৩১ জানু, ২০১৮

ও চাঁদ !!!

রেকটু বাকী। কিসের? চাঁদটাকে এইবারে পুরোটা ঢেকে দিল রে! কে ঢেকে দিল? কে আবার?পৃথিবীকে ঘুরতে ঘুরতে যখন চাঁদ ও সূর্যের মাঝে চলে আসে তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে। কলায় কলায় প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্রের ষোলো কলা পূরণ হল আর তারপরেই ক্রমে ক্রমে তা অমাবস্যার চাঁদের মত হয়েও গেল। ব্যাস্! আর দেখা গেল না চাঁদটাকে। চাঁদ তুমি এবার সামলে রেখো তোমার জোছনা কে। নয়ত হবে পূর্ণগ্রাস। 
নিথর নিস্পন্দ প্রকৃতি। গাছের পাতা নড়ছেনা। পাখীরা বাসায় ফিরে গেছে অনেক আগেই। তাদের নেই কোনো কিচিরমিচির। গরু বাছুর, ছাগল কুকুর যে যেখানে ছিল তারাও কেমন করে বুঝতে পারে গ্রহণের পূর্বাভাস। ভরা পূর্ণিমার এ কি বিষণ্ণতা? অমাবস্যার মত ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিক। কোথায় গেল আমাদের চন্দ্রবিলাস? পূর্ণচাঁদের মায়া? ও আমার চাঁদের আলো! আমার পূর্ণশশী, তোমার দেহের সব কলঙ্ক মোচন হয় এভাবেই।
চন্দ্র শুনেছি মাতৃকারক গ্রহ। তোমার কলঙ্ক মোচনের সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার সব মায়েদের কলঙ্ক মুছিয়ে দাও হে চাঁদ। কেউ বাজাল শাঁখ। কেউ ফেলে দিল রান্নাঘরের ঘড়া ভর্তি জল। কেউ রান্নাবান্না করবে না। কোনো শৌচালয়ে প্রবেশ নিষেধ। মল-মূত্র ত্যাগ চলবেনা। কত্ত নিয়ম গেরণ লাগলে।  ভরা পোয়াতি মায়েরা কেউ সেলাই ফোঁড়াই করবে না। তাহলে সন্তানের অঙ্গের কোথাও না কোথাও সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকবে। কেউ খাবার মুখে দেবে না। খাবারদাবারে তুলসীপাতা ছাড়াবেই ঠানদিদিরা। তারপর শুদ্ধ হবে গঙ্গার জল ছিটিয়ে। চাঁদে গেরণ লেগেছে। সাইরেন বাজল বুঝি। গ্রহণ লাগল। গ্রহণ ছাড়লে আবার রান্না খাওয়া, জল ভরা। ওরে চাঁদ আছে বলেই আছে আমাদের মন। চাঁদ আছে বলেই আমাদের যত আলো-আঁধারি। একে মাঘী পূর্ণিমা তায় চন্দ্রগ্রহণ। এর তিথিমাহাত্ম্য নাকি জোরালো। তাই তো এ চাঁদ যে সে নয়। সুপারমুন বা নীলচাঁদ। তবে চাঁদ মোটেও নাকি নীল হবে না। জ্যোতির্বিদরা কত ছবি তুলবেন। চান্দ্র গহ্বরের গুরুত্ব অপরিসীম এঁদের কাছে।
সৌরজগতের গঠন পর্বে প্রচুর গ্রহাণু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। পরে এদের বেশির ভাগকেই নিজেদের বুকে টেনে নেয় দেবগুরু বৃহস্পতি ও শনি। বাকিরা এখনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সেগুলি মাঝেমধ্যেই ছিটকে চন্দ্রের গায়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে। পৃথিবীর দিকে উল্কা ছুটে এলে বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পরেই তা দ্রুত জ্বলে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু চাঁদে বায়ুমণ্ডল না-থাকায় তুলনায় ছোট মাপের উল্কা বা গ্রহাণুও প্রবল গতিতে ছুটে গিয়ে আছ়ড়ে প়ড়ে এবং প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তৈরি করে নানা মাপের গহ্বর।তাই সদ্যজাত গহ্বরের ছবি উঠছে এখন। কি বাঙ্গালি বলবেন না? হ্যাপি লুনার এক্লিপ্স কিম্বা হ্যাপি ওয়ালি সুপার মুন? কিম্বা ব‌ইমেলা প্রাঙ্গণ থেকে সুপারমুনের সঙ্গে সেল্ফি তুলে পোষ্টাবেন না? থেমে আছেন কেন? এই তো সুযোগ ছবি পোষ্টানোর।

১৩ জানু, ২০১৮

পোষের শীত পিঠের গায়


ত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে শুরু হয়েই ফুরিয়ে যায় আদরের শীতের পৌষের ডাক। লেপ বালাপোষের ওম নিতে নিতেই উধাও হয় অমৃত কমলার মিষ্টি দুপুর। তবে শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে চষি পাকানো, মোয়া গড়া কিম্বা পুলিপিঠে গড়তে গড়তে মেয়েলি গল্প? তা কিন্তু ফুরোয়না। বছরের পর বছর জি‌ইয়ে থাকে বাংলার গৃহিণীদের হাতের যাদুতে আর জয়নগরের মোয়ার শীতের প্যাকেজে।  কথায় বলে "মাঘের শীত বাঘের গায়'  আর পোষের শীত ? খেজুরের গুড়ে, পিঠেপুলিতে, নলেনগুড়ের পায়েসে আর পাটালীতে। 

আমাদের দুই বাংলাতেই অপর্যাপ্ত খেজুর গাছ আর তার হাত ধরে কুয়াশার পরত ছিঁড়ে খুঁড়ে  ঘুম ভাঙে কোলকাতায় । হ্যালোজেন নিভে যায় । আমি কান পেতে র‌ই । উশখুশ প্রাণ বলে, খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন  । মফস্বলের দিকে ভোরবেলায় অন্ধকার থাকতেই "চাই রস"  বলে সেই বিখ্যাত হাঁক? এখন আর শুনি ক‌ই?  রোদ বাড়ার সাথেসাথেই খেজুর রস গেঁজে তাড়ি হয় । সেই খেজুর রস জাল দিয়ে প্রথম দফায় পয়রা বা পয়লা গুড় আমাদের বড্ড প্রাণের। এ যেন অল্পদিনের অতিথি। একে ছেড়ে দিলে আর পাবনা সারাটি বছর তাই যতই  দাম হোক গেরস্থ তার সাধ্যমত একটি ছোট্ট মাটির নাগরী  খড়ের বিঁড়ের ওপর বসিয়ে বাড়ি বয়ে আনবেই। রান্নাবান্নার ঝুটঝামেলা নেই। রুটি, লুচি, পরোটা দিয়ে দিব্য চলবে পয়লাগুড়। বিদেশের মেপল সিরাপ যেন। ওরা খায় প্যানকেক, ওয়েফল দিয়ে। 
তারপর সেই খেজুর রস জাল দিয়ে ঘন করে মাটির সরার মধ্যে থরে থরে পাটালি গুড় তৈরী হয়। কিছুটা আধাঘন গুড় বিক্রী হয় খেজুরের গুড় হিসেবে। সেটা বেশ অনেকদিন রেখে খাওয়া যায়। মূলতঃ পৌষমাসের সেরা উত্সব মকরসংক্রান্তিতে সেই খেজুরের গুড় দিয়েই পিঠেপুলি বানানো হয়। মোয়া তৈরী হয় হরেক কিসিমের। নবান্নের নতুন ধানের গন্ধ তখনো লেগে থাকে চিঁড়ে, মুড়ি আর খ‌ইয়ের গায়ে। নতুন ধান আর নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে পরতে পরতে শীতের রূপ হয় খোলতাই।  পৌষলক্ষীর বরণডালা উপচোয়  সোনার ফসলে। আনন্দে কবি বললেন, মরি হায় হায় হায়। এতে মরার একটাই কারণ কাজের চাপে শীত ফুরায়। আর শীত ফুরোলে কি আর থাকে বাঙালীর কপালে? চলে যায় মরি হায় নলেন গুড় আর চালের গুঁড়ির জম্পেশ কেমিষ্ট্রি।  
 আমাদের ঘটিবাড়ি খুলনা জেলার সাতক্ষীরার ঐতিহ্য মেনে এখনো পৌষসংক্রান্তিতে নতুন ধান দিয়ে পৌষলক্ষীর পুজো করে। আর সেই পুজোয় মুখ্য ভোগ হল নতুন গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে  নলেন গুড়ের পায়েস আর তার মধ্যে হাবুডুবু খাওয়া তুলতুলে নরম দুধপুলি। মা লক্ষী কৃপা করলে সারাজীবন ধরে বংশ পরম্পরায় যেন এই ভোগ নিবেদন করা যায়, এমনি বিশ্বাস ছিল আমাদের ঠাকুমার। নতুন গুড়ের পায়েসের গন্ধে শিকেয় উঠত জ্যামিতি পরিমিতি ।
পুলিপিঠে বানাতে বসে ঠাকুমা বলতেন রিভেঞ্জ নেবার এক গল্প। 
এক দজ্জাল শাশুড়ি তার নিরীহ বৌমাটিকে অত্যাচার করত। দাপুটে শীতে গাদা গাদা পিঠে বানাতেই হত। একদিকে সংসারের সমস্ত কাজ, তায় আবার একাধিক কাচ্চাবাচ্চা সামলিয়ে নিদারুণ শীতে নিজের পিঠে পিঠে রাঁধার চাপ নিতে হত। বৌটি মুখে প্রতিবাদ করতে পারতনা। এক শীতে সে ঠিক করল দুধ ঘন করে, পাটালী দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে এক জব্বর দুধপুলি বানিয়ে শাশুড়িকে খাইয়েই ছাড়বে। রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘরের আশপাশ থেকে ছোট্ট ছোট্ট দুধসাদা নেংটি ইঁদুর ধরে এনে সেই ফুটন্ত দুধের পায়েসের মধ্যে ফেলে দিল ইঁদুরগুলিকে। অন্ধ শাশুড়িকে শীতের রাতে জামবাটি ভরে সেই দুধপুলি খেতে দিল। শাশুড়ি হাত ডুবিয়ে সেই নরম তুলতুলে পুলি খায় আর ইঁদুরের লেজগুলি ছুঁয়ে বলতে থাকল,
' কালে কালে কত‌ই হল, পুলিপিঠের লেজ গজালো '  
এমন কাহিনী আজ হয়ত অচল । বদলেছে শাশুড়ি-বৌয়ের গল্প অন্য আঙ্গিকে। তবে পিঠেপুলি বানাতে বানাতে এমন মুখরোচক গল্প শোনাটাও ছিল আমাদের উপরি পাওনা। 
আর এইসব কাহিনীর জন্যেই বুঝি লোকমুখে ছড়িয়ে গেল
 "কারও পোষ মাস, কারও সব্বনাশ " এর মতন প্রবাদ।

পৌষসংক্রান্তির আগের দিন থেকে পরের দিন অর্থাত মোট তিনদিন ধরে চলে আমবাঙালীর পিঠে-উত্সব। দুধ, নারকেল আর নতুনগুড়ের বিক্রিবাটরায় হৈ হৈ  তলা লেগে যাওয়া ঘন দুধের গন্ধে ম ম করা ঘরবাড়ি আর বার্কোশ পেতে কুরুনিতে নারকেল কোরার খসখস শব্দ?
  
