৫ মে, ২০১৩

অক্ষয় তৃতীয়া


বৈশাখমাসের ব্রত/ বর্ধমান সমাচার   

বৈদিক মতে বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিটি বিশেষ শুভ।  এর নাম অক্ষয় তৃতীয়া।কোনও শুভারম্ভের দিন হিসেবে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অক্ষয় শব্দটির অর্থ হল যার কোনও ক্ষয় নেই অর্থাৎ চিরস্থায়ী। এই তিথিতে কোনও কাজে হাত দিলে তার শুভ ফল অনন্ত কাল ধরে চলতে থাকে। কারও মতে বেদব্যাস এই দিনে মহাভারত লেখায় হাত দেন। কেউ বলেন শ্রী কৃষ্ণ এইদিনে দরিদ্র বন্ধু সুদামা ও দ্রৌপদীকে অক্ষয়পত্র হাতে তুলে দিয়ে ধনসম্পদে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। 


মহাভারতে আছে সূর্যদেব এইদিনে পাণ্ডবদের অক্ষয় পাত্র দান করেছিলেন। অক্ষয় পাত্র এমনি এক মন্ত্রপূত পবিত্র পাত্র যা ঘরে থাকলে কোনোদিন অন্নাভাব হয়না। 

এই দিন বর্ধমান সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্মী নারায়ণ এবং কুবেরের পুজো হয়।মানুষের অগাধ বিশ্বাস এই তিথির ওপর। শুভ মহরত বা সর্ব সিদ্ধ মহরত হবে এই আশায়। কারও হয় সেদিন দোকানের হালখাতা খোলা। 
পুরাণে বলে সত্য এবং ত্রেতা যুগের সূচনা হয়েছিল এই তিথিতে। জৈনদের মতে এই দিন আখের রস খেয়ে তাঁর এক বছরের উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন তীর্থঙ্কর ঋষভ। স্বর্গের দেবতা ধনপতি কুবের এই দিন তার হৃতসম্পদ ফিরে পেয়েছিলেন। 

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির একবার  মহামুনি শতানিককে অক্ষয় তৃতীয়া তিথির মাহাত্ম্য কীর্তন করতে বললেন ।
শতানিক বললেন পুরাকালে খুব ক্রোধসর্বস্ব, নিষ্ঠুর এক ব্রাহ্মণ ছিলেন । ধর্মকর্মে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলনা । একদিন এক দরিদ্র ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ তার নিকট অন্ন এবং জল ভিক্ষা চাইলেন । রণচন্ডী হয়ে ব্রাহ্মণ কর্কশ স্বরে তাঁর দুয়ার থেকে ভিখারীকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন  আর বললেন যে অন্যত্র ভিক্ষার চেষ্টা করতে ।
ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর ভিখারী চলে যেতে উদ্যত হল ।
ব্রাহ্মণ পত্নী সুশীলা অতিথির অবমাননা দেখতে না পেরে  দ্রুত স্বামীর নিকট উপস্থিত হয়ে ভরদুপুরে অতিথি সত্কার না হলে সংসারের অমঙ্গল হবে এবং গৃহের ধন সমৃদ্ধি লোপ পাবে, একথা জানালেন ।  
স্বামীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে  ভিখারীকে তিনি ডাক দিলেন এবং ভিখারীর অন্যত্র যাবার প্রয়োজন নেই সে কথা জানালেন । সুশীলা ত্রস্তপদে তার জন্য অন্নজল আনবার ব্যবস্থা করলেন । কিছুপরেই তিনি অতিথি ভিক্ষুকের সামনে সুশীতল জল এবং অন্ন-ব্যঞ্জন  নিয়ে হাজির হলেন । ভিখারী বামুন অতীব সন্তুষ্ট হলেন এবং সে যাত্রায় সুশীলাকে আশীর্বাদ করে সেই অন্নজল দানকে অক্ষয় দান বলে অভিহিত করে চলে গেলেন ।
বহুবছর পর সেই উগ্রচন্ড  ব্রাহ্মণের অন্তিমকাল উপস্থিত হল । যমদূতেরা এসে তার শিয়রে হাজির ।  ব্রাহ্মণের দেহপিঞ্জর ছেড়ে তার প্রাণবায়ু বের হ'ল বলে। তার শেষের সেই ভয়ঙ্কর সময় উপস্থিত । ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তার কন্ঠ ও তালু শুকিয়ে গেল । তার ওপর যমদূতেদের কঠোর অত্যাচার । ব্রাহ্মণ তাদের কাছে দুফোঁটা জল চাইল এবং তাকে সে যাত্রায় উদ্ধার করতে বলল ।
 যমদূতেরা তখন একহাত নিল ব্রাহ্মণের ওপর ।
তারা বলল " মনে নেই ? তুমি তোমার গৃহ থেকে অতিথি ভিখারীকে নির্জ্জলা বিদেয় করেছিলে ?"
বলতে বলতে তারা ব্রাহ্মণকে টানতে টানতে ধর্মরাজের কাছে নিয়ে গেল ।

ধর্মরাজ ব্রাহ্মণের দিকে তাকিয়ে বললেন " এঁকে কেন আমার কাছে এনেছ্? ইনি  মহা পুণ্যবান ব্যক্তি । বৈশাখমাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে এনার পত্নী তৃষ্ণার্ত অতিথিকে অন্নজল দান করেছেন ।  এই দান অক্ষয় দান ।   
সেই পুণ্যে ইনি পুণ্যাত্মা । আর সেই পুণ্যফলে এনার নরক গমন হবেনা । ব্রাহ্মণকে তোমরা জল দাও । এনার প্রাণবায়ু নির্গত হতে দাও । শীঘ্রই ইনি স্বর্গে গমন করবেন "এমনও হত সেই পিতৃতান্ত্রিক যুগে? সতীর পুণ্যে পতির পুণ্যলাভ। 
আমাদের ঘটি বাড়ীতে দেখেছি অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে কালো সরষে জলে ধুয়ে তা শুকিয়ে নিয়ে শুকনো বাটতে। সদ্য ওঠা কাঁচা আম ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন হলুদ মাখিয়ে রোদে দিতে। তারপর কাঁচের শিশিতে ভরে নেওয়া হত সেই জারানো আম, সরষে গুঁড়ো, তেঁতুলের ক্বাথ, চিনি আর সর্ষের তেল । দিন কয়েক রোদে ফেলে রাখলেই তৈরী হত আম কাসুন্দি। চলতি কথায় বলে আমের কাসন। 

