৩০ জানু, ২০২৬

৫১ বর্তী নিয়ে আলোচনা- শ্রীমতি গোপা দত্ত ভৌমিক

 পাঠকদের অকুন্ঠ শুভেচ্ছা। এযাবত প্রচুর রিভিউ পেয়েছি অনেক গুণী মানুষের কাছ থেকে। আমি চির কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। এই রিভিউটি লিখে পাঠিয়েছিলেন স্বনামধন্যা প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক শ্রীমতী গোপা দত্ত ভৌমিক। তাঁর বন্ধু আমার আরেক প্রিয় রূপা দিদির কাছ থেকে গোপা দি বইটি উপহার পেয়েছিলেন। গোপা দির রন্ধন সংক্রান্ত লেখাগুলি পড়ে কতকিছু শিখেছি আমিও। তবে সম্পূর্ণ অচেনা এক লেখককে এভাবে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আবারও প্রণাম তাঁকে।

৫১বর্তী নিয়ে বই আলোচনা গোপা দত্ত ভৌমিক এর কাছ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ মারফত এসেছিল তিন বছর আগে। আমি ধন্য।
সুদীর্ঘদিনের বান্ধবী রূপা একটি অমূল্য উপহার পাঠালো। সুলেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ৫১ বর্তী বাঙালির হারানো ৫১ টি পদ। বইটি পড়ে দুই বন্ধু মিলে কতো যে কথা হলো। কোনো মামুলি রেসিপি বই নয় এটি ।এ হল রন্ধনসংস্কৃতির ভাণ্ডার। লেখিকা জৈব রসায়নের পণ্ডিত হলে কী হয় বাংলা সাহিত্যে তাঁর ঈর্ষণীয় দখল। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য , চৈতন্যজীবনী থেকে ভারতচন্দ্র রামপ্রসাদ হয়ে রবীন্দ্রনাথ সুকুমার রায় , রান্নার প্রসঙ্গে অজস্র প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি সাহিত্যপাঠের আনন্দ দেয়। সেইসঙ্গে পূর্বমাতৃকাদের অসামান্য কারিকুরিতে কীভাবে অপূর্ব ব্যঞ্জন প্রস্তুত হত তার মনকাড়া বর্ণনার সঙ্গে প্রাঞ্জল ভাবে সহজ করে রান্নার পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন প্রতিট পদের ক্ষেত্রে। আকাশ পাতাল খুঁজে উপকরণ জোগাড় করতে হবেনা অথচ স্বাদে হবে অনন্য। ইন্দিরা মোগলাই চাইনিজ স্প্যানিশ ইতালীয় রেসিপির ঢলের মধ্যে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যময় রান্নার কথা স্মরণ করিয়ে জরুরি কৃত্য সম্পাদন করেছেন। সবচেয়ে ভালো লাগে পদগুলির গায়ে লেগে থাকা মেদুর নস্ট্যালজিয়া। ঠাকুমার পাতে ভাতেভাতের ঘিয়ের সুগন্ধমাখা গরাস, মায়ের হাতের কাঁচা আমমাখা, জেঠিমার হাতের বাটিচচ্চড়ি যেন হারিয়ে যাওয়া যুগের ওপার থেকে হাতছানি দেয়। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেল, মঙ্গলকাব্যের পেটুক শিব গৃহিণী পার্বতীকে বলেছিলেন,
আজি গণেশের মাতা রান্ধ মোর মত।
নিমে শিমে বেগুনে রান্ধিয়া দিবে তিত।
অভাবের সংসারে অবশ্য তেমনটি জোটেনি। গৃহিণী শৃলপাণির শূল বাঁধা দিয়ে তণ্ডুল আনার প্রস্তাব দেন।
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ প্রমুখ বিখ্যাত বাঙালির বিষয়ে কতো গল্প বলেছেন, ফোড়ন মশলা সবজিকাটার রকমারি শোনাতে শোনাতে। সাবলীল তাঁর ঝরঝরে গদ্য, অসাধারণ তাঁর রসবোধ। আমাদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিলেন তিনি।


৫১বর্তী -বই আলোচনা করলেন মধুরিমা দত্ত

 https://inscript.me/ekannoborti-bangalir-harano-51-pod-book-review-indira-mukhopadhyay-writes-about-lost-recipes-of-bengal-mandas-publication-book


inscript.me এ প্রকাশিত ৫১বর্তী নিয়ে আলোচনা করলেন মধুরিমা দত্ত । বইটির ২য় মুদ্রণ হল বইমেলা ২০২৬ এ। যারা এতদিন ফিরে গেছেন মান্দাসের কলেজস্ট্রীট আউটলেট থেকে তাদের এবার স্বস্তি। 

৫১বর্তী 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

মান্দাস 



২৯ জানু, ২০২৬

মান্দাসের হাত ধরে উপন্যাসে ফিরলেন রসায়নের রাজা প্রফুল্লচন্দ্র

 


মান্দাসের হাত ধরে উপন্যাসে ফিরছেন রসায়নের রাজা প্রফুল্লচন্দ্র

রিভিউ লিখলেন সোহিনী দাস 

নিচের লিংকে গিয়ে পড়া যাবে বুক রিভিউটি। 

https://inscript.me/prafulla-rasayani-a-book-written-by-author-indira-mukhopadhyay-released-from-mandas-prakashan

......................................................................................................

বিজ্ঞান থেকে বাণিজ্যে: বাঙালির নিজস্ব সুপারহিরোর আখ্যান 'প্রফুল্ল রসায়নী'
 যেভাবে ইন্দিরা গোটা বইয়ের পাতায় পাতায় প্রফুল্লের প্রতিটি সত্তাকে চেনাতে চেনাতে গিয়েছেন পাঠককে, তা কার্যত এই বইটিকে করে তুলেছে আস্ত একটি দলিল, সময় ও সমাজের দলিল।







 লীলাবতীর নবদুর্গা বইটি নিয়ে লিখলেন বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষা ডঃ কৃষ্ণা রায় 

বাঙালি মেয়েদের  বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। আধুনিক বিজ্ঞান যতই দাবি করুক নারীর মেধা-মনন পুরুষের থেকে কোন অংশে কম নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কিন্তু দীর্ঘদিন নারীকে  শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে  বাঙলার মেয়েরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেলেও  তাদের  বিজ্ঞান পড়ার অনুমতি ছিলনা। আমাদের দেশে উনিশ শতকে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র  সেন পরামর্শ দিয়েছিলেন , মেয়েদের বিজ্ঞান  পড়ার দরকার নেই। সে সময়  কোন কোন বিখ্যাত মানুষ বলে থাকতেন , মেয়েদের মেধার যথেষ্ট ঘাটতি আছে । তবুও মেয়েরা  হাল ছাড়েনি।  অনেক মেয়েই এই সব প্রচলিত বাধার গন্ডি পেরিয়ে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছেন । উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই মেয়েরা ডাক্তারি পড়তে এসেছে, বিশ শতকের গোড়ায় ফিজিক্স , কেমিস্ট্রি, বায়োলজি অঙ্ক নিয়ে দিব্য পড়াশুনো চালিয়ে গেছে।  দেশের কত মেয়ে  বিজ্ঞানের গবেষণা করতে  বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন ।

কিন্তু  প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ না পেয়েও   গত শতকে  এই বাঙলায় কয়েক জন মেয়ে তাদের নিজস্ব ভঙ্গীতে  , স্বাভাবিক আগ্রহে বিজ্ঞান চর্চা করেছে। তাদের সবার কথা আমরা হয়তো জানিনা। কিন্তু দুটি  নারীর নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতেই হয়। প্রথম-জন রবীন্দ্রনাথের ন’দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী(১৮৫৬-১৯৩২), বাঙলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ রচয়িতা। অন্যজন নিজেকে মেলে ধরেছিলেন বিজ্ঞান নির্ভর সাহিত্যে, জনবিজ্ঞানের প্রবন্ধে  এবং  কল্পবিজ্ঞানের দুনিয়ায়। তিনি বেগম রোকেয়া( ১৮৮০-১৯৩২)। আক্ষরিক অর্থে এরা ছিলেন বিজ্ঞান-মনস্ক , বিজ্ঞানী নন।  কিন্তু যে পূর্বজ নারীর চেতনা বহন করে ছিলেন এঁরা, তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতকের এক অসামান্যা নারী, বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের কন্যা  গণিতজ্ঞ  তথা  জ্যোতির্বিদ  লীলাবতী। এই লীলাবতীর  চেতনা বহনকারী পরবর্তী  নয় জন বিশিষ্ট নারী বিজ্ঞানীর দিকে আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন সুসাহিত্যিক  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ।  বর্তমান গ্রন্থের নাম তাই” লীলাবতীর নবদুর্গা”। এই  দুর্গা প্রতিম নারীদের তালিকায় যারা আছেন , তাঁরা সকলেই বিদগ্ধ প্রথমা, প্রচলিত কাচের দেয়াল ভেঙ্গে যারা অভীষ্ট লক্ষে নির্ভয়ে হেঁটে গেছেন ।  এই তালিকায় প্রথমেই আছেন ১৮৬১ সালে জাত কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, পাশ্চাত্য  শিক্ষায় চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করে চিকিৎসকের বৃত্তিতে  যিনি আজীবন নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন । আছেন অসামান্য পদার্থবিদ বিভা চৌধুরি( জঃ১৯১৩-), জনপ্রিয় বিশিষ্ট রসায়নবিদ অসীমা চট্টোপাধ্যায়( জঃ১৯১৭)। মেয়েরা ইতিহাস পড়তে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে নাক গলাবেন  এমন ব্যাপার কে ভেবেছিল? খুলনার  মেয়ে  দেবলা মিত্র কিন্তু ভেবেছিলেন (জঃ ১৯২৫)। ভারতে  আর্কিওলজি তথা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের  প্রথম নারী ডিরেক্টার হলেন তিনি। সচরাচর জীববিজ্ঞানে মেয়েদের স্বাভাবিক ঝোঁক থাকে । কিন্তু পদার্থবিদ্যা পড়ে জীব বিজ্ঞানের পাঠ আরো নিবিড় ভাবে আত্মস্থ করলেন অঞ্জলি মুখার্জী( জঃ ১৯২৭-), হয়ে উঠলেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ।  উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণায়  কত কাল নিজেকে জুড়ে রাখলেন প্রবাসী বাঙালি মেয়ে, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অরুণ শর্মার স্ত্রী অর্চনা শর্মা (জঃ১৯৩২)। আর বাঙলার আরেক মেয়েমহারানী চক্রবর্তী জীববিজ্ঞানের গভীরতম প্রদেশে দৃষ্টি ফেলে গবেষণায়  মাতলেন জীবকোশের ভেতরকার জিনের সাম্রাজ্যে। মলিকিউলার বায়োলজিস্ট মহারানীর গবেষণা আজ সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত।  প্রথাগত বিজ্ঞানের  বিষয়ে মেয়েরা গত শতকের প্রথম ভাগ থেকে পা রাখলেও ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে এসেছিল গত শতকের  চারটি দশক পার করে।   অবিভক্ত বাঙলার ফরিদপুরের  মাদারিপুর গ্রামের মেয়ে , প্রথম বাঙালি তথা এশিয়ার  মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনীয়র ইলা মজুমদারের ( জঃ১৯৩০-) লড়াইটা তাই পুরুষ-কেন্দ্রিক প্রকৌশলের জগতে   বড় কম ছিলনা। আর আন্টার্টিকার মত দুর্গম পথে  অভিযান চালিয়ে যে  আধুনিক বাঙালি মেয়েটি   নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন তিনি জিওলজির  উজ্জ্বল ছাত্রী তথা গবেষক- অধ্যাপিকা সুদীপ্তা সেনগুপ্ত (  জঃ ১৯৪৬)। 

