১৬ এপ্রি, ২০২৫

৫১ বর্তী - বাঙালির হারানো ৫১ পদ

 


৫১বর্তী বইটির রিভিউ লিখলেন 

হায়দ্রাবাদের বাসিন্দা, সক্রিয় নাট্য ব্যাক্তিত্ব, একটি LPO তে কর্মরত সৃষ্টিশীল মানুষ শ্রীমতী রীতা ঘোষ। 


৫১ বর্তী : বাঙালির হারানো ৫১ পদ 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এর এই বইটি কয়েকদিন ধরে পড়তে পড়তে আমার মন যেন কোথায় ভেসে যেত, তাই তো অনেক বেশি সময় নিয়ে পড়লাম। মন চলে যেত সেই ছোটবেলার দিনগুলিতে, যখন, অনেক রান্নাঘরেই কয়লার উনুন ছিল।  সেই রান্নার স্বাদই ছিল আলাদা, সাধারণ মাছের ঝোল বা ডিমের ডালনা হয়ে উঠতো অতুলনীয়।  আমার অনেক আত্মীয়র বাড়িতে, ঝকঝকে সোনার মতো কাঁসার থালাতে খেতাম।  আহা, সেই সব দিন যেন কোথায় হারিয়ে গেলো।  আবার কখনো, দিদার বাড়িতে, খেতাম ,আমার জন্য রাখা স্টিল এর থালায়, দিদার হাতে গোবিন্দভোগ চালের ভাত, ঘি বা মাখন দিয়ে মাখা, সঙ্গে আলুসেদ্ধ।  দিদা,  থালায়, ভাতের গোল্লা করে রাখতেন, আমায় গল্প বলে খাওয়াতেন, আর সেই গোল্লাগুলি ছিল, কাকের ডিম্, বকের ডিম্, হাঁসের ডিম্ ইত্যাদি।  অতি সাধারণ খাবার হয়ে উঠতো অসামান্য। আমার মায়ের ও শাশুড়ি মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে  গেল। আমার বাপের বাড়ি, মামার বাড়ি ও শ্বশুর  বাড়ি, সবই ওপার বাংলার, তাই রান্নাতে ওপার ও এপার বাংলার প্রভাব। আমার শাশুড়ির হাতের শুঁটকি মাছের ঝাল বা চিতল মাছের মুইঠ্যা আমার প্রিয় খাবারের মধ্যে পড়ে।  সেই সঙ্গে, বিউলির ডাল, আলু পোস্ত, ভেটকি মাছের কাঁটা চচড়ি, চিংড়ি মাছ- সবই আমার অতি লোভনীয় খাদ্য। 

বইটি হাতে পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম, এটি একটি রান্নার বই।  কিন্তু না, কি অপূর্ব, কনসেপ্ট, সুন্দর স্মৃতিচারণার মধ্যে দিয়ে রান্নাঘরের হেঁশেল কথা।  ভাষার গাঁথুনিও চমৎকার। রেসিপি শেয়ার করেছেন  ঠিকই কিন্তু, সেটা একটা গল্পের মাধ্যমে, স্মৃতিচারণ করতে করতে। এটাই বইটির মাধুর্য্য বাড়িয়েছে। ইন্দিরার  লেখাতে, ঈশ্বর গুপ্ত মহাশয় আছেন, আছে  ঠাকুরবাড়ির প্রসঙ্গ। আছে মঙ্গল কাব্যের ও চৈতন্যচারিতামৃতর  রেফারেন্স। রান্নার প্রসঙ্গে, খাবারের আলোচনায় মহেন্দ্রনাথ দত্ত, রাসবিহারী বসু, বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়, বাসন্তী দেবী, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, অমৃতলাল বসু কে নেই... কত যে আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক হতে পারে একটি সাধারণ রান্নার বই তা না পড়লে বোঝা যায়না। গবেষণা যে শুধু তথ্যপূর্ণ তা নয়, তা লেখাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আমি কুর্নিশ জানাই লেখিকার অধ্যাবসায় ও রান্নার প্রতি আবেগ কে। 

