৭ ডিসে, ২০১৩

ডালাস ডায়েরী : পর্ব ১

-->


সালটা ছিল ১৯৮৯ । মার্চ মাস ।
সুদূর ডালাসে পাড়ি দেওয়া হল । আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমের টেক্সাস স্টেটে অবস্থিত ডালাস । বহু প্রতীক্ষিত বায়ুপথে ভ্রমণ..
বিমানবন্দর থেকে একে একে চোখের বাইরে চলে গেল মা, বাবা আর ভাইয়ের ছলছল চোখ ।
জীবনে প্রথম বায়ুপথে হারিয়ে যাওয়া । দমদম থেকে দিল্লী । সেখানে বন্ধুবান্ধবের সাথে গেটটুগেদার । মধ্যরাতে দিল্লী এয়ারপোর্টে গিয়ে আবার উড়ানে জার্মানি । সেখান থেকে আরো দূরে আটল্যান্টা ।
এয়ারপোর্টে ফ্রেস হয়ে বিধ্বস্ত জামাকাপড় বদল করে ছোট্ট এক ফ্লাইটে আটল্যান্টা থেকে সোজা ডালাস পৌঁছালাম বিকেলবেলায় । ইউটিডালাসের ম্যনেজমেন্ট স্কুলের পিএইচডি স্টুডেন্টরা সব এসেছে.. একপাল অপরিচিত মুখ সাদরে অভ্যর্থনা করল ডালাস এয়ারপোর্টে । ভারতীয় স্টুডেন্টদের একাধিক গরীব রথ বরণ করে ঘরে তুলছে আমাকে ... সে এক অভিনব অভিজ্ঞতা ।
অবশেষে পৌঁছলাম ডালাস ক্লিফব্রুক কন্ডোমিনিয়ামের এপার্টমেন্টে । ঘুমে তখন দুচোখ বুঁজে আসছে । অথচ বন্ধুদের হল্লা আর হুল্লোড়ের খামতি নেই । গরম ভাত থেকে শুরু করে পঞ্চব্যঞ্জন রেঁধে রেখেছে বাঙালী বন্ধু পত্নী । আমি তখন জেটল্যাগ সর্বস্ব । তবুও হাসিমুখে আলাপ পর্ব সেরে চলতে হল সকলের সাথে ।


আমেরিকার মাটিতে পা দিয়েই মনে হল ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য এই দেশ, কত সুন্দর সৌজন্যবোধ মানুষের, সুন্দরের সত্য পূজারী তারা,
তারা কত রুচিশীল, সত্যিই তারা গড়তে জানে নিজেদের আর ভালবাসে তাদের দেশকে, রক্ষা করতে পারে ভগবানের সৃষ্টিকে, আর নিজেদের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করে, উজাড় করে দিতে পারে বিশ্বের দরবারে;
তুমি বলবে কৃত্রিমতা এ শতাব্দীর অভিশাপ কৃত্রিমতা যদি উন্নতি ঘটায় তাহলে বাধা কোথায়? বিজ্ঞান যদি কাজের বন্ধু হয় তাহলে আপত্তি কিসে ? সৃষ্টিসুখের উল্লাসে আমরা বাঁচিনা একটু সহজ করে, সাবলীল ভাবে!
আসলে যে দেশের নাগরিকের চিন্তাধারা সুস্থ, যারা সভ্যতায় পরিপুষ্ট, বিধাতাপুরুষ বোধ হয় দুহাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করেন..
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যে, প্রাকৃতিক জলবায়ুর মিষ্টতায় সে দেশের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে রোজ আমরা প্রণাম জানাতাম নিজের দেশমাতৃকাকে ।

এর মধ্যে দেশের মানুষগুলোর জন্য মন কেমন করলেই চিঠি লিখছি ফাঁকে ফাঁকে । তবে বেড়ানোর আনন্দে দখিনের খোলা জানলায় সব ওলটপালট । ফাগুণের ওমে শীত লুকোল শুকনোপাতায় । পলাশের হাসিতে শীত-ফুলেরা মুখ ঢেকেছে চুপিসাড়ে । শিমূল, অশোকের হট্টমেলায় ডালেডালে কাঁচা সবুজের ছোঁয়া । মাতাল বসন্তে রঙীন প্রকৃতি ।

ভোরবেলা কিচেনের ব্লাইন্ডস সরিয়ে ক্লিফব্রুক কন্ডোমিনিয়ামসের পার্কিং লটে তাকিয়ে থাকা সার সার গাড়ির ছাদে দুধসাদা বরফের চাদর ..তার সাথে সূর্যের আলোর মাখামাখি !
দুপুরবেলা বান্ধবীদের সাথে শপিংমলের হাতেখড়ি, একরাশ বিদেশী পারফিউমের গন্ধ নিয়ে ফিরে আসা, বিকেল হলেই নতুন জলখাবার তৈরী আর প্রতীক্ষা...
তারপর রোজ চোখ রেখেছি অপার বিস্ময়ে, কখনো ডালাস ডোমের মাথায় গরম কফি হাতে, টেক্সাস ও ওকলাহোমার বর্ডারে অসাধারণ টেক্সোমা লেকের জলের ধারে । কখনো টাইলার রোজ গার্ডেনের গোলক ধাঁধায়, কখনো নেচে উঠেছে প্রাণ টার্নার ঝোরার ধারে, গুহার ভেতর .. গেয়ে উঠেছে মুক্তির আনন্দে, নেচে উঠেছে ঝোরার জলের ছন্দে... 

এল বি জে এক্সপ্রেস ওয়ের ওপর দিয়ে লং ড্রাইভে ছুটেছি কত কত বার আমার স্টুডেন্ট স্বামীর সেকেন্ডহ্যান্ড দুধসাদা মাজদা ৬২৬ গাড়িতে, হৈ হৈ করে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে উইকএন্ডট্রিপ !হঠাত প্ল্যান করেই "চলো লেটস গো" বলে বেরিয়ে পড়া আর কি !
প্রতি সপ্তাহান্তে এমন ছোটখাটো বেড়ানোর সাথে ছিল ভারতীয় বন্ধুমহলের কারোর একজনের বাড়িতে আয়োজিত পটলাক পার্টি । দারুণ আইডিয়া । বিদেশে এসে শিখেছিলাম । যার বাড়িতে পার্টি হবে সে ভাত/রুটি বানানোর দায়িত্বে থাকবে আর অন্যেরা যে যার ইচ্ছেমত ডিশ বানিয়ে আনবে । কেউ আবার পেপারপ্লেট, চামচ আর কোল্ডড্রিংক্সয়ের ভার নিত । দারুণ মজা হত এমন পার্টিতে । একঘেয়ে মেনু নয় কিন্তু পট লাক (potluck) অর্থাত কোন্‌ পটেতে কি আছে সেটা খাবার সময় খুলে দেখবার । আর সবচেয়ে বড় কথা হল যিনি পার্টির জন্য বাড়িতে সকলকে ডেকেছেন তাঁর ওপর অযথা চাপও পড়লনা ।

ডালাসে যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অবস্থিত তার নাম রিচার্ডসন । যেন শহুরে গ্রামের মাদকতা সেই অঞ্চলে 

University of Texas @ Dallas
রথযাত্রা দেখেছিলাম ডালাসে । ডালাস থেকে অনেকটা দূরে ইস্কনের কালাচাঁদজীর মন্দিরে রথের রশি টেনে কিছুটা স্বদেশের জন্য ব্যাকুলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম ।লুচি আর পাঁচমেশালী একটি তরকারী সহযোগে ভোগপ্রসাদও পেয়েছিলাম।

এরপর মনে পড়ে ৪ঠা জুলাইয়ের সেই লঙ উইকএন্ডের কথা । আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস । ডালাসের সাবার্বে একটি খোলা মাঠের ওপর বিকেল থেকে জমায়েত হল কয়েক হাজার মানুষ । তারপর সন্ধ্যের ঝুলে একে একে আকাশে ফুটে উঠতে লাগল রঙ বেরঙের ফায়ারওয়ার্কস । আতস বাজি, আলোর বাজি এত সুন্দর ভাবে পরিবেশন আর কোথাও দেখিনি । ব্যাবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি নেই । সুষ্ঠুভাবে প্রায় তিন চার ঘন্টা বাজি পোড়ানো হল সেই মাঠের ওপর । কিন্তু কোনো বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ল না । অথচ বৈচিত্র্যময়তায় ভরা সেই দীপাবলীর রাত যেন আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠল । ফায়ারওয়ারক্স দেখে সে রাতের প্রোগ্রাম ছিল দল বেঁধে সকলে মিলে পিত্জা হাটে পিত্জা খেতে যাওয়া । তখন ভারতবর্ষে প্রবেশ করেনি পিত্জা হাট । তাই আমি অপার বিস্ময়ে গোগ্রাসে গিলেছিলাম সেই লোভনীয় ইটালিয়ান খাদ্য । তবে ভারতবর্ষের পিত্জা হাট কিন্তু চিজ ছড়ানোর ব্যাপারে আমেরিকার পিত্জা হাটের মত এখনো অত জেনারাস হতে পারেনি সেটাই বড় দুঃখ আমার । ঠাটবাট সব ঠিকই র‌ইল কিন্তু কোয়ালিটি একটু নিকৃষ্ট হয়ে গেল ।