তবে মেয়েদের বিজ্ঞানের  সাধনার ইতিহাসটা কোন কালেই মসৃণ ছিলনা। আমরা যাঁকে আবহাওয়া-বিজ্ঞানীর সম্মান দিই না, কিন্তু  দূর অতীতে  তিনিই --এই বাঙলার মেয়ে,” খনার “পর্যবেক্ষণে  জন্ম হয়েছিল তথাকথিত  অন্য এক বিষয়, যাকে এখন বলা যায়  আবহাওয়া সম্পর্কিত পরিসংখ্যানবিদ্যা।  এখানে উল্লেখ করা এই নয় জন বিজ্ঞানীর মধ্যে সবার চলার পথ খুব  সুগম ছিলনা।  মেধা –মনন –সাধনার   সাফল্যের  যথোচিত আলো তাদের  কয়েকজনের মুখে  বিশেষ পড়েনি, সে আলো কেড়ে নিয়েছে ,  সমকালের  পুরুষ-শাসিত সমাজ । এই তালিকায় উপেক্ষিত বিজ্ঞানী বিভা  চৌধুরির নাম করতেই হয়। মাত্র কয়েক দশক আগে দূর মহাকাশে একটি নক্ষত্র তাঁর নামেই পরিচিত হবার আগে  পর্যন্ত বাঙলার বহু মানুষই জানতেন না কে এই বিভা ?  বলতে হয় ইলা মজুমদারের সংগ্রামের কথা । মেয়েদের বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাস তাই বরাবর বড় করুণ । একুশ শতকের মেয়েরা বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য তো কত সুযোগ পায়। সে সুযোগ পাননি  তাদের পূর্বমাতৃকারা।  সেই ভাবনাতেই এই ন’জন প্রতিভাময়ী দুর্গারূপিনী নারীর  প্রসঙ্গের অবতারণা, এই গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ। লীলাবতীর উত্তরসূরীদের  সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত  হলেও কিছুটা আলো পড়ুক  মানুষের চেতনায়,  তৈরি হোক অনুসন্ধিত্যসু পাঠকের পরবর্তী  জিজ্ঞাসার পথ। 

ব্যক্তিগত পরিচিতির সুবাদে জানি,  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় নিজে বিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রী হলেও পরিস্থিতির কারণে গবেষণার দুনিয়ায় পা রাখতে পারেন নি। দীর্ঘকাল শিক্ষা জগতে অবস্থান করার সুবাদে  ইন্দিরার মত অনেক মেয়ের জীবনে , এই যন্ত্রণার, এই আক্ষেপের কথা জেনেছি।  কত নারীর অপ্রমেয় মেধার  হিসেব সংসার রাখেনা। যেটুকু জানা যায় , সেটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র।  এমন একটি স্পর্শকাতর অথচ অনালোচিত বিষয়  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বড় স্বচ্ছন্দে ,  বড় মমতায়  তুলে ধরেছেন । সায়ন্তন প্রকাশনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আশা রাখি বইটি পাঠক  প্রিয় হবে। 



ডঃ কৃষ্ণা রায়

প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বেথুন কলেজ

কলকাতা। 


------------------------

--------------------------

লীলাবতীর নবদুর্গা 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

সায়ন্তন পাবলিকেশন 

মূল্য ২২০ টাকা 

৬ জানু, ২০২৬

রানিয়ার রান্নাঘর - রিভিউ লিখলেন সায়ন তালুকদার

 






রানিয়ার রান্নাঘর উপন্যাসের প্রথম রিভিউ লিখলেন সায়ন তালুকদার

রানিয়ার রান্নাঘর। নাম শুনেই সহজেই অনুমেয় এ বইয়ের যাপন রান্নাকে ঘিরে। কিন্তু নিছক রেসিপিভিত্তিক বই এটি নয়; এটি আসলে রান্নাকে ভালোবেসে যাপনের গল্প। রান্নার ইতিহাসের অতল সাগরে ডুব দিয়ে জানার প্রচেষ্টা যেমন একদিকে, তেমনই এই উপন্যাসের চরিত্ররা আমার, আপনার—আমাদের চারপাশের সমাজ থেকে উঠে আসা সম্পর্কের সমীকরণের কথা বলে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রানিয়া, যে একজন ফুড ইভেঞ্জালিস্ট। ছোটবেলা থেকেই রন্ধনপটিয়সী মায়ের, দিদার হাতের রান্না খেয়ে অভ্যস্ত রানিয়া নিজেও বড় হয়ে রন্ধনের প্রতি একটা অনবদ্য আকর্ষণ অনুভব করে। রন্ধনে বন্ধন। রান্নার দ্বারা সে গোটা বিশ্বকে মজিয়ে রাখতে চায়। তার বর কুশল তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করে, পাশে থাকে স্ত্রীর এই যাত্রায়। রানিয়া ভাবে,গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া। রানিয়া পডকাস্টে তুলে ধরে প্রাচীন থেকে নবীন রান্নার হালহকিকত, টুকরো ইনফো, হারানো ইতিহাস এবং অবশ্যই রেসিপি। সব মিলিয়ে সার্থক সমাবেশ। রানিয়ার দিদি মিঠি। একই মায়ের পেটের মেয়ে হলেও তাঁরা স্বভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত। মিঠি স্বামী শৈবালের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে থাকে,যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে তাদের কাজ‌। রান্না নিয়ে কোনওদিনই সেভাবে ওয়াকিবহাল ছিল না মিঠি। রানিয়ার রন্ধনপ্রীতি দেখে ব্যঙ্গ করত সে। রাঁধাই যে মেয়েদের একমাত্র কর্তব্য নয়, এটা সে সটান জানিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে অবলীলায় বেরিয়ে আসে। 

এ উপন্যাস শুধু যে রানিয়া এবং মিঠির ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, ঈর্ষার গল্প বলে তাই নয়; পাশাপাশি আরও নানাবিধ চরিত্ররা জুড়ে থেকে উপন্যাসটিকে করে তোলেন আরও মধুর, বাস্তবতায় মোড়া। আমাদের চারপাশে চোখ রাখলেই আমরা এমন অনেক রানিয়া-মিঠির মতো দুই বোনকে দেখতে পাব যাঁরা ছোটবেলার একসঙ্গে খেলে,ঝগড়া করে, ভালোবাসায়,অভিমানে বেড়ে উঠলেও একটা সময়ের পরে এসে ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব, স্বার্থপরতার নাগপাশে জড়িয়ে গিয়ে সম্পর্কগুলোর মর্যাদা হারিয়ে ফেলে।

রানিয়া ফুডব্লগার। সুদূর ডালাসে বসে তাঁকেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে সে কোনো কিছুতে কম নয়। এ পৃথিবীতে সে এসেছে কিছু দাগ রেখে যাওয়ার জন্য। নানাবিধ খাবার নিয়ে তাঁর এমন ভালোবাসা রয়েছে যে, তার সুলুকসন্ধানে নেমে সে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ফুড ব্লগার। বর্তমান দুনিয়ার যা অত্যন্ত প্রচলিত এবং অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিগণিতও। রানিয়া নিজে কিছু করে দেখাতে চায়, সে চায় সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হতে। পড়াশোনা নিয়ে সেভাবে এগোয়নি বলে কম ব্যঙ্গ সইতে হয়নি তাঁকে। মিঠির ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গি তাঁকে বারংবার বিদ্ধ করেছে। তার যোগ্য জবাব দিতে চায় রানিয়া। ফুড ব্লগিং তো অনেকেই করে, রানিয়ার কন্টেন্ট অভিনবত্বের ছোঁয়া। রসকষহীন মন্তব্য নয়, বাংলার হেঁশেল থেকে উঠে আসা মা-ঠাকুমার রান্নার ইতিহাস গল্পের ছলে বলে রানিয়া। সেখানে যেমন ঝালের ঝোলের কথা থাকে, তেমনই থাকে রসুন রুটির ইতিবৃত্ত। দাতসি, কেজুনে ক্রেওল, পিৎজা, পাওভাজির মতো বিভিন্ন প্রদেশের খাবার কথা যেমন উঠে আসে তাঁর ব্লগে, তেমনই জানাতে ভোলে না তার মামাবাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোয় ভোগের খিচুড়ি রান্নার গল্প। একইসূত্রে উঠে আসে রানিয়ার ছোটবেলায় মামাবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজোর হইহুল্লোড়ের কথা, গোটা বাড়ির সকলে মিলে ভোগ রান্নার কথা। সে এক হইহই ব্যাপার। 

