? যেন সন্তানের মঙ্গলার্থে শুধু মা ষষ্ঠীই নয় শিব‌ও আছেন কিন্তু, একথা ভুলে যেও না হে ব্রতী! 

    • চৈত্রমাসে বাসন্তী পুজোয় অশোক ষষ্ঠীও শরতকালের মা দুর্গার পুজোর অনুরূপ ।  যমদংষ্ট্রা শরত ও বসন্ত এই দুই ঋতুতে মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধি ভোগ করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী তাই আবির্ভূতা হন এই দুই সময়েই । মা দুর্গা তখন অশোকা অর্থাৎ শোক রহিতা, বসন্তের দেবী বাসন্তী।

উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের কাছে প্রিয় তিস্তানদী এক বয়স্ক শুভ্র বসনা রমণী যার কেশ শুভ্র, হাতে লাঠি ।  প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা থেকে বাঁচতেই সেখানে হয় তিস্তাবুড়ির পুজো। রাজবংশীদের মতে, এই পুজো শুধু নদীকে তুষ্ট করে না যারা এই পুজোয় অংশ নেয় তাদের পারিবারিক বিবাদও মেটে। 
কোথাও এই দেবী তিস্তাবুড়ি, কোথাও বা মেছেনি । চৈত্র ও বৈশাখ মাসে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মহিলারা প্রচার করেন দেবী তিস্তার মাহাত্ম্য মেছেনি গানের মধ্য দিয়ে-

আবার আশ্বিনে  তিস্তা ও জলঢাকা পাড়ের গ্রাম মাতে প্রাচুর্যের দেবী ভাণ্ডানীর আরাধনায়। দুর্গা পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তরবঙ্গের গ্রামবাংলায় ফের বোধনের সুর বেজে ওঠে। দেবী দুর্গার অপর রূপ দেবী ভান্ডানিকে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের বনবাসীরা পুজো করে ‘বনদুর্গা রূপে’।

কোচবিহারেও পশ্চিমবাংলার আর পাঁচটি জেলার মত সন্তান পালনের দেবী হিসেবে  রাজবংশীরা যে ষষ্ঠীর ব্রত করেন তার নাম ষাইটোল বা সাইটাল।   
সাইটোল হল শোলা দিয়ে বানানো মা ষষ্ঠীর লৌকিক রূপ।
ষাইটোল ওদের ভাষায় ষষ্ঠী। ষষ্ঠী থেকেই সাইটোল বা ষাইটোর শব্দের উত্পত্তি।

উত্তরবঙ্গের ষাইটোল দেবীর পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবনে বনবিবিও কিন্তু মা দুর্গার অংশ বিশেষ। সুন্দরবনাঞ্চলে মধু সংগ্রাহক, কাঠুরে, মৎসজীবীদের দেবী বনবিবি, বনদেবী বা ব্যাঘ্রদেবী একই সঙ্গে হিন্দু ধর্মের দেবী ও কিছু বনবাসী মুসলমানদের পীরানি। সুন্দরবনের ‘গার্ডিয়ান স্পিরিট’ বা রক্ষাকারী শক্তি, অভিভাবক ।

সুন্দরবন অঞ্চলের লোকায়ত এই দেবী হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে পূজিত হন। বনবিবি বনদুর্গা‌, বনচণ্ডী, বনষষ্ঠ‌ী বা বিশালাক্ষী। বাংলাতে ইসলামের প্রভাবে তিনি বনবিবি ।
স্থানীয় মানুষ বনে প্রবেশের আগে বনবিবির পূজা করে। সুর করে গান গেয়ে  বনদেবীর কাছে প্রার্থনা করে ।

সুন্দরবন অঞ্চলে এই বনবিবি ছাড়াও ষষ্ঠীঠাকরুণ, কলেরার হাত থেকে বাঁচার জন্য ওলাইচন্ডী বা ওলাবিবি, জ্বরজারির মহামারী রোধে শীতলা বা জ্বরাসুর, সাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য মনসাপুজো করা হয়।

আনাচেকানাচে দেবীপুজোর সঙ্গে বাংলার ব্রতকথায় দেবীপূজার প্রবল প্রচার দেখে দেবীদের পাল্লাই ভারী মনে হয় । আজকের নারীবাদের ধ্বজা উড়িয়ে যখন আমরা একটা ভয়ানক হুজুগে মেতেছি তখন মনে হয়, এ আর নতুন কি? আমাদের  বারোমাসের তেরোপার্বণে সবপুজোই তো প্রায় নারীদের উত্সর্গ করে। লোকসাহিত্যের আঙিনায় কান পাতলে শুনি চন্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, শীতলামঙ্গল, বাশুলী মঙ্গল বা অন্নদামঙ্গলের  কাহিনীর ছত্রে ছত্রে দেবীমাহাত্ম্যের বর্ণনা।

অর্থাত দেবী প্রসন্না হলে মানুষকে মুক্তিলাভের জন্য অভীষ্ট বর প্রদান করেন।

প্রতিমুহূর্তেই ব্রতপালনের দ্বারা স্মরণ এবং মনন হয় নারীশক্তির। মূলতঃ তিনি মাতৃ রূপিণী শক্তি। পুরুষের তথা সমাজের চালিকা এবং দাহিকা শক্তি। বাকীটা কিংবদন্তী। লোকমুখে প্রচলিত। লোকগাথায় সমাদৃত ।


