১৬ জুল, ২০১৩

বেথুন-জার্নাল -১

-->

মরা একপাল মেয়ে জড়ো হয়েছিলাম ১৯৮২ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাসের পর কোলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী মেয়েদের রক্ষণশীল কলেজে । সকলের মধ্যে দুটি বিষয় অন্ততঃপক্ষে কমন ছিল । এক হল সকলের কেমিস্ট্রি অনার্স আর দুই সকলেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেশ কনফিডেন্ট পড়াশুনোর ব্যাপারে । আমাদের অনেকের আবার আরো একটা জিনিস কমন ছিল সেটা হল কেমিস্ট্রি অনার্সের সাথে ম্যাথস আর ফিজিক্স । 
 

সেই ছাব্বিশ নম্বর ঘরটা ! কাঁচের সার্শি সরিয়ে, পুরোণো গন্ধ বুকে নিয়ে, খড়খড়ির দরজা ঠেলে অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিলাম হুড়মুড় করে । কিছুটা উচ্চাশা নিয়ে আর কিছুটা দুরুদুরু বুকে । ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই পচাডিমের হাইড্রোজেন সালফাইডের সেই চেনা উচ্চমাধ্যমিক গন্ধটা অবশ করে দিল সুষুম্না স্নায়ুগুলোকে ।

ব্যাক্তিত্ত্বময়ী জ্যোত্স্নাদি এসেছিলেন । অনেকটা সেই মূর্তিমতী করুণায় শ্রদ্ধা উপছে উঠেছিল । তারপর রেডক্স ইক্যুয়েশান ব্যালেন্সিংয়ের দাপটে কেমন যেন সব ওলটপালট ! আবার হাতীবাগানের ড্রেসের ঝুলে সব যেন উথালপাথাল... কিছুটা অনাস্বাদিত মুক্তির আস্বাদে, কিছুটা শেষ ঊণিশ-কুড়ির ভালোলাগায়, ফুচকার তেঁতুলগোলা জলে ...

কিন্তু মনের মধ্যে একটু আধটু খচখচানি সেই ছাব্বিশ নম্বরের । আমি অ-পাঙক্তেয় ন‌ই তো সেখানে ? আমার জীবন রসায়নের সাথে রসায়নের দোস্তি সত্যি হবে তো?
বরানগর থেকে প্রথম একা বেরুলাম বেথুন কলেজে ভর্তি হয়ে । বাবা কলেজে ভর্তি করে চেনালেন পথঘাট, দোকানপাট । ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর । ১৭ বছরের আমি । মফস্বলী শহর আলমবাজার থেকে নিয়মিত শুরু হল আমার কলকাতা অভিযান । ছোটবেলায় শ্যামবাজার যেতে হবে শুনলেই বাবা বলতেন "কোলকাতা" যেতে হবে । আমি ভাবতাম অনেক দূর বুঝি! কোলকাতা যাওয়া মনেই এটা ওটা সেটা । শ্যামবাজার থেকে ড্রাই ফ্রুটস, ফড়িয়াপুকুরের অর্ফ্যানের চা পাতা, অমৃত'র লাল দৈ, জলোযোগের প্যাটিস আরো কত বলব ! ঠাকুমার জাফরাণী জর্দা, ঘোষকাজিনে চোখ দেখিয়ে চশমা করতে দেওয়া কিম্বা কুমার্স কনসার্ণ থেকে আঁকার স্কুলের রঙ-তুলি ! বাবা চেনাতেন পথঘাট । পাঁচমাথার মোড়ে পাঁচটা বড় রাস্তা কোন্‌টির কি নাম ও তারা সব শেষে কোথায় গিয়ে পড়েছে । পঞ্চমুন্ডির আসনে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে নেতাজী সুভাষের ইতিবৃত্ত ! কিছুটা অজানা আনন্দ আর সাথে কিছুটা অচেনা ভয় নিয়ে শুরু হল কলেজ জীবন । এতদিন ছিল মা-বাবার হাত ধরে শখের বাজার । এখন সেটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হল ।
কলেজ কেটে রূপবাণী সিনেমায় দু একবার সিনেমা ও হাতীবাগানের স্টার থিয়েটারে মায়ের সাথে সুপ্রিয়া দেবীর "বালুচরী" দেখেছি । ফেরার পথে সিলভার ভ্যালী রেস্তোরাঁয় কবিরাজী কাটলেট ভুলতে পারিনি এখনো । হাতীবাগানে একটা পেন সারানোর দোকান ছিল । নাম "পেন কেবিন্" । আমরা ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতাম । তাই ভালো মন্দ নানা পেনের নিব বদলানো লেগেই থাকত । এখনকার মত "ইউস এন্ড থ্রো" এর বাতাবরণ ছিলনা । কলেজ বান্ধবী মল্লিকা তখন টেনে নিয়ে যেত ওর বাড়ি । রসোগোল্লা আবিষ্কারক নবীন চন্দ্র দাসের বাগবাজারের বাড়িতে । বহুবার গেছি আর কে সি দাসের লোভনীয় সব মিষ্টিতে উদরপূর্তি করে বাড়ি ফিরেছি । কি আতিথেয়তা তাঁদের !
বিবেকানন্দের সিমলে স্ট্রীটের পাশে বিডন স্ট্রীটের ওপর জন ডিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের কলেজে।উল্টোদিকে হেদুয়ার সরোবর আর স্কটিশচার্চ কলেজ । বৈকুন্ঠ বুক হাউসে অনার্সের প্রথম ব‌ইট‌ই কেনা ; কলেজ ফেরত স্বাস্থ্যকর সুখাদ্যের হ্যাবিট ধরানোর জন্য সিমলেপাড়ার বিখ্যাত আইসক্রিম সন্দেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন অভিভাবক । দক্ষিণেশ্বর-বাবুঘাট, মিনিবাস রুট নং ১৫৮ তে চড়ে রোজ কলেজ যেতাম । কোনোদিন আবার আড়িয়াদহ-বাবুঘাট, মিনিবাস রুট নাম্বার ১৮১তে চড়ে শ্যামবাজারে নেমে বিধান সরণীর ট্রামে করে । বিধান সরণীর নাম ছিল একসময় কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট । তখন আলমবাজার থেকে বিডন স্ট্রীট যেতে মিনিবাসে লাগত ১টাকা ৫ পয়সা । সেই ৫ পয়সা আজ অবলুপ্ত আর মিনিবাসের সেই চেহারাও বদলেছে । প্রায়শ‌ই বাসে উঠত বরানগর বাজার থেকে কাশীপুরের সুমিত্রা অথবা বাসবী ।
কোলকাতার পথঘাট চিনেছি কলেজবেলায় । প্রায়শই পাঁচমাথার মোড়ে জ্যাম থাকার দরুণ আরজিকর রোড দিয়ে বাস ঘুরে দীনেন্দ্র স্ট্রীট দিয়ে বেরিয়ে বিধানসরণী ধরত । বুক ধড়পড় করত অচেনা জায়গা দিয়ে যখন বাস যেত কিন্তু ঐ ভাবে এঁকে বেঁকে বাস যখন আমাকে বেথুন কলেজের সামনে নামিয়ে দিত তখন এই শহরটার ওপর বেশ অদ্ভূত ভালোলাগায় আবিষ্ট হতাম ।
ভরতবর্ষের প্রথম মহিলা কলেজ বেথুন কলেজ । প্রতিষ্ঠাতা জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন । সেযুগে আমাদের দেশে নারীশিক্ষা প্রসারে যাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য । ১৮৪৯ এ তিনি স্থাপন করেন বেথুনস্কুল ও পরে ১৮৭৯ এ বেথুন কলেজ নির্মিত হয় । আমাদের সময় বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন শ্রীমতী দীপ্তি ত্রিপাঠী । কলেজে ভর্তির পর শুনেছিলাম আরো অনেক মহিয়সীর নাম যাঁরা এখান থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ।এঁদের মধ্যে সুখলতা রাও অন্যতম । আমাদের বাংলাভাষায় হাতেখড়ি হবার সাথে সাথে যাঁর অ, আ ক, 'র ছড়ার ব‌ই পড়ে আমাদের স্কুল যাবার ভিত তৈরী হয়েছিল । বেথুনে পড়েছিলেন মহিলা কবি কামিনী রায় যাঁর কবিতা আমাদের একাধিকবার সিলেবাসের মধ্যে ছিল । এছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রীতিলতা ওয়াদেদার পড়েছিলেন এই কলেজে । নেতাজী সুভাষচন্দ্রের খুব কাছের বন্ধু, সে যুগের রাজনৈতিক এবং সমাজসংস্কারক লীলা রায় (আগে নাগ ছিলেন ) সে যুগে বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোল্ড-মেডেল পেয়ে ছিলেন । এছাড়াও রয়েছেন পদ্মাবতী স্মর্ণপদক প্রাপ্তা সরলা দেবীচৌধুরাণী , শ্রীমতী সীতাদেবী, ডাঃ দীপ্তি ত্রিপাঠী, বৈজ্ঞানিক ডাঃ অসীমা চট্টোপাধ্যায়, থিয়েটার ও ছায়াছবি ব্যাক্তিত্ত্ব শোভা সেন, সঙ্গীতজ্ঞা পূরবী মুখোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকী, বাচিকশিল্পী ব্রততী বন্দোপাধ্যায় যাঁরা এই বেথুন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশান করেছিলেন । বেথুন কলেজের দুজন প্রথম গ্র্যাজুয়েট হলেন ডাঃ কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং শিক্ষাবিদ চন্দ্রমুখী বসু । ১৮৮৩ সালে এঁরা বেথুন কলেজ থেকে পাশ করেন । গ্র্যাজুয়েশানের পর কাদম্বিনী দেবী কলকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারী পড়েন । আর চন্দ্রমুখীদেবী বেথুন কলেজে লেকচারার পদে যোগ দেন । আমার ১৯৮৩ সালে বেথুন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার । সেবছর এই প্রথম দু'জন মহিলার গ্র্যাজুয়েশানের শতবছর উদ্‌যাপন মহা আড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল । নানারকম বর্ণময় অনুষ্ঠান এবং খাওয়াদাওয়ার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়েছিল সেই সেন্টিনারি । বেথুন কলেজের গ্র্যাজুয়েট হবার সুবাদে আর ঠিক ঐ বছরেই স্টুডেন্ট হিসেবে উপস্থিত থাকার সুবাদে আমিও খুব গর্বিত ।