ধীরে ধীরে রানিয়ার পরিচিতি বাড়তে থাকে‌। দেশ থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম। অ্যাকাউন্ট মানিটাইজড্ হয়ে টাকা আসে। মিঠি ঈর্ষান্বিত হয়। ক্যামেরার সামনে রান্না নিয়ে বকবক,দু-চারটে জ্ঞান দিয়ে রানিয়ার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্তরে উত্তরণের এই যাত্রা মিঠিকে উত্তেজিত করে তোলে। মা অনুসূয়া সিঁদুরে মেঘ দেখেন। তবে বোনের দেখাদেখি, তাঁকে টক্কর দিতে বা গৃহকর্মে নিপুণা স্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে কখনও মা, কখনও বোনের কাছে রেসিপি জেনে টুকটাক রাঁধতেও চেষ্টা করে মিঠি। রানিয়া খুশি হয়। ছোট ছোট খুশি, পরিবারকে নিয়ে একসূত্রে বেঁধে থাকতেই তো সে চায়। সুদূরে বিয়ে হওয়ার সুবাদে যখন-তখন দেশে মা-বাবার কাছে আসতে পারে না সে। তাই নিয়ে মনখারাপ,এদেশে,এদেশেও। 

রানিয়ার ফুড ব্লগ এগিয়ে চলে। ইউটিউবে নতুন চ্যানেল। নাম দেয় ‘পেন্ডুলাম’। সেই পেন্ডুলাম দুলতে দুলতে কখনও সিঙাড়া, সামোসার ফারাক বোঝায়, কখনও হিঙ কোথা থেকে এল জানায়। কখনও আবার প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর রন্ধনের প্রসঙ্গ জানিয়ে তাঁকে কুর্নিশ জানায়, তেমনই কখনও আবার চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর হাতে বানানো ফিশমোল্ডের গল্পও শোনায়। ফলোয়ার বাড়তে থাকে, বিজ্ঞাপন আসে। রানিয়া এগিয়ে যায়। তবে সাফল্য যেমন অনেক পরিচিতি দেয়,বিশ্বমাঝারে নিজেকে খ্যাতনামা করে তোলে; তেমনই আপন সম্পর্কগুলো থেকে কখন যেন ক্রমশ একাকী করে দেয়। এর পিছনে কি কেবল ঈর্ষা নাকি পারস্পরিক দ্বন্দ্ব,তা জানে না রানিয়া। রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা তাঁর আশ্রয় হয়ে ওঠে। 


হেঁশেল এবং সেখানে বিভিন্ন রান্নার জন্য, ইতিহাস,গল্প যেমন এ উপন্যাসে সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে, তেমনই দুই বোনের ইগো, তাঁদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, অভিমানের এক অদ্ভুত চড়াই-উতরাই সাক্ষী হয়ে থেকেছে এই উপন্যাস। রান্নাঘর কেবল একটি বাড়িতে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজাটাল ফুড ব্লগিংয়ের দৌলতে সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়েছে। গোটা সেদ্ধ, বাঁশ মুরগির কথা যেমন রানিয়া জানে, ফুড ব্লগিং দৌলতে আমেরিকা, টেক্সাস সহ বিদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে তা পৌঁছে গিয়েছে। রানিয়ার রান্নাঘর আজ আর কেবল তাঁর একার নয়, সর্বজনীন। 

এই রান্না, রান্নাঘর, রন্ধনপ্রীতি; তা নিয়ে ব্যঙ্গ, অভিমান, ভালোবাসা সবটুকু জুড়ে এই উপন্যাসে সম্পর্কের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন লেখিকা। তাঁর এই প্রয়াসকে কুর্ণিশ জানাই।


বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন শুভেন্দু সরকার। মুদ্রণপ্রমাদ খুঁজে পাইনি সেভাবে। পাতায় পাতায় কিছু ছবি থাকলে তা আরও শোভাবর্ধন করত বলে মনে হয়। তবে উপন্যাসের ঝরঝরে, টানটান গতি বইটি একটানা পড়তে বাধ্য করে, এক্ষেত্রে কলমের মুন্সিয়ানা অবশ্যই লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের। পাঠ শুভ হল।


গ্রন্থ: রানিয়ার রান্নাঘর

লেখিকা: ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক: মান্দাস

মূল্য: ৪০০ টাকা

সর্পগন্ধা - রিভিউ লিখলেন স্নিগ্ধদেব বোস

 



📕বই~ সর্পগন্ধা

✒️ লেখিকা~ ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

🎨 অলংকরণ~ সৌজন্য চক্রবর্তী

🖨️ প্রকাশনা~ দীপ প্রকাশন

💷 মুদ্রিত মূল্য~ ৩০০/-

📋 পৃষ্ঠা~ ১৭৫

📝পাঠ অনুভূতি- লিখলেন স্নিগ্ধদেব বোস 🌸

এ বছর সংকল্প ছিল আমার অচেনা সাহিত্যিককে চেনার। সেই সূত্রে এক বর্ণিল বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে লেখিকার সাথে পরিচয়। আজ পাঠ শেষে বইয়ের পাতায় তার সই আর ল্যাপটপের পর্দায় স্মৃতিময় ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে—এ কেবল এক অনন্য সাহিত্য-সফর।

বাঙালি মনে সাপের যে চিরাচরিত আতঙ্ক, লেখিকা তাঁর জাদুকরী গদ্যে তাকে রূপ দিয়েছেন গভীর মমতায়। তাঁর গল্পে সরীসৃপ কখনো ‘নাগকন্যা’ হয়ে নিঃসন্তান দম্পতির শূন্যতা ভোরায়, কখনো ‘ফণী’ হয়ে বিশেষ শিশুর নিঃসঙ্গতার সাথী হয়। তাঁর প্রতিটি শব্দে বীরভূমের লাল মাটির ঘ্রাণ আর প্রকৃতির অলৌকিক ছোঁয়া মিশে আছে।

ভয় কাটিয়ে সাপেদের প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে এই মায়াবী ভ্রমণ শেষ করলাম। লেখিকার সেই স্বাক্ষরটি আজ কেবল আমার বইয়ে নয়, মনের মণিকোঠাতেও স্থায়ী হয়ে রইল। এক কথায়—মুগ্ধ!

⛩️ নাগবন্ধন:

✨কলকাতার স্কুল শিক্ষক দম্পতি সায়ন ও সীমা মনের ক্ষত মুছতে আর একঘেয়েমি কাটাতে পাড়ি জমান ঝাড়খণ্ডের মন্দিরময় গ্রাম মলুটি-তে। তবে সায়নের মনে রয়েছে এক গোপন উদ্দেশ্য—এক তান্ত্রিকের খোঁজ করা, যিনি অলৌকিক উপায়ে তাদের অপূর্ণ পিতৃত্বের বাসনা পূরণ করতে পারেন। ইতিহাসের রহস্য আর তান্ত্রিকের হাতছানির মাঝে 'নাগবন্ধন' আসলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে এক দম্পতির মানসিক টানাপোড়েনের গল্প।

🎯 লেখিকা এই গল্পে বিজ্ঞানমনস্ক সায়ন ও তার স্ত্রী সীমার ব্যক্তিগত শূন্যতাকে কেন্দ্র করে আধুনিক যুক্তিবাদ বনাম আদিম বিশ্বাসের এক চিরায়ত সংঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন। ঝাড়খণ্ডের নবরত্নগড় দুর্গ ও মন্দিরের ঐতিহাসিক আবহে মাতৃত্বের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তি পেতে এক তান্ত্রিকের দ্বারস্থ হওয়ার এই টানাপোড়েন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। ভ্রমণের নেশায় দুঃখ ভোলার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত এক অলৌকিক আশার পেছনে ছুটে চলা মানুষের চিরন্তন আবেগের জটিল রসায়নই এই কাহিনির মূল ভিত্তি। 

⭐ 'নাগবন্ধন' পড়ার সময় বিজ্ঞানের যুক্তি এবং অলৌকিক রহস্যের এক অদ্ভুত টানাপোড়েন পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে। ঝাড়খণ্ডের পটভূমিতে প্রাচীন স্থাপত্যের বর্ণনায় যেমন এক ধরণের ঐতিহাসিক গন্ধ পাওয়া যায়, তেমনি সায়ন ও সীমার সম্পর্কের আর্দ্রতা পাঠককে আবেগপ্রবণ করে তোলে। বিশেষ করে অজানার প্রতি ভয় এবং সেই ভয়কে জয় করে এক অলৌকিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা গল্পটিকে এক গভীর মাত্রা দান করেছে। এটি কেবল একটি রহস্যগল্প নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস ও পরম আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটার এক অনন্য আখ্যান।

🛡️ সার্পেন্টিনা:

✨ কর্পোরেট ল-ইয়ার সুমেধা 'সর্পগন্ধা'র সূত্র ধরে খুঁজে পান এক অতি-গোপন রহস্যময় সংগঠন 'সার্পেন্টিনা সোস্যাইটি', যারা আড়ালে থেকে দেশের রাজনীতি ও ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। বন্ধু ইন্দ্রাণীকে সঙ্গে নিয়ে এই অন্ধকার জগতের দুর্ভেদ্য দুর্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক ভয়ঙ্কর মিশনে নামেন সুমেধা। পুরুষতান্ত্রিক এই চক্রের পাঠোদ্ধার আর অস্তিত্ব রক্ষার রোমাঞ্চকর লড়াই নিয়েই গড়ে উঠেছে এই কাহিনি। 