মামারবাড়িতে দিদিমার সে এক হৈ হৈ জগ্যি পৌষসংক্রান্তির দিনে।  বিশাল রান্নাঘরের মধ্যে কয়লার উনুন জ্বলছে গাঁকগাঁক করে। দুটো  ষন্ডামার্কা লোক বড়বড় কাঠের বার্কোশে কলাপাতা বিছিয়ে নারকেল কুরছে। উনুনে কালো লোহার কড়াইতে দুধ ঘন হচ্ছে।  আগের রাতে ভেজানো নতুন চাল শিলে বাটছে দুজন মেয়ে। এবার সেই চালের গুঁড়ি ঠাণ্ডা জলে মসৃণ করে গুলে ঘি দিয়ে উনুনে বসিয়ে নাড়া । এবার সোনার মত চকচকে করে মাজা পেতলের পরাতে ঘি মাখিয়ে সেই চালের মণ্ড ঢেলে দিলেন দিদিমা । সাথেসাথে ঠাণ্ডা হাতে গরমের ওম মেখে, ময়দা মাখার মত ঠেসে নিলেন সেই চালের মণ্ড। ছোট ছোট লেচি বানিয়ে ভেজা মসলিন কাপড়ে ঢেকে রাখলেন তা। ততক্ষণে কালো লোহার কড়াইতে খেজুরের গুড় জাল দিয়ে নারকেল মিশিয়ে ছেঁই প্রস্তুত। বাড়ীর কচিকাঁচাদের হাতে নারকেল নাড়ু সম সেই ছেঁই চাখার জন্য একটু করে দেওয়াও হল । এই ছেঁই হল পিঠের পুর। এই বানিয়ে রাখা হল। চলবে একমাস ধরে। ছেঁই ঠাণ্ডা হতেই চালের মণ্ডের লেচি হাতের তেলোয় নিয়ে একটু করে ছেঁই ভরে পুলিপিঠের মুখ বন্ধ করার পালা। ফিডিং বোতলের আকারে আলতো হাতে ছোট্ট ছোট্ট পুলি গড়ে ফেললেন দিদিমা তাঁর শৈল্পিক অনুভূতিতে।   আধাঘন  ফুটন্ত দুধে সেই  পুলিগুলো ছাড়লেন  ধীরে ধীরে । আর হাতা দিয়ে  আলতো করে মাঝেমাঝে নেড়ে দিলেন ।  কি সুন্দর হেঁশেল পারিপাট্য! খেজুরের গুড় ভর্তি বয়াম থেকে পরিমাণ মত গুড় দুধে ফেলে সমান ভাবে মিশিয়ে দিলেন ।  সারাবাড়ি ম ম করছে দুধপুলির আগাম আগমনীবার্তায়  ।  ক্ষীরসমুদ্রে ভাসমান পুলি নিয়ে তখনো সংশয়ে দিদিমা। পুলি ফেটে গেলে চূড়ান্ত ডিস্ক্রেডিট।  সেই দুজন ষন্ডামার্কা লোক এসে পেল্লায় লোহার কড়াইটাকে নামিয়ে দিল মাটিতে।

কিছু পুলিপিঠে  গড়ে রাখা হল সেদ্ধ বা ভাপানো হবে বলে। সেদ্ধপুলি হল বাঙালীর মিষ্টি মোমো। পেল্লায় হাঁড়ির মুখে জল ফুটবে। আর সাদা নরম কাপড়ে পুলিগুলোকে বেঁধে হাঁড়ির মুখে স্টীমারে ভাপানো  হবে। তারপর সেদ্ধপুলি খাওয়া হবে বাটি ভর্তি করে পাতলা পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। 

কিছুটা চালবাটা আর কলাইয়ের ডালবাটা মিশিয়ে রাখা হল একটি গামলায়। তা দিয়ে বানানো হবে সরুচাকলি। দক্ষিণী দোসার অনুরূপে পাতলা পাতলা সেই দোসা খাওয়া হবে পৌষসংক্রান্তির রাতে। আবারো পয়রাগুড়ে চুবিয়ে। পিঠে উত্সবের মধ্যমনি হল পাটিসাপটা। ঐ যে নারকোল আর খেজুর গুড়ের ছেঁই বানিয়ে রাখা হল সেই ছেঁইতে একটু খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে মসৃণ করে আরেকটা রাজকীয় কেমিষ্ট্রি তৈরী হল । সেটি হল পাটিসাপটার পুর। এবার পাটিসাপটার ব্যাটার বা গোলা তৈরীর পালা।  আমাদের ঘটিবাড়ির পাটিসাপটা এতটাই নরম ও তুলতুলে হয় যে তা পরেরদিনও দিব্যি গরম করে নিয়ে খাওয়া যায়। আর এখন ফ্রিজের দৌলতে গোলা বানিয়ে ঠান্ডায় রেখে দিলে রোজ বানিয়ে খাওয়া যেতেই পারে গরমাগরম এই পিঠে। গোলার কেমিষ্ট্রি তৈরী হয়  ঠান্ডা দুধ, সম পরিমাণ সুজি-ময়দার মসৃণ মিশ্রণে সামান্য চালের গুঁড়ো, একটু পাতলা খেজুর গুড় আর অল্প ঘি দিয়ে ।  ঠিক ভাজার পূর্ব মূহুর্তে গোলায় ছড়িয়ে দাও বড়দানার সামান্য চিনি।  কারণ  গোলারুটিতে একটা ফুটোফুটো ভাব আনার জন্য। এখন ছুটছি সকলে। তাই টেফলন‌ই ভরসা। বেশ করে ননস্টিক তাতিয়ে নিয়ে বেগুনের বোঁটায় করে ঘি মাখিয়ে নেওয়া আর হাতায় করে গোল দেওয়ার পর দেশলাই বাক্সের খোলের ভেতরটা  দিয়ে সেটিকে ডিম্বাকৃতি রুটির আকার দেওয়া। এবার পাতলা সেই গোলারুটির ধার দিয়ে সামান্য ঘিয়ের ছিটে দিয়ে কম আঁচে ভেজে নিয়ে  আগে থেকে বানিয়ে রাখা রাজকীয় পুর চালান হল। তারপর কাঠের তাড়ু দিয়ে হাতের কৌশলে পাশবালিশের আকারে পাটিসাপটা মুড়ে নিতে পারলেই হল বাঙালীর মিষ্টি প্যানকেক।  আজকাল বাজারে যে পাটিসাপটা বিক্রি হয় সেগুলি ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। এর কারণ হল ময়দা বা সুজির পরিবর্তে জলে গোলা চালের গুঁড়ি। 

কখনো খাও ক্ষীর সাঁতারে ডুব দেওয়া দুধপুলি। কখনো কামড় বসাও পাটিসাপটায় অথবা হালকা মিস্টির স্বাদ নিতে সরুচাকলিতে।  আমাদের আড়িয়াদহের বাড়ীতে  ঠাকমা বানাতেন রসবড়া।  বিউলির ডাল বাটার ঘন ব্যাটারে, মৌরী আর সামান্য চিনি ছড়িয়ে ( ফাঁপা করার জন্য) সরষের তেলে ভেজে নিতেন বাদামী রংয়ের টোপা টোপা রসবড়া। এটা হল ভাজার গুণ। কম আঁচে মুচমুচে করে ভাজতে হবে, যাতে খেজুরগুড়ের পাতলা রসে ফেললে বড়া আরামে না নেতিয়ে পড়ে । এবার খাও কে কত খাবে।
আরেকটি পিঠে আমাদের ঘটিবাড়ির স্পেশ্যাল। তা হল মুগসামালী। শুকনো খোলায় ভাজা সোনামুগ ডাল সেদ্ধ করতে হবে এমনভাবে যাতে ডাল গলে ঘ্যাঁট না হয় আর শুকনো শুকনো সেই ডালসেদ্ধ ঘিয়ের হাতে আলতো চাপে সামান্য ময়দা আর চালের গুঁড়ো মাখিয়ে নিয়ে গড়তে হবে পুলির আকারে। মধ্যে দিতে হবে সেই আদি, অকৃত্রিম খেঁজুর গুড় আর নারকেলের ছেঁই। এবার পুলির মুখ বন্ধ করে গরম সর্ষের তেলে ভেজে নিতে হবে। পয়রা গুড়ে চুবিয়ে কিম্বা এমনি এমনি‌ ই খাওয়া যায় এই মুগসামালী। অনেক পিঠের মাঝখানে একটু মুখ বদল করতে ময়ান দিয়ে মাখা ময়দার খোলে ঐ ছেঁই চালান করে বানানো হত সিঙাড়া পিঠে।  কেউ মনের আনন্দে পরিপাটি করে গড়েই চলত এই সিঙাড়া পিঠে আর কেউ ভাজত গরম খোলা চাপিয়ে। এক‌ই অঙ্গে কত রূপ পিঠের! সৃষ্টিসুখে সামিল হওয়া বাংলার ঘরণীদের কত আইডিয়া মাথায়! অফুরন্ত সময় ছিল তাদের। সংসার ছিল যৌথ। পরিবারের সকলকে নিজের হাতে খাওয়ানো ছিল নেশা।

 ওদিকে বাংলার আদিবাসীদের ঘরে সেদিন টুসু পরবের গানের সাথে শোনা যায় মাদলের দ্রিমি দ্রিমি। আমরা গঙ্গসাগরে মকর স্নান করে পুণ্যি কুড়োই আর ওরা শোভাযাত্রা করে টুসু ভাসায়।  কেউ নতুন ধানের আউনি-বাউনি বেঁধে পিঠে বানাতে বসে। সেই পিঠে ঠাকুরকে দিয়ে তবে খায়। কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। একজনের কাছে গুড়পিঠের কথা শুনেছি। মালপোয়ার মত ভাজা পিঠে গুড়ের রসে ফেলে খাওয়া আর কি! সাধ আর সাধ্যের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে পিঠের রেসিপিতে, রসনায় কত বৈচিত্র্য এসেছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের প্রিয় গোকুলপিঠেও এমনি এক বৈচিত্র্য। আর এই একটি পিঠেতে খোয়া ক্ষীর, নারকেল অর খেজুরের গুড়ের সঙ্গে ছানার রসায়ন জমে যায় একেবারে।
পিঠেপুলির পরিবারে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে রাঙা আলুর পুলি।  এখন ক্যানসার রুখতে রাঙা আলুর জুড়ি নেই তাই বেশ কদর এই পুলির। সেদ্ধ করে নিয়ে চালের গুঁড়ি আর ময়দা আর ঘিয়ের হাতে রাঙা আলুর পুলির মধ্যে আবারো চালান করো নারকেলের ছেঁই আর পুলির মুখ বন্ধ করে ভেজে নাও তেলে। এবার এমনি খাও অথবা গুড়ের রসে ফেলে খাও। সেটা নিজের চয়েস।      
মনে পড়ে যায় পিঠের প্রসঙ্গে ইতু পুজোর ব্রতকথা। অঘ্রাণের শীতেই প্রতি রবিবারে ইতুপুজো করতে গিয়ে মা শোনাতেন সেই ব্রতের কথা। গরীব বামুন ভিক্ষে করে পিঠের উপকরণ যোগাড় করে বৌকে এনে দেয় আর বলে, দ্যাখ বামনী, এই যে মাগ্যির পিঠে বানাবি তা যেন তোর ঐ অলুক্ষুণে মেয়েদুটো মানে উমনোঝুমনোর পেটে না যায়।  বামনী পিঠে ভাজে আর বামুন একটা করে তেঁতুলে বিচি দিয়ে গুনতি করে রাখে মোট ক'খানা পিঠে সবশুদ্ধ ভাজা হল। বামুনের কাছে দুই কন্যাসন্তান সংসারে ব্রাত্য। এদিকে বামনীর প্রাণ পারেনা মেনে নিতে। উনুনপিঠেয় রাখা চোঁয়া, পোড়া, কাঁচা পিঠেগুলো সে মেয়েদের গিয়ে চুপিচুপি দিয়ে আসে। বামুন তা জানতে পেরে উমনোঝুমনোকে বনবাসে দিয়ে আসে। তারপর একদিন ঐ ইতুপুজো করার কারণেই তার মেয়েরা রাজরাণী হয়ে বামুনের দুঃখ ঘোচায়। এখনো তাই পিঠে বানালেই মনে পড়ে যায় এইসব। ফিরে ফিরে অসে কাহিনীরা নতুন গল্পের মোড়কে। 

 শিলাদিত্য  জানুয়ারি সংখ্যা ২০১৭

৮ জানু, ২০১৮

মহাপ্রভু জিন্দা হ্যায়




শীতের ভোর। পুবের মিঠে রোদ গায়ে মেখেই বেরিয়ে পড়া নবদ্বীপের দিকে। কলকাতা থেকে কোনা এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে ডানকুনি, বৈদ্যবাটি হয়ে নবদ্বীপের পথ। প্রথম পিটস্টপ রাস্তার ধারে এক পথ রেস্তোঁরায়।  ছোট্টছেলে তার দাদুর মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল। নিতান্ত‌ই ছোট সে। তার নাম জিগেস করলে বলল, প্রীতম শিকদার রোবট। আমি বললাম রোবট কেন? সে দর্পের সঙ্গে জানাল, ভিনগ্রহ থেকে আসা এক এলিয়েন সে। পৃথিবীর সবকিছু দেখেশুনে আবার নিজের গ্রহে ফিরে যাবে। তার বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়েই নাকি অন্যগ্রহে যাওয়ার পথ। বিশ্বায়নের কি মাহাত্ম্য! কেবল টিভি এবং ইন্টারনেটের যুগে গ্রামের এই সপ্রতিভ বালকটিও কত পরিণত আজকের যুগে। স্টেট হাইওয়ের ধারে তার দাদুর হোটেলে বসতে দিল। কিছুপরেই টেবিলে এল গরম ছেঁড়া পরোটা আর ধূমায়িত আলুর সবজী। শেষপাতে গুড়ের রসগোল্লা। অমৃতকমলার পৌষের সকাল জমে গেল সেই মূহুর্তে। 
আমরা চললাম সদ্য ধান ওঠা খেতের পাশে একরের পর একর জমিতে সর্ষেফুলে ছয়লাপ হলুদকে সঙ্গী করে। আমন্ত্রণে চলেছি কীর্তণ পরিবেশনের। কলকাতার এক আশ্রম নবদ্বীপে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে আমাদের। পথে বেরিয়েই মনে পড়ল নানান ব্যস্ততায় আমন্ত্রণপত্রটি বাড়িতে ফেলে এসেছি। অতএব নবদ্বীপের কোন্‌ ঠিকানায় যাচ্ছি তা অজানা। শুধু আছে দুটি ফোন নাম্বার। অতএব সে যাত্রায় নিশ্চিন্ত।