মূল পেপার টি প্রকাশিত হয়েছে বই আকারে। কিছুটা দেওয়া হল এখানে। 

১৬ জুন, ২০১৯

কিশোর গল্প সংকলন "চিন্তামণির থটশপ" নিয়ে রিভিউ




১৩ জুন সাপ্তাহিক বর্তমান- এ ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়-এর কিশোর গল্প সংকলন 'চিন্তামণির থটশপ'-এর আলোচনা
বইটির প্রাপ্তিস্থান - ধানসিড়ি বই (কলেজস্ট্রিট), ধানসিড়ি বইঘর (সিঁথি),
এছাড়াও দে বূক স্টোর, ধ্যানবিন্দু, দে'জ (কলেজস্ট্রিট)
রিড ইন ( সন্তোষপুর), সংকলন (কৃষ্ণনগর), বিশ্বাস বুক স্টল (বহরমপুর), পুনশ্চ (মালদা)
অনলাইন থেকে সংগ্রহের লিংক :
রিড বেঙ্গলি বুকস - https://readbengalibooks.com/index.php/chintamonir-thoughtshop.html

ফ্লিপকার্ট - https://www.flipkart.com/chintamonir-thoughtshop/p/itmfefv2nzwb6qdd?pid=9789386612908&lid=LSTBOK9789386612908NM5RNV&marketplace=FLIPKART&srno=s_1_1&otracker=search&otracker1=search&fm=SEARCH&iid=1331a2b2-0332-4c00-a8e3-bacbeb1ddf30.9789386612908.SEARCH&ppt=sp&ppn=sp&ssid=7hudacj33kskkc401560570949636&qH=c715c96a16095bda

বইচই - https://www.boichoi.com/chintamonir_thoughtshop
— with Indira Mukhopadhyay.

২০ এপ্রি, ২০১৯

যতসব !!!

একেই ভোটের বাজারে চ্যানেলে চ্যানেলে ঘটি গরম, প্রোমোটাররাজের কৃপায় বাড়ির গরম, ব্যাঙ্কের ইএমআই এর শাইনিং বিজ্ঞাপনের দৌলতে ক্রমবর্ধমান গাড়ির গরম, নিয়মিত অরণ্যমেধ যজ্ঞে আহুতি দিতে দিতে আর ছোটবড়,কুট্টি, আন্না পুকুর বুজিয়ে পরিবেশের দ্রুত গরমায়ন। সবমিলিয়ে পরিবেশের বেজায় দম্ভ। বড় গরম দেখায়। উঠতি কবি, লেখকদের আরো দেমাক। সেই গরমে পা পড়েনা তাদের। তারপরে আমাদের কারণে অকারণে সবার মাথা গরম। গরম লেগে ছেলেপুলের গা গরম । মধ্যবয়সী মায়েদের মেনোপজের কারণে যখন তখন হটফ্লাশ। কাজের চাপে গরমে ক্লান্ত পথেঘাটের মানুষদের গরম গরম বক্তিমে। আর সেই সঙ্গে শাইনিং ইন্ডিয়ার মাহাত্ম্যে দেশের সম্মিলিত ফ্রিজ এবং এসিগুলোর দ্বারা পরিত্যক্ত গরম গ্যাসের গরম। আর কত বলব মশাই? এই গরমে ফুটি ফাটছে, মা রাগছে, মাটি ফাটছে। মানুষ রাগে ফেটে পড়ছে। পুরোটাই তাপ নিঃসারক বিক্রিয়া মশাই। মানে এক্সো থার্মিক রিএকশান। উঁহু! অত কালবোশেখি নয় আর। পেয়ে পেয়ে বড্ড নোলা বেড়েছে না? বিষ্টি অত্ত সস্তা নয়। একি বিগবাজারের বুধবারের সস্তে পে সস্তা পেয়েছ? নিজেরা জলীয় বাস্পের গুস্টির তুষ্টি করেছে এখন চেল্লাচ্ছে। ঠিক আত্মঘাতী বাঙালীর জাত। নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে আর এখনও বলে চলেছে সব দোষ এর, ওর। আমাদের পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গোরু, মরাইভরা ধান ছিল। তো?
নিজের গুষ্টি হিংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে বাবু। তোমরা ইংলিশ লিখতে, বলতে পারোনা তো? আর ইস্কুলে ইংরেজির টিচার পাচ্ছে না তো?
রক্ত দিয়ে রোখা অটোমেশন বাবুরা আজ ঠান্ডা ঘরে ল্যাপটপ খুলে ফেসবুকিং এ ব্যস্ত, দেখতে পাওনা? বাড়িতে সবাই তাদের কম্প্যু লিটারেট। তো?
নিজেরা চুপিচুপি ভেলোরে গিয়ে চিকিস্যা করে আসে, ভরসা নেই বাংলার ওপর। তো?
অন্য রাজ্যে যখন ছেলেমেয়েগুলো পড়তে পালালো তখন ব্যাঙের ছাতার মত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হল। সেখান থেকে পাশ করে ব্রিজ বানাচ্ছে। আর ভাংছে। তো?
পুজো হচ্ছে। উৎসব হচ্ছে। মেলা হচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে। তো?
তো আমার ছেলেটা ফিরে এসে কোথায় চাকরি পাবে বলে দেবে কেউ? নাকি আবার বলবে তো?
এই দেখুন আবার মাথাটা গরমে জ্বলে উঠল।তার চেয়ে এই ভালো।
মিডিয়া গরম গরম খবর দিক আপনাদের। শ্রাবস্তীর তিন বার বিয়ের কিম্বা প্রিয়াংকার বিয়ে ভাঙার। এইসব গসিপে কারোর গরম লাগেনা।