বিশ্বায়নের দৌলতে, আজ আমরা কত জানছি আর শিখছি, শুধু তাই নয়, পুরাতন ও আধুনিক এর একটা মেলবন্ধন করতে পারছি। সেটা যে আহারেও প্রযোজ্য, তার নিদর্শন হল ৫১ বর্তী ।  হেঁশেলে বৈচিত্রর অভাব নেই, আমাদের গুরুজনেরা সেই বৈচিত্র কে কাজে লাগিয়ে আমাদের প্রজন্ম ও আগামী আরও অনেক প্রজন্মকে কত কি শিখিয়ে গেছেন। এই ভাবেই তো আমাদের সমাজ এগিয়ে চলছে। 

সবার শেষে, খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়লাম, সপ্তকন্যার রান্নার ২৫ টি পরামর্শ ও কৌশল।  প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এটা জরুরি।  না খেয়ে তো থাকা যাবে না, আর খেতে গেলে, রান্নাও করতে হবে, আর রান্না করতে গেলে, হেঁশেল ও সামলাতে হবে। ইন্দিরা  বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর জীবনে দেখা সুরাঁধিয়ে সপ্তকন্যাকে। কি ভালো যে লাগলো, আমি নিশ্চিত, তাঁরা লেখিকাকে  অনেক আশীর্বাদ করছেন ওপর থেকে আর তাঁদের স্নেহের ছায়াতে  ঘিরে আছেন।

ঠিক করেছি, বাঙালির হারানো ৫১ পদের মধ্যে, দু চারটে তো রাঁধবই বিশেষ দিনে।  সত্যিই  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের এই বইটি সব মেয়েদের পড়া উচিৎ। মন ভরে যাবেই।



আরও একটি চমৎকার রিভিউ পড়তে ইন্সক্রিপ্টের লিংকে পড়ুন। 




২৭ জানু, ২০২৪

প.ব মৎস্য দফতরের সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটরী অতনু রায় লিখলেন প্রফুল্ল রসায়নী নিয়ে



 

"প্রফুল্ল রসায়নী" 

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

মান্দাস 


রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের মেধাবী সহপাঠী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের লেখা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনোপন্যাস "প্রফুল্ল রসায়নী" একখানি ঐতিহাসিক দলিল। উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি পাঠকের কাছে  সমসাময়িক বাঙলার ইতিহাস ও ভারতবর্ষে আধুনিক রসায়ন শিক্ষার ক্রমবিকাশ তুলে ধরেছেন। প্রফুল্লচন্দ্র এমন একটা সময়ে জন্মগ্রহণ করেন যখন ভারতবর্ষে সবেমাত্র ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একশ বছরের অরাজকতার অবসানে ইংরেজদের রাণীর ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে।ইংরেজ তার সবচেয়ে সম্পদশালী উপনিবেশে শিক্ষা স্বাস্থ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা ভাবতে শুরু করেছে।অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার রাডুলি-কাটিপাড়া গ্রামে ১৮৬১ সালে এক প্রগতিশীল শিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম।পিতা হরিশচন্দ্র ছিলেন মুক্তমনা সুশিক্ষিত মানুষ।নেতাজী সুভাষচন্দ্রের পিতা জানকীনাথ বোসের এলবার্ট স্কুলের সহপাঠী এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিশেষ স্নেহধন্য। মা ভুবনমোহিনী বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে বাংলার পাঠ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।এমন বাবা মায়ের আদরে ও সান্নিধ্যে, পিতারই প্রতিষ্ঠিত গ্রামের স্কুলে প্রফুল্লচন্দ্রের পড়াশোনা শুরু। মা ও বাবার সঙ্গে প্রফুল্লর সংলাপগুলি কাল্পনিক হলেও উপন্যাসে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। 