এদিকে স্টেশন পৌঁছতেই হাতের মুঠোয় খোলা গুগল ম্যাপ জানাতে থাকল এখুনি সেই স্টেশনে কোন্‌ কোন্‌ ট্রেনের আগমন এবং প্রস্থানের খবর। ধ্যুত্‌ তেরি! এই এক জ্বালা কৃত্তিম বুদ্ধিমতার। আমার গুগল সব জানে। আমি এযাবত আমার এন্ড্রয়েড ফোন থেকে যত মেসেজ করেছি সেখানে নবদ্বীপ কথাটি সে পড়ে বুঝে ফেলেছে ইতিমধ্যে। আর আসার পথে পথ নির্দেশিকা গুগলম্যাপের অ্যাপটিতে গন্তব্য নবদ্বীপ তাও জানা তার। অতএব অংক কষে ফেলেছে তার কৃত্রিম মস্তিষ্ক । একেই বলে এ আই মাহাত্ম্যম্‌ । আমাকে হেল্প করতে চায় সে।

 কিন্তু বিধি বুঝি হল বাম! নবদ্বীপ স্টেশনের কাছে আসতেই ফোন ঘোরালাম আশ্রমের একজনকে। যথারীতি মোবাইল উপলব্ধ নেই সেখানে। আরেকটি নাম্বারেও সংযোগ হলনা কিছুতেই। আর স্টেশনের দুধারে শুধু চোখে পড়ছে "টাইগার জিন্দা হ্যায়" এর বিজ্ঞাপন। নিকুচি করেছে। আমি কোথায় হাতড়ে মরছি ঐ ঠান্ডায় রাতে কোথায় গিয়ে উঠব তা জানিনা আর কেবলি চক্ষুশূল হচ্ছে সলমন খানের বাইসেপস আর ক্যাটরিনার ভ্যাঙচানো শ্রীমুখ।   সঙ্গে আমার অশীতিপর বৃদ্ধা। অতরাতে প্রোগ্রাম সেরে তিনিই বা কোথায় থাকবেন? আর প্রোগ্রামটাই বা কোন্‌ মঞ্চে কিছুই জানিনা।  অবশেষে পুছতাছ শুরু করি।এক ব্যক্তি জানাল জন্মস্থানের দিকে আজ রাতে অনুষ্ঠান আছে।গাড়ি থেকে মুখ বের করে স্থানীয় মানুষকে জিগেস করতেই  তারা বলে, এ পাড়ায় কিস্যুটি হয় না। প্রাচীন মায়াপুর অর্থাত গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর খোদ জন্মস্থান যেতে হবে । সেখানেই যা কিছু। স্বাভাবিক। আজ যাঁর জন্য সেই একদা সংস্কৃতচর্চার অন্যতম পীঠস্থান এই নবদ্বীপ "ধাম" হয়ে উঠেছে সেখানেই সব মাতামাতি হওয়াটাই উচিত। একটি কলেজ পড়ল। স্থানীয় স্মার্ট সব ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে জটলা করছে। জিগেস করলাম, মহাপ্রভুর জন্মস্থানটি কোন্‌ দিকে? তারা ঠোঁট উল্টিয়ে বলল "জানিনা' । চোখমুখের ভাবও বলল মহাপ্রভুর নাম শোনেনি তারা। আবার অলিগলি চলি রাম।  "আচ্ছা দাদা জন্মস্থান?" "কার জন্মস্থান?'  রেগে গিয়ে একহাত নিয়ে ফেলি। আরে মশাই কার আবার? আমার, আপনার নয় নিশ্চয়‌ই। এখানে এসে মানুষ কার জন্মস্থানে যায়? অতএব আবার চলি কানাগলি, পোড়া গলি। এবার এসে পড়ল বুড়োশিব তলা। বেশ প্রাচীন মন্দির। নেমে পুরোহিতকে জিগেস করলাম। তিনিও সেই এক কথা মহাপ্রভুর জন্মস্থানের খোদ পাড়া প্রাচীন মায়াপুরেই সব। অতএব আর কোনোদিকে নয়। পুরী গিয়ে জগন্নাথ, কলকাতা পৌঁছে কালীঘাট আর নবদ্বীপ পৌঁছে জন্মস্থানে না হাজিরা দিলে কোনোকিছুই হবেনা। এদিকে গাড়ির সকলে মিলে অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ফোন ঘুরিয়ে, মেসেজ পাঠিয়েই চলেছি। নো পাত্তা। অবশেষে হাজির হলাম সেই প্রাচীন মায়াপুরে। পরে নির্মিত বিশাল গেট, মন্দিরের আভিজাত্যের মধ্যে অলঙ্কৃত করে রেখেছে সেই সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরোনো প্রকাণ্ড নিমগাছ আর তার কোল ঘেঁষে এক ঘর। সেই ঘরে "জনমিলা গোরাচাঁদ শচীর উদরে'। 
সেই নিমগাছে এখন মানুষ লাল সুতো বেঁধে মানত করে। কিন্তু আমার তেমন কোনো ইচ্ছে নেই তখন। দূর থেকে নিমগাছকে প্রণাম জানিয়ে বললাম "আমার ফোনে আজকের অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যেন যোগাযোগ করতে পারি"  প্রণাম জানিয়ে ফিরে আসছি । মন্দিরের বাইরেও পা দি‌ই নি তখন। আমার মোবাইলে কর্মকর্তাদের বহু প্রতীক্ষিত সেই ফোনটি এল। "দিদি আপনি পৌঁসেসেন? আমরাও আসতেসি" 
তারা জানাল আমাদের জন্য  দুদিনের আশ্রমের ঘর, প্রোগ্রামের আয়োজন এই জন্মস্থানের পাশেই। নরহরি আশ্রমে।

আমি বুঝলাম সত্যি সত্যি "টাইগার জিন্দা হ্যায়' ।


১ জানু, ২০১৮

কেকের আমি কেকের তুমি

শিলাদিত্য ডিসেম্বর ২০১৭

না, না। কেক কি আর সুকুমার রায় সৃষ্ট গোঁফচুরি নাকি? কেকের আমিও নেই বা তুমিও অবান্তর। তবে কেকের সেকাল আর একাল আছে কিন্তু। আর সেই কেক দিয়ে বেকার কে চেনা যাবেই। কেকের বিবর্তনের মধ্যেই কেক বেঁচে রয়েছে নানাভাবে।

বাঙালীর শীতের সঙ্গে কেকের অনুষঙ্গটি কিন্তু বহুদিনের।

কেকমাস আজ মধুমাস, ক্রিসমাস পোষমাসে
একাকার হল হাড়মাস, শীতমাস ভালোবেসে !
বাকী তিনমাস পর পচামাস তাই বাঁচো বেশ কশে
শীত এলে ঝোলাগুড় আর কেক খেও বসে বসে ।

উলটে দ্যাখো শীতকে। পালটে গেছে কলকাতার শীত । মুঠোমুঠো রোদের কণায় একভর্তি শীতের ব্যালকনি । রোদের উঠোনে আরাম চেয়ারে হেলান দিয়েছ । গায়ে ওষ জড়ানো পশমিনা । পায়ে মোজা । ব্যালকনির সামনের ফুটপাথে সারেসারে পথশিশু । আদুড় গা কারো। কারো সোয়েটারের হাত ছেঁড়া । নাক দিয়ে দুরন্ত গতিতে শ্লেষ্মা । ভ্রুক্ষেপ নেই কারো । খেলে বেড়াচ্ছে । রাত হলে ঘরে গিয়ে খাবে দুপুরের দুমুঠো জলঢালা ভাত আর সঙ্গে পাড়ার দোকানের আধখানা গরম ফুলুরি হয়ত । কপালে থাকলে এককুটি চারামাছ ।
আমাদের শিশুরা এসব বোঝেনা । তাদের জীবন জুড়ে টিফিনে কাপ কেক, বার্থ ডে কেক আর শীতকালের ছুতোয় নাতায় বাড়ীর কেক।
কাকার সঙ্গে কেকের কি সম্পর্ক তা জানা নেই তবে কেক শব্দটি এসেছে স্ক্যন্ডেনেভিয়ান শব্দ কাকা থেকে।

"কারো শীতমাস কারো সর্বনাশ' !

কে যেন সেদিন এক আড্ডায় বলছিলেন বাঙালী শীতকালে কফি আর কেক খায়। আসলে এই একটা ঋতুর জন্য আমরা মুখিয়ে থাকি সারাটা বছর। তাই শীতকে কাছে পেতে গরম পানীয় সে কফি হোক কিম্বা স্যুপ তাকে বরণ করে নিই । কারণ এই শীতে গরম পানীয় দেয় সেই ওম যার স্বাদ পেতে তো ঠান্ডার দেশে যেতে হয় বছরের বাকী সময়ে। আর আগেই বলেছি শীতমাস মানেই কেক মাস।
তবে বড়দিনের প্রাক্কাল হোক না হোক, শীত পড়ুক না পড়ুক কেক বানানোর জন্য কোনো ছুতো লাগেনা। সে যুগে আমাদের ঠাকুমা, দিদিমারাই উনুনের মরা আঁচে সারাদিনের রান্নাবান্নার পর এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি, লোহার বড় কড়াইয়ে কিম্বা ডেকচিতে বালি বিছিয়ে তার মধ্যে এলুমিনিয়ামের বাটিতে কেক বানাতেন শুনেছি। মায়ের মুখে শুনেছি সে কেক বাড়িতে বসলেও সারাবাড়ি গন্ধে ম ম করত। ঠিক যেন কাঁঠাল বা তালের মত। "এ পাড়ায় বুড়ি মলো, ও পাড়ায় গন্ধ পেল'
তখন নিউমার্কেট থেকে ভ্যানিলা এসেন্স আনা হত। এখন অবিশ্যি পাড়ার দোকানেও মেলে। ওরা তখন কেক ফোলানোর জন্য দিতেন খাবার সোডা বা সোডিয়াম বাই কার্বোনেট। পরে অবিশ্যি আরেকটু সফিষ্টিকেশনের ছোঁয়ায় মা কে দেখতাম বেকিং পাউডার ব্যাবহার করতে। কিছুই না বেকিং পাউডারে সোডি বাইকার্বের সঙ্গে থাকে পটাশিয়াম হাইড্রোজেন টার্টারেট। টার্টারিক এসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সোডি বাইকার্ব থেকে সহজেই প্রচুর কার্বন ডাই অক্সাইড বেরোয় তাই কেক বেশ ফ্লাফি হয়। এখন তার আরো বিবর্তন হয়েছে। আমরা কেকের ব্যাটারে বেকিং সোডা বা পাউডার দিই সেই সঙ্গে আভেনে ঢোকানোর ঠিক পূর্ব মূহুর্তে আধা চামচ সাদা ভিনিগার কিম্বা লেবুর রস দিয়ে বেশ করে নেড়েচেড়ে দি। আরো ফুলবে ব্যাটার। এবং এটি কিন্তু ব্রাউনি, মাফিন বা অন্য যে কোনো ধরণের ফ্রুট কেক, পেস্ট্রি বানানোর সময় দেওয়া যেতে পারে। অতএব কেক বানানোর মধ্যমণি হল এই লিভনিং এজেন্ট । কেক কে ফোলানোর বা ঝাঁঝরা করবার অন্যতম উপকরণ। ব্রেডের ক্ষেত্রে যে কাজটি করে ইষ্ট।
আমার মা ডেকচি বা হাঁড়ির মধ্যে বালি পর্বে কেক বানাতে না বানাতেই বাবা একবার রন্ধন পটীয়সী মায়ের জন্য সুদূর বম্বে থেকে নিয়ে এলেন একটি অভূতপূর্ব কেক বানানোর এলুমিনিয়ামের পাত্র। তার নীচে ছোট্ট বালির জায়গা। আর পাত্রের মধ্যিখানটা চোঙাকৃতি ভাবে খোলা। ফলে গ্যাসা অভেনের সুনীল শিখাটি সেই চোঙের মধ্যে দিয়ে তির তির করে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পাত্রের কেকটিকে বেকড হতে সাহায্য করে। আর নীচের বালি গরম করে নিয়ে তবেই আসল পাত্রটি বসানো হয়। এ যেন প্রিহিটেড আভেনের পূর্বতন প্রযুক্তি। ফলে নীচটাও সুষ্ঠুভাবে তাপ পেয়ে বেকড হয়। সম্পূর্ণ ফুলে উঠলে ওপরটা একটু লালচে ভাব আনার জন্য গ্যাসের সর্বোচ্চ শিখায় মিনিট দুয়েক দিলেই লাজে রাঙা হয়ে ওঠে এই মনোহরা মিষ্টান্ন। মায়ের রান্নাঘরে থাকত একটি উল বোনার সরু কাঁটা। সেটি ফুটিয়ে সন্তর্পণে দেখা হত ভেতরে কোথাও কাঁচা আছে কিনা।
মা কে দেখতাম প্রথমেই সেই বালি চেলে নিয়ে কাঁকর বেছে নিয়ে তারপর সমান করে সেই নীচের ছোট পাত্রে রাখতেন শুকনো বালি। প্রধান পাত্রটিতে বেশ করে মাখন মাখিয়ে নিতেন । আরেকটি বড় বাটিতে হাঁসের ডিম ফেটিয়ে তার মধ্যে চিনি দিতেন যতক্ষণ না চিনি গলে মসৃণ পেষ্ট তৈরী হয়। এরপর খবরের কাগজে চালনী দিয়ে পরিমাণ মত ময়দা ও বেকিং পাউডার একসঙ্গে চেলে নিতেন যাতে সম্পূর্ণ মিশে যায়। এবার সেই ময়দাটিকে পরিমাণ মত গলানো মাখন দিয়ে মেখে নিতেন ঠিক যেমন করে ময়দা ময়ান দিয়ে মাখা হয়। এরপর সেই ময়দা মাখা টি ধীরে ধীরে ডিম-চিনির মিশ্রণে দিতেন আর ফ্যাটাতেন। সব শেষে ভ্যানিলা এসেন্স দিয়ে ঐ পাত্রে ঢেলে দিয়ে আগে থেকে গরম করে নেওয়া বালির পাত্রে বসিয়ে দিয়ে গ্যাস কমিয়ে রাখতেন প্রথম মিনিট দশেক। এরপর আগে থেকে জলে ভেজানো কাজু-কিশমিশ পাত্রের ঢাকা খুলে ছড়িয়ে দিতেন কেক মিশ্রণের ওপরে।