১১ এপ্রি, ২০১৯

দুর্গা চৈতালী

আজ অশোক ষষ্ঠী। চৈত্রমাসের দুর্গা পুজোর শুরু। হিন্দুদের এই পুজো চলে পাঁচ দিন। খ্রীষ্টানদের ইস্টার শুরু হয় মন্ডি থার্সডে তে। শেষ হয় ইস্টার মানডে' র দিন। ঠিক পাঁচদিন। পাশ্চাত্যের ইস্তারা দেবী আর প্রাচ্যের দুর্গায় যেন বড্ড মিল। আমাদের অশোকা-বাসন্তী-চৈতালী দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন ৬টি করে অশোক ফুলের কুঁড়ি কলা বা দৈ সহযোগে গিলতে হয়। অশোকফুলের ওষধি গুণ মেয়েদের রোগের অব্যর্থ। তাই বাত্সরিক টীকাকরণ বলে মনে হয় আমার। অশোক অষ্টমী পরশু। সেদিন অন্নপূর্ণা পুজো, দুর্গাষ্টমী।আবার ওষধির সেকেন্ড ডোজ। সেদিন ৮টি অশোক ফুলের কুঁড়ি আবার খেতে হবে। আমার বাপু বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। আর বাকীটা সন্তানের মঙ্গলার্থে। আর কিছুই করিনা। পয়সা তুলে রাখি সম্বচ্ছরিক কৌটোয়। সেই দুর্গাষ্টমীতে পুজো দি‌ই। তবে আজ শরীরের কিছুটা হলেও ডিটক্সিং। তরমুজ, বেলের পানা, ফল, নারকেল, দুধ, কলা দিয়ে সাবুমাখা দিয়ে লাঞ্চ। রাতে অবিশ্যি রেঁধেছি ছোলা, নারকেল কুচি, পটল, কুমড়ো, আলু দিয়ে কুমড়োর ছক্কা। এক টুসকি হিং দিয়েছি। বাকীটা পরে ভাবা যাবে। লুচি না পরোটা খুব একটা খাই না। তবে আজ খেতেই হবে। পোড়া খেতে নেই। সেখানেও বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। তর্ক করিনা। কারণ টা ব্যাক্তিগত।  
বাকীটা এইখানে...

