২৮ ফেব, ২০২০

সুলতার শাড়ি - বম্বে Duck বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত

সুলতার এখন মধ্যবয়স। এমনিতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে বেশ ফিট তিনি কিন্তু আগের মত তণ্বী নন আর। একসময় নিত্যনতুন শাড়িতে ক্লাবে গেলেই তাকে দেখে সবাই বলত ঐ যে এসে গেছে আমাদের হেড টার্নার। এখন ক্লাবে তিনি অনিয়মিত । আগের চেয়ে একটু পৃথুলা তাই শাড়ি বড় একটা পরা হয়না।


কিন্তু বাঙালীদের আড্ডায় শাড়ি মাস্ট। তখন শাড়ির আলমারীখানি খুলতেই হয়। আজকেই কিছু বন্ধুবান্ধব ক্লাবে ডেকেছে অতএব না গিয়ে উপায় নেই তাঁর ।

একসময় এই শাড়ি পরে সেজেগুজে ক্লাবে যাওয়া ছিল নেশার মত। সেই তাগিদটাও আর অনুভব করেন না সুলতা।

আলমারির দিকে এগিয়ে যান। পঙ্খের কাজ করা, মেহগিনি পালিশের কেতাদুরস্ত কাঠের আলমারীতে শাড়ী সম্ভার বন্দী হয়ে পড়েই থাকে। সুলতার মনখারাপ হয় ঐ শাড়ির আলমারীটির দিকে চোখ পড়লেই। এমনিতে আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড। আলমারী খুললেই শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা খুচরো গল্পের স্মৃতিরা বেরিয়ে আসে শাড়ির পরত খুলে। সুলতার মনখারাপ সজোরে যেন আছড়ে পড়ে বার্মাটিকের পাল্লায়, ড্রয়ারে এমন কি দামী শাড়ি ঝোলানোর রডের ওপরে। বাঁদিকের পাল্লার ওপরে আবার পেতলের ছোট্ট ছিটকিনি। সেটি খুলতে আঙুলের জোর লাগে এখন। সুলতা ভাবেন, কি যে হবে এত শাড়ি তাঁর! মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে...

"কি আবার হবে? তুমি কেটে পড়লে শাড়িরাও ঠিক নিজেদের জায়গা করে নেবে, তাদের ভাবনা তারাই ভাববে, তুমি তখন বিন্দাস, সুখস্বপনের পারে, শ্মশানের ধারে"


সুলতা ভাবেন, যাক্‌ গে! সত্যি‌ই তো একসময় প্রয়োজন ছিল, নেশা ছিল শাড়ি কেনার। এখন আর নেই। তিনি চলে গেলে তো আর কেউ ভাববে না এই শাড়িগুলোর অবস্থা। যা হবার হবেখন। ছিটকিনি টা খুলেছেন। হাতে অল্প চোট পেলেন। আঙুলটা লাল হয়ে গেল। একটু জিভ দিয়ে চেপে ধরে র‌ইলেন কয়েক সেকেন্ড। মনে পড়ে গেল তমালের কথা। একসময় হাত কেটে গেলে তমাল এভাবেই নিজের ঠোঁটের মধ্যে পুরে নিত সুলতার নরম আঙুল। তমাল প্রসঙ্গ মাথায় এলেই মনে পড়ে কতকিছু ।


আলমারীর বাঁদিকের পাল্লা খুলতেই তমালের স্মৃতি সব। প্যান্ডোরার বাক্স যেন। চেপে রাখা যায়না তাদের। শাড়ি ঠাসাঠাসি । আলমারীর চাপে বশীভূত ছিল। চাপ মুক্ত হতেই একের পর এক পড়ে গেল মেঝের ওপর। শাড়ি, শাড়ি আর শাড়ি। সব তমালের দেওয়া। কোনোটা বিয়ের প্রথম বছরে। পিচ রঙের বালুচরী। আঁচলে পাড়ে মীনাকারীর কাজ। রাধাকৃষ্ণের গল্প। ঠিক সুলতা আর তমালের প্রেমের মতোই । একসময় মুক্তোর সেটের সঙ্গে খুব পরেছেন সুলতা। এখন বালুচরী অবসোলিট। ভাল্লাগেনা পরতে। তমাল সেবার বিষ্ণুপুর থেকে কিনে এনে চমকে দিয়েছিল। ক্লাবের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পরে গান গেয়েছিল সুলতা।


এবার চোখ পড়ে গেল প্রুশিয়ান ব্লু রঙের সিল্ক শিফনের দিকে। পিঁজে গেছে শাড়িখানা। মখমলি জমিন থেকে রেশমের পাড়খানি আলাদা হয়ে আসছে। ঠিক যেন এটাই চেয়েছিলেন সুলতা। এই শাড়ির প্রতি তাঁর কোনো দুর্বলতা অবশিষ্ট নেই। নিউমার্কেট গিয়ে সেবার বিয়ের তারিখে পছন্দ করেছিলেন ।

স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে অমন সি থ্রু শাড়ি পরে ক্লাবে যাবে তুমি? তমাল বলেছিল।

সুলতা বলেছিল, কেন আপত্তি আছে বুঝি?

