১৬ অক্টো, ২০১৭

কার্তিক লক্ষ্মী দীপান্বিতা এবং ধনতেরস



এইসময় বর্ধমান সমাচার ১৬ই অক্টোবর ২০১৭
বর্ধমান হল পশ্চিমবাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। মাড়োয়ারি, গুজরাটি সহ বহু রাজ্যের মানুষের বাস এখানে। সেই সঙ্গে যে বাঙালীরা এখানকার প্রাচীন বাসিন্দা তাদের সকলের সংস্কৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এই জেলায় কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজোর দিনে ঘটিদের হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মী পুজো। অবাঙালী ব্যবসায়ীরা বলে দীপাণ্বিতা কালীপুজো।

দীপাবলী বা দেওয়ালির সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর কথা অনেকেই জানিনা। রামায়ণ অনুসারে দীপাবলী হল রামের রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করা উপলক্ষে আলোক উৎসব। দীপাবলীর আলোকসজ্জা এবং শব্দবাজি সেই অধ্যায়কে সামনে রেখেই আজও সমাদৃত ।কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে।আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায়

কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়।
দীপাবলীর আগের দিন চতুর্দশীকে বলা হয়নরকা চতুর্দশী।দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন।

চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলী উৎসবের দ্বিতীয় দিন শাক্ত ধর্মের অনুসারীগণ শক্তি দেবী কালীর পূজা করেন।
আলোকসজ্জার মাধ্যমে অন্ধকারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দিন। সকল অজ্ঞতা তমোভাবকে দীপের আলোয় প্রজ্বলিত করার দিন। কেউ বলেন মহালয়ায় যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্ত্যে এসেছিলেন, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে দিন আলোকসজ্জা বাজি পোড়ানো হয়, দরজা-জানালায় মোম বাতি দেওয়া হয় কেউ বা জ্বালায় আকাশপ্রদীপ।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি।

পশ্চিমবাংলায় অনেকের রীতি কালীপুজোর বিকেলে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজো করে অলক্ষ্মী বিদেয় করা সংসারের শ্রীবৃদ্ধির আশায় লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো পিটুলি বাটা দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরী হয় তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়

চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,

"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে। এই দিনে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী বরদাত্রী রূপে ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।
দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর ব্রতকথায় আবারো উঠে আসে লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য
এক রাজার পাঁচ মেয়ে। একদিন তিনি সকলকে ডেকে জিগেস করলেন, তারা কে কার ভাগ্যে খায়? কনিষ্ঠা কন্যাটি ছাড়া প্রত্যেকেই সমস্বরে জানাল, রাজার ভাগ্যে তারা খায়। কিন্তু কনিষ্ঠা বলল সে নিজের ভাগ্যে খায়। আর মা লক্ষ্মী তার সহায়। সেই কথা শুনে রাজা অগ্নিশর্মা। ঠিক করলেন পরদিন ভোরে উঠে যার মুখ দেখবেন তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। পরদিন রাজবাড়ির সামনে দিয়ে এক বামুন তার পুত্রকে নিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে তিনি ছোটমেয়ের বিয়ে দিলেন। পুত্র রাজার জামাই হল বলে বামুন একাধারে খুশি আবার মহাচিন্তিত। রাজকন্যা তো মহানন্দে শ্বশুরবাড়ি চলল। অভাবের সংসার। মেয়েটি শ্বশুরকে বলল, রাস্তায় যা দেখবেন সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। বামুন একদিন একটি মরা কেউটে দেখতে পেল। বৌমার কথামত সেটি ঘরে নিয়ে এনে মাচায় তুলে রাখল। এবার সে দেশের আরেক রাজার ছেলের অসুখ করেছে। রাজবৈদ্য বলেছে মরা কেউটের মাথা আনলে ওষুধ তৈরী করতে পারে। সেইমত রাজা ঢেঁড়া পেটালেন। যে মরা কেউটের মাথা এনে দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই দেবেন
সেই শুনে রাজকন্যা তখুনি সেই মরা কেউটের মাথাটা রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল। আর সেই সঙ্গে তার শ্বশুরকেও বলে দিল, রাজা কিছু দিতে চাইলে যেন তিনি না নেন শুধু রাজার কাছে তার অর্জি হল একটাই। কার্তিক অমাবস্যায় রাজার রাজত্বের কোনো গ্রামে কেউ যেন ঘরে আলো না জ্বালায়। রাজকন্যার শ্বশুর তা জানিয়ে ফিরে এলেন খালি হাতে। অবশেষে কার্তিক অমাবস্যার রাতে রাজকন্যা নিজের ঘরে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে লক্ষ্মী পুজো করল।নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে আলো জ্বেলে রাখল। মা লক্ষ্মী দেখলেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেবল তাঁর ব্রতীর ঘরেই আলো জ্বলছে। তাঁর কৃপায় বামুনের ঘরে আর কোনো অর্থাভাব ইল না। অবস্থা ভাল হতে বামুন পুকুর কাটালেন। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রাজকন্যার বাবা ভূতপূর্ব রাজাও উপস্থিত। তিনি জানালেন তাঁর দুরবস্থার কথা। নিজের অহমিকায় তাঁর সর্ব নাশ হয়েছে। তিনি আজ ভিখারী। মেয়ে জানাল, "বাবা তুমি লক্ষ্মীপুজো কর। তুমি সেদিন রেগে গিয়েছিলে আমার ওপর। আজ দেখলে তো মা লক্ষ্মীর কৃপাতেই আমার সব হয়েছে"