৯ জুল, ২০১৩

ঘটি-বাঙালের কাজিয়া শুনে বড় হয়েছি যে...


-->

এহেন "আমি"র শিরা-উপশিরায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বাঙাল রক্ত ও বাকী পঞ্চাশ ভাগ ঘটি রক্ত বহমান । আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মা দুজনের বাংলাদেশের খুলনাজেলার সাতক্ষীরায় জন্ম । তাই এহেন "আমি" সেই অর্থে হাফ বাঙাল ও হাফ ঘটি । অন্তত: আমার শ্বশুরালায়ের মন্তব্য তাই । ইলিশ আর চিংড়ি দুইয়ের সাথেই আমার বড় দোস্তি । যেমন রাঁধতি পারি ঝরঝরে ভাত তেমন ভাজতি পারি ফুলকো ফুলকো নুচি। তবে ঘটির ওপর আমি পক্ষপাতদুষ্ট । কারণ রক্ত ।
উপাদেয় পোস্তর বড়ার স্বাদ পেতে আমাকে ছুটতে হয় বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার বন্ধুর বাড়িতে । আর নারকোল-বড়ি দেওয়া মোচার ঘন্ট খাবার জন্যে আমাকেই ছুটতে হয় রান্নাঘরে । আমাদের ঘটি বাড়ির হেঁশেল আবার একটু বেশি মিষ্টি তাই বেশির ভাগ রান্নাবান্নাই শর্করায় পুষ্ট । কুটিঘাটের মেয়ে আমার দিদিমা ছিলেন খাস ঘটিবাড়ির মেয়ে । বিয়ের পরদিন বাঙাল শ্বশুরবাড়ির রান্নায় চিনি ছড়িয়ে খেয়েছিলেন । তাই বোধহয় আমার ঠাকুরদাদার মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনেছি । সব ক্রিয়াপদে এলুম, গেলুম, খেলুম মার্কা কথা । আমাদের বন্ধুরা হেসে বলত এই এল হালুম-হুলুম করতে । কি আর করি ! জন্ম-দোষ যে!
স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুরা সকলে ভাত খেত আর আমরা খেতাম লুচি-পরোটা বা রুটি কিন্তু দুবেলা ভাত নৈব নৈব চ ! কি আর করে বন্ধুরা! ওদের মা ময়দার কাজে মোটেও পটু নন, ভাতের রকমারিতে পটু তাই ঘটির বৈকালিক জলযোগের ময়দা বুঝি ওদের কাছে অধরা ।
ওদের সেই চিতলামাছের মুইঠ্যা একবগ্গা মাছের এক্সোটিক ডিশ ফর গ্যাস্ট্রোনমিক তৃপ্তি । আর কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়া ইশে... সেই বাদলা দিলে কাদলা মাছের পাদলা ঝোল না খেয়ে কাতলার ক্রোকে, দৈ-মাছ, কোর্মা, মাছের পোলাও, মাছের কচুরী, চপ আরো কত বলব ! ঘটি হেঁশেলে শুঁটকি ফুটকির নো এন্ট্রি ! একবার বাঙাল-ঘটির কাজিয়ায় আমার ঠাকুর্দা তার এক বাঙাল বন্ধুকে বলেছিলেন "কচুরী আর রাধাবল্লভীতে যে বিস্তর ফারাক সেটাই জানোনা? আর কি করেই বা জানবে "ময়দার" ব্যাপারে তোমাদের তো হাঁটুতে খঞ্জনী বাজে। চাড্ডি ভাত চাপিয়েই খালাস তোমরা । জমিয়ে মিষ্টি মিষ্টি নাউ-চিংড়ি খাও মশাই। দেখবে মনের কাদা সাদা হয়ে গেছে । এট্টু চিনি ছড়িয়ে কড়াইয়ের ডাল আর ঝিঙেপোস্ত খাও । দিল খুশ হয়ে যাবে । মিষ্টি কথা কি এমনি কৈতে পারি? মিষ্টি মিষ্টি ব্যবহার কি এমনি পারি! সবের মূলে ঐ ঘেটো মিষ্টি"
বাজার গেছি একবার জ্যাঠামশাইয়ের হাত ধরে । সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছি তখন । পুলিশে কর্মরত জ্যাঠামশাই তাঁর চাঁচাছোলা ভাষায় গঙ্গার ঘাটে তাঁর এক পুরোণো সহপাঠীকে বলছেন :
"তোমরা হলে গিয়ে, ইশে "অরিজিনাল দেশি" তাই বলে আমরা এবরিজিনাল দেশি ন‌ই গো দাদা ! এট্টু ঘুসোচিংড়ির বড়া খেয়ে দ্যাখেন মশাই ! অথবা কষে চিনি দিয়ে ছোলারডাল আর ঐ আপনাগো "ময়দা" মানে আমাগো "নুচি" । চিল্লোতে পারিনা আমরা, আট ডেসিবেল কি সাধে ক্রস করিনা? ভেতরটা সত্যিসত্যি মিষ্টি হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে"
জ্যাঠামশাইকে আমরা জ্যাঠা বলতাম । খুব রসিক মানুষ ছিলেন । আর বাঙাল দেখলেই তাকে কচুকাটা করে দিতেন, কেন তা জানিনা। ওনার অফিসে একজন পেটরোগা কন্ষ্টেবল ছিল । প্রায়ই সে কাজে আসতে লেট করত । লোকটির পেটের ব্যারাম ছিল । সে জ্যাঠামশাইকে দেখলেই সেলাম করত ভয়ে ভয়ে আর তখুনি জ্যাঠা নিজের পেটটা বাজিয়ে তাকে বলত "প্যাটের ভিতর গেস হৈসে, চুয়া চুয়া ডেকুর মারে?"
একবার ওনার এক বাঙাল কনস্টেবলের ছেলে পরীক্ষায় পাশ না করে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পুলিশে বেয়ারার চাকরীর জন্য দরখাস্ত দিয়েছে । জ্যাঠামশাইকে আগেই তার বাবা বলে দিয়েছে "স্যার, আমার ছেলেটা সব লিখেছিল কিন্তু ইংরেজীটায় মোটে চোদ্দ পেয়ে গেল এবার, তাই আর পাশ করতে পারলনা"
সে ছেলেকে প্রশ্ন করার আগেই জ্যাঠা হাসতে হাসতে বলে বসল "কি ল্যাখসি জানিনা তবে চোদ্দ পাসি"
আরেকটা গল্প জ্যাঠা প্রায়ই বলতেন আমাদের । একজন কানহার জঙ্গলে বাঘ দেখে এসে ভয়ানক অত্যুক্তি করে বলছে । যত না বাঘ দেখেছে তার চেয়ে অতিরঞ্জিত তার বাঘের দৈর্ঘ্য । লোকটির গিন্নীও তার সঙ্গে গেছিল তাই সে প্রকৃত দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল । বারবার লোকটি অমন বাঘের গল্প শোনায় আর তার বৌ ভাবে এমন মিথ্যা বলে কেন তার স্বামী ! তারা তো ছোট্ট একটা বাঘের ল্যাজের দিকটা একটু দেখেও ঠিক মত দেখতে পায়নি , ভারি লজ্জা হত বৌটির । বৌ বলেছে দ্যাখো, এবার তুমি যখন তোমার বন্ধুদের ঐ গল্প আবার শোনাবে আমি পাশের ঘর থেকে জোরে জোরে কাশব আর তুমি তখন বাঘের সাইজটা কমাবে কিন্তু। লোকটি বলতে শুরু করেছে আট-দশ-বারো.. হাত যেই বলেছে তার বৌ কেশে উঠেছে । খুব কাশছে বৌটি । তখন লোকটি বলছে "গিন্নী, তুমি কাইস্যা কাইস্যা মৈরা গ্যালেও আমি দশ হাতের নীচে নামুম না "
এভাবেই আমি এলুম, দেখলুম, ছিলুম বলে । একবার জ্যাঠামশাইয়ের স্পেশাল ব্রাঞ্চের আপিস গেলুম, আমের সময় মিষ্টি আঁব খেলুম, হ্যান্ডলুম পরলুম ! এতে লজ্জার কিছু নেই । আমাদের রান্নার সোশ্যাইটি জুড়ে, হেঁশেলের ঝুলকালিতে শুধু একটাই কথা :

শুক্তো, ঘন্ট, ছ্যাঁচড়া, সাথে অম্বল আমড়া ।
চিনির রসে হাবুডুবু ঘটির প্রাণে খুশি
ঝাল-ঝাল-টক-টক-মেছো শুঁটকি বাসি ।
নাউ-নঙ্কা-নেবু-নুচি-নেপ-নাট্টু-নাটাই
বিঘা বিঘা ধানজমি আর তালদীঘিটা নাই।
রামদা নিয়ে, চোখ পাকিয়ে আসি নাকো তেড়ে
ঝগড়া করার জোর যে নাই লড়ব কেমন করে ?