তা আছে, আমার ব‌উয়ের শরীরের ভাঁজ, খাঁজ অন্য পুরুষ দেখুক আমি চাইনা।

তা মশাই? আপনি যখন বন্ধুর স্ত্রীয়ের চুলকাটার প্রশংসা করেন? সেটা বুঝি আমার খুব ভালো লাগে? এমন সব উত্তপ্ত বচসার পর ব্লেড দিয়ে সেই সিল্ক শিফনের কিছুটা চিরে ফেলেছিল সুলতা। ছিঁড়ুক শাড়ি। মরুক গে।

খুব শখ করে কেনা শাড়িখানা আর অঙ্গে তোলেনি সুলতা। পায়ের কাছে একটা শাড়ি অনেকক্ষণ পায়ের পাতা ছুঁয়েই চলেছে। হাতে তুলে নিল সুলতা তাকে। বাবা দিয়েছিলেন কলেজে পড়াকালীন তার জন্মদিনে। বাংলাদেশী ঢাকাই। হালকা গোলাপী রঙের ওপর ঘন গোলাপীর কাজ। মধ্যে মধ্যে রূপোলী জরির বুটি। এই শাড়িটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তমালের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার মূহুর্ত। দুইবাড়ির মধ্যে গ্রিন সিগনালের পরে ছাদে উঠে জীবনের প্রথম পুরুষের হাতের ছোঁয়া, চুমুর স্মৃতি। সেদিন রোমকূপের শিহরণ টের পেয়েছিল একমাত্র এই গোলপী ঢাকাইখানি। তমাল কেমন বদলে গেল তাইনা সুলতা? শাড়ি যেন তাকে প্রশ্ন করল। সুলতা বলল তাকে, এমনি হয় গোলাপী। সময় বদলে দেয় কতকিছু। এই যেমন তোকেও আমি কত্তখানি ভালোবেসেছিলাম আমার কলেজ জীবনে। তুইও তো একদিন নিজে থেকেই ঐ জরির বুটি থেকেই ফাটতে শুরু করলি। সুতো সরে সরে আমাকে কত কষ্ট দিয়েছিলি। সবাই এমনি হয় সংসারে। তোর কাজ সেদিন শেষ হয়ে গেছিল রে গোলাপী। সেদিন বিকেলের কনে দেখা আলোয় তোকে জড়িয়েছিলাম বলেই নাকি আমায় ওরা পছন্দ করেছিল। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা পাত্রীর জন্য কনে দেখা আলোয় গোলাপী রং নাকি উত্কৃষ্ট রে। মা বলেছিল। আমায় নিয়ে কত চিন্তা ছিল মায়ের! গায়ের রং কেন আরেকটু উজ্জ্বল হলনা মেয়ের। তা তুই আমায় উতরে দিয়েছিলি সেদিন, গোলাপী। তবুও তমালের সঙ্গে ঠিক জমল না আমার।


এবার চোখ গেল হ্যাঙারে ঝোলানো ইঁট রঙা মাইশোর জর্জেটের দিকে। সোনালী সুতোর পার্শি কাজ করা। জমিনে ঝকমকে চুমকী যেন আজো জ্ব্বলছে চিকমিক করে। এই শাড়িখানি পরে বিয়ের পরে নেমন্তন্ন খেতে গেছিল কটকটে রোদ্দুরে। তমালের সঙ্গে জোড়ে, মাসীর বাড়ি। ঘরে ঢোকা মাত্তর মাসীর মেয়েরা খুব হেসে উঠেছিল। তুই এই রোদে এমন ঝকমকে শাড়ি পরে এলি কি করে কলকত্তাওয়ালি? বারাকপুরে অবিশ্যি চলে এ সব। তবে তোদের ওখানে ভরদুপুরে এই শাড়িখানা পরলে সবাই আওয়াজ দেবে কিন্তু।

মাসীর ছোট মেয়ে ফিক করে হেসে বলেই ফেলল, "মেটিয়াবুরুজ"। জ্বলছিস পুরো। সোনার গয়না আর সোনালী জরি, সেই সঙ্গে চুমকি।

মেটিয়াবুরুজ? সে তো মুসলমানদের পাড়া। তমাল বলেছিল।

তাই তো বলছি মশাই। আপনারা খাস দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা হয়ে...

মাসি বলেছিল, আরে ওদের ঢুকতে তো দে আগে। শাড়ি প্রসঙ্গ ধামা দিয়ে চাপা পড়ে গেছিল।সেদিনের পর আর পরা হয়নি শাড়িখানা। শাড়ির আবার পাড়া হয়? জাতপাঁত হয় বুঝি?

এরপর কত শীত, বসন্ত পেরিয়ে এসেছে সুলতা-তমালের জীবন। শাড়ি জমা হয়েছে আলমারীর অন্দরে। উপলক্ষ্য পয়লা বোশেখ, পুজো, জন্মদিন, বিয়ের তারিখ। যেমন হয় সব মেয়েদের জীবনে। হাইফাই কর্পোরেট স্বামীর জীবনসঙ্গিনী সুলতা ক্লাব কালচারে অভ্যস্ত হয়েছে। শাড়ি কিনতে হয়েছে আরো আরো। বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ব্যোমকাই থেকে গাদোয়াল, ধর্মাভরম্‌ থেকে কলাক্ষেত্র কতরকমের শাড়িরা এসেছে জীবনে তার। ঠিক যেন মানুষের জীবনে কতরকমের, কত স্বভাবের মানুষের আনাগোনা হতেই থাকে সারাটা জীবন ধরে।

তবু এত সুখের জীবনে সুলতার মা হওয়া হয়ে ওঠেনি। শাড়ি জানে সেই দুঃখ। শাড়ি সাক্ষী আছে সব ঘটনার। প্রথমবার পেটে এসেছিল মেয়ে।