২ অক্টো, ২০১৭

ধান্যলক্ষ্মী বা ধনলক্ষ্মী কোজাগরী


এইসময়, ২রা অক্টোবর ২০১৭


দুর্গা পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই ধুমধাম করে আশ্বিনমাসের পূর্ণিমাতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর রীতি মূলত পূর্ববাংলার মানুষদের। তবে এখনো বর্ধমানের ঘরে ঘরে এই পুজো লক্ষ্য করা যায়। কারণ দেশভাগের পর বহু মানুষ বর্ধমান জেলাতেও এসে ঘর বেঁধেছিলেন।এঁরা কেউ মাটীর সরায় রঙীন লক্ষ্মী মূর্তি এঁকে অথবা কেউ মাটীর প্রতিমা এনে পুজো করেন ঘরেই। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রত ব‌ইতে আছে, দেবীর কাছে খেতের ভাল ফলনের আশায় মানুষ পুজো দেয়। বর্ধমান জেলাটি আমাদের রাজ্যের শস্যভান্ডার। তাই কোজাগরী পুজোর উপাচার হিসেবে ফলমিষ্টি ছাড়াও ধানজাত দ্রব্যাদি অর্থাত খ‌ই, চিঁড়ে, মুড়কি, মুড়ি ইত্যাদির মোয়া অবশ্য‌ই নিবেদিত হয়। তাই কোজগরী লক্ষ্মী পুজো বর্ধমনের এই লৌকিক কৃষি উত্সবও বটে। আকাশে পূর্ণচাঁদের রূপোলী জ্যোত্স্নায় ঘরে ঘরে সোনার ধানের গোলা। তাই সম্বচ্ছর যেন ধনের ফলন নিয়ে গৃহস্থ কে চিন্তা করতে না হয়, তাদের পরিবার যেন থাকে দুধেভাতে। আউস ধানে পরিপূর্ণ মাঠঘাট। লক্ষ্মী তাদের ধান্য তথা ধনদেবী।