এবার শুরু ধুকপুকুনি। ঠিক না ফুললে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। তলা পুড়ে গেলে লোকে নিন্দে করবে। সোডা কম হলে ভেতর কাঁচা থাকবে। এইসব কানাঘুষো শুনতে শুনতে আমিও কেমন করে ঐ বিশেষ পাত্রটিতে অবলীলায় কেক বানানো শিখে গেলাম। একটু গ্যাসের আঁচ বাড়ানো আবার কমানো আর সব শেষে দুমিনিট হাই ফ্লেমে ওপরটায় রং ধরানো। ব্যাস! এই কথা? হ্যাঁ, এই টুকুই। কেক বানানোয় এমন কিছু হাতিঘোড়া রকেট সায়েন্স এর প্রযুক্তি নেই। কেক বানানোয় আহামরি কিছু উপকরণ ও লাগেনা। শুধু আছে ঠিকঠাক পরিমাপ আর একাগ্রতা।

মা কে অবিশ্যি দেখতাম এই রেসিপি কে সামান্য ইম্প্রোভাইজ করতে। শীতকালে কমলালেবুর খোসা শুকিয়ে কেকের ব্যাটারে মিশিয়ে দিলে তৈরী হয় অরেঞ্জ ফ্লেভার্ড কেক। আর কাজু কিশমিসের সঙ্গে মা দিতেন কচকচি বা পেঠা। দিল্লীতে রাস্তায় খুব বিক্রি হয় যেটা অর্থাত ঘন চিনির রসে উগরে নেওয়া চালকুমড়োর মেঠাই বা মোরব্বা । এখন যা সুদৃশ্য রঙে ফাইন কুচোনো টুটি ফ্রূটি। শপিং মলের গালভরা নাম। এইভাবে গ্যাস আভেনে কেক শিখে এসে শ্বশুরবাড়িতে দেখলাম শাশুড়ি মা কে ইলেকট্রিক গোল আভেনে কেক বানাতে। আমার অসুবিধে হচ্চে দেখে প্রচুর খুঁজলাম বাজারে। সেই বোম্বাইওয়ালি স্পেশ্যাল কেকপাত্রের দেখা পেলাম না। "আমি তাঁরেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে আমার মনে...'
অগত্যা বাবা খুঁজে পেতে এনে দিলেন হাতিবাগান বাজার থেকে। তদ্দিনে বাঙালীর মডিউলার কিচেনে রমরমিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ওটিজি (আভেন, টোষ্টার ও গ্রিলার) বা একই অঙ্গে ত্রিরূপী বৈদ্যুতিক যন্ত্র। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসেছে মাইক্রোওয়েভ আভেন। সেখানেও কনভেকশান মোডে কেক বেকিং হয় তবে সেটি কে আমি বলি কেকের অপভ্রংশ। যারা অভেনে কেক বেক করতে অভ্যস্ত এবং দক্ষ তাদের কাছে মাইক্রোওয়েভে কেকে বেকিং নিছক ছেলেখেলা । কারণ আভেনে কেক বেকিং এর সেই স্বাদ বা গন্ধ কোনটি থাকেনা এতে। বরং দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে। সময়ের অভাবে চটপট কেক মিক্স ফেটিয়ে বসিয়ে দিতে পারলেই কেক হয় এতে।
এখন ছোট কেক বানালে ওটিজি আর বড় বানালে গ্যাস আভেনে বেক করি। আর কেকের টপিং এ আইসিং দিয়ে অযথা খাটুনি এবং ক্যালরি বৃদ্ধি আমার নাপসন্দ। বরং বাড়িতে হঠাত অতিথি আপ্যায়ণে মিক্সার গ্রাইন্ডারের ছোট্ট ব্লেন্ডারটিতে প্রথমে মাথা কাটা এককাপ চিনি গুঁড়ো করে তার মধ্যেই দুটো ডিম ভেঙে দি। হাই স্পিডে মিক্সি চালিয়ে মসৃণ মিশ্রণ রেডি। এবার একটি স্টিলের গ্লাসে এককাপ ভর্তি ভর্তি চেলে নেওয়া ময়দা আর দু চা চামচ বেকিং সোডা নিয়ে মিক্সি থেকে ডিম চিনির মিশ্রণ গ্লাসে ঢালি আর কেক ফ্যাটানোর বিশেষ বিটার দিয়ে যে কোনো একই দিকে ফেটাই । যে পাত্রটিতে কেক বেকিং হবে সেটি টিনের হলে খুব ভাল। সেটি তে দু-টেবিল চামচ মাখন গলিয়ে মাখন টি গ্লাসের মিশ্রণে দিয়ে আরো ফেটাই। এতে কি হয় যে পাত্রটিতে কেক বেকিং হবে সেটি খুব ভাল করে গ্রিজড বা তৈলাক্ত হয়ে যায়। এবার মোট দুশো বার হওয়া চাই এই ফ্যাটানো। এবার দুচামচ যেকোনো এসেন্স (ভ্যানিলা, পাইন্যাপল, অরেঞ্জ) মিশিয়ে বেকিং পাত্রটিতে পুরো মিশ্রণটি ঢেলে দি। এবার দু ফোঁটা হোয়াইট ভিনিগার অথবা লেবুর রস দিয়ে আবার নেড়ে চেড়ে প্রিহিটেড ওটিজি তে ২০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে মাঝখানের র‍্যাকে পাত্রটি বসিয়ে দি।
ভরা থাক হাতের যাদু সুধায় কেকের এই পাত্রখানি! এভাবেই তৈরী হয়ে যায় চটজলদি কেক।
ওটিজির চোখরাঙানিতে রাগে, ক্ষোভে ফুলতেই থাকে কেক। ওপর থেকে আলগা হাতে ছড়ানো ড্রাইফ্রুটস এর মর্মে যেন রং লাগে, আমার মনেও চিন্তা জাগে ঠিক সেই মায়ের যেমন লাগত।সব অনিশ্চয়তার শেষ কিছু পরেই।
উলের কাঁটা দিয়ে ফুটিয়ে যখন দেখি কেক আর নেই কাঁচা, তখন দুহাত তুলে পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা! এমনি অবস্থা হয় এহেন বেকার হোম মেকারের।
বেশি পরিমাণে কেক বানালে হ্যান্ড ব্লেন্ডারের সাহায্য নি। তবে পদ্ধতি হরে দরে একই । চারটে ডিম হলে আগের মাপের দ্বিগুণ সবকিছু। শুধু একটা করে ডিম বেশী দিলে কেক সুস্বাদু হয়। অর্থাত চারটে ডিমে চারকাপ ময়দা, চারকাপ চিনি, চার টেবিল চামচ গলানো মাখন আর একটি ডিম বেশী। ময়দা আর চিনি এক ধরণের কাপে মাপতে হবে। শুধু ময়দা উঁচু করে নিতে হবে আর গুঁড়ো করা চিনি কম কম মাথা কাটা কাপে। তবে কেকের মিষ্টতা ঠিক থাকবে। অতিরিক্ত চিনিতে কেক রসালো হয়ে ভিজে যায়। এবার এই কাপের মাপটি বিশাল কফি মাগ হলে হবেনা আবার ছোট্ট চায়ের পেয়ালা হলেও হবেনা। মাঝারি সাইজের কাপ হতে হবে। আর বাকীটা? এক টুসকি মনোযোগ আর হালকা অধ্যাবসায়। সুখী গৃহকোণে আনন্দের জোয়ার। গৃহিণীর কনফিডেন্স লেভেল একধাপ বাড়ানোয় এই রেসিপির জুড়ি নেই। আমার কাছে কেক এক সুচারু শিল্প যা নিমেষেই সত্য হয়ে প্রতিভাত হয় চোখের সামনে। তাই শীত আসুক না আসুক, ঠান্ডা পড়ুক না পড়ুক সব মাস‌ই কেক মাস।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাজার আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। সবকিছুই হাতের নাগালের মধ্যে এখন। ছত্রে ছত্রে কেকের হরেকরকম রেসিপি ছড়ানো ইন্টারনেটে। সেগুলোকে নিজের মত করে নিয়ে বানিয়ে ফেলতে পারলেই হল। শুধু চাই তিন "' এর মেলবন্ধন। পছন্দসই পাত্র, সঠিক পদ্ধতির পরিমাপ আর পর পর প্র্যাকটিস চাই সফল কেক তৈরীর পেছনে। রাম কেক থেকে প্লাম কেক, ওয়ালনাট থেকে আমন্ড কেক, চকোলেট চিপস দেওয়া থেকে মিক্সড ফ্রুট কেক যাই বানানো হোক বেসিক পন্থা একটাই। বৈচিত্র্য টপিংয়ে, হরেক কিসিমের শুকনো ফলের বিচিত্রতায়। আর এখন বিশ্বায়নের বানভাসি শপিং মলে শুকনো কিউয়ি থেকে ক্র্যানবেরি সবকিছুই মেলে অতএব সেই সত্য যা রচিবে তুমি!
ছোটবেলার স্মৃতির সরণী বেয়ে কেবল ছিল নিউমার্কেটের ডি গামা, নাহুমস, ফারপো, ফেরিনি, গ্রেট ইষ্টার্ণ এর কেক । তারপর কলেজবেলার ফ্লুরিজের কেক। এরপর জলযোগের কেক। মনজিনিস বদলে মিও আমোর, কেকস, কুকি জার, ব্রিটানিয়া, সুগার অ্যান্ড স্পাইস, বিস্কফার্ম, আনমোল, রাজা, বাপুজি, নানা ব্র্যান্ডের কেক। এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় সব বেকারির কেক। খিদিরপুরে যে লোকটি প্রতিদিন আমার বাড়িতে ফ্রেশলি বেকড ব্রেড দেয় প্রতিবছর শীতে সেও একবার অন্ততঃ কেক দিয়ে যাবেই। ইস্কনের কৃষ্ণপ্রেমীদের গোবিন্দা বেকারীতেও কেক বিক্রি হচ্ছে। হ্লদিরামও নিরামিষ কেক বানাচ্ছে তবে এগুলি ডিম ছাড়া। সেটি কে আদৌ কেক বলা হবে কিনা সেটা বেশ সংশয়ের ব্যাপার। কারণ যাকে কেক বলছি আমরা তার প্রধান অঙ্গ হল ডিম।
তবে একটাই হটকেক বার্তা। আগে বঙ্গ ললনারা শীতকালে শুধু পিঠে বানাতেন এখন টেলিভিশন আর ইন্টারনেটের দৌলতে তারা কেকপিঠেতেও সামিল হয়েছেন। তাই এই শীতে কেককে অন্তর্ভুক্ত করা যেতেই পারে বিদেশী পিঠে হিসেবে পৌষপার্বণে। আর রসের সাগরে ভাসমান রসবড়া, ক্ষীর সমুদ্রে ভাসমান দুধপুলি আর তুলতুলে নরম পাটিসাপটার পাশাপাশি গরম কেক পিঠের মৌতাত কিন্তু জমিয়ে দেবে শীতকাল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। 
 