"সেক্স ডিটারমিনেশন ইজ নট ডান হিয়ার" লেখাটাকে এড়িয়েছিল তমাল। একবার নয় দুবার। দুবার‌ই মেয়ে ছিল যে। তাই ফেলে দিল তমাল। অমন সব নার্সিংহোমে লেখা থাকে। চুপ করে থাকো, বলেছিল তমাল। ডাক্তারবাবুরাও জেনেবুঝেই ফেলে দেন। কিন্তু ...সুলতার মুখটা চাপা দিয়েছিল তমাল। চল। আজ বেরিয়ে আমরা ক্লাবে গিয়ে খাব আর তোমায় সেই কি যেন বলছিলে? কোন্‌ শাড়িটার কথা? তোমার সেই ফেবারিট শাড়িটা?অনুসন্ধানে  রাখী পরেছিল যেটা? স্কার্ট পাড় পিওর সিল্ক তাই তো? মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সুলতা। খুব দুর্বল ছিল শরীর। প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল দুমাসের বাচ্ছাটাকে ফেলতে। শরীরের কষ্টের চেয়েও প্রবল ছিল মনের কষ্ট, না পাওয়ার খেদ, তমালের ওপর ঘেন্না। নিকুচি করেছে অনুসন্ধানের শাড়ির।

সুলতার মায়ের ওপরেও ছিল প্রচ্ছন্ন অভিমান। কলেজের কেমিষ্ট্রি প্র্যাকটিকাল ক্লাসগুলোয় মায়ের ভালো ভালো তাঁতের শাড়িগুলো এক একদিন একএকটা পাট ভেঙে পরে যেত আর এসিডের ফোঁটায় ফুটো করে বাড়ি ফিরত। কপালে জুটত মায়ের বকুনি। এতকিছুর পরেও বিয়ের পরদিন চলে আসার সময় মায়ের পুরনো একটা সাধারণ শাড়ি বাক্সের মধ্যে ভরে নিয়েছিল সুলতা। সেটা ছিল মায়ের আর তার বৃষ্টিশাড়ি। অক্ষয় অব্যয়। বড়বাজারের সিন্থেটিক কোটা শাড়ি। কি অপূর্ব প্রিন্ট শাড়িটার। সুলতার আলমারীর সবচেয়ে সস্তার শাড়ি ছিল সেটা। পরীক্ষার দিন পরত। খুব পয়া ছিল তার। কি আর হল তাকে বয়ে শ্বশুরবাড়ি এনে? নতুন ব‌উয়ের উচ্চশিক্ষা, চাকরীর মুখে নুড়ো জ্বেলে দিয়ে শাশুড়ি ঠাকরুণ কিছুদিনের মধ্যেই গত হলেন।

এরপরে আরো একটা মেয়ের মুখ দেখা হলনা ঠিক আগের মতোই। সেই দুঃখ ঘোচাতে আরেকটা শাড়ি, দুটো শাড়ি, হঠাত শাড়ি, কারণে, অকারণে আরো শাড়ির আগমন হল বটে কিন্তু জীবনে আর মা হওয়া হলনা সুলতার।

কেমন বদলে গেছিল তমাল ঠিক সেই কথা জানার পরেই। আলমারীর ডানদিকের তাকে ন্যাপথলিন বল রেখেছিল সুলতা। পাতলা ন্যাকড়ার পুঁটলিতে ভরে। ও মা! কেমন দাগ লেগে গেছে শাড়ির ভাঁজে। কি শাড়ি এটা? ওহ্! সেই লাল পাড় গরদ। সুলতার মা দিয়েছিলেন সেবার পুজোয়। বলেছিলেন আমি থাকব কিনা তাই এটা রাখ। বাচ্চা পেটে সাধ দেবার দিন, লক্ষ্মীপুজোর ভোগ রাঁধার দিন এমন সব শাড়ি নাকি পরতে হয়। আর পরা হয়নি সেই শাড়ি। সাদা শাড়ি জুড়ে ন্যাপথলিন কলঙ্কের দাগ। মনখারাপ হল সুলতার। শাড়িখানা খুলতেই একটা লালচে হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো পড়ে গেল টুক করে । পাখার হাওয়ায় উড়ে পালাচ্ছিল চিরকূটটা। সুলতার পায়ের জোর কমে গেছে। তবু ছুটে গিয়ে ধরে আনল হাতের মুঠোয়। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে কত কথা। তমালের অফিসের সহকর্মী লগ্নজিতার চিঠি। সেই প্রেমপত্র আমূল বদলে দিয়েছিল সুলতার জীবনটাকে। তমাল কে আর ধরে রাখতে পারেনি সে। সংসারের অজস্র টানাপোড়েনের মধ্যেও টিকে থাকা সম্পর্কের সুতোটা টুক করে একদিন ছিঁড়ে ফেলেছিল সুলতা। গাছেরো খাব, তলারো কুড়োব করে আমার সঙ্গে থাকতে পারবে না তুমি। চলে যাও আমার কাছ থেকে।

তমাল বলেছিল, তাই যাব। একটা ছেলের জন্য যা করতে হয় তাই করব। গাড়িবাড়ি, ক্লাব মেম্বারশিপ সবকিছু থাক তোমার নামে। তবুও যা পড়ে থাকবে তা আমার ছেলের। লগ্নজিতা আমায় ছেলে তো দিল। তুমি আর পারলে ক‌ই ?