সে ফাগুনের এক ভোরে আমরা প্ল্যান করে বায়ুপথে পাড়ি দিলাম ডালাস থেকে নিউইয়র্ক । আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নামে জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে অবতরণ হল । কি ঝকঝকে এয়ারপোর্ট আর কেমন সুন্দর সব ব্যবস্থা । এখানে সব কিছুর মেন্টেন্যান্স দেখলে অপার মুগ্ধতায় তাকিয়ে থাকতে হয় । এমনটিই থাকে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ।
নিউইয়র্কে এক বন্ধুর বাড়িতে কিছুদিনের জন্য আস্তানা বেঁধে সারাটাদিনের জন্য যাওয়া হল ওয়াশিংটন ডিসি ।
একটা গাড়ি নিয়ে রাজধানী শহর ওয়াশিংটন ডিসির রাজপথে.. অর্থাত যা কিনা বর্তমান রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার অফিস । ১৯৮৯ এ সেই সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন জর্জ বুশ । হোয়াইট হাউস বা প্রেসিডেন্টের অফিসকে এখানে ক্যাপিটল বলে ( capitol)

ডিসির রাজপথ হোয়াইট হাউসের রাজকীয় শুভ্রতায় কি অসাধারণ শন্তিময়তা, বাইরের সবুজ লনে কি সুন্দর সজীবতা সাথে গেরুয়া মরশুমি ফুলের একরাশ উচ্ছ্বাস দেখে বিহ্বল হয়ে গেলাম ।
এই তিন রঙ মনে করিয়ে দিল আমার ধন্যধান্যপুষ্পে ভরা নিজের দেশের কথা । মনে মনে প্রনাম জানালাম ত্রিরঙা জাতীয় পতাকাকে।
ক্যাপিটল হিলের কাছে লিংকন মেমোরিয়াল চির শুভ্রতায় জ্বাজ্জল্যমান এব্রাহাম লিংকনের স্মৃতি নিয়ে । সেখান থেকে ন্যাশানাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে । সেই বহু বিতর্কিত এবং অভিশপ্ত হোপ ডায়মন্ড দেখে অবাক হতে হয় । ঘন নীল হীরে । কোনোদিনো দেখিনি এর আগে । 

ন্যাশানাল গ্যালারি অফ আর্ট থেকে এয়ার এন্ড স্পেস মিউজিয়ামে ঝুলন্ত ছোট বড় কত কত উড়োজাহাজের মডেল, আর তার বিবর্তন ।
তার মধ্যে থেকেই উঠে এল স্মৃতির মণিকোঠা থেকে রাইট ব্রাদার্সের হাতে তৈরী প্রথম প্লেনের মডেল । ক্লাস নাইনের ফিসিক্স ব‌ইয়ের সেই ছবি আজ ত্রিমাত্রিক মডেল হয়ে ঝুলছে চোখের সামনে..অরিভিল এবং উইলবার রাইট এই দুই ভাই সর্বপ্রথম আকাশের বুকে হাওয়া কাটিয়ে ত্রিমাত্রিক এরোপ্লেনের মডেল তৈরী করেছিলেন । মনে মনে ভাবলাম সার্থক হয়েছে ওয়াশিংটন আসা ।

সাময়িক বাকরূদ্ধতা !
ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশানাল গ্যালারী অফ আর্ট এ এসে পৌঁছালাম । বহু প্রতিক্ষীত ভাবনালোকের রূপসাগর ..
ডুব দিলাম সেই রূপসাগরে..
ইম্প্রেশানিস্ট, স্যুরিয়ালিস্টিক সবরকমের পেন্টিংয়ের সাথে হাতেখড়ি হল ! বিদেশের নামী সব শিল্পীর দামী সব তৈলচিত্র ।
Matisse, Rennoir, Claude Monet, Van Gogh, Paul Gauginর গল্পে মাত হয়ে গেছিল আর্ট গ্যালারির প্রতিটি করিডোর !
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হোল Da Vinciর আর এক বিরল সৃষ্টি দেখে যা মোনালিসার থেকে কোন অংশে কম নয় ।মোনালিসার হাসি নেই তাতে কিন্তু সেই ভয় মিশ্রিত গাম্ভীর্য্য..
অনবদ্য লাগল সেই আর্ট গ্যালারী পরিদর্শন । আরো চোখ জুড়িয়ে গেল ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখে ।
বিদায়ের সময় মনে মনে বলে উঠলাম, বিদায় ওয়াশিংটন!
ডিসি তুমি দিগবসনা, সবুজ আঁচল শুভ্ররাজবেশে ছড়িয়ে দিয়েছো নীলের দিগন্তে , সৌন্দর্য তোমার অলংকার, রাজকীয়তা তোমার মজ্জাগত, নিয়ম শৃঙ্খলা তোমার সহজাত,
বেঁচে থাকো ডিসি তোমার অমলিন স্বর্গীয় রাজকীয়তা নিয়ে, আর সর্বকালের অহংকার নিয়ে । রাজধানী হবার যোগ্যতা তোমার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় । 

ছোটদের ই-পত্রিকা ইচ্ছামতীতে প্রকাশিত   


২৪ অক্টো, ২০১৩

বিরিয়ানি, মুক্তো এবং পুজো


কোলকাতার ভীড়ভাট্টা ছেড়ে হায়দ্রাবাদে পুজোটা কাটাবো এবার এই ঠিক ছিল  । ছেলের ফাইনাল ইয়ারের ইন্টার্নশিপ চলছে এখানে । সে ছুটি পাবেনা তাই আমাদের একসাথে পুজোর ছুটি কাটাতে যাওয়া । সকাল
থেকে হাপিত্যেশ করে বসে থাকা তার জন্যে । কখন সন্ধ্যে হবে আর তার সাথে বেরুনো হবে । ভাবতে লাগলাম ছোট্টটির কথা । নাছোড় সেই বীরের কথা ।

তখন আমরা জামশেদপুরের বাসিন্দা । 
ওখানকার পুজোতে সেবার নবমীর দিন আগমনী গান গাইতে উঠেছি পুজোমঞ্চে, মাদুর্গার পাশে । নাম ঘোষণার পর স্টেজে উঠতেই  হৈ হৈ ।
আমার নাছোড় পুত্রের বাবা তাকে দর্শকাসনে বসানোর চেষ্টা করছেন আর সে মঞ্চে উঠবেই..
চারবছরের পুত্রটি ধীরে পায়ে এসে আমার পাশে টপ্‌ করে বসে পড়ল । আমি হতবাক!
অনুষ্ঠানের কতৃপক্ষদের সে বলল  মায়ের পাশে বসে রা'টিও কাটবেনা, তাকে বসতে অনুমতি দেওয়া হল ।
আমার  গান অবধি গম্ভীর হয়ে, হাতে ক্যাপবন্দুক নিয়ে  ঘটের মতন বসে র‌ইল চুপটি করে
মঞ্চ থেকে নেমে আসার সময় তাকে শুধালাম, এটা তুমি কি করলে? বাবার কাছে বসলেই পারতে..
সে বলল-  দুষ্টু অসুর যদি তোমার কোনো ক্ষতি করে ! বীরপুরুষ আবৃত্তির সময় তুমিই তো বলেছিলে তোমার পাশে এমনি করে থাকতে!
আমি মনে মনে আওড়ে নিলাম "ভাগ্যি খোকা ছিল মায়ের সাথে" !
....

দিন কয়েকের মত শিকেয় তোলা র‌ইল মহানাগরিক কোলাহল । কিন্তু তেলেঙ্গানা পৃথকীকরণের জেরে আর ধেয়ে আসা ঘূর্ণাবর্তের আশঙ্কায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারলাম না ।   একটু মনখারাপও হোল তবুও  ভালো লাগল ছুটির আনন্দে ।  ছুটি যেমনই হোক  আর পুজোর ছুটি  সব ছুটির থেকে অন্যরকমের । তবে খুব মিস করছিলাম  ঢাকের শব্দ ।  এবছর আশ্বিনের শারদপ্রাতে অকাল শ্রাবণের চোখরাঙানি এ শহরকেও তাড়া করে চলেছে । বৃষ্টি শরতের মুখে একরাশ কালি ঢেলে দিয়েছে ।  মনখারাপের বাঁধ ভেঙে কবিতায় পেয়ে বসল আমায় । 


দুর্গা তোমার দুচোখ জুড়ে বৃষ্টি কেন বলো ?
দুর্গা তোমার দৃষ্টি সুদূরে আঁধারে কিম্বা আলো ।
দুর্গা তোমার ঘামতেল আজ বিষণ্ণতার ছোঁয়া
ধুলোমুঠি শাড়ি মলিন আঁচল তবুও শিউলি ধোয়া ।
...