পৌষ লক্ষ্মী

এইসময় ২৫শে ডিসেম্বর ২০১৭

ইতুপুজোর কথা

এইসময় ডিসেম্বর ১১ ২০১৭
অঘ্রাণমাসের প্রতি রবিবার ভোরে পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের দেখা যায় ইতুপূজা বা মিত্র পুজো করতে। মিত্র > মিতু > ইতু এই হল মূল শব্দের বিবর্তন। ইতু শস্যের দেবী। কেউ বলে এটি সূর্য পুজো। কেউ বলেন লক্ষ্মী বা কৃষি দেবী।  একটি মাটির সরায় মাটি দিয়ে ভর্তি করে মাটির ঘট বসিয়ে  ঘটটি পূর্ণ করা হয় দুধ বা জল দিয়ে।সরার উপর পুঁতে দেওয়া ছড়ানো হয় পঞ্চশস্যের দানা, কলমি, কচু ইত্যাদি।
ইতু পুজোর উদ্দেশ্য হলো সংসারের সুখ ও ঐশ্বর্য কামনা।
কোথাও কোথাও পাড়া-প্রতিবেশীরা একত্র হয়ে বসে একজন ইতুর ব্রত কথা বলে, আর ব্রতীরা হাতে ফুল নিয়ে বসে বসে শুনে যায় ব্রত কথা।

অষ্টচাল, অষ্টদূর্বা কলসপাত্রে থুয়ে
শুন একমনে ইতুর কথা সবে প্রাণ ভরে ।
ইতু দেন বর !
ধনধান্যে পুত্র-পৌত্রে ভরে উঠুক ঘর ।

আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে ইতুদেবীর পুজো বোধহয় দুর্গাপুজোর নবপত্রিকার মত । কৃষির জন্য সূর্যদেবতার অবদান অনস্বীকার্য তাই বুঝি "ইদম্‌ অর্ঘ্যম্‌ নমো শ্রী সূর্যায় নমঃ" বলে অর্ঘ্য দেওয়া হয় ইতুর ঘটে।  সূর্যদেবতা এবং ইতুদেবী উভয়কেই তুষ্ট রাখা হয়।
গোটা মাস এইভাবে ব্রতকথা শুনে সংক্রান্তির দিন সেই সরায় বসানো ঘট আর তার মধ্যে অঙ্কুরোদগম হয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা সজীব ও সবুজ উদ্ভিদ পরিবার নিয়ে মেয়েরা দল বেঁধে যায় নদীর ঘাটে কিংবা পুকুর পাড়ে। ভাসিয়ে দেয় ইতুর ঘট ও সরা।

গরীব বামুন-বামনীর দুই মেয়ে উমনো আর ঝুমনো । শীতকালে একদিন বামুনের পিঠে খাবার সাধ হল । বামনীকে ডেকে বললে পিঠে করতে । পিঠের সব যোগাড় যন্ত্র করে সে বললে একটি পিঠেও যেন তার ঐ মেয়েদুটিকে না দেওয়া হয় । বামনী পিঠে ভেজে ভেজে উনুনের পিঠে রাখে আর রান্নাঘরের পেছনে বসে বামুন একটি করে তেঁতুল বিচি রাখে নিজের কাছে । হঠাত বামনীর কি মনে হল। পেটের দুই সন্তান দুই মেয়ে। তাদের কি করে সে পিঠের থেকে বঞ্চিত করে? চুপিচুপি  উমনো-ঝুমনোকে দুটো পিঠে খাইয়ে দিয়ে মুখ পুঁছে শুয়ে পড়তে বলল । বামুন পিঠে খেতে গিয়ে দুটো পিঠে কম দেখে বামনীকে জবাবদিহি করতে বললে।  কেন সে এই মহার্ঘ পিঠে তার মেয়েদুটোকে দিয়েছে । বামনী বললে আর হবেনা অমন, ভুল হয়ে গেছে তার  । বামুন শুনলোনা বামনীর কথা ।
মেয়েদের বুঝিয়েসুঝিয়ে পিসির বাড়ি নিয়ে যাবার নাম করে  রেখে এল ঘন জঙ্গলের মধ্যে। আর ফিরে এসে আনন্দ করে বলতে লাগল আজ সব পিঠে সে একা খাবে। সে আরো বলল যে  মেয়েদুটোর বিয়েথা ও ঐ আত্মীয়ের বাড়ি থেকেই যেন হয়ে যায় তেমনটি বলে কয়ে এসেছে তাদের ।
এদিকে মেয়েদুটোকে পিসির বাড়ি যাবার নাম করে বনের মধ্যে জল আনার ছুতো করে সে ফেলে রেখে এল । রাতে মেয়েদুটো ভয় পেয়ে  কাঁদতে কাঁদতে জোড়হাত করে দুই বোনে বলল, বটবৃক্ষ তুমি যদি সত্য হও তবে তোমার কোটরে আজ রাতের মত আমাদের স্থান দাও। তাই বলে বটগাছের কোটরে আশ্রয় নিল । পরদিন ভোরে উঠে তারা দেখে নদীর ধারে মেয়েরা কি সব পুজো করছে । উমনো-ঝুমনো তাদের কাছে  গিয়ে শুনলো যে মেয়েরা ইতুপুজো করলে নাকি সংসারের সব দুঃখ ঘুচে যায় তাই তারা ইতুপুজো করছে । 
উমনোঝুমনো তাদের কথামত নদীতে নেয়ে এসে ইতুপুজোয় সামিল হল।  পুজোর পরে তারা ওদের বলল ইতুঠাকুরাণীর কাছ থেকে মনের মত বর চেয়ে নিতে। মেয়েদুটো তাদের বাবা-মায়ের দুঃখ ঘোচানোর বর চাইলো। এদিকে সেই বরে বামুন-বামনীর ঐশ্বর্য্য ফিরে তারা খুব ধনী হয়ে গেল। বামুনটা ভেবেছিল জঙ্গলের মধ্যে মেয়েদুটোকে নির্ঘাত বাঘে খেয়েছে। কিন্তু ইতুদেবীর বরে মেয়েদুটো পথ চিনে একদিন যখন ঘরে ফিরে এল তখন তাদের বাবা-মা তো অবাক। এর কিছুদিন পরে সেই রাজ্যের রাজা যখন পাকেচক্রে তাদের বাড়ি এসে মেয়েদুটিকে রাজপুত্রের বৌ করে নিয়ে গেলেন তখন বামুন বামনী সত্যিই অবাক হল।  উমনোর সঙ্গে যুবরাজের আর কোটাল-পুত্রের সঙ্গে ঝুমনোর বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পরের দিন ছিল অঘ্রাণমাসের রবিবার। উমনো বেমালুম ভুলে গেল ইতুপুজোর কথা। সে দিব্যি মাছ-ভাত খেল। আর ঝুমনো নিষ্ঠাভরে ইতুপুজোর ব্রত পালন করল। ইতুর ঘট মাথায় করে সে হাতীর পিঠে চড়ল। উমনো পান চিবুতে চিবুতে সোনার পালকীতে গিয়ে উঠল। উমনো যে পথে গেল সে পথে খালি মড়া যায়। পথঘাট শুকিয়ে রুক্ষ হয়। ঝুমনো যে পথে যায় সে পথে কেবল মরাই ভরা সোনার ধান, শস্যশ্যামলা প্রান্তর দেখে। এভাবে দুজনে শ্বশুর ঘরে গিয়ে উঠল। 

শ্বশুরঘরে গিয়ে ইতুর বরে ঝুমনো সত্যি হল রাজরাণী। তার আগমনে কোটালের বাড়ি যেন ভরে উঠল সুখ সমৃদ্ধিতে, ঐশ্বর্য্যে আর খ্যাতিতে। আর ওদিকে উমনোর আগমনে রাজবাড়িতে যেন মড়ক, গৃহযুদ্ধ, অশান্তি, ঋণের বোঝা বাড়তেই থাকল। 
ঝুমনো রাজরাণী হয়েও ইতুপুজো করতে ভোলেনা। উমনো কিন্তু ভুলেই গেল ইতুর ব্রত। দুইবোনের দেখা হতে ঝুমনো সব জানতে পেরে বলল, দিদি তুই ইতু পুজো ছেড়েচিস বলে তোদের এমন দুর্দশা আজ। সেই শুনে উমনো আবার ইতু পুজো করতে থাকে। আর ধীরে ধীরে তাদের সংসারের অভাব অনটন ঘুচে যায়।  
এভাবেই সরল বিশ্বাসে বর্ধমান তথা পশ্চিমবঙ্গের অনেক জেলায় এখনো সৌভাগ্যপ্রদায়িনী ইতুদেবীর ব্রত পালন খুব পরিচিত একটি পার্বণ। 

এখনো অঘ্রাণমাসের রবিবারে নদীর তীরে গেলে শোনা যায় বাংলার মেয়ে বৌদের মুখে ইতুর পাঁচালিঃ

কাঠিমুঠি কুড়োতে গেলাম, ইতুর কথা শুনে এলাম
এ কথা শুনলে কি হয়, নির্ধনের ধন হয়
অপুত্রের পুত্র হয়, অশরণের শরণ হয়
অন্ধের চক্ষু হয়, আইবুড়োর বিয়ে হয়,
অন্তকালে স্বর্গে যায় ।

আইবুড়োভাত

বাঙালি বিয়ের আইবুড়োভাত অনেকটা বিদেশের ব্যাচিলরস পার্টির মত।  বিয়ের দিন পাত্র পাত্রী অনেকক্ষণ উপোস করে থাকবে। আমিষ খাবেনা। ভাত নয়। কেবল ফলাহার, দুধ মিষ্টি, শরবত ইত্যাদি। তাই বিয়ের আগের দিন ফাঁসির খাওয়া খাইয়ে তাকে পুরোদস্তুর ফর্টিফায়েড করে দিতে হবে। বিয়ের দিনে সে ফিট থাকবে। বজ্রদন্তি, চন্দ্রকান্তি, তন্দরস্থি পাত্র পাত্রী রেডি ফর দ্যা শো। 
না, না আমাদের বাড়িতে ফেয়ারনেস ক্রিম চলে না। বরং চলে কাঁচা হলুদ সেবন। সঙ্গে নিমপাতা, মধু তে শরীরের দিনভর টক্সিন সুপার ক্লিনিং। তারপর আইবুড়োভাতের দিনে  সকালে স্নান সেরে ফুলকো লুচি, সাদা আলু চচ্চড়ি আর বোঁদেতে কব্জি ডুবিয়ে আমার পুত্রটি রেডি হতে না হতেই ফুলওয়ালা হাজির মালা নিয়ে। ততক্ষণে দোরেগোড়ায় আলপনা, মঙ্গলঘট, আম্রপল্লব, কলা গাছ, ডাব, সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিকা পর্ব সমাপন।  এবার ল্যাপটপে হালকা শব্দ। হিন্দুস্তানী ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের মূর্ছণা। রবিশঙ্কর, আলি আকবর, শিবকুমার শর্মা, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া আর বিসমিল্লা খান সাহেবের মধ্যরাতের মেলোডি, স্বর্ণযুগের রাগরাগিণীর সুর। ওদিকে গায়েহলুদের তত্ত্ব সাজানো শেষ। কবিতায় তত্ত্বসূচি পড়ে চলেছেন দুই মা। মিলিয়ে দেখার পর্ব। প্রতিটি ট্রের সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী  কবিতার লিষ্টি ।
ওরে ওরে কাল সকালে সাতটার মধ্যে কাতলা মাছ রেডি তো? আর তার ঘাগরা চোলি? নাকের নথ? মাথার ওড়না? শতরঞ্চি বিছানো পানপাতার বাগানে সুপুরীর সমাবেশ? রূপোর বাটিতে হলুদ বাটা?  আর গায়েহলুদের গঙ্গাযমুনা শাড়ি? সঙ্গে সরিষার তেলের পেট বোতল? আমাদের সময় ছিল টিন। 




।। মত্‌স্য নাকি মাঙ্গলিক, ইহাই কহেন লোকে 
কাঁচা হলুদ, পান সুপারী সঙ্গে যদিবা থাকে।  
ঘাগরা চোলিতে মতস্যকন্যে বিয়েবাড়ি যায়
গাত্রহারিদ্রা শেষে ইহারে কুটিয়া খায় ।
সরিষার তেল-হলুদ মাখিও ওগো কনে 
লাল হলুদ গঙ্গাযমুনা শাড়িটি থাকিল সনে।
শতরঞ্চিতে বসিও সব ভাইবোনে মিলিয়া  
হলুদ কপালে দিও, মাথায় জল ঢালিয়া । 
কমলা গামছায় ঢাকিও অঙ্গের ভূষণ 
ধান দুব্বোয় আশীর্বাদ করিবে স্বজন।। 