নিজের মনেই দু-হাত বাজিয়ে তালি দিয়ে সুলতা বলে উঠল

"সাবাস্! সাবাস্! গরদের শাড়ি, এইজন্যেই তোমার গায়ে বুঝি এত কলঙ্ক "


শাড়ি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেলা বাড়ল সেদিন। হঠাত কলিংবেল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সুলতা। সুদর্শন এক যুবক দাঁড়িয়ে। হাতে একটি চিঠি।

কে আপনি? আমার নাম প্রত্যয়। বাবা চলে গেলেন। মা আগেই চলে গেছেন। বাকীটা চিঠিতেই লেখা আছে। এটা আপনার জন্য, বলে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল সে সুলতার দিকে।


সুলতা কিছুই বুঝতে পারলেন না। চিঠিখানি হাতে নিয়ে তিনি চমকে উঠলেন । তমালের হাতের লেখা। ছেলেকে দিয়ে গেছে সুলতার জন্য? একটা মধুবনী শাড়ি । যেটা খুব পছন্দ ছিল সুলতার একসময়। কেনা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে।

প্রত্যয় বলল, আন্টি হ্যাপি বার্থ ডে।

ওহ! দ্যাট রিমাইন্ডস মি। সুলতা বলে উঠলেন । ভাবলেন, তাই বুঝি আজ ক্লাবে বন্ধুরা ডেকেছে তাকে। সারপ্রাইজ পার্টি তে তমালের দেওয়া জন্মদিনের সেই মধুবনী শাড়িখানাই পরেই তবে বন্ধুদের সারপ্রাইজ দেবেন তিনি ।


২১ ফেব, ২০২০

আমার ভাষা

আমার ভাষাতেই দিদা বলতেন, খুব "তার" হয়েছে আজ আমার রাঁধা আলুর দমে। সেই শুনে মা বলতেন "বাসি" বলে "মজেছে" আরো। ঠাম্মা আমার চিবুক ছুঁয়ে বলতেন, "আমার এক ভুবন আকাশ"। ভাইকে বলতেন "আমার শিব্রাত্তিরের সলতে"। বুড়ো বাবা সেই শুনে দুই ভাই বোনের মাথায় দুটো হাত রেখে বলতেন, এরা "আমার এক‌ বৃন্তে দুটি কুসুম"।রান্নাঘর থেকে প্রায়শ‌ই মুখ বাড়িয়ে ফোন ধরে মা এখনো বলেন "নাটাঝামটা" খাচ্ছি। বাবা টিভিতে খবর শুনতে শুনতে চেঁচিয়ে আজো বলেন "উচিত তর্পণে গাঙ শুকলো" উন্নতি আর হল না রাজ্যের। মা বিয়ের পর আমার নতুন সংসার দেখে বলেছিলেন" কি সুন্দর "ঘরুনি-গেরুনি" হয়েছিস!   
সেই ভাষায় জ্বর আসে "তাড়সে" আর কাঁচালংকা আজও কামড়ে খাই প্রতিটি "গরাসে"।আজও সেই ভাষায় কাজের পরে লাগে একটু "জিরেন"। আজও হাতড়ে এই যে ভাষায় খুঁজি আমার "দোসর"। আজও মিস্ত্রীর পারিশ্রমিক দিই "ফুরোনে"।এই ভাষায় মা এখনও সামলায় "ভাঁড়ার"। এই ভাষাতেই বাবা লেখাপড়ায় ফাঁকি দিলে এখনও বলেন বলে "ব্যাদড়া"। অশীতিপর শাশুড়ি মা এখনও বলেন দিনভর "ব্যারাম" এর কথা।
আবার ঘুম এলে এই ভাষায় চোখের "পাতা ভারি" হয়ে আসে আবার সারারাত জেগে থেকে দুচোখের "পাতা এক" করা যায় না যে ভাষায়। এই ভাষাতেই বহুদিন আড়ির পর দুই বন্ধু আবার "আমে-দুধে" মিশে যায়। বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দিয়ে যে ভাষায় মেয়ের মায়ের "পায়াভারি" হয়। সেই মিষ্টি ভাষাতেই আবার বন্ধু বন্ধুকে তেড়ে যান "ষাঁড়ের নাদ" বলে। বিষহীন সাপ এই ভাষায় "ঢ্যামনা"। বেকার পুত্রকে বাবা রেগে গিয়ে বলে ওঠেন "ঢেঁড়স"। শাশুড়িকে ব‌উ ঝগড়ার সময় বলেন তাঁর "শাঁখের করাতের" মত অবস্থার কথা অথবা বলে ওঠেন মা কি "মুখে মধু" দেয় নি গা? শাশুড়ি আরও বলেন বৌয়ের মুখে "কুলুপ আঁটার" কথা। সেই শুনে শ্বশুর বলেন নিজের "উভয়সংকটের" কথা। ট্রেন যাত্রায় "ভোগান্তির" কথা বলে সেই ভাষা, অথচ সেই ট্রেনে চড়ার জন্য "হত্যে" দিয়ে থাকে কত মানুষ। মা সংসারে দেন "গতর" আর "আলটপকা" কিছু বলে ফেলেই বিপদ বাড়ান তিনি। মা বলেন সারাদিন পিঠটা "দোমড়" করতে পারিনি। এই ভাষাতেই কেউ তাঁর কাজের "কদর" করে না বলে অভিযোগ জানান তিনি। "আগুপিছু" কিছু না ভেবেই এ ভাষায় মন্তব্য করি আমরা।
সেই ভাষা হল আমাদের মিষ্টি মাতৃভাষা। আমাদের বাংলাভাষা।
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়   

২৮ জানু, ২০২০

কলাবতী কথা সানন্দা পুজো ২০১৫


সানন্দা পুজোসংখ্যা-২০১৫ এ প্রকাশিত উপন্যাস  
মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যঃ
এবছরের সেরা পুজো উপন্যাস ছিল কলাবতী কথা। 