মানুষের বিশ্বাস কোজাগরীর রাতে ঘুমোনো চলবেনা। তাহলেই লক্ষ্মী তাকে ছেড়ে চলে যাবে। মা লক্ষ্মীর হাতে ধানের শীষের গুচ্ছ। চৌকাঠে পিটুলিগোলার আলপনা, সারা বাড়ীময় লক্ষ্মীর পদচিহ্ন এই বিশ্বাসে...তিনি ঠিক আসবেন প্রত্যেক ব্রতীর ঘরে। পুরাণে বলে সমুদ্রমন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে পদ্মফুল হাতে লক্ষ্মীদেবী‌ই উঠে এসেছিলেন হাতে রাশিরাশি সোনাদানা, মণিমাণিক্য নিয়ে।
সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে এসেছিলেন বলে লক্ষ্মীর অপর নাম সমুদ্রকন্যা। কেউ আবার ডাকে ভূদেবী অর্থাত সারা পৃথিবীর, সমগ্র প্রকৃতির পালনকর্ত্রীরূপে।
শারদপূর্ণিমা তাঁর যে ভীষণ প্রিয়। আশ্বিনের এই পূর্ণিমার সময় বর্ষা ঋতু ফিরে যায় একবছরের মত। মৌসুমীবায়ু বিদায় নেয়। শস্যশ্যামলা মাটি থেকে সোনা রঙের নতুন আউস ধানের গন্ধ ওঠে। ভক্তের ঘরে পরব আর লক্ষ্মী তখন কোজাগরী। এটি তাঁর কৌমুদী-উত্সব। চাঁদের আলোয় তখন রাত পরিক্রমার শুরু। কোজাগরী হয়ে তিনি নজর রাখেন কে তাঁকে চায়। কে তাঁর পালন করে। কে তাঁকে বেঁধে রাখে আজীবন।
অবনীন্দ্রনাথের মতে কোজাগরী লক্ষ্মী হলেন আদিম অনার্য লক্ষ্মী। আর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর ব্রত কথাটিও সেই অনার্যা কন্যা কে ঘিরেই।
উজ্জয়িনীর এক ধার্মিক রাজা তাঁর প্রজাপালনের জন্য খুব সুখে কাল যাপন করতেন। একবার তিনি ঢেঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন যে তাঁর রাজ্যের হাটে কোনো অবিক্রিত জিনিষ যেন না পাড়ে থাকে। দিনের শেষে তিনি‌ই সেই জিনিষটি কিনে নেবেন দোকানীর কাছ থেকে। রটে গেল খবর। জানা গেল এক কামারের কাছে এক ভয়ানক চেহারার বিশ্রী নারীমূর্তি পড়ে রয়েছে। কামারকে জিগেস করতেই সে বলল, মহারাজ এটি নাকি অলক্ষ্মী মূর্তি তাই কেউ কিনতে চাইছেনা। মহারাজ বললেন, তিনি যখন কথা দিয়েছেন তখন সেটি কিনে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। নয়ত অধার্মিক রাজা হিসেবে তাঁকে রাজ্যের মানুষ চিনে যাবে। রাজা অগত্যা সেই লোহার মূর্তিটি কিনে এনে নিজের ঠাকুরবাড়িতে তাকে আশ্রয় দিলেন। মাঝরাতে নিজের রাজপুরীর মধ্যে মেয়েলি কান্নার কন্ঠস্বর শুনে রাজা দেখতে পেলেন এক ক্রন্দনরতা নারীমূর্তিকে।
রাজা তাকে জিগেস করলেন "তুমি কাঁদছো কেন মা?'
সেই নারী বললে," মহারাজ, আমি আপনার রাজলক্ষ্মী, আজ আপনার বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি'
রাজা বললেন, কেন মা? আমি কি অন্যায় করেছি? জানতে পারি?'
সেই নারীমূর্তি বললে," আপনি রাজবাড়িতে অলক্ষ্মীকে ঠাঁই দিয়েছেন। অতএব আমি আর এখানে থাকতে পারবনা।' এই বলে তিনি অন্তর্হিতা হলেন। আবার কিছুপরে রাজা দেখলেন আরেক সুন্দরী, সুশীলা নারী প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে হল ভাগ্যলক্ষ্মী। তার কিছুপরেই যশোলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী, সকলেই একে একে রাজপুরী থেকে বিদায় নিল। রাজার সেরাতে ঘুম এলনা। এবং সকলেরি বিদায় নেবার কারণ হল সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি যেটি রাজা কিনে এনেছিলেন।

এভাবেই তাঁর দিন কাটে।

তবুও শিল্পীর হাতে বানানো সেই অলক্ষ্মীমূর্তিটি ফেলে দিতে রাজার মন চায়না। শিল্পী তো আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরী করেছে তাকে।