 আইবুড়োভাতের দিন দুপুরের খাওয়াদাওয়া মিটলেই বিকেলে আমরা তত্ত্ব পাঠিয়ে দিই মেয়ের বাড়ি। নইলে বিয়ের দিন হুলুস্থুল হয়। পুজো আচ্চা, রীতিনীতির ভীড়ে সব তোলাপাড়ায় অসুবিধে হয়। বিয়ের দিন সকালে নিয়মমাফিক শুধু হলুদ ছুঁইয়ে মাছ, হলুদ আর গায়ে হলুদের শাড়ি পাঠানো হয়। 

|| তত্ত্বীয় সব তত্ত্বতালাশ, বাক্স প্যাঁটরা কর খালাস
ছড়ায়, ছন্দে তত্ত্বসূচী, যা কিছু সব শুভ শুচি
ঠাম্মা-দিদার কচকচানি, ইন্দিরা মা'র ছটফটানি
বই বাঁধালেন শ্বশুর মশাই, সোজা হয়ে বসেন দাদাই
শাঁখ বাজাও, উলু দাও গো এয়োতিরা প্রাণ ভরে 
 মাতিয়ে দাও বিয়ে বাড়ী সানাইয়ের সুরে ||

আমার অনেকদিনের সাধ ছিল ছেলের বিয়ের গায়েহলুদের তত্ত্বসূচি সম্পূর্ণ ছড়ায় লিখব। সংবাদ প্রতিদিনের পাতায় পড়েছিলাম ঋতুপর্ণ ঘোষের লেখা অপর্ণা সেনের মেয়ের বিয়েতে লেখা এমন সব। তার ধারে কাছ দিয়ে না গেলেও চেষ্টা করে গেছি মাত্র। যেমন শাড়ির নাম দিয়ে, ড্রেসের নাম দিয়ে প্রতিটি ট্রের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ না হলেও আংশিক লিষ্টি। মিষ্টি, মশলা, স্যুটকেস, স্নানের সরঞ্জাম, ঘুমের টুকুটাকি  সব দিয়ে মিলিয়ে মিশিয়ে। বন্ধুদের অনুরোধে কিছুটা দিলাম।  


যেমন স্নানের সব কিছু উপকরণ দিয়ে সাজানো ট্রে খানি ছিল এমন। 

।। মধুচন্দন ফেসপ্যাকে হোক সুকোমল তব ত্বক 
বিয়ের জলে হয়ে ওঠো তুমি উজ্জ্বল ঝকঝক।
কদম্ব-কুর্চি জলে ছড়িয়ে স্পা এর অনুরূপ
গোলাপজলে স্নান সেরে ওডিকোলন টুপটুপ । 
হেনা করা কেশ হোক সুগন্ধিত, ধূপের ধোঁয়ায়  
আধফোটা কুসুমকলি, হবে  স্নানের ছোঁয়ায় ।
বাথরোব, তোয়ালে, চটি রইল এইখানে 
যখন যেটা লাগবে বোলো কিনে দেব এনে ।।

রাতপোষাক আর তার আনুষাঙ্গিক এর  ট্রে টি ছিল এমন।

।। ঘুম ঘুম চাঁদ, মাধবী রাতে ঝিকিমিকি তারা
এসব ব্যবহারে কন্যে হোয়ো না নিদ্রাহারা। 
কাছে শোবে, কানে কবে, মেখে নেবে সুগন্ধি
ভুলো নাকো মুখে দিতে দুটো মুখশুদ্ধি।
ফুলেল গন্ধে ঘর মোম জোছনায়
আড়ি পাতে বাড়িসব, তারা ফিশফিশায়।।

২৪ ডিসে, ২০১৭

আনন্দনাড়ু পর্ব



কেমন যেন স্বপ্নের মত একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম কয়েকটা সপ্তাহ। এখনো মনে হচ্ছে ঘোর কাটেনি। ওরা এল, দেখল, জয় করল আবার ফিরে চলেও গেল। শাশুড়ি নামক এহেন ভিনগ্রহের জীবটির কি বিশেষত্ব থাকে, তার পদোন্নতিতে কি পরিবর্তন হয় এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি কখনো। এখন খুব সন্তর্পণে ভাবতে বসেছি এতসব। আয়নার সামনে নিজেকে দেখছি আর ভাবছি হস্ত-পদ-স্কন্দ-মাথা যথাস্থানে আছে কিনা। আমার কি ইস্পেশ্যাল গ্রুমিং দরকার? অথবা লেসেন নিতে হবে ভেটারান কোনো শ্বশ্রূমাতার কাছ থেকে? তা যাইহোক আমার মতন এহেন শ্বশ্রূমাতার শারীরিক ধকলটি ছিল বেশ ঘটনাবহুল এবং উত্তেজনাপূর্ণ। শুরুরদিনেই ছাদে প্যান্ডেল বাঁধতে এসে  ডেকরেটারের লোকজন দিল খানকয়েক ফুলের টব ভেঙ্গে। তারপর আদ্যোপান্ত ছাদটাকে মুড়ে ফেলে রং মিলিয়ে কাপড় সেলাই করে চলে যাচ্ছে। আমার ঘরমোছার মেয়ে চেঁচিয়ে বলল, আমার ন্যাতা-বালতি?
ডেকরেটরের লোকটা বললে "কাপড়টা একটু তুলুন, ওখানেই আছে'
ব্যাস! বিয়েবাড়িতে হাসির রোল। বাড়ি ভর্তি লোক জন  সকলে হেসে খুন।

তারপর রোজ সকালে দুধ চা না লাল চা? এই কটা দিন দুধ-চিনির ফতোয়া জারি ছিল না। অতএব চালাও পানসি দুধ চা।  শাশুড়ি হবার আগে একটু শক্তি সঞ্চয় প্রয়োজন কিনা। তারপর একটু ফাটা গোড়ালি, ফ্রুট ফেসিয়াল, এক্সট্রা সাইন হেয়ার ট্রিটমেন্ট। সবটাই ঘরোয়া যদিও। বিউটি স্যালোঁ আমার পোষাতা নেহি হ্যায়।   শীতের সকাল। ছোট দিন। পরাণ আঁটুপাটু।



হঠাত আমার মায়ের চীত্কার। ওরে কাল আনন্দনাড়ুর বাজার ? বললাম, সব রেডি আছে। ঘটিবাড়ির আরেক রীতি। শুভকাজে আনন্দনাড়ু বানানো। সে এক যজ্ঞ। আত্মীয় স্বজন মুখিয়ে থাকেন সেই নাড়ুর জন্য। সত্যনারায়ণের শিরণির মত মাপ তার। যত প্রিসিশন তত সুস্বাদু হবে সেই নাড়ু। আমার মায়ের মাপ মুখস্থ। সেইমত বাজার করেছি। সে এক যজ্ঞ আমাদের। বিয়ের আগের দিন বিশাল পরাতে নারকোল কোরা হল। চারটে বড় বড় নারকোলের জন্য  এক কিলো আটশো আতপচালের মিহি গুঁড়ো, আটশো গ্রাম সাদা তিল আর দেড়কিলো শুকনো আখের গুড় এর জোগাড় হল। আর ভাজার জন্য সরিষার তেল। এবার আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি, মাখিব নাড়ু সবে ভাজিব তায়। প্রথমে নারকোলের ওপর চালের গুঁড়ো আর গুড় দিয়ে ঠাসা। ভাগে ভাগে পেতলের গামলায় এক একটি অংশ নিয়ে ঠাসল বাড়ির মেয়েরা, বৌয়েরা। তারপর তিল ছড়িয়ে আবার ঠাসো। মোলায়েম করে, মসৃণ করে। এবার পাকানোর পালা। ঘন্টা তিনেক কাবার এই ঠাসাঠাসিতে। বিশাল গ্যাস আভেনে বিশাল পিতলের কড়াই। সরষের তেলে ধোঁয়া উঠতেই প্রথম খোলায় একুশটা নাড়ু আমাকে মানে পাত্রের মা'কে ভেজে তুলে রাখতে হবে মাটির হাঁড়িতে। এর নাম শ্যামের হাঁড়ি। বিয়ে মিটলে নারায়ণের পুজোয় এই নাড়ু নিবেদন করতে হবে। এই একুশটি নাড়ুর অদ্ভূত সব আকার প্রকার। আমাকেই গড়তে হল। জ্যামিতিক আকৃতি। কোনটা গোলক, কোনটা চৌকো, কোনটা ত্রিকোণ,কোনটা তারা, কোনটা আবার চোঙাকৃতি। গনগনে আঁচে গরম তেলে নাড়ু ভাজা শুরু হল। শাঁখ বাজল।  সেইসঙ্গে ছিল অঘ্রাণের কালো মেঘ করা আকাশের অন্তহীন বৃষ্টি। মা বললেন এ হল আশীর্বাদ। নাড়ুভাজার সময় বৃষ্টি নাকি আনন্দের বার্তা বহন করে।।

১৭ নভে, ২০১৭

ঘুম গেছিলাম গত দীপাবলিতে। প্রত্যন্ত চা বাগান তামসাং  টি-রিট্রিটের বাঙালি ম্যানেজার এই ধানী লঙ্কার দানা দিয়েছিলেন। এদ্দিনে সেই লঙ্কা আমার যত্নে। প্রথমে গাছের তেজ দেখে মালুম হয়নি।  এখন বুঝছি ভরা পোয়াতির কি তেজ! বিয়োতে না বিয়োতেই দাপট! দিদা বলত, " যেমন তেমন মেয়ে বিয়োব, বয়েস কালে তেজ দেখাব"

 প্রচন্ড ঝাল আর ঝাঁজ এই লঙ্কায়।তবে একে ধানী বলেনা পরে জেনেছি।  ঠিক বাঙালী মেয়ের মত। রূপে না গুণে ভোলায়, মিছরির ছুরিতে নয় শুধুই গন্ধে, ঝালের মাত্রা ছাড়িয়ে কাজ সারে।
বেশী ফলে না। জৈব সারের মাহাত্ম্য। গোবর,  খোল ভেজানো জল, মাছ ধোয়া জল আর বাকীটা অমিতাভ বচ্চনের অমৃত বচন যারর নাম বিজ্ঞাপন।  অল্প খাব, প্রতি রান্নাপিছু একটি লঙ্কাতেই মাত। অরগ্যানিক লঙ্কা বলে কথা। দুষ্প্রাপ্য।

১৪ নভে, ২০১৭

নবান্নে হেমন্ত লক্ষ্মী আর কুলুই চণ্ডী কি এক?


এইসময় ১৩ই নভেম্বর ২০১৭
বর্ধমান কে বলে Granary of Bengal অর্থাত বংলার শস্যভান্ডার। অঘ্রাণে ধানকাটা আর মাড়াই শেষ।চাষীর উঠোন ভরে গেছে সোনার ফসলে। নতুন ধানের গন্ধে ম ম করা গ্রাম। মৌসুমীর আনুকুল্যে বাম্পার ফলন। কৃষক পরিবারে আনন্দের বন্যা। আর তাই আমন ধান ওঠার সময় এখানে নবান্ন উত্সব বা হেমন্ত লক্ষ্মীর আরাধনায় মহাধূম। 
গ্রামবাসীরা খেতের সদ্য ওঠা নতুন আতপ চাল, এক টুকুরো সোনা, একটুকুরো রুপো, একটি ধাতব রেকাবির মধ্যে রেখে লক্ষ্মীকে নিবেদন করেন আর বলেন

“নতুন বাঁধি, পুরনো খাই, তাই খেতে খেতে যেন জন্ম যাই
নতুন বস্ত্র পুরনো অন্ন, তাই খাই যেন জন্ম জন্ম”

উৎসবমুখর বাঙালীর প্রিয় পার্বণ এই নবান্ন। নতুন অন্নের এই উৎসবে মেতে ওঠার আরেক অর্থ হল মা লক্ষ্মীর প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দিরে সর্বকালের ঐতিহ্য পরম্পরা মেনে অনুষ্ঠিত হয় নবান্ন উৎসব। দেবী দুর্গার আর এক রূপ অন্নপূর্ণা।তাই এখানে মা  অন্নপূর্ণাকে নতুন অন্নের রাজকীয় ভোগ নিবেদন করে তবেই ভক্তরা নতুন অন্ন গ্রহন করেন। কেউ আবার তাদের আরাধ্য দেবদেবী, পিতৃ পুরুষ কে নিবেদন করে তবেই নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।
আরেকটি লৌকিক প্রথা হল কাক কে নতুন চালের খদ্যদ্রব্য নিবেদন করা। যাতে কাকের মাধ্যমে সে অন্ন পূর্বপুরুষের নিকট পৌঁছে যায়।এর নাম "কাকবলী' । 
অঘ্রাণের নতুন চাল, মটরশুঁটি, মূলো, কমলালেবু আর খেজুরের গুড়ের পাটালী দিয়ে মা ঠাকুরঘরে "নতুন" দিতেন। দুধের মধ্যে সব নতুন জিনিস দিয়ে পাথরের বাটিতে ঠাকুরকে নিবেদন করা আর কি! আর পুজোর পর সেই প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ! তখন মনে হত, 
আহা শীতকাল, থাক্‌না আমার ঘরে। বারেবারে ফিরে আসুক নবান্ন, ঠিক এমনি করে । 