১ জুল, ২০১৩

স্মৃতিরূপেণ-১


মামারবাড়ি দক্ষিণেশ্বরে মায়ের ডেলিভারি পেন উঠেছিল ।  তখন পৌষমাসের ঠান্ডায় মা নাকি দাপুটে ব্যাথায় ঘেমে নেয়ে সারা । পাড়াপড়শীর মতে ছেলে হওয়াটাই স্বাভাবিক । তবুও ছেলে হতে হতে মেয়ে । কি কুলুক্ষুণে জানিনা!

যাইহোক, উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের নার্সিংহোমে ঘুমবিছানার বেবিকটে  প্রথম আলো দেখা... প্রথম কান্নার সাথে হাতেখড়ি ।

সকলে মা'কে বলেছিল "প্রথম মেয়ে সন্তান হোলো"?

মা বলেছিল  "কেন? আমার বন্ধু হবে, রুটি বেলে দেবে, আর আমরা সিনেমা যাব একসাথে "

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা বঙ্কিমের "ইন্দিরা" পড়েছিলেন  । সেই থেকে ঐ নামের ওপর ভালোলাগা ।

তবুও ১৯৬৫ সালেও নাক সিঁটকোনো ভাবসাব বাড়ির সকলের । বাবা  কিন্তু সিস্টারদের বখশিস দিয়েছিলেন "মেয়ে" হবার খবরটা জানানোর জন্য ।

দিদা বলেছিল "আমাদের বাড়ির মত রং পেলনা"

মা বলেছিল "হীরের আংটি, আবার বেঁকা !  যেমন তেমন মেয়ে বিয়োবো, বয়সকালে গুণ দেখাবো"

কি গুণ যে মা দেখালেন জানিনা তবে আমার গ্রুমিংটা সম্পূর্ণ মায়ের জন্য সম্ভব হয়েছিল । আড়িয়াদহে গঙ্গার তীরে বাবাদের ভাগের বাড়িতে এসেছিলাম মুখেভাতের সময় । পাশে পুকুর, পেছনে ঘন সিংহি বন আর পুরোণো বাড়ির ফাটল থেকে উঁকিঝুঁকি দেওয়া তেঁতুলে বিছে । বাবা জমি কিনে বাড়ি করলেন  কিছুদূরে আলমবাজারে ।  বাড়িতেই আমার পড়াশোনা শুরু হল মায়ের কাছে । আর রোজ দুপুরে, রাতে শোয়ার আগে গল্প পড়ে শোনানো শুরু মায়ের । বাবা বলত যুদ্ধের গল্প, পশুপাখীর গল্প । মা পড়ে শোনাত রুশ দেশের উপকথা, উপেন্দ্রকিশোরের মহাভারতের গল্প । নিজে নিজে পড়তে শুরু করলাম কিছুপরে । পাঁচবছরের জন্মদিনে দাদু উপহার দিলেন "আবোলতাবোল" ।  বাবা দিলেন পুতুল । 

সুকুমার-সাহিত্য মজ্জাগত হতে হতে হাতে এল "ছোটদের বুক অফ নলেজ" । সে ব‌ই আমার চেয়েও ভারী । সেই ব‌ইকে বালিশে রেখে আমি বসতাম খাটে আর উল্টে যেতাম পাতাগুলো । হঠাত সেই পাতা উল্টোতে গিয়ে এসে পড়ল ইস্কুলবেলা । সাথে গানভাসি হল কৈশোর । 

স্কুলে ভর্তির আগেই মোটামুটি দ্বিতীয়শ্রেণীর পাঠ কমপ্লিট । মুখে মুখে আর লিখে লিখে । মফস্বলের নাম করা মেয়েদের স্কুল বরানগর রাজকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে সেই ভর্তি হওয়া পাঁচবছরে ক্লাস টু'তে । পুরোণো কোলকতার মেয়েদের স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম । প্রথম চালু হয়েছিল বিজ্ঞান শাখা । আর ছিল কেতাদুরস্ত ল্যাবরেটারি । লাইব্রেরীতেও ছিল বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার । ছিল খেলার মাঠ । একটা প্রকান্ড চেরী গাছ আর তার পাশে লিলিপুল । মাঠের একদিকে ছোটমোট গ্রিণ হাউস । অনামা সব ফুলেল ক্যাকটাস থাকত সেই গ্রিণহাউসে। স্কুলের দুটো গেট । একটা কেবল সকালে খুলত প্রাথমিক সেকশানের জন্য আর দুপুরে খুলত দুটোই  । দুই গেটের মাথায় জুঁইফুলগাছের আর্চ আর দুই গেট পেরিয়ে স্কুল অফিসে ঢোকার মুখে দুপাশে গোলাপের কেয়ারি । কি সুন্দর পরিবেশ !  রাজকুমারীদেবীরা ক্রিশ্চান ছিলেন ।   স্কুলের মধ্যে ছিল একটা সেমেটারি ।  সেমেটারীতে বসে টিফিন খেতাম আমরা ।

স্কুলের বাতাবরণ রবীন্দ্রগানে উদ্বুদ্ধ করেছিল । প্রতিবছর স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান আর বর্ষাশেষে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত ছিল বারোটা বছর ।

বাড়িতে হত ক্লাসিক্যাল গানের চর্চা । জ্যাঠামশাই ছিলেন বেতারশিল্পী, তারাপদ চক্রবর্তীর ছাত্র । মায়ের কাছে কীর্তনে নাড়া বেঁধে নেওয়া খুব ছোট বয়সে । মা ছিলেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্রী ।

গ্রীষ্মের   ছুটির পরেই  বৃক্ষরোপণ উত্সবের তোড়জোড়  । দস্তুর মত রিহার্সাল কমন রুমে । বনমহোত্সবের একটা স্ক্রিপট বছর বছর হয়ে আসছে । একটু রদ বদল করে কয়েকটা গান এদিক ওদিক করে নৃত্যনাট্য দাঁড় করানো হয়। সবুজ গাছ লাগানো হয় । খুব উত্সাহে মেয়েরা নাচ গান প্র্যাকটিস করে প্রতিবছর । অনুষ্ঠান শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গান 'আয় আমাদের অঙ্গনে, অতিথিবালক তরুদল ' দিয়ে আর শেষ হয় 'মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও, এ শূন্যে ওড়াও ওড়াও হে প্রবল প্রাণ' দিয়ে ।   প্রথম দৃশ্যে একদল মেয়ে নেচে নেচে মঞ্চে এসে প্রবেশ করে আর শেষ দৃশ্যে তারাই আবার প্রত্যেকে হাতে একটা করে সবুজ চারা গাছ নিয়ে  মঞ্চ থেকে নেমে এসে খোলা স্কুল মাঠের ধার দিয়ে নেচে নেচে চলে । গাইতে থাকে বাকি সকলে যারা এতক্ষণ ধরে গান পরিবেশন করছিল । নাচের মেয়েদের মেঘ রংয়ের শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায় । গানের মেয়েরা কচিকলাপাতা রঙের শাড়ি আর মেঘ নীল ব্লাউজে । আগে থেকে স্কুলের মালি যেখানে যেখানে নতুন গাছ পোঁতা হবে তার জন্য মাটি খুঁড়ে নির্দ্দিষ্ট ব্যাবধানে গর্ত করে রাখে । নাচের মেয়েরা  নাচ করতে করতে একে একে  গাছগুলি সেইখানে রেখে দেয় আর গানের মেয়েরা জলঝারি দিয়ে জল দান করে সেই নতুন গাছের চারায় ।  এভাবেই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ।

 

৫ মে, ২০১৩

অক্ষয় তৃতীয়া


বৈশাখমাসের ব্রত/ বর্ধমান সমাচার   

বৈদিক মতে বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিটি বিশেষ শুভ।  এর নাম অক্ষয় তৃতীয়া।কোনও শুভারম্ভের দিন হিসেবে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অক্ষয় শব্দটির অর্থ হল যার কোনও ক্ষয় নেই অর্থাৎ চিরস্থায়ী। এই তিথিতে কোনও কাজে হাত দিলে তার শুভ ফল অনন্ত কাল ধরে চলতে থাকে। কারও মতে বেদব্যাস এই দিনে মহাভারত লেখায় হাত দেন। কেউ বলেন শ্রী কৃষ্ণ এইদিনে দরিদ্র বন্ধু সুদামা ও দ্রৌপদীকে অক্ষয়পত্র হাতে তুলে দিয়ে ধনসম্পদে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। 


মহাভারতে আছে সূর্যদেব এইদিনে পাণ্ডবদের অক্ষয় পাত্র দান করেছিলেন। অক্ষয় পাত্র এমনি এক মন্ত্রপূত পবিত্র পাত্র যা ঘরে থাকলে কোনোদিন অন্নাভাব হয়না। 

এই দিন বর্ধমান সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্মী নারায়ণ এবং কুবেরের পুজো হয়।মানুষের অগাধ বিশ্বাস এই তিথির ওপর। শুভ মহরত বা সর্ব সিদ্ধ মহরত হবে এই আশায়। কারও হয় সেদিন দোকানের হালখাতা খোলা। 
পুরাণে বলে সত্য এবং ত্রেতা যুগের সূচনা হয়েছিল এই তিথিতে। জৈনদের মতে এই দিন আখের রস খেয়ে তাঁর এক বছরের উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন তীর্থঙ্কর ঋষভ। স্বর্গের দেবতা ধনপতি কুবের এই দিন তার হৃতসম্পদ ফিরে পেয়েছিলেন। 

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির একবার  মহামুনি শতানিককে অক্ষয় তৃতীয়া তিথির মাহাত্ম্য কীর্তন করতে বললেন ।
শতানিক বললেন পুরাকালে খুব ক্রোধসর্বস্ব, নিষ্ঠুর এক ব্রাহ্মণ ছিলেন । ধর্মকর্মে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলনা । একদিন এক দরিদ্র ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ তার নিকট অন্ন এবং জল ভিক্ষা চাইলেন । রণচন্ডী হয়ে ব্রাহ্মণ কর্কশ স্বরে তাঁর দুয়ার থেকে ভিখারীকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন  আর বললেন যে অন্যত্র ভিক্ষার চেষ্টা করতে ।
ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর ভিখারী চলে যেতে উদ্যত হল ।
ব্রাহ্মণ পত্নী সুশীলা অতিথির অবমাননা দেখতে না পেরে  দ্রুত স্বামীর নিকট উপস্থিত হয়ে ভরদুপুরে অতিথি সত্কার না হলে সংসারের অমঙ্গল হবে এবং গৃহের ধন সমৃদ্ধি লোপ পাবে, একথা জানালেন ।  
স্বামীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে  ভিখারীকে তিনি ডাক দিলেন এবং ভিখারীর অন্যত্র যাবার প্রয়োজন নেই সে কথা জানালেন । সুশীলা ত্রস্তপদে তার জন্য অন্নজল আনবার ব্যবস্থা করলেন । কিছুপরেই তিনি অতিথি ভিক্ষুকের সামনে সুশীতল জল এবং অন্ন-ব্যঞ্জন  নিয়ে হাজির হলেন । ভিখারী বামুন অতীব সন্তুষ্ট হলেন এবং সে যাত্রায় সুশীলাকে আশীর্বাদ করে সেই অন্নজল দানকে অক্ষয় দান বলে অভিহিত করে চলে গেলেন ।
বহুবছর পর সেই উগ্রচন্ড  ব্রাহ্মণের অন্তিমকাল উপস্থিত হল । যমদূতেরা এসে তার শিয়রে হাজির ।  ব্রাহ্মণের দেহপিঞ্জর ছেড়ে তার প্রাণবায়ু বের হ'ল বলে। তার শেষের সেই ভয়ঙ্কর সময় উপস্থিত । ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তার কন্ঠ ও তালু শুকিয়ে গেল । তার ওপর যমদূতেদের কঠোর অত্যাচার । ব্রাহ্মণ তাদের কাছে দুফোঁটা জল চাইল এবং তাকে সে যাত্রায় উদ্ধার করতে বলল ।
 যমদূতেরা তখন একহাত নিল ব্রাহ্মণের ওপর ।
তারা বলল " মনে নেই ? তুমি তোমার গৃহ থেকে অতিথি ভিখারীকে নির্জ্জলা বিদেয় করেছিলে ?"
বলতে বলতে তারা ব্রাহ্মণকে টানতে টানতে ধর্মরাজের কাছে নিয়ে গেল ।

ধর্মরাজ ব্রাহ্মণের দিকে তাকিয়ে বললেন " এঁকে কেন আমার কাছে এনেছ্? ইনি  মহা পুণ্যবান ব্যক্তি । বৈশাখমাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে এনার পত্নী তৃষ্ণার্ত অতিথিকে অন্নজল দান করেছেন ।  এই দান অক্ষয় দান ।   
সেই পুণ্যে ইনি পুণ্যাত্মা । আর সেই পুণ্যফলে এনার নরক গমন হবেনা । ব্রাহ্মণকে তোমরা জল দাও । এনার প্রাণবায়ু নির্গত হতে দাও । শীঘ্রই ইনি স্বর্গে গমন করবেন "এমনও হত সেই পিতৃতান্ত্রিক যুগে? সতীর পুণ্যে পতির পুণ্যলাভ। 
আমাদের ঘটি বাড়ীতে দেখেছি অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে কালো সরষে জলে ধুয়ে তা শুকিয়ে নিয়ে শুকনো বাটতে। সদ্য ওঠা কাঁচা আম ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন হলুদ মাখিয়ে রোদে দিতে। তারপর কাঁচের শিশিতে ভরে নেওয়া হত সেই জারানো আম, সরষে গুঁড়ো, তেঁতুলের ক্বাথ, চিনি আর সর্ষের তেল । দিন কয়েক রোদে ফেলে রাখলেই তৈরী হত আম কাসুন্দি। চলতি কথায় বলে আমের কাসন। 