সন্তানের উচ্চতম শিক্ষার উদ্দেশ্যে হরিশচন্দ্র পরিবারসহ চলে এলেন কলকাতায়। বালক প্রফুল্লচন্দ্র প্রথমে হেয়ার স্কুল ও তারপর  এলবার্ট স্কুল থেকে বিদ্যালয় শিক্ষা শেষ করে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে এফ এ পড়তে ভর্তি হন।সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ। শুরু হলো ব্রিটিশ প্রফেসর আলেকজান্ডার পেডলারের তত্ত্বাবধানে রসায়ন শিক্ষা। পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দেয় প্রেসিডেন্সি কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যাবের গল্প। আমরাও সেখানে কাজ করেছি। পরীক্ষা দিয়েছি। মেলাতে চেষ্টা করি। শিহরিত হই। 

অতঃপর গিলক্রিস্ট বৃত্তি নিয়ে ১৮৮২ সালে বিলেতে পাড়ি। এসে পৌঁছলেন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে।বিলেতে পূর্ণ সান্নিধ্য ও সহযোগিতা পেলেন অগ্রজপ্রতিম জগদীশ চন্দ্র বসুর। প্রেসিডেন্সির সিনিয়র 'জগদীশদা'র সঙ্গে ছাত্র প্রফুল্লর সংলাপ  চমৎকার সুখপাঠ্য। 

এডিনবার্গে তাঁর শিক্ষক ছিলেন লন্ডন ইউনিভারসিটির প্রথম ডিএসসি ডিগ্রিধারী প্রফেসর আলেকজান্ডার ক্রাম ব্রাউন।১৮৮৫ সালে বিএসসি ডিগ্রি লাভ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় ডাক পাওয়া।কনজুগেটেড সালফেট নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং মাত্র দু বছরে ১৮৮৭ সালে একসঙ্গে ডিএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ।১৮৮৮ সালে দেশে ফিরে এলেন। এবারও তাঁকে  স্বাগত জানাতে উপস্থিত সস্ত্রীক জগদীশ চন্দ্র।প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে ১৮৮৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান।একদিকে রসায়নের ল্যাবরেটরিতে অনলস গবেষণাকার্য ও অপর দিকে স্বজাতিকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান ও শিল্পের সংমিশ্রণ ঘটানোর অনাবিল প্রচেষ্টা।১৮৯২ সালে আপার সার্কুলার রোডের নিজের ভাড়াবাড়িতে তাঁর স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কসের ভিত্তি স্থাপন।১৮৯৫ সালে তাঁর মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার তাঁকে বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে সুপরিচিত করে তোলে।১৯০২ সালে তাঁর রচিত গবেষণাপত্র A History of Hindu Chemistry Part-1 ইউরোপ ও আমেরিকার মত এশিয়া খন্ডেও বিজ্ঞানের সার্বভৌম চর্চা সম্মন্ধে তৎকালীন বিশ্বকে অবগত করে।১৯০৪ সালে প্রফুল্লচন্দ্রর সুযোগ হয় দ্বিতীয় দফা স্বল্পকালের ইউরোপ ভ্রমণের। এবার তিনি নব্য রসায়নশাস্ত্রের পীঠস্থান প্যারীসেও আসেন এবং সাক্ষাৎ হয় রসায়নের ঋষি বার্থেলোর সঙ্গে। পরবর্তীতে ১৯০৯ সালে হিন্দু রসায়ন বইটির দ্বিতীয় খন্ডটি তিনি বার্থেলোকেই উৎসর্গ করেন।১৯০৬ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর দীর্ঘ দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অনুরোধে প্রফুল্লচন্দ্র ১৯১৬ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ অব সায়েন্স বা রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে যোগ দেন। ইংরেজ সরকারের কোন সাহায্য ছাড়াই আইনজীবী তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘোষের দানে ১৯১৪ সালে এই কলেজ স্থাপিত হয়।