২৮ এপ্রি, ২০১৩

ইহারা জাদু জানে ! কিন্তু শেষরক্ষা করিতে জানেনা ।


এ বি সি ডি গ্রুপ..... ইত্যাদি নানা নামের স্বল্প আমানত প্রকল্পে যোজনা করিবার আহ্বান  আসিল । গ্রামে গঞ্জে, শহরে, মফস্বলে স্বাক্ষর মেয়েদের কাজে লাগানো হ‌ইল ঘরদুয়ার হ‌ইতে মাসিক কিস্তি আদায় করিবার উদ্দেশ্যে । তাহারা আপিস খুলিয়াছে কলিকাতার একপ্রান্তে আর এজেন্ট যাইতেছে আরেকপ্রান্তে । কোম্পানির হাবভাব, বিনিয়োগের পলিসি, সুদের হার, টাকা লগ্নী করিবার নিয়ম ইত্যাদি সম্বন্ধে পাখীপড়া করিয়া পাঠানো হ‌ইতেছে । স্বল্প শিক্ষিত শহুরে এজেন্ট ঘর গেরস্থালীর সামাল দিয়া পান চিবাইতে চিবাইতে ব্যাগ বগলে ল‌ইয়া বস্তিবাসীদিগের উন্নয়নে তার কোম্পানির ভূমিকা হ‌ইতে শুরু করিয়া কত টাকা কয় বত্সরে দ্বিগুণ বা চতুর্গুণ হ‌ইবে অবধি জ্ঞান দিয়া মগজ ধোলাই করিতেছে ।
এ বি সি ডি ইত্যাদি গ্রুপের নামকরণের জন্য অভিধানের বিপুল ভান্ডারে সর্বক্ষণ নানাবিধ আর এন্ড ডি চলিতেছে । কোন্‌ নামেতে বাঙালীমন চট করিয়া টুপি পরিবে কিম্বা কোন্‌ নামের প্রলোভনে পড়িয়া এজেন্টের কথার চিঁড়ে অচিরেই ভিজিবে তাহাই গবেষণার বিষয় । আর করিবে নাই বা কেন ? উহাদের নিজ নিজ ক্যাচ লাইনেও চমক রহিয়াছে । কেহ আস্থার যোগান দেয় । কেহ ভরসা দেবার প্রতিশ্রুতি অথবা আজীবন সাথে থাকার অঙ্গীকার। এতসব বিচার করিয়া কাহার সথিত যাইবেন আমজনতা? কাহার উপর ভরসা করিয়া তাহার হার্ড আর্নড মানি গচ্ছিত রাখিবেন ?
উহারা কৃষিজ দ্রব্য হ‌ইতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা হ‌ইতে ভ্রমণ, সংবাদপত্র প্রকাশনা হ‌ইতে টেলিভিশন চ্যানেল, ফিশারি হ‌ইতে জুয়েলারি, বাতের ওষুধ হ‌ইতে জন্মনিরোধন, সিমেন্ট হ‌ইতে ঝরণার জল সবকিছুই দশভুজার মত মেলিয়া ধরিয়াছেন । যৌবনকে ধরিয়া রাখিবার তথা হৃত যৌবন পুনরুদ্ধার করিবার ক্ষমতা রাখে তাহাদের ঔষধ । উহারা পারে না এমন কিছুই নাই । ইকোপার্ক হ‌ইতে হসপিটাল গড়িতে পারে । সূর্যরশ্মিকে কাজে লাগাইতে পারে । লাভ-লোকসান পরের কথা । উহাদের বিজ্ঞাপনের জৌলুসে টিভি চ্যানেলের কুশীলবের চাকচিক্য নিষ্প্রভ হ‌ইয়া পড়িতেছে ।
সাধারণ মানুষ বলিতেছে হাওয়া পরিবর্তন হ‌ইল বটে! সকালবেলায় পথপার্শ্বে কত সংবাদ! কত রঙীন সংবাদপত্রের বিকিকিনি! দোকানে বাজারে নূতন নূতন এগ্রো কোম্পানির চাল, ডাল, আটা, ময়দা, সুজি, বেসন হ‌ইতে শুরু করিয়া মশলাপাতি, পাঁপড় এমন কি ইসবগুল পর্যন্ত থরে থরে সাজানো ! টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিতেছেন । অতএব টাকা লগ্নী করাটা গৃহস্থের পক্ষে কতটাই নিরাপদ! উহারা ভ্রমণ পিপাসু বাঙালীর জন্য বিলাসবহুল হোটেল খুলিয়াছেন । পেলিং হ‌ইতে পুরী, দীঘা হ‌ইতে দার্জিলিং যাইবার জন্য কত সুবন্দোবস্ত করিতেছেন ! ভ্রমণের সাথী স্বরূপ খাঁটি ঝরণার প্রাকৃতিক জল এবং প্রয়োজনীয় ঔষুধপালাও সরবরাহ করিতেছেন ।
কে বলিল বদলের বাঙ্গলায় শিল্প নাই! আবালবৃদ্ধবণিতার কর্ম সংস্থান হ‌ইতেছে এই "কালেকশানের" কৃপায় । যে মানুষগুলো প্রতিনিয়ত খাটিয়া খান তাঁদের কষ্টের অর্থ আলবাত বিনিয়োগ হ‌ইতেছে ঐ এ বি সি ডি ইত্যাদি কোম্পানিতে ! আর তাহারা ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঘাম ফেলিয়া আরো আরো এমন অর্থ আনিয়া কোম্পানির ভান্ডারে ফেলিতেছেন । দেশের মানুষের টাকা দেশের অভ্যন্তরেই ঘুরপাক খাইতে লাগিল । তাহার পর কোম্পানির লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাইল কি চাটিয়াই ছাড়িয়া দিল তা জানিবার প্রয়োজন নেই আমাদের ।
আমরা বাঙলার তাঁতী, তাঁত বুনিয়া খাই । আমার আত্মীয়ের মেধাবীছাত্র অন্যরাজে চাকরী ল‌ইল। আমার বন্ধুর পুত্র বিদেশে পাড়ি দিল । রিয়েল এষ্টেট হ‌ইতে সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল সব‌ই তো হ‌ইল কিন্তু পরিষেবা কিনিবে কে? যে প্রজন্মের ভোগ করিবার কথা তাহারাই পাততাড়ি গুটাইল বিদেশে ।
তাহা হ‌ইলে এত সংবাদপত্র পড়িবেই বা কে? এত শত কৃষিজ সামগ্রী কিনিবেই বা কে? বত্সরান্তে ভ্রমণে আকুল হ‌ইয়া পেলিং কিম্বা পুরী যাইয়া বিলাসবহুল হোটেলে রাত্রিযাপন করিবেই বা কে ?
পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে মাখিবার জন্য পড়িয়া রহিলেন কেবলি বরিষ্ঠ নরনারী । বঙ্গ আমার পরিণত হ‌ইল জেরিয়াট্রিক মহানগরে ।
তাঁহাদের চোখে ছানি । বাইফোকাল উঁচুনীচু করিয়া সংবাদপত্র পড়িতে হয় । কাজেই উপরোক্ত সংবাদপত্রের লেখক বেশী, পাঠক কম ।
তাঁহাদের ক্ষুধামান্দ্য । তাঁহারা স্বল্পাহারী । বাজারের অতসব কৃষিজ দ্রব্য খাইবার শক্তি নাই ।
তাঁহাদের একাকী ভ্রমণ করিবার শক্তি নাই অতএব বিলাসবহুল হোটেল তাঁহাদের কাছে অধরা ।
সুপার-স্পেশালিটি হসপিটাল তাঁদের কাজে আসিলেও আসিতে পারে কিন্তু ল‌ইয়া যাইবে কে ? দেখিবার কেহ নাই । পুত্রকন্যা বিদেশে । আর অত ব্যয়বহুল চিকিত্সার ভার বহন করিবার ক্ষমতাও তাঁহাদের নাই ।
উহাদের টিভি চ্যানেলের বকবকম শোনেন কেবল উহারাই । বৃদ্ধ মানুষগুলি কানেও ভালো শোনেন না আজকাল । অতএব চ্যানেলের কূটকচালি, নৃত্যগীতবাদ্যশৈলী মুষ্টিমেয় দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ র‌হিল ।
তাহারা একটা কাজ ভুলিয়াও করেন না । সেটি হ‌ইল সকল আমানতকারীর মাথার উপর যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা সেবি আছেন এবং সর্বাগ্রে তাহাদের পারমিশান ল‌ইতে হয় সেটি এ বি সি ডি প্রভূত কোম্পানিরা অনায়াসে এড়াইয়া যান । এর ফলে সাধারণ মানুষ যে তাহাদের অর্থ ফেরত পাইবেন সেরূপ কোনো আশ্বাস দিবার সম্ভাবনাও নাই ।
তাহারা জন্মাইল। জয় করিল । আর অচিরেই পলাইল । আমরা ভাবিলাম উন্নয়নের জোয়ার আসিল বুঝি । কিন্তু সে জোয়ার তো সুনামির ন্যায় ভাসাইয়া দিল কত মানুষের স্বপ্ন ।
তিন দশক পূর্বে এমন ঘটনা ঘটিয়াছিল । কিন্তু বাঙালী ভুলিয়া গেল । সেই ট্র্যাডিশান ফিরিয়া আসিল ।
বলিতে ইচ্ছা হয় : 
ইহারা জাদু জানে !  কিন্তু শেষরক্ষা করিতে জানেনা । 
অথবা
টাকা ল‌ইতে পারি কথার মারপ্যাঁচে কিন্তু ফিরাইতে পারিনা ।  
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে, রাজনৈতিক দলাদলিকে দোষারোপ না করিয়াই বলি বাঙালী কি ঘুমাইয়াই থাকিবে ? কে বলিয়াছে তাহাদের এত দুঃখ সহিতে? 

২৭ মার্চ, ২০১৩

দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান !








মাদের দোল ছিল কিছুটা অন্যরকম । শহুরে দোল যেমন হয় । আগের দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম ন্যাড়াপোড়ার আয়োজন । ফাঁকা মাঠ থাকলেই শুকনো গাছপালা কেটে "যাক্‌ পুরাতন স্মৃতি, যাক্‌ ভুলে যাওয়া গীতি"  নতুন বর্ষবরণের আগে ধুয়েমুছে পুরোণো জঞ্জাল সাফ !
সূর্য্যিডোবার আগেই রেডি পাড়ার কচিকাঁচারা । তারপর ঝুপ করে সন্ধ্যে নামলেই আমরা বারান্দায় লাইন করে । কোন্‌ পাড়ার ন্যাড়াপোড়ার আগুণের লেলিহান শিখা কতদূর গিয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই ! বিখ্যাত সেই প্রাক্‌ দোলযাত্রার ট্যাগলাইন...
 "আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠবে বল হরিবোল! এ যেন ন্যাড়াপোড়ার রিয়েলিটি শো ! এখন অবিশ্যি না হওয়াই ভালো । নেই খালি মাঠঘাট, পলিথিনিক পথঘাট । পর্যাপ্ত প্লাসটিক পূর্ণ পরিবেশে ন্যাড়াপোড়া নৈব নৈব চ!
অতএব কচিকাঁচা-সবুজ অবুঝ সকলেই মজিনু নীল সেই একফুটের স্ক্রিণে, ভুলিনু ন্যাড়াপোড়া, খেলিনু ক্রুদ্ধ পক্ষী অথবা আপডেটিনু মুখব‌ই দেওয়াল ।
পরদিন সত্যনারায়ণের পায়ে ঢিপ করে পেন্নাম করে আবীর দিয়ে পিচকিরী, বালতি ভরে রঙের গোলা আর বারান্দা দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে রং ভর্তি বেলুন মারা ! আর কারোকে না পাও তো সাদা ধোপ দুরস্ত ফতুয়া পরা বাজার অভিমুখী বাবা, দাদাকেই দাও রং কিম্বা বেচারা কাজের মাসীকে একেবারে চুবিয়ে দাও রঙে । আর সাথে অবিরত মুখ চালানো । ঠাকুর ঘর থেকে ঠাম্মার পুজো করা ফুট কড়াই মুড়কির চূড়ো ক্রমশঃ নিম্নগামী হতে থাকে । হাতে রঙীন মঠ । তখন কেউ ফতোয়া জারিও করেনি মঠের রঙের ওপর । লাল মঠে এলিজারিন, হলুদে মেটানিল..এটা খেওনা, সেটা কোরোনা !

ক্রমে যখন স্কুল পেরিয়ে কলেজগেট, তখন দোল বেশ সিরিয়াস অনার্সের চাপে । তবে দোল ছিল প্রকৃত দোলের মতন । অন্যরকমের মাদকতা আর একটা বিশেষ ছুটির দিনে দোলকে দোলের মত করে পাওয়া ।
তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল ফোন অথবা হাজারো কেবল চ্যানেল । অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকি ! তবে মায়ের হাতে স্পেশ্যাল রান্না ছিল সেদিনের মুখ্য আকর্ষণ । সকালে পোলাও-মাংস কিম্বা রাতে লুচি আলুরদম ছিল দোলের স্পেশ্যালিটি কুইজিন ।
কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটির একলাফে ট্রানজিশান যেন গ্রাউন্ড লেভেল থেকে এক্সাইটেড স্টেটে ফার্স্ট ঝাঁপিয়ে পড়া । কো-এড বাতাবরণ । রঙীন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দ । হেদোর মোড়ে ফুচকা তদ্দিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে । বিধানসরণীর চাচার রোল তখন রাজাবাজারে ঊত্তীর্ণ । সেবার প্রচুর ফাগ খেলা হল একপাল ছেলে মেয়েতে মিলে । সেই প্রথম ছেলে বন্ধুদের সাথে দোল খেলে লালটুকটুকে হয়ে লজ্জায় সবুজ হয়ে মিনিবাসে বাড়ি ফেরা । তবুও আনন্দ আকাশে বাতাসে । কারণ মম যৌবন নিকুঞ্জে তখন পাখিডাকার শুরু হয়ে গেছে । মা বরং খুশিই হলেন । এই তো জগতের নিয়ম । প্রকৃতির গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে । আমগাছে মুকুল আসবে । বাদাম গাছের পাতা ঝরে গিয়ে লাল ফুল সর্বস্ব গাছ হবে এই তো বসন্তের নিয়ম ! মায়ের একরত্তি মেয়েটা কেমন বড়ো হয়ে গেল!
তখন বসন্তে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পাসপোর্ট যেন পাওয়া হয়েই যেত সরস্বতী পুজোতে । তারপরেই দোল । অতএব সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা পেয়ে গেছি । তাই সব কিছুতেই মায়ের সায় ।
লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু হতে না হতেই বিরহিনী যক্ষের মত দোল রঙীন হত নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু পাঠিয়ে সাগরপারে ।
কারণ  তখনো হিমেল বসন্তে ইমেল নেই । দোলের দিনে নীলখামে আর্চিস গ্যালারির একটুকরো চিরকূটের নীরব প্রতীক্ষা । বুক ফেটে যায় তো মুখ ফোটেনা । উদাসিনী বেশে বিরহিনী আমি দোলে পেলাম অপ্রত্যাশিত ভালোবাসার সেই নীল খাম । তারপর একে একে গায়েহলুদ, সপ্তপদী ও দোলের গালের লাল রং উঠল সিঁথিতে ।

এখন ফাগুনের ফুল ঝরতে না ঝরতেই চকোলেট-ডে, প্রোপোজ ডে, হাগ-ডে, কিসিং-ডে, ভ্যালেন্টাইনস-ডে পেরিয়ে দোল দে । দোলের আবীরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায় । দোলের রঙের গড়িয়ে পড়তে লাগল অর্কুট অলিন্দ দিয়ে । সেই রঙ গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে ।

এখন দোলের রঙের ওপরেও টেকশো ! রূপ সচেতন বঙ্গতনয়ারা স্কিনফ্রেন্ডলি রং চায় ! ইকোফ্রেন্ডলি আবীর, ভেষজ গুলালে ফ্যাশন ইন ! তাই ডিজিটাল দোল খেলো বাবা!  নো হ্যাপা !  আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না, রং খেলবোনা ! 

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে ! দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । দোলখেলার প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । এখন দোলখেলার বাতাস সোশ্যালনেটওয়ার্ক ময়তায় । ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলখেলা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই দোলখেলা । দোলের রং ঝরছে সর্বত্র । ফাগ উড়ছে অনাবিল আনন্দে ।

সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে বসন্তের দোলখেলার সকাল এসে পড়ে ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো দোলের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় দোলের । মনের মানুষটির হাতের মুঠোয় দোলের ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।
দোলের উপহারের তালিকায়  আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী । দোলের কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে দোল আছে দোলেতেই । একটু অন্য আঙ্গিকে ।  
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । দোলের দিনেও সেই হ্যাঙ আউট । শুধু বসন্ত কেবিন এখন বাসন্তী নীল ফেসবুকের কফিহাউস কিম্বা ডিজিটাল ঠান্ডাই শরবতি মেসেজ আদানপ্রদানে, আমাদের সাথে রঙবাজি করতে । আমরা দোলবাজি করি অন্যভাবে । কিছুটা ফেসবুকি দলবাজিতে অথবা ব্লগবাজির ঠেকে । দোলের সেই আনন্দ আর পাইনা খুঁজে । ফুটকড়াই মুড়কি মঠ হারিয়ে গেল । দোলের আটপৌরে আভিজাত্য হারিয়ে গেল ।স্মার্ট হোল দোলবাজি । দোলা লাগল ফেসবুক-বনে কিন্তু দোলের রং লাগল না মনে । দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হল !

মক্‌টেল থেকে চকোলেট, কফি থেকে কেক, সোনা থেকে জাঙ্ক সর্বত্র হিয়ার মাঝে লুকোনো হ্যাপি হোলি! হোলির ধামাক, হোলি বাম্পার, হোলি হ্যায় !
শপিং মলে, মেট্রোরেলে, সুইমিংপুলে, তন্ত্রেমন্ত্রে হোলি হ্যায়
 
সেই কবে কবি বলেছিলেন ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত ! তারা পলাশ চিনুক না চিনুক আজ কিন্তু ভালোবাসার দোলের দিন আগতপ্রায় । দোলের রঙ লাগতে না লাগতেই ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করতে হবে... মন্দারমণির বালুকাবেলায় লিখিনু সে লিপিখানি প্রিয়তমারে । ঐ কূলে আমি আর এই কূলে তুমি মাঝখানে একরাশ ডিজিটাল ঢেউ বয়ে যায়

১২ মার্চ, ২০১৩

স্মৃতিরূপেণ

বলো তো! আমারা আবার স্মৃতি! কয়জনা যে পড়বে তা অজানা ।  তবুও লিখতে চাই ! ভাবতেও চাই পুরোণো কথাগুলো। ভাগ্যি সাথে ছিল আদরের নৌকা । আপাতত সেখানেই ভেসে চলুক আমার স্মৃতিকণারা ।   যদি তোমাদের ঘুম ভাঙে তোমরাও ভাসতে পারো স্মৃতির ভেলায় আমার সাথে অথবা নিজের সাথে ।   শুরু হল আমার কথা আদরের ব্লগে । 

২৯ জানু, ২০১৩

ব‌ইমেলা উত্সব

খুলে ফেল ব্রাউসার, ই-বুকের বান্ডিল পড়ে ফেল ঝটাপট, যদি থাকে কিন্ডল
ব‌ইমেলা, মেলাব‌ই, ফ্যাশানের মোচ্ছব ! মানুষের ঢল সেথা, শীতের ঐ উত্সব ।
এদিকে কৈছে তাঁরা গাছফাছ কেটোনা, অথচ ছাপিয়ে বৈ কিন্ডল কিনোনা ।
তাহলে তো পরিবেশ এমনিই দূষিত, ডিজিটাল বৈমেলা হয়ে যাক ত্বরিত!
নামীদামী ম্যাগাজিন অনলাইন সস্তা,বাড়িতে রাখতে জ্বালা, ভরে যায় বস্তা ।
News Week উঠে গেল বন্ধু তুমি জানো? অনলাইন পড় তাই ফেলে রাখো কেনো?


ছোট্টবেলা থেকে ছেলেমেয়েদের হাতে ব‌ই তুলে দেওয়ার থেকে ভালো উপহার আর কিছুই নেই । বুড়ো মানুষদের হাতে করে কাশীরামদাসের মহাভারত, কৃত্তিবাসী রামায়ণ কিম্বা কথামৃতের মত ব‌ই এর কথকতা শোনার মত ভালো অভিজ্ঞতা আর কিছুতেই হয়না । ব‌ইমেলায় ঘুরে ঘুরে দুষ্প্রাপ্য কিছু ব‌ই খুঁজে খুঁজে কিনতে খুব ভালোবাসি কিন্তু এত এত নতুন নতুন গল্প-কবিতার ব‌ই বাজারে সেগুলির পাঠক অপ্রতুল । ব‌ইপ্রকাশের ব্যাপারেও অর্থনৈতিক মন্দার কথা জানলাম এবারের দেশ পত্রিকা পড়ে । নতুন লেখক লেখিকার প্রতি কোনো রকম অসম্মান না করেই বলছি তারা আরেকটু কেন ইকোফ্রেন্ডলি এটিট্যুড নিয়ে অনলাইন ইবুক প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না । আর সর্বোপরি যে রাজ্যে শিল্পের হাহাকার, বেকারত্বের চিতকার এখনো সেখানে এত ধুমধাম করে ব‌ইমেলা না করে অনলাইন ব‌ই পড়ানোর ওয়ার্কশপ কিম্বা ওয়েব পত্রিকার প্রোমাশান করলে ভালো হত । রাজ্যের টাকা ঘুরে ফিরে রাজ্যেই আসছে । beyond border গেলে ভালো হত না কি ? নতুন লেখকদের ব‌ই মানুষ অনলাইন পড়ুক বিনিপয়সায় নয় ।মাত্র ১ টাকা করে দিক তারা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে । এতে লেখক অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবেন । আর প্রকাশনার খরচও সামান্য সেখানে । তাই লেখকের হারাবার কিছু নেই । তাই বলে আমি যদি এখন ব‌ই প্রকাশ করি তবে আমাকে অনেকে গাল দেবেন কিন্তু আমার পাঠককুলের একাংশ বরিষ্ঠ মানুষেরা যাদের হাতে ব‌ই তুলে না দিলে তাঁদের প্রতি আমার ঋণ থেকে যাবে চিরকালের মত । তাই প্রিন্ট অন ডিমান্ড এর পথ বেছে নেওয়াই মঙ্গলকর । একসাথে পাবলিশারের মাধ্যমে ৪০০ কপি ব‌ই না ছেপে যখন যেমন দরকার ( মাত্র ১টিব‌ই ও ছাপা যায় )তেমন ছেপে নাও । এতে লেখকের পকেট বাঁচে.. এমন অনলাইন সার্ভিস আছে বাজারে । দেশের অরণ্যমেধ যজ্ঞের বিরুদ্ধে এও আমার এক নীরব প্রতিবাদ ।
ব‌ইমেলা রমরমিয়ে চলছে খুব জাঁকজমক করে । আমিও যাই প্রতিবার, জানিনা এবার হবে কিনা । তবে এখন প্রচুর ডিসকাউন্টে অনলাইন ব‌ইপত্র কেনাকাটি করা আর ই-বুক পড়া এবং সর্বোপরি নামীদামী ম্যাগাজিন অতি সস্তায় সাবস্ক্রাইব করার এত সুযোগ তাই মনে হয় পরিবর্তন এল বলে । তবে প্রিন্ট ম্যাগাজিন বা ব‌ইয়ের চাহিদা থাকবে কিছু মানুষের জন্য যাঁরা কিন্ডল হাতে নিয়ে পড়তে পারেননা বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বেশিক্ষণ বসতে পারেন না । শুনছিলাম " News Week" ম্যাগাজিন প্রিন্ট এডিশান বন্ধ করে দিয়েছে কিন্তু অনলাইন ভার্সান আরামে পড়া যাচ্ছে । তাই মন দিয়ে ব্লগ লিখে চলেছি শীতের দুপুরবেলায়, একটু একটু করে সাহস করে ব্লগ লিখে চলেছি ২০০৭ থেকে এই ভরসায় । দেশের অরণ্য-নিধন যজ্ঞের বিরুদ্ধে এও এক লড়াই আমার । 