🎯 লেখিকা এই গল্পে একটি 'সিক্রেট সোসাইটি'র রহস্য উন্মোচন এবং অজানার প্রতি দুঃসাহসী আকর্ষণকে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘদিনের পুরুষশাসিত সংস্থায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণের মাধ্যমে এখানে এক শক্তিশালী নারীবাদী উত্তরণ ফুটে উঠেছে। সাপের প্রতীক ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলা এই রোমাঞ্চকর পথ এবং একজন পুলিশ অফিসারের অগোচরে তাঁর স্ত্রীর বিপজ্জনক মিশনে জড়িয়ে পড়ার টানাপোড়েন কাহিনিটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

⭐ 'সার্পেন্টিনা' পড়ার সময় এক অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে। পার্ক স্ট্রিটের চেনা পরিবেশের ভেতরেই যে এমন এক অচেনা জগত থাকতে পারে, তা কল্পনাকেও হার মানায়। সুমেধা চরিত্রটির দৃঢ়তা পাঠককে মুগ্ধ করে; বিশেষ করে যখন সে নিজের স্বামী পুলিশ অফিসার অর্জুনের অগোচরেই এক বিপজ্জনক অভিযানে শামিল হয়। সাপের প্রতীকী ব্যবহার এবং গুপ্ত সংগঠনের নিয়মকানুন গল্পটিতে এক ধরণের গথিক আবহ তৈরি করেছে। গল্পের পরতে পরতে থাকা অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তের অভাবনীয় মোড় পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে। এটি কেবল একটি থ্রিলার নয়, বরং প্রথা ভাঙার এক শক্তিশালী রূপক আখ্যান।

🐍 কালনাগিনী:

✨ জনপ্রিয় টেলিভিশন সঞ্চালক রুচিরা এবং রহস্যময়ী ঈশানী দেবীর কথোপকথনের মাধ্যমে এই গল্পটি উন্মোচিত হয়। গ্ল্যামার জগতের তিক্ত অভিজ্ঞতায় দগ্ধ ঈশানী এখন আকালীপুরের শ্মশানে সাপদের মাঝে বাস করেন। আধ্যাত্মিক শক্তি ও প্রখর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ঈশানী মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদম্য প্রতিশোধের প্রতীক। তাঁর এই 'কালনাগিনী' রূপ আসলে এক কঠিন লড়াইয়ের বর্ম।

🎯 লেখিকার কলমে ঈশানী চরিত্রটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সেই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ, যা নারীর তেজকে 'উদ্ধত' বলে দেগে দেয়। গ্ল্যামার জগতে প্রতিভার চেয়ে কেবল 'শরীরী আবেদন'কে গুরুত্ব দেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি বেছে নেন বীরভূমের আকালীপুরের শ্মশান। সেখানে সাপেদের মাঝে হঠযোগ ও কঠোর সাধনার মাধ্যমে তাঁর যে নতুন সত্তার জন্ম হয়, মহারাজা নন্দকুমারের ইতিহাস ও গুহ্যকালীর আশীর্বাদপুষ্ট সেই 'কালনাগিনী' রূপই এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রধান রক্ষাকবচ ও লড়াইয়ের মোক্ষম হাতিয়ার।

⭐ 'কালনাগিনী' গল্পটি পড়ার সময় এক ধরণের রোমাঞ্চ কাজ করে, বিশেষ করে ঈশানী দেবীর দৃঢ় এবং স্পষ্টভাষী সংলাপগুলো পাঠককে আবিষ্ট রাখে। গ্ল্যামার জগত থেকে আধ্যাত্মিকতায় তাঁর এই উত্তরণ কোনো ধর্মীয় ভণ্ডামির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিজের আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট-যেমন ওয়ারেন হেস্টিংস ও মহারাজা নন্দকুমারের দ্বন্দ্ব-গল্পটিতে এক গভীর মাত্রা যোগ করেছে। পরিশেষে, 'কালনাগিনী' কেবল একটি নাম নয়, বরং এক নারীর নিজেকে রক্ষা করার এবং অন্যায়ের যোগ্য জবাব দেওয়ার এক প্রতীকী রূপ।

🔱 সর্পমঙ্গলা:

✨ লাবণ্যর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা ও সাপের প্রতি রহস্যময় টান ললিতের মনে গভীর সংশয় জাগায়। মনসার থানে গোপন আরাধনা আর এক প্রাচীন অভিশাপের ছায়ায় লখিন্দরের নিয়তি ও আধুনিক নারীশক্তির দ্বৈরথ এখানে প্রকট। ললিতকে মাধ্যম করে লাবণ্যর এই আধ্যাত্মিক লড়াই মূলত পুরুষতান্ত্রিক দম্ভকে চূর্ণ করে নিজের জয়গান গাওয়ার এক অনন্য প্রয়াস এই কাহিনী।

🎯 পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও 'মেল ইগো'-র বিপরীতে এই গল্পটি নারীশক্তির এক বলিষ্ঠ জাগরণ। বেহুলা-লখিন্দরের পৌরাণিক মিথ আর আধুনিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছে, যেখানে পুনর্জন্মের আভাস ও অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা কাহিনীকে দিয়েছে মায়াবী রহস্য। গ্রামীণ বাংলার লৌকিক বিশ্বাস আর আধুনিক জীবনবোধের এই অপূর্ব সমন্বয় গল্পটিকে এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

⭐ 'সর্পমঙ্গলা' পড়তে গিয়ে শুরু থেকেই এক ধরণের রহস্যময় আবেশ কাজ করে। ঈশানী দেবীর দৃঢ় এবং স্পষ্টভাষী সংলাপগুলো পাঠককে মোহগ্রস্ত করে রাখে। গল্পের পরিবেশ বিশেষ করে শ্মশানের পটভূমি এবং সাপেদের উপস্থিতি-এক ধরণের হিমশীতল রোমাঞ্চ তৈরি করে। এটি কেবল একটি অতিপ্রাকৃত গল্প নয়, বরং আধুনিক সমাজের মুখোশ খুলে দেওয়ার এক বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা। গল্পের শেষে ঈশানী কেবল এক রহস্যময়ী নারী থাকেন না, বরং তিনি হয়ে ওঠেন অপরাজেয় নারীশক্তির এক প্রতীকী রূপ।

👁️ নাগমণি:

✨ বাঁশবেড়িয়ার দেড়শ বছরের প্রাচীন ভিটে আর হংসেশ্বরী মন্দিরের প্রেক্ষাপটে রহস্যময়ী কিশোরী ‘নাগমণি’র উপস্থিতি এক অতিপ্রাকৃত আবহের সৃষ্টি করে। ধ্বংসস্তূপের বুক থেকে জেগে ওঠা এই জ্যোতির্ময় মেয়েটি সাধারণ এক গ্রাম্য কিশোরী নাকি অতীতের কোনো অলৌকিক হাতছানি—সেই কুহেলিকাই এই গল্পের মূল উপজীব্য।

🎯 লেখিকা এই গল্পে শিকড়ের টানে আদি ভিটেয় ফেরার এই আখ্যানে বংশপরম্পরার ইতিহাস ও লোকজ আতিথেয়তা অনন্য মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এক গ্রাম্য কিশোরীর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বের মাঝে নাগচম্পা ও সাপের প্রতীকী ব্যবহার বাস্তব ও পরাবাস্তবকে একাকার করে দিয়েছে। মূলত এটি প্রকৃতি, মিস্টিক আবহ আর আত্মপরিচয় খোঁজার এক মায়াবী উপাখ্যান।

⭐ 'নাগমণি' পড়তে গিয়ে শুরু থেকেই এক ধরণের গা-ছমছমে রোমাঞ্চ অনুভব করা যায়। লেখিকার সাবলীল বর্ণনায় পাহাড়ি পরিবেশ আর রহস্যময় গুহার আবহ যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। গল্পের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সাসপেন্স পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। বিশেষ করে সাপেদের বর্ণনা এবং লোকগাথার ব্যবহার গল্পটিতে এক ধরণের অতিপ্রাকৃত আবেশ তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী নয়, বরং মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং প্রকৃতির বিশালতার এক চমৎকার আখ্যান যা শেষ হওয়ার পরেও মনে এক রেশ রেখে যায়।

🌙 অচেনা পরকীয়া:

✨ শহরের কোলাহলমুক্ত নির্জন মফস্বলে এক দম্পতির জীবনে এক বিশাল সাপের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক অতীন্দ্রিয় আখ্যান। বিজ্ঞানের যুক্তি আর অতিপ্রাকৃতের মায়াজালে ঘেরা এই গল্পে এক রহস্যময়ী নারীমূর্তির সান্নিধ্য ও শীতল স্পর্শ জন্ম দেয় এক ‘অচেনা পরকীয়া’র। মানুষের অবদমিত কামনা আর এক মৃত সঙ্গীর আকুতি মিলেমিশে এখানে এক অলৌকিক ও শিহরণ জাগানিয়া অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করেছে।

🎯 লেখিকা এই গল্পে অতিপ্রাকৃত ও পরাবাস্তবতার নিপুণ বুননে মানুষ এবং আদিম প্রকৃতির এক রহস্যময় সম্পর্কের রসায়ন ফুটিয়ে তুলেছেন। মৃত সঙ্গীর বিরহে কাতর এক 'মাদি' সাপের হাহাকার যখন মানুষের অবদমিত কামনার সাথে মিলে যায়, তখন জন্ম নেয় এক অতীন্দ্রিয় 'পরকীয়া'। এক রহস্যময়ী ছায়ার সাথে গড়ে ওঠা এই অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্রটি শেষ পর্যন্ত পারিবারিক জীবনের চেনা সমীকরণগুলোকেই আমূল বদলে দেয়।