নিজে বড়লোকের ঘরের ছেলে হয়েও দরিদ্র সংস্কারাচ্ছন্ন দেশবাসীর প্রতি তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসাই বোধহয় তাঁকে পরাধীন ভারতে অজস্র প্রতিকুলতার মধ্যেও কিছু অসম্ভব কর্মসাধন করতে সাহায্য করেছিল।তিনি বেঙ্গল কেমিক্যাল এর মত রাসায়নিক কারখানা তৈরিতে সফল হলেন।আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের হাত ধরে পরাধীন ভারতবাসীর রসায়ন চর্চা কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দিল যেদিন বেঙ্গল কেমিক্যাল এর উৎপন্ন বস্তু BP (British Pharmacopeia) লেভেল পেল।অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৪০ সালে কোম্পানীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে স্বেচ্ছায় কোম্পানী ছেড়ে চলে আসেন।ভাষা সাহিত্য বিজ্ঞান পরিবেশ সমাজসেবা সকল বিষয়েই তাঁর আগ্রহ ছিল অসামান্য।উপন্যাসের মাধ্যমে সমকালীন প্রায় সকল বিখ্যাত বাঙালির সঙ্গেই তাঁর হৃদয়ের যোগাযোগ দেখতে পাই।অগ্রজপ্রতিম জগদীশ চন্দ্র বসু ও সমবয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ছিল তাঁর আজীবন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।জানতে পারি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, ডঃ নীলরতন সরকার, ডঃ রাধাগোবিন্দ কর, নেতাজী সুভাষচন্দ্র ও গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।বইয়ে তৎকালীন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্রগণ সত্যেন্দ্রনাথ বোস, মেঘনাদ সাহা, সি ভি রমন, রাজশেখর বসু প্রমুখের প্রসঙ্গ উঠে এল। যেগুলি বইটিকে আরো মনোজ্ঞ করে তুলেছে। ছোটোবেলায় মনীষিদের জীবন নিয়ে আমাদের বাংলা রচনা লিখতে বলা হত। কিন্তু এ জীবনীভিত্তিক উপন্যাস আরো অনেককিছু বলবে। আজীবন আচার্য'র জীবন যুদ্ধ তাঁকে কেমন করে নিরলস কর্ম তাপস করে তুলেছিল তা পড়ে ভাবতে হবে পাঠককে। 

আচার্যের জীবন অবলম্বনে এই উপন্যাস যার মধ্যে সমসাময়িক বাঙলার ইতিহাস ও ভারতবর্ষের আধুনিক রসায়ন চর্চার ক্রমবিকাশ প্রোথিত। স্বল্পমূল্যের এই বইটি স্কুল কলেজের লাইব্রেরীতে স্থান পাওয়ার যোগ্য।ব্যক্তিগতভাবেও এটি সংগ্রহের তালিকায় আসতে পারে। বিশেষত, অধুনা বঙ্গ সমাজে যখন parenting একটা issue, আচার্যের অভিবাবকদের প্রতি সন্তানের শিক্ষা সম্মন্ধে উপদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।রসায়ন শিক্ষায় যুক্ত বিশিষ্টজনদের কাছে বইটি কদর পাবে বলে বিশ্বাস রাখি।

লেখকের রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজের সহপাঠী  অতনু রায় (সিনিয়র স্পেশ্যাল সেক্রেটরী, মৎস্য দফতর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) রিভিউ লিখলেন 

৩ জানু, ২০২৪

প্রফুল্ল রসায়নী - একটি ব্যাতিক্রমী জীবনোপন্যাস - ড: পার্থ সারথি দস্তিদার

 



প্রফুল্ল রসায়নী

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক- মান্দাস

প্রচ্ছদ- সুপ্রসন্ন কুণ্ডু

মূল্য- ৩০০/-

প্রথমেই বলি লেখিকার পক্ষে খুব শক্ত ছিল কাজটা। প্রফুল্লচন্দ্র-চরিত্রের যে অসংখ্য ডাইমেনশন। তাঁর আমৃত্যু রসায়ন প্রেম আর যে বেঙ্গল কেমিক্যাল ছিল তাঁর স্বপ্নের ফসল তাঁকেই একদিন হটানো হল সেই বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে। 

উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ সহ সব মনিষী দের সঙ্গে ওঠাবসার গল্প আর last not least প্রেসিডেন্সির কেমিস্ট্রি পড়া আর পড়ানোর অভিজ্ঞতা। সায়েন্স কলেজে কেমিস্ট্রি  বিভাগ খোলা... সে কত লড়াই, কত আত্মত্যাগ... আর বলব না। আপনারা বইটা হাতে তুলেই নাহয় দেখবেন।

রাজাবাজার সাইন্স কলেজ এর কৃতি ছাত্রী ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এর লেখা উপন্যাস "প্রফুল্ল রাসায়নী" পড়লাম বললে ভুল হবে। গোগ্রাসে গিললাম। ইন্দিরার আগের সব লেখার মতোই (যত গুলো আমি পড়েছি) এই বইটিও অত্যান্ত সুপাঠ্য।  'প্রফুল্ল রাসায়নী' আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এর জীবনী অবলম্বনে লেখা উপন্যাস। 

গল্পের শুরু রসায়নাচার্য, শিক্ষাব্রতী, ফিল্যান্থ্রপিস্ট, এন্টারপ্রেনর স্যার  পি সি রায় এর জীবন সায়াহ্ন দিয়ে। অনেকটা ফিরে দেখার মতো। বৃদ্ধ প্রফুল্লচন্দ্র নিজের গ্রামে এসেছেন (অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার রাডুলি গ্রাম) তাঁর শেষ অভিভাষণ দিতে বিরাশি বছর বয়সে। সেখান থেকে অনেকটা ফ্ল্যাশ ব্যাক এর মতো গল্প বলার শুরু।প্রকৃতির কোলে তাঁর গ্রামে বড় হয়ে ওঠা, কিশোর বয়সে কলকাতার ইস্কুলে ভর্তি হওয়া, সেখান থেকে ধীরেধীরে পৃথিবী বিখ্যাত রসায়নবিদ হয়ে ওঠার কাহিনি। কি ভাবে তিনি এগেইনস্ট অল অড্স নিজের ভাড়া বাড়িতে শুরু করলেন পরাধীন ভারতের প্রথম কেমিকাল ও মেডিসিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। কিভাবে তিনি মাত্র চৌতিরিশ বছর বয়সে ১৮৯৫ সালে মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার করে বিজ্ঞান মহলে তাকে লাগিয়ে দিলেন। তাঁর ছোট থেকে বেড়ে ওঠা, বাবা মা, দাদাদের তাঁর জীবনে অবদান, ওই সময়ের বিখ্যাত সব গুণীজন এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ওঠাবসা, ভাবনাচিন্তার আদান প্রদান, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র এর সঙ্গে সখ্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিজ্ঞানীর কর্তব্য, শয়নে স্বপনে রসায়ন, তার উন্নতি, প্রয়োগ অতি প্রাঞ্জলভাবে উঠে এসেছে লেখিকার কলমের জাদুতে। আজকের দিনে যা স্টার্ট আপ বলে সবাই জানে তেমনি তো ছিল তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত বেঙ্গল কেমিক্যালের ভ্রূণ। প্রফুল্ল রসায়নী তে উঠে এসেছে রাজশেখর বসু সহ অনেকের সঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্রের ইন্টারঅ্যাকশন। সেকালে দেশে কয়েক হাজার লোকের কর্ম সংস্থান করা, কৃতি ছাত্র তৈরী করা - সব কিছু অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছে ইন্দিরা। তাঁর চরিত্রের অনেকগুলি অ্যাঙ্গেল তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁর স্বদেশপ্রেম থেকে ব্যবসা প্রীতি অন্যতম।  বাঙালি জাতি যে একে অন্য নামিয়ে দিয়ে আনন্দ পাই , খুব সহজেই ভুলে যাই প্রফুল্লচন্দ্র বা সেই রকম অনেক গুণীজন কে অথবা ফর রং রিজন কোনো গুণীজন কে শুধু সমালোচলা করার জন্য আলোচনা করি - সেই রকম ঘটনা যেটা প্রফুল্লচন্দ্রকে নিয়ে অতি সম্প্রতি কালে একটি লিডিং সংবাদ পত্রে হয়েছিল সেটাও ইন্দিরা খুবই দক্ষতার সঙ্গে তা নিজের কল্পনায় অতি যত্নে ফুটিয়ে তুলেছে। বাস্তবের একজন বিজ্ঞানী যেন প্রমাণ করেই ছাড়লেন "প্রফুল্লচন্দ্র মরিয়া প্রমাণ করলেন যে তিনি করেন নাই" এককথায় অনবদ্য উপস্থাপনা । আমার মনে হয় 'প্রফুল্ল রাসায়নী' সবার পড়া উচিত, কর্মতাপস প্রফুল্লচন্দ্র সম্পর্কে জানতে হলে। সমস্ত স্কুল কলেজ রিসার্চ ইনস্টিটিউশন এর লাইব্রেরি তে থাকা উচিত। 