শিল্পীর শিল্পীসত্তায় আঘাত করতে মন চায়না রাজার। তাই প্রাসাদ থেকে একটু দূরেই সরিয়ে রাখেন তাঁকে কিন্তু ফেলতে পারেন না। ক্রমে তিনি দরিদ্র হতে থাকলেন। ধন, মান, যশ, সাফল্য ভাগ্য তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। একদিন রাজা দেখতে পেলেন ধর্মরাজ তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রাজা তখন নিরূপায় হয়ে ভাবলেন এটা মেনে নেওয়া যায়না। ধর্ম তাঁকে ত্যাগ করলে তিনিতো অধার্মিক রাজা রূপে পরিগণিত হবেন। রাজা তখন ধর্মকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন।

ধর্মরাজা রাজার যুক্তি শুনে খুব খুশি হলেন। ধর্মরজের কথায় আশ্বিনমাসের পূর্ণিমায় রাণীকে কোজাগরী ব্রত পালন করতে বললেন । রাণী সারারাত জেগে বসে র‌ইলেন। আর নিষ্ঠাভরে লক্ষ্মীর পুজো করে রাজা সব ফিরে পেলেন। আবার আগের মত তাঁর রাজবাড়ি ভরে উঠল জাঁকজমকে, ধনসম্পত্তিতে।

আর ঠিক সেখানেই যেন মানব সংসারে ভাল এবং মন্দ মেয়ের টানাপোড়েনের গল্পটি উঠে আসে। লক্ষ্মী এবং অলক্ষ্মীর পুজোর তাই বুঝি চল। কারোকে ফেল না। সব মেয়েই পূজ্য। দোষে গুণে গড়া মানুষ। লক্ষ্মীকে বরণ করলেও অলক্ষ্মীকেও ফেলে দেওয়া চলবেনা...ইহজগতের মানুষের জন্য সেই শিক্ষামূলক বার্তা আজো পাই এই পুজোর থেকে। লক্ষ্মী সুরূপা আর অলক্ষ্মী কুরূপা। লক্ষ্মী শান্ত আর অলক্ষ্মী চঞ্চলা। তারা তো আমাদের ঘরের আর পাঁচটা মেয়েরি মতন। তাই অলক্ষ্মীর পুজো করে নিয়েই লক্ষ্মী পুজোর রীতি।

কুমারীপুজো এবং



এইসময় ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৭
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার মন্দির তিনশো বছরেরও পুরোনো এক তীর্থস্থান। এটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির। এখানে দেবী মূর্তি কষ্ঠি পাথরের অষ্টাদশভুজা সিংহবাহিনী, মহিষমর্দিনী, মহালক্ষী রূপিণী । মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে এখানে শারদোতসবের সূচনা হয়। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদে কৃষ্ণসায়র থেকে রূপোর ঘটে জল ভরে শোভাযাত্রা বের হয় মন্দিরের উদ্দেশ্যে।ঘোড়ায় টানা রথে বাদ্যযন্ত্র, ঢাক সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় অংশ নেন শহরবাসীরা। শহরের রাজপথের দুই ধারে মানুষের ভিড় উপচে পড়ে । অবশেষে শোভাযাত্রা এসে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে শেষ হয় এবং ঘট প্রতিষ্ঠা হয়।

সারাবছর এখানে দেবীর নিত্যপুজো ছাড়াও মহাষষ্ঠীতে বিল্ববৃক্ষে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস, মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পূজা, মহা অষ্টমীতে কুষ্মান্ড বলিদান, আরতি ও সন্ধিপূজা হয় । মহানবমীতে হয় কুমারী পুজো, হোমযজ্ঞ। মহা দশমীতে বিহিত পুজোর পর অপারাজিতা পূজা ও ঘট বিসর্জন হয় ।
বর্ধমানের কোথাও আবার পালকি চেপে কুমারীকে ঘোরানো হয় সারা শহর। সেখানেও ঐতিহ্য মেনে নবমীর দিন কুমারী পুজো হয়।
বর্ধমানের সাবেকী বাড়ির পুজোগুলি খুব প্রাচীন। কোনোটি বা পাঁচশো বছরেরো পুরোনো। বুদবুদের মানকরের বড় কবিরাজ বাড়ির পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের। বর্ধমান রাজার কাছে জমিদারি পাওয়ার পরে এখানে বাস শুরু করেন পূর্বপুরুষেরা। তখন থেকেই এই পুজো চলছে।
কাঁকসার ত্রিলোকচন্দ্রপুরের মণ্ডলবাড়ির পুজো প্রায় তিনশো বছরের পুরনো। নবমীর দিন গ্রামের বাইরে তিলুইচণ্ডী তলায় পুজো হয়। এই তিলুইচণ্ডী নাকি লক্ষ্মণ সেনের আমলের। এখানে নবমীর দিন কুমারীপুজো হয় দেখবার মত। এছাড়া আসানসোল রামকৃষ্ণ মিশন ও কাটোয়ার রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে ধুম করে হয় কুমারী পুজো।