https://sahityo.life24.in/probondho-durga-choitali/


২৪ অক্টো, ২০১৮

কোজাগরীর চিঠি

সুজনেষু সব ব্রতীরা আমি আজ জেগেই থাকব সারাটা রাত। যতক্ষণ না পূর্ণিমার চাঁদ ডুবে যায় আকাশের মধ্যে। যতক্ষণ না আমার চোখের পাতা ক্লান্ত হয়। যতক্ষণ না আমি তার দেখা পাই। কেউ ঘুমিওনা আজ রাতে। ঘুমিয়ে পড়লেই আমার শব্দ শুনতে পাবে। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আমি চুপিচুপি বলব "জাগদেরহো"! আমার ঘুম নেই চোখে। আর আমিও ঘুমোতে দেবনা কারোকে। শারদপূর্ণিমা আমার যে ভীষণ প্রিয়। আশ্বিন-কার্তিকের এই পূর্ণিমার সময় বর্ষা ঋতু ফিরে যায় একবছরের মত। মৌসুমীবায়ু বিদায় নেয়। শস্যশ্যামলা মাটিতে নতুন আউস ধানের গন্ধ ওঠে। তোমাদের ঘরে ঘরে পরব আর আমি তখন কোজাগরী। আমার তখন কৌমুদী-উত্সব। চাঁদের আলোয় তখন আমার রাত পরিক্রমার শুরু। আমি কোজাগরী হয়ে দেখব কে আমাকে চায়। কে আমার পালন করে। কে আমাকে বেঁধে রাখে আজীবন। জানো ? আমরা দুই যমজ বোন। লক্ষ্মী আর অলক্ষ্মী। আমার সব সোজাসাপটা, সাধাসিধে । আমার ধীরস্থির চলনবলন। আমি শান্তশিষ্ট, বেশী আওয়াজ আমার নাপসন্দ। বেশী খাওয়া দেখলেই আমার বমি আসে। আমি মিষ্টি, দুধের খাবার পছন্দ করি। আর আমার বোন অলক্ষ্মীর সব উল্টো। সে যেমন কলহপ্রিয়া তেমনি কোলাহল প্রিয়া। সে বড্ড বেশী খায় আর যতসব টক, ঝাল আর বিদঘুটে সব খাবার তার পছন্দের। সে যেমনি বাচাল তেমনি চঞ্চল। আমাকে ছাড়তে নাছোড় সে। আমারো খুঁতখুঁতানি থাকে তাকে নিয়ে । নিজের সংস্কারটা শুদ্ধ রাখতে চাই যে! ওর সঙ্গদোষে যদি আমি খারাপ হয়ে যাই! ভয় হয়। অলক্ষ্মী যেমনি হোক, আমার আশেপাশেই থাকে। বোন তো! ফেলতে পারিনা, গিলতেও পারিনা তাকে। তবে আমার দাপটে সে একটু হলেও চাপে থাকে সর্বদা। সাধারণ মানুষ বিষ্ণুর অবতারত্ব নিয়ে কতকিছু বলে কিন্তু আমি মেয়ে বলে আমার কথা কেউ বলেনা। আমি ত্রেতায় রামের সহধর্মিণী সীতা, দ্বাপরে কৃষ্ণের পত্নী রুক্মিনী। পুরাণে বলে সমুদ্রমন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে পদ্মফুল হাতে আমি উঠে এসেছিলাম। তাই আমার অপর নাম পদ্মা। আমি আবার নাকি পদ্মফুলে বসি তাই আমার নাম কমলা। আমি বিষ্ণুর প্রেমিকা তাই আমার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া। এমন সব কত আদরের, আহ্লাদের নাম আমার । সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে এসেছিলাম তাই কেউ আমায় বলে সমুদ্রকন্যা। কেউ আবার ডাকে ভূদেবী অর্থাত সারা পৃথিবীর, সমগ্র প্রকৃতির পালনকর্ত্রী নাকি আমি। ঐ দ্যাখো সকলেই বলে "বিশ্বরূপস্য ভার্য্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে সর্বতো পাহি মাং দেবী মহালক্ষ্মী নমোহস্তুতে" তবুও দেখো আমার না আছে পিতামাতা। না আছে স্বামীসন্তানের সুখ। তাই তো আমি সেই দুঃখ ভুলে গিয়ে জগতের পালন করতে তোমাদের ধনদৌলত আগলাতে সর্বদা ব্যস্ত থাকি। আমার আর কে আছে তোমরা ছাড়া! আর কোজাগরীর দিনে মানে বছরের ঐ একটি বিশেষ পূর্ণিমা তিথিতে আমার কাজ হল ঘুরে ঘুরে দেখা কোথায় নষ্ট হল ধান, কার গৃহে অলক্ষ্মী বাস করল, কে খেতে পেয়েও রাখতে পারলনা আর কে তিলতিল করে সঞ্চয় করে ঘরে আনল লক্ষ্মী। উজ্জয়িনীর এক ধার্মিক রাজা তাঁর প্রজাপালনের জন্য খুব সুখে কাল যাপন করতেন। একবার তিনি ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর রাজ্যের হাটে কোনো অবিক্রিত জিনিষ যেন না পাড়ে থাকে। দিনের শেষে তিনি‌ই সেই জিনিষটি কিনে নেবেন দোকানীর কাছ থেকে। রটে গেল খবর। জানা গেল এক কামারের কাছে এক ভয়ানক চেহারার বিশ্রী নারীমূর্তি পড়ে রয়েছে। কামারকে জিগেস করতেই সে বলল, মহারাজ এটি নাকি অলক্ষ্মী মূর্তি তাই কেউ কিনতে চাইছেনা। মহারাজ বললেন, তিনি যখন কথা দিয়েছেন তখন সেটি কিনে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। নয়ত অধার্মিক রাজা হিসেবে তাঁকে রাজ্যের মানুষ চিনে যাবে। রাজা অগত্যা সেই লোহার মূর্তিটি কিনে এনে নিজের ঠাকুরবাড়িতে তাকে আশ্রয় দিলেন। মাঝরাতে নিজের রাজপুরীর মধ্যে মেয়েলি কান্নার কন্ঠস্বর শুনে রাজা দেখতে পেলেন এক ক্রন্দনরতা নারীমূর্তিকে। রাজা তাকে জিগেস করলেন" তুমি কাঁদছো কেন মা?" সেই নারী বললে," মহারাজ, আমি আপনার রাজলক্ষ্মী, আজ আপনার বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি" রাজা বললেন, কেন মা? আমি কি অন্যায় করেছি? জানতে পারি? " সেই নারীমূর্তি বললে," আপনি রাজবাড়িতে অলক্ষ্মীকে ঠাঁই দিয়েছেন। অতএব আমি আর এখানে থাকতে পারবনা। " এই বলে অন্তর্হিতা হলেন। আবার কিছুপরে রাজা দেখলেন আরেক সুন্দরী, সুশীলা নারী প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে হল ভাগ্যলক্ষ্মী। তার কিছুপরেই যশোলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী, সকলেই একে একে রাজপুরী থেকে বিদায় নিল। রাজার সেরাতে ঘুম এলনা। এবং সকলেরি বিদায় নেবার কারণ হল সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি যেটি রাজা কিনে এনেছিলেন। এভাবেই তাঁর দিন কাটে। তবুও শিল্পীর হাতে বানানো সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি ফেলে দিতে রাজার মন চায়না। শিল্পীতো আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরী করেছে তাকে। শিল্পীর শিল্পীসত্তায় আঘাত করতে মন চায়না রাজার। তাই প্রাসাদ থেকে একটু দূরেই সরিয়ে রাখেন তাঁকে কিন্তু ফেলতে পারেন না। ক্রমে তিনি দরিদ্র হতে থাকলেন। ধন, মান, যশ, সাফল্য ভাগ্য তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একদিন রাজা দেখতে পেলেন ধর্মরাজ তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রাজা তখন নিরূপায় হয়ে ভাবলেন এটা মেনে নেওয়া যায়না। ধর্ম তাঁকে ত্যাগ করলে তিনিতো অধার্মিক রাজা রূপে পরিগণিত হবেন। রাজা তখন ধর্মকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন। ধর্মরাজা রাজার যুক্তি শুনে খুব খুশি হলেন। ধর্মরজের কথায় আশ্বিনমাসের পূর্ণিমায় রাণীকে কোজাগরী ব্রত পালন করতে বললেন । রাণী সারারাত জেগে বসে র‌ইলেন। আর নিষ্ঠাভরে লক্ষ্মীর পুজো করে রাজা সব ফিরে পেলেন। আবার আগের মত তাঁর রাজবাড়ি ভরে উঠল জাঁকজমকে, ধনসম্পত্তিতে। এইগল্পটা শুনে তোমরা বলবেতো নিজের ঢাক নিজে পেটালাম? আসলে কি জানো? আমি তো চাই তোমাদের ঘরে আটকে থাকতে। তোমাদের ভালোর জন্যে অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি সব দিয়ে তোমাদের ধনী করতে। কিন্তু তাই বলে অলক্ষ্মীর জন্যে সত্যকে, অধর্মকে তো আর মেনে নিতে পারিনা। ঐ রাজার চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো গুণ হল তিনি সত্‌ এবং ধার্মিক। আর তাইতো ধর্মরাজা সবকিছু ফিরিয়ে দিলেন রাজাকে। অলক্ষ্মীর প্রতিও অবিচার করেননি রাজা আর শিল্পীর প্রতি তো নয়‌ই। আমার জীবনের কত গল্পের কথা আর বলি তোমাদের? নারায়ণের পাশে আজীবন সদা সুহাসিনী লক্ষ্মীকে দেখে তোমরা ভাবো এই দম্পতির কত সুখ! আদর্শ স্বামীস্ত্রী ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে শোনো আমার সপত্নীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গল্প। কত ঝড় বয়ে গেলে একটা মেয়ে লক্ষ্মীমেয়েতে পরিণত হয় দ্যাখো তোমরা! কত অসহনীয় টানাপোড়েন একজন নারীকে লক্ষ্মী করে তোলে! পুরাণের আরেকটি গল্পের মতে সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং গঙ্গা ছিলেন বিষ্ণুর তিন পত্নী । বিষ্ণু কিন্তু গঙ্গার প্রতি একটু বেশিমাত্রায় আসক্ত ছিলেন । নম্রস্বভাবের লক্ষ্মী এই ঘটনায় মনে মনে খুব দুখঃ পেতেন কিন্তু কিছু প্রকাশ করতেন না । সরস্বতী কিন্তু বিষ্ণুর এই অতিরিক্ত গঙ্গাপ্রেমকে প্রশ্রয় না দিয়ে অশান্ত এবং রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন । একদিন তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল । প্রচন্ড উগ্রমূর্তি ধরলেন তিনি । গঙ্গার মুখোমুখি হলেন । লক্ষ্মী একটি ভয়ানক কলহের পূর্বাভাস পেয়ে সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যিখানে এসে দাঁড়ালেন । সরস্বতী লক্ষ্মীকে অভিশাপ দিয়ে একটি গাছে পরিণত করলেন । লক্ষ্মী আবার সেই অভিশাপে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সরস্বতীকে নদীতে রূপান্তরিত করলেন । সরস্বতী নিজেও তখন উগ্রচন্ডা । নিজে নদীতে পরিণত হয়েছেন বলে গঙ্গাকেও নদী হতে অভিশাপ দিলেন । ইতিমধ্যে বিষ্ণু সেইখানে হাজির হলেন । এতসব ঝগড়া বিবাদ দেখে ও শুনে স্থির করলেন সরস্বতী ও গঙ্গার সাথে আর নয় । এখন থেকে তিনি কেবলমাত্র লক্ষ্মীর সাথেই ঘর করবেন । সরস্বতীকে ব্রহ্মার হাতে এবং গঙ্গাকে শিবের হাতে সমর্পণ করে বিষ্ণু হলেন লক্ষ্মীর প্রিয় পতিদেবতা । আর সরস্বতী ও গঙ্গার ওপর এরূপ অন্যায় শাস্তির জন্য লক্ষ্মী মনে মনে ব্যথিত হলেন আবার বিষ্ণুকে একান্ত নিজের স্বামীরূপে বরণ করে আনন্দিতও হলেন । বিষ্ণুকে শান্ত হতে বললেন এবং তাদের দুজনের আশীর্বাদে লক্ষ্মী ও গঙ্গা মর্ত্যের ওপর দিয়ে নিজ নিজ গতিপথে ব‌ইতে লাগল । স্বর্গে তাদের দুজনার একটি করে শাখা বিষ্ণুর হাত ধরে র‌ইল। তবে যাই বলো সেই বৈদিকযুগ থেকে আমি স্বীকৃতি পেয়ে আসছি সৌভাগ্য ও ঋদ্ধিদায়িনী দেবী রূপে। আমি যখন শুভদায়িনী তখন কল্যাণী বা পুণ্যলক্ষ্মী আর অশুভদায়িনী যখন তখন আমি অলক্ষ্মী। কেউ বলেন আমি মাদুর্গার কন্যা । কেউ বলেন আমি মায়ের অন্য একটি রূপ । মহাদেব নিজের দেহ থেকে সৃষ্টি করেছিলেন ঊমাকে এবং ঊমা পরে সৃষ্টি করেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, দুর্গা এবং কালীকে । শ্রী শ্রী চন্ডীতে দুর্গাদেবীকেই মহালক্ষ্মী রূপে আখ্যা দেওয়া হয় । বাঙালী কল্পনাপ্রবণ জাতি । সপরিবারে মা দুর্গাকে না দেখলে তাদের যে মন ভরেনা । তাই তো দুই শক্তি লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে দুপাশে আমরা দেখি এবং মহানন্দে বরণ করি । লক্ষ্মীদেবী হলেন বিষ্ণুপ্রিয়া বা নারায়ণী যিনি সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক আর সরস্বতী হলেন বাগদেবী, বিদ্যা-বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী, জ্ঞানদায়িনী। অর্থাত এই দুই নারীশক্তি সকল শুভ, সৃজনশীল, গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপের উত্স । তাই শুভ শক্তির প্রতীকও বটে । আমার বাহন পেঁচা। তাই বলে ঐটুকুনি পেঁচার ওপরে আমি বসে থাকি আর সে আমাকে নিয়ে উড়ুক আর কি! এসব বাহন তত্ত্ব মনগড়া। লক্ষ্মীর বাহন নিশাচর পেঁচা । অন্ধকার যার আশ্রয় । লক্ষ্মী সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির আলোর দিশা দেখান পেঁচাকে সাথে নিয়ে অর্থাত অন্ধকার ও আলোর মধ্য থেকে জীবজগত আলোর দিশা খুঁজে নেবে । কারণ জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের লড়াইতে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য উভয়ই থাকবে কিন্তু সব পরিস্থিতিতেই অবিচল থেকে আলোর পথ যাত্রী হয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলতে হবে । জাগতিক সত্ত্ব ও তমগুণের মধ্য থেকে সত্ত্বটুকুকে বেছে নিতে হবে । তাই বলে তমকে বাদ দিলেও বাদ দেওয়া যাবে না তাই এই নিশাচর । এত জ্ঞান দিলাম চিঠিতে কিন্তু কেউ কি জানবে আমার কথা? ইতি আমি কোজাগরী