[প্রফেসর পার্থসারথি দস্তিদার রাজাবাজার সাইন্স কলেজ থেকে জৈব রসায়নে মাস্টার্স করে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সিটিউট অফ সাইন্স থেকে পি এইচ ডি করেছেন। ভাবনগর অবস্থিত সি এস আই আর ইনস্টিটিউট সি এস এম সি আর আই তে ৯ বছর সায়েন্টিস্ট পদে থাকার পর ২০০৭ থেকে কলকাতার ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর টি কাল্টিভেশন অফ সাইন্স এ সিনিয়র প্রফেসর পদে কর্মরত। বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এ ১৫০ এর বেশি রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছেন। ১৯১৮ সালে ইন্ডিয়ান একাডেমী অফ সাইন্স, বেঙ্গালুরু এর ফেলো নির্বাচিত হন।]



প্রফুল্ল রসায়নী সংগ্রহ করতে 

কলেজস্ট্রিটে বইটি পাওয়া যাচ্ছে- মান্দাস, দে’জ, দে বুক স্টোর(দীপুদা) এবং ধ্যানবিন্দুর বিপণিতে।

বাংলাদেশে পাওয়া যাবে ‘বাতিঘর’, ঢাকার ‘কলকাতা বুকস্’এবং 'তক্ষশিলা'য়। 

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় এবার মান্দাসের স্টল নম্বর ৬৫৩। ন' নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে। ১৮-৩১ জানুয়ারি, সেন্ট্রাল পার্ক, বইমেলা প্রাঙ্গণ

অনলাইনে অর্ডার করতে পারেন boighar.in-এর ওয়েবসাইটে, amazon এবং flipkart-এ। এছাড়াও ডাকযোগে পেতে হলে বিক্রেতা এবং সাধারণ পাঠক হোয়াটসঅ্যাপ করুন 84798 73803 নাম্বারে।

৮৪৭৯৮৭৩৮০৩

mandaspublication@gmail.com। ১৮, সূর্য সেন স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০১২

১৭ অক্টো, ২০২৩

দীপান্বিতা


কার্তিক লক্ষ্মী দীপান্বিতা


বর্ধমান হল পশ্চিমবাংলার অন্যতম বিজনেস সেন্টার। মাড়োয়ারি, গুজরাটি সহ বহু রাজ্যের মানুষের বাস এখানে। সেই সঙ্গে যে বাঙালীরা এখানকার প্রাচীন বাসিন্দা তাদের সকলের সংস্কৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে এই জেলায় । কার্তিকমাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজোর দিনে ঘটিদের হয় দীপাণ্বিতা লক্ষ্মী পুজো। অবাঙালী ব্যবসায়ীরা বলে দীপাণ্বিতা কালীপুজো।