⭐ 'অচেনা পরকীয়া' পড়তে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী জগতের আমেজ পাওয়া যায়। লেখিকা যেভাবে বসন্তের বর্ণনা দিয়েছেন-শিমুল, পলাশ, আর মহুয়া সরণির মাদকতা-তা পাঠককে শুরুতেই এক স্নিগ্ধ পরিবেশে নিয়ে যায়। গল্পের নামকরণে যে চমক আছে, কাহিনী এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার সার্থকতা উন্মোচিত হয়। এটি কোনো সাধারণ নারী-পুরুষের ত্রিকোণ প্রেমের গল্প নয়, বরং এক সরীসৃপের প্রতি মানুষের মুগ্ধতার গল্প। সবচেয়ে ভালো লাগে ওঝার সেই সরল বিশ্বাসটুকু-যেখানে সে সাপটিকে 'শুভ' এবং 'মাদি সাপ' হিসেবে চিহ্নিত করে জানায় যে সে তার হারানো সঙ্গীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। গল্পের শেষে যখন দম্পতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে এবং তারা নতুন প্রাণের আগমনের বার্তা পায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই মানুষের অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দেয়। এটি একটি ভিন্নধর্মী এবং মন ছুঁয়ে যাওয়া ছোটগল্প যা জীবনের 'অচেনা' বাঁকগুলোকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।

🌿 লাউডগা সাপ:

✨ লাউশাকের আঁটিতে লুকিয়ে আসা একরত্তি এক সবুজ সাপ অনিচ্ছাকৃতভাবেই সুতপাদের অন্দরমহলে এক মায়াবী জগতের দ্বার খুলে দেয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর ঋভুর সাথে সেই 'ফণী'র কথোপকথন বিজ্ঞান ও যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে গতজন্মের এক অলৌকিক সংযোগকে উন্মোচিত করে। এটি মূলত এক নিঃসঙ্গ কিশোরের জগত আর প্রকৃতির এক রহস্যময় প্রাণের নিবিড় ও বিস্ময়কর মেলবন্ধনের গল্প।

🎯 লেখিকা এই গল্পে ঋভুর মতো বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুর সংবেদনশীল দৃষ্টিতে প্রকৃতি ও এক অবহেলিত সরীসৃপের মায়াবী সখ্য ফুটিয়ে তুলেছেন। গতজন্মের স্মৃতিবাহী এক অলৌকিক টান আর একাকী কিশোরের মনস্তত্ত্ব মিলে এখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণের এক অনন্য ও মরমী বন্ধুত্বের আবহ তৈরি করেছেন।

⭐ 'লাউডগা সাপ' পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে এক মায়াবী কুহক তৈরি হয়। লেখিকা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে একটি খুদে সাপের জবানবন্দিতে মানুষের পৃথিবীকে তুলে ধরেছেন। ফ্রিজের তলার উষ্ণ আশ্রয়ে থাকা একটি তুচ্ছ সরীসৃপ যে কতটা মানবিক এবং সংবেদনশীল হতে পারে, তা ভাবিয়ে তোলে। গল্পের শেষে ঋভুর মধ্যে যে পরিবর্তন দেখা যায়, তা একাধারে রহস্যময় এবং আশাব্যঞ্জক। মানুষের অবজ্ঞা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভিড়ে প্রকৃতি যে কতটা নীরবে আমাদের ক্ষত সারিয়ে দেয়, এই গল্পটি সেই ধ্রুব সত্যকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এটি কেবল একটি সাপের গল্প নয়, বরং এক অদ্ভুত ভালোবাসার আখ্যান যা পাঠককে অনেকক্ষণ ঘোরের মধ্যে রাখে।

🌀 মন দোলে, তন দোলে:

✨ মেধাবী ছাত্র আদিনাথের আধুনিক স্থাপত্যচর্চার সমান্তরালে মিশে আছে তার শৈশবের রহস্যময় ও অতীন্দ্রিয় ছায়াসঙ্গী 'চাঁদু'। সহপাঠী সংগ্রামীর যুক্তিবাদী মন যখন এই সম্পর্কের মুখোমুখি হয়, তখনই শুরু হয় বিজ্ঞানের সাথে লোকজ বিশ্বাসের এক চিরায়ত দ্বন্দ্ব। মূলত সাপের প্রতীকি উপস্থিতিতে আদিনাথের সৃজনশীলতা ও তার শিকড়ের রহস্যময় রসায়নই এই আখ্যানের মূল আকর্ষণ।

🎯 শিকড়ের টান ও সৃজনশীলতার রহস্যময় মেলবন্ধনই এই গল্পের মূল উপজীব্য। এখানে আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার যুক্তির সাথে গ্রামীণ মিথ ও অতিপ্রাকৃত অনুপ্রেরণা সমান্তরালে মিশে গেছে, যেখানে 'সাপ' সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রতীক। বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের চিরায়ত দ্বন্দ্বকে ছাপিয়ে কাহিনীটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি ও মানুষের এক নিবিড় সখ্যতার আখ্যানে রূপ নিয়েছে।

⭐ 'মন দোলে, তন দোলে' গল্পটি পড়তে গিয়ে এক অদ্ভুত দোলাচলের অভিজ্ঞতা হয়। লেখিকা খুব সুন্দরভাবে একজন ছাত্রের কঠোর পরিশ্রমী নাগরিক জীবনের সমান্তরালে তার ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি ও সংস্কারকে তুলে ধরেছেন। আদির চরিত্রের মধ্যে যে দ্বৈততা আছে-একদিকে সে আধুনিক ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে সে 'চাঁদু'র পরামর্শ ছাড়া এক পা-ও চলতে পারে না-তা পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সাপের প্রতীকি ব্যবহার। বেঞ্জিন রিং আবিষ্কারের গল্পের মতোই সাপের লেজ কামড়ে থাকার যে ধারণাটি এখানে এসেছে, তা বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন আর অতিপ্রাকৃতিক বিশ্বাসের মাঝখানের সূক্ষ্ম সুতোটিকে স্পর্শ করে। বৃষ্টির দিনে সাপের ভয় আর মনসা গাছের ছবির অনুষঙ্গ গল্পে এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি ছাত্রের জীবনযুদ্ধ নয়, বরং মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসের এক সুন্দর প্রকাশ।

🧿 সাপের ম্যাজিক (অনুবাদ):

✨ তিব্বতের দুর্গম পথে এক দয়ালু পথিকের হাতে প্রাণ ফিরে পাওয়া তিন প্রাণী ও এক মানুষের গল্প এটি। পশুপাখিরা কৃতজ্ঞতা জানালেও, সেই মানুষটির চরম অকৃতজ্ঞতায় পথিক কারাবন্দি হন। অবশেষে এক রহস্যময় জাদু সর্পের অলৌকিক হস্তক্ষেপে অশুভের বিনাশ ও নিরপরাধের মুক্তি ঘটে। বিশ্বাসঘাতকতা বনাম মনুষ্যত্বের এই দ্বন্দ্বই গল্পটিকে এক ধ্রুপদী রূপকথায় উন্নীত করেছে।

🎯 লেখিকার কলমে অনূদিত এই তিব্বতী উপকথাটি উপকার ও অকৃতজ্ঞতার এক চিরায়ত দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছে। পশুপাখির আদিম সারল্য আর মানুষের কুটিল স্বার্থপরতার বৈপরীত্য এখানে জীবনবোধের এক গভীর পাঠ দেয়। বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যার জাল ছিন্ন করে শেষ পর্যন্ত জাদুকরী অলৌকিকতা আর প্রকৃতির অমোঘ বিচারে মনুষ্যত্বের জয় হয়। অকৃতজ্ঞতার করুণ পরিণাম এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই অনন্য আখ্যানটি এর সাবলীল অনুবাদের গুণে সংকলনের অমর অংশ হয়ে রয়ে যাবে।

⭐ 'সাপের ম্যাজিক' গল্পটি পড়তে গিয়ে এক প্রাচীন তিব্বতি লোককথার স্বাদ পাওয়া যায়, কারণ লেখিকা সেখানের গল্পটিকেই অনুবাদ করেছেন। গল্পের শুরুতেই পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথ আর বিপন্ন চার প্রাণীর যে বর্ণনা লেখিকা অনুবাদ করেছেন, তা এক সিনেমাটিক আবহ তৈরি করে। খুব সহজ সরল ভাষায় একটি গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন-উপকারীর অপকার করলে প্রকৃতি বা অলৌকিক শক্তি কোনো না কোনোভাবে তার বিচার করেই। গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সাপের 'জাদু' বা মায়াবী ক্ষমতা, যা রূপকথার আমেজ নিয়ে আসে। ইঁদুরের খাবার বয়ে আনা বা সাপের ছদ্মবেশ ধারণ করার মাধ্যমে প্রাণীদের যে সংবেদনশীল রূপ দেখানো হয়েছে, তা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। শিশুদের জন্য যেমন এটি একটি চমৎকার নীতিকথা, বড়দের জন্যও এটি সম্পর্কের বিশ্বস্ততা নিয়ে ভাবার এক সুন্দর রসদ। সব মিলিয়ে এটি একটি স্নিগ্ধ এবং শিক্ষণীয় ছোটগল্প।

🔮 সামগ্রিক অনুভূতি:

⭐ লেখিকার ‘সর্পগন্ধা’ সংকলনটি বিজ্ঞানের যুক্তি আর মানুষের আদিম বিশ্বাসের এক চমৎকার রসায়ন। এটি কেবল সরীসৃপ জগতের কথা নয়, বরং মানুষের অবচেতন মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়, ভক্তি আর অলৌকিকত্বের এক সংকলন। লেখিকা এখানে সাপকে কেবল বিষধর প্রাণী হিসেবে দেখেননি, বরং পুরাণ ও মহাকাব্যের সেই ‘মিথিক্যাল’ সত্তা হিসেবে এঁকেছেন, যা যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের প্রতীক হয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে মিশে আছে। আধুনিক জীবনের রুক্ষ বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও মানুষ যখন অসহায় বোধ করে, তখন সে ফিরে যায় সেই প্রাচীন বিশ্বাসের কাছে—যেখানে মা মনসার আশীর্বাদ বা সাপের অলৌকিকত্ব এক পশলা স্বস্তি নিয়ে আসে।