২৮ এপ্রি, ২০১৩

ইহারা জাদু জানে ! কিন্তু শেষরক্ষা করিতে জানেনা ।


এ বি সি ডি গ্রুপ..... ইত্যাদি নানা নামের স্বল্প আমানত প্রকল্পে যোজনা করিবার আহ্বান  আসিল । গ্রামে গঞ্জে, শহরে, মফস্বলে স্বাক্ষর মেয়েদের কাজে লাগানো হ‌ইল ঘরদুয়ার হ‌ইতে মাসিক কিস্তি আদায় করিবার উদ্দেশ্যে । তাহারা আপিস খুলিয়াছে কলিকাতার একপ্রান্তে আর এজেন্ট যাইতেছে আরেকপ্রান্তে । কোম্পানির হাবভাব, বিনিয়োগের পলিসি, সুদের হার, টাকা লগ্নী করিবার নিয়ম ইত্যাদি সম্বন্ধে পাখীপড়া করিয়া পাঠানো হ‌ইতেছে । স্বল্প শিক্ষিত শহুরে এজেন্ট ঘর গেরস্থালীর সামাল দিয়া পান চিবাইতে চিবাইতে ব্যাগ বগলে ল‌ইয়া বস্তিবাসীদিগের উন্নয়নে তার কোম্পানির ভূমিকা হ‌ইতে শুরু করিয়া কত টাকা কয় বত্সরে দ্বিগুণ বা চতুর্গুণ হ‌ইবে অবধি জ্ঞান দিয়া মগজ ধোলাই করিতেছে ।
এ বি সি ডি ইত্যাদি গ্রুপের নামকরণের জন্য অভিধানের বিপুল ভান্ডারে সর্বক্ষণ নানাবিধ আর এন্ড ডি চলিতেছে । কোন্‌ নামেতে বাঙালীমন চট করিয়া টুপি পরিবে কিম্বা কোন্‌ নামের প্রলোভনে পড়িয়া এজেন্টের কথার চিঁড়ে অচিরেই ভিজিবে তাহাই গবেষণার বিষয় । আর করিবে নাই বা কেন ? উহাদের নিজ নিজ ক্যাচ লাইনেও চমক রহিয়াছে । কেহ আস্থার যোগান দেয় । কেহ ভরসা দেবার প্রতিশ্রুতি অথবা আজীবন সাথে থাকার অঙ্গীকার। এতসব বিচার করিয়া কাহার সথিত যাইবেন আমজনতা? কাহার উপর ভরসা করিয়া তাহার হার্ড আর্নড মানি গচ্ছিত রাখিবেন ?
উহারা কৃষিজ দ্রব্য হ‌ইতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা হ‌ইতে ভ্রমণ, সংবাদপত্র প্রকাশনা হ‌ইতে টেলিভিশন চ্যানেল, ফিশারি হ‌ইতে জুয়েলারি, বাতের ওষুধ হ‌ইতে জন্মনিরোধন, সিমেন্ট হ‌ইতে ঝরণার জল সবকিছুই দশভুজার মত মেলিয়া ধরিয়াছেন । যৌবনকে ধরিয়া রাখিবার তথা হৃত যৌবন পুনরুদ্ধার করিবার ক্ষমতা রাখে তাহাদের ঔষধ । উহারা পারে না এমন কিছুই নাই । ইকোপার্ক হ‌ইতে হসপিটাল গড়িতে পারে । সূর্যরশ্মিকে কাজে লাগাইতে পারে । লাভ-লোকসান পরের কথা । উহাদের বিজ্ঞাপনের জৌলুসে টিভি চ্যানেলের কুশীলবের চাকচিক্য নিষ্প্রভ হ‌ইয়া পড়িতেছে ।
সাধারণ মানুষ বলিতেছে হাওয়া পরিবর্তন হ‌ইল বটে! সকালবেলায় পথপার্শ্বে কত সংবাদ! কত রঙীন সংবাদপত্রের বিকিকিনি! দোকানে বাজারে নূতন নূতন এগ্রো কোম্পানির চাল, ডাল, আটা, ময়দা, সুজি, বেসন হ‌ইতে শুরু করিয়া মশলাপাতি, পাঁপড় এমন কি ইসবগুল পর্যন্ত থরে থরে সাজানো ! টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিতেছেন । অতএব টাকা লগ্নী করাটা গৃহস্থের পক্ষে কতটাই নিরাপদ! উহারা ভ্রমণ পিপাসু বাঙালীর জন্য বিলাসবহুল হোটেল খুলিয়াছেন । পেলিং হ‌ইতে পুরী, দীঘা হ‌ইতে দার্জিলিং যাইবার জন্য কত সুবন্দোবস্ত করিতেছেন ! ভ্রমণের সাথী স্বরূপ খাঁটি ঝরণার প্রাকৃতিক জল এবং প্রয়োজনীয় ঔষুধপালাও সরবরাহ করিতেছেন ।
কে বলিল বদলের বাঙ্গলায় শিল্প নাই! আবালবৃদ্ধবণিতার কর্ম সংস্থান হ‌ইতেছে এই "কালেকশানের" কৃপায় । যে মানুষগুলো প্রতিনিয়ত খাটিয়া খান তাঁদের কষ্টের অর্থ আলবাত বিনিয়োগ হ‌ইতেছে ঐ এ বি সি ডি ইত্যাদি কোম্পানিতে ! আর তাহারা ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঘাম ফেলিয়া আরো আরো এমন অর্থ আনিয়া কোম্পানির ভান্ডারে ফেলিতেছেন । দেশের মানুষের টাকা দেশের অভ্যন্তরেই ঘুরপাক খাইতে লাগিল । তাহার পর কোম্পানির লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাইল কি চাটিয়াই ছাড়িয়া দিল তা জানিবার প্রয়োজন নেই আমাদের ।
আমরা বাঙলার তাঁতী, তাঁত বুনিয়া খাই । আমার আত্মীয়ের মেধাবীছাত্র অন্যরাজে চাকরী ল‌ইল। আমার বন্ধুর পুত্র বিদেশে পাড়ি দিল । রিয়েল এষ্টেট হ‌ইতে সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল সব‌ই তো হ‌ইল কিন্তু পরিষেবা কিনিবে কে? যে প্রজন্মের ভোগ করিবার কথা তাহারাই পাততাড়ি গুটাইল বিদেশে ।
তাহা হ‌ইলে এত সংবাদপত্র পড়িবেই বা কে? এত শত কৃষিজ সামগ্রী কিনিবেই বা কে? বত্সরান্তে ভ্রমণে আকুল হ‌ইয়া পেলিং কিম্বা পুরী যাইয়া বিলাসবহুল হোটেলে রাত্রিযাপন করিবেই বা কে ?
পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে মাখিবার জন্য পড়িয়া রহিলেন কেবলি বরিষ্ঠ নরনারী । বঙ্গ আমার পরিণত হ‌ইল জেরিয়াট্রিক মহানগরে ।
তাঁহাদের চোখে ছানি । বাইফোকাল উঁচুনীচু করিয়া সংবাদপত্র পড়িতে হয় । কাজেই উপরোক্ত সংবাদপত্রের লেখক বেশী, পাঠক কম ।
তাঁহাদের ক্ষুধামান্দ্য । তাঁহারা স্বল্পাহারী । বাজারের অতসব কৃষিজ দ্রব্য খাইবার শক্তি নাই ।
তাঁহাদের একাকী ভ্রমণ করিবার শক্তি নাই অতএব বিলাসবহুল হোটেল তাঁহাদের কাছে অধরা ।
সুপার-স্পেশালিটি হসপিটাল তাঁদের কাজে আসিলেও আসিতে পারে কিন্তু ল‌ইয়া যাইবে কে ? দেখিবার কেহ নাই । পুত্রকন্যা বিদেশে । আর অত ব্যয়বহুল চিকিত্সার ভার বহন করিবার ক্ষমতাও তাঁহাদের নাই ।
উহাদের টিভি চ্যানেলের বকবকম শোনেন কেবল উহারাই । বৃদ্ধ মানুষগুলি কানেও ভালো শোনেন না আজকাল । অতএব চ্যানেলের কূটকচালি, নৃত্যগীতবাদ্যশৈলী মুষ্টিমেয় দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ র‌হিল ।
তাহারা একটা কাজ ভুলিয়াও করেন না । সেটি হ‌ইল সকল আমানতকারীর মাথার উপর যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা সেবি আছেন এবং সর্বাগ্রে তাহাদের পারমিশান ল‌ইতে হয় সেটি এ বি সি ডি প্রভূত কোম্পানিরা অনায়াসে এড়াইয়া যান । এর ফলে সাধারণ মানুষ যে তাহাদের অর্থ ফেরত পাইবেন সেরূপ কোনো আশ্বাস দিবার সম্ভাবনাও নাই ।
তাহারা জন্মাইল। জয় করিল । আর অচিরেই পলাইল । আমরা ভাবিলাম উন্নয়নের জোয়ার আসিল বুঝি । কিন্তু সে জোয়ার তো সুনামির ন্যায় ভাসাইয়া দিল কত মানুষের স্বপ্ন ।
তিন দশক পূর্বে এমন ঘটনা ঘটিয়াছিল । কিন্তু বাঙালী ভুলিয়া গেল । সেই ট্র্যাডিশান ফিরিয়া আসিল ।
বলিতে ইচ্ছা হয় : 
ইহারা জাদু জানে !  কিন্তু শেষরক্ষা করিতে জানেনা । 
অথবা
টাকা ল‌ইতে পারি কথার মারপ্যাঁচে কিন্তু ফিরাইতে পারিনা ।  
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে, রাজনৈতিক দলাদলিকে দোষারোপ না করিয়াই বলি বাঙালী কি ঘুমাইয়াই থাকিবে ? কে বলিয়াছে তাহাদের এত দুঃখ সহিতে? 

২৭ মার্চ, ২০১৩

দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান !








মাদের দোল ছিল কিছুটা অন্যরকম । শহুরে দোল যেমন হয় । আগের দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম ন্যাড়াপোড়ার আয়োজন । ফাঁকা মাঠ থাকলেই শুকনো গাছপালা কেটে "যাক্‌ পুরাতন স্মৃতি, যাক্‌ ভুলে যাওয়া গীতি"  নতুন বর্ষবরণের আগে ধুয়েমুছে পুরোণো জঞ্জাল সাফ !
সূর্য্যিডোবার আগেই রেডি পাড়ার কচিকাঁচারা । তারপর ঝুপ করে সন্ধ্যে নামলেই আমরা বারান্দায় লাইন করে । কোন্‌ পাড়ার ন্যাড়াপোড়ার আগুণের লেলিহান শিখা কতদূর গিয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই ! বিখ্যাত সেই প্রাক্‌ দোলযাত্রার ট্যাগলাইন...
 "আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠবে বল হরিবোল! এ যেন ন্যাড়াপোড়ার রিয়েলিটি শো ! এখন অবিশ্যি না হওয়াই ভালো । নেই খালি মাঠঘাট, পলিথিনিক পথঘাট । পর্যাপ্ত প্লাসটিক পূর্ণ পরিবেশে ন্যাড়াপোড়া নৈব নৈব চ!
অতএব কচিকাঁচা-সবুজ অবুঝ সকলেই মজিনু নীল সেই একফুটের স্ক্রিণে, ভুলিনু ন্যাড়াপোড়া, খেলিনু ক্রুদ্ধ পক্ষী অথবা আপডেটিনু মুখব‌ই দেওয়াল ।
পরদিন সত্যনারায়ণের পায়ে ঢিপ করে পেন্নাম করে আবীর দিয়ে পিচকিরী, বালতি ভরে রঙের গোলা আর বারান্দা দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে রং ভর্তি বেলুন মারা ! আর কারোকে না পাও তো সাদা ধোপ দুরস্ত ফতুয়া পরা বাজার অভিমুখী বাবা, দাদাকেই দাও রং কিম্বা বেচারা কাজের মাসীকে একেবারে চুবিয়ে দাও রঙে । আর সাথে অবিরত মুখ চালানো । ঠাকুর ঘর থেকে ঠাম্মার পুজো করা ফুট কড়াই মুড়কির চূড়ো ক্রমশঃ নিম্নগামী হতে থাকে । হাতে রঙীন মঠ । তখন কেউ ফতোয়া জারিও করেনি মঠের রঙের ওপর । লাল মঠে এলিজারিন, হলুদে মেটানিল..এটা খেওনা, সেটা কোরোনা !