কুমারী কন্যার শুদ্ধ আত্মাতেই নাকি ভগবতী দেবী দুর্গার প্রকাশ সবচেয়ে বেশী। তন্ত্রসার মতে ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত অরজঃস্বলা বালিকারা কুমারী পূজার উপযুক্ত । যে কোনো জাতের কন্যাকেই মাতৃজ্ঞানে দুর্গাপুজোর অষ্টমী কিম্বা নবমী তিথিতে পুজো করা হয়। বেদ পুরাণের যুগে মুনি ঋষিরা প্রকৃতিকে কুমারী জ্ঞানে পুজো করতেন।
স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে বেলুড়মঠে দুর্গাষ্টমীতে পুনরায় কুমারীপুজো চালু করেছিলেন। ভারতবর্ষের দুটি স্থানে, মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে এবং কন্যাকুমারীতে দেবীশক্তিকে কুমারী জ্ঞানে পুজো করা হয়।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত যে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া অনবরত চলছে সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপিত করে দেবীরূপে তার সাধনাই হল কুমারী পূজা । এ সাধনপদ্ধতিতে সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারীমূর্তির রূপ ধারণ করে । তার নিকট নারী ভোগ্যা নয়, পূজ্যা।দুর্গাপুজো কে কলিকালের অশ্বমেধ যজ্ঞ বলা হয়। আর রামায়ণ্-মহাভারতে আমরা যত যজ্ঞের কথা শুনি কুমারীপুজো হল দুর্গাপুজোর মধ্যে আরো একটি বিশেষ যজ্ঞ।
বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তখন শরৎকাল, দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। তাই, ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি তপ্তকাঞ্চন বর্ণা বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা। তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধারন করলেন।

মনু সংহিতা অনুসারে
যত্র নার্যন্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ
যত্রৈতান্তু ন পূজ্যতে সর্বান্তুত্রাফলাঃ ক্রিয়া’।।

এর অর্থ হল, যেখানে নারীরা পূজিত হন সেখানে দেবতারা প্রসন্ন। যেখানে নারীরা সম্মান পান না, সেখানে সব কাজই নিষ্ফল। আর তাই তো নারীর সম্মান প্রদানে ব্রতী হয়ে স্বামীজি এই কুমারী পুজো চালু করেন।

আবার মহাদেব যোগিনী শাস্ত্রে বলেছেন,
কুমারী পূজনং ফলং বক্তু নার্হামি সুন্দরী।
জিহ্বাকোটি সহস্রৈস্তু বস্তুকোটি শতৈরপি’।

এর অর্থ শতকোটি জিহ্বায় কুমারী পূজার ফল ব্যক্ত করতে পারব না। কুমারীরা শুদ্ধতার প্রতীক হওয়ায় মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনার জন্য কুমারী কন্যাকে নির্বাচন করা হয়।

তবে অরজ:স্বলা কুমারীদেরই কেন পুজো করা হবে সেই নিয়ে আধুনিক ভাবনাচিন্তায় দ্বিমত। কন্যা ঋতুমতী হলেই কি অশুদ্ধ হয়ে যায় ? আর অরজস্বঃলা কন্যাই কি অপাপবিদ্ধ? তাহলে অম্বুবাচীর দিনে কামাখ্যা মন্দিরে এত ভীড় কিসের হয়?