 এবারেই পড়লাম দেশ পত্রিকাতে :

"মুদ্রিত ব‌ইয়ের বিক্রি ক্রমশঃই নিম্নগামী । কাগজ-কালি গন্ধ থেকে অনেকটাই দূরে এখন "গ্রন্থের" অবস্থান । ই-বুক একটু একটু করে দখল করে নিচ্ছে বাজার । বিশ্বের নামী প্রকাশকরাও কমিয়ে দিচ্ছেন মুদ্রণ সংখ্যা । লেখকদের পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক দিতে ও তারা দ্বিধান্বিত । তাই স্বয়ং লেখকরাই ছাপাচ্ছেন নিজেদের ব‌ই । তবে এ পন্থা চটজলদি কোনো সমাধানের পথ যে দেখাচ্ছে তেমনটা নয় । পূর্ণ সময়ের লেখক - এই বৃত্তিও ক্রমক্ষীয়মান । পাশাপাশি আর-এক আশঙ্কা , লোকজন এবারও ব‌ইমেলায় ভীড় করবেন বটে , কিন্তু ব‌ই কিনবেন তো ? সব মিলিয়ে মুদ্রণ জগতহয়ত এখন প্রমাদই গুনছে"
দেশ পত্রিকা, ১৭ই জানুয়ারি ২০১৩, "ঘরে-বাইরে" কলম


 শেষ ৮০র দশকে আমার যখন কলেজ বেলা তখন ব‌ইমেলা বাধ্যতামূলক ছিল । কারণ সব অনার্সের ব‌ই লাইব্রেরীতে পাওয়া যেতনা আর কিছু দুস্প্রাপ্য বিদেশী লেখকের টেক্সট ব‌ই সস্তায় পাব সেই আশায়, আর সাথে বন্ধুবান্ধবের জন্মদিনের উপহারে দিতে হবে সারাবছর ধরে , ছোট ভাইয়ের জন্য ছবির ব‌ই, মায়ের জন্য অমনিবাস । চলে আসছি, আবার মনে পড়ে গেল ঠাকুমার জন্য কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের জন্য বাবা খোঁজ নিতে বলেছিলেন ।  আবার বেরিয়ে আসব তখন মনে পড়ল দিদিমা বলেছিলেন কার যেন লেখা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পুঁথি শতছিন্ন হলেও যেন নিয়ে আসি কিনে । ব‌ই কেনা, নাড়াচাড়া, সব করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খাওয়া দাওয়া সেরে ধূলো খেতে খেতে বাসে গিয়ে ওঠা ।
বিয়ের পর ব‌ইমেলা গিয়ে খোঁজ হল মাটিতে বসা তরুণ আর্টিস্টদের কাছ থেকে অরিজিনাল পেন্টিং কেনা আর কালীঘাট পটচিত্র, যামিনী রায় , নন্দলাল বসু, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামী ছবির পোষ্টার সংগ্রহ করা । ঘর সাজাতে হবে । নতুন ঘরবাঁধার জন্য  ব‌ইমেলা  । আরো কিছু টেরাকোটা শিল্পীর কাছ থেকে গিফট আইটেম কেনা  ( তখন অন্যসময় এত সব টেরাকোটা পাওয়া যেত না )  ।
৯০ শুরুতে পুত্রকে নিয়ে হাতে ব‌ই তুলে দিতে হবে । ব‌ইপড়ার অভ্যাস করাতেই হবে । কিন্তু তা তো ইংরেজী ব‌ই । বাংলা উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়, শরদিন্দু তো আমি পড়ে বাড়িতে তাকে শোনাই । তার এক একবার এক একটা সিরিজ চাই । কোনো বার ফেমাস ফাইভ, কোনো বার সিকরেট সেভেন্, কোনো বার নডি ...তারপর এল পুরো টিনটিন, এস্ট্রিকস...  
ততদিনে বাড়ি সিলিকন-চিপময়তায় আচ্ছন্ন ।  কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা । তার একহাতে চাই ব‌ই অন্যহাতে চাই গেমসিডি ।   সিডিও জায়গা করে নিল কোলকাতা ব‌ইমেলায় ।  মিলতে লাগল ফেলুদা, টেনিদা, ঘনাদার অনুবাদও ।   এ প্রজন্ম বাংলা পড়বেনা  । কিন্তু আমার ছেলের কৈশোর যে অধরা থেকে যাবে তাই অনুবাদই স‌ই ।  তখনো কোলকাতার ক্ষুধার রাজ্য সুপ্ত শিল্পীসত্তায় জেগে রয়েছে । কিন্তু ডিজিটালি । অর্কুটময় গদ্যে, ফেসবুকময় কবিতায়, ট্যুইটারময় সনেটে । যন্ত্রজালে জায়গা করে নিয়েছে কত কত উদ্বাস্তু ব্লগবসতি । দুইবাংলার পাবলিক এখন পড়ে কম, লেখে বেশী ।
এখন ব‌ইকেনার চেয়ে স্বরচিত ব‌ইপ্রকাশের পাবলিসিটিতে আত্মহারা তারা । ব‌ইমেলায় হারিয়ে যাচ্ছে শরদিন্দু, সুনীল শক্তিরা । নবপ্রজন্মের কাছে হ্যারিপটার বেশী পাত্তা পায় । ঠাকুমার ঝুলিতে ধূলোর আস্তরণ ।   আর ব‌ইয়ের পাশাপাশি অ-ব‌ইয়ের স্টলও নেহাত কম নয় ।  যে যার ঢাক পেটাচ্ছে জোরেজোরে । জিটকের চ্যাটবাক্সের হাতছানিকে  উপেক্ষা করে কে যায় আর ব‌ইমেলায় ? ব‌ইপ্রেমীর পৃথীবি ফেসবুকময় । যারা যাচ্ছে তারা খাচ্ছে কিন্তু গিলছেনা । যারা পাচ্ছে তারা হেলায় হারাচ্ছে নীহাররঞ্জন-বিভূতিভূষণদের  । আর কিছু খাচ্ছে প্রচন্ড ক্ষুধাতাড়নায় । কেউ কিনছে নতুন ব‌ইয়ের আলমারীতে অমুক সমগ্র, তমুক অমনিবাস সাজিয়ে রাখার জন্য । আর স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের গুগলময় রাজ্যে ব‌ইমেলা নেহাতই একটা মিটিং গ্রাউন্ড । শীতে প্রেমঝারি জমে ক্ষীর  ।
থরে থরে পসরা । বাঙালীর রসনা তৃপ্তির একমেবমদ্বিতীয়ম খোরাক ব‌ই । কিন্তু ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশী । ঠিক যেমন গানের সিডি বাজারে থরে থরে সাজানো কিন্তু শ্রোতার চেয়ে শিল্পী বেশি ।
 আর দেখি টিভি চ্যানেলের উপছে পড়া স্টল । যে যার প্রোপাগান্ডা করে নিজের প্রোডাক্টের প্রোমোশান চালাচ্ছে কিন্তু ব‌ইবিক্রির বাণী সেখানে নীরবে নিভৃতে কাঁদছে । পাঠক-দর্শকের ভীড় সেখানেই । সেলিব্রিটির খোঁজে, হাতে হাত মেলানোর অপেক্ষায় । মানুষ যত না ব‌ই দেখছে তত বেশি কুইজ, অন্তাক্ষরি খেলছে ব‌ইমেলায় । টেলিভিশনে নিজের মুখটা দেখতে পাবে সেই আশায় । বেচারা ব‌ইসব!  
লে ছক্কা !   হাতের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র কপি-পেস্ট । বেকার পয়সা নষ্ট করা কেন !     দাদু ঠাকুমার আয়ু বেড়েছে  । দাদু আর রামায়ণ পড়েন না কারণ ডিমেনশিয়া । ঠাকুমার চৈতন্যচরিতামৃত তাকে ধূলো খায় কারণ এলঝাইমারস । বাবার নেটেই সব পড়াশুনো হয়ে যায় কারণ সামনে খোলা ল্যাপটপ  । মায়ের অনলাইন সব খবর মিলে যায় কারণ উপচে পড়া ডিজিটাল বন্ধুমহল । আর ছেলেপুলের ব‌ইমেলা যাওয়া হল নিছক আউটিং কারণ স্টেটাস সিমবল । কিন্তু তবুও সরস্বতীও আসেন এই সময়েই  । তাই ব‌ইমেলাও আসবে তার নির্ঘন্ট মেনে । থিমও থাকবে একটা কিছু । নতুন নতুন ব‌ইতে উপচে পড়বে স্টল ।  কোলকাতা ব‌ইমেলা বেঁচে থাকবে তার ঐতিহ্য আর রাজকীয়তা নিয়ে কারণ  বছরে  বাঙালীর একটা কিছু বলার মত স্টেটাস আপডেট ব‌ইমেলা-উত্সব !
তবুও যদি ব‌ইমেলার হাত ধরে শিল্প আসত! তবুও যদি ব‌ইমেলার হাত ধরে কর্ম সংস্থান হত! 