⭐ বইটির প্রতিটি গল্প ও উপন্যাসিকায় ফুটে উঠেছে বিজ্ঞানের  যৌক্তিক মন এবং এক সংবেদনশীল শিল্পীর হৃদয়ের দ্বন্দ্ব। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মনসার থানে দুধ ঢেলে আসার যে অকৃত্রিম ভক্তি, তা যেমন পাঠককে ছুঁয়ে গেছে, তেমনি আধুনিক দম্পতির সন্তানহীনতার যন্ত্রণায় অলৌকিক আশ্রয়ের সন্ধান পাঠকের মনে এক করুণ ও রহস্যময় আবহ তৈরি করে। ‘সর্পগন্ধা’ আসলে এক বিষণ্ণ ও মায়াবী অনুভূতির কোলাজ, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির রহস্য আজও বিজ্ঞানের সীমানার বাইরে অনেক গভীরে বিস্তৃত। সাপের খোলস ত্যাগের মতো এই গল্পটিও যেন মানুষের বিশ্বাসের নবজন্মের গল্প শোনায়, যা একাধারে শিহরণ জাগানিয়া এবং পরম আশ্রয়ের।

✨ পাঠ শুভ হোক। 🌸


দীপ প্রকাশনার সি ই ও সুকন্যা মন্ডলের সঙ্গে 

 লেখক - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

বইপ্রকাশ- কলেজস্ট্রীট কফিহাউজের বইচিত্র সভাঘরে 




 

১৬ এপ্রি, ২০২৫

৫১ বর্তী - বাঙালির হারানো ৫১ পদ

 


৫১বর্তী বইটির রিভিউ লিখলেন 

হায়দ্রাবাদের বাসিন্দা, সক্রিয় নাট্য ব্যাক্তিত্ব, একটি LPO তে কর্মরত সৃষ্টিশীল মানুষ শ্রীমতী রীতা ঘোষ। 


৫১ বর্তী : বাঙালির হারানো ৫১ পদ 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এর এই বইটি কয়েকদিন ধরে পড়তে পড়তে আমার মন যেন কোথায় ভেসে যেত, তাই তো অনেক বেশি সময় নিয়ে পড়লাম। মন চলে যেত সেই ছোটবেলার দিনগুলিতে, যখন, অনেক রান্নাঘরেই কয়লার উনুন ছিল।  সেই রান্নার স্বাদই ছিল আলাদা, সাধারণ মাছের ঝোল বা ডিমের ডালনা হয়ে উঠতো অতুলনীয়।  আমার অনেক আত্মীয়র বাড়িতে, ঝকঝকে সোনার মতো কাঁসার থালাতে খেতাম।  আহা, সেই সব দিন যেন কোথায় হারিয়ে গেলো।  আবার কখনো, দিদার বাড়িতে, খেতাম ,আমার জন্য রাখা স্টিল এর থালায়, দিদার হাতে গোবিন্দভোগ চালের ভাত, ঘি বা মাখন দিয়ে মাখা, সঙ্গে আলুসেদ্ধ।  দিদা,  থালায়, ভাতের গোল্লা করে রাখতেন, আমায় গল্প বলে খাওয়াতেন, আর সেই গোল্লাগুলি ছিল, কাকের ডিম্, বকের ডিম্, হাঁসের ডিম্ ইত্যাদি।  অতি সাধারণ খাবার হয়ে উঠতো অসামান্য। আমার মায়ের ও শাশুড়ি মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে  গেল। আমার বাপের বাড়ি, মামার বাড়ি ও শ্বশুর  বাড়ি, সবই ওপার বাংলার, তাই রান্নাতে ওপার ও এপার বাংলার প্রভাব। আমার শাশুড়ির হাতের শুঁটকি মাছের ঝাল বা চিতল মাছের মুইঠ্যা আমার প্রিয় খাবারের মধ্যে পড়ে।  সেই সঙ্গে, বিউলির ডাল, আলু পোস্ত, ভেটকি মাছের কাঁটা চচড়ি, চিংড়ি মাছ- সবই আমার অতি লোভনীয় খাদ্য। 

বইটি হাতে পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম, এটি একটি রান্নার বই।  কিন্তু না, কি অপূর্ব, কনসেপ্ট, সুন্দর স্মৃতিচারণার মধ্যে দিয়ে রান্নাঘরের হেঁশেল কথা।  ভাষার গাঁথুনিও চমৎকার। রেসিপি শেয়ার করেছেন  ঠিকই কিন্তু, সেটা একটা গল্পের মাধ্যমে, স্মৃতিচারণ করতে করতে। এটাই বইটির মাধুর্য্য বাড়িয়েছে। ইন্দিরার  লেখাতে, ঈশ্বর গুপ্ত মহাশয় আছেন, আছে  ঠাকুরবাড়ির প্রসঙ্গ। আছে মঙ্গল কাব্যের ও চৈতন্যচারিতামৃতর  রেফারেন্স। রান্নার প্রসঙ্গে, খাবারের আলোচনায় মহেন্দ্রনাথ দত্ত, রাসবিহারী বসু, বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়, বাসন্তী দেবী, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, অমৃতলাল বসু কে নেই... কত যে আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক হতে পারে একটি সাধারণ রান্নার বই তা না পড়লে বোঝা যায়না। গবেষণা যে শুধু তথ্যপূর্ণ তা নয়, তা লেখাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আমি কুর্নিশ জানাই লেখিকার অধ্যাবসায় ও রান্নার প্রতি আবেগ কে। 

বিশ্বায়নের দৌলতে, আজ আমরা কত জানছি আর শিখছি, শুধু তাই নয়, পুরাতন ও আধুনিক এর একটা মেলবন্ধন করতে পারছি। সেটা যে আহারেও প্রযোজ্য, তার নিদর্শন হল ৫১ বর্তী ।  হেঁশেলে বৈচিত্রর অভাব নেই, আমাদের গুরুজনেরা সেই বৈচিত্র কে কাজে লাগিয়ে আমাদের প্রজন্ম ও আগামী আরও অনেক প্রজন্মকে কত কি শিখিয়ে গেছেন। এই ভাবেই তো আমাদের সমাজ এগিয়ে চলছে। 

সবার শেষে, খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়লাম, সপ্তকন্যার রান্নার ২৫ টি পরামর্শ ও কৌশল।  প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এটা জরুরি।  না খেয়ে তো থাকা যাবে না, আর খেতে গেলে, রান্নাও করতে হবে, আর রান্না করতে গেলে, হেঁশেল ও সামলাতে হবে। ইন্দিরা  বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর জীবনে দেখা সুরাঁধিয়ে সপ্তকন্যাকে। কি ভালো যে লাগলো, আমি নিশ্চিত, তাঁরা লেখিকাকে  অনেক আশীর্বাদ করছেন ওপর থেকে আর তাঁদের স্নেহের ছায়াতে  ঘিরে আছেন।

ঠিক করেছি, বাঙালির হারানো ৫১ পদের মধ্যে, দু চারটে তো রাঁধবই বিশেষ দিনে।  সত্যিই  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের এই বইটি সব মেয়েদের পড়া উচিৎ। মন ভরে যাবেই।



আরও একটি চমৎকার রিভিউ পড়তে ইন্সক্রিপ্টের লিংকে পড়ুন। 




২৭ জানু, ২০২৪

প.ব মৎস্য দফতরের সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটরী অতনু রায় লিখলেন প্রফুল্ল রসায়নী নিয়ে



 

"প্রফুল্ল রসায়নী" 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

মান্দাস 


রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের মেধাবী সহপাঠী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের লেখা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনোপন্যাস "প্রফুল্ল রসায়নী" একখানি ঐতিহাসিক দলিল। উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি পাঠকের কাছে  সমসাময়িক বাঙলার ইতিহাস ও ভারতবর্ষে আধুনিক রসায়ন শিক্ষার ক্রমবিকাশ তুলে ধরেছেন। প্রফুল্লচন্দ্র এমন একটা সময়ে জন্মগ্রহণ করেন যখন ভারতবর্ষে সবেমাত্র ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একশ বছরের অরাজকতার অবসানে ইংরেজদের রাণীর ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।ইংরেজ তার সবচেয়ে সম্পদশালী উপনিবেশে শিক্ষা স্বাস্থ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা ভাবতে শুরু করেছে।অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার রাডুলি-কাটিপাড়া গ্রামে ১৮৬১ সালে এক প্রগতিশীল শিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম।পিতা হরিশচন্দ্র ছিলেন মুক্তমনা সুশিক্ষিত মানুষ।নেতাজী সুভাষচন্দ্রের পিতা জানকীনাথ বোসের এলবার্ট স্কুলের সহপাঠী এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিশেষ স্নেহধন্য। মা ভুবনমোহিনী বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে বাংলার পাঠ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।এমন বাবা মায়ের আদরে ও সান্নিধ্যে, পিতারই প্রতিষ্ঠিত গ্রামের স্কুলে প্রফুল্লচন্দ্রের পড়াশোনা শুরু। মা ও বাবার সঙ্গে প্রফুল্লর সংলাপগুলি কাল্পনিক হলেও উপন্যাসে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। 

