১৬ জুন, ২০২১

জগাদা-কোভিড সিরিজ



জগাদা-কোভিড সিরিজ / ইস্যু রথযাত্রা 

ওরা আজ বেড়াতে বেরুবে। ভোর থেকেই তার তোড়জোড়। একলাটি বিমলা বসে বসে ভাবছে ছাইপাঁশ। প্রতিবারের মতোই তার মন উচাটন। উৎকল দেশের সংস্কৃতি বলে কথা। যে দেশের নামের মূলে হল উৎকৃষ্ট কলা। তা বাপু, কলাই হোক আর মুলোই হোক অতিমারীর মধ্যে এসব কলাকৃষ্টি তে না সামিল হলে চলছিল না? জগাদা বলেছে, না চলে না, জানোই তো। দিন পনেরো নিভৃতবাসে থেকে তিন ভাইবোনের ক্যাটারপিলার ইন দ্যা গতর। অর্থাৎ গতরে শুঁয়োপোকা ধরে গেছে। না বেরিয়ে বেরিয়ে সুভদ্রার সাজপোশাকে বাহুল্য নেই। মদিরাসক্ত বলরামের ভুঁড়িটা যেন আরও বেড়েছে। তবে বলাই বাহুল্য বদ্ধ ঘরে বসে বসে শুধু ভালোমন্দ খেয়ে খেয়ে আর নিত্যি পাঁচন সেবন করে জগাদার অ্যাপেটাইট রসেবশে রয়েছে। 
কে জানে যাবার সময় সবাই মুখবন্ধনী পরল তো? বিমলা সুদর্শন কে বলে রেখেছিল কাল রাতে। মনে করে যেন মুখবন্ধনী গুলো নেওয়া হয়। সুভদ্রা আবার না কাঁদতে বসে। গতবারেও এমন বায়না ধরেছিল মেয়েটা। সে কিছুতেই মুখবন্ধনী চড়াবে না মুখে। সব সাজ ঢাকা পড়ে যাবে। একে বেরুনো হয়না। তায় একদিন বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে । তো মুখবন্ধনী পরবে না সে। ওষ্ঠরঞ্জনী চাপা পড়ে যাবে। তার স্টাইল স্টেটমেন্ট সবার চেয়ে আলাদা। ভীড়ের মাঝে হেড টার্নার সে। নাক মাটামাটা চোখ ভাসা। বৌদি হল গিয়ে লড়াকু, উগ্র জাত সুন্দরী। আর ননদ হল নরম স্বভাবের ঘরোয়া মেয়ে। বিমলার সেই নিয়ে ননদিনীর সঙ্গে একটু আধটু ইগো ক্ল্যাশ আছে অবিশ্যি। জগা দা বলেছে ননদ ভাজে অমন হয়। তাই নিয়েই বাঁচতে হবে তোমাদের। দুই সুন্দরী কে নিয়ে মাঝেমধ্যেই টানাপোড়েন চলে। জগাদা অভ্যস্ত এসব রাজনীতি তে। বলরামের অবিশ্যি এসব তরজায় হেলদোল নেই। তিনি বুঁদ হয়ে থাকেন সোমরসের মৌতাতে। জগাদা বৌ আর বোন কে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে মাঝেমধ্যেই বলে ওঠেন, যার নেই উত্তরপুব তার মনে সদাই সুখ। 
এই তো সেবারেই  বোনের সে কী কান্না! তোমাদের সবার মাথার মুকুট কত্ত বড়! আর আমারটা দেখ। অথচ লোকসমাজে কী আদিখ্যেতা আমায় নিয়ে। সে আমার ছোটো বোন, বড় আদরের ছোটো বোন... বিরক্ত লাগে এসবে তার। মনে মনে বলে ওঠে সে, হু হু বাবা, মেয়ে সন্তান বলে কথা! জানা আছে সব হিপোক্রেসি তোমাদের। 
জগাদা ভাবে, নিরীহ বোনটা আমাদের ছোটো থেকেই ঝগড়া করতে পারেনা। চেঁচাতে পারেনা। বৌদির অপোজিট এক্কেরে। বিমলা কে বোঝাতে কালঘাম ছুটে যায় তার। শোনো বিমলি, ও কিন্তু সাক্ষাত আদ্যাশক্তির অংশ।বাবা বলতেন। ওকে একদম হেনস্তা করবেনা কেউ। গা জ্বলে যায় বিমলার। কে কাকে কী শোনাচ্ছে? জগাদা বলেছিল সেদিন। তুমি হলে ওয়ান অ্যান্ড ওনলি শুধু শ্রী অর্থাৎ মহালক্ষ্মী। আরেকজন হল ভগিনী শ্রী। এসব শুনে বিমলার গা জ্বলে যায় আজকাল। সব শ্রী য়ের ব্র্যান্ড ডাইলুশ্যান হয়ে গেছে মিনসে অতবড় বড় চোখ দিয়েও দেখতে পায়না। 
। 
বাইরে কলরব শুনতে পেয়ে বিমলা দুয়ারের খিল খুলে উঁকি দিয়ে দেখতে পায়। সেই সম্বচ্ছরিক রথযাত্রায় যাচ্ছে তিন মক্কেল। বারণ শুনলো না। যাবেই। নিভৃতবাসে থেকে দম বন্ধ হয়ে আসছে তাদের। কিন্তু গতর আর নড়েই না তাদের। বাব্বা ! খেয়েদেয়ে, শুয়েবসে আরাম করে করে বদ অভ্যেস হয়ে গেছে গুষ্টির! সব্বার ওজন বেড়েছে। তায় আবার ভরা বর্ষায় ১০৮ ঘড়া উপর্যুপরি স্নানে সারা শরীর রসস্থ। পেইন কিলার আর পাঁচনের সম্মিলিত বুস্টার ডোজে শরীরের গাঁটে গাঁটে বাতজ বেদনা। এক পক্ষকালে নব যৌবন পেয়েছেন বাবুরা। মহালক্ষ্মী বিমলা ভাবে বসে বসে সাতপাঁচ। জ্বরের কারণে ইমিউনিটি কমে গেছে। বাইরে না গেলেই নয়? জগাদা কাল রাতেও বলে গেছে এসে, আহা! ওরম কোরোনা বিমলি! যেতে আমাদের হবেই। একটানা  অনশরে তো থাকোনি জীবনে, বুঝবে কী করে মুক্তির স্বাদ? বিমলা তার উত্তরে বলেছে, জানোনা? সব পেলে নষ্ট জীবন? 
জগাদা বলেছে না, পনেরো দিনের বিরহ কী জিনিষ তুমি বুঝবে কেমন করে? তোমার সঙ্গে তো আমার রোজ রাতে দেখা হয়েছে, আমার এই সোশ্যাল ডিটক্সে ফ্যান ফলোয়ারস দের পরাণ আটুপাটু। 
বিমলা তার উত্তরে বলেছে, ভ্যাকসিনের দুটো ডোজ হলনা কারোর, তাই তো চিন্তা এত। এসব ভাবতে ভাবতেই সিংহদুয়ার দিয়ে তিন ভাইবোন একে একে বেরিয়ে আসে। বিমলার তখন দুয়ারে রথ। রাতের অন্ধকারে দেখতে পায়নি সে। এ কী! জগাদার চোখের চারিপাশে টুকটুকে লাল আভা কিসের? ব্ল্যাক ফাঙ্গাস না কী সব শুনছিল সেদিন। নাহ! ওনার তো অতিমারী সংক্রমণ হয়নি এখনও। তার মানে ফ্যানেদের বিরহে কেঁদে কেঁদে উতলা হয়েছে চিত্ত। তাই চোখ লাল। মনে হল চীৎকার করে বলে, "তা বলি যাদের জন্য এত দরদ উঠলে উঠছে তারা তোমার কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে কেন নে যায়?" 
শুনতে পায়না জগাদা। আবারও বলে ওঠে সে। "বলি হ্যাঁগা? তুমি কী চোর না ডাকাত?"  
জগাদার এহেন টানা ও পোড়েনে বিমলা বড় ব্যথা পায় প্রতিবার। কী জানি? জগাদা বুঝি শুনতে পেয়েও পায় না সেই কোলাহলের মাঝে। 
বিমলার পরক্ষণেই মনে পড়ে যায়। ঠিকই করছে ওরা। 
"মিনসে সেই ছোটো থেকেই পাক্কা হয়ে উঠেছে চৌর্যবৃত্তিতে। শৈশবে পড়শিদের ননী চুরি করে খাওয়া থেকে কৈশোরে সঙ্গিনীদের কাপড় চুরি? আর ফাইনালি যৌবনে গোপিনীদের মন চুরি? জানিনা বুঝি? সব মনে আছে আমার। শুধু আমায় কব্জা করতে পারেনি লোকটা। একচুল সরিনি আমার পাওনাগণ্ডা আর অধিকার থেকে।"   

স্নান যাত্রা 
হ্যাঁ গা বিমলা! দু সপ্তা কোয়ারেন্টিনেই নাহয় থাকব। তুমি মাঝরাতে চলে আসবে তো আমার ঘরে? তোমায় না দেখলে, না ছুঁলে আমার জীবন বড়থা মনে হয়। জগা দা হোয়াটস্যাপ করল।  বিমলা টাইপ করে...কি জানি বাপু! এখন ছোঁয়া বারণ। আমার যদি কোভিড হয় তখন তুমি তো আমার মাথাটাও টিপে দিতে পারবেনা।ঠুঁটো নাগর থাকার যে কি যন্ত্রণা তা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝবে? কি যে দরকার ছিল এবছর তোমার এই মহাস্নানের! বলে তাত সয় তো বাত সয় না। বারণ তো শোনো না। এবার জ্বর তো আসবেই। তারপর তুমি আবার ওষুধ গিলবে না। আমায় পাঁচন বানিয়ে মরতে হবে। আমার হল মহা জ্বালা।তারপর তোমার হলে তোমার ঐ সাগরেদ দুজনেরও হবে ছোঁয়া লেগে। কিচ্ছু হবে না দেখো। আমি বলে দিলাম। আমার কাছে এসো রোজ রাতে একবার করে, আগের মতন। তোমার গায়ের গন্ধেই আমার সব টেনশন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়।  আজ্ঞে মশাই গত তিনমাস আমার গায়ের ফুল চন্দন চর্চিত সেই গন্ধ আর নেই। আমি এখন সাফসুতরা শহুরে পটের বিবিদের মতন।বিমলা লিখল হোয়াটস্যাপে। কিচ্ছু চিন্তা করোনা বিমলা। নারায়ণী শীর্ষদেশে, সর্বাঙ্গে বিমলা বাহিনী। জগা দা টাইপ করল। 
...
আমায় যেতিই হবে। আমায় যেতি দিতি হবেই।
সত্যিই তো! সম্বচ্ছর স্বেচ্ছায় নিভৃত যাপন করে তারা। বছরে একবার মোটে বাইরে পা দেয়। তাও আবার দিন সাতেকের জন্যি। তাদের বুঝি মনের ভেতরটা হু হু করেনা?
বেড়াতি যাবুই আমরা। তায় এবছর কতদিন বাইরের লোকের পর্যন্ত মুখ দেখিনা!

গতকাল রাত অবধি দোটানায় ছিল তিন ভাইবোন। একবার ব্যাগ গুছোয় তো আরেকবার সব ঢেলে ফেলে দেয় মনের দুঃখে। উত্তেজনা তার‌ই তুঙ্গে। কি পরবে? কি মাখবে? কি গয়নাগাটি সঙ্গে নেবে? আর উত্তেজনা বড়জনের। সঙ্গে যাবে সাতদিনের মত সোমরস। তার তোড়জোড় নিখুঁত করে। সঙ্গে মুখরোচক সব স্ন্যাক্স। নিমকিই হরেক কিসিমের। ভাজা মশলা দেওয়া শুকনো সিঙ্গারা। রকমারি বাদাম। শুকনো ফল। বেসনের ভাজাভুজি। জগা দা ভাইবোনের কথা ভেবে অস্থির ছিল এ ক'দিন। যাব কি যাব না। ভেবেই অস্থির সে। প্রতিবছর বিমলি যা ক্ষেপে থাকে তাদের তিন ভাইবোনের এই বেড়াতে যাওয়ার ধুম দেখে! এবার কি ভাগ্যি সে সিনে নেই! নিজেই কোয়ারিন্টিন করে রেখেছে নিজেকে তার কারণ অবিশ্যি কোভিড নয়। অম্বুবাচী পড়ে গেছে বলে। জগাদা বলে বলে থকে গেছে বিমলি কে।
বছরের ঐ চারদিন তুমি যে কি কর! এত্ত ছুঁতমার্গ এ যুগে হয়না বিমলি।
বিমলি নারাজ। চারদিনের চান হোক। আবার এসো আমার ঘরে।
এ যুগে আমার এসব ভালো লাগেনা বিমলি।
এই করতে করতে অবশেষে মধ্যরাতে অনুমতি এয়েচে। হেডাপিস বলেছে, তারা বেড়াতে যেতে পারে। ব্যাস! এবছর নিজের গাড়ী বের করার রাস্তা বৃষ্টি তে ধুতেও হবেনা জগাদা কে। বৃষ্টি এবার আষাঢ়ের আগেভাগেই এসে গেছে।কিন্তু মাস্ক? সুভদ্রার মনখারাপ। সব সাজ নষ্ট হয়ে যাবে। বলরাম অবিশ্যি বয়সে সবার বড় তাই মাস্কটা বেঁধেই নিয়েছে মুখে। কোভিডে ধরলে নাকি রক্ষে নেই। জগাদা বিন্দাস। মাস্ক নামিয়ে রেখেছে। একবার নাকের ফুটো বের করে তো একবার থুতনিতে ঝুলিয়ে নেয়। যাবার আগেই বিমলি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পরিয়েই ছেড়েছে। তোমার না দিন পনেরো আগেই চান যাত্রায় বেদম চান করে জ্বর এয়েচিল! আমি ছিলুম তাই পাঁচন গিলিয়ে পথ্যি করেছি। তাই আজ সুস্থ হয়েছ! নির্লজ্জ, বেহায়া মিনসে ! মাস্ক পর মাস্ক। আর শোনো তিনজনের হ্যান্ড স্যানিটাইজারটা দয়া করে পকেটের মধ্যে রেখো না। বাইরেই রেখে দাও।
জগাদা ভাবে শালা! এমন রথ এ জম্মে বের করিনি! এর চেয়ে না যাওয়াই ভালো ছিল!

জগাদা কোভিড সিরিজ / ইস্যু জামাইষষ্ঠী 
রোজ রাতে টুক করে একটিবার বিমলা কে চোখের দেখা না দেখলে জগাদার ঘুম আসেনা। 
জামাইষষ্ঠীর আগের রাতেও তাই হবারই কথা। সবার চোখে ধুলো দিয়ে টুক করে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।দ্বাররক্ষী, দয়িতাপতি, মোহন্ত কেউ জানল না। বিমলার কাছে গিয়ে জগাদা দেখলেন রোজ রাতের মত সেও জেগে বসে আছে। একটু স্বামী সোহাগ, একটু ফষ্টিনষ্টি। তবে আসার আগে স্যানিটাইজ করে মাস্ক পরে আসতে হয় সেটাই চাপের। তবুও গেলেন নিশুতিরাতে। 
কি গো? আজ মন ভার মনে হচ্ছে? জগাদা বললেন। 
বিমলা বলল, এবছরেও বাড়ি যাওয়া হলনা। জামাইষষ্ঠীর খাওয়া, পাওনাগণ্ডা কিছুই হলনা গতবারের মতই। 
জগাদা বললেন, আহা, দুঃখ্যু কোরোনা বিমলা। আমরা এখন বেরুলেই লোকজনও বেরিয়ে পড়বে। কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আগতপ্রায়। এখন সব আম আদমির মত আমরাও দুয়ার এঁটে বসে আছি, জানোনা? গতবার রথেও মাসীর বাড়ি যাই নি তেমন করে।এবারেও হয়ত যাওয়া হবেনা। সব হবে। আবার সব মিটুক প্রিয়ে! 

তোমার আর কি? এতগুলো শ্বশুরবাড়ি! কোনটাই তেমনই আইনতঃ বিয়ে নয়। সবার সঙ্গে সারাটা জীবন থাকাথাকির খেলা খেলে গেলে তুমি। সন্তানও দিলে তাদের। আমি তো হাতের পাঁচ। বিয়েও করলে অথচ ঘর করলে না। সন্তান দিলে না। সবাই জানলো লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ আমার পেটের ছেলেপুলে। আমি তো জানি সেসব মিথ্যে। তোমার এখানে পড়ে থেকে থেকে আমার রক্তাল্পতা ধরে গেল। কি না, পুরীক্ষেত্র বৈষ্ণব থান। সেখানে আমিষ ঢুকবে না। আর কত ত্যাগ স্বীকার করি বলতে পারো? 

আরে শোনো। এই জন্যই তোমাকে বলেছিলাম বাপের বাড়ি থাকতে। শুনলে না। সারাক্ষণ চোখ ঘুরছে তোমার। আমি কোথায় কি ফষ্টিনষ্টি করি সেদিকে খেয়াল রাখবে বলে এখানে এলে। জগাদার গলায় আক্ষেপের সুর। 

বছরে একবার এই জামাইষষ্ঠীর সময় বাবা মায়ের কাছে যেতে চাই। একটু খেয়েদেয়ে সুখ করে আসব বলে। বিমলা গর্জে ওঠে। 
আমি তো শ্রীক্ষেত্রে দুর্গাপুজোর সময় বলির ব্যবস্থা করেইছি। শুধু তোমার জন্যে। নয়ত তোমার ওই সময় রাগ চরমে ওঠে। আরও মাংস চাই তোমার? জগাদা এবার রেগে গেলেন। 

বিমলা বলল, বছরে মোটে একদিন? দেখছ না? অতিমারীতে ইমিউনিটি না বাড়িয়ে কেমন ঝিমিয়ে পড়েছি রোজ রোজ শাকপাতা, ফলমূলে খেয়ে খেয়ে? এসবে নাহয় ভিটামিন, মিনারেল আছে কিন্তু... এখন তোমারও কিন্তু শরীলে একটু আমিষ এর প্রয়োজন। হ্যাঁগো, যদি আমাদেরও অতিমারী তে ধরে? 

   
 


৭ মে, ২০২১

আমার কোভিডদিন

 আজ ১৪ দিন আটতলার ঘরে বন্ধ। প্রচুর আলো, হাওয়া। পাখির ডাক। সবুজ গাছপালা। তবু আমি বড় নিঃস্ব যেন। হঠাত কাল্পনিক এক কথোপকথন এসে আজ দুপুরে ভর করল আমায়। এ ক'দিনে নিজেকে চণ্ডালিকার মত অছ্যুত মনে হয়। যদিও তা মানুষের মনগড়া জাতপাত।আমার প্রিয় চরিত্র চিরকালের। খুব ইচ্ছে হত চণ্ডালিকা হতে। বিশেষ করে ওর টপ নট আর কাঁচুলি, হাঁটুর ওপরে শাড়ি, ওপর হাতে তাগা। পায়ে মল। তাইই হয়েছি যেন বেশ কিছুদিনের জন্য। 

সেই সঙ্গে ঘুমের ঘোরে শ্রীচৈতন্যের বুকে টেনে নেওয়া যবন হরিদাসের মুখটা মনে পড়ল একবার। আমার দরজার বাইরে রাখা টেবিলে আমার চায়ের কাপে চা ঢেলে দেয় ওরা। প্লেটে রেখে যায় খাবার ও দাবার।


ঘুমের ঘোরে মা শুধালেন, কি হয়েছে তোমার? সারাদিন একলাটি পড়ে আছো কেন? চল, আমায় খেতে দেবে না? 

বললাম, মা, আমার সেই মারণ রোগ হয়েছে। এর থেকে মুক্তি পেতে আমায় এভাবেই থাকতে হবে। আমার ছোঁয়া কেউ খাবে না। আমার জামাকাপড় বাড়ির কারোর সঙ্গে কাচা যাবে না। আমার বাথরুম কেউ সরবে না। আমার পরম শ্রদ্ধেয় অমরজ্যতি কবিরাজ আর বন্ধু চিকিৎসক পুপুরাণীর বিধান। আমাকে শুনতেই হবে ওদের কথা। জানেন মা? ওরা ভীষণ কড়া। ওরাই আমার ঈশ্বর এখন। 


শাস্ত্রে বলছে, পৈত্তিকান্‌ সন্নিপাতজান্‌ কফবাতসমুদ্‌ভবান্‌—

ওসব রাখো তো। মা বললেন। 

কিন্তু মা, আমি তো ঠাণ্ডা লাগাই নি। 


অমর কোবরেজ বললেন, এই গ্রীষ্মকালীন রৌদ্র আর বায়ু দুই-ই ঐ নাকি আমার পক্ষে বিষবৎ— কারণ শাস্ত্রে বলছে, অপস্মারে জ্বরে কাশে কামলায়াং হলীমকে—


আমার শাস্ত্রের কড়া কড়া কথা শুনলে খুব ভয় করে মা। এসব শুনেই সেদিন আপনার ছেলে আমার ঘরের দরজা সেই যে বন্ধ করে দিল... 

আমি অমর কোবরেজ কে বলেছি, থাক্‌ থাক্‌, আপনার শাস্ত্র থাক্‌। আমার ওসব শুনলে বড় ভয় করে যে। 

তা সেই শুনে আপনার ছেলে আর কবিরাজ মশাই দুজনে যুক্তি করে বললেন, ওকে বন্ধ করেই রেখে দিতে হবে —অন্য কোনো উপায় নেই? মা বললেন। 

পুপুরাণীও ওদের তালে তাল দিল, জানেন মা? বলল যে রোগের যা নিয়ম। মানতেই হবে। কারণ, পবনে তপনে চৈব –

মা বললেন, ওরা কত বড় ডাক্তার বল! ওদের কথা তো শুনতেই হবে তোমাকে। আর তো মোটে ক'টা দিন। তা বলি, পথ্যি হচ্ছে তোমার? 

তার খামতি নেই । জল-ফল-প্রোটিন আবার জল। দুধ-ডিম-ডাল। আবার জল। কিন্তু আমার তো আর বন্দীদশা ভালো লাগছে না মা। 

আবার কবে আমরা যাদবের দোকানে যাব? আবার কবে পার্ক স্ট্রীটের সেই কোটাশাড়ির দোকানগুলোয় যাব? আবার কবে আমরা ক্যালকাটা ক্লাবে গিয়ে চা খেয়ে বেকারী তে ঢুঁ মারব? আমি আবার পারব তো যেতে? এসব করতে? আমি যে বড় দুর্বল আর হাক্লান্ত হয়ে গেছি মা।

৪ মে, ২০২১

আমার কোভিড, তোমার কোভিড

গতকাল ছিল আমার কোভিড একাদশী। জীবনে প্রথমবার আক্রান্ত আমার  অতিমারীর অভিজ্ঞতা। অবশেষে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেও লোহার বাসর ঘরে ঢুকে পড়ল মারণ ভাইরাস। তাই ভাববেন না খুব সতর্ক আছেন। আমার মত সাবধানে অনেকেই থাকেন না। তার একটাই কারণ ছিল ঘরে ৮৩ বছরের শাশুড়ি মা। একটু বেশী সতর্কই ছিলাম আমরা। তবুও কেউ হয়ত ঘরের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবেই দিয়ে গেছে এসে। সে নিজেও হয়ত জানত না যে সে চিহ্নহীন ধারক ও বাহক। এটাই এ রোগের সবচেয়ে মুশকিল। আমার গত ৫ই এপ্রিল প্রথম ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়ে গেছিল। তারপর ভালো রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তারপরেও হয়ত শরীরে সাফিসিয়েন্ট এন্টিবডি তৈরী হয়নি। তার ফাঁকেই কেউ সেই মহামূল্য অমূল্যরতন মারণ ভাইরাস আমায় দান করে গেছিল। তেইশ তারিখ সকাল থেকেই জ্বর আসে। সঙ্গে শুকনো কাশি। গায়ে হাতে ব্যাথা। গতিক ভালো নয় দেখে নীচের থেকে প্রিলের পাউচ প্যাক, স্কচ ব্রাইট, নিজের ঘর থেকে গুচ্ছের নাইটি, হাউজকোট, পেটিকোট, ওষুধের বাক্স সব নিয়ে একটা ঘরে নিজেকে আইসোলেট করলাম আগেভাগেই। একটা পুরনো ঝ্যাঁটা, ঘর মোছার কাপড় সব নিলাম। মা তখনও বেঁচে। কি জানি আমি ওনার ঘরে যাচ্ছিনা, কেন, কি বৃত্তান্ত এসব ভাবছিলেন কি মনের মধ্যে? ওনার খাওয়া দাওয়া ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর থেকে ক্ষীণতম হয়ে গেল। এটা অবিশ্যি গত এক মাস ধরেই চলছিল। আমার তখন কাজ শুধু শুয়ে শুয়ে এক ঘণ্টা অন্তর অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপা। জ্বর বাড়তেই থাকল। রাতে ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট উঠছিল। সারারাত ঘুম হয়না এ রোগে। শুধু প্রহর গুনে জেগে বসে থাকা ভোরের অপেক্ষায়। খুশখুশে কাশি তে ব্রেথলেসনেস যে কি কষ্টের হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। নাকে গন্ধ, স্বাদ, রুচি সব চলে গেল। বন্ধু ডাক্তার রা পাশে ছিল আমার। সেটাই একমাত্র আশার। খাওয়াটাই বড় চাপের হয়ে দাঁড়ালো। সোয়াব টেস্ট এর স্যাম্পেল নিল ২৫ শে। রিপোর্ট আসবে ৭২ ঘণ্টা পর। তার আগেই সিম্পটমস দেখে  সবরকম ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিলেন ডাক্তার বন্ধু। এর মাঝে মা দুম করে ২৮ তারিখ ব্রাহ্ম মুহূর্তে চলে গেলেন। ভাবলাম মায়ের সর্বক্ষণের মেয়েটি আছে। আমার খাবার নীচ থেকে ওপরে দিয়ে যাবে যেমন যাচ্ছে। পৃথ্বীশ কে ভাত জল দেবে। আমার ফল কাটাকুটি... আমার ঘর আমি কোনোমতে হাফাতে হাফাতে ঝাড়ু পোছা করে নিই। বাসন ধুয়ে নিই। সাতদিন অন্তর মেশিনে আমার জামাকাপড় কেচে নিয়ে মেলে দিই। 

মেয়েটির বাড়ির লোক বোধহয় ভয় পাচ্ছিল। বুঝছিলাম ওর অস্থিরতা।  সেই সঙ্গে তার তুমুল ভূতের ভয়। যেহেতু মা কে নাড়াচাড়া করত তাই। তার বাড়ি যাবার পিছটান বুঝলাম। ছেড়ে দিলাম তাকে। আমার জন্য তার যদি করোনা হয়? সেটাই তার বুঝি একমাত্র চিন্তা। এদিকে মুখে সকালে বিকেলে হরিরলুঠ চড়াচ্ছে সে আমার জন্য। ততদিনে আমার ১০ দিন হতে চলল। টেলিমেডিসিন এ ডাক্তার কন্সাল্টেশনও শুরু হল। রোজ একবার করে ফোন করেন ডায়েটিসিয়ান, ডাক্তার। কি খাচ্ছি, কেমন আছি। কি ওষুধ এইসব রুটিন ডায়ালগ। অশৌচ ডায়েট পালন করছিনা আমি। আমার শুধু ওষুধ হল খাওয়া। ইচ্ছে না করলেও । জল দিয়ে গিলে। 

এভাবেই চলবে কোভিড একাদশী থেকে পূর্ণিমা। আবার ফিরবে  অমাবস্যাও। ঠিক পেরিয়ে যাব একদিন। মাঝখানে মায়ের ডিজিটাল শ্রাদ্ধশান্তি আছে। মা আমার হাতে খেতে বড় ভালোবাসতেন। একটু হলেও সেদিন রান্না আমায় করে ওনার ছবির সামনে ধরতেই হবে আমাকে। 

এখন নাকে গন্ধ এলেও মুখের রুচি ফেরেনি। শারীরিক দুর্বলতা যে কি জিনিষ তা বুঝছি নতুন করে। জীবনে ৬ বার মেজর সার্জারি হয়েছে। এমন কষ্ট উপভোগ হয়নি। কি জানি তখন বয়সটা কম ছিল বলেই হয়ত টের পায়নি। রক্তের জোর ছিল বলেই হয়ত অনুভূত হয়নি। যারা গতবছর "গোষ্ঠী সংক্রমণ" হয়েছে লিখেছিলুম বলে আমাকে রীতিমত ফেসবুকে ট্রোল করেছিলেন তারা এবছর সাবধানে থাকুন। এবারের স্ট্রেইন টা সত্যিই মারাত্মক। এত সাবধানে থেকে সেই গতবছর থেকেও "কোভিডচঞ্চু", "কোভিবিশারদ" এতসব গালভরা নামে আমায় ভূষিত করেছিলেন  যারা?  তারা জানলে খুশি হবেন এত সাবধানে থেকেও আমার ভাইরাল লোড বেশ মডারেট। তাই ফুসফুসের রিস্ক ফ্যাক্টর থেকেই যাচ্ছে। এ মারণ ভাইরাস একবার থাবা বসালে দগ্ধে দগ্ধে মারে। মানুষকে কাবু করে দিয়ে নিজে মজা দেখে। 

২৮ ফেব, ২০২১

রেওয়া পত্রিকা, অভিজিৎ দত্ত গল্প পুরষ্কার ২০২০ "পাসপোর্ট"

 


 

পাসপোর্ট

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় 

এতদিন বাদে প্রণতি পিসি কে দেখে চমকে উঠেছিল রূপা। কি আশ্চর্য! মানুষটার বিয়েই হলনা কোনোদিন আর সে কি না বিধবার বেশে? দেখেই জিগেস করেছিল সে, কেন গো এমন সাদা শাড়ি পরে রয়েছ তুমি? আমার কিন্তু মোটেও ভালো লাগছে না তোমায় এমন দেখে।  

প্রণতি বলেছিলেন, বয়স তো ভালোই হল রে। তুই যখন বিদেশ চলে গেলি তখন তোর বয়স কত বল তো? 

কেন ? চার বছর। আর তোমার আঠেরো বছর বোধহয় । এই তো? দেখো দিব্যি মনে আছে আমার। তাই বলে বুড়োরা কেউ রঙ্গিন শাড়ি পরে না?  

প্রণতি বললেন, হ্যাঁ। আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছিলাম সেবছরেই। 

রূপা বলল, আমায় কিন্তু চিঠে লিখে জানাওনি পাশের খবরটা। বাবা বলেছিল আমায়, দেখও আমার বোন লেটার নিয়ে পাশ করেছে । তখন তো কেমন রঙীন শাড়ি পরতে গো। এখন কেন এমনি পর? 

আরে চল্‌, চল্‌ দিকিনি। কত বছর পর এলি বলত? তোর দিকে চেয়ে দেখি, দাঁড়া তুই! চকচক করছে স্কিন একেবারে। সেদেশে জারাই থাকে তাদেরই এমন। 

তুমি থামবে? রূপা বলে 

হ্যাঁ রে, তোর বর কবে আসবে? 

আমি ঠিক একমাস থাকব পিসি । যাবার সাতদিন আগে তিনি আসবেন ছেলে কে নিয়ে। বাবার অফিস, ছেলের কলেজ । সেদেশে ছুটি অত সুলভ নয় পিসি। বুঝেছ? 

আচ্ছা, বেশ। নে, নে চল, চল এবার। জামা প্যান্ট ছাড়। কিছু মুখে দে। 

সত্যি কি গরম এখানে! 

রূপার কষ্ট দেখে প্রণতি বললেন, তবু তো শীতকালে এলি রে। এখন তো বেশ আরাম আমাদের। 

রূপা বলল, আচ্ছা মন্টু কাকা কোথায় ? দেখছি না যে। 

 

প্রণতি এড়িয়ে যান। তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়। রাত হয়েছে। ডিনার খেতে খেতেই সব কথা হবে। তোরা ওখানে শুনেছি খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে নিস। 

হ্যাঁ, আর্লি ডিনার সেদেশে। বলে রূপা তার স্ট্রলি ব্যাগ টানতে টানতে বলে, এই ফ্ল্যাট টা কিন্তু বেশ ছোট যাই বল পিসি। আমাদের আগের বাড়িটা অনেক বড় ছিল। 

প্রণতি কিচেনের দিকে এগিয়ে যান। প্রশ্নগুলি কিছুটা এড়িয়ে। 

বাড়ির সঙ্গে কি ফ্ল্যাটের তুলনা চলে রে? বাড়ি হল বাড়ি আর ফ্ল্যাট হল ফ্ল্যাট। কোনও তুলনাই চলে না। 


রূপা যখন সেই ছোটবেলায় এ শহর ছেড়েছিল তখন তাদের সেই পুরনো বড় বাড়িটায় কত মানুষ একসঙ্গে, এক ছাদের নীচে বাস করতেন। রূপার ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, বাবা, মা, আরো এক পিসি আর মন্টুকাকা। বাবা সবার বড়। প্রণতি তারপরেই । সবচেয়ে সুন্দরী বাড়ির মধ্যে। মন্টু সকলের ছোট। মাঝে রূপার আরেক পিসি। রূপার বাবা পরিতোষ শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরী পেলেন কলকাতায়। তখন পাত্রী দেখে তাকে বিয়ে দেওয়া হল। বিদেশ থেকে আরো ভালো চাকরীর অফার এল। এর মধ্যে জন্মেছে রূপা। বছর চারেকের মেয়ে নিয়ে তারা বিদেশে সেটল করল।  দেশে থাকাকালীন প্রণতি পিসির সঙ্গেই ছিল রূপার যত দোস্তি, যত বায়না। বাবা, মায়ের সঙ্গে বিদেশে যাবার বেশ কিছুদিন পরে ছোট পিসি শম্পার  বিয়ে হল। রূপারা আসতে পারেনি বিয়েতে। শম্পা এম এ, বিএড করে ইস্কুলে পড়াতেন। তারপর পোষ্ট এন্ড টেলিগ্রাফে বেশ কিছুদিন চাকরি করার পর তার বিয়ে । রূপা এসব শুনেছে বাবার মুখে।  

প্রণতি টেবিল সাজালেন ভাইঝির জন্য। পিসির হাতে এতদিন পর গরম ভাত, আলুপোস্ত আর মাছের ঝোল খেয়ে তৃপ্তিতে সুখঢেকুর তুলতে তুলতে রূপা বলে, এবার তোমার জন্যে সেদেশ থেকে কি এনেছি দেখবে চল।  

প্রণতি বললেন, আমি কি ছাই বেরোই নাকি? রূপা তার ঢাউস ব্যাগ খুলে পিসির জন্যে একে একে সুগন্ধী সাবান, বডি লোশন, ঘরে পরার নরম চটি আর চকোলেট বের করে।   

প্রণতি বলেন, যাক! এগুলো সব কাজের জিনিষ। চকোলেটের মোড়ক খুলে পিসির মুখে আদরে একটা ডার্ক চকোলেট পুরে দেয় রূপা। অনেকদিন বাদে কেউ এমন আদর করে কিছু দিল প্রণতি কে। । পরিতৃপ্তিতে মন ভরে ওঠে তাঁর । আশীর্বাদ করেন রূপাকে। 

আজ রাতে তোমার কাছে শোব কিন্তু পিসি । সেই ছোটবেলাকার মত। রূপার আবদারে শুখোরুখো মনের ভেতরে অনেকদিন পর যেন নতুন করে বৃষ্টি ঝরে তাঁর। কি আনন্দ সেই ভেজায়।  

বলেন, সে আর বলতে! আমার কাছে শুবি না তো কার কাছে আর শুবি? এ বাড়িতে আর কে আছে? 

মন্টুকাকার খবর কি বললে না তো? 

প্রণতি বললেন, সব খবর এক্ষুণি চাই মেয়ের। আগে চল। এবার কোমর ফেটে যাচ্ছে আমার। শুয়ে শুয়ে সব বলব। রূপা বলল, তা ভাল। আমার তো এখন জেট ল্যাগ। ঘুম আসবে না।  

তবে চল শুয়ে শুয়েই দেদার আড্ডা দেব আজ।  

যা বলছিলাম,তোর  মন্টু কাক আর বিয়েই  করেনি রে। সে আমার কাছেই ছিল এতদিন। দুই ভাইবোনে থাকতাম সেই বড় বাড়িটায়। তারপর তোর দাদু যেমন উইল করে গেল । সেই অনুযায়ী সব ভাগ হল। তবে বাড়ি আর রাখা গেল না। যখন আমাদের বাড়ি প্রোমোটারকে দিয়ে দিলাম তখন মন্টুর আর আমার প্রাপ্য আলাদা ফ্ল্যাট বা টাকা। বাবা কি আর জানত যে মন্টু জীবনে বিয়েই করবে না? 

মন্টুকাকা গান শেখাত না? 

হ্যাঁ, এখনো শেখায় সেই ফ্ল্যাটবাড়িতেই। ওটাই তো তার একমাত্র রুজিরোজগার। তোর বাবা আর ছোট পিসি বাড়ির অংশ ছেড়ে দিয়ে টাকা নিয়ে নিল তখন। আর আমি এসে উঠলাম এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে। আমার প্রাপ্য বাকী টাকা ব্যাঙ্কে রেখেছি। বড় ফ্ল্যাট নিয়ে কি করব। শেষ বয়সে টাকা থাকলে সে আমাকে দেখবে। 

এই ফ্ল্যাট প্রণতি রূপাকে দিয়ে যাবেন। এবারে সেই সব কাগজেকলমে করতেই রূপার আসা। তার পিসির ইচ্ছে ।

তা বাবা, ছোটপিসিকে অত পড়াশুনো করালো আর তুমি হায়ার সেকেন্ডারির পর আর পড়লে না কেন পিসি? তুমি পড়াশোনায় অত ভাল ছিলে শুনেছি । 

কি আর করি বল? বাড়িতে পড়তে দিল না কেউ। তখন বাড়ি থেকে বেরুনো বারণ। 

তা তোমার বোন যে বেরুলো?  

আমার কপালটাই খারাপ রে। 

তোমার বিয়ে দিলেন না কেন ঠাম্মা, দাদু?  

সারাজীবন ধরে এত টানাপোড়েন সহ্য করে এতবছর পর এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ভাল না লাগলেও রূপা কে তিনি বলেই দেবেন সব। এই ভাবলেন।  

কি হল পিসি? চুপ করে র‌ইলে যে।  

আমাদের বাড়ি সে অর্থে কনসারভেটিভ ছিল না। নয়ত আমার বোন অতদূর পড়ে, চাকরী করে তারপর বিয়ের পিঁড়িতে বসে? 

তবে?  

তবে আর কি? এই যেমন তুই সেদেশে তোর বরকে ভালোবেসেছিলি, তোর বাবা মা বিয়েও দিয়ে দিলেন।  

রূপা বলল, সেটাই তো ন্যাচারাল।


জানিস? আমার জীবনটা অনেকের থেকে আলাদা রে। 

কেন পিসি? 

আর কেন? তাঁর জন্য আমিই দায়ী। 

তার মানে? 

আমাদের মস্ত সেই পুরোনো বাড়িটার পাশেই থাকত সুবিমলরা। দুই পরিবারে আসা যাওয়াও ছিল। তবে ঐ যেমন হয় সুবিমল আর আমি তখন ভেসে গেলাম। আমরা প্রেম করতাম ছাদে উঠে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এইরকম চলছিল। সে পড়ত কলেজে। আমি তখন ক্লাস টেন। 

তো ? কি হল তারপর? রূপা বলে 

তার পিসি বলল, মা একদিন মাসীদের সঙ্গে থিয়েটার দেখতে গেল রংমহলে। শম্পা কে সঙ্গে নিয়ে গেল।আর আমাকে রেখে দিয়ে গেল কারণ আমার সামনেই টেস্ট পরীক্ষা। বাবা অনেক রাতে ফিরতেন অফিস থেকে। তোর বাবা তখন শিবপুরের হষ্টেলে। 

রূপা বলল তারপর ? 

সুবিমল সেদিন আমাদের বাড়ির মধ্যেই সোজা চলে এসেছিল। তারপর যা হয়। এতদিনের দূর থেকে প্রেম হঠাত অত কাছাকাছি এসে আর বাঁধ মানেনি। আর কি বলি? সব তো বুঝিস । 

আই মিন গুড তো। ক্ষতি কি তাতে? রূপা বলল। 

তোরা বলবি কি আর হয়েছে এসবে? যাকে বিয়ে করবেই ঠিক করেছ তার সঙ্গে শোয়াই যায়। প্রণতি বললেন। 

ইয়েস। অফ কোর্স। নো  ঢাক ঢাক গুড়গুড় । 

আমি চুপচাপ ছিলাম। পরীক্ষার রেজাল্টও ভাল হল। কিন্তু আমার শরীরের হাবভাব দেখে মা বুঝে ফেলল মাস তিনেক পর। আমার পেটে তখন সুবিমলের সন্তান। মা চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে আমাকে বাবার কাছে নিয়ে গেল। আর তারপরেই সব খালাস হয়ে আমায় মুক্ত করল। তবে মা'কে সুবিমলের কথা আমি খুলে জানিয়েছিলাম সব। বাবা, মায়ের চরম আপত্তি। ভ্যাগাবন্ড ছেলে। পাড়ার লোক। পাশেই থাকে। তাদের সঙ্গে প্রবল অশান্তি, ঝগড়াঝাটি কিছুই বাকী র‌ইল না। তদ্দিনে সুবিমল চুপিচুপি বম্বে পাড়ি দিয়ে সিনেমা করতে গেছে। রাগে, ঘেন্নায় আমার তখন সুবিমলের প্রতি প্রেম উধাও। 


রূপার চোখে তখন জল টলটল করছে। ও তাই জন্যে এমন বৈধব্য বেশ তোমার? সেই কাপুরুষ লোকটার জন্যে? এত্ত মায়া? এটা আমি মেনে নিতে পারলাম না কিন্তু।  

প্রণতি বললেন, মোটেও না। আমার অভিমান অন্যখানে। এই ঘটনার পর অষ্টাদশীর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হল বাড়িতে। আর জারি করল কারা? তার বাবা আর মা। বাড়ির বড় মেয়ে, সুন্দরী বুদ্ধিমতী মেয়ে তাদের সব আশায় জল ঢেলে দিয়েছে তাই। বাবা আলমারী খুলে আমার রঙীন সব শাড়ি পুড়িয়ে দিল। আর সাদাশাড়িগুলো এনে আমাকে বলল, কাল থেকে বাইরে বেরুনো বন্ধ। পড়াশুনো আর চলবে না। এখন থেকে যেন বাড়ির সব রান্নাবান্না আমি‌ই দেখি। মা'কে সাহায্য করি। যেমন আগেকারদিনে হত। ভাইবোনদের পড়াশুনো দেখতে হবে। অনেক কষ্টে হায়ারসেকেন্ডারি পরীক্ষাটা দিলাম। ভাবলাম বাবা-মায়ের মন গলবে। আবারো পড়তে দেবে। কিন্তু নাহ্! পরীক্ষার পর থেকেই মা খুব অসুস্থ হয়ে বিছানায় শোয়া। তাও নাকি আমার দোষে। বাবা বলত প্রায়শঃই। মন ভেঙ্গে গিয়ে মা শয্যা নিয়েছে নাকি।  আর আমার দায়িত্ত্বে এই পুরো সংসার। দুটো ভাইবোনের ইস্কুল, পড়াশুনো, রান্নার মাসীর যোগাড়, ধোপা, নাপিত বাজারের হিসেব সবকিছু। ভাল রেজাল্ট করেও আর ভর্তি হওয়া হলনা কলেজে। আর সেইথেকেই এমনি আছে রে তোর প্রণতি পিসি।  


রূপা বলল

- হাউ স্যাড পিসি। জাষ্ট ভাবতে পারছিনা যে বাবা, মা কি করে এমন ক্রুয়েল হতে পারে। 

- আর কি হবে এসব ভেবে? রাখ তো।  

- আর সেই লোকটা? সে ই বা কি করে পারল এমন করতে? 

- কাপুরুষ একটা। ওকে একবার পেলে আমি বুঝিয়ে ছাড়তুম । লোকটা পালিয়ে বাঁচল। জানিস? সেদিন কেউ আমার পাশে দাঁড়ায় নি। এমন কি তোর বাবাও না। 

- এস্কেপিস্ট একজন। তোমার জীবনটা নষ্ট করল। রূপা বলে ওঠে। 

- নে, নে এবার বাদ দে ওসব কথা। এবার ছবি দেখা দিকিনি সেদেশের। তোর ঘর সংসার, ছেলে, বর সকলের। 

রূপা এবার তার হাতের সেলফোন খুলে নিজের শহরের ছবি দেখাতে শুরু করে দিল। সেদেশের ছবি কি সুন্দর। কোন্‌টা ছেড়ে কোন্‌টা দেখে? 

ওদেশের আকাশ বড্ড নীল রে। আর জলবায়ু কত ভাল বল্‌ তো! এখানকার মত এত গরম নেই। 

রূপা বলল, তুমি এবার আমার সঙ্গে চলে চলো প্লিজ। খুব আরামে থাকবে বাকী জীবনটা। 

এই মধ্য ষাটে নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাব? কি যে বলিস বাপু! 

তোমার নিজের দেশের পুরনো স্মৃতিগুলো কি খুব সুখের ? সেই বিশাল বাড়িও নেই। না আছে লোকজন। কিসের জন্য মায়া তোমার? 

প্রণতি চুপ করে থাকেন। সত্যিসত্যি তাঁর কোনোই পিছুটান নেই। কিন্তু এত বয়সে সেদেশের জীবনযাত্রার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা কি মুখের কথা? কথায় বলে পর ভাতী হয়ো কিন্তু পর ঘরী হয়ো না। 


সেলফোনের ফোটো অ্যালবামের পাতা উল্টে যায় রূপা একে একে। দুজনের খুচরো, এলোমেলো সংলাপ চলতে থাকে। হঠাত একটি ছবিতে গিয়ে চোখ আটকে যায় প্রণতির। এ কি! এ ছবি কার? কোথায় পেলি তুই?  


রূপা বলে, কেন? তুমি চেনো নাকি এনাকে? আরে সেবার বঙ্গ সম্মেলনে আলাপ হল। মুম্বাই থেকে এসেছিলেন। ওখানে স্ক্রিন প্রেজেন্স ছিল ওনার। বাঙালী অভিনেতা বিমল দা। দারুণ দোস্তি হয়ে গেছে । আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড হয়ে গেছেন তারপর থেকে। উনি অ্যামেরিকায় আমাদের বাড়িতে এসে দুরাত ছিলেন। কি ভাল অভিনয় করেন গো পিসি। এখনো যোগাযোগ আছে। 


ঝটকা মেরে প্রণতি উঠে পড়েন বিছানা থেকে। আমি তোর সঙ্গে সেদেশে চলেই যাব রূপা। সেদেশেই গিয়ে থাকব তবে। চল তবে পাসপোর্ট, ভিসার সব ব্যবস্থা করে ফেলি। যদি সেই লোকটার সঙ্গে আরেকটি দেখা হয়! 

রূপা বলল কে? কার কথা বলছ তুমি?  

প্রণতি বললেন ঐ যে, সুবিমল থেকে এখন শুধু বিমল হয়েছে যে। মুম্বাই গিয়ে ভোল বদলেছে তার । এইবার এতদিন বাদে তার সঙ্গে বোঝাপড়াটা সেরে নেওয়া দরকার।     



৫ ফেব, ২০২১

ইমিউনিটি কারে কয়?

 

সেই যে লকডাউনে শেফ সঞ্জীব কাপুর লাখ কথার এক কথা কয়েছিলেন না? ইন্ডিয়ান কিচেনে মশলার তাকটি হল ইমিউনিটি বুস্ট্যার এর জায়গা। খুব মনে ধরেছিল কথাগুলি। কথাগুলো কিয়দাংশে কিন্তু সত্যি প্রমাণিত হয়েছেও । তাইনা? আমাদের ছেলেপুলেদের আমরা ছোটো থেকে অত হাত ধোয়াই? ওরা হামা দিতে শুরু করলেই খুঁটে খায়। তা সে আরশোলার পা হোক কিম্বা টিকটিকির গু। দু চারদিন নলিখলি যায় হেগে। তারপর ঠিক হয়ে যায় চিঁড়ে, কাঁচকলা, আপেল সেদ্ধ খেয়ে। আমরা একটু বড় হলেই স্কুল কলেজে এক আকাশের নীচে, খোলা হাওয়ায় হজমি,আলুকাবলি, ফুচকা, রোল খেয়ে অভ্যস্ত। এটা শুধু আমার রাজ্যেই নয়। আসমুদ্র হিমাচলেই এমন। তাই আমাদের এই HARD immunity কি HERD immunity তে গিয়ে ঠেকল? এই অভিশাপ আজ আমাদের আশীর্বাদ। আমাদের ন্যাংটা খোকার শিঙনি ঝরা নাক, থুতু মাড়িয়ে রাস্তা থেকে এসে জুতো না ধুয়েই গটমট করে ঘরে ঢুকে পড়া, থুতু দিয়ে বড়বাজারের গদির ব্যাবসায়ীর নোট গোনা আর বাজারের চকচকে আপেল বা পেয়ারা না ধুয়েই নোংরা জিনসের প্যান্টে ডিউস বলের মত দুবার ঘষে নিয়ে কামড় দেওয়া... এসবের একটা মাহাত্ম্য আছে কি বল?

১ ফেব, ২০২১

"এবং রংপুর লাইম" পথের আলাপ পত্রিকার আয়োজনে সেরা দশে পুরস্কৃত গল্প

 



(১) 

নমস্কার! আমার নাম সুতনুকা রায়। আপনাদের নাম্বার পেলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে । 

হাঁসের ডিম আছে তো এখনও? নাকি ফুরিয়ে গেছে? জানান তবে। 

আচ্ছা সোনারপুরে  ডেলিভারি করবেন? 


এতসব লিখেই খটখট নিজের ঠিকানা টাইপ করে ফেললেন। 

একতরফাই যেন বকে চলেছেন সুতনুকা। মনখারাপের মেঘ এক নিমেষে উড়িয়ে দেবার এ এক উপায় হল বেশ। কিন্তু ওদিকের প্রাপক কথা বলেনা কেন যে ? দুটো টিক নীল হয়ে গেল। 


অনেকক্ষণ হয়ে গেছে হোয়াটস্যাপের ওদিক থেকে কোনও উত্তর না আসায় সুতনুকা বিচলিত হলেন। মধ্যবয়সীর শরীর মনে খুব টানাপোড়েন। মায়ের সঙ্গে একা থাকেন। বাবার কেনা ফ্ল্যাট আর সঞ্চিত বেশ কিছু টাকাপয়সা আছে তাই এখনও দিব্য চলে যায়। সমস্যা একটাই। ঘরে কেউ নেই কথা বলার মত। অশীতিপর প্যারালিটিক মা দীর্ঘদিন বিছানায় শয্যাশায়ী। কথাবার্তাও জড়ানো। সুতনুকা কোভিডের লকডাউনে মায়ের দিনেরাতের কাজের লোকটিকেও কাছে পায়নি। সে রাতারাতি কানাঘুষো লকডাউনের কথা শুনেই পালিয়েছিল বাড়ি। ট্রেনে করে আসা যাওয়া করত। অগত্যা মা কেও দেখতেই হয়। ফেলে তো আর দেওয়া যায় না। একাই রাঁধে বাড়ে। ঘরের কাজ কোনোমতে সারে। টিভি দেখলে মন খারাপ লাগে। মনোবল কমে যায়। দু একজন আত্মীয় বন্ধু থাকলেও কোভিডের কালে কেউ আগ বাড়িয়ে কিছু জিগ্যেস করেনা সুতনুকা কে, এমনি স্বার্থপর মানুষ এখন। যদি রাতবিরেতে মায়ের জন্য তাদের কোনও দরকার পড়ে । তাই হয়ত। দিন দিন আত্মীয়, পরিজন সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে সুতনুকা একদিন খুব একা হয়ে পড়লেন এই মারণ কোভিডের রাজত্বকালে। এবছরটায় শুধু নিজেকে বাঁচতে হবে আর মা কে নিয়ে বন্দী হয়ে ঘরে থাকতে হবে। এ আর এমন কি? বন্দীই তো ছিলেন তিনি । তবে কোভিডের আগে কাজের মেয়েটা আসত যেত দিনে দু বার। বিকেলে সে চা করতে এসে। টিভি দেখতে দেখতে গল্পগাছা করত। এখন কেমন দম বন্ধ হয়ে আসে সুতনুকার সেইসব ভাবলে। 


আবার টাইপ করলেন... 

আর কি কি আইটেম আছে আপনাদের? জানালে ভালো হয়। অবিশ্যি ডেলিভারি না করলে আলাদা কথা... 

অতঃপর উত্তর আসে ও প্রান্ত থেকে। সুতনুকা উৎফুল্ল হোয়াটস্যাপে "টাইপিং" দেখে।  

নমস্কার। আপনি কি ফেসবুকে আছেন ম্যাম? তাহলে আমাদের পেজটি লাইক করলে জানতে পারবেন। 


 না আমি ফেসবুকে নেই। "হাটেবাজারে" র  সুন্দরবনের ভালো হাঁসের ডিমের কথা জেনে মনে হল। 

আপনি আমায় এখানেই জানাতে পারেন কি কি জিনিষ আছে হাটেবাজারে তে । আপনাদের প্রডাক্ট রেঞ্জ জানলে আমার অর্ডার দিতে সুবিধা হয় একটু। 


ওদিকে হাটেবাজারে আবারো টাইপিং... 

আপনার কি লাগবে ম্যাম? চাল থেকে চালতা, ডাল থেকে ডালডা, আম থেকে আমড়া সব রাখি আমরা। 

বাহ! কি সুন্দর কথা বলেন আপনি! 

হাসির ইমোটিকন আসে ওপ্রান্ত থেকে। 

খুশি হন সুতনুকা। লিখে ফেলেন ঝপাঝপ... 

তার মানে দুধ থেকে দুধেরসর চাল, গাছপাঁঠা থেকে কচি পাঁঠা সব? 

ইয়েস ম্যাম। এভরিথিং । আপনার কি লাগবে শুধু বলুন। হাজার টাকার ওপরে ফ্রি হোম ডেলিভারি। প্রথম কাস্টমার হিসেবে আপনি অ্যাডিশানাল টেন পারসেন্ট ডিসকাউন্টও পাবেন। 

আরও খুশি সুতনুকা। তড়িঘড়ি বলেন 

সুন্দরবন থেকে সোনারপুর কাছেই হবে আপনাদের  

আবারো হাটেবাজারে টাইপিং ... 

আমরা দক্ষিণ থেকে উত্তর সর্বত্র ডেলিভারি করে থাকি ম্যাম। 

"বেশ"  

শব্দটা লেখার পরেই মায়ের গোঙানিতে সুতনুকার মেসেজিংয়ে ভাটা পড়ে। 

মায়ের ঘরে যেতেই সুতনুকার চোখে পড়ে মা অনেকক্ষণ বিছানা ভিজিয়ে পড়ে আছে তেমনি। বোধহয় শীত করছিল তাই চেঁচিয়ে মেয়েকে জানান দিয়েছেন। মা কে হাগিস পরিয়ে রাখেনা সে। এক হল তার দাম আর দুই মায়ের অ্যালারজি। খুব র‍্যাশ বেরুতো আগে আগে। তাই মা কে উঠিয়ে সে নিজেই বেড প্যান দেয় নিয়মিত। 

ওদিকে হাটেবাজারে তাদের প্রডাক্ট প্রোমোশানের খবরাখবর দিয়েই চলে... 

আমাদের সব প্রডাক্ট আমাদের নিজস্ব ফার্মের। কয়েকটা ফলের ছবি, মাছের ছবি। ম্যাম, ইফ ইউ আর ইন্টারেস্টেড প্লিজ ভিজিট আওয়ার ফার্ম ওয়েবসাইট। লিংক দিয়েই সে যাত্রায় কথোপকথনে ইতি টানে হাটেবাজারে। 

এসেই তাকে অফলাইন দেখে মন খারাপ হয় সুতনুকার। ডাউনলোড করে ছবিতে চোখ রাখেন। 

কাঁঠালিকলাও? কাগচি লেবু, ছড়া তেঁতুল, রংপুরের লেবুর ছবি দেখে মোহিত হন সুতনুকা। তার মানে লকডাউনে মামাবাড়ির সেই স্পেশ্যাল হাতঅম্বল অ্যাসিওরড। কি ভালো রাঁধত তাঁর মা। হাতায় করে তেলের মধ্যে সর্ষে লংকা ফোড়ন দিয়েই ঢেলে দিত তেঁতুলগোলা, নুন, মিষ্টি । লেবুর রস আর লেবুপাতা দিয়েই ফুটে উঠলে নামিয়ে ঢেলে দিত সুতনুকার  কাঁঠালিকলা চটকানো ঠাণ্ডা ভাতের মধ্যে।গরমকালে ইশকুল থেকে ফিরে এই হাত অম্বল খেতে খুব ভালো লাগত তাঁর। তাই কাঁঠালিকলা আর রংপুর লেবু একসঙ্গে দেখে চোখ চকচক করে উঠল সুতনুকার।  

হাটেবাজারের নিজস্ব ফার্মের ওয়েবসাইটের লিংকে ক্লিক করেই নিমেষের মধ্যে হাজির হলেন তিনি খোলা আকাশের নীচে । যেখানে রঙিন, ঝলমলে সব টাটকা আনাজপাতি, মুদিখানা, মাছমাংস, ডিমের পসরা থরেথরে সাজানো । 

মনের আনন্দে ওপারে  ছুঁড়ে দিলেন একগুচ্ছ প্রশ্ন  । 


পায়েসের গোবিন্দভোগ খুঁজে পেলাম না। আচ্ছা মুরগীর ডিম দিশী? তাহলে হাঁসের ডিমের সঙ্গে এটাও দবেন । মানে হাঁস, মুরগী মিলিয়ে ছ' টি করে মোট এক ডজন। 

ছড়া তেঁতুল দেখেই লোভ লাগছে। বাজারে তো পাইই না আর । ওটা দেবেন আড়াইশো গ্রাম। 

গন্ধরাজ লেবুর পাশে রংপুর লাইমস দেখলাম । কতদিন পর নাম শুনেই জিভে জল এল! বাংলাদেশের রংপুরের লেবু? আমার মামারবাড়ি জানেন? দু দুটো লেবুগাছও ছিল সেখানে। সব কেমন ছেড়ে আসতে হয়েছিল দাদুদের। নাম শুনেছি মায়ের মুখে । খুব টক অথচ ভীষণ রস ঐ লেবুর। বাইরেটা ঘন সবুজ, ভেতরটা মুসাম্বীর মত হলুদ। তাইতো ছবি দেখেই চিনতে পেরেছি। ওটার বড্ড দাম। তবুও দেবেন দুটো। বাপের বাড়ির লেবু শুনলে মা একটু খুশি হবেন। 


ওপ্রান্তে  কেউ আর তখন অনলাইন হয়না দেখে বিফল মনোরথ সুতনুকা মনের দুঃখে হোয়াটস্যাপের ঝাঁপি বন্ধ করে দেন। সেরাতের মত । 

ভোরে উঠেই দেখেন উত্তর এসেছে। 

আমাদের সব নিজস্ব ফার্মের প্রোডাক্ট ম্যাম। গোবিন্দভোগ চালের মত আমাদের নিজস্ব একটা সুগন্ধি চাল আছে। নাম গোপালভোগ। ওটা নিয়ে দেখুন। এক কেজি দিচ্ছি তবে। 

সুতনুকা ঝটিতি টাইপ করতে শুরু করে দেন... 

তাহলে মুরগীর ডিম, হাঁসের ডিম মিলিয়ে একডজন, পাঁচ কেজি দুধের সর চাল, এক কেজি গোপালভোগ। ও হ্যাঁ, সোনামুগ ডাল দেবেন এক কিলো। আড়াইশো তেঁতুল, দুটো গন্ধরাজ লেবু আর দুটো রংপুর লাইমস। মোট কত হয় জানাবেন। আমি কিন্তু ক্যাশে পেমেন্ট করব। আমার দ্বারা ওসব নতুন ডিজিটাল ওয়ালেট হবেনা।  

ফোন রেখেই এবার মনে হল কোভিডের যুগে খুচরো নেওয়া যাবে না। অতএব রাউন্ড ফিগারে দুহাজার টাকার মত জিনিষ নিতে হবে। তাই আবার ঢুকে দেখতে হবে সাইটে। 

কিন্তু ও প্রান্তে নীরব। কোনও উত্তর আসেনা। 

ধুস! সকাল সকাল অনেক কাজ। মায়ের কাজ, নিজের কাজ। রাঁধাবাড়া। টবের গাছ থেকে তুলসী পাতা তুলে এনে মধুর শিশি হাঁটকাতে গিয়ে দেখেন  তলানিতে ঠেকেছে। মনে পড়ে গেল। 

আচ্ছা ওদের মধুও তো দেখলাম মনে হল। সুন্দরবনের চাক ভাঙা খাঁটি মধু। তাহলে তো দু' হাজার হয়েই যাবে। এবার সোজা ফোন করেই ফেললেন তিনি। কেউ ধরল না ফোন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল... 

স্যরি! দিস ইজ হোয়াটস্যাপ নং। শ্যাল কন্ট্যাক্ট ইউ সুন... 

কি যন্ত্রণা রে বাবা! আবার টাইপ করতে বসলেন সুতনুকা। এক কেজি মধু দেবেন। আচ্ছা এই মধু চিনির রসে ক্যারামেলাইজড নয় তো? তাহলে নেব না। 

খটখট উত্তর এল ওদিক থেকে। 

কি যে বলেন ম্যাম! সুন্দরবনের খাঁটি মধুর নাম সারা বিশ্বে। আমাদের মধু এক্সপোর্ট হয়। 

সুতনুকার মনে পড়ে, রংপুরের মামাবাড়ির লোকজনের মুখে সুন্দরবনের মধুর নাম শুনেছে। বাংলাদেশে সুন্দরবনের যে অংশটা ঢুকে আছে সেখানেও এই মধু পাওয়া যেত। 

আবার লিখলেন... 

দেখুন যা যা জিনিষ অর্ডার করলাম সব মিলিয়ে ২০০০ পুরো হয় যেন। আমি খুচরো নেব না কিন্তু। 

ওকে ম্যাম। শ্যাল রাউন্ড আপ উইথ লেবু কিম্বা তেঁতুল। 

(২) 

সেদিন মা মেয়ের চা-টোস্ট পর্ব শেষে ভাত রেঁধে বসে রইলেন সুতনুকা। এমন প্রায়ই হয় আজকাল তাঁর। কোনদিন ডালটা প্রেসারে সেদ্ধ করে গ্যাস নিভিয়ে দিয়ে টিভি খোলেন। কোনদিন আনাজপাতি কেটে নিয়ে হাঁফিয়ে মরেন। কোনদিন মিক্সারে পোস্তটা কাঁচালঙ্কা দিয়ে দুবার ঘুরিয়ে ক্ষান্ত দেন। ভাবেন আর কদ্দিন এভাবে? মায়ের জীবনটাও তেমনি। কোভিডও তেমনি। এই দুয়ের টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত হতে হতে আজ ক্লান্ত এই অবিবাহিতা। আর কদ্দিন নিজের জন্য রান্না করে চলবেন তিনি? মা তো নামমাত্র বেঁচে আছেন। তাঁর খাওয়াদাওয়া শুধু বাঁচার জন্য। তিনি কি খান, কেন খান তাও সবসময় বোঝেন না। সর্বগ্রাসী এক মনখারাপ ঘিরে ধরে কুয়াশার মতন। এসে দাঁড়ান মায়ের বিয়ের ড্রেসিং মিররের সামনে ।  পুবের রোদ এসে আছড়ে পড়েছে  পুরনো পলকাটা আয়নার কাচে । সুতনুকার সিঁথির পাশের আরও আরও চুলগুলিতে রঙ ধরে গেছে এই কোভিডের কালে। অর্থাৎ আরেকটু বয়স বেড়ে গেল বুঝি। আগে শখের নেল পালিশ লাগানো সব ঘুচে গেছে । বেরুনোর সময় লিপস্টিক, ম্যাচিং ব্লাউজ, শখের শাড়ি সব শিকেয় তোলা রইল। কিসের জন্য তবে এই বেঁচে থাকা? দিনের পর দিন। 

এখন আবার আরেকটা ভয় কুরেকুরে খায় তাঁকে। তাঁকে  যদি কোভিড ধরে? তিনি যদি মায়ের আগে চলে যান এই দুনিয়া থেকে? মায়ের কি হবে তবে? এর নাম ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের আরেক নাম মনখারাপ। কেউ যেন বলে ওঠে নেপথ্যে। 


একটা ফোন এসে সেই চিন্তায় ভাটা পড়ে তখনকার মত। অচেনা নম্বর। 

হাটেবাজারে থেকে বলছি। আপনার টোটাল বিল অ্যামাউন্ট ২০১০ টাকা। এক্সপেক্টেড ডেলিভারি টাইম, কাল সকাল ১০টা। 

কথাগুলো বলেই ফোন কেটে যায় না কেউ কেটে দেয় বুঝতে পারেন না । পরেই মনে হল ভয়েস মেসেজ ছিল সেটি। 

মানুষের সঙ্গে আর ইন্টারঅ্যাক্ট করা যাবেনা তবে? কি মারাত্মক অতি যান্ত্রিক হয়ে উঠল জীবন! তবে বাবা একটা কথা বলতেন বটে। "প্ল্যানেট  আর্থ ইজ সিক। অ্যান্ড দ্যা ডিজিজ ইজ ম্যান"  মানুষের থেকে দূরে থাকতে শেখ । ভালো থাকবি। 

সেদিন অনেক তর্ক হয়েছিল বাবার সঙ্গে।  কি যে বল তুমি! মানুষ কি জন্তু জানোয়ার? মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। 

বাবা বলেছিলেন পশুপাখিদের অতীত নেই, ভবিষ্যতের চিন্তা নেই। আছে কেবল বর্তমান। যত মানুষের সঙ্গে মিশবি তত বুঝবি। আনন্দ যেমন পাবি তেমনি ততটাই আঘাত পাবি, দুঃখ পাবি।

 

ভূপেনবাবুর বিখ্যাত গান "মানুষ মানুষের জন্যে" মিথ্যে তবে? সুতনুকা বলেছিল। 


আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব সবার থেকে বাবা ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন একদিন। তখন ইন্টারনেট আসছে সবেমাত্র। সোশ্যাল মিডিয়াও ছিলনা। বাবা একা হয়ে পড়লেন অবসর নেওয়ার পরেই। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে বয়স্ক ছেলেরা অনেকেই  এমন অবসাদগ্রস্ত  হয়ে পড়ছে আজকাল। এর নাম মেল মেনোপজ। কাগজে পড়েছেন তিনি। গুমরে গুমরে নিজের খোলসের মধ্যেই গুটিয়ে রাখতে রাখতে একদিন দুম করে বাবা চলে গেলেন। সুতনুকার তখন কলেজ জীবন। তারপর এম এ ক্লাসে ঢুকেই মায়ের স্ট্রোক হল। পড়া শেষ হল তারমাঝেই কিন্তু সুতনুকার জন্য জীবনের আর কিছু নতুন ইশারা রইল না। নাথিং টু লুক ফরোয়ার্ড। কেউ তার বিয়ের চেষ্টাও করেনি কোনোদিন । আর প্রেমে পড়তেও শেখেননি সুতনুকা। ঐ যে বাবার কথাই মাথায় গেঁথে ছিল বোধহয়। মানুষের থেকে দূরেই থেকে গেলেন তিনি। নতুন করে নিজের জীবনে বিপদ ডেকে আনার কোনও ইচ্ছেই মাথায় আর আসেনি।  

ফোন হাতে নিয়েই দেখতে পেলেন হোয়াটস্যাপে মেসেজ এসেছে আবারো। যে কথাগুলি তখন ফোনে শোনালো সেটাই আরও একবার। তিনি শুধু থ্যাংক্স জানালেন তখনকার মত। 

মনে মনে বলে উঠলেন, উফ! কি নিরুত্তাপ সারা দুনিয়া!

(৩) 

এভাবেই চলছিল বেশ। কাঁঠালি কলায়, থোড়-বড়ি-মোচায়।  দুধেরসর থেকে দুধকচু সবের মধ্যেও ঐ অচেনার সঙ্গে কথোপকথন সুতনুকাকে এক পশলা সুবাতাস দিয়ে যায়। গলার স্বর শুনে অভ্যস্ত ও প্রান্তের মানুষটিকে খুব দেখতে, জানতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই তার। আরও কথা বলারও ইচ্ছে থেকেই যায়। 

হঠাত একদিন গ্রসারী আইটেমের অর্ডার দিয়ে সুতনুকা ঝাঁঝের সঙ্গে লিখেই ফেলেন, এত এত জিনিষ কিনছি কিছু ফ্রি দেন না তো?  


সঙ্গেসঙ্গে ওদিক থেকে উত্তর আসে। 

আপনার কি চাই বলুন? নেক্ট টাইম ফর শিওর। 

সুতনুকা কি বলবেন ভেবে পান না। 

ওদিক থেকে আবারো প্রশ্ন আসে... 

বলবেন ম্যাম। কি দিতে পারি ফ্রি হিসেবে। 

সুতনুকা স্মাইলি পাঠান খুশি হয়ে

প্রত্যুত্তরে হাটেবাজারের করজোড়ে নমস্কারের ইমোজি ফুটে ওঠে স্ক্রিনে।  

থেমে যায় বার্তালাপ। 


(৪) 

ইলিশমাছ বড্ড দাম। তার চেয়ে চিংড়ি দিন। মাছের ডিম আছে? এইসব আদুরে খুচরো সংলাপে বানভাসি হয় সুতনুকার হোয়াটস্যাপ। তবে আগে যেমন বেশীটাই কেজো কথা হত এখন আরেকটু আবেগ মাখানো সেই সংলাপের ভাষা। হাটেবাজারের ভাষাতেও  বেশ আত্যিশ্যের ছোঁয়া।  

বিজনেস ডিল বাদ দিয়ে সুপ্রভাত, শুভরাত্রির সঙ্গে দিব্য জায়গা করে নিল সুন্দরবনের আমফানের ক্ষয়ক্ষতি । সুতনুকা একদিন লিখেই ফেললেন, 

আপনাদের ফার্মের ঘরবাড়ির কোনও ক্ষতি হয় নি তো? জানাবেন। যদি সাধ্যমত কিছু সাহায্য করতে পারি। 

ওদিক থেকে উত্তর আসে বিনয়ের সঙ্গে, 

সো নাইস অফ ইউ ম্যাম।

উদ্বেল হয়ে পড়েন সুতনুকা। 

এসব কথা ছাড়াও "কি টাটকা মাছ ছিল" অথবা "খুব মিষ্টি ছিল পেয়ারা” ...এসব শুনে  হাটেবাজারেও তাদের ব্যাবসায়ী  মনোবৃত্তি, নিক্তিতে ওজন মাপা ছেড়ে সুতনুকা ম্যামের জন্য স্পেশ্যাল ডিল দিতে শুরু করল অচিরেই। 

দু কিলো আলুর সঙ্গে কাঁচা হলুদ ফ্রি, এক কিলো সোনামুগ ডালের সঙ্গে একশো হলুদ গুঁড়ো ফ্রি আবার কোনদিন একডজন কলা দিল দশটার দামে। 

সুতনুকা ছেড়েই দিয়েছেন প্রায় পাড়ার দোকান থেকে বাজার আনা। এই বেশ ভালো ব্যাবস্থা। আজকাল প্রতিদিন ভোরে উঠেই তিনি হাটেবাজারের মেসেজ পান। নতুন কি ফল এল, কি শাক এল, কোন মাছ এল ... মন ভালো হয়ে যায় তাঁর। ইচ্ছে হয় সামনাসামনি মানুষটির সঙ্গে একটিবার আলাপ করার। 

(৪) 

ম্যাম ইউ উইল লাভ দিজ গুডি ব্যাগ ফর্ম আওয়ার ফার্ম! শ্যাল ডেলিভার ইউ টুডে। 

সুতনুকা হতবাক। কিছু তো অর্ডার করেন নি তবু কেন? হয়ত ভ্যালিউড ক্লায়েন্ট ভেবে কিছু দিচ্ছে। 

সেদিন গুডি ব্যাগ খুলতেই চোখে পড়ল রংপুর লাইমস, কাঁচা হলুদ, তুলসীপাতা, আদা, ছোট্ট মধুর শিশি আর গোলমরিচের প্যাকেট। বেশ অবাক হলেন খুলে। বেশ দামী সব জিনিষ। আর সঙ্গে একটা চিরকুটে লেখা "স্টে হেলদি, স্টে সেফ" 

হাটেবাজারে তার মানে তাদের ক্লায়েন্টের কোভিড কেয়ারের জন্য বেশ সচেতন। ফার্ম ফ্রেশ গুডিজ পাঠিয়েছে তাই। 

হোয়াটস্যাপ খুলে সুতনুকা লেখেন খুব ভালো লাগছে এইসময় এত কিছু দরকারি জিনিষ হাতে পেয়ে। নিশ্চয়ই পাঁচন বানিয়ে খাব। থ্রোট কেয়ার হবে আমাদের। মনে করার জন্য থ্যাংকস। বাই দ্যা ওয়ে জ্যান্ত কাতলার কি স্টেট্যাস? ল্যাজা মুড়ো বাদ দিয়ে সলিড মাছ দেবেন এবার এক কেজি । ঘাড়ের বা নীচের দিকের মাছ নেব না অ্যাজ ইউজ্যুয়াল। মা কে কাঁটা বেছে দিতে হয় আমার।  

ওপাশ থেকে উত্তর আসে জানি তো ম্যাম। তবে এবার আরেকটা সারপ্রাইজ দি? 

প্লিজ... 

ইয়োর ফেবারিট মালাবার স্পিনাচ ফাইনালি অ্যারাইভড। কাতলা মাছের সঙ্গে ওটা ফ্রি যাবে, সঙ্গে আড়াইশো হরিণা চিংড়ি ফ্রি। অসুবিধে নেই তো ? বাই দ্যা ওয়ে, একফালি কুমড়ো দেব কি তবে? উইকেন্ডে পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ি চচ্চড়ি জমে যাবে ম্যাম। 

সুতনুকা ভাবেন, আমার আবার উইকেন্ড! আমি কি চাকরী করি ছাই? তবে কি করে জানলো ওরা? দিন কয়েক ধরে পুঁইশাকের জন্য বড্ড মনকেমন করছিল তার। মা ও খুব ভালো রাঁধতেন একসময়। 

হাটেবাজারের সঙ্গে কেনাকাটিতে মন ভালো করতে করতে একসময় ডিপ্রেশন একটু একটু করে মুক্তি দিয়েছিল সুতনুকা কে। ফেসবুকে ঢুকে নিজেই একটা অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলেছিলেন তিনি। প্রোফাইলের ছবিও একই আছে মানে যেটি হোয়াটস্যাপে লাগানো। মানুষ কে হঠাত করেই ভালো লাগতে শুরু করেছে তাঁর। বাবা ভুল বলতেন। বাবার কপাল সেটা। খুঁজে পেয়েছেন  ইশকুল, কলেজ, ইউনিভারসিটির কয়েকজন বন্ধু বান্ধব কে। 

বেশ কাটছিল দিন। অসুস্থ মা ঘরে। তবুও অভ্যেসে সব সয়ে গেছে। কোভিড ও বশে আছে এখনও অবধি। 

হঠাত করেই একদিন রাতে মায়ের শ্বাস উঠল। পাশে শুয়েই টের পেলেন সুতনুকা। মায়ের নাড়ী ছেড়ে দিচ্ছে। ভোর রাতে মা চলে গেলেন। পাড়ার ছেলেদের খবর দিলেন। মা কে তারা নিয়ে গেল।  সুতনুকার গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল বেরিয়ে এল। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নতজানু হয়ে জানালেন ধন্যবাদ। মা কে মুক্তি দিলেন তিনি। কোভিডও ধরতে পারেনি তাই  মায়ের শেষ যাত্রায় তিনিই সঙ্গী হলেন। মুখাগ্নি করলেন। 


বাড়ি ফিরে দেখেন হাটেবাজারের ডেলিভারি পড়ে আছে তাঁর দরজার সামনে। একমধ্যে কিছু অর্ডার দিয়েছেন বলে  তো মনে পড়ছে না। তাহলে? 

প্যাকেট খুলে দেখতে পেলেন একটি চিরকুটে লেখা শোকবার্তা ..মে ইওর মাদার'স সোল বি অ্যাট পিস! ওম শান্তি! ফ্রম টিম  হাটেবাজারে। 

চিরকুটের সঙ্গে এসব আবার কি? হবিষ্যির আয়োজন? সুতনুকার জন্য? আতপ চাল, মটর ডাল, সৈন্ধব লবণ, ঘিয়ের শিশি আর কাঁচকলা। ওরা জানলো কি করে? তিনি তো এখনও মায়ের মৃত্যুর কথা বলেন নি ওদের সঙ্গে। 


কোভিডের যুগে সংক্রমণের "ট্রেস দ্য পাথ" এ অভ্যস্ত শিক্ষিত মানুষজন। হঠাত মাথায় এল তাঁর। মা চলে যাবার পরেই ভোর রাতে ফেসবুকে স্টেট্যাস দিয়েছিলেন বটে। বন্ধুদের জানাতে । হাটেবাজারেও সেখানে সুতনুকার প্রকৃত বন্ধু কিনা!  











 




১৫ নভে, ২০২০

ভাইফোঁটার পুরাণকথা এবং বিজ্ঞান / ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

যম, সংযম, যমুনা, যমজ... আগে কখনো ভাবিনি এই শব্দগুলোর সঙ্গে ভাইফোঁটার কত গভীর সংযোগ। সূর্যপত্নী সংজ্ঞা সূর্যের সঙ্গে সহবাসকালে তাঁর পতির তেজোদৃপ্ত শরীরের ছটা, উত্তাপ, তেজময় বিকিরণ সহ্য করতে না পারায় চোখ বুঁজে র‌ইলেন। ক্রুদ্ধ সূর্যের সংজ্ঞার এহেন সংযম অপছন্দ হল। গালিগালাজ করলেন পত্নীকে! "কোথায় আমার মত পুরুষের সঙ্গে রতিলিপ্ত হয়ে শীত্কারে, আনন্দে চূড়ান্ত সম্ভোগময়ী হবে তা নয় চোখ বুঁজে রয়েছো! সংযম পালন হচ্ছে? ঠিক আছে, আমার ঔরসে তোমার গর্ভের সন্তান হবে আলোকবিহীন অর্থাত ঘোর আঁধারের মত কালো।' 

সাহিত্যের ধারাপাতে সংযোজিত হল নতুন শব্দ যার নাম সংযম। আর সূর্যের অভিশাপে সংজ্ঞার একজোড়া কালো পুত্রকন্যা জন্ম নিল যাদের নাম হল যম এবং যমী। ।  

সূর্যপত্নী সংজ্ঞা সূর্যের দাপট সহ্য করতে না পেরে পৃথিবীতে ফিরলেন । সেইসঙ্গে তার বিকল্প হিসেবে তার ছায়াকে রেখে এলেন সূর্যের কাছে, দেবলোকে।ব্যাস! সূর্য ছায়ার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হলেন। ছায়ার গর্ভে যখন সূর্যের সন্তান এল তখন সংজ্ঞার পুত্রকন্যা যম-যমীর সঙ্গে ছায়া বৈমাত্রেয় সুলভ ব্যবহার করতে থাকলেন । ছায়ার কুমন্ত্রণায় সূর্য নিজপুত্র যমকে নরকে এবং কন্যা যমীকে মর্ত্যে পাঠিয়ে দিলেন । 

সাহিত্যের অভিধানে একজোড়া সহজাত সন্তানের নাম একত্রে যমজ। সূর্যতনয়া, রবিনন্দিনী, সূর্যজা যমুনার অপর নাম কালিন্দী বা যমুনাও প্রবাহিত হল কালীয় নামক সর্পের বিষোদগারে কালো বর্ণের নদীরূপে । যম হলেন কালদন্ড হাতে নরকে মৃত্যুর দেবতা রূপে।  

বহুদিন অতিবাহিত হলে যম এবং যমী উভয়ে একে অপরের বিচ্ছেদে কাতর হলেন। যম দেখা করতে গেলেন যমীর সঙ্গে । আর সেদিনটি ছিল কালীপুজোর দু-দিন পর কার্তিক অমাবস্যার শুক্লাদ্বিতীয়া তিথি যা আজো ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা যমদ্বিতীয়া নামে খ্যাত। ভাইয়ের জন্য যমী নানাবিধ খাদ্যদ্রব্যের আয়োজন করে, উপহার সাজিয়ে নাকি বসেছিলেন তাই ঐদিনে বোনেরা ভাইদের জন্য এভাবেই পালন করে থাকে। কারণ একটাই। ভাইয়ের মঙ্গলকামনায়, ভাইয়ের পরমায়ু কামনায়।  

ঋগ্বেদ বলে যম আর যমী মায়ের শরীরের বাইরে এসেও নাকি মাতৃজঠরের একত্র অবস্থানকে ভুলতে পারেনা। তাই যমী যমকে কামনা করে বসেন। বলেন, আমাকে তোমার সন্তান দাও।  যম কিন্তু নিরুত্তর। প্রত্যাখ্যান করেন আপন সহোদরা যমীকে। 

অথর্ববেদে বলে যমুনা নাকি যমকে বলেছিলেন মায়ের পেটে তো তাঁরা একত্রে দশমাস পাশে শুয়ে ছিলেন অতএব এখনো তিনি সেভাবেই যমকে শয্যাসঙ্গিনী রূপে কামনা করেন কিন্তু যম বোনের মুখে এমনটি শুনে যেন তড়িতাহত হলেন। বলেন, জন্মসূত্রে এক পরিবারের হলে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা গর্হিত কর্ম।   

যদিও প্রাকবৈদিক যুগে ভাই-বোন বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছে তাই যমীর এরূপ ধারণা অমূলক নয়।  কিন্তু যম সেই ধারণাকে এক্কেবারে আমল না দিয়ে চলে যান।  আজ আমাদের শরীরবিজ্ঞান বলছে ভাই-বোনে বিবাহ হওয়াটা সত্যি সত্যি যুক্তিযুক্ত নয় । ভারত সহ পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে এই বিবাহ চালু ছিল কিন্তু জিনগত সমস্যা এই বিবাহকে নিরাপদ করেনা অনেকাংশেই। সুস্থ মাতৃত্ব আসেনা। এলেও জিনগত ত্রুটি নিয়ে সন্তান আসে তাদের যা পরবর্তী জীবনে দুর্বিষহ। ভয়ানক সব রোগের স্বীকার হয় ভাইবোনের মিলনের ফলস্বরূপ সন্তানটি। সে যুগে এত বিজ্ঞান ছিলনা। ছিলনা হেমাটোলজির পরীক্ষানিরিক্ষা। মানুষ বুঝতনা জিনতত্ত্ব ও জৈবরহস্য। সেই বিয়ের ফলশ্রুতি মোটেই সুখকর হয়নি তাই বুঝি ধীরে ধীরে বিদায় নিয়েছে সহোদর-সহোদরার বিবাহ।  সেই প্রাচীন যুগে এক পরিবারের, একই পিতামাতার দুই পুত্রকন্যার বিবাহ হলে হয়ত নিজেদের রক্তের শুদ্ধতা বাঁচিয়ে রাখাটা হত একটি‌ই কারণে। পিতার সম্পত্তি যাতে নিজের পরিবারের মধ্যেই সযত্নে রক্ষিত হয়। কারণ বিবাহ নামক সামাজিক বন্ধন হল সম্পত্তি রক্ষার্থে উত্তরসুরীর উৎপাদন। 

কিন্তু রক্তের রসায়ন দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ । এ জটিল তত্ত্ব গবেষণায় উঠে এসেছে। রক্তের শুদ্ধতার পরিবর্তে রক্ত দূষণ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা জানিয়েছে বিজ্ঞান। কিন্তু এ তত্ত্ব জানতেন না যমরাজ। ডার‌উইনের থিয়োরি অফ ইভোলিউশানে  সারভাইভ্যাল অফ দ্যা ফিটেষ্ট বা যে সমর্থ সেই বাঁচবে সেই অনুসারে কালক্রমে ভাই-বোনের এই বিবাহে ভাটা পড়ে গেছে। পরে এসেছে আরো থিয়োরি। রক্তসূত্র ধরে যেমন এসেছে আমাদের বংশগোত্র। এখনো আধুনিক সমাজেও আমরা স্বগোত্রে তাই বিবাহ দিতে কেউ কেউ নারাজ হ‌ই।  আর তাই বুঝি যমীর ভাইকে বিবাহের আবেদন ও বোনকে বিবাহে যমের এই প্রত্যাখানের লোকায়ত কাহিনীটি প্রচার করে ধীরে ধীরে মর্যাদার আসনে বসানো হয়েছে ভাইফোঁটাকে আর সমাদর করা হয়েছে ভাইবোনের মধুর সম্পর্কটিকে।  

যা হয়েছে তা সমাজের ভালোর জন্যেই। যম-যমীর সুস্থতার জন্যেই। আর ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়েছে ভাইবোনের বিয়ে। তাই বুঝি যমী মনকে বুঝিয়ে বলে,  যমের অখন্ড পরমায়ু আশা করে। তাকে পেট পুরে তার মনের মত পদ রেঁধেবেড়ে খাওয়াও, তাকে উপহার দাও..শুধু এই বিয়ে থেকে শতহস্ত দূরে থাকো।  

কালের স্রোতে ধুয়েমুছে সাফ হল ভাইবোনের যৌনতার গন্ধ মাখা সম্পর্ক। আর ঠাঁই পেল স্বর্গীয় সুন্দর এক অমলিন, পবিত্র সম্পর্ক।  যম যমীর ফোঁটা নিয়ে পরম তৃপ্তি পেলেন। আর সমাজ স্বীকৃতি দিল  ভাই-ফোঁটা, ভাই-দুজ, ভাই-বীজ, ভাই-টীকা বা ভাই-তিলকের মত পবিত্র উত্সবকে।  

পুরাণ এই উত্সবের অন্য ব্যাখ্যা দেয়। কার্তিকমাসের শুক্লা দ্বিতীয়ার দিনে শ্রীকৃষ্ণ দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ নরকাসুর বধ করে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর বিজয়-সম্বর্ধনায় ভগিনী সুভদ্রা যে উত্সবের আয়োজন করেন তার নাম‌ই ভাইফোঁটা।  

*তাই আবহমান কাল ধরে বোনেরা ভাইদের মঙ্গল কামনা করে ফোঁটা দেয় ভাইয়ের শত পরমায়ু, উন্নতি কামনা করে।

কিন্তু কখনো কি শুনেছি আমরা এর উল্টোটা? অর্থাৎ ভাই তার বোনকে ফোঁটা দিয়ে বোনের সুস্থতা, সুরক্ষা এবং সার্বিক উন্নতি চাইছে? সকালে ধোপদুরস্ত হয়ে মাঞ্জা দিয়ে, ধুতির কোঁচা দুলিয়ে ভাইরা যুগে যুগে বলে এল, "ভাইফোঁটা নিতে যাচ্ছি"। কিন্তু "বোনফোঁটা দিতে যাচ্ছি" ও তো বলতে পারত তারা।

তাই এস আমরা চালু করি সামগ্রিক "ভাইবোনফোঁটা"। দু-তরফের পক্ষ থেকেই ফোঁটা চালু হোক!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ভাইফোঁটা...

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান হত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'ভাইফোঁটা' অনুষ্ঠানের উষ্ণতা ও আন্তরিকতা খুবই পছন্দ করতেন। তিনি তাঁর ভগিনীদের কাছ থেকে ভাইফোঁটা নেবার সুযোগ থেকে কখনও বঞ্চিত হতে চাইতেন না। সৌদামিনী, শরৎকুমারী, সুকুমারী, স্বর্ণকুমারীর ও বর্ণকুমারী দেবীরা নানা সময়েই দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, সৌমেন্দ্রনাথ প্রমুখ দাদা-দের ভাইফোঁটার দিন ফোঁটা দিতেন এবং সেই পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন রবীন্দ্রনাথও।

স্বর্ণকুমারী দেবী রবীন্দ্রনাথ-কে খুবই স্নেহ করতেন এবং ভালোবাসতেন ও তাঁর আদরের ভাই-কে ফোঁটা দিয়েছেন। স্বর্ণকুমারী দেবী তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'গাথা' তাঁর আদরের ভাই 'রবি'কে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন -

"ছোট ভাই'টি আমার

যতনের গাঁথা হার কাহারে পড়াব আর?

স্নেহের রবিটি, তোরে আয়রে পড়াই,

যেন রে খেলার ভুলে ছিঁড়িয়া ফেল না খুলে,

দুরন্ত ভাইটি তুই, তাইতে ডরাই।"

কবি'র জীবনের শেষ ভাইফোঁটার আবেগঘন অনুষ্ঠানের অসাধারণ বর্ননা আছে রাণী চন্দ'র "গুরুদেব" বইটিতে।

"ভ্রাতৃদ্বিতীয়া এল। গুরুদেবের এক দিদিই জীবিত তখন - বর্ণকুমারী দেবী। তিনি এলেন আশি বছরের ভাইকে ফোঁটা দিতে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আজও ভাসে ছবি চোখের সামনে - গৌরবরন একখানি শীর্ণহাতের শীর্ণতর আঙুলে চন্দন নিয়ে গুরুদেবের কপালে কাঁপতে কাঁপতে ফোঁটা কেটে দিলেন। দুজন দুপাশ হতে ধরে রেখেছি বর্ণকুমারী দেবীকে। ফোঁটা কেটে তিনি বসলেন বিছানার পাশে চেয়ারে। ভাইয়ের বুকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। খুব রাগ হয়েছে দিদির ভাইয়ের উপরে। কালিম্পঙে গিয়েই তো ভাই অসুস্থ হয়ে এলেন, নয়তো হতেন না - এই ভাব দিদির। ভাইকে বকলেন, বললেন, দেখো রবি, তোমার এখন বয়স হয়েছে, এক জায়গায় বসে থাকবে, অমন ছুটে ছুটে আর পাহাড়ে যাবে না কখনো। বুঝলে?

গুরুদেব আমাদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন, বললেন, না, কক্ষনো আর ছুটে ছুটে যাব না; বসে বসে যাব এবার থেকে।

সকলের খিলখিল হাসিতে ঘর ভরে উঠল।"


মেয়েদের উপলক্ষ্য করে কোনো অনুষ্ঠানই নেই। একটি মাত্র অনুষ্ঠান সাধভক্ষণ তাও সে কোনো গৌরবের নয় সবাই জানি ।বেশ কয়েক বছর আগে তসলিমা নাসরিন তাঁর কোলকাতার বাড়িতে বোনফোঁটার অনুষ্ঠান শুরু করেন।গতবছর দেখলাম এই ফেসবুক পাতায় বেশ কয়েক জোড়া বোনের বোনাফোঁটার ছবি।বেশ লাগলো কিন্তু। মেয়েরা যদি এইভাবেই আরো কাছাকাছি এসে যায় পরস্পরের প্রতি আরো সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে।

যাইহোক আমাদের সিস্টারহুড জারি থাকুক।সব বোনেদের পক্ষ থেকে আমার পরম বন্ধু কবি তৃষ্ণা বসাক এর বোনফোঁটা মন্ত্রটি পড়ছি 

বোনফোঁটার মন্ত্র 

তৃষ্ণা বসাক 


(অমৃত আর গরল মথিয়া 

এসে গেছে আজ ভগিনীদ্বিতীয়া)


নতুন যুগের নতুন সুর।

বোন না যেও দূর।।

বোনের কপালে দিলাম ফোঁটা ।

ভায়েরা প্লিজ দিও না খোঁটা।।

যমুনাকেও দিলাম ফোঁটা ।

যম দেখে ভয়ে কাঁটা! 

তুমি আমার  বোন হয়ো।

বছর বছর ফোঁটা নিও।।