২৫ জানু, ২০১৩

তুমি কি এমনি শক্তিমান !


গত সপ্তাহে আমাদের এক বন্ধুর আনুকুল্যে রাঁচি যাবার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ।  ভারত-ইংল্যান্ডের ODI ম্যাচ ঝাড়খন্ডে আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ । খেলা দেখার সৌভাগ্য হল । ধোনির টিম জিতল বলে ঝাড়খন্ডবাসীর সাথে আমরাও  বেজায়  খুশী ।   উইকএন্ড ছিল বলে চট করে রাজরপ্পাও ঘুরে এলাম আমরা একটা গাড়ী নিয়ে । দামোদর ও ভেরা নদীর সঙ্গমে রাজরপ্পা জলপ্রপাতে মা ছিন্নমস্তার মন্দির দর্শন হল । খুব ভালো পুজো দেওয়া হল । শীতের আরামদায়ক জলবায়ু আর সেই সাথে ছোট্ট এমন উইকএন্ড ট্রিপ কার না ভালো লাগে! রাজরপ্পা থেকে ফেরার পথে বুটি (Booty) মোড়ে অবস্থিত ডিপাটলি আর্মি ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে গাড়ি যাবার সময় বাইরে থেকে একটি স্ট্রাকচার দেখতে পেয়ে ড্রাইভারকে বললাম থামতে ।
রাঁচি-রাজরপ্পা-হাজারিবাগ হাইওয়ের ধারে ডিপাটলি ( Dipatoli) ক্যান্টনমেন্টে না থামলে অনেক কিছু মিস করতাম । আর্মি ক্যান্টনমেন্ট যেমনটি হবার কথা । ঝাঁ চকচকে  সবুজ ম্যানিকিওর্ড লন আর অজস্র ফুলের সম্ভার । আর ইন্ডিয়ান আর্মির বাগান বা রাস্তা মেন্টেন্যান্সের ব্যাপারে নতুন কিছু বলাই বাহুল্য । কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগল সেই স্ট্রাকচারটি দেখে যেটি হল ভারতমাতার এক দল সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে তৈরী করা ওয়ার মেমোরিয়াল । ঝাড়খন্ডের এই ওয়ার মেমোরিয়াল যুদ্ধের দেশনেতাদের সম্মান জানাতে সাজিয়ে রেখেছে এই বাগিচায় অনবরত রঙবেরঙের ফুল ফুটিয়ে রেখে । তাঁদের অমর জওয়ান জ্যোতি আজীবন জ্বলে থাকবে ঐ স্থানে ।
আমাদের দেশের সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, ভারত-চীন যুদ্ধে, ইন্দো-পাক যুদ্ধে এবং অন্যান্য উগ্রপন্থী দমনের কাজে প্রতিনিয়ত বলিদানকে স্মরণ করে  তাঁদের "পরম বীর চক্র" প্রদান  করা হয় বিশেষ দিনে ।তাদের পরিবারের হাতে স্মারক তুলে দেওয়া হয় ...এ সব আমরা টেলিভিশনে দেখি, খবরের কাগজে পড়ে । প্রজাতন্ত্র দিবসের ঠিক আগে আগে এইখানে গিয়ে মনটা শ্রদ্ধায় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল । পরমবীরচক্র বিজয়ী এলবার্ট এক্কা, কীর্তি চক্র বিজয়ী  বিহার রেজিমেন্টের  বিশ্ব কেরকাট্টা এঁদের কথা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম আমাদের দেশটার কথা । কিছুদূরে মাঠের মাঝখানে ছিল ছোটনাগপুর অঞ্চলের কিংবদন্তী ট্রাইবাল নেতা বীরসা মুন্ডার স্ট্যাচু  । "লাইট এন্ড সাউন্ড" এর মাধ্যমে  ঐ প্রকান্ড মাঠে শো চলে নিয়মিত সন্ধ্যায়  । প্রতিবছর প্রজাতন্ত্র দিবস আসে এবং চলে যায় । ছোটবেলায় স্কুলে কিছু নিয়ম পালনের মাধ্যমে ঐ দিনটিকে মনে রাখা ছিল বাধ্য-বাধকতার মধ্যে  কিন্তু এতদিন পরে ডিপাটলি ক্যান্টনমেন্টের ঐ ওয়ার মেমোরিয়াল   আমাকে এই পোড়া দেশটার জন্য সত্যি ভাবিয়ে তুলল । 
মনে মনে আজ সারাটাদিন সেই মানুষগুলির আত্মত্যাগের কথা চিন্তার ঢেউ তুলবে আমার মনে যাঁরা বারবার বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে এই এই সুন্দরী দেশমায়ের লাবণ্যটুকুনি বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে প্রাণ দিচ্ছেন অনায়াসে । কার্গিল থেকে কন্যাকুমারিকা,  কচ্ছ থেকে কামাখ্যা বুক দিয়ে আগলে আছেন দেশটাকে । আমরা কতটুকুই বা তাঁদের দিতে পারি কেবলমাত্র বিশেষদিন গুলোতে স্মরণ করা ছাড়া ।
আজ তাই ২৬শে জানুয়ারির প্রাক্কালে তাঁদের জন্য আমার এই লেখাটি ডেডিকেট করলাম । 

১৯ ডিসে, ২০১২

১৯শে ডিসেম্বর


১৯শে ডিসেম্বর সকাল সকাল ফেসবুকের ইনবক্সে উড়ে আসা একরাশ জন্মদিনের শুভেচ্ছা মনে করিয়ে দেয় আজকের দিনটার কথা । আজ আবার ৪র্থ বাংলা ব্লগ দিবস ও । এতটা বছর পার করতে করতে এই দিনটাতে নানারকমের অভিজ্ঞতা কুড়িয়ে নিলাম আঁচল ভরে ।
একবার ছোটবেলায় বাবা হাতে তুলে দিয়েছিলেন  "ছোটদের বুক অফ নলেজ" ।ব‌ইখানা আমার থেকে বড় ও ভারী ছিল তাই সে ব‌ই যখন হাতে করে পড়তে শিখলাম তখন আরো অনেকগুলো জন্মদিন পেরিয়ে গেছে ।  