সন্তানের উচ্চতম শিক্ষার উদ্দেশ্যে হরিশচন্দ্র পরিবারসহ চলে এলেন কলকাতায়। বালক প্রফুল্লচন্দ্র প্রথমে হেয়ার স্কুল ও তারপর  এলবার্ট স্কুল থেকে বিদ্যালয় শিক্ষা শেষ করে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে এফ এ পড়তে ভর্তি হন।সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ। শুরু হলো ব্রিটিশ প্রফেসর আলেকজান্ডার পেডলারের তত্ত্বাবধানে রসায়ন শিক্ষা। পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দেয় প্রেসিডেন্সি কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যাবের গল্প। আমরাও সেখানে কাজ করেছি। পরীক্ষা দিয়েছি। মেলাতে চেষ্টা করি। শিহরিত হই। 

অতঃপর গিলক্রিস্ট বৃত্তি নিয়ে ১৮৮২ সালে বিলেতে পাড়ি। এসে পৌঁছলেন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে।বিলেতে পূর্ণ সান্নিধ্য ও সহযোগিতা পেলেন অগ্রজপ্রতিম জগদীশ চন্দ্র বসুর। প্রেসিডেন্সির সিনিয়র 'জগদীশদা'র সঙ্গে ছাত্র প্রফুল্লর সংলাপ  চমৎকার সুখপাঠ্য। 

এডিনবার্গে তাঁর শিক্ষক ছিলেন লন্ডন ইউনিভারসিটির প্রথম ডিএসসি ডিগ্রিধারী প্রফেসর আলেকজান্ডার ক্রাম ব্রাউন।১৮৮৫ সালে বিএসসি ডিগ্রি লাভ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় ডাক পাওয়া।কনজুগেটেড সালফেট নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং মাত্র দু বছরে ১৮৮৭ সালে একসঙ্গে ডিএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ।১৮৮৮ সালে দেশে ফিরে এলেন। এবারও তাঁকে  স্বাগত জানাতে উপস্থিত সস্ত্রীক জগদীশ চন্দ্র।প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে ১৮৮৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান।একদিকে রসায়নের ল্যাবরেটরিতে অনলস গবেষণাকার্য ও অপর দিকে স্বজাতিকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান ও শিল্পের সংমিশ্রণ ঘটানোর অনাবিল প্রচেষ্টা।১৮৯২ সালে আপার সার্কুলার রোডের নিজের ভাড়াবাড়িতে তাঁর স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কসের ভিত্তি স্থাপন।১৮৯৫ সালে তাঁর মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার তাঁকে বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে সুপরিচিত করে তোলে।১৯০২ সালে তাঁর রচিত গবেষণাপত্র A History of Hindu Chemistry Part-1 ইউরোপ ও আমেরিকার মত এশিয়া খন্ডেও বিজ্ঞানের সার্বভৌম চর্চা সম্মন্ধে তৎকালীন বিশ্বকে অবগত করে।১৯০৪ সালে প্রফুল্লচন্দ্রর সুযোগ হয় দ্বিতীয় দফা স্বল্পকালের ইউরোপ ভ্রমণের। এবার তিনি নব্য রসায়নশাস্ত্রের পীঠস্থান প্যারীসেও আসেন এবং সাক্ষাৎ হয় রসায়নের ঋষি বার্থেলোর সঙ্গে। পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে হিন্দু রসায়ন বইটির দ্বিতীয় খন্ডটি তিনি বার্থেলোকেই উৎসর্গ করেন।১৯০৬ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর দীর্ঘ দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অনুরোধে প্রফুল্লচন্দ্র ১৯১৬ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্স বা রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে যোগ দেন। ইংরেজ সরকারের কোন সাহায্য ছাড়াই আইনজীবী তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের দানে ১৯১৪ সালে এই কলেজ স্থাপিত হয়।

নিজে বড়লোকের ঘরের ছেলে হয়েও দরিদ্র সংস্কারাচ্ছন্ন দেশবাসীর প্রতি তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসাই বোধহয় তাঁকে পরাধীন ভারতে অজস্র প্রতিকুলতার মধ্যেও কিছু অসম্ভব কর্মসাধন করতে সাহায্য করেছিল।তিনি বেঙ্গল কেমিক্যাল এর মত রাসায়নিক কারখানা তৈরিতে সফল হলেন।আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের হাত ধরে পরাধীন ভারতবাসীর রসায়ন চর্চা কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দিল যেদিন বেঙ্গল কেমিক্যাল এর উৎপন্ন বস্তু BP (British Pharmacopeia) লেভেল পেল।অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৪০ সালে কোম্পানীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে স্বেচ্ছায় কোম্পানী ছেড়ে চলে আসেন।ভাষা সাহিত্য বিজ্ঞান পরিবেশ সমাজসেবা সকল বিষয়েই তাঁর আগ্রহ ছিল অসামান্য।উপন্যাসের মাধ্যমে সমকালীন প্রায় সকল বিখ্যাত বাঙালির সঙ্গেই তাঁর হৃদয়ের যোগাযোগ দেখতে পাই।অগ্রজপ্রতিম জগদীশ চন্দ্র বসু ও সমবয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ছিল তাঁর আজীবন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।জানতে পারি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, ডঃ নীলরতন সরকার, ডঃ রাধাগোবিন্দ কর, নেতাজী সুভাষচন্দ্র ও গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।বইয়ে তৎকালীন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্রগণ সত্যেন্দ্রনাথ বোস, মেঘনাদ সাহা, সি ভি রমন, রাজশেখর বসু প্রমুখের প্রসঙ্গ উঠে এল। যেগুলি বইটিকে আরো মনোজ্ঞ করে তুলেছে। ছোটোবেলায় মনীষিদের জীবন নিয়ে আমাদের বাংলা রচনা লিখতে বলা হত। কিন্তু এ জীবনীভিত্তিক উপন্যাস আরো অনেককিছু বলবে। আজীবন আচার্য'র জীবন যুদ্ধ তাঁকে কেমন করে নিরলস কর্ম তাপস করে তুলেছিল তা পড়ে ভাবতে হবে পাঠককে। 

আচার্যের জীবন অবলম্বনে এই উপন্যাস যার মধ্যে সমসাময়িক বাঙলার ইতিহাস ও ভারতবর্ষের আধুনিক রসায়ন চর্চার ক্রমবিকাশ প্রোথিত। স্বল্পমূল্যের এই বইটি স্কুল কলেজের লাইব্রেরীতে স্থান পাওয়ার যোগ্য।ব্যক্তিগতভাবেও এটি সংগ্রহের তালিকায় আসতে পারে। বিশেষত, অধুনা বঙ্গ সমাজে যখন parenting একটা issue, আচার্যের অভিবাবকদের প্রতি সন্তানের শিক্ষা সম্মন্ধে উপদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।রসায়ন শিক্ষায় যুক্ত বিশিষ্টজনদের কাছে বইটি কদর পাবে বলে বিশ্বাস রাখি।

লেখকের রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের সহপাঠী  অতনু রায় (সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটরীমৎস্য দফতর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) রিভিউ লিখলেন 

৩ জানু, ২০২৪

প্রফুল্ল রসায়নী - একটি ব্যাতিক্রমী জীবনোপন্যাস - ড: পার্থ সারথি দস্তিদার

 



প্রফুল্ল রসায়নী

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক- মান্দাস

প্রচ্ছদ- সুপ্রসন্ন কুণ্ডু

মূল্য- ৩০০/-

প্রথমেই বলি লেখিকার পক্ষে খুব শক্ত ছিল কাজটা। প্রফুল্লচন্দ্র-চরিত্রের যে অসংখ্য ডাইমেনশন। তাঁর আমৃত্যু রসায়ন প্রেম আর যে বেঙ্গল কেমিক্যাল ছিল তাঁর স্বপ্নের ফসল তাঁকেই একদিন হটানো হল সেই বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে। 

উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ সহ সব মনিষী দের সঙ্গে ওঠাবসার গল্প আর last not least প্রেসিডেন্সির কেমিস্ট্রি পড়া আর পড়ানোর অভিজ্ঞতা। সায়েন্স কলেজে কেমিস্ট্রি  বিভাগ খোলা... সে কত লড়াই, কত আত্মত্যাগ... আর বলব না। আপনারা বইটা হাতে তুলেই নাহয় দেখবেন।

রাজাবাজার সাইন্স কলেজ এর কৃতি ছাত্রী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এর লেখা উপন্যাস "প্রফুল্ল রাসায়নী" পড়লাম বললে ভুল হবে। গোগ্রাসে গিললাম। ইন্দিরার আগের সব লেখার মতোই (যত গুলো আমি পড়েছি) এই বইটিও অত্যান্ত সুপাঠ্য।  'প্রফুল্ল রাসায়নী' আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর জীবনী অবলম্বনে লেখা উপন্যাস। 