প্রত্যুষা চক্রবর্তীঃ  
অপেক্ষা করছি অনেক অনেক দিন ধরেই ...
হাতে আসামাত্র পড়ে ফেললাম একটু ও দেরি না করে,
ঘড়ির কাঁটা কি করে তিরিশ মিনিট ঘুরে গেল, টের পেলাম না!
পটশিল্পের কি অসাধারণ কথামালা বোনা হয়েছে বাংলার রীতি আচার অনুষ্ঠান আর ব্রতকথার সুতো দিয়ে ।মেদিনীপুর এর প্রত্যন্ত গ্রাম তাদের কথা নিয়ে উঠে এসেছে অবলীলায়। নয়াগ্রাম , খড়্গেশ্বর , পিংলা, পাথরা , কুকাই , নানকারচক , কুরুম্ভেরা গনগনি কত নাম না জানা গাঁয়ের গন্ধ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে বৈশাখী অশোক ষষ্ঠীর ব্রতকথা থেকে মঙ্গলচণ্ডী, ভৈমীএকাদশী,বিপত্তারিণী , লোটন ষষ্ঠীর কথার সাথে ।আর চরিত্রেরা ! মাটির গন্ধ পাচ্ছি যেন ।
সবশেষে লেখিকার উদ্দেশ্যে বলি, আপনি লুপ্তপ্রায় একটি শিল্পকে পুনঃজীবিত করার প্রয়াস করেছেন ।
অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 
কাছের মানুষদের নাম যখন বহুল প্রচারিত পত্রিকার পুজোসংখ্যায় দেখি, গর্বে ও খুশিতে ভরে ওঠে।
প্রিয় মানুষ, বন্ধু ও দিদি ইন্দিরাদির প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে সানন্দা পুজো সংখ্যায়। ‘কলাবতী কথা’। পড়া শেষ করলাম কাল।
মেদিনীপুর নিয়ে রীতিমত রিসার্চ করা এ উপন্যাস। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম গঞ্জের অলিগলি, গ্রামীন সংস্কৃতি ও তার রীতিনীতি, ব্রতকথার নানা হারিয়ে যাওয়া গল্প, গ্রামীন মেলা ও উতসব, নানা পার্বন ও গ্রামীন মানুষের জীবনের এত ডিটেইলস এ উপন্যাসে পেলাম যে অবাক হতে হয় লেখকের পরিশ্রম ও গবেষনায়। উপন্যাসের পটভূমিকা হল গ্রাম বাঙলার পট শিল্প। এই পটশিল্পীদের জীবন, তাদের মনস্তত্ব, দারিদ্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা, তাদের স্বপ্ন, অপ্রত্যাশিত সুযোগ, সাফল্য সবকিছুই এসেছে এ উপন্যাসের সাজানো ইটের সারিতে। লতু, কনক,  কলাবতী, মিকি, আকিও এবং আরো নানা চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে লেখক বলেছেন অনেক অনেক গ্রামীন সংস্কারের গল্প, তাদের বিচিত্র জীবন চর্চা, প্রতিবাদ, বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নিবিড় গ্রাম বাংলার সাহচর্য্য, ক্ষয়ে যেতে থাকা এক শিল্পী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ও তাদের লড়াই হয়ে উঠেছে এ উপন্যাসটির উপজীব্য।
অর্ণব রায়চৌধুরীঃ 
কলাবতী কথা পড়লাম। বাংলার পটশিল্পীদের জীবন নিয়ে এরকম লেখা আগে পড়িনি। গ্রামবাংলার এত মেলার কথাও জানা ছিল না। কুরুম্ভেরা মেলা বা ময়নাগড়ের রাসমেলার বর্ণনা পড়ে ইচ্ছা করে ঘুরে আসতে। তবে যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হল সহজ সরল ভাষায় কথকতার গল্প। পুরাণ নিয়ে তোমার গল্প সম্ভার আমাকে মোহিত করেছে। যদিও 'অহল্যা' নিয়ে তোমার বিশ্লেষণ পড়ে জেনেছিলাম পুরাণ নিয়ে তোমার অগাধ আগ্রহ ও knowledge। উপন্যাসের শেষে নোট থেকে জানলাম মেদিনীপুরের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার সময় তুমি এই পটশিল্পীদের সান্নিধ্যে এসেছিলে। অনেক ধন্যবাদ তাদের কথা এরকম সুন্দর উপন্যাসের রূপ দেওয়ার জন্য। দু একটা জায়গায় একটু প্রশ্ন এসেছে মনে। এক জায়গায় পড়ে মনে হয়েছে আকিও বাংলা ভাষা জানে না। আবার সে রাতেই সে দিব্যি পরিষ্কার বাংলায় কলাবতীর সাথে কথা বলে। মনে হল এখানে কথোপকথন টা না থাকলেও চলত। আর উপন্যাসের শেষ লগ্নে যখন কলাবতী জাপানে নিজের সংসার শুরু করেছে তখন জানা গেল না তার স্বামী রামু বা তার শ্বাশুড়ি কনকের মনের অবস্থা কেমন হল বা তারা এত সহজে কি করে মেনে নিল ব্যাপারটা। আর জানতে ইচ্ছা করছে এখন কি গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে এইসব পটশিল্পীদের জন্য কম্পিউটার পৌঁছেচে নাকি তোমার উপন্যাসে ভবিষ্যতের রূপরেখার ইংগিত আছে। সব শেষে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটা উপন্যাস আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। আশাটা এবার বেড়ে গেল।
সুনন্দা চক্রবর্তীঃ 
দিদি আজ আমি সারা দুপুর ধরে লেখাটি পড়েছি । প্রথমেই বলি তোমার ধৈর্য অপরিসীম । তোমার লেখা ১) খুব ক্লাসি, ২) ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ , ৩) বাংলার বার ব্রত যা অনেকেই জানেনা তা সুচারুরূপে ব্যক্ত করেছ, ৪) বাংলার একটা শিল্প তোমার লেখনীতে স্থান পেয়েছে বলে খুব ভালো লেগেছে। এবার আসি কলাবতীর কথায়, তিনটে একই সংসারে থাকা নারী যেখানে ঝগড়া ঝাঁটি আর গালাগালিতেই পার করে সেখানে সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর একে অপরের পরিপূরক , উদার হৃদয় চরিত্রগুলো অপূর্ব এঁকেছ । পুরো উপন্যাসটাই আসলে রূপকথা । যা বেঁচে থাকার রসদ দেবে । 
শর্বরী ব্যানার্জিঃ
কলাবতী কথা পড়লাম। গ্রামীন শিল্পীদের অনেক অনেক সম্মান ও মর্যাদা প্রাপ্য। আমরা শহরে বসে তাঁদের শিল্পীমন বা শিল্পের কথা জানতেই পারিনা তাই হয়ত প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে পারিনা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই শিল্পীদের তুলে ধরার জন্য।

শ্রাবণী দাশগুপ্তঃ
কলাবতীকথা - অনেক যত্নের বহু পরিশ্রমের ফসল উঠেছে লেখিকার কর্ষণে। প্রয়োজনীয় বৃষ্টি দিয়েছে সজীবতা, শ্যামল হয়ে উঠেছে উপন্যাস - বারব্রত, সংস্কার মিলেমিশে। একেক সময়ে মন ভার হয়ে উঠেছে, কত দ্রুত এসব হারিয়ে গিয়েছে শহুরে জীবন থেকে, নিষ্প্রাণ দেখনদারী এসে দখল করে নিয়েছে সজল আত্মীয়তা - আত্মার কাছাকাছি, মনের কাছাকাছি থাকা মানুষদের। হয়ত আছে গ্রামে-গঞ্জে এখনো - থাকুক, বেঁচে থকুক। বেঁচে থাকুক পটচিত্র আর স্বরচিত গান নিয়ে কলাবতীরা। শহরায়ন বিশ্বায়ন - অনেক কিছু শুকিয়ে দিয়েছে, কোথাও বাঁধ দরকার...। নইলে আমাদের নিজস্বতা হারিয়ে যাবে।
টানাপোড়েন আছে উপন্যাসে, কিন্তু তেমনটা নয়, খুব সাবলীল ভাবে ঘটে যায় ওঠা-পড়া। জটিলতা ধরা যায়না তেমন।

নন্দিতা ভট্টাচার্যঃ
এত ডিটেলিং ভাবা যায়না।  অনেকদিনের প্রয়াস মনে হচ্ছে। বাংলাকে এভাবে  একেবারে টেনে তুলে এনেছ, তুলে ধরেছ ভুলে যাওয়া সব কথা।

অমৃতা ঘোষঃ
অনেক কিছু জানতে পারলাম বাঙলার পটচিত্রও কিংবদন্তীর ব্যাপারে। অসাধারণ শুধুই কলাবতী নয়। কনক, লতু প্রত্যেকেই। আরো একটি ব্যাপার যেটি খুব ভালো লেগেছে সেটি হল একজন নারী হয়ে অন্য আরেকজনকে অণুপ্রাণিত করা। লতু, তার পুত্রবধূ কনককে আর কনক তার পুত্রবধূ কলাবতীকে।  আমাদের জীবন এমন হলে বরতে যেতাম।

রুচিরা চ্যাটার্জিঃ 
কলাবতী কথা পড়ে পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পারলাম আগে যা অজানা ছিল। ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস জেনে ভালো লেগেছে। সত্যি অনেক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে লড়াই করে ওঁরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বাংলার সব ব্রতকথার ছোতছোট গল্পগুলি বিশেষতঃ উমনোঝুমনোর কথা জেনে অনেকদিন বাদে খুব মজা পেলাম। আবারো নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।

শর্মিলা দাশগুপ্তঃ
খুব ভালো লাগল কলাবতী কথা পড়ে। পটশিল্পীদের সম্বন্ধে অজানা কথা, ওদের ছবি আঁকার ডিটেলস, আমাদের গ্রামবাংলার এতসব ব্রতকথা আর পুজোআর্চার গল্প জানতামনা। কনক আর কলাবতীর সম্পর্কটা এত সুন্দর ভাবে দেখিয়েছ খুব ভালো লাগছে। কনকের প্রতিবাদী চরিত্রটি দারুন। কিন্তু শেষের দিকটা পড়ে মনে হল কলাবতী কেন এত স্বার্থপর হয়ে গেল? যে শাশুড়িমা তার জন্য এতকিছু করল তাকে ছেড়ে, স্বামীকে ছেড়ে সে চলে গেল কি করে? হতেই পারে এটাই বাস্তব কিন্তু কনক এত পুজো করে কি পেল? খুব‌ই বাস্তবিক পটভূমি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পুরোটাই নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। 

২০ জানু, ২০২০

সীতায়ণের খোঁজে শ্রীলঙ্কার পথে পথে





আমাদের প্রতিবেশী দেশ সিংহল দ্বীপ বা শ্রীলংকাকে আবিষ্কার করতে গেলে মহাকাব্য রামায়ণের সাহায্য নিতেই হয়। তখন রামায়ণকে আর নিছক কাল্পনিক কাব্য নয়, ইতিহাস বলেই মেনে নিতে ইচ্ছে করে ।
রামায়ণের স্মৃতিচিহ্ন বিজড়িত দশটি এমন প্রধান স্থান নিয়ে এই আলোচনা করব আজ। এদেশের ট্যুর এজেন্টরা রামায়ণ ট্রেইল বা রামায়ণ ট্যুর আখ্যা দিলেও আমি বলব সীতায়ণের রুট এটি। কারণ সেই দেশে সীতা আর হনুমান সর্বত্র পূজ্যতে। তাই রামায়ণের মাহাত্ম্য না সীতায়ণের দাপট সে নিয়ে আমার আর সংশয়ের অবকাশ নেই।


শ্রীলংকার সিগিরিয়া আর মান্নার বাদে বাকী একই রুটে অবস্থিত আটটি এমন স্থান ছুঁয়ে আসার পরে মনে হল এই নিয়ে আলোকপাত করাই যায়। প্রথমে দেখে নি কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ দশটা সেই জায়গায় রামায়ণের আলো পড়েছিল। তাই এখনও সেগুলি দেশ বিদেশের মানুষের কাছে অন্যতম ট্যুরিস্ট গন্তব্য।


  • সিগিরিয়া (রাবণের ভাই কুবেরের প্রাসাদ)
  • মান্নার (রামেশ্বর সেতুর শেষ বিন্দু)
  • নুয়ারা এলিয়া (অশোকবন, সীথাআম্মার মন্দির, হনুমানের পায়ের ছাপ, সীতার স্নানের জায়গা)
  • সীথা এলিয়া (হনুমান মন্দির)
  • ধিভুরাম্পুলা (সীতার অগ্নি পরীক্ষার স্থান)
  • রামবোডা জলপ্রপাত (হনুমান শক্তি সঞ্চয় করেন)
  • রামবোডা (চ্যারিয়ট পাথ, সীথা অশ্রুকুন্ড)
  • গুরুলাপোথা ( সীথা দুর্গ )
  • গায়াত্রীপীঠ ( নিকুম্ভিলা)
  • উনাবান্টুনা (গল, গন্ধমাদন উপড়ে এনে ফেলেছিল হনুমান)

অশোকবন 

সীতা মন্দির 

এছাড়াও রয়েছে আরও কয়েকটি স্থান যেগুলি রামায়ণের জন্য এখনও বিখ্যাত তবে আমাদের এবার শ্রীলংকার সেদিকটায় যাওয়া হয়নি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাবণ গুহা । সংলগ্ন ঝর্ণার ধারে পাহাড়ের মাথায় এই গুহার মধ্যে সীতাকে নিয়ে লঙ্কায় আসার পর রাবণ লুকিয়ে রাখেন কিছুদিন। এই স্থানটি এল্লা নামক স্থানে।
আর রয়েছে শঙ্করী দেবী শক্তি পীঠ যেটি শ্রীলঙ্কার পূর্ব উপকূলে ত্রিনকোমালিতে অবস্থিত অন্যতম হিন্দু তীর্থস্থান । শঙ্করী মাদুর্গার সঙ্গে এখানে রয়েছেন তাঁর ভৈরব ত্রিকোণেশ্বর এর কোণেশ্বরম্‌ মন্দির।পর্তুগীজরা সপ্তদশ শতাব্দীতে যা ধ্বংস করে। পরম শৈব রাবণ মা দুর্গার তপস্যা করেছিলেন এখানে । দেবী শঙ্করী প্রসন্ন হয়ে বিশ্বকর্মা নির্মিত রাবণের প্রাসাদে এসে বাস করেছিলেন। রাবণ শঙ্করী দেবীর জন্য বিশাল মন্দির বানিয়ে দেন।
তামিল রামায়ণ মতে মুনেস্বরমে রাবণ বধের পর রাম সেখানে তপস্যা করেন ।
রামায়ণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান হল উসসাংগোডা । এটি দক্ষিণ শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত, রামায়ণ মতে যেখানে সীতার সঙ্গে দেখা করার পর হনুমান রাবণ এবং তাঁর রাক্ষস বাহিনীর শক্তি পরীক্ষা করার জন্য লঙ্কাপুরী আগুণ লাগিয়ে ছারখার করেন। তখন হনুমানের লেজটি রাক্ষসরা আগুন ধরিয়ে দেয়। উসসাংগোডায় নাকি রাজা রাবণের ব্যবহৃত আকাশপথে চালিত পুষ্পক রথের বিমানবন্দরটি ছিল বলে বিশ্বাস স্থানীয় মানুষজনের।
তবে আমরা এবার যে স্থানগুলি গিয়েছিলাম সেগুলি মানচিত্রে মোটামুটি আশেপাশেই রয়েছে আর এগুলির গুরুত্ব রামায়ণে সবচেয়ে বেশী।


সিংহলের উঁচু পাহাড়্চূড়ায় সিংহগিরি বা সিগিরিয়া তে ছিল রাবণের রাজপ্রাসাদ যেখানে পাহাড় কেটে রাবণের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের তৈরী করেছিলেন এক বিশাল দুর্গ। প্রায় হাজার দেড়েক খাঁড়াই সিঁড়ি ভেঙে সেই পাহাড়ে উঠতে হয়।

তামিলনাড়ুর পাম্বান বা রামেশ্বরম থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত সেই পাথরের সেতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায় এখনও। কথিত আছে, সীতা উদ্ধারের জন্য লঙ্কাপুরী যাত্রার জন্যই পাথরের এই সেতু তৈরি করেছিলেন রাম।সেই যুগে শ্রীলঙ্কা পৌঁছানোর অন্য কোন উপায় ছিলনা। সীতা উদ্ধারের পরে ফিরে এসে, রাবণকে বধ করে ব্রহ্মহত্যার পাপ খণ্ডনের জন্যই শিবের আরাধনা করেন রাম। তিনি যে শিবলিঙ্গের আরাধনা করেন তামিলনাডুর সেইস্থানই আজ আমাদের হিন্দু তীর্থ রামেশ্বরম নামে পরিচিত।
শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে হালকা ঠান্ডার অপূর্ব শৈল শহর ক্যান্ডি হয়ে যেতে হয় মনোরম এক নৈসর্গিক শহরে যার নাম "নুয়ারা এলিয়া"। সিংহলী ভাষায় নুয়ারা মানে নগর আর এলিয়া মানে জ্যোতি। এখানে সীতা আম্মার জন্য বিগলিত স্থানীয় জনগণ তথা আমাদের মত ভারতীয় পর্যটকেরাও। নুয়ারা এলিয়ার সবুজ পাহাড় ঘেরা ফুলপাখীর স্বর্গরাজ্য অশোক বটিকা বা অশোক বন আজো জ্বলজ্বল করছে নিজের সবুজ জ্যোতিতে। রাবণের বিলাস বহুল প্রাসাদে সীতার থাকতে আপত্তি থাকায় এই সুন্দর অশোক বনে রাবণ তাঁকে রেখেছিলেন, এমনি বিশ্বাস রামায়ণে। এই অশোকবন শ্রীলঙ্কার হাকগালা ন্যাশানাল পার্ক এখন। অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত এই বটানিকাল গার্ডেনটি বেশ দামী টিকিট কেটে আমাদের মত বিদেশী পর্যটকদের দেখতে যেতে হয়। সেখানে পৃথিবীর সব গাছ রয়েছে। সেখানেই দূরের এক উঁচু পাহাড়ের খোঁচাটির নাম হাকগালা রক। দেখে মনে পড়ল আবারো রামায়ণের কাহিনী। সেই পাহাড়ের উল্টোদিকেই এখন হয়েছে সীতা মাঈয়ার অপূর্ব এক মন্দির। বন্দিনী সীতাকে এখানেই কাঁদতে দেখে পাহাড়ের মাথা থেকে হনুমান এক লাফে সেখানে হাজির হয়ে সীতার হাতে দেন রামের আংটি, সীতা যা রাবণের পুষ্পক রথে আসার সময় ছুঁড়ে ফেলেছিলেন আকাশপথে। চোখে পড়ল মন্দির সংলগ্ন খরস্রোতা পাহাড়ী নদী, নুড়িপাথরের বুকে এখনো যা বয়ে চলেছে অবিরত। সীতাকে রাবণ অশোক বনের এই অঞ্চলেই বন্দী করে রেখেছিলেন। তবে সসম্মানে। সীতা প্রতিদিন এই নদীতেই স্নান করতেন । এই নদীর তীরেই রয়েছে মস্ত এক শিলাখন্ডের ওপর হনুমানের পায়ের ছাপ। শক্তিমান হনুমানের লাফানোর ফলে যা বহু যুগ আগে পাথরের মধ্যে গর্ত সৃষ্টি করে রেখেছে । এমনি বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের।
এই অঞ্চলে আসার পথে তাই বুঝি পড়েছিল ভক্ত হনুমান মন্দির। এখানে সীতা আর হনুমান সর্বত্র পূজ্যতে। এই স্থানকে স্থানীয় মানুষ "সীথা এলিয়া"ও বলে যার অর্থ সীতার জ্যোতি। রাবণের সঙ্গে অশোকবনে আসার পথে বিশ্রাম নিয়েছিলেন সীতা এখানে।
সীতা স্নান কুণ্ড 

সীথা এলিয়া থেকে কিছুদূরেই এক বনভূমি যেখানে সীতার অগ্নি পরীক্ষা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সিংহলীভাষায় এই অঞ্চলের নাম Divurumpola বা ইংরেজীতে Place of oath। দলীয় বা পারিবারিক বিবাদ, বিরোধ নিষ্পত্তি করার সময় শ্রীলংকার আইনি ব্যবস্থা এই মন্দিরে নেওয়া শপথকে এখনও আইনি মান্যতা দেয়।
নুয়ারা এলিয়া থেকে বেন্টোটা যাবার পথে পড়ে শ্রীলঙ্কার অনেকগুলি জলপ্রপাতের মধ্যে একটি, যার নাম রামবোডা ওয়াটারফলস। রামবোডা গ্রামের অন্তর্গত ১০৯ মিটার উঁচু এই জলপ্রপাতটির কাছেই হনুমান নাকি সীতা উদ্ধারের জন্য বিপুল শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন।
ক্যান্ডি থেকে নুয়ারা এলিয়া যাবার পথে রামবোডা পর্বত দেখা যায়। সেখানে এঁকে বেঁকে যে মনোরম বীথিপথ চলে গেছে সেই পথ দিয়েই রাবণ সীতা কে অশোক বনে নিয়ে যান, এমনি বিশ্বাস করা হয়। নিজের রাজধানী কেমন সুন্দর সীতাকে তা ব্যাখ্যা করতে করতে চলেছিলেন রাবণ। এই বনানীকে বলা হয় চ্যারিয়ট পাথ। সীতার চোখের জল পড়তে পড়তে গেছিল এখানে। তাই কেউ কেউ সীতা টিয়ার পণ্ড বা অশ্রুকুন্ডও বলেন।
শ্রীলঙ্কার গুরুলাপোথা কে বলা হয় লঙ্