১৫ অক্টো, ২০১৮

কাউন্টডাউনঃ৬- এক মেয়ের এত নাম???

নামদুর্গা
মাদুর্গার এক অঙ্গে বহুরূপ। এক রূপে বহুনাম্মী আমাদের মা দুর্গা ।
অদ্রিজা মাদুর্গার আরেক নাম । অদ্রি অর্থাত পর্বত হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁকে এই নামে ভূষিত করা হয় ।
দুর্গা শব্দটির অর্থে আসা যাক ।
দুর্গা =  দুর্গ + আ =  দ্+উ+র্+গ্ +আ


দ এর অর্থ দৈত্যনাশ
উ এর অর্থ বিঘ্ননাশ
র এর অর্থ রোগনাশ
গ এর অর্থ পাপনাশ এবং
আ এর অর্থ ভয় ও শত্রুবিনাশ ।


দুর্গ শব্দের অর্থ দৈত্য, বাধাবিঘ্ন,  দুঃখশোক, নরকযন্ত্রণা, রোগব্যাধি… এহেন নানাবিধ অশুভকিছু  আর “আ” অর্থটি বাংলাভাষায় নাশ করা বা বধ করা বোঝায় । সেই কারণে দুর্গা শব্দের অর্থ দাঁড়ায়  জীবের জীবন থেকে যা কিছু অশুভ শক্তির বিনাশ কারী দেবী শক্তি । নিজের নাম প্রসঙ্গে দেবী বলেছেন চন্ডীতে


“তত্রৈব চ বধিষ্যামি দুর্গমাখ্যং মহাসুরং
দুর্গা দেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি” ।।