যোগিনীতন্ত্রে বলে ব্রহ্মার শাপে বিষ্ণুর দেহে পাপ সঞ্চার হলে সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে হিমাচলে মহাকালীর তপস্যা শুরু করেন। বিষ্ণুর তপস্যায় মহাকালী খুশি হন। দেবীর সন্তোষ মাত্রেই বিষ্ণুর হৃদ পদ্ম হতে সহসা ‘কোলা’ নামক মহাসুরের আবির্ভাব হয়। সেই কোলাসুর ইন্দ্রাদি দেবগণকে পরাজিত করে অখিল ভূমণ্ডল, বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ এবং ব্রহ্মার কমলাসন প্রভৃতি দখল করে নেয়। তখন পরাজিত বিষ্ণু ও দেবগণ ‘রক্ষ’ ‘রক্ষ’ বাক্যে ভক্তিবিনম্রচিত্তে দেবীর স্তব শুরু করেন। দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন।সন্তুষ্টা দেবী বলেন, ‘হে বিষ্ণু! আমি কুমারীরূপে কোলানগরী গমন করে কোলাসুরকে সবান্ধবে হত্যা করব।’ দেবী কথামতো কাজ করেন। সেই থেকে দেব-গন্ধর্ব, কিন্নর-কিন্নরী, দেবপত্নীগণ সকলে সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে কুমারীর অর্চনা করে আসছেন।
আজকের সমাজের নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কন্যাভ্রূণ হত্যা, ধর্ষণ, ইভটিজিং ইত্যাদির মত নৃশংস ঘটনায় মনে হয় প্রতিদিন যদি এভাবেই মন্দিরে মন্দিরে এক একজন জ্যান্ত কুমারীকে পুজো করা হয় তবে বুঝি কিছুটা হলেও এই কদর্য এবং বিকৃত রুচির কাজগুলির হাত থেকে মেয়েরা মুক্তি পেত। যে কুমারী কন্যাশ্রীদের দেবীজ্ঞানে পুজো করা হচ্ছে ধর্ম ভীরু সেইসব পুরুষরা পথেঘাটে তাদের স্পর্শ করতে অন্ততঃ একবার ভাববে।

১ অক্টো, ২০১৭

শারদীয়া অক্ষর প্রসব ১৪২৪

শারদসাহিত্যে ২০১৭

আবাপ ডিজিটাল, আনন্দ উতসব : লাইট-ক্যামেরা-একশন (রম্য)http://www.anandabazar.com/events/puja-parikrama/special-write-up-on-durga-puja-dgtl-1.679653?ref=puja-parikrama-new-stry
ভ্রমণ (আলাস্কার তিমি )
নিবোধত (কাশ্মীর মন্দির সোপান তলে)
পুরুলিয়া দর্পণ (বড়গল্প জন্মান্তর)
উত্তরবঙ্গসংবাদ শারদঅর্ঘ্য (ছোটগল্প পূর্বপুরুষ)
দৈনিক যুগশঙ্খ ( ছোটগল্প পিতৃত্ব)
একান্তর ( ছোটগল্প তিন কন্যা)
সপ্তপর্ণ ( ছোটগল্প বদলা)
মালিনী ( ছোটগল্প নিয়মভঙ্গ)
ম‌উল ( ছোটগল্প ডিলিট)
শৈলজা ( ভ্রমণ অরুণাচল প্রদেশ)
যুগসাগ্নিক (রম্য রচনা)
তিস্তা নন্দিনী (অণুগল্প লাবণ্যময়ীর স্বর্গ লাভ)
স্মরণিকা ( প্রান্তিক )

অনুভব (রম্যরচনা, শিব দুর্গার আধার কার্ড )
ইচ্ছামতী (ভ্রমণ ভিক্টোরিয়া, কানাডা)
ম্যাজিক ল্যাম্প (সহজে দুর্গা কথা)
কলকাতা ২৪x৭ (পুরাণ কথা)
শব্দের মিছিল (পুজোর স্মৃতি, পত্রসাহিত্য)
ঐহিক (ছোটগল্প দেবী)