 ১৯৮৫ সাল  ; তখন বেথুন কলেজের থার্ড ইয়ার । পার্ট-টু পরীক্ষা দিয়ে ছুটিতে রয়েছি বাড়িতে ।  রেজাল্ট বেরুনোর অপেক্ষায় । গান শিখতে গেছি ঐ দিন বিকেলে । বাড়ি ফিরে দেখি একপাল বন্ধুরা বাড়ীতে অপ্রত্যাশিত ভাবে আমার জন্মদিনের সারপ্রাইজ পার্টি দিতে হাজির । আমার কুড়ি বছর পূর্ণ হওয়ায় একুশটা রসোমালাই ভর্তি হাঁড়ি আর একুশটা হলদে গোলাপ নিয়ে সেদিনের সন্ধ্যেবেলায় আমার বাড়ির ড্র‌ইংরুম জমজমাট হল । বিয়ের ঠিক হল ১৯৮৮ সালে । পৃথ্বীশ তখন ডালাসে পিএইচডি স্টুডেন্ট । জন্মদিনের প্রথম লাভলেটার এল নীলখামে বন্দী হয়ে বিদেশ থেকে । সাথে গ্রিটিংস কার্ড ও একটা ছোট্ট উপহারের বাক্সে ছোট্ট ছোট্ট রকমারি পারফিউমের  সুদৃশ্য বোতল ।   সে এক অনুভূতি । জীবনের প্রথম প্রেমিক বন্ধু, হবু স্বামীর কাছ থেকে উপহার ! আবিষ্কার করেছিলাম নতুন করে নিজেকে । আবিষ্ট হয়েছিলাম অন্য রকম এক ভালোলাগায় । এরপর বিয়ে । তারপর ছেলে ও একে একে সংসারের ঝুট-ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া ।  
বিয়ের পর জন্মদিনের কোনো সুখস্মৃতি আমার মনের কোণায় থিতিয়ে পড়ে নেই । আমি কে, আমি কেন আর আমি কি জন্যে জন্মে এই বাড়িটায় এসে হাজির হয়েছিলাম বিয়ের পরে প্রথম কয়েক বছর তা আমাকে কেবলি তাড়া করে বেড়াত । সে সময় চাইলেও আমাকে ওর মত করে পেত না আর আমাকে ওর ইচ্ছেমত ভরিয়েও দিতে পারত না । আমার জন্য কিছু নিয়ে আসা মানেই বাড়িতে তুফানি ঝড় বয়ে যেত আর আমাকে ঘিরে এক অশান্তির বাতাবরণ তৈরী হয়ে যেত নিমেষের মধ্যে । তাই ভুলে যেতে বাধ্য হতাম ঐ বিশেষ দিনটাকে । একবারের ঘটনা খুব মনে পড়ে । আমাকে সারপ্রাইজ দিয়ে  জেমস বন্ডের সিনেমা "টুমরো নেভার ডাইসের" নাইট শোয়ের টিকিট কাটিয়ে রেখেছিল আমাদের ড্রাইভারকে দিয়ে । রাতে বাড়ি এসে ডিনার খেয়ে আমাকে তৈরী হয়ে নিতে বলল " প্রিয়ায় টিকিট কাটা আছে, এই বলে "  চলেও গেলাম অপ্রত্যাশিত একরাশ আনন্দ সঙ্গে করে । রাতে বাড়ি ফিরে দরজা খুলে দিতে হল বলে মুখ ভার দেখলাম তাঁর আর পরদিন চায়ের টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করে র‌ইল সেই কাল মাঝরাতে না বলা বকুনির কথা । " বৌ কে নিয়ে আদিখ্যেতা !!! যত্তসব ! " ভুলে গেলাম জন্মদিনের স্মৃতি ।  এভাবেই পেরিয়ে গেছে বাইশটা বছর এই বাড়িটায় । কিন্তু আমার জন্যে মায়ের মত পায়েস রেঁধে বা ছোট্ট কোনো উপহার নিয়ে কখনো সারপ্রাইস দেয়নি জন্মদিন; যে মানুষটা ভালোবেসে কিছু দিতে চেয়েছে আমাকে তার জন্য তাকে শুনতে হয়েছে অনেক কিছু, স‌ইতে হয়েছে শতেক । কারণ আমি যে অন্য বাড়ির মেয়ে তাদের বাড়ির উত্তরসুরীর জন্মদাত্রী! আজ তারিখটা এলেই মনে পড়ে সেই সব দুঃখের স্মৃতিগুলো । শিউরে উঠি আর বলি,  জন্মদিন, তুমি অন্যের হও, কিন্তু এসো না তুমি আমার হয়ে ।
 ২০১০ এ ভাইয়ের বাড়িতে  পুণায় ছিলাম এইদিনটিতে ।   আগের দিন  দুপুরের খাওয়াদাওয়া, যত্নাআত্তির কোনো ত্রুটি ছিলনা । বিকেল হল । সন্ধ্যে হল । আমরা হৈ হৈ করে বেরুলাম.. মন্দিরে গেলাম । ক্রসওয়ার্ড এ গেলাম । সেখান থেকে পিতজা হাট । খুব খাওয়া হল ।  ফেরার পথে গ্রিন আপেলের ভদকা হল সঙ্গের সাথী । ফিরে এসে রাত বারোটা ছুঁইছুঁই । আমার জন্মদিনের ঘন্টা বাজবে এই বুঝি । টলোমলো পায়ে সে এল গিফট হাতে  ।  ভাইয়ের ছেলে গুগ্‌লের কাছ থেকে "হ্যাপি বার্থ ডে পিসিমণি ( খুতুন)" শুনে আমার ভরে গেছিল মন ।   এত আনন্দ বুঝি কোনো জন্মদিনে হয় নি আমার !
 গতবছর ২০১১ তে জন্মদিন পালন হয়েছিল ট্রেনের মধ্যে । আমরা অমরকন্টক যাচ্ছিলাম । সেও এক অন্যরকমের অনুভূতি ।   এবছর ২০১২ তে আমার ছেলে তার পকেটমানি দিয়ে  আমার জন্য একটা কাঠের কাজ করা   সুন্দর রাজস্থানী মশাল এনেছে । ও জানে মা ঘর সাজাতে ভালোবাসে । তাই এই সারপ্রাইজ । প্রতিবছর আমার জন্মদিন আসতে না আসতেই ৩৬৫দিনের পুরোণো একটা বছরের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যাবার তোড়জোড় ।  

জীবনের আলপথগুলো গুলো চলতে চলতে অনেক বন্ধু এল চারপাশে । একঘেয়েমি কাটল ফেসবুকের একচিলতে ব্যালকনিতে । কেউ ভালোবেসে ছুঁড়ে দিল একরাশ জুঁইভেজা বৃষ্টিকবিতা । কেউ দিল একগোছা শুকনো রজনীগন্ধা । কেউ আবার শিশিরসিক্ত শিউলির গন্ধ নিয়ে সামনাসামনি এসে দাঁড়ালো। আলতো করে ধরে আছি বন্ধুত্বের হাত । ভয় হয়, পাছে দুঃখ পেয়ে বসি । আলগোছে পছন্দ করি বন্ধুর ছবি ।  ভয় হয়, যদি আঘাত পাই।  বন্ধুকে প্রতিদানে হয়ত ফিরিয়েও দি একমুঠো সত্যি শিউলি কিম্বা জুঁইভেজা সন্ধ্যেটা ।

চলতে থাকে জীবন। আলগোছে, আলতো পায়ে । মনের কার্ণিশ বেয়ে নিঃশব্দে উঁকি দেয়  এসেমেস। বেজে ওঠে মুঠোফোন ঝন্‌ঝন্‌ । আমার মনোবীণায় সে ঝঙ্কারে হয়ত সামিল হয় অচেনা কোনো পাখি । সে শুধু বলে তুমি একা নও ।  ইনবক্সে উড়ে আসে অচেনা মেল, হঠাত মেল ।
চলতেই থাকে জীবন ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার ঘ্রাণ নিয়ে, অলস সময় পেরিয়ে যায় বৃষ্টিপথ, ভাবনার গদ্যেরা ভেসে যায় আপন খেয়ালিপথে, আলগোছে, আলতো পায়ে...

কখনো খেয়ালপোকা কিলবিল করে ওঠে । বলে "চল্‌, কোথাও ঘুরে আসি"
কখনো টেষ্টবাড গুলো লক্‌লক্‌ করে ওঠে "বলে চল্‌ ! ভালো কিছু খাই"
এদের নিয়েই  আমার ভালোমন্দ । এদের সাথে ওঠাবসা ।  আর রয়ে গেলে তোমরা । পুরোণো সেই আমির সাথে । চেনা চেনা রোদ্দুরে, অচেনা রাস্তায়, ভালোবাসার ফুটপাথে.......
একমুঠো কুচোনো কবিতার কলি দিয়ে জীবনপাত্রটি ভরে চলেছি । দুফোঁটা গান নিয়েছি সাথে। তিন-চার চামচ বৃষ্টি আর ছড়ানো ছেটানো শিশির ফেলেছি সেই জীবনপাত্রে । কথামালার টুকরো আখরগুলো দিয়ে  উথলে উঠি উঠি পূর্ণপাত্র । সবশেষে গার্ণিশ করলাম ভালোলাগার ঝর্ণাকলমের ফোঁটা দিয়ে । আর ভালোবাসার ঢাকনি দিয়ে বন্ধ করলাম আজকের রেসিপি ।
ভাগ্যি ব্লগ লিখতে শুরু করেছিলাম । তাই আজকের এই বিশেষ দিনে মন খুলে কটা কথা লিখতে পেরে ধন্য হলাম । এটাই এবারের  জন্মদিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া !  


১৬ ডিসে, ২০১২

" আকবর ও আইপড "


-->
তার স্কুলের নাম বীরব্রত । বাড়ির আদুরে নাম বীরু । ক্লাসে বন্ধুরা সকলে ডাকে বীর বলে । অঙ্কের মাষ্টারমশাই ডাকেন বীরবল । খুব গর্ব বোধ করে তখন বীরু মনে মনে । আকবরের রাজসভার বীরবল চরিত্রটা হল বীরুর আইকন । বীরু নিজে যেমন বুদ্ধিদীপ্ত আর চালাক তেমনি আবার মজার মজার কথা বলে মানুষকে একদম সম্মোহিত করে ফেলে ।
তখন বীর বছর তিনেকের । সবে শ্লেটে চকের আঁচড় কাটছে । মা নিজের কাজ সারবে বলে সিমেন্টের মেঝেতে রঙীন চক দিয়ে বীরকে এবিসিডি লিখতে বলে রান্নাঘরে চলে গেছে । রান্নাঘর আর শোবার ঘরের মাঝে এক বিস্তর দালান । সিমেন্টের চকচকে মেঝে । বীর এ লিখে পাশে একটা ট্যারা বেঁকা আপেল, বি লিখে তার পাশে একটা মস্ত ব্যাট এঁকে, যেই সি লিখেছে মনে হল রোজ তো ম্যাওপুষি আঁকি । আজ ক্যাটার পিলার আঁকলে কেমন হয় ? যা কথা সেই কাজ । ক্যাটার পিলারের তিন খন্ড দেহ এঁকে দুটো জম্পেশ শুঁড় দিয়ে আর পেল্লায় দুটো চোখ মাথায় বসিয়েই মনে হল মা'কে ডাকে । মা কি আর রান্নাঘর থেকে ডাকলেই আসতে পারে ! " মাম্‌মাম্‌ দ্যাখো, দ্যাখো বলেও সাড়া না পেয়ে সোজা শোবার ঘর থেকে দালান হয়ে রান্নাঘর অবধি বীর তখন মন দিয়ে ক্যাটার পিলারটার দেহ একখন্ড করে বাড়িয়েই চলল নীচের দিকে । কাছাকাছি এসে সে পৌঁছে গেছে তার ক্যাটার পিলারকে নিয়ে । চীত্কার করে মাকে বলল " তুমি তো আর ক্যাটারপিলারকে দেখতে গেলে না , ও তোমার সঙ্গে দ্যাখা করতে চলে এসেছে" এই সেই একরত্তি বীরব্রত ।
স্কুলে ভর্তি হবার পর বাংলা ক্লাসে প্রথম ইউনিট টেষ্ট পিকচার কম্পোজিশানের । বিষয় বাড়ি । বীর মন দিয়ে বাড়ি এঁকেছে একটা । দেওয়ালে ইঁট । জানলায় গরাদ । আধা ভেজানো দরজা । মাথায় টালির চাল আর সেখান থেকে বেরিয়েছে স্মোকলেস উনুনের পাইপ । দশ লাইন লিখতে হবে বাড়ি নিয়ে । মোটে পাঁচ লাইন লিখে মন দিয়ে বাড়ি রঙ করছে বীর । একটা একটা করে লাল ইঁট, জানলা দরজা, গরাদ, সিঁড়ি সব রঙ করে ধোঁয়ার পাইপের মুখ দিয়ে কুচকুচে কালো ধোঁয়া এঁকে সেই ধোঁয়া বের করতে করতে ঘন্টা পড়ে গেল ! লেখা শেষ হল না । টিচার দশের মধ্যে তাকে পাঁচ দিয়েছেন দেখে বীর গিয়ে বলল " মিস, আমাকে পাঁচ দিলেন ? আমি এত কষ্ট করে বাড়িটা রঙ করলাম ! " মিস্‌ খুশি হয়ে আরো দুটো নম্বর বাড়িয়ে দিলেন । এই ছিল একফোঁটা ছেলের কান্ড !