দীপাবলী বা দেওয়ালির সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর কথা অনেকেই জানিনা। রামায়ণ অনুসারে দীপাবলী হল রামের রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করা উপলক্ষে আলোক উৎসব। দীপাবলীর আলোকসজ্জা এবং শব্দবাজি সেই অধ্যায়কে সামনে রেখেই আজও সমাদৃত ।কোজাগরীর ঘোর কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর পরদিনেই ভূতচতুর্দশী। শুক্লপক্ষে আকাশ আলো করা রূপোর থালার মত চাঁদ, হিম ঝরানো জ্যোত্স্না আর শারদীয়ার মনখারাপ। দিন পনেরো কাটতে না কাটতেই কৃষ্ণপক্ষের সূচনা। ভূত চতুর্দশীর প্রস্তুতি। পূর্ণিমার চাঁদ এখন ঘুমোতে গেছে। ঝুপসি অন্ধকার আকাশের গায়ে।আসন্ন দীপাবলীর আলোর রোশনাই আর আকাশছোঁয়া ঘরবাড়ির আলোয়, বাজির গন্ধকী গন্ধে ভরপুর বাতাস। হিমের পরশ, ঝিমধরা নেশাগ্রস্ত ... ঋতু বৈচিত্র্যময়তায় ।

কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়।
দীপাবলীর আগের দিন চতুর্দশীকে বলা হয় ‘নরকা চতুর্দশী’।দেবী কালী নাকি কার্তিকমাসের এই চতুর্দশীর রাতে ভয়ানক অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেন।

চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলী উৎসবের দ্বিতীয় দিন শাক্ত ধর্মের অনুসারীগণ শক্তি দেবী কালীর পূজা করেন।
আলোকসজ্জার মাধ্যমে অন্ধকারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দিন। সকল অজ্ঞতা ও তমোভাবকে দীপের আলোয় প্রজ্বলিত করার দিন। কেউ বলেন মহালয়ায় যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্ত্যে এসেছিলেন, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে ঐ দিন আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানো হয়, দরজা-জানালায় মোম বাতি দেওয়া হয় । কেউ বা জ্বালায় আকাশপ্রদীপ।

ধনাগমের জন্য মানুষ করে ধনতেরস ও লক্ষ্মী-গণেশের পুজো। মূল উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীবৃদ্ধি আর উন্নতি।

পশ্চিমবাংলায় অনেকের রীতি কালীপুজোর বিকেলে দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপূজো করে অলক্ষ্মী বিদেয় করা । সংসারের শ্রীবৃদ্ধির আশায় লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরের পুজো । পিটুলি বাটা দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরী হয় তিন পুতুল.... সিঁদুর দিয়ে পিটুলির তৈরী লালরঙের লক্ষ্মী, নীলের গুঁড়ো দিয়ে নীল নারায়ণ, আর অপরাজিতা পাতা বাটা দিয়ে সবুজ কুবের । কলার পেটোতে সেই পুতুল তিনটিরই আসলে পূজো হয় ঐদিন । আর একটি কলার পেটোতে মাথা থেকে আঁচড়ানো চুলের নুড়ি, একটু গোবর আর একটা ভাঙা মোমবাতি রেখে তৈরী হয় অলক্ষী । চাটাই পিটিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে অলক্ষীকে বাড়ির বাইরে বের করে পূজো করে, লক্ষী, নারায়ণ আর ধনপতি কুবেরকে শাঁখ বাজিয়ে বরণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ।