গল্পের শুরু রসায়নাচার্য, শিক্ষাব্রতী, ফিল্যান্থ্রপিস্ট, এন্টারপ্রেনর স্যার  পি সি রায় এর জীবন সায়াহ্ন দিয়ে। অনেকটা ফিরে দেখার মতো। বৃদ্ধ প্রফুল্লচন্দ্র নিজের গ্রামে এসেছেন (অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার রাডুলি গ্রাম) তাঁর শেষ অভিভাষণ দিতে বিরাশি বছর বয়সে। সেখান থেকে অনেকটা ফ্ল্যাশ ব্যাক এর মতো গল্প বলার শুরু।প্রকৃতির কোলে তাঁর গ্রামে বড় হয়ে ওঠা, কিশোর বয়সে কলকাতার ইস্কুলে ভর্তি হওয়া, সেখান থেকে ধীরেধীরে পৃথিবী বিখ্যাত রসায়নবিদ হয়ে ওঠার কাহিনি। কি ভাবে তিনি এগেইনস্ট অল অড্স নিজের ভাড়া বাড়িতে শুরু করলেন পরাধীন ভারতের প্রথম কেমিকাল ও মেডিসিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। কিভাবে তিনি মাত্র চৌতিরিশ বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার করে বিজ্ঞান মহলে তাকে লাগিয়ে দিলেন। তাঁর ছোট থেকে বেড়ে ওঠা, বাবা মা, দাদাদের তাঁর জীবনে অবদান, ওই সময়ের বিখ্যাত সব গুণীজন এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ওঠাবসা, ভাবনাচিন্তার আদান প্রদান, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র এর সঙ্গে সখ্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিজ্ঞানীর কর্তব্য, শয়নে স্বপনে রসায়ন, তার উন্নতি, প্রয়োগ অতি প্রাঞ্জলভাবে উঠে এসেছে লেখিকার কলমের জাদুতে। আজকের দিনে যা স্টার্ট আপ বলে সবাই জানে তেমনি তো ছিল তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত বেঙ্গল কেমিক্যালের ভ্রূণ। প্রফুল্ল রসায়নী তে উঠে এসেছে রাজশেখর বসু সহ অনেকের সঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্রের ইন্টারঅ্যাকশন। সেকালে দেশে কয়েক হাজার লোকের কর্ম সংস্থান করা, কৃতি ছাত্র তৈরী করা - সব কিছু অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছে ইন্দিরা। তাঁর চরিত্রের অনেকগুলি অ্যাঙ্গেল তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁর স্বদেশপ্রেম থেকে ব্যবসা প্রীতি অন্যতম।  বাঙালি জাতি যে একে অন্য নামিয়ে দিয়ে আনন্দ পাই , খুব সহজেই ভুলে যাই প্রফুল্লচন্দ্র বা সেই রকম অনেক গুণীজন কে অথবা ফর রং রিজন কোনো গুণীজন কে শুধু সমালোচলা করার জন্য আলোচনা করি - সেই রকম ঘটনা যেটা প্রফুল্লচন্দ্রকে নিয়ে অতি সম্প্রতি কালে একটি লিডিং সংবাদ পত্রে হয়েছিল সেটাও ইন্দিরা খুবই দক্ষতার সঙ্গে তা নিজের কল্পনায় অতি যত্নে ফুটিয়ে তুলেছে। বাস্তবের একজন বিজ্ঞানী যেন প্রমাণ করেই ছাড়লেন "প্রফুল্লচন্দ্র মরিয়া প্রমাণ করলেন যে তিনি করেন নাই" এককথায় অনবদ্য উপস্থাপনা । আমার মনে হয় 'প্রফুল্ল রাসায়নী' সবার পড়া উচিত, কর্মতাপস প্রফুল্লচন্দ্র সম্পর্কে জানতে হলে। সমস্ত স্কুল কলেজ রিসার্চ ইনস্টিটিউশন এর লাইব্রেরি তে থাকা উচিত। 





[প্রফেসর পার্থসারথি দস্তিদার রাজাবাজার সাইন্স কলেজ থেকে জৈব রসায়নে মাস্টার্স করে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সিটিউট অফ সাইন্স থেকে পি এইচ ডি করেছেন। ভাবনগর অবস্থিত সি এস আই আর ইনস্টিটিউট সি এস এম সি আর আই তে ৯ বছর সায়েন্টিস্ট পদে থাকার পর ২০০৭ থেকে কলকাতার ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর টি কাল্টিভেশন অফ সাইন্স এ সিনিয়র প্রফেসর পদে কর্মরত। বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এ ১৫০ এর বেশি রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছেন। ১৯১৮ সালে ইন্ডিয়ান একাডেমী অফ সাইন্স, বেঙ্গালুরু এর ফেলো নির্বাচিত হন।]



প্রফুল্ল রসায়নী সংগ্রহ করতে 

কলেজস্ট্রিটে বইটি পাওয়া যাচ্ছে- মান্দাস, দে’জ, দে বুক স্টোর(দীপুদা) এবং ধ্যানবিন্দুর বিপণিতে।

বাংলাদেশে পাওয়া যাবে ‘বাতিঘর’, ঢাকার ‘কলকাতা বুকস্’এবং 'তক্ষশিলা'য়। 

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় এবার মান্দাসের স্টল নম্বর ৬৫৩। ন' নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে। ১৮-৩১ জানুয়ারি, সেন্ট্রাল পার্ক, বইমেলা প্রাঙ্গণ

অনলাইনে অর্ডার করতে পারেন boighar.in-এর ওয়েবসাইটে, amazon এবং flipkart-এ। এছাড়াও ডাকযোগে পেতে হলে বিক্রেতা এবং সাধারণ পাঠক হোয়াটসঅ্যাপ করুন 84798 73803 নাম্বারে।

৮৪৭৯৮৭৩৮০৩

mandaspublication@gmail.com। ১৮, সূর্য সেন স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০১২

১৭ অক্টো, ২০২৩

দীপান্বিতা


কার্তিক লক্ষ্মী দীপান্বিতা


বর্ধমান হল পশ্চিমবাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। মাড়োয়ারি, গুজরাটি সহ বহু রাজ্যের মানুষের বাস এখানে। সেই সঙ্গে যে বাঙালীরা এখানকার প্রাচীন বাসিন্দা তাদের সকলের সংস্কৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এই জেলায় কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজোর দিনে ঘটিদের হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মী পুজো। অবাঙালী ব্যবসায়ীরা বলে দীপাণ্বিতা কালীপুজো।

দীপাবলী বা দেওয়ালির সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর কথা অনেকেই জানিনা। রামায়ণ অনুসারে দীপাবলী হল রামের রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করা উপলক্ষে আলোক উৎসব। দীপাবলীর আলোকসজ্জা এবং শব্দবাজি সেই অধ্যায়কে সামনে রেখেই আজও সমাদৃত ।কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে।আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায়

কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়।
দীপাবলীর আগের দিন চতুর্দশীকে বলা হয়নরকা চতুর্দশী।দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন।

চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলী উৎসবের দ্বিতীয় দিন শাক্ত ধর্মের অনুসারীগণ শক্তি দেবী কালীর পূজা করেন।
আলোকসজ্জার মাধ্যমে অন্ধকারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দিন। সকল অজ্ঞতা তমোভাবকে দীপের আলোয় প্রজ্বলিত করার দিন। কেউ বলেন মহালয়ায় যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্ত্যে এসেছিলেন, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে দিন আলোকসজ্জা বাজি পোড়ানো হয়, দরজা-জানালায় মোম বাতি দেওয়া হয় কেউ বা জ্বালায় আকাশপ্রদীপ।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি।

পশ্চিমবাংলায় অনেকের রীতি কালীপুজোর বিকেলে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজো করে অলক্ষ্মী বিদেয় করা সংসারের শ্রীবৃদ্ধির আশায় লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো পিটুলি বাটা দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরী হয় তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়

চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,

"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে। এই দিনে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী বরদাত্রী রূপে ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।
দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর ব্রতকথায় আবারো উঠে আসে লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য
এক রাজার পাঁচ মেয়ে। একদিন তিনি সকলকে ডেকে জিগেস করলেন, তারা কে কার ভাগ্যে খায়? কনিষ্ঠা কন্যাটি ছাড়া প্রত্যেকেই সমস্বরে জানাল, রাজার ভাগ্যে তারা খায়। কিন্তু কনিষ্ঠা বলল সে নিজের ভাগ্যে খায়। আর মা লক্ষ্মী তার সহায়। সেই কথা শুনে রাজা অগ্নিশর্মা। ঠিক করলেন পরদিন ভোরে উঠে যার মুখ দেখবেন তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। পরদিন রাজবাড়ির সামনে দিয়ে এক বামুন তার পুত্রকে নিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে তিনি ছোটমেয়ের বিয়ে দিলেন। পুত্র রাজার জামাই হল বলে বামুন একাধারে খুশি আবার মহাচিন্তিত। রাজকন্যা তো মহানন্দে শ্বশুরবাড়ি চলল। অভাবের সংসার। মেয়েটি শ্বশুরকে বলল, রাস্তায় যা দেখবেন সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। বামুন একদিন একটি মরা কেউটে দেখতে পেল। বৌমার কথামত সেটি ঘরে নিয়ে এনে মাচায় তুলে রাখল। এবার সে দেশের আরেক রাজার ছেলের অসুখ করেছে। রাজবৈদ্য বলেছে মরা কেউটের মাথা আনলে ওষুধ তৈরী করতে পারে। সেইমত রাজা ঢেঁড়া পেটালেন। যে মরা কেউটের মাথা এনে দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই দেবেন
সেই শুনে রাজকন্যা তখুনি সেই মরা কেউটের মাথাটা রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল। আর সেই সঙ্গে তার শ্বশুরকেও বলে দিল, রাজা কিছু দিতে চাইলে যেন তিনি না নেন শুধু রাজার কাছে তার অর্জি হল একটাই। কার্তিক অমাবস্যায় রাজার রাজত্বের কোনো গ্রামে কেউ যেন ঘরে আলো না জ্বালায়। রাজকন্যার শ্বশুর তা জানিয়ে ফিরে এলেন খালি হাতে। অবশেষে কার্তিক অমাবস্যার রাতে রাজকন্যা নিজের ঘরে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে লক্ষ্মী পুজো করল।নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে আলো জ্বেলে রাখল। মা লক্ষ্মী দেখলেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেবল তাঁর ব্রতীর ঘরেই আলো জ্বলছে। তাঁর কৃপায় বামুনের ঘরে আর কোনো অর্থাভাব ইল না। অবস্থা ভাল হতে বামুন পুকুর কাটালেন। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রাজকন্যার বাবা ভূতপূর্ব রাজাও উপস্থিত। তিনি জানালেন তাঁর দুরবস্থার কথা। নিজের অহমিকায় তাঁর সর্ব নাশ হয়েছে। তিনি আজ ভিখারী। মেয়ে জানাল, "বাবা তুমি লক্ষ্মীপুজো কর। তুমি সেদিন রেগে গিয়েছিলে আমার ওপর। আজ দেখলে তো মা লক্ষ্মীর কৃপাতেই আমার সব হয়েছে"