কিন্তু দুর্গা নাম এল কিভাবে? পুরাকালে দুর্গম নামক এক অত্যাচারী অসুর দেবতাদের পরাজিত করে বেদ শাস্ত্রকে হরণ করে । তার উদ্দেশ্য ছিল জীবজগতে ধর্মের বিনাশ ঘটানো । সমাজে এমন বিশৃঙ্খলা দেখে দেবতারা সমবেত ভাবে মহামায়ার শরণাপন্ন হন । কোনো অসুর যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিষ্ট সাধন না করতে পারে তাই দেবী দেবতাদের আরাধনায় তুষ্ট হয়ে সমগ্র “বেদ”কে স্বীয় দেহে ধারণ করেন । বেদময়ী দেবীকে দেবগণ “দুর্গা”  নামে ভূষিত করেন । দেবী পুরাণ মতে দুর্গা নাম স্মরণ করলেই ত্রিতাপ দুঃখ, জ্বালা যন্ত্রণা মুক্ত হয়  এবং এরূপে তিনি জীবের কল্যাণদায়িনী, রোগ-শোক বিনাশিনী রূপে জীবকে অশুভ শক্তির হাত থেকে উদ্ধার করেন  । অথবা বলতে পারি মহাশক্তিকে লাভ করার দুর্গম পথকে যিনি সুগম করে দেন তিনিই দুর্গা ।
  শিবঘরণী, শিবসোহাগীনি দুর্গা হিমালয় পর্বতের কন্যা বলে তাঁর এক নাম পার্বতী। তিনি বিশ্বচরাচরের অন্নদায়িনী তাই অন্নপূর্ণা, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। স্যার ফ্রেজার তাঁর  Adonis গ্রন্থে  প্রাচ্যের এক বৃষভবাহন দেবতা ও সিংহবাহিনীদেবীর উল্লেখ করেছেন। তিনি শিব বা দুর্গার নাম উল্লেখ করেননি কিন্তু তারাই যে আদতে আমাদের হর-গৌরী তা একেবারে সুস্পষ্ট। A short history of religion গ্রন্থে কেলেট সাহেব মুক্তকন্ঠে প্রকাশ করেছেন শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবতা সর্বপ্রথম প্রাচ্যেই বিকাশ লাভ করেছিলেন। তাঁর ব‌ইতে বোনদিয়া (Bona Dea) নামক এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় যিনি a deity of fertility বলে প্রচলিত এবং এই বোনদিয়া আমাদের সুন্দরবনের বনদুর্গা বা বনবিবি যিনি আমাদের শাকম্ভরী দুর্গা সে কথা বুঝে নিতে আমাদের অসুবিধা হয়না ।  এই শাকম্ভরী হল মাদুর্গার অনেকগুলি নামের মধ্যে অন্যতম।
শরতঋতুতে আবাহন হয় বলে দেবীর আরেক নাম শারদীয়া। এছাড়া মহিষাসুরমর্দিণী, কাত্যায়নী, শিবাণী, ভবানী, আদ্যাশক্তি, চন্ডী  এইসব নামগুলি বাংলাদেশেই প্রচলিত। নেপালে দেবী নবরাত্র, কাশ্মীরে অম্বা, গুর্জরে হিঙ্গলা বা রুদ্রাণী, কনৌজে কল্যাণী, দাক্ষিণাত্যে অম্বিকা , মিথিলায় ঊমা নামে তিনি পূজিতা ।  এছাড়া বাংলাদেশের সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা মাটির বুকে শক্তির আরাধ্যারূপে পূজিতা দেবী শীতলা, মনসা, বাশুলি, ষষ্ঠী, মঙ্গলচন্ডী সকলেই মা দুর্গার অংশ বিশেষ। শ্রীশ্রীচন্ডীর একাদশ অধ্যায়ে আছে অনাবৃষ্টির সঙ্কটে পৃথিবী যখন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে তখন ঋষিদের স্তবে তুষ্ট হয়ে শক্তিময়ী দেবী নিজের দেহ থেকে উত্পন্ন শাকসব্জীর দ্বারা বিশ্ববাসীর প্রতিপালনে সচেষ্ট হন। সেই শাক ভক্ষণ করে মানুষ প্রাণ ফিরে পায়। ইনিই দেবী শাকম্ভরী।  যতদিন না পর্যন্ত বৃষ্টি হয় ততদিন সমগ্র বিশ্বের মানুষকে দেবী নয়রকম শাক খাইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাই এই শাকম্ভরী ই শতাক্ষী, দুর্গা, ঊমা, গৌরী, সতী, চন্ডী, কালিকেশা ও পার্বতী নামে বিদিতা। রাজস্থানের কাছে আজমীরে শাকম্ভরী তীর্থে এই কাহিনী বর্ণিত আছে। শ্যামল সবুজবর্ণ শাকসব্জীর রঙে ভূষিতা বলেই দেবী শাকম্ভরী নীলোত্পল বর্ণা। পশ্চিমবাংলার কাটোয়া থেকে আট মাইল দূরে মঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত মাজিগ্রামে শাকম্ভরী দেবীর পুজো হয়।
সতী, পার্বতী, ঊমা এবং গৌরী দুর্গার এই চারটি রূপ হল শিবের পত্নী রূপ। তাই শিবাণী, রুদ্রাণী, অদ্রিজা,  এই নামগুলি হল আমাদের মনগড়া এবং বাংলাসহিত্যের অভিধানে বর্ণিত মাদুর্গার নামান্তর মাত্র। দক্ষযজ্ঞের প্রলয়ের কারণে  দক্ষকন্যা সতীর অপর নাম দাক্ষায়নী। এবার বেদের সপ্তমাতৃকায় আসি। দুর্গার এই সপ্তমাতৃকার নামগুলি হল ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, বৈষ্ণবী ইন্দ্রাণী বা ঐন্দ্রী বা কৌমারী, নারসিংহী, বারাহী এবং চন্ডী  ।  এই মহাশক্তিময়ী দেবীরা অগ্নিরূপী শিবের বা সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। শ্রী শ্রী চন্ডীতে দেবীকবচে একাদশ মাতৃকার উল্লেখ আছে। এই একাদশ মাতৃকা পূর্বে উল্লিখিত  নবদুর্গা ও সপ্তদুর্গার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ।
ঘুরেফিরে সব রূপগুলিতেই সর্বকালে চামুন্ডা শবাসনা, বারাহী মহিষারূঢ়া, ইন্দ্রাণী গজাসনা, বৈষ্ণবী গরুড়াসনা ও  মহাবীর্যা নারসিংহী, মহাবলা শিবদূতি, বৃষাঢ়া মাহেশ্বরী, শিখিবাহনা কৌমারী , পদ্মাসনা লক্ষ্মী, বৃষবাহনা ঈশ্বরী, হংসারূঢ়া ব্রাহ্মী এবং এঁরা সকলেই একাদশ মাতৃকার বৈচিত্রময়ী রূপ।  দুর্গার এই নামগুলি ছাড়াও শ্রীশ্রীচন্ডীতে মহালক্ষ্মী, মহামায়া, মহাবিদ্যা, মহাবাণী, ভারতী, বাক্‌ সরস্বতী, আর্যা, ব্রাহ্মী, কামধেনু, বেদগর্ভা, ধীশ্বরী, সুরেশ্বরী, দেবেশী, অশোকা, বিপদতারিণী, শতাক্ষী প্রভৃতি অগণিত নামের উল্লেখ আছে। এছাড়া দুর্গাপূজার পর বিজয়াদশমীতে এ অপরাজিতা পূজা হয় সেই অপরাজিতা এবং দুর্গা এক ও অভিন্ন। এই অপরাজিতা দেবী দুর্গার চৌষট্টি যোগিনীদের মধ্যে অন্যতমা। এমনকি জগদ্ধাত্রী পুজোতেও নবশক্তির অর্চনারপর দেবতাদের পুজোর মধ্যেও “অপরাজিতায়ৈঃ” মন্ত্রে দেবীপূজা করা হয়। মত্স্যপুরাণে এই অপরাজিতাকে মায়ানুচরী বলা হয়েছে। বামনপুরাণে ইনি গৌতম মুনি ও অহল্যার চারকন্যা জয়া, বিজয়া, জয়ন্তী ও অপরাজিতা। সেখানে আবার এই চারভগ্নী শিবজায়া সতীর সহচরী সখী রূপে অভিহিত। দেবী অপরাজিতা প্রণাম মন্ত্রে রুদ্রলতা নাম পাওয়া যায়। তাই তিনিই যে শিবসঙ্গিনী দুর্গা সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই ।
দেবীপুরাণে দেবীর আরো নানাবিধ নামের উল্লেখ আছে। দেবী দুর্গার সন্ধিপূজায় দেবীর চামুন্ডারূপের পূজা হয়। দেবর্ষি নারদ সেখানে দেবীকে অর্চণা করছেন নিম্নলিখিত নাম ধরে। দুর্গা, শাকম্ভরী, গৌরী ছাড়াও বিন্ধ্যবাসিনী, কাত্যায়নী, কৌষিকী, কৈটবেশ্বরী, মহাদেবী, মহাশ্বেতা, মহেশ্বরী, ত্রিদশবন্দিনী, ঈশানী, ভবানী, ভূতভবানী, জ্যেষ্ঠ্যা, ব্রহ্মবাদিনী, অপর্ণা, কপালা, সুবর্ণা, গায়ত্রী, সাবিত্রী, ত্রিশূলিনী, ত্রিনয়না, ত্রিপদা, ত্রিগুণাত্মিকা, শ্রদ্ধা, স্বাহা, সর্বজ্ঞা, সর্বতোভদ্রা, সর্বোতক্ষী, সর্বভূতাদিমধ্যান্তা, সর্বলোকেশস্বরূপা, কামরূপিণী, যাদবী, যোগীন্দ্রা, বৈষ্ণবী, অরূপা, ভদ্রকালী, স্কন্দমাতা, শ্রুতি, স্মৃতি, কালরাত্রি, মহারাত্রি, কপালিনী, চামুন্ডা, চন্দ্রিকা, চন্ডী, চন্ডমুন্ডবিনাশিনী, রুদ্রাণী, পার্বতী, ইন্দ্রাণী, দাক্ষায়নী, নারী, নারায়নী, শুম্ভ-নিশুম্ভ দলনী, মহিষাসুরমর্দিণী, সহস্রলোচনা, ধীরা, রেবতী, সিংহবাহিনী, বিশ্ববতী, বেদমাতা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মায়াবতী, ভোগাবতী, সতী, সত্যবতী, ভীমা, উগ্রা, ধূম্রা, অম্বিকা, ত্রম্ব্যকপ্রিয়া, জটা, বিজয়া, অজিতা, অপরাজিতা, পাপনাশিনী প্রভৃতি । মহিষাসুরমর্দিণী দুর্গার সবচেয়ে রুদ্ররূপ যেখানে তিনি একাধারে  দনুজদলনী আবার অন্যদিকে কল্যানী এবং বরাভয়দায়িনী। তিনি ঘোরা আবার প্রসন্না। আসলে বিশ্বমাতা মা দুর্গা এই সকল রূপের সমষ্টি মূর্তি। একই দেবী দুর্গা আবার কামেশ্বরী ও ভদ্রকালী। উভয়েই শাক্তদেবী, এক ও অভিন্না। দশমহাবিদ্যা কালীর দশটি রূপ কিন্তু তত্ত্বগত ও আদর্শগত দিক থেকে এক ও অদ্বিতীয়। কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা  এই দশটি রূপ কিন্তু একাধারে কালী অন্যধারে দুর্গাকে বর্ণিত করে।
এছাড়া শ্রীশ্রী চন্ডীতে নবদুর্গার নয়টি নামের উল্লেখ আছে। এই নয়টি নাম হল
শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মান্ডা, স্কন্দমাতা,কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী । 