ক্রমে যখন স্কুল পেরিয়ে কলেজগেট, তখন দোল বেশ সিরিয়াস অনার্সের চাপে । তবে দোল ছিল প্রকৃত দোলের মতন । অন্যরকমের মাদকতা আর একটা বিশেষ ছুটির দিনে দোলকে দোলের মত করে পাওয়া ।
তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল ফোন অথবা হাজারো কেবল চ্যানেল । অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকি ! তবে মায়ের হাতে স্পেশ্যাল রান্না ছিল সেদিনের মুখ্য আকর্ষণ । সকালে পোলাও-মাংস কিম্বা রাতে লুচি আলুরদম ছিল দোলের স্পেশ্যালিটি কুইজিন ।
কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটির একলাফে ট্রানজিশান যেন গ্রাউন্ড লেভেল থেকে এক্সাইটেড স্টেটে ফার্স্ট ঝাঁপিয়ে পড়া । কো-এড বাতাবরণ । রঙীন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দ । হেদোর মোড়ে ফুচকা তদ্দিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে । বিধানসরণীর চাচার রোল তখন রাজাবাজারে ঊত্তীর্ণ । সেবার প্রচুর ফাগ খেলা হল একপাল ছেলে মেয়েতে মিলে । সেই প্রথম ছেলে বন্ধুদের সাথে দোল খেলে লালটুকটুকে হয়ে লজ্জায় সবুজ হয়ে মিনিবাসে বাড়ি ফেরা । তবুও আনন্দ আকাশে বাতাসে । কারণ মম যৌবন নিকুঞ্জে তখন পাখিডাকার শুরু হয়ে গেছে । মা বরং খুশিই হলেন । এই তো জগতের নিয়ম । প্রকৃতির গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে । আমগাছে মুকুল আসবে । বাদাম গাছের পাতা ঝরে গিয়ে লাল ফুল সর্বস্ব গাছ হবে এই তো বসন্তের নিয়ম ! মায়ের একরত্তি মেয়েটা কেমন বড়ো হয়ে গেল!
তখন বসন্তে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পাসপোর্ট যেন পাওয়া হয়েই যেত সরস্বতী পুজোতে । তারপরেই দোল । অতএব সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা পেয়ে গেছি । তাই সব কিছুতেই মায়ের সায় ।
লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু হতে না হতেই বিরহিনী যক্ষের মত দোল রঙীন হত নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু পাঠিয়ে সাগরপারে ।
কারণ  তখনো হিমেল বসন্তে ইমেল নেই । দোলের দিনে নীলখামে আর্চিস গ্যালারির একটুকরো চিরকূটের নীরব প্রতীক্ষা । বুক ফেটে যায় তো মুখ ফোটেনা । উদাসিনী বেশে বিরহিনী আমি দোলে পেলাম অপ্রত্যাশিত ভালোবাসার সেই নীল খাম । তারপর একে একে গায়েহলুদ, সপ্তপদী ও দোলের গালের লাল রং উঠল সিঁথিতে ।

এখন ফাগুনের ফুল ঝরতে না ঝরতেই চকোলেট-ডে, প্রোপোজ ডে, হাগ-ডে, কিসিং-ডে, ভ্যালেন্টাইনস-ডে পেরিয়ে দোল দে । দোলের আবীরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায় । দোলের রঙের গড়িয়ে পড়তে লাগল অর্কুট অলিন্দ দিয়ে । সেই রঙ গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে ।

এখন দোলের রঙের ওপরেও টেকশো ! রূপ সচেতন বঙ্গতনয়ারা স্কিনফ্রেন্ডলি রং চায় ! ইকোফ্রেন্ডলি আবীর, ভেষজ গুলালে ফ্যাশন ইন ! তাই ডিজিটাল দোল খেলো বাবা!  নো হ্যাপা !  আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না, রং খেলবোনা ! 

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে ! দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । দোলখেলার প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । এখন দোলখেলার বাতাস সোশ্যালনেটওয়ার্ক ময়তায় । ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলখেলা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই দোলখেলা । দোলের রং ঝরছে সর্বত্র । ফাগ উড়ছে অনাবিল আনন্দে ।

সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে বসন্তের দোলখেলার সকাল এসে পড়ে ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো দোলের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় দোলের । মনের মানুষটির হাতের মুঠোয় দোলের ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।
দোলের উপহারের তালিকায়  আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী । দোলের কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে দোল আছে দোলেতেই । একটু অন্য আঙ্গিকে ।  
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । দোলের দিনেও সেই হ্যাঙ আউট । শুধু বসন্ত কেবিন এখন বাসন্তী নীল ফেসবুকের কফিহাউস কিম্বা ডিজিটাল ঠান্ডাই শরবতি মেসেজ আদানপ্রদানে, আমাদের সাথে রঙবাজি করতে । আমরা দোলবাজি করি অন্যভাবে । কিছুটা ফেসবুকি দলবাজিতে অথবা ব্লগবাজির ঠেকে । দোলের সেই আনন্দ আর পাইনা খুঁজে । ফুটকড়াই মুড়কি মঠ হারিয়ে গেল । দোলের আটপৌরে আভিজাত্য হারিয়ে গেল ।স্মার্ট হোল দোলবাজি । দোলা লাগল ফেসবুক-বনে কিন্তু দোলের রং লাগল না মনে । দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হল !

মক্‌টেল থেকে চকোলেট, কফি থেকে কেক, সোনা থেকে জাঙ্ক সর্বত্র হিয়ার মাঝে লুকোনো হ্যাপি হোলি! হোলির ধামাক, হোলি বাম্পার, হোলি হ্যায় !
শপিং মলে, মেট্রোরেলে, সুইমিংপুলে, তন্ত্রেমন্ত্রে হোলি হ্যায়
 
সেই কবে কবি বলেছিলেন ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত ! তারা পলাশ চিনুক না চিনুক আজ কিন্তু ভালোবাসার দোলের দিন আগতপ্রায় । দোলের রঙ লাগতে না লাগতেই ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করতে হবে... মন্দারমণির বালুকাবেলায় লিখিনু সে লিপিখানি প্রিয়তমারে । ঐ কূলে আমি আর এই কূলে তুমি মাঝখানে একরাশ ডিজিটাল ঢেউ বয়ে যায়

১২ মার্চ, ২০১৩

স্মৃতিরূপেণ

বলো তো! আমারা আবার স্মৃতি! কয়জনা যে পড়বে তা অজানা ।  তবুও লিখতে চাই ! ভাবতেও চাই পুরোণো কথাগুলো। ভাগ্যি সাথে ছিল আদরের নৌকা । আপাতত সেখানেই ভেসে চলুক আমার স্মৃতিকণারা ।   যদি তোমাদের ঘুম ভাঙে তোমরাও ভাসতে পারো স্মৃতির ভেলায় আমার সাথে অথবা নিজের সাথে ।   শুরু হল আমার কথা আদরের ব্লগে । 

২৯ জানু, ২০১৩

ব‌ইমেলা উত্সব

খুলে ফেল ব্রাউসার, ই-বুকের বান্ডিল পড়ে ফেল ঝটাপট, যদি থাকে কিন্ডল
ব‌ইমেলা, মেলাব‌ই, ফ্যাশানের মোচ্ছব ! মানুষের ঢল সেথা, শীতের ঐ উত্সব ।
এদিকে কৈছে তাঁরা গাছফাছ কেটোনা, অথচ ছাপিয়ে বৈ কিন্ডল কিনোনা ।
তাহলে তো পরিবেশ এমনিই দূষিত, ডিজিটাল বৈমেলা হয়ে যাক ত্বরিত!
নামীদামী ম্যাগাজিন অনলাইন সস্তা,বাড়িতে রাখতে জ্বালা, ভরে যায় বস্তা ।
News Week উঠে গেল বন্ধু তুমি জানো? অনলাইন পড় তাই ফেলে রাখো কেনো?