যত বড় হতে লাগল বীরব্রত তত তার অঙ্কে মাথা খুলতে লাগল । মা-বাবা কখনো তাকে অঙ্ক পরীক্ষা নিয়ে মাতামাতি বা জোরাজুরি করেনি বলেই বোধহয় সে অঙ্ক করতে বড্ড ভালবাসত । বরং অঙ্ক পরীক্ষার আগের দিন মা'কে বলত মা, তুমি আমাকে একটু অঙ্ক প্র্যাকটিস করাবেনা ? বন্ধুদের মায়েরা কত কত ব‌ই ঘেঁটে অঙ্ক করায় ওদের। কি জানি হয়ত মা তার অঙ্ক পরীক্ষা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেনি বলেই বোধহয় সে অত ভালো নম্বর পায় অঙ্কে । অঙ্ক পরীক্ষা মানেই অন্য বন্ধুদের যেন যত টেনশান । আর ক্লাসে সকলে তাকে বলে "উইজার্ড অফ ম্যাথস্" । তাকে যা অঙ্কই দেওয়া হোক যেমন করেই হোক সে করে দেয় ।
বীরব্রত এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে । লেখাপড়ার পাশাপাশি গান শোনা আর ব‌ই অন্ত প্রাণ তার । বাংলাব্যান্ডের গান এফ এমের কৃপায় ঠোঁটস্থ । জন্মদিনে, পুজোয় কেউ তাকে কি উপহার নেবে জিগেস করলে বীর একবাক্যে বলে ব‌ই কিম্বা গানের সিডি । এবার ছোটমামা তাকে দিয়েছে বাংলাব্যান্ডের সিডি, মাসী দিয়েছে একটা সায়েন্স ফিকশান, আর একটা আকবর-বীরবলের গল্পের মজাদার ব‌ই । পুজোটা বেশ কেটে গেল হৈ হৈ করে গল্পের ব‌ই পড়ে, ঠাকুর দেখে গান শুনে আর মজা করে । পুজোর পর বাড়ি খালি । মন খারাপের পার্টির শুরু । তার ওপর স্কুল খুলেই ইউনিট টেষ্টগুলো সব হাত নেড়ে নেড়ে বলবে আজ বাংলা, কাল হিষ্ট্রি, পরশু ইভিএস । তবে পরীক্ষা দিতে, পড়াশুনো করতে বীরের খারাপ লাগেনা কিন্তু পুজোর ছুটি আর গরমের ছুটির পর স্কুল যেতে মোটেই ভাল্লাগেনা । তারপর স্ক্র্যাপবুক, ক্রাফট, নেচার ক্লাবের চার্ট তৈরী, স্কুলের অত্তবড় মাঠ থেকে রোজ প্লাসটিক তোলা, স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য ছোটদের কাছ থেকে লেখা আদায় করা ... কত কাজ ! ভাগ্যিস তাকে রাহুল, সোহাগের মত টিউশানে যেতে হয়না । ক্রিকেট খেলতে হয়না । তাহলে তো আরো বাঁধাধরা জীবন হত তার । সে কথা ভেবে মনে মনে খুশী হয় বীরু । স্পোর্টস সে একটাই করে তা হল সাঁতার কাটা । নিয়ম করে ভোরবেলায় বাবার সাথে সাঁতার কাটতে যায় । পড়াশুনোয় বীরু এক্সেল নয় কিন্তু একেবারে খারাপও নয় ।