অঘ্রাণের শুক্লপক্ষে "বড়িহাত' থাকে বাংলার ঘরে ঘরে ।  নতুন বিউলির ডাল ভিজিয়ে রেখে শীলে বেটে নিয়ে তার মধ্যে চালকুমড়ো কুরে দিয়ে, হিং, মৌরী সব মিশিয়ে  স্না সেরে অঘ্রাণের রোদে পিঠ দিয়ে মেয়েরা বড়ি দেয় । একটি বড় কুলোর ওপরে পাতলা পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে সুচারু হস্তে এই বড়ি হাত অর্থাত বড়ি দেওয়ার রীতি অনেকেরি আছে। ঝোলে খাবার বড় বড়ি, ছোট্ট ছোট্ট ভাজাবড়ি এসব আজকাল স্মৃতি। আমরা দোকান থেকে কিনে খাই। আর ডালের সাথে পরিবেশিত হওয়া এই ভাজাবড়ির অন্যতম অঙ্গ ছিল কালোজিরে আর পোস্ত। কেনা বড়িতে পাইনা তেমন আর। এই বড়িহাতের দিন দুটি বড় বড়ি গড়ে তাদের বুড়ো বুড়ি করা হত। বুড়ি-বড়িটির মাথায় সিঁদুর আর দুজনের মাথাতেই ধানদুব্বো দিয়ে, পাঁচ এয়োস্ত্রীর হাতে পান, কপালে সিঁদুর ছুঁইয়ে, শাঁখ বাজিয়ে তাদের রোদে দেওয়া হত। একে বলে বড়ির বুড়োবুড়ির  বিয়ে দেওয়া।
এছাড়াও অঘ্রাণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে মেয়েরা কুলুই চন্ডীর ব্রত করে । বহুযুগ আগে এক ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী এই ব্রত করত।তাদের মেয়ে পুজোর যোগাড়  দিত ।এই পুজোয় ঘটে জোড়া কলা রাখার নিয়ম। মেয়ে একবার জোড়াকলাটি লোভ করে খেয়ে নিল । কিছুদিনের মধ্যে তার গর্ভে এল যমজ সন্তান । কুমারী মেয়ের গর্ভধারণে কুলের সম্মান রক্ষার্থে ও লোকলজ্জার ভয়ে তার বাবা মা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল । মেয়েটি বনের মধ্যে কাঠকুটো দিয়ে পাতার ঘর বানিয়ে বাস করতে লাগল । নির্ধারিত সময়ে তার দুই যমজ পুত্র হল । নাম রাখল আকুলি ও সুকুলি । বড় হয়ে তারা নদীর ধারে খেলা করছে মস্ত এক সওদাগর ধনরত্ন বোঝাই নৌকা নিয়ে তাদের সামনে আসতেই আকুলি ও সুকুলি বলল "তোমার নৌকায় কি আছে? আমাদের একটু দেবে? '
সওদাগর বলল "কেবল গাছপালা আছে বাবা, আর কিচ্ছু নেই'
ছেলে দুটি বলল "বেশ, তবে তাই হোক'
সাথে সাথে সওদাগর গিয়ে দেখে নৌকায় সত্যি সত্যি গাছপালা রয়েছে ।
সওদাগর ছেলেদুটির মাথায় হাত রেখে বললে "তোমরা কে বাবা? আমার ঘাট হয়েছে, আমার নৌকার জিনিষ যেমনটি ছিল তেমনটি ঠিক করে দাও বাবা"

আকুলি-সুকুলি বলল "আমরা তো কিছু জানিনা" এই বলে সওদাগরকে তাদের মায়ের কাছে নিয়ে গেল । তার মা  সব শুনে মা মঙ্গলচন্ডীকে সবকথা জানাল ।
মা মঙ্গলচন্ডী  সওদাগরকে  দৈববাণী করে বললেন  "কেন সে তাঁর ব্রতদাসের অপমান করেছে, কেন সে কিছু ভিক্ষা দেয়নি ছেলে দুটিকে' 

সওদাগর তার ভুল বুঝতে পেরে বাড়ি ফিরে মঙ্গলচন্ডীর পুজোর আয়োজন করল ও হারাণো জিনিষ সব ফিরে পেল।

এবার মঙ্গলচন্ডী স্বপ্নাদেশ দিলেন সেই রাজ্যের রাজাকে । বললেন তার দুই মেয়েকে আকুলি আর সুকুলির সাথে বিয়ে দিয়ে তাদের ঘরজামাই করতে । আকুলি-সুকুলি আর তাদের মায়ের বরাত ফিরে গেল ।

ব্রতকথা যদি লোকশিক্ষার অস্ত্র হয় তবে আমি বলব কন্যার অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের জন্য পাশে থাকুক তার বাবা-মা। যে কারণেই গর্ভাধান হোক না কেন মেয়েসন্তানকে তাড়িয়ে না দিয়ে তার প্রতিকার করুক ।
সওদাগরের ধনসমুদ্র থেকে এক আঁচলা ভিক্ষান্ন পাক আকুলি-সুকুলির মত অবাঞ্ছিত শিশুরা ।
রাজকন্যার সাথে হোকনা ঐ যমজ ছেলেদুটির বিয়ে । বেঁচে যাবে সংসারটি ও সাথে তাদের মা টিও যাকে একদিন লোকলজ্জার ভয়ে ত্যজ্যা কন্যা হতে হয়েছিল । 
প্রতিবছর অঘ্রাণের ভোরে যখন শীত দরজায় কড়া নাড়ে তখন মনে পড়ে এইসব। পাল্টায়না ব্রতকথার গল্পগুলো। শুধু পাল্টে যায় সমাজের চিত্রকল্পটা। বদলে যায় চরিত্রগুলো। ব্রতের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলে এ যুগেও  । সমাজে মেয়েগুলো আজো ব্রাত্য ।

২০ অক্টো, ২০১৭

"ভাইবোনফোঁটা"

ছবি সূত্রঃ গুগল

* সূর্যের ঔরসে সংজ্ঞার গর্ভে যম এবং যমী নামে একজোড়া পুত্র কন্যা হয়। মাতৃজঠরে একত্রে প্রতিপালিত ভ্রাতা যমের জন্য দেহের বাইরে এসে ভগিনী যমীর খুব কষ্ট হত। সে যত বড় হতে লাগল তত তার কষ্ট বাড়তে লাগল। অন্যথায় বিমাতা ছায়া দুজনকে পৃথক করে রাখতে চাইলেন। ছায়ার কুমন্ত্রণায় সূর্য নিজ পুত্র যমকে নরকে এবং কন্যা যমীকে মর্ত্যে পাঠিয়ে দেন। বহুদিন অতিবাহিত হলে যম এবং যমী উভয়ে একে অপরের বিচ্ছেদে কাতর হলেন। যম দেখা করতে গেলেন যমীর সঙ্গে। আর সেদিনটি ছিল কালীপুজোর দু-দিন পর কার্তিক অমাবস্যার শুক্লাদ্বিতীয়া তিথি যা আজো ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা যমদ্বিতীয়া নামে খ্যাত। ভাইয়ের জন্য যমী ঘর সাজিয়ে, নানাবিধ খাদ্যদ্রব্যের আয়োজন করে উপহার সাজিয়ে নাকি বসেছিলেন তাই ঐদিনে বোনেরা ভাইদের জন্য এভাবেই পালন করে থাকে। কারণ একটাই। ভাইয়ের মঙ্গলকামনায়, ভাইয়ের পরমায়ু কামনায়। এটি বলে পুরাণ।
* ঋগ্বেদ বলে যম আর যমী মায়ের শরীরের বাইরে এসেও নাকি মাতৃজঠরের একত্র অবস্থানকে ভুলতে পারেনা। তাই যমী যমকে কামনা করে বসেন। বলেন, আমাকে তোমার সন্তান দাও। যম কিন্তু নিরুত্তর। প্রত্যাখ্যান করেন আপন সহোদরা যমীকে।
* অথর্ববেদে বলে যমুনা নাকি যমকে বলেছিলেন মায়ের পেটে তো তাঁরা একসাথেই দশমাস পাশে শুয়ে ছিলেন অতএব এখনো তিনি সেভাবেই যমকে শয্যাসঙ্গিনী রূপে কামনা করেন কিন্তু যম বোনের মুখে এমনটি শুনে যেন তড়িতাহত হলেন। বলেন, জন্মসূত্রে এক পরিবারের হলে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা গর্হিত কর্ম।
* যদিও প্রাকবৈদিক যুগে ভাই-বোন বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছে তাই যমীর এরূপ ধারণা অমূলক নয়। কিন্তু যম সেই ধারণাকে এক্কেবারে আমল না দিয়ে চলে যান।
আজ আমাদের শরীরবিজ্ঞান বলছে ভাই-বোনে বিবাহ হওয়াটা সত্যি সত্যি যুক্তিযুক্ত নয় ।
জিনগত সমস্যা এই বিবাহকে নিরাপদ করেনা অনেকাংশেই। সুস্থ মাতৃত্ব আসেনা। এলেও জিনগত ত্রুটি নিয়ে সন্তান আসে তাদের যা পরবর্তী জীবনে দুর্বিষহ। ভয়ানক সব রোগের স্বীকার হয় ভাইবোনের মিলনের ফলস্বরূপ সন্তানটি। সে যুগে এত বিজ্ঞান ছিলনা। ছিলনা হেমাটোলজির পরীক্ষানিরিক্ষা। মানুষ বুঝতনা জিনতত্ত্ব ও জৈবরহস্য। সেই বিয়ের ফলশ্রুতি মোটেই সুখকর হয়নি তাই বুঝি ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে সহোদর-সহোদরার বিবাহ। আর তাই বুঝি যমীর ভাইকে বিবাহের আবেদন ও বোনকে বিবাহে যমের এই প্রত্যাখানের লোকায়ত কাহিনীটি প্রচার করে ধীরে ধীরে মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে ভাইফোঁটাকে আর সমাদর করা হয়েছে ভাইবোনের মধুর সম্পর্কটিকে।

যা হয়েছে তা সমাজের ভালোর জন্যেই। যম-যমীর সুস্থতার জন্যেই। আর ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়েছে ভাইবোনের বিয়ে। তাই বুঝি যমী মনকে বুঝিয়ে বলে, যমের অখন্ড পরমায়ু আশা করে। বোনেরা এখনো ভাইয়ের কপালে চুয়া-চন্দনের ফোঁটা দিতে দিতে বলে ওঠে

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁট৷ ।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।
ঢাক বাজে, ঢোল বাজে আর বাজে কাঁড়া।
আজ অবধি ভাই তুমি যেওনা কো যমের দক্ষিণ পাড়া।

সেই সময় কেউ বোধহয় যমীকে বুঝিয়েছিল যে এই বিয়েতে ঠিক হবেনা। তুমি যদি সত্যি সত্যি ভাইকে ভালোবাসো তবে তার সুস্থ পরমায়ু কামনা করো। তাকে পেট পুরে তার মনের মত পদ রেঁধেবেড়ে খাওয়াও, তাকে উপহার দাও..শুধু এই বিয়ে থেকে শতহস্ত দূরে থাকো।
কালের স্রোতে ধুয়েমুছে সাফ হল ভাইবোনের যৌনতার গন্ধ মাখা সম্পর্ক। আর ঠাঁই পেল স্বর্গীয় সুন্দর এক অমলিন, পবিত্র সম্পর্ক। যম যমীর ফোঁটা নিয়ে পরম তৃপ্তি পেলেন। আর সমাজ স্বীকৃতি দিল ভাই-ফোঁটা, ভাই-দুজ, ভাই-বীজ, ভাই-টীকা বা ভাই-তিলকের মত পবিত্র উত্সবকে।

*তাই আবহমান কাল ধরে বোনেরা ভাইদের মঙ্গল কামনা করে ফোঁটা দেয় ভাইয়ের শত পরমায়ু, উন্নতি কামনা করে।
কিন্তু কখনো কি শুনেছি আমরা এর উল্টোটা? অর্থাৎ ভাই তার বোনকে ফোঁটা দিয়ে বোনের সুস্থতা, সুরক্ষা এবং সার্বিক উন্নতি চাইছে? সকালে ধোপদুরস্ত হয়ে মাঞ্জা দিয়ে, ধুতির কোঁচা দুলিয়ে ভাইরা যুগে যুগে বলে এল, "ভাইফোঁটা নিতে যাচ্ছি"। কিন্তু "বোনফোঁটা দিতে যাচ্ছি" ও তো বলতে পারত তারা।
তাই এস আমরা চালু করি সামগ্রিক "ভাইবোনফোঁটা"। দু-তরফের পক্ষ থেকেই ফোঁটা চালু হোক!

১৯ অক্টো, ২০১৭

দীপাণ্বিতার স্মৃতিকণা



মার স্মৃতিতে ছোটবেলায় কালীপুজোর প্রদোষে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর স্মৃতি অমলিন। সব ঘটিবাড়িতেই এই পুজো হবার কথা। আমাদের কোজাগরী পুজো নেই তাই এই পুজোয় মহা ধুম হত। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব পড়ে যেত বাড়িতে। মা, ঠাম্মা উপোস থাকতেন। আর সারাদিন ধরে বিকেলের পুজোর জোগাড় যন্ত্র চলত। আগেরদিন বাজার হয়ে যেত। নারকোল নাড়ু মা আগের দিন করে রাখতেন। ঠাম্মা বসে নাড় পাকাতেন। আখের গুড়ের গন্ধে বাড়ি ঘর ম ম করত। স্কুল ছুটি থাকায় পড়াশুনো শিকেয় তখন। বারান্দার গ্রিলে মোমবাতি, ছাদের প্যারাপেটে মোমবাতি জ্বালানো নিয়ে কত এক্সপেরিমেন্ট চলত আমার আর ভাইয়ের। পুজোর দিন সকালে বাগানের ফুল তোলা ছিল আমার কাজ। একটাও কুঁড়ি না ছিঁড়ে শিউলি, জবা অপরাজিতা ফুল, স্থলপদ্ম তুলে সাজি ভরে আনতাম। ভাই ব্যস্ত তার বাজী নিয়ে। বাজি রোদে শুকনো, কড়মড়ে করে তবে তার শান্তি। আর ক্যাপ ফাটানো নিয়ে তার কত উত্তেজনা। একবার বম্বে থেকে বাবা তার জন্য নিয়ে এলেন স্পেশ্যাল এক ক্যাপ ফাটানোর স্টীলের বন্দুক। তার সঙ্গে আবার কিছু ক্যাপ ফ্রি ছিল। সেই দেখে আমিও উত্তেজিত। যদিও হাতে খেলনা বন্দুক দেওয়া মায়ের নাপসন্দ তবুও ভাইয়ের ইচ্ছে কে বেশ ভালোই প্রশ্রয় দেওয়া হত বাড়িতে।আমাদের বাড়ীতে পুত্র সন্তান ছোট থেকেই বেশ অগ্রাধিকার পায়, দেখেছি এমনটি। কিন্তু আমি
আমার ন'বছরের ভাকে এতটাই স্নেহ করতাম যে তার আনন্দে আমার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যেত। ভাবতাম এটাই যেন হওয়া উচিত। ও তো কত ছোট আমার থেকে। সেই ফুল দিয়ে মা দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীর জন্য মালা গাঁথতেন দেখবার মত। এবার পুজোর ভোগ রাঁধার প্রস্তুতি। বড় হয়ে মা আমাকে বঁটিতে ভোগের ভাজাগুলি কাটতে বলতেন। পাঁচভাজার মধ্যে আলু, পটল, ফুলকপি, বেগুণ, আর রাঙা আলু ভাজা। মা ভাগ করে দিয়ে ভোগের খিচুড়ি বসাতেন। আমি মন দিয়ে ভাজা কাটতাম। ভাই ঠিক সময়ে এসে আমাকে বলত দিদি, বেশী করে গোল গোল চাকা চাকা আলুভাজা কেটে দে প্লিজ। মা যা আলু দিয়েছে তার প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ আলু কাটিয়ে নিত, যাতে না কম পড়ে। এবার মায়ের সেই আলুভাজতে প্রাণান্ত হত। নিয়মিত বাড়িতে এমন আলুভাজা হত না। তাই বুঝি ওর এমন আসক্তি ছিল ঐ স্পেশ্যাল আলুভাজায়। মা ভোগের জন্য সোনামুগ ডাল আর গোবিন্দভোগ চালের অপূর্ব খিচুড়ি, ঘিভাত, ফুলকপির ডালনা, রাঁধতেন। এরপর সুজির পায়েস বসত পেতলের কড়ায়। তাতে কাজু, কিশমিশ দিয়ে গার্ণিশ করার দায়িত্ব পড়ত আমার ওপরে। আর হত একটা স্পেশ্যাল চাটনী। এটা সারাবছরে আর হত না বাড়িতে। পালংশাক ভাজা হয়ে যেত আগেভাগে। সদ্য ওঠা মূলো, রাঙা আলু, বেগুণ আর মটর ডালের ছোট্ট ছোট্ট বড়ি দিয়ে সেই চাটনী।সরষে, ফোড়ন আর নামানোর ঠিক আগে একাটু ময়দা গোলা আরা কাঁচা তেঁতুলের ক্বাথ। সে যে কি অপূর্ব রসায়ন!
সব শেষে চাপত ছোট্ট ছোট্ট গোল গোল ঘিয়ের লুচির খোলা। সে গন্ধ আর পেতুম না সারা বছর।বছরের একটি দিনেই লুচির ময়দা কি করে শক্তপোক্ত করে, কম জল দিয়ে মাখতে হয় শিখে গেছিলাম সারা জীবনের মত। ভাই পাশ থেকে এসে বলত দিদি, বেশী করে ময়দা টা মেখেছিস তো? তারপর পাহাড় প্রমাণ সেই লুচি ভাজতে উপোসী মা হিমশিম খেতেন।
ভোগ রান্নার সময় মা একটিও কথা বলতেন না। পাছে ভোগের মধ্যে থুতু পড়ে যায়।
এবার মা লক্ষ্মী পাততেন। ধানের মধ্যে লক্ষ্মী আর তাঁর পেঁচার আসন গ্রহণ সুচারু আলপনা দেওয়া জল চৌকি তে। ঠাকুমার লক্ষ্মীর হাঁড়ি পেয়েছিলেন মা। সেই ধান প্রতিবছরে বদলানো হত পৌষ মাসে নতুন ধান উঠলে। এবার লক্ষ্মীর পা, ধানের শীষ এঁকে মা পিটুলি গোলা দিয়ে সারা বাড়ি আলপনা দিতেনা। লক্ষ্মীর কুনকে ভর্তি ধান আর ধান, পাশে সিঁদুর কৌটোখানি। মা লক্ষ্মীর ছবিতে পুজোই আমাদের রীতি।
লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো হয় । পিটুলি বাটা দিয়ে মা তাঁর নিপুণ হাতে তৈরী করেন তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী পুতুল, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ পুতুল, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের পুতুল । কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন । আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী । চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ।
চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,
"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্'
আসলে কুললক্ষ্মী তথা ভাগ্যলক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজো। সূর্যাস্তের আগেভাগে প্রদোষকালে হয় অলক্ষ্মীর পুজো। তারপর শুরু হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীর পুজো। ব্রতকথা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম ঈশ্বর, মানুষ, পুজোআর্চা এসবকিছুই তো মানুষের মনগড়া। এই অনুষঙ্গগুলি জীবনযাপনের উপলক্ষ্যমাত্র। উপযুক্ত চেষ্টা এবং ভাগ্যের জোরে মানুষের সংসারে শ্রীবৃদ্ধি হয়। যাকে আমরা বলি লক্ষ্মীর আগমন। তাই ভাগ্যলক্ষ্মীকে বরণ করা হয় দীপাণ্বিতার দিনে।

১৬ অক্টো, ২০১৭

কার্তিক লক্ষ্মী দীপান্বিতা এবং ধনতেরস



এইসময় বর্ধমান সমাচার ১৬ই অক্টোবর ২০১৭
বর্ধমান হল পশ্চিমবাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। মাড়োয়ারি, গুজরাটি সহ বহু রাজ্যের মানুষের বাস এখানে। সেই সঙ্গে যে বাঙালীরা এখানকার প্রাচীন বাসিন্দা তাদের সকলের সংস্কৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এই জেলায় কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজোর দিনে ঘটিদের হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মী পুজো। অবাঙালী ব্যবসায়ীরা বলে দীপাণ্বিতা কালীপুজো।

দীপাবলী বা দেওয়ালির সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর কথা অনেকেই জানিনা। রামায়ণ অনুসারে দীপাবলী হল রামের রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করা উপলক্ষে আলোক উৎসব। দীপাবলীর আলোকসজ্জা এবং শব্দবাজি সেই অধ্যায়কে সামনে রেখেই আজও সমাদৃত ।কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে।আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায়

কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়।
দীপাবলীর আগের দিন চতুর্দশীকে বলা হয়নরকা চতুর্দশী।দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন।

চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলী উৎসবের দ্বিতীয় দিন শাক্ত ধর্মের অনুসারীগণ শক্তি দেবী কালীর পূজা করেন।
আলোকসজ্জার মাধ্যমে অন্ধকারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দিন। সকল অজ্ঞতা তমোভাবকে দীপের আলোয় প্রজ্বলিত করার দিন। কেউ বলেন মহালয়ায় যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্ত্যে এসেছিলেন, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে দিন আলোকসজ্জা বাজি পোড়ানো হয়, দরজা-জানালায় মোম বাতি দেওয়া হয় কেউ বা জ্বালায় আকাশপ্রদীপ।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি।

পশ্চিমবাংলায় অনেকের রীতি কালীপুজোর বিকেলে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজো করে অলক্ষ্মী বিদেয় করা সংসারের শ্রীবৃদ্ধির আশায় লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো পিটুলি বাটা দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরী হয় তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়

চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,

"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে। এই দিনে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী বরদাত্রী রূপে ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।
দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর ব্রতকথায় আবারো উঠে আসে লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য
এক রাজার পাঁচ মেয়ে। একদিন তিনি সকলকে ডেকে জিগেস করলেন, তারা কে কার ভাগ্যে খায়? কনিষ্ঠা কন্যাটি ছাড়া প্রত্যেকেই সমস্বরে জানাল, রাজার ভাগ্যে তারা খায়। কিন্তু কনিষ্ঠা বলল সে নিজের ভাগ্যে খায়। আর মা লক্ষ্মী তার সহায়। সেই কথা শুনে রাজা অগ্নিশর্মা। ঠিক করলেন পরদিন ভোরে উঠে যার মুখ দেখবেন তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। পরদিন রাজবাড়ির সামনে দিয়ে এক বামুন তার পুত্রকে নিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে তিনি ছোটমেয়ের বিয়ে দিলেন। পুত্র রাজার জামাই হল বলে বামুন একাধারে খুশি আবার মহাচিন্তিত। রাজকন্যা তো মহানন্দে শ্বশুরবাড়ি চলল। অভাবের সংসার। মেয়েটি শ্বশুরকে বলল, রাস্তায় যা দেখবেন সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। বামুন একদিন একটি মরা কেউটে দেখতে পেল। বৌমার কথামত সেটি ঘরে নিয়ে এনে মাচায় তুলে রাখল। এবার সে দেশের আরেক রাজার ছেলের অসুখ করেছে। রাজবৈদ্য বলেছে মরা কেউটের মাথা আনলে ওষুধ তৈরী করতে পারে। সেইমত রাজা ঢেঁড়া পেটালেন। যে মরা কেউটের মাথা এনে দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই দেবেন
সেই শুনে রাজকন্যা তখুনি সেই মরা কেউটের মাথাটা রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল। আর সেই সঙ্গে তার শ্বশুরকেও বলে দিল, রাজা কিছু দিতে চাইলে যেন তিনি না নেন শুধু রাজার কাছে তার অর্জি হল একটাই। কার্তিক অমাবস্যায় রাজার রাজত্বের কোনো গ্রামে কেউ যেন ঘরে আলো না জ্বালায়। রাজকন্যার শ্বশুর তা জানিয়ে ফিরে এলেন খালি হাতে। অবশেষে কার্তিক অমাবস্যার রাতে রাজকন্যা নিজের ঘরে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে লক্ষ্মী পুজো করল।নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে আলো জ্বেলে রাখল। মা লক্ষ্মী দেখলেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেবল তাঁর ব্রতীর ঘরেই আলো জ্বলছে। তাঁর কৃপায় বামুনের ঘরে আর কোনো অর্থাভাব ইল না। অবস্থা ভাল হতে বামুন পুকুর কাটালেন। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রাজকন্যার বাবা ভূতপূর্ব রাজাও উপস্থিত। তিনি জানালেন তাঁর দুরবস্থার কথা। নিজের অহমিকায় তাঁর সর্ব নাশ হয়েছে। তিনি আজ ভিখারী। মেয়ে জানাল, "বাবা তুমি লক্ষ্মীপুজো কর। তুমি সেদিন রেগে গিয়েছিলে আমার ওপর। আজ দেখলে তো মা লক্ষ্মীর কৃপাতেই আমার সব হয়েছে"