ছোট্টবেলা থেকে ছেলেমেয়েদের হাতে ব‌ই তুলে দেওয়ার থেকে ভালো উপহার আর কিছুই নেই । বুড়ো মানুষদের হাতে করে কাশীরামদাসের মহাভারত, কৃত্তিবাসী রামায়ণ কিম্বা কথামৃতের মত ব‌ই এর কথকতা শোনার মত ভালো অভিজ্ঞতা আর কিছুতেই হয়না । ব‌ইমেলায় ঘুরে ঘুরে দুষ্প্রাপ্য কিছু ব‌ই খুঁজে খুঁজে কিনতে খুব ভালোবাসি কিন্তু এত এত নতুন নতুন গল্প-কবিতার ব‌ই বাজারে সেগুলির পাঠক অপ্রতুল । ব‌ইপ্রকাশের ব্যাপারেও অর্থনৈতিক মন্দার কথা জানলাম এবারের দেশ পত্রিকা পড়ে । নতুন লেখক লেখিকার প্রতি কোনো রকম অসম্মান না করেই বলছি তারা আরেকটু কেন ইকোফ্রেন্ডলি এটিট্যুড নিয়ে অনলাইন ইবুক প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না । আর সর্বোপরি যে রাজ্যে শিল্পের হাহাকার, বেকারত্বের চিতকার এখনো সেখানে এত ধুমধাম করে ব‌ইমেলা না করে অনলাইন ব‌ই পড়ানোর ওয়ার্কশপ কিম্বা ওয়েব পত্রিকার প্রোমাশান করলে ভালো হত । রাজ্যের টাকা ঘুরে ফিরে রাজ্যেই আসছে । beyond border গেলে ভালো হত না কি ? নতুন লেখকদের ব‌ই মানুষ অনলাইন পড়ুক বিনিপয়সায় নয় ।মাত্র ১ টাকা করে দিক তারা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে । এতে লেখক অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবেন । আর প্রকাশনার খরচও সামান্য সেখানে । তাই লেখকের হারাবার কিছু নেই । তাই বলে আমি যদি এখন ব‌ই প্রকাশ করি তবে আমাকে অনেকে গাল দেবেন কিন্তু আমার পাঠককুলের একাংশ বরিষ্ঠ মানুষেরা যাদের হাতে ব‌ই তুলে না দিলে তাঁদের প্রতি আমার ঋণ থেকে যাবে চিরকালের মত । তাই প্রিন্ট অন ডিমান্ড এর পথ বেছে নেওয়াই মঙ্গলকর । একসাথে পাবলিশারের মাধ্যমে ৪০০ কপি ব‌ই না ছেপে যখন যেমন দরকার ( মাত্র ১টিব‌ই ও ছাপা যায় )তেমন ছেপে নাও । এতে লেখকের পকেট বাঁচে.. এমন অনলাইন সার্ভিস আছে বাজারে । দেশের অরণ্যমেধ যজ্ঞের বিরুদ্ধে এও আমার এক নীরব প্রতিবাদ ।
ব‌ইমেলা রমরমিয়ে চলছে খুব জাঁকজমক করে । আমিও যাই প্রতিবার, জানিনা এবার হবে কিনা । তবে এখন প্রচুর ডিসকাউন্টে অনলাইন ব‌ইপত্র কেনাকাটি করা আর ই-বুক পড়া এবং সর্বোপরি নামীদামী ম্যাগাজিন অতি সস্তায় সাবস্ক্রাইব করার এত সুযোগ তাই মনে হয় পরিবর্তন এল বলে । তবে প্রিন্ট ম্যাগাজিন বা ব‌ইয়ের চাহিদা থাকবে কিছু মানুষের জন্য যাঁরা কিন্ডল হাতে নিয়ে পড়তে পারেননা বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বেশিক্ষণ বসতে পারেন না । শুনছিলাম " News Week" ম্যাগাজিন প্রিন্ট এডিশান বন্ধ করে দিয়েছে কিন্তু অনলাইন ভার্সান আরামে পড়া যাচ্ছে । তাই মন দিয়ে ব্লগ লিখে চলেছি শীতের দুপুরবেলায়, একটু একটু করে সাহস করে ব্লগ লিখে চলেছি ২০০৭ থেকে এই ভরসায় । দেশের অরণ্য-নিধন যজ্ঞের বিরুদ্ধে এও এক লড়াই আমার । 

 এবারেই পড়লাম দেশ পত্রিকাতে :

"মুদ্রিত ব‌ইয়ের বিক্রি ক্রমশঃই নিম্নগামী । কাগজ-কালি গন্ধ থেকে অনেকটাই দূরে এখন "গ্রন্থের" অবস্থান । ই-বুক একটু একটু করে দখল করে নিচ্ছে বাজার । বিশ্বের নামী প্রকাশকরাও কমিয়ে দিচ্ছেন মুদ্রণ সংখ্যা । লেখকদের পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক দিতে ও তারা দ্বিধান্বিত । তাই স্বয়ং লেখকরাই ছাপাচ্ছেন নিজেদের ব‌ই । তবে এ পন্থা চটজলদি কোনো সমাধানের পথ যে দেখাচ্ছে তেমনটা নয় । পূর্ণ সময়ের লেখক - এই বৃত্তিও ক্রমক্ষীয়মান । পাশাপাশি আর-এক আশঙ্কা , লোকজন এবারও ব‌ইমেলায় ভীড় করবেন বটে , কিন্তু ব‌ই কিনবেন তো ? সব মিলিয়ে মুদ্রণ জগতহয়ত এখন প্রমাদই গুনছে"
দেশ পত্রিকা, ১৭ই জানুয়ারি ২০১৩, "ঘরে-বাইরে" কলম


 শেষ ৮০র দশকে আমার যখন কলেজ বেলা তখন ব‌ইমেলা বাধ্যতামূলক ছিল । কারণ সব অনার্সের ব‌ই লাইব্রেরীতে পাওয়া যেতনা আর কিছু দুস্প্রাপ্য বিদেশী লেখকের টেক্সট ব‌ই সস্তায় পাব সেই আশায়, আর সাথে বন্ধুবান্ধবের জন্মদিনের উপহারে দিতে হবে সারাবছর ধরে , ছোট ভাইয়ের জন্য ছবির ব‌ই, মায়ের জন্য অমনিবাস । চলে আসছি, আবার মনে পড়ে গেল ঠাকুমার জন্য কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতের জন্য বাবা খোঁজ নিতে বলেছিলেন ।  আবার বেরিয়ে আসব তখন মনে পড়ল দিদিমা বলেছিলেন কার যেন লেখা শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত পুঁথি শতছিন্ন হলেও যেন নিয়ে আসি কিনে । ব‌ই কেনা, নাড়াচাড়া, সব করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খাওয়া দাওয়া সেরে ধূলো খেতে খেতে বাসে গিয়ে ওঠা ।
বিয়ের পর ব‌ইমেলা গিয়ে খোঁজ হল মাটিতে বসা তরুণ আর্টিস্টদের কাছ থেকে অরিজিনাল পেন্টিং কেনা আর কালীঘাট পটচিত্র, যামিনী রায় , নন্দলাল বসু, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামী ছবির পোষ্টার সংগ্রহ করা । ঘর সাজাতে হবে । নতুন ঘরবাঁধার জন্য  ব‌ইমেলা  । আরো কিছু টেরাকোটা শিল্পীর কাছ থেকে গিফট আইটেম কেনা  ( তখন অন্যসময় এত সব টেরাকোটা পাওয়া যেত না )  ।
৯০ শুরুতে পুত্রকে নিয়ে হাতে ব‌ই তুলে দিতে হবে । ব‌ইপড়ার অভ্যাস করাতেই হবে । কিন্তু তা তো ইংরেজী ব‌ই । বাংলা উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়, শরদিন্দু তো আমি পড়ে বাড়িতে তাকে শোনাই । তার এক একবার এক একটা সিরিজ চাই । কোনো বার ফেমাস ফাইভ, কোনো বার সিকরেট সেভেন্, কোনো বার নডি ...তারপর এল পুরো টিনটিন, এস্ট্রিকস...  
ততদিনে বাড়ি সিলিকন-চিপময়তায় আচ্ছন্ন ।  কিন্তু ছেলে নাছোড়বান্দা । তার একহাতে চাই ব‌ই অন্যহাতে চাই গেমসিডি ।   সিডিও জায়গা করে নিল কোলকাতা ব‌ইমেলায় ।  মিলতে লাগল ফেলুদা, টেনিদা, ঘনাদার অনুবাদও ।   এ প্রজন্ম বাংলা পড়বেনা  । কিন্তু আমার ছেলের কৈশোর যে অধরা থেকে যাবে তাই অনুবাদই স‌ই ।  তখনো কোলকাতার ক্ষুধার রাজ্য সুপ্ত শিল্পীসত্তায় জেগে রয়েছে । কিন্তু ডিজিটালি । অর্কুটময় গদ্যে, ফেসবুকময় কবিতায়, ট্যুইটারময় সনেটে । যন্ত্রজালে জায়গা করে নিয়েছে কত কত উদ্বাস্তু ব্লগবসতি । দুইবাংলার পাবলিক এখন পড়ে কম, লেখে বেশী ।
এখন ব‌ইকেনার চেয়ে স্বরচিত ব‌ইপ্রকাশের পাবলিসিটিতে আত্মহারা তারা । ব‌ইমেলায় হারিয়ে যাচ্ছে শরদিন্দু, সুনীল শক্তিরা । নবপ্রজন্মের কাছে হ্যারিপটার বেশী পাত্তা পায় । ঠাকুমার ঝুলিতে ধূলোর আস্তরণ ।   আর ব‌ইয়ের পাশাপাশি অ-ব‌ইয়ের স্টলও নেহাত কম নয় ।  যে যার ঢাক পেটাচ্ছে জোরেজোরে । জিটকের চ্যাটবাক্সের হাতছানিকে  উপেক্ষা করে কে যায় আর ব‌ইমেলায় ? ব‌ইপ্রেমীর পৃথীবি ফেসবুকময় । যারা যাচ্ছে তারা খাচ্ছে কিন্তু গিলছেনা । যারা পাচ্ছে তারা হেলায় হারাচ্ছে নীহাররঞ্জন-বিভূতিভূষণদের  । আর কিছু খাচ্ছে প্রচন্ড ক্ষুধাতাড়নায় । কেউ কিনছে নতুন ব‌ইয়ের আলমারীতে অমুক সমগ্র, তমুক অমনিবাস সাজিয়ে রাখার জন্য । আর স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের গুগলময় রাজ্যে ব‌ইমেলা নেহাতই একটা মিটিং গ্রাউন্ড । শীতে প্রেমঝারি জমে ক্ষীর  ।
থরে থরে পসরা । বাঙালীর রসনা তৃপ্তির একমেবমদ্বিতীয়ম খোরাক ব‌ই । কিন্তু ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতা বেশী । ঠিক যেমন গানের সিডি বাজারে থরে থরে সাজানো কিন্তু শ্রোতার চেয়ে শিল্পী বেশি ।
 আর দেখি টিভি চ্যানেলের উপছে পড়া স্টল । যে যার প্রোপাগান্ডা করে নিজের প্রোডাক্টের প্রোমোশান চালাচ্ছে কিন্তু ব‌ইবিক্রির বাণী সেখানে নীরবে নিভৃতে কাঁদছে । পাঠক-দর্শকের ভীড় সেখানেই । সেলিব্রিটির খোঁজে, হাতে হাত মেলানোর অপেক্ষায় । মানুষ যত না ব‌ই দেখছে তত বেশি কুইজ, অন্তাক্ষরি খেলছে ব‌ইমেলায় । টেলিভিশনে নিজের মুখটা দেখতে পাবে সেই আশায় । বেচারা ব‌ইসব!  
লে ছক্কা !   হাতের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র কপি-পেস্ট । বেকার পয়সা নষ্ট করা কেন !     দাদু ঠাকুমার আয়ু বেড়েছে  । দাদু আর রামায়ণ পড়েন না কারণ ডিমেনশিয়া । ঠাকুমার চৈতন্যচরিতামৃত তাকে ধূলো খায় কারণ এলঝাইমারস । বাবার নেটেই সব পড়াশুনো হয়ে যায় কারণ সামনে খোলা ল্যাপটপ  । মায়ের অনলাইন সব খবর মিলে যায় কারণ উপচে পড়া ডিজিটাল বন্ধুমহল । আর ছেলেপুলের ব‌ইমেলা যাওয়া হল নিছক আউটিং কারণ স্টেটাস সিমবল । কিন্তু তবুও সরস্বতীও আসেন এই সময়েই  । তাই ব‌ইমেলাও আসবে তার নির্ঘন্ট মেনে । থিমও থাকবে একটা কিছু । নতুন নতুন ব‌ইতে উপচে পড়বে স্টল ।  কোলকাতা ব‌ইমেলা বেঁচে থাকবে তার ঐতিহ্য আর রাজকীয়তা নিয়ে কারণ  বছরে  বাঙালীর একটা কিছু বলার মত স্টেটাস আপডেট ব‌ইমেলা-উত্সব !
তবুও যদি ব‌ইমেলার হাত ধরে শিল্প আসত! তবুও যদি ব‌ইমেলার হাত ধরে কর্ম সংস্থান হত! 