পুজোর ছুটির শেষদুপুরে ঘুম পেল বীরের । হাতে মাসীর দেওয়া আকবর-বীরবল আর কানে লাগানো আইপড । সিডি থেকে গান গুলো মামা সব আইপডে ট্রান্সফার করে দিয়ে গেছে । নাকের ওপর চশমা আর তার ওপর জোরসে আকবর-বীরবল-চিত্র-কথা আছাড় খেল । তো কি, তার দুচোখে নিদ্রাদেবী তখন ভর করেছেন । আর সে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে সোজা এসে দাঁড়াল আকবরের রাজসভায় । এই সেই ইতিহাস.. এই সেই দিল্লির মুঘল সম্রাটের দেওয়ানি আম ? কি বিশাল রূপোর দরজা ! ঠাম্মা যেমন রাজার গল্প শোনাতেন! নবরত্ন খচিত লাল পলা, নীলা, সাদা মুক্তো, হীরে, পোখরাজ, পান্না, বৈদুর্যমণি.. আরো কত সব পাথর থেকে জ্যোতি ঠিকরে পড়ছে দেওয়ালে! কানে লাগানো আইপডে তখন বেজে চলেছে... আসছে সে এক রাজার রাজা ..ক্যাকটাসের "রাজার রাজা" এলবামের হিট গান । ছোট্ট ছেলে বীরু, পরণে তার সিক্স পকেটস, সাদা জিনসের প্যান্ট আর গায়ে কালো রঙের স্পাইডারম্যানের টিশার্ট । পায়ে একজোড়া ফ্লোটার্স । আকবার বাদশার জমজমাট রাজসভায় রবাহুত, অনাহুতের মত ঢুকে পড়েছে বীরু। নবরত্নের আসন আলোকিত করে রয়েছেন জ্ঞানী-গুণী ন'জন তারকা ।
আকবরই হবেন ইনি ! সিংহাসনে বসে আছেন সকলের থেকে দূরে, একা..কি চকমকে বেশভূষা, আর মণিমাণিক্য খচিত রাজ সিংহাসন তার ! কত গয়না পরেন না জানি রাজা মহারাজারা.. ভাবল। বীরুকে দেখেই সভার কার্যকলাপ স্থগিত হয়ে গেল।বীরুর আর কোনো সন্দেহ নেই ! ইনি মুঘলসম্রাট শাহেনশা আকবর বাদশা হতে বাধ্য । কি চকমকে পোশাক, কত সুন্দর পাগড়ী মাথায় ! কত গয়নাগাটি পরেছেন সম্রাট! রাজাদের বেশভূষা, চালচলন এমনই হয় সে জানে । স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সব রাজারাই রাজার মত হ'ন ।
একবার মনে হল গিয়ে সেলাম করে আসে । একবার ভাবল নিজের পরিচয় দেয় । তারপরেই মনে হল নাম না জিগেস করলে বলবে কেন সে ? ইচ্ছে হল তাঁকে গিয়ে জিগেস করে, আচ্ছা এখানে বাবর, হুমায়ুনের ছবি কোথায় ? রাজসভা আলো করে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ভাবে বসে আছেন সব মন্ত্রীর মত ব্যক্তিরা । বীরব্রতর মনে পড়ল বিক্রমাদিত্যের মত আকবরের রাজসভাতেও তো নবরত্ন ছিল । ভাবতে ভাবতে হঠাত দেখে, একজন তালপাতার পুঁথি থেকে আবৃত্তি করছে.. কি সব আওড়াচ্ছেন শ্লোকের মত ; ও তাহলে ইনি পন্ডিত আবুল ফজল যিনি লিখেছিলেন আকবরের জীবনী "আকবরনামা" । আর তাঁর পাশেই ফৈজী হবেন নিশ্চয়ই যিনি ছিলেন আবুল ফজলের ভাই । গণিতে পারদর্শী ছিলেন আর কবি ছিলেন । আকবরের রাজসভার সব চেয়ে বড় সাহিত্যিক, জ্ঞানী মানুষ ...ইতিহাসে পড়েছে বীর ।
ঐ দূরে কত কত বাদ্যযন্ত্র পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন যিনি উনি নিশ্চয়ই মিঞা তানসেন । আকবর যাঁর সঙ্গীতের কদর করেছিলেন । বীর মনে মনে বলল । অভাবনীয় ক্ল্যাসিকাল শিল্পী তানসেন, যিনি দীপক রাগ গেয়ে আগুণ জ্বালাতেন, মেঘমল্লার রাগ গেয়ে বৃষ্টি নামিয়েছিলেন ...বীর সব পড়েছে এসব । সঙ্গীতশিল্পী দেখলে বীরের কেবল অটোগ্রাফ নিতে মন চায় ! ইস্‌ একটা কাগজ পেন নেই তার সাথে ! আকবর বাদশার পাশে বসে আছেন ঐ মানুষটা কে হতে পারে, খুব মন দিয়ে সম্রাটের সাথে গুরুতর আলোচনায় ব্যস্ত উনি । কি সব হিসেব নিকেশের কাজকর্ম চলছে বলে মন হল তার । বোধহয় রাজা টোডরমল উনি । আকবরের খাস দেওয়ান ছিলেন । যত দেখছে বীরু ততই খুশি খুশি হয়ে উঠছে তার মনটা । জমজমাট একটা রাজপ্রাসাদের মন্ত্রীমহল । সেবার দিল্লী-আগ্রা বেড়াতে গিয়ে বিশাল বিশাল রাজপ্রাসাদ দেখে মনে হয়েছিল শূণ্যতা আর শূণ্যতা ! রাজা,মন্ত্রী আর তাদের পার্ষদ না থাকলে রাজবাড়ী কেমন যেন বিষণ্ণতায় ভরা থাকে । হঠাত রাজসভায় টুংটাং আওয়াজ হতে শুরু হল । মিঞা তানসেন মিহি করে গান ধরেছেন তখন । বীরু দেখল আরেকজন মানুষকে । খুব সাদামাটা পোষাকে খুব হাসিখুশি মুখে বসে বসে কি যেন বিড়বিড় করে চলেছেন তিনি আর পাশের মানুষগুলিও তার কথার অংশীদার হয়ে হেসে উঠছে জোরে জোরে । ইনি দরিদ্র ব্রাহ্মণপুত্র বীরবল হতে বাধ্য । যার নাম ছিল মহেশদাস । সম্রাট আকবর এনার নাম দিয়েছিলেন বীরবল । খুব পছন্দ করতেন আকবর এনাকে । এনার বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত তারিফ করেছিলেন ইনি । বীরু সব জানে এসব । ঐ চরিত্রটি তার যে বড্ড পচ্ছন্দ । জাঁকালো সব জোকস জানে বীরু । আকবর-বীরবলের ব‌ইতে পড়েছে । সেই উটের দেহ কেন বাঁকাচোরা ? বাগানে ক'টা কাক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ? এসব মনে পড়লে হেসে কুটিপাটি হয় আর মাম্‌মাম্‌, বাবাইয়ের সাথে শেয়ার করে । কিন্তু আকবরের নবরত্ন সভার আরো কয়েকজনের নাম আর মনে পড়ছেনা সেই মূহুর্তে তার । আরো কয়েকজন আছেন এই নাইন-জেমস ক্লাবে কি যেন নাম বাকীদের মনে মনে হিস্ট্রি ব‌ইয়ের পাতা থেকে বলতে লাগল..
হঠাত মনে হ'ল বাদশার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে । তাহলে তিনিই তো বলে দেবেন বাকী ক'জনের নাম । চিনিয়ে দেবেন তাদের একে একে ।
এক উর্দিপরা এক চাপরাশি এসে তাকে টেনিস বলের সাইজের লাড্ডু আর একবাটি ক্ষীর খেতে দিল ।
বীরু তো মিষ্টি খেতে ওস্তাদ অত বড় লাড্ডু হাতে নিয়ে মনে পড়ে গেল গুপিবাঘার সেই রাজার আদরের কথা । ঠিক অত্তবড় রসগোল্লা দেখেছিল সিনেমায় ।
মাথায় তখনো ঘুরছে তার আকবর-বীরবলের গল্প । লাড্ডু হাতে নিয়ে দৌড়ে চলে এল রাজার সামনে । সম্রাট আকবর বীরব্রতকে দেখে একগাল হেসে বললেন " তোমার নাম কি , তুমি কোথা থেকে এসেছ ইত্যাদি ইত্যাদি । বীরব্রত সব জবাব দিতে দিতে আকবরকে মন দিয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগল ।
সম্রাট আকবর বীরব্রতর কানে দুটো সাদা সূতো ঝুলছে দেখে অবাক হয়ে জিগেস করলেন " আচ্ছা এটা কি বস্তু বালক? "
বীরব্রত বলল "এটা হল গান শোনার তার, "আইপড" আছে না ? তার থেকে বের হয়ে কানে লাগানো থাকে" এই বলে পকেট থেকে ছোট্ট গানযন্ত্রটি বের করে দেখাল আর রাজার কানে হেডফোন লাগিয়ে দিয়ে গান শোনাতে লাগল ।
রাজার খুব ভাল লাগল । বললেন "এটা আমাকে এনে দিতে পারবে"
বীরব্রত বললে "তুমি এটাই নাও না, তোমার জন্য আমি তো কিচ্ছু আনিনি হাতে করে, যতক্ষণ ব্যাটারী আছে তুমি গান শুনতে পারবে, কিন্তু চার্জ দেবে কোথায় ? তোমার এখানে তো ইলেকট্রিসিটি নেই" গল্পের ব‌ইতে পড়েছি, রাজাদের সাথে দেখা করতে গেলে ভেট দিতে হয় , না হয় এটাই দিলাম তোমাকে রাজা মশাই"
বীরব্রত বললে "আমাকে অটোগ্রাফ দেবে রাজামশাই?"
"সে আবার কি বস্তু?" আকবর বললেন
"অটোগ্রাফ হল নিজের হাতে লেখা স‌ই বা ছাপ যাই বল" বীরব্রত বললে
আচ্ছা, আমরা যাকে স্বাক্ষর বলি, আকবর বললেন

"এই যা:,আমি কাগজ পেন আনিনি । আমাকে একটা কাগজে তোমার নাম স‌ই করে দেবে রাজামশাই? আমার বন্ধুদের গিয়ে দেখাব" বীরব্রত বললে
আকবর বললেন " কাগজ কি বস্তু? আমি একটা তালপাতা দিচ্ছি , আমার সভার ন'জন রত্নকে নাম স‌ই করে তোমাকে দিতে বলছি"
খুশি হয়ে বললেন "আমার রাজত্বকালে মুদ্রিত, আমার নাম লেখা এই স্বর্ণমুদ্রাটি তোমাকে উপহার দিলাম ” বীরব্রত সেটিকে সযত্নে পকেটের মধ্যে পুরে রাখল ।

মন্ত্রীমশাই রাজার কাছ থেকে একটা তালপাতা, একটা খাগের কলম ও কালির দোয়াত এনে একে একে ন'জন নবরত্নের কাছ থেকে সেই তালপাতায় স‌ই করাল ও সব শেষে আকবরের কাছ থেকে তালপাতাটায় যেই মাত্র তাঁর স‌ই নেবার জন্যে আসবে তখুনি তার ঘুম ভেঙে গেল

ঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় খুব আপসেট। কেন এমন হয় ? কেন রাজার অটোগ্রাফ নেওয়া হল না ? দূর একটুও ভালো লাগছেনা এখন তার; কেবল মাথায় ঘুরছে আকবরের রাজসভা, নবরত্ন, ফতেপুর সিক্রির সেই দেওয়ানি আম দরবার । আবার স্কুল খুলে যাবে । দুপুরে আর ঘুমোতে পারবে না সে । উতসব শেষ, স্বপ্ন দেখাও শেষ ।
কিন্তু এবার উতসবের ছুটিতে ফতেপুর সিক্রির সেই দেওয়ানি আম দরবার বেড়ানো... বীরকে এক ভালোলাগায় পেয়ে বসল ।

মনে পড়ল পুজোর ছুটিতে বাংলা মিস একটা রচনা লিখে আনতে বলেছেন পুজোর ছুটির দুপুরবেলা নিয়ে । ঘুম ভাঙতেই মা বললেন "বীর, আয় পাস্তা বানিয়েছি, খেয়ে নে"
পাস্তা তার খুব প্রিয় । বীর বলল "দাঁড়াও মা, ভুলে যাব এক্ষুণি না লিখে ফেললে"
বাংলাখাতা আর পেন নিয়ে বসে পড়ল ছুটির দুপুরের রচনা লিখতে "আমার দুপুরবেলার ইচ্ছে স্বপ্নেরা"...
ডান হাতে কলম আর বাঁ হাতে পাস্তার চামচ। চলতে লাগল সব্যসাচীর দুহাত সমান তালে ।
মা দেখতে লাগল দুচোখ ভরে বীরপুরুষকে । কানে আইপডটা গেল কোথায় ? "নিশ্চয়ই, হারালি তো এই বারে ?" মা বলল
"কোথায় আবার যাবে, আছে তো পকেটের মধ্যেই । দিচ্ছি দাঁড়াও । একটু লিখতে দাও না মা তারপর দিচ্ছি" বলল সে
মা ব্যস্ত হয়ে বললেন "নির্ঘাত হারিয়েছিস ওটা, আমি জানতাম একদিন হারাবেই"
বীর পকেট  হাতড়াল, পেলনা । "জানো মা আজ কি হয়েছিল?” বলল সে ।
মা বললেন "বুঝেছি আইপড হারানোর একটা গল্প ফাঁদছিস তো?"
বীর আবার পকেটের মধ্যে হাত দিয়ে খুঁজল তার গানযন্ত্রটিকে  ।
পেল অন্য একটা জিনিষ । স্বয়ং মুঘল সম্রাটের দেওয়া  উপহার । সেই আকবরী মোহরটিকে
পকেট হাতড়ে সোনার কয়েনটা মায়ের হাতে দিয়ে  বললে "এটা নাও"
মা তো হতবাক ! আইপডের বদলে সোনার কয়েন ? "কোথায় পেলি ?"
"ঐ জন্যেই তো লিখছি তাড়াতাড়ি যাতে তুমি সব জানতে পারো । নয়তো সব ভুলে যাব যে"
মা উলটেপালটে দেখতে লাগল সোনার কয়েনে কি সব লেখা রয়েছে তাতে ।
অনাবিল আনন্দে বীর ততক্ষণে ডুবে গেছে তার বাংলা রচনার মধ্যে । 

 আনন্দমেলা ৫ই নভেম্বর ২০১২ তে প্রকাশিত