ছোটবেলায় ষষ্ঠীর ভোরে  মা'কে দেখতাম স্নান সেরে এসে প্রত্যেক দরজার মাথায় তেল-হলুদ-সিঁদুরের ফোঁটা দিতে । মা দুর্গাষষ্ঠীর ব্রতকথা পড়ে হাতে প্রসাদ দিতেন ।  সুদূরে বসে সেই স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই । সেই শুভসূচনার সাথে সাথে মায়ের আগমনের শুরু হয়ে যেত  । হোটেলের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চাদের স্কুল যাওয়ার তাড়া । অফিসকাছারি যাবার কর্মব্যস্ততা ।  কোলকাতার সাথে কোনো তুলনা নেই এ শহরের পুজোর । হোটেলের ব্রেকফাস্ট ব্যুফেতে গিয়ে নিরামিষ ফলাহার সেরে নিলাম ষষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে ।
রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজো
 হোটেলের টেলিভিশনে ডিটিএইচ পরিষেবার মাধ্যমে আকাশবাণী কলকাতা পেয়ে দিব্যি খুশি হলাম । একে একে পুরোণোদিনের গান আর কলকাতার পুজোর আপডেট পেতে থাকলাম । প্যান্ডেল হপিং না করেই সেলেবদের খুচরো গসিপ আর বাংলা গান এর চেয়ে ভালো ছুটি কাটানো কিসে হতে পারে ? মাঝেমধ্যে ডিডিবাংলায় পুজো পরিক্রমা দেখে দুধের সাধ ঘোলে মেটালাম । আমার মনের ছুটির ঘন্টা আর ঢাকের বাদ্যি ততক্ষণে কোলকাতাকে এনে দিয়েছে চোখের সামনে । মায়ের আমন্ত্রণ, অধিবাস, বোধন চলছে ।
 সপ্তমীর শারদপ্রাতের সূচনায়  মনখারাপের মেঘ জমেছে । কলাবৌ স্নানের কোনো লক্ষণ নেই এ শহরে । হয়ত বা হচ্ছে তার প্রস্তুতি দূরে কোথাও , বহু দূরে । মনে পড়তে লাগল ঢাক, শাঁখের আওয়াজ.. ন'টি উদ্ভিদ চারা দিয়ে তৈরী কলা-বৌকে স্নান করিয়ে,  লাল পাড় সাদা শাড়ী পরিয়ে   মা দুর্গারূপে পুজো করা ।   
গোলকুন্ডা ফোর্ট

আমারা রয়েছি হায়দ্রাবাদের হাইটেক সিটির কাছে কোন্ডাপুরে । সেখান থেকে সপ্তমীর দিন গেলাম হুসেন সাগর নামে এক বিশাল লেকে । কি পরিচ্ছন্ন! 
 
হুসেন সাগরের বুদ্ধমূর্তি 

আর সেখানে ঐ বিশাল জলাশয়ের মধ্যে একটি অভিনব বুদ্ধমূর্তি দেখতে যাওয়া হল লঞ্চে করে । তারপর গোলকুন্ডা ফোর্ট ও চারমিনার ।
চারমিনার
 সপ্তমীর দিন আমাদের বাড়িতে খুব রান্নাবান্না হত ।   বিশেষ আমিষ পদ.. মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, আরও কত কি! সেই  স্মৃতি নিয়ে পৌঁছে গেলাম   হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে পুরোণো রেস্তোঁরা প্যারাডাইসে । বিরিয়ানি   রায়তা ও কাবাব দিয়ে সপ্তমীর ভোজ সারা হল । সন্ধ্যের ঝুলে ডোমালগুডায় রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজো দেখতে গেলাম । সন্ধ্যারতির পর পোহা প্রসাদ পেলাম । 
হায়দ্রাবাদ বাঙালী এস্যোসিয়েশানের দুর্গাপুজো
 এবার পাশেই ইন্দিরা পার্কের উল্টোদিকে  হায়দ্রাবাদ বাঙালী এস্যোসিয়েশানের ৭২বছরের পুরোণো পুজো দেখতে গেলাম ।  ওখানকার পুজোতে গিয়ে পুরোণো বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা একটা বিরাট প্রাপ্তি ।   বাঙালী যেখানেই থাকুক ঠিক চেষ্টা করে যায় তার সাহিত্য-কলা-কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে ।বিরিয়ানি আর মুক্তার শহর  হায়দ্রাবাদও তার ব্যাতিক্রম নয় ।  সেখানেও এক আকাশের নীচে সব বাঙালী মানুষ  গান, নাচ, নাটকের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোকে পালন করছে । তবে এদের কোনো পুজোতেই কোলকাতার মত অনিয়ন্ত্রিত ভীড় নেই বা অহেতুক সেলিব্রিটি প্রদর্শনের হিড়িক নেই । আর নেই থিম পুজোর জাঁকজমক ।  কোলকাতার এক একটি বারোয়ারি পুজো এখন ‘স্পনসর্ড’ পুজো— কোনও এক কোম্পানির সম্পত্তি, কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের কিনে নিয়েছে ওই পাঁচটি দিনের জন্য। প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে মা আসেন একটা প্যাকেজে! সেরা প্যান্ডেল, সেরা প্রতিমা, সেরা দর্শক শ্রীমতি, সেরা আরও কত কিছুর ভিড়ে কিন্তু আসল পুজো একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সরে যাচ্ছে পুজোর মূল, অনাদি আবেদন। শুধু বেঁচে র‌ইল স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মহাষ্টমীতে সেরা পোষাকটি পরে অঞ্জলি দেওয়া । সারা বছরের মত মায়ের কাছে বাঙালীর যত কিছু চাওয়া  । "রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি"... ইত্যাদি আরো কত কিছু । 

মহাষ্টমীর ভোরে স্নান সেরে নিয়ে  হায়দ্রাবাদেও নতুন শাড়ি । তারপর আবার রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজোয় সামিল হলাম ।ঠিক বেলুড়মঠের মত একচালার হলুদ মূর্তি মা সহ তাঁর পরিবারের । মূল মন্দিরে  ঠাকুর রামকৃষ্ণ  টুকটুকে লাল দক্ষিণি পট্টবস্ত্রে, মা সারদা টুকটুকে লাল জরিপাড় মাহেশ্বরী শাড়িতে ও স্বামী বিবেকানন্দ গেরুয়া রঙের কাঞ্জিভরম ধুতিতে ।    চন্ডীপাঠের সকাল । মন্ত্রমুগ্ধ আবহ । স্তোত্রপাঠের পর  আরতি, পুষ্পাঞ্জলি ।  সবকিছুই বেলুড়মঠের রীতি অনুসারে । কিন্তু ভীড় কম বলে আরো যেন কাছে পাওয়া সেই দুর্গাপুজোকে । কোলকাতার পুজোতে যেন অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি বড্ড বেশি কৃত্রিম মনে হয় আজকাল । এরপর হোমযজ্ঞ । তারপর প্রসাদ বিতরণ । অভিনব ভোগপ্রসাদ । মাঠের ওপর পেতলের বিশাল হাঁড়িতে ঘিভাত বসেছে কাঠের জালে । আর সেই ঘিভাতের সাথে তেলুগু সবজী, চাটনী, পাঁপড়  ও মিষ্টি ডালপুরী । পরিতৃপ্তিতে ভরপুর মন ।  হোটেলে ফিরে এসে ডিডিবাংলায় সরাসরি বেলুড়মঠের সন্ধিপুজো দেখতে পেয়ে গেলাম ।
মনখারাপ হল তীব্র গতিতে ছুটে আসা ঘূর্ণিঝড়  পিলিন এর কথা শুনে । অন্ধ্র ও উড়িষ্যার উপকূলে ধেয়ে আসছে সেই ঘূর্ণাবর্ত । সে রাতে  অজানা আশঙ্কায় ঘুম এলনা দুচোখে ।
 বৃষ্টি কোলকাতাকে পুজোতে মুক্তি দেয়নি  কিন্তু শরতের আকাশের অনেকটা নীল দাক্ষিণাত্য মালভূমির এই শহরে  ধরা দিল । পিলিন অষ্টমীর রাতে ঊড়িষ্যার উপকূলে আছাড়ে পড়েছে এর‌ই মধ্যে । ততক্ষণে পিলিন শান্ত হয়েছে   অন্ধ্রে  । তবে ঊড়িষ্যায় বিপুল ক্ষতি করেছে ।  
সালার জাং মিউজিয়ামের বিখ্যাত ভেলড রেবেকা 
 নবমীর সকালে এ শহরের আরো এক মুখ্য আকর্ষণ সালার-জাং মিউজিয়ামে ঘুরে ঘুরে থকে যাওয়া আর নবমীনিশিতে আবার মন উচাটন কোলকাতার ধুনুচিনাচের জন্য । আর সেই সোনার প্রতিমা ভাসানের সুর যেন বেজে উঠল কানে কানে ।

 মনে মনে গেয়ে উঠলাম " নবমীনিশি রে তোর দয়া নাই! এত করে সাধিলাম ..."