২৫ জানু, ২০১৩

তুমি কি এমনি শক্তিমান !


গত সপ্তাহে আমাদের এক বন্ধুর আনুকুল্যে রাঁচি যাবার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ।  ভারত-ইংল্যান্ডের ODI ম্যাচ ঝাড়খন্ডে আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ । খেলা দেখার সৌভাগ্য হল । ধোনির টিম জিতল বলে ঝাড়খন্ডবাসীর সাথে আমরাও  বেজায়  খুশী ।   উইকএন্ড ছিল বলে চট করে রাজরপ্পাও ঘুরে এলাম আমরা একটা গাড়ী নিয়ে । দামোদর ও ভেরা নদীর সঙ্গমে রাজরপ্পা জলপ্রপাতে মা ছিন্নমস্তার মন্দির দর্শন হল । খুব ভালো পুজো দেওয়া হল । শীতের আরামদায়ক জলবায়ু আর সেই সাথে ছোট্ট এমন উইকএন্ড ট্রিপ কার না ভালো লাগে! রাজরপ্পা থেকে ফেরার পথে বুটি (Booty) মোড়ে অবস্থিত ডিপাটলি আর্মি ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে গাড়ি যাবার সময় বাইরে থেকে একটি স্ট্রাকচার দেখতে পেয়ে ড্রাইভারকে বললাম থামতে ।
রাঁচি-রাজরপ্পা-হাজারিবাগ হাইওয়ের ধারে ডিপাটলি ( Dipatoli) ক্যান্টনমেন্টে না থামলে অনেক কিছু মিস করতাম । আর্মি ক্যান্টনমেন্ট যেমনটি হবার কথা । ঝাঁ চকচকে  সবুজ ম্যানিকিওর্ড লন আর অজস্র ফুলের সম্ভার । আর ইন্ডিয়ান আর্মির বাগান বা রাস্তা মেন্টেন্যান্সের ব্যাপারে নতুন কিছু বলাই বাহুল্য । কিন্তু সবচেয়ে ভালো লাগল সেই স্ট্রাকচারটি দেখে যেটি হল ভারতমাতার এক দল সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে তৈরী করা ওয়ার মেমোরিয়াল । ঝাড়খন্ডের এই ওয়ার মেমোরিয়াল যুদ্ধের দেশনেতাদের সম্মান জানাতে সাজিয়ে রেখেছে এই বাগিচায় অনবরত রঙবেরঙের ফুল ফুটিয়ে রেখে । তাঁদের অমর জওয়ান জ্যোতি আজীবন জ্বলে থাকবে ঐ স্থানে ।
আমাদের দেশের সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, ভারত-চীন যুদ্ধে, ইন্দো-পাক যুদ্ধে এবং অন্যান্য উগ্রপন্থী দমনের কাজে প্রতিনিয়ত বলিদানকে স্মরণ করে  তাঁদের "পরম বীর চক্র" প্রদান  করা হয় বিশেষ দিনে ।তাদের পরিবারের হাতে স্মারক তুলে দেওয়া হয় ...এ সব আমরা টেলিভিশনে দেখি, খবরের কাগজে পড়ে । প্রজাতন্ত্র দিবসের ঠিক আগে আগে এইখানে গিয়ে মনটা শ্রদ্ধায় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল । পরমবীরচক্র বিজয়ী এলবার্ট এক্কা, কীর্তি চক্র বিজয়ী  বিহার রেজিমেন্টের  বিশ্ব কেরকাট্টা এঁদের কথা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম আমাদের দেশটার কথা । কিছুদূরে মাঠের মাঝখানে ছিল ছোটনাগপুর অঞ্চলের কিংবদন্তী ট্রাইবাল নেতা বীরসা মুন্ডার স্ট্যাচু  । "লাইট এন্ড সাউন্ড" এর মাধ্যমে  ঐ প্রকান্ড মাঠে শো চলে নিয়মিত সন্ধ্যায়  । প্রতিবছর প্রজাতন্ত্র দিবস আসে এবং চলে যায় । ছোটবেলায় স্কুলে কিছু নিয়ম পালনের মাধ্যমে ঐ দিনটিকে মনে রাখা ছিল বাধ্য-বাধকতার মধ্যে  কিন্তু এতদিন পরে ডিপাটলি ক্যান্টনমেন্টের ঐ ওয়ার মেমোরিয়াল   আমাকে এই পোড়া দেশটার জন্য সত্যি ভাবিয়ে তুলল । 
মনে মনে আজ সারাটাদিন সেই মানুষগুলির আত্মত্যাগের কথা চিন্তার ঢেউ তুলবে আমার মনে যাঁরা বারবার বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে এই এই সুন্দরী দেশমায়ের লাবণ্যটুকুনি বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে প্রাণ দিচ্ছেন অনায়াসে । কার্গিল থেকে কন্যাকুমারিকা,  কচ্ছ থেকে কামাখ্যা বুক দিয়ে আগলে আছেন দেশটাকে । আমরা কতটুকুই বা তাঁদের দিতে পারি কেবলমাত্র বিশেষদিন গুলোতে স্মরণ করা ছাড়া ।
আজ তাই ২৬শে জানুয়ারির প্রাক্কালে তাঁদের জন্য আমার এই লেখাটি ডেডিকেট করলাম ।