চাটাই বাজাতে বাজাতে বলা হয়,

"অলক্ষ্মী বিদেয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক্" আসলে কুললক্ষ্মীর পুজো এই দীপাণ্বিতা ।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী কার্তিকমাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতেই সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলেন ধ্বন্বন্তরী। তাই এই তিথির নাম হল ধনতেরস। তাই এই দিনটিতে ধনের উপাসনা করতে হয়। আর তার ঠিক পরেপরেই লক্ষ্মীর পুজো করতে হয়। সমুদ্রের ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেদিন নাকি ছিল কার্তিক অমাবস্যা। তাই লক্ষ্মীকে বরণ করে স্বর্গে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুষ্ঠানটিতে আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়েছিল স্বর্গকে। এই দিনে ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী বরদাত্রী রূপে ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।
দীপাণ্বিতা লক্ষ্মীপুজোর ব্রতকথায় আবারো উঠে আসে লক্ষ্মীর মাহাত্ম্য ।
এক রাজার পাঁচ মেয়ে। একদিন তিনি সকলকে ডেকে জিগেস করলেন, তারা কে কার ভাগ্যে খায়? কনিষ্ঠা কন্যাটি ছাড়া প্রত্যেকেই সমস্বরে জানাল, রাজার ভাগ্যে তারা খায়। কিন্তু কনিষ্ঠা বলল সে নিজের ভাগ্যে খায়। আর মা লক্ষ্মী তার সহায়। সেই কথা শুনে রাজা অগ্নিশর্মা। ঠিক করলেন পরদিন ভোরে উঠে যার মুখ দেখবেন তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। পরদিন রাজবাড়ির সামনে দিয়ে এক বামুন তার পুত্রকে নিয়ে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে তিনি ছোটমেয়ের বিয়ে দিলেন। পুত্র রাজার জামাই হল বলে বামুন একাধারে খুশি আবার মহাচিন্তিত। রাজকন্যা তো মহানন্দে শ্বশুরবাড়ি চলল। অভাবের সংসার। মেয়েটি শ্বশুরকে বলল, রাস্তায় যা দেখবেন সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। বামুন একদিন একটি মরা কেউটে দেখতে পেল। বৌমার কথামত সেটি ঘরে নিয়ে এনে মাচায় তুলে রাখল। এবার সে দেশের আরেক রাজার ছেলের অসুখ করেছে। রাজবৈদ্য বলেছে মরা কেউটের মাথা আনলে ওষুধ তৈরী করতে পারে। সেইমত রাজা ঢেঁড়া পেটালেন। যে মরা কেউটের মাথা এনে দিতে পারবে সে যা চাইবে তাই দেবেন ।
সেই শুনে রাজকন্যা তখুনি সেই মরা কেউটের মাথাটা রাজার কাছে পাঠিয়ে দিল। আর সেই সঙ্গে তার শ্বশুরকেও বলে দিল, রাজা কিছু দিতে চাইলে যেন তিনি না নেন । শুধু রাজার কাছে তার অর্জি হল একটাই। কার্তিক অমাবস্যায় রাজার রাজত্বের কোনো গ্রামে কেউ যেন ঘরে আলো না জ্বালায়। রাজকন্যার শ্বশুর তা জানিয়ে ফিরে এলেন খালি হাতে। অবশেষে কার্তিক অমাবস্যার রাতে রাজকন্যা নিজের ঘরে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে লক্ষ্মী পুজো করল।নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে আলো জ্বেলে রাখল। মা লক্ষ্মী দেখলেন ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেবল তাঁর ব্রতীর ঘরেই আলো জ্বলছে। তাঁর কৃপায় বামুনের ঘরে আর কোনো অর্থাভাব র‌ইল না। অবস্থা ভাল হতে বামুন পুকুর কাটালেন। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে রাজকন্যার বাবা ভূতপূর্ব রাজাও উপস্থিত। তিনি জানালেন তাঁর দুরবস্থার কথা। নিজের অহমিকায় তাঁর সর্ব নাশ হয়েছে। তিনি আজ ভিখারী। মেয়ে জানাল, "বাবা তুমি লক্ষ্মীপুজো কর। তুমি সেদিন রেগে গিয়েছিলে আমার ওপর। আজ দেখলে তো মা লক্ষ্মীর কৃপাতেই আমার এ সব হয়েছে"