মহাষষ্ঠীর বোধন আবার কি?

  
 


সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ করে লঙ্কায় হাজির হলেন । ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে । সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই । তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে অকালে অর্থাত শরতকালে  (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত)   কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং । তাই তো অকাল বোধন । ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ব বৃক্ষমূলে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন । সেই দিনটিই ছিল শুক্লপক্ষের মহাষষ্ঠী ।
রামচন্দ্র স্তব করলেন :

নমস্তে ত্রিজগদ্বন্দ্যে সংগ্রামে জয়দায়িনী
প্রসীদ বিজয়ং দেহি কাত্যায়নি নমোহস্তুতে ।।

পূজা শুরু হল । পিতামহ  ব্রহ্মা  রামচন্দ্রের সাথে বললেন
“হে দেবী! যত দিন না পর্যন্ত রাবণ বধ হয়, রাক্ষসকুল ধ্বংস না হয় আমাদের পূজা গ্রহণ করে তুষ্ট হোন ”   

মিথিলার কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী গ্রন্থে ষষ্ঠীতে মায়ের বোধনের উল্লেখ আছেঃ ষষ্ঠ্যাং বিল্বতরৌ বোধঃ সায়ংসন্ধ্যাসুকারয়েত্‌। বসন্তকালের দুর্গাপুজোয় বোধনের প্রয়োজন হয়না কারণ দেবতারা ঐ সময়  জাগ্রত থাকেন। সমগ্র দেবকুলকে শরতকালে জাগানোর উদ্দেশ্যেই এই বোধন। বোধনের অর্থ হল জাগরণ। কালিকাপুরাণে পাওয়া যায় এই বোধন নিয়ে...

"বোধয়েদ্বিল্ব্শাখায়াং ষষ্ঠ্যাং দেবীফুলেষু চ"

১৪ অক্টো, ২০১৮

কাউন্টডাউন-৩ : নবরাত্রি



ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র শারদীয়া দুর্গাপূজার  প্রচলন করেন  । রাবণবধ ও সীতাউদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র দুর্গতিনাশিনী দুর্গার অকালবোধন করে নবরাত্র ব্রত পালন করেছিলেন। নবরাত্র ব্রত আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত । মা দুর্গা এই সময় অর্থাত আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ তিথি থেকে নবমী অবধি মোট ন’দিন নয়টি রূপ ধারণ করেন। পিতামহ ব্রহ্মা দেবীর এই নয়টি রূপের নামকরণ করেছিলেন। নয়টি নামের নয়টি বৈচিত্রময় রূপভেদ। এঁরা প্রত্যেকেই দেবীর নয়টি কায়াব্যূহ মূর্তি। নবদুর্গা নামে এঁরা বিশেষ পরিচিত। শ্রীশ্রী চন্ডীতে এই নয়টি নামের উল্লেখ আছে। নবদুর্গার এই নয়টি নাম হল
  • শৈলপুত্রী ( পর্বতের কন্যা)
  • ব্রহ্মচারিণী (যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান )
  • চন্দ্রঘন্টা ( দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘন্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও লাবণ্যবতী ইনি  )
  • কুষ্মান্ডা ( উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি  )
  • স্কন্দমাতা ( দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা )
  • কাত্যায়নী ( কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা। ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী )  
  • কালরাত্রি ( ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। মহাপ্রলয়কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে আখ্যাত )
  • মহাগৌরী (তিনি সন্তানবত্সলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা  মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি) এবং
  • সিদ্ধিদাত্রী ( অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন
শ্রীশ্রীচন্ডীর দেবীকবচ অধ্যায়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্লোকে নবদুর্গার উল্লেখ আছেঃ

প্রথমং শৈলপুত্রীতি দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী।
তৃতীয়ং চন্দ্রঘন্টেতি কুষ্মান্ডেতি চতুর্থকম্‌।।
পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা।
সপ্তমং কালরাত্রীতি মহাগৌরীতি চাষ্টমম্‌।।
নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গা প্রকীর্তিতাঃ।
উক্তোন্যেতানি নামানি ব্রহ্মনৈবমহাত্মানা।। 

শ্রীশ্রীচন্ডীতেই প্রথম মহিষাসুরমর্দ্দিণী মাদুর্গার নয়টি রূপের বর্ণনা ও মহিমা প্রকাশিত। 

মহালয়ার সাথেসাথে কৃষ্ণপক্ষের অবসান হয়। দেবীপক্ষের সূচনা হয়। পরদিন অর্থাত শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত ন'টি রাত্রি অবধি মাদুর্গার নয়টি রূপের পুজো চলে।  শরতকালীন এই নবরাত্রি উত্সবকে বলা হয় শারদ নবরাত্রি।  মূলত এটি শক্তির আরাধনা।  নবরাত্রির পরদিন বিজয়াদশমীর সাথে সাথে এই শক্তিপূজার সমাপন হয়।