নবমীর দুপুরে মাংস খাওয়ার রেওয়াজ সব বাঙালী বাড়িতে । কাবাব-বিরিয়ানি-তন্দুরীর শহরে তার জন্য হাপিত্যেশ নেই । অলিগলিতে মুখরোচক দোকান । ঐদিন এ শহরে নবরাত্রির সাজগোজ যেন একটু বেশিমাত্রায় নজরে এল ।  
দশমীর দুপুর থেকে বাড়িতে শুরু হয়ে যেত নিমকী-নাড়ু আর ঘুগনীর তোড়জোড় । কত মানুষ আসবে বাড়িতে । কিন্তু এখন কোলকাতায় সেই রেওয়াজ যেন অনেকটাই স্তিমিত । দল বেঁধে যাওয়া হত বিজয়া করতে । প্রবাসে বসে আরো যেন এইগুলো পেয়ে বসে আমাকে । মনে হয় আমি যেন দলছুট এক কোলকাতাইয়া । তবে হাইটেক সিটি ছেড়ে যেতে যেতে কেবল মনে হতে লাগল আমার শহরের কথা । হায়দ্রাবাদ কোলকাতা দুই পুরোণো শহর । কিন্তু এ শহরে শুধু শিল্পের জোয়ার । শেষদিন খেতে গেছিলাম এক রেস্তোঁরায় । সেখানে বাঁকুড়ার এক বাঙালী যুবক হোটেলে কাজ করে । সে বলল তার দুঃখের কথা । দেশ ছেড়ে পুজোর সময় তার মোটেও ভালো লাগছেনা কিন্তু বাঁকুড়ায় পড়ে থাকলে তার সংসার চলবেনা  তাই কাজের জন্য দলে দলে ছেলেরা বাঁকুড়া ছেড়ে হায়দ্রাবাদে পাড়ি দিয়েছে .. সে জানাল ।   আবারো মনটা ভারি হয়ে গেল তার কথাগুলো শুনে ।
দুর্গাপুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকুক কোলকাতার বাঙালী । যদি মাদুর্গা ভবিষ্যতে প্রসন্না হন তবে আমাদের এই শহরেও শিল্পের জোয়ার আসবে ।  সেই সুপ্ত বাসনা নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে ।   
আমাদের পরবর্তী  পিটষ্টপ ভাইজ্যাগ্-আরাকু ভ্যালিতে ।  ইষ্টকোষ্টের ধার ঘেঁষে  গোদাবরী এক্সপ্রেস ছুটে চলল ।  
আদরের নৌকায় প্রকাশিত  

২ অক্টো, ২০১৩

প্যাপিরাস ই-পত্রিকার পুজোসংখ্যা ২০১৩


মহালয়ার আগেই প্রকাশিত হল প্যাপিরাস ই-পত্রিকার পুজোসংখ্যা ২০১৩ । ধীরে ধীরে সকলের ভালোবাসায় প্যাপিরাস  তিনটে পুজো পার করতে চলেছে ।   আশাকরি সকলে পড়বে তোমরা ও তোমাদের বন্ধুদের জানাবে  প্যাপিরাসের কথা । আরো কেমন করে এই ওয়েবপত্রিকা  সুন্দর করা যায় জানালে খুশি হব । তোমাদের সুচিন্তিত মতামতের জন্য ইমেল ও প্যাপিরাসের কমেন্ট তো র‌ইলই । দুর্গাপুজোয় সকলে খুব ভালো থেকো । হৈ হৈ করে বেড়াতে যাও, ঠাকুর  দেখো । খুব আনন্দে খাওয়াদাওয়া করো সকলের সাথে । 
আবারো জানাই শারদীয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা । মহালয়ার আগমনীর সুরে সুরে থেকো সক্কলে মিলে ।   আবার  দেখা হবে  নতুন বছরে ।  

২১ সেপ, ২০১৩

ডালাস ডায়েরী

বিদেশের মাটিতে পা রেখেছিলাম অনেকদিন আগে । সেই নিয়ে আমার স্মৃতিচারণা আদরের ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে । 

৭ সেপ, ২০১৩

পর্বঃ রাজাবাজার


লেজ থেকে ইউনিভার্সিটির একলাফে ট্রানজিশান যেন একফোঁটা দস্যি ইলেকট্রনের গ্রাউন্ড লেভেল থেকে এক্সাইটেড স্টেটে ফার্স্ট ঝাঁপিয়ে পড়া । কত এনার্জি ওইটুকুনি ইলেকট্রনের ! চার্জড হয়ে তো আছেই সে ।
কো-এড বাতাবরণ । রঙীন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দ । হেদোর মোড়ে ফুচকা তদ্দিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে । বিধানসরণীর চাচার রোল তখন রাজাবাজারে ঊত্তীর্ণ ।
জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ততার বছর দুটো কেটেছিল রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে । বেথুন কলেজের রক্ষণশীলতার লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে সেই প্রথম কো-এড বাতাবরণে গা ভাসানো ।

সে ছিল বৃষ্টিভেজা শ্রাবণ সকাল । রাজাবাজারে ক্লাস শুরু হ'ল । রোজ সাড়ে দশটায় ক্লাস শুরু । দক্ষিণেশ্বর থেকে ব্রেকজার্নি । অধিকাংশ দিন শ্যামবাজারে নেমে লেডিস ট্রাম ১২ নম্বরে চড়ে বসতাম । তারপর সার্কুলার রোড ধরে ট্রাম আমাকে বয়ে নিয়ে পৌঁছে দিত সায়েন্স কলেজ । শুরু হ'ল প্রতিনিয়ত যাতায়াতের লড়াই । কিন্তু দুবছরে কোনোদিনো আমি ফার্স্ট ক্লাস মিস করিনি । যারা কাছে থাকত তারা বরং লেট করে পৌঁছাত । স্যার একদিন বলেছিলেন "একে দেখে শেখো, She is nearest to the God, farthest from the Church!"
থিয়োরি ক্লাসের পর লাঞ্চব্রেক । তারপর প্র্যাকটিকাল ক্লাস । রোজ সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ ক্লাস শেষ হত । তারপর অফিসের ভীড় ঠেলে বাড়ি ফেরা ।
কলেজে ক্লাস শুরুর ঠিক পরেপরেই চোখে নিদারুণ কনজাংটিভাইটিস সংক্রমণ হল । নতুন ক্লাস আর দ্বিতীয় কেউ নেই যে আমার পড়া বুঝিয়ে দেবে । ক্লাস-নোটসের ওপর ভিত্তি করেই পড়া আর পরীক্ষা দেওয়া । তাই শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি সেকেন্ড ইয়ারের দাদাদিদিদের "কোনো ক্লাস কামাই করবে না" । ইউনিভার্সিটিতে যারাই রক্ষক, তারাই ভক্ষক অতএব ক্লাসে যা পড়ানো হবে সেটা নিয়মিত ফলো করে গেলে আর তাকে ভিত্তি করে নিজে পাঁচটা জার্নাল আর ব‌ই ঘেঁটে নোটস বানিয়ে নিলেই ফার্স্টক্লাস অবধারিত । তাই নিদারুণ চক্ষুশূলেতেও বাসবদল করে আলমবাজার থেকে রাজাবাজারে গেছি ক্লাস করতে । ইউনিভার্সিটিতে প্রোমোশানের জন্য নতুন রোদচশমা চোখে সেদিন দুগ্গা দুগ্গা বলে কলেজে গেছি । ক্লাসরুমে ঢোকার মুখে আমার ক্লাসেরই একপাল ছেলে (তখনো আলাপ পরিচয় হয়নি তাদের সাথে ) তুমুল শব্দ করে উঠল । বুঝলাম যে আমাকে দেখে ওরা অমন করছে । চশমাটা কায়দা করে মাথায় তুলে তাদের দিকে চেয়ে বললাম " এই তো সবে ক্লাস শুরু হল, দুবছর তোদের সাথে ঘর করব কি করে! ক্লাসের বন্ধুকে তোরা আওয়াজ দিস বুঝি! বুঝতাম তোরা আমার সিনিয়ার তাহলেও নয় একটু আধটু raggingভেবে ক্ষমাঘেন্না করে দিতাম !"
সাথে সাথে আমার বন্ধুরা sorry বলেছিল । তারপর ওরা যে আমার কি ভালো এবং হেল্পফুল বন্ধু হয়ে উঠেছিল যে কি বলব ।
প্রতি শুক্রবার আমাদের থিয়োরি ক্লাস হত প্রেসিডেন্সি কলেজে । সেখান থেকে দল বেঁধে পায়ে হেঁটে ট্রাম রাস্তা, অলিগলি দিয়ে পার্সিবাগান লেন ও সব শেষে সায়েন্স কলেজে এসে প্র্যাকটিকাল ক্লাস করা । সেই ফাঁকে পরিচয় হল কফিহাউসের সাথে । ঐ দুটো বছর অনেক ভালো বন্ধু পেয়েছিলাম । কফিহাউস ছাড়াও সায়েন্স কলেজের ক্যান্টিন, সাহা ইনস্টিটিউট ও বোস ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিনে দুপুরের টিফিন খাওয়ার মজাটাই ছিল অন্য স্বাদের । ন্যাশানাল লাইব্রেরীতে পড়াশুনোও চলত সেই ফাঁকে ।

মনে পড়ে যায়...


দুপুরবেলার নিঝুম স্মৃতি, শান্ত পায়ে পথ চলা,
ক্লান্ত গায়ে কথা বলা রাজাবাজার কলেজ পারে,
ট্রামলাইনকে ক্রস করে, এপিসি রোড ছুঁতো শেষে
পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।

আমরা তখন স্নাতোকোত্তর, আমরা খোলা হাওয়া
স্বপ্ন নেশা চোখে মেখে, রঙীন হয়ে যাওয়া
খগেনদাদার চায়ের ঠেকে, ল্যাবের সেই কোণা
মিনিট পাঁচেক জিরেন, টেস্টটিউব হাতে নিয়ে...

সুলগ্নার বাসের প্রেমিক, কমলিকার দেখতে আসা,
সুদীপের স্বপ্ন দেখা,বিদেশ যাবার কত আশা !
অমৃতা আর সুমন জুটি, পাশাপাশি থাকত কেবল
গোপন প্রেমের কেমিস্ট্রিতে, গসিপ গিলি বন্ধু সকল..

সূয্যি ডোবে আঁধার নেমে আসে
কলিকাতা সাতলক্ষনয়, পার্শিবাগান লেনে ।
ফার্স্ট ইয়ারেই ভিসা পেল সুমন-অনীক-জয়দীপরা
হলনা কো অমৃতার সুমনের সাথে বাড়ি ফেরা..

র‌ইলো পথের ধূলোগুলো, উড়ে গেল কিছু
পার্শিবাগান চললে তুমি আমার পিছুপিছু
র‌ইলে নীরব প্রেমের তুমি , সাক্ষী হয়ে শুধু
রাজাবাজার, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।

আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ার, একশো কুড়ি জন
কফিহাউস, ব‌ইপাড়া, জটিল সমীকরণ ।
মাতাল হাওয়ায় উড়ে গেল, বুদবুদ উদ্বায়ী
হারিয়ে গেল ওরা যেন আজব পরিযায়ী

কফিহাউসের সাদা টেবিল লিনেনে
র‌ইল ছোঁয়া সাতাশি সালের ব্যাচ
র‌ইলে তুমি পড়ে পার্শিবাগান লেন
আর এপিসি রোড, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।

বিশুদ্ধ রসায়নের সিলেবাসের চাপে ঐ দুটো বছর কোথা দিয়ে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত হয়েছিল তা টের পাইনি । তখনো আমার সাহিত্যের ধারাপাত অধরা, অনবরত মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার টানাপোড়েনে ।
দিক্‌পাল সব কেমিষ্ট্রির অধ্যাপকের সান্নিধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যতের দিশা । একদিকে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স, অন্যদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এহেন আমি হাবুডুবু খেতে খেতে অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রিতে স্পেশালাইজ করলাম । ডাঃ অসীমা চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ জুলি ব্যানার্জি, ডাঃ অভিজিত্ ব্যানার্জি, প্রোফেসর তলাপাত্র, ডাঃ প্রিয়লাল মজুমদার, ডাঃ শিবদাস রায় এদের সাথে সর্বক্ষণের ওঠাবসা আমার জীবন রসায়নকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল । জৈব রসায়নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ন্যাচারাল প্রোডাক্টস নিয়ে পড়াশুনো করতে করতে আশ্চর্য্য হতে লাগলাম । সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে শুতে যাওয়া অবধি জৈব রসায়ন আমাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে এই কথা ভেবে । চায়ের মধ্যে ফ্ল্যাবোনয়েডস, তারপর প্রাতরাশের ফ্রুট প্ল্যাটার ভর্তি রঙীন সব এন্টি কার্সিনোজেনিক বিটা ক্যারোটিন ! পরণের সূতির কাপড়... সে ন্যাচারাল পলিমার ফাইবার, আবার সিন্থেটিক শাড়ি বা ড্রেস মেটিরিয়াল সে সিন্থেটিক পলিমার । এইভাবে অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি তখন আমার শয়নে, স্বপনে, জাগরণে । সিনথেটিক অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি আমাকে আবিষ্ট করে রাখত সে সময় । এন্টিবায়োটিক্স পড়াতেন প্রোফেসর কে এম বিশ্বাস । উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ছিলেন । ডাঃ শিবদাস রায় পড়াতেন হেটেরোসাইক্লিক কম্পাউন্ডস । ডাঃ প্রিয়লাল মজুমদার পড়াতেন নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স আর এরোমেটিক কম্পাউন্ডস । প্রতিটি ক্লাস ছিল ভীষণ উপভোগ্য । স্যারের সাথে আমার খুব দোস্তি হয়েছিল । বাবা চাকরী করতেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে । বাবাদের নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ হলেই সেই ওষুধের লিটারেচার নিয়ে স্যারের সাথে আলোচনায় বসতাম । স্যার শিখিয়েছিলেন ডক্টর কোনো ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেই ওষুধের কম্পোজিশান পড়ে নিতে । সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে আমার বাড়িতে । কাশির ওষুধ সেই যে বাড়িতে ব্যান করেছিলাম আজো তেমনি আছে । এফিড্রিন দেওয়া কাফ সিরাপ যে কত ক্ষতিকারক স্যার বোঝাতেন । এছাড়াও হলুদের কারকিউমিনের কত গুণ বা খয়েরের ক্যাটেচিন যে কতখানি ক্ষতিকারক সেগুলো জেনেছিলাম । সালফার ড্রাগে আমার চিরকাল এলার্জি । এন্টিবায়োটিক সালফার ফ্রি কিনা ডক্টর প্রেসক্রাইব করলে এখনো নেট ঘেঁটে দেখে নি । এভাবেই চলছিল আমার জৈব রাসায়নিক দোস্তি ।
সায়েন্স কলেজের শেষবছর অর্থাত ১৯৮৬ সালে আমরা চুটিয়ে দিল খেলেছিলাম সকলে মিলে । তখন বসন্তে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পাসপোর্ট যেন পাওয়া হয়েই যেত সরস্বতী পুজোতে । তারপরেই দোল । অতএব সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা পেয়ে গেছি । তাই সব কিছুতেই মায়ের সায় । দোলের আগের দিন ক্লাস শেষ হবার পর কলেজের মাঠে ছেলেমেয়ে একত্র হলাম । সাথে নানা রংয়ের আবীর এনে প্রথমে স্যারেদের ঘরে ঘরে ঢুকে পায়ে দিয়ে প্রণাম করে আসা হল । সেবার প্রচুর ফাগ খেলা হল একপাল ছেলে মেয়েতে মিলে । সেই প্রথম ছেলে বন্ধুদের সাথে দোল খেলে লালটুকটুকে হয়ে লজ্জায় সবুজ হয়ে মিনিবাসে বাড়ি ফেরা । তবুও আনন্দ আকাশে বাতাসে । কারণ মম যৌবন নিকুঞ্জে তখন পাখিডাকার শুরু হয়ে গেছে । মা বরং খুশিই হলেন । এই তো জগতের নিয়ম । প্রকৃতির গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে । আমগাছে মুকুল আসবে । বাদাম গাছের পাতা ঝরে গিয়ে লাল ফুল সর্বস্ব গাছ হবে এই তো বসন্তের নিয়ম ! মায়ের একরত্তি মেয়েটা কেমন বড়ো হয়ে গেল! কিন্তু পুরোটাই খুব সুন্দর ভাবে । শালীনতার মাত্রা অতিক্রম না করে । বছর দুয়েক আগে দোলের আগের দিন কোলকাতার এক নামী কলেজের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম । দেখলাম ছেলেগুলি মেয়েদের সিঁথিতে সিঁদুরে আবীর ঢেলে দিচ্ছে নিপুণ ভাবে তারপর সেই লাল টুকটুকে সিঁথিতে মেয়েটি ছেলেটিকে জাপটে ধরে মোটরসাইকেলে করে এক নিঃশ্বাসে অন্তর্হিত হল সেখান থেকে ।
এখন ফাগুনের ফুল ঝরতে না ঝরতেই চকোলেট-ডে, প্রোপোজ ডে, হাগ-ডে, কিসিং-ডে, ভ্যালেন্টাইনস-ডে পেরিয়ে দোল দে । দোলের আবীরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায় । দোলের রঙের গড়িয়ে পড়তে লাগল অর্কুট অলিন্দ দিয়ে । সেই রঙ গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে ।
এখন দোলের রঙের ওপরেও টেকশো ! রূপ সচেতন বঙ্গতনয়ারা স্কিনফ্রেন্ডলি রং চায় ! ইকোফ্রেন্ডলি আবীর, ভেষজ গুলালে ফ্যাশন ইন ! তাই ডিজিটাল দোল খেলো বাবা! নো হ্যাপা ! আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না, রং খেলবোনা !
ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে ! দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । দোলখেলার প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । এখন দোলখেলার বাতাস সোশ্যালনেটওয়ার্ক ময়তায় । ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলখেলা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই দোলখেলা । দোলের রং ঝরছে সর্বত্র । ফাগ উড়ছে অনাবিল আনন্দে ।
পড়াশোনোর চাপে আমাদের দোল ছিল প্রকৃত দোলের মতন । অন্যরকমের মাদকতা আর একটা বিশেষ ছুটির দিনে দোলকে দোলের মত করে পাওয়া ।
তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল ফোন অথবা হাজারো কেবল চ্যানেল । অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকি ! তবে মায়ের হাতে স্পেশ্যাল রান্না ছিল সেদিনের মুখ্য আকর্ষণ ।
বেথুন কলেজে যেমন দুই মহিলা চন্দ্রমুখী দেবী এবং কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর প্রথম স্নাতক হওয়ার শতবর্ষে আমি ছিলাম ঠিক তেমনি সায়েন্স কলেজে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদযাপনের সামিল হবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । ১৮৮৬ সাল থেকে ১৯৮৬ এই একশো বছরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কত নাম করা মানুষেরা কেমিষ্ট্রি পড়েছিলেন আর এহেন আমিও সেই ডিপার্টমেন্টের ১০০ বছরের একরত্তি ছাত্রী ! একসপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ও রাজাবাজারে সায়েন্স কলেজে কত সেমিনার, লেকচার, সিম্পোশিয়াম হয়েছিল তার ইয়ত্ত্বা নেই । আমি ছিলাম প্রথম দিনের রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ত্বে । তারপর শেষদিনের খাওয়াদাওয়া ও নাচাগানা । ল্যাবের মধ্যে বিশাল বিশাল বাক্স প্যাকিং । পাশেই হচ্ছে রান্নাবান্না । লুচি, মুর্গির মাংস সব প্যাকিংয়ের দায়িত্ত্বে আমরা । সবশেষে প্রত্যেকের জন্য কেসিদাসের রসোমালাইয়ের ছোট্ট হাঁড়ির ভার নিয়েছিলেন কেসি দাসের বাড়ির মেয়ে মল্লিকার ঠাকুমা । মল্লিকা আমার সহপাঠিনী । আমি গিয়ে হাসিমুখে ঠাকুমাকে একটি বিজ্ঞাপন দিতে অনুরোধ করেছিলাম । ঐ বাড়ির অনেকেই সায়েন্স কলেজের স্টুডেন্ট ছিলেন তাই এই কলেজের ভালোমন্দে ওনাদের একটু দুর্বলতা ছিল ।এই যজ্ঞির দুমাস আগে থেকে সারা কলকাতা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কোম্পানির থেকে বিজ্ঞাপন চেয়ে আনার দায়িত্ত্বও ছিল আমি সহ একটি টিমের । কোথায় পাস্তুর ল্যাব, কোথায় ক্যালকাটা কেমিক্যালস, কোথায় বেঙ্গল কেমিক্যালস, হিন্দুস্তান লিভার , রেকিট এন্ড ক্যোলম্যান ও নামীদামী ফার্মাসিউটিকালের অফিস থেকে শুরু করে কলেজ স্ট্রীটে ছোট বড় সব ল্যাব ইকুয়িপমেন্টসের অফিসে পায়ে হেঁটে হেঁটে, ট্রামে, বাসে দৌড়ে মরেছি আমরা পয়সার জন্যে । তবে সায়েন্স কলেজের নাম শুনে কেউ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করেনি সেটাই রক্ষে । আরো একটি কারণ হল এই সব কোম্পানিগুলোতে তখন সায়েন্স কলেজের পোষ্ট গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টরা চাকরীতেও জয়েন করতে যেত । তখন ছাত্রদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার ঢল এতটা নামেনি ।

কত বাদামী বিকেল পেয়েছিলাম আমরা । জন্মদিনের সন্ধ্যে হত সেখানে । পরীক্ষার ভালো ফলের পার্টি হত অথবা কারোর সফল কোর্টশিপ । সেদিনের কফির পেয়ালার বিকেল আজো রয়ে গেছে... একমুঠো রোদ ভর্তি সকাল গড়িয়ে নোট তৈরী হতে হতে বিকেলের চৌকাঠে পা দেওয়া ।
শিল্পীর ক্যানভাসেও ছিল সেই রঙ ! মেহগিনি টেবিলের ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ত সেই রং । কবিতার খোলাখাতায় টুপটাপ ঝরে পড়ত সাবলীল শব্দকণা সেই মেহগিনি টেবিলে । যার ওপরে ধূমায়িত কফিবিন্‌সের গুঁড়ো গুঁড়ো গন্ধ হাওয়া ভেসে বেড়াত অনবরত ।
আমার একভুবন আকাশ জুড়ে তখন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ আর কফিহাউসের আড্ডা ।
পেরেছ চিনতে বিকেল আমার?
একরাত স্বপ্ন নিয়ে, একসন্ধ্যে নেশা নিয়ে, একভর্তি হুল্লোড় নিয়ে
চেয়েছিলাম তোমায়, পেয়েওছিলাম তোমায়
রঙতুলির টানে সজীব হয়েছিল একরাশ চিন্তা-দৃশ্যপট !
আর সেই টেবিল ! সেই রাশিরাশি আড্ডা,
তুফানি তর্কের মুঠো মুঠো সংলাপ, যুক্তির খেল!
সেই সাদা নীলছোপ ধরা টেবিলক্লথ !
কত কাপ কফির উষ্ণতা !
কত ত্রিকিণমিতি, হাতে হাত ছুঁয়ে যাওয়া স্মৃতির পরিমিতি,
উপপাদ্যের ছেঁড়া পাতা, চিকেন কাটলেটের গন্ধ !
মনে পড়েছে তোমার ?
সেই পড়ন্ত বিকেলের ফুটপাথের ব‌ইপাড়া,
সেই আমাদের চলার সাক্ষী সব পুরোণো-নতুন ব‌ইয়েরা !
সেই রঙচটা, তার ছিঁড়ে দাঁড়িয়ে পড়া ট্রামেদের সারি।
কফির বাদামী গন্ধ কেড়ে নিয়েছিলে আমার থেকে,
নিয়ে গেছিলে সব রঙ তুমি ।
তবুও বেঁচে র‌য়ে গেলে সেই পুরোণো
রঙচটা ছাল ওঠা খোলসের শহরে..

সেই শ্রাবণের তুমি, ধরেছিলে বৃষ্টির রঙিন ছাতা,
কলেজবেঞ্চে থকে যাওয়া শীতের দুপুরে দিয়েছিলে
এককাপ ভর্তি অতিচেনা উষ্ণতা,
গ্রীষ্মের ল্যাব-পালানো চুপকথার গোপন দুপুর, আরো কত কি!

আমি আজও শুনতে পাই
সেই ভেঙে যাওয়া আড্ডা-বিকেলগুলোর কলকল শব্দ,
সেই ক্লান্ত একব্যাগ দুপুরের বয়ে চলার ফিসফিস
আর সেই টেবিলের চাদরের একটুকু ছোঁয়া লাগা কফির ধোঁয়ার ওম
সেই উর্দিপরা আমাদের আবদারের ক্লান্ত মানুষগুলো,
মাথার ওপরে পুরোনো গন্ধের পাখাদের বনবন শব্দকণারা
ঝরে পড়েছিল আমাদের কথাবৃষ্টির বর্ণমালার সাথে
মিশে গেছিল দুকূল ছাপানো কফির বাদামী গন্ধ নিয়ে..

আমি তখন ঊনিশ কুড়ির সাঁঝবেলা
তোমার আকাশ আমার আকাশকে
চিনিয়েছিল সেই বাদামী গন্ধ
আমি দাঁড়িয়ে র‌ইলাম সেই গন্ধ নিয়ে
সেই ওম নিয়ে, সেই রঙ নিয়ে


২ সেপ, ২০১৩

বেথুন জার্ণাল- পর্ব ৩

কলেজগেটের পাশে রোজ সকাল দশটা থেকে বিকেল সাতটা অবধি দাঁড়িয়ে থাকত মতিদা  ।

এ পাড়ার বিখ্যাত ফুচকাওয়ালা । তার ফুচকা যেমন বড়বড়, গোল্লা গোল্লা, ও মুচমুচে আর তেমনি সুস্বাদু তার যাবতীয় অনুপান। একদম ঠিকঠাক টক, ঝাল ও নুনের কম্বিনেশন । আমাদের অনেক গবেষণা হত সেই তেঁতুল জলের রসায়ন নিয়ে । বাড়িতে অনেক বকুনিও খেতাম রোজ রোজ ফুচকাখাওয়া নিয়ে । কিন্তু এক  মতিদা  মানুষটা আর দুই তার ফুচকার টানকে কিছুতেই এড়াতে পারতাম না ।  মতিদার ছিল একটাই শ্লোগান "ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো  মতিদাকা গুণ গাইও " "আমার ফুচকায় অসুখ করবে না । কলেজের ফিল্টারের জলে তৈরী এই তেঁতুলজল" । আমার দিদি তখন পড়ত অন্য কলেজে ।



দিদিকে বলতাম " একদিন তোকে  মতিদার ফুচকা খাওয়াব " তা সে আর হয়ে উঠত না । সেবার পয়লাবোশেখের ঠিক আগে মা নতুন জামাকাপড় কেনার টাকা দিলেন । আমরা দু'বোনে হাতিবাগান থেকে জামাকাপড় কিনে একটা চায়ের দোকানে এসে চা-জলখাবারের অর্ডার দিয়ে দেখি পার্সের সব টাকা শেষ। মাত্র একটা কয়েন পড়ে আছে । এদিকে প্রচন্ড খিদে পেয়েছে আর বাড়িও ফিরতে হবে । হাঁটা লাগালাম কলেজের দিকে| বাসে উঠব সে পয়সাও নেই কাছে । হাঁটতে হাঁটতে দুজনে পৌঁছলাম কলেজ অবধি । সেখানে  মতিদা  তখনো দাঁড়িয়ে । দিদিকে দেখামাত্রই  মতিদা  যথারীতি তার স্লোগান আওড়ালো "ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো  মতিদাকা গুণ গাইও "

 "আমার ফুচকায় অসুখ করবে না । কলেজের ফিল্টারের জলে তৈরী এই তেঁতুলজল"

 দিদিকে কথা দিয়েছিলাম একদিন ফুচকা খাওয়াব । মতিদা  শালপাতা ভাঁজ করে এগিয়ে দিল আমাদের সামনে ।

 আমি বললাম " না, মানে একটা কথা ছিল  মতিদা  ,"

 মতিদা  বলল " খাও খাও , কিচ্ছু হবে না "

 আমি বললাম " না না সে কথা নয় "

 মতিদা  বলল "মা বকবে ?” আমি বললাম " না না পয়সা ফুরিয়ে গেছে যে "

 মতিদা  বলল "কাল দিও, আগে তো খাও "

 আমি বললাম " বাড়িফেরার পয়সাও নেই "

 মতিদা  বলল " আমি দিচ্ছি, কাল দিও "

 আমরা পেট পুরে ফুচকা খেলাম । এত ভাল বোধ হয় আগেও লাগেনি কখনো । আরো যেন বড়বড়, গোল্লাগোল্লা, মুচমুচে ফুচকা ! আরো পার্ফেক্ট টক-ঝাল-নুনের কম্বিনেশন !

 দু'জনের বাসের ভাড়াও চেয়ে নিলাম  মতিদার কাছ থেকে ।



আমরা তখন বেথুন কলেজ, আমি তখন শাড়ি
কেমিষ্ট্রিল্যাব, লেকচার হল, আর মিনিবাসে বাড়ি ।।
কেমন যেন দিনগুলো সব হঠাত ফুরিয়ে এল
হেদোর ধারে ফুচকা-আচার সায়েন্স কলেজ গেল !!!

৩১ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-৩

-->


তারকেশ্বর পশ্চিমবাংলার শৈবতীর্থের অন্যতম তারকেশ্বর । হুগলীজেলার এই দেবভূমি হাওড়া স্টেশন থেকে মাত্র ৩৬ মাইল দূরে । আমার চলেছিলাম বর্ষণমুখর এক কাকভোরে । গাড়ি নিয়ে সোজা উত্তরে নিবেদিতা সেতু পেরিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে সিঙ্গুরের পর বাঁদিকে ঘুরতে হবে । তারপর স্টেট-হাইওয়ে ২ ধরে গেলেই পড়বে তারকেশ্বর । গাড়ি রাখবার চমতকার জায়গা আছে মন্দিরের বাইরে । চমত্কার রাস্তা । বহু মানুষ শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত রেলপথে যাতায়াত করে থাকেন । স্বনামখ্যাত স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গ আছেন এখানে যাঁর কলিযুগের নাম বাবা তারকনাথ । এবার আসি প্রতিষ্ঠাতার কথায় ।
তারকেশ্বর তীর্থস্থান থেকে প্রায় মাইল তিনেক দক্ষিণ-পূর্বে কানানদীর তীরে রামনগর গ্রাম । সেখানে রাও ভারামল্ল নামে এক রাজপুত রাজা রাজত্ব করতেন । রামনগরের স্থানীয় অধিবাসীদের উপর জোর জবরদস্তি করে রাজস্ব আদায় সহ নানাবিধ অত্যাচার শুরু করলেন । রামনগরের নিকটবর্তী গ্রাম বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল । তারা মুর্শিদাবাদের নবাবকে সেকথা জানালে নবাব রাজারূপী ঐ দস্যুগণকে মুর্শিদাবাদে বন্দী করে পাঠাতে বললেন । এদিকে রাজা ভারামল্ল ও তার ভাই বিষ্ণুদাসকে দেখে নবাব বুঝলেন এরা কেবলমাত্র ভিনদেশী দুই রাজপুত । যাদের ব্যবহার অত্যন্ত ভালো এবং যারা ব্যবসার কারণে বাংলায় থিতু হয়েছে। নবাব তাদের রামনগরে থাকতে আদেশ দিলেন ।
রাজা ভারমল্লের একটি গোশালা ছিল । কপিলা নামে একটি হৃষ্টপুষ্ট গোরু সেখানে প্রচুর দুধ দিত । একদিন হঠাত দেখা গেল রাজার দুধ কমে গেছে । গোরক্ষকের ওপর ভার পড়ল সেই রহস্য উদঘাটন করার জন্য । সে গিয়ে দেখতে পেল জঙ্গলের অনেক গরুর মধ্যে কেবলমাত্র কপিলা একটি চকচকে পাথরের মধ্যে খোদিত একটি গর্তে স্তন রেখে সেখানেই দুধ দিচ্ছে । রাজাকে জঙ্গলের মধ্যে এনে সেই দৃশ্য দেখালেন গোরক্ষক । আশপাশের গ্রামের মানুষ দেখতে লাগল সেই দৃশ্য । তারা জানালো সেই পাথরটির ওপর বহুদিন ধরে তারা ধান ঝাড়ে কিন্তু এরূপ দৃশ্য তারা কখনো দেখে নি । আর এই পাথরটি হল সেই স্বয়ংভূ লিঙ্গ যিনি তারকনাথ রূপে পূজিত হন ।

শ্রাবণ মাসে প্রচন্ড ভীড় হয় তাই শ্রাবণ মাস পড়ার আগেইভাগেই ভোর ভোর আমরা পৌঁছেছিলাম আর পুজো দিয়ে নিয়েছিলাম । আছে সেই বিখ্যাত দুধপুকুর যেখান থেকে জল নিয়ে বাবার পুজোসামগ্রী কিনে পুজো করার ব্যবস্থা আছে । কথায় বলে দুধপুকুরে স্নান করলে সর্ব ব্যাধি বিনাশ হয় ।   তারকনাথের সেবার জন্য বাবার গদিতে দানের সুবন্দোবস্ত আছে । রসিদের বিনিময়ে দান গ্রহণ করা হয় সেখানে । জলযোগ ও দুপুরের খাওয়ার ভালো হোটেল ও আছে আর আছে কাশী বিশ্বনাথের মত অজস্র অলিগলি ও সেখানে দন্ডায়মান ষাঁড় । মোটের ওপর বাড়ির কাছাকাছি বেশ ভালো তীর্থস্থান এই তারকেশ্বর ।

২৬ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-২

ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার 
সম্প্রতি  আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি  sms poll এ দেখছিলাম জানতে চাওয়া হয়েছে "বাংলা কি বেকার ভাষা?" এই উক্তির পক্ষ একেবারেই না নিয়ে বলতে চাই বাংলা আজ বেকার ভাষা হলে সেই ভাষাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের রুজিরোজগার এবং তাও আবার ঐ পত্রিকাকে ঘিরে । এমন জনপ্রিয় একটি সংবাদপত্রের ট্যাগলাইন হোল "পড়তে হয় নয়ত পিছিয়ে পড়তে হয়" ।  এই দৈনিক পত্রিকাটি বাংলাভাষায় বলেই হয়ত এতটা জনপ্রিয় এবং তার সুষ্ঠু সম্পাদনাকে ঘিরে আজ কোলকাতা সহ পশ্চিমবাংলার অনেক মানুষই সাকার ।  তাই বুঝি সুদীর্ঘ ৯০টা বছর পার করেও তার পাঠককুল সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন । আবার নয় নয় করে তার পাঠক সংখ্যা ৯লাখে পৌঁছায় । 
 তবুও অবাক হ‌ই যখন বাংলাকে 'বেকার ভাষা' বলে ভোট নিতে চান দেখে । হয়ত বা আমার ভুল এই ভাষাকে কেন্দ্র করে এই বেকারত্বকে ঘিরে । কিম্বা হয়ত পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাভাষার গুরুত্ব যাচাই করার জন্য এই ভোট । সে যাই হোক কিছুদিনের মধ্যেই দেখি সেই ভোটের ফল প্রকাশিত । আকাশতলে অনিলে জলে, দিকে দিগন্তলে ৮৮ শতাংশ মানুষ এই বাংলাভাষাকে ভালোবেসে "ভালোভাষা" বলে জানিয়েছেন । 
এই ভোটাভুটির মাঝামাঝি কোলকাতায় আয়োজিত হল এক আলোচনাচক্র । ইন্টারনেটে বাংলাভাষার প্রসার, প্রচারকে ঘিরে নেটসাহিত্যের অগণিত পাঠক, লেখক ও সম্পাদকদের আনুকুল্যে । যার নাম "ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার"  । বাংলাভাষায় সাহিত্য রচনা করতে ভালোবাসেন অনেকেই । এবং এই ভাষাকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয় অনেক অনেক ই-পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিন ।   আর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির রমরমায় বাঙালীর ঘরে ঘরে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের অধিক্যে সেই সাহিত্য এখন এককথায় হাতের মুঠোয় ।  তাই এরূপ একটি সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা এই মূহুর্তে খুব জরুরী ছিল । সৃষ্টি, ইচ্ছামতী এবং ও-কোলকাতা এই তিনটি ওয়েব পত্রিকা এবং ব্লগজিনের  আতিথেয়তায় আমিও হাজির ছিলাম গত ১২ই অগাস্ট ২০১৩ বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাঘরের ঐ আলোচনাচক্রে । 
  


ব্লগ লেখা শুরু করি ২০০৮ এর গোড়ার দিকে । ততদিনে বাংলা লেখার সফটওয়ার ও ইউনিকোডের জয়জয়াকার । এরপর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও ব্লগার বন্ধুদের সাথে ঘনিষ্ঠতায় ব্লগের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে । সোনারতরী ছিল আমার নিজের ব্লগ ।
অর্কুটময় দুনিয়ায় তখন বন্ধুদের সাহিত্যরস উপচে পড়ছে দেখে ভাবতাম এগুলি আমার ব্লগে একত্রে রাখলে তো মন্দ হয়না ।
কবি তো বলেইছেন "সেই সত্য যা রচিবে তুমি' ....সেই ভাবনা নিয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধুকে বাংলা লেখা শিখিয়েও ফেলেছিলাম অনলাইন । কিন্তু ব্লগ খুলতে তারা নারাজ অথচ নিজের লেখা নেট-সাহিত্যে দেখতে খুব উদগ্রীব । সেই ভাবনা নিয়ে সোনারতরী থেকে প্রথম আত্মপ্রকাশ হয় "অর্কুট আগমনী পাঁচালী'
সেটাই ব্লগ থেকে আমার সম্পাদনায় ওয়েবম্যাগের জন্মলগ্ন, ২০১০ সালে পুজোতে । জনপ্রিয়তা দেখে ২০১১ তে "দোলছুট" ও ১লা বৈশাখে "পয়লা সাহিত্য পার্বণ" প্রকাশিত হল ।
তখুনি মেটামরফোসিস। ছিল রুমাল, হল বেড়াল । সোনারতরী র‌ইল আমার লেখার জন্য কিন্তু প্যাপিরাসের জন্ম হল ২০১১ পুজোতে । এইভাবে ব্লগ-বৈতরণী পার হতে গিয়ে কত লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হল প্যাপিরাস । পরিচিতি বাড়তে থাকল ।
গুণমানের উত্কর্ষতার কথা চিন্তা করে বছরে দুটি উত্সব সংখ্যা বের করি আমরা । পুজোসংখ্যাটি একটু বিস্তারিত হয়, একগুচ্ছ গল্প, কবিতার নোটবুক , ভ্রমণকাহিনী, নিবন্ধ ও হোমমেকারের হেঁশেলের রেসিপি দিয়ে । আর ২০১২ থেকে শুরু হল একটি আলোচনাচক্র বা ফোরাম যার নাম "চক্রবৈঠক"। সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয়ের ওপর মতামত সংগ্রহ করে সেটিকে প্যাপিরাসের পাতায় উপস্থাপিত করা হয় । ধারাবাহিক স্মৃতিচারণা থাকে একটি বিভাগে, যে পাতাটির নাম 'স্মৃতিকণা'   । 'ধরণীর পথে পথে নামে' ভ্রমণের পাতা থাকে একটি । কখনো অণুগল্প থাকে ডজন খানেক অথবা নির্দ্দিষ্ট থিমে ছোটগল্প স্থান পায় । 


 আমাদের ওয়েবম্যাগাজিনের ঠিকানা হল papyrus.sonartoree.com
 
আপনারা পড়ুন ও পড়ান সকলকে আর আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় র‌ইলাম । 
চোখ রাখুন আমার প্রেজেনটেশানে :
http://yweb2.blogspot.com 


১৬ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা- পর্ব ১

অলীক সুখ 
শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটির হ্যাট্রিক ! দেখেছি এদের আগের ছবিদুটিঃ ইচ্ছে ও মুক্তধারা । খুব বাস্তববাদী কাজ করেন এরা । আর নতুন রকমেরো ।  আমার পছন্দের লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাহিনী। পছন্দের অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদারকে নায়করূপে প্রথম দেখা। আর সোহিনীকে নতুন করে কিছু বলার নেই । চন্দ্রবিন্দুর অনিন্দ্যকে আরো একবার Hats off! দারুন লিরিকস আর দারুন সুর। আর জয় সরকারের অনবদ্য সঙ্গীত আয়োজন ।পুরোটাই পাওয়ার সুখ না হলেও অনেকটাই সুখের ।  
দেবশঙ্কর হালদার (ছবিতে ডাঃ কিংশুক গুহ)  তাঁর বিয়ের তারিখে নিজের "সুখ"/ইচ্ছাপূরণের জন্য  একমাত্র বৌকে উপহার দিলেন কোলকাতার বুকে এক স্বপ্ন-বাড়ি যার নাম ফ্ল্যাট । আর সেই সুখ পূরণ করতে গিয়ে কেড়ে নিলেন সোহিনীর জীবন । সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়ে সোহিনীর প্রেতাত্মা কুরে কুরে খেতে লাগল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ( রম্যাণি, ডাক্তারবাবুর স্ত্রী )কে । সেও সন্তান সম্ভবা হল কিন্তু তার যখন মিসক্যারেজ হল তখন ডাক্তারবাবু বুঝতে পারলেন সেই "সুখ" পূরণের কি মাহাত্ম্য । তার আগে নয় ।
তবে কোলকাতার ডাক্তারবাবুদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নপূরণের ইচ্ছা আর ডাক্তারী পাশ করে শপথ গ্রহণের মূহুর্তটা একতু প্রকট করে দেখালে আরো ভালো লাগত । আজ কোলকাতার সরকারী-বেসরকারী সব হাসপাতাল/নার্সিংহোমের কি অবস্থা তা আমরা খুব ভালো করেই জানি । খবরের কাগজে প্রতিনিয়তঃ দেখতে পাই, টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পাই নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের সুচিকিত্সা বা যথাসময়ে করণীয় চিকিত্সার অভাবে মৃত্যু কিন্তু উচ্চমধ্যবিত্তরাও সমান ভাবে ভুক্তভোগী । এত সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল হচ্ছে কিন্তু ডাক্তারবাবুরা কি ঠিকমত কর্তব্য পালন করছেন? কেন আমরা কোলকাতার মানুষেরা এই মেট্রো সিটি  ছেড়ে অন্যত্র যাব আর কেনই বা ডাক্তারবাবুরা আরো সহৃদয় হবেননা এ শহরের মানুষদের জন্য ?  এই শূণ্যস্থানগুলি নন্দিতা-শিবপ্রসাদরা আরো একটু প্রকট করে তুললে ভালো হত বোধহয় । 
আর মাঝেমাঝে দেবশঙ্করের অতি নাটকীয় চিত্কার বড্ড প্রকট লেগেছে । উনি নাট্যমঞ্চের ব্যাক্তিত্ত্ব বলে বোধহয় তেমনটি হয়েছে । কিন্তু সব মিলিয়ে বাংলাছবির বাজারে বেশ নাম করবে বলে মনে হল । 

সব মিলিয়ে রোবাবরের বিকেল + প্রিয়া সিনেমা + অলীক সুখ = টোট্যালি পয়সা উশুল ছবি । সাথে বোনাস হল বিশ্বনাথ + নন্দিতা + শিবপ্রসাদের সাথে প্রিয়ার সিঁড়িতে করমর্দন !!!
এই হল কলকাতার মানুষজনের অলীক সুখ । বাঙালী বেশ আছি আমরা বেঁচে বরতে ...কি বল ? বাইরে বেরিয়ে দেখি একজন ব্যাগ ভর্তি আচার নিয়ে চেঁচাচ্ছে " ও মা একটা প্যাকেট আচার নিয়েই দেখুন না ! ওদিকে ন্যানোর কারখানা হলে সে সিঙ্গুরে গিয়ে সেই আচারের ব্যাগ পুরোটাই হয়ত বিক্রি করে আসতে পারত । অন্যথায় যারা আচার তৈরী করা শেখালো তারা সেই আচারের বিশ্বব্যাপী মার্কেটিং করে আজ ক্রোড়পতি। আজ তারাই এই শহরটাকে গ্রাস করে ফেলল । তাই তো ন্যানো ওদের দেশে ।আমাদের অলীকসুখ আছে বাবা। আমরা এই নিয়ে দিব্য আছি বেঁচে । আমাদেরই বা সুখ কম কিসের?

৮ আগ, ২০১৩

খোলাচিঠি রবিঠাকুরকে....

রবিঠাকুর
তুমি না কি স্কুল পালিয়ে ছবির খাতায় আঁকো  ?
গোল্লাছুটের দুপুরগুলোয় কাব্যি করে লেখো?
রবিঠাকুর তোমার নাকি  খুনসুটির এই ভোর
গান লিখতে  সিঁড়ি ভেঙে চিলেকোঠার দোর ।
রবিঠাকুর তুমি চেনো মেঘের কোলে রোদ ?
জীবনভর তোমার দেনা কেমনে করি শোধ ? 
ছোট্টবেলায় মা চেনালো রবিকবির আলো
সেইতো আমার হাতেখড়ি গান-বিকেলের ভালো ।
রবিঠাকুর তোমায় যদি সেলফোনেতে পেতাম
এসেমেসের বৃষ্টি ফোঁটা উজাড় করে দিতাম ।
রবিঠাকুর জানো তুমি মাল্টিপ্লেক্সের ঢল্‌ ?
তোমার গল্প-গানছবিতে মাতাল শপিংমল ।
রবিঠাকুর দেখবে তুমি ফ্লাইওভারের ধারে
হোর্ডিং ওলা রঙিন ছবি শিল্পী সারেসারে ।
দেড়শো তোমার পূর্ণ হ'ল পুজোয় মাতে লোক
প্রভাতফেরী গানের ভেরী দেড়শো মানার ঝোঁক ।
রবিকবি তুমি না কি ফেসবুকেতে আছো?
স্টেটাসে তে কাব্যি ঝরাও মনের সুখে বাঁচো ।
রবীন্দ্রনাথ আছো তুমি যন্ত্রজালে বন্দী
ট্যুইট দেখি মাঝেসাঝে বুঝি নাকি ফন্দী ?
রবিঠাকুর রবিঠাকুর খোলা খেরোখাতা
ছিটেফোঁটা দাওনা লিখে মনের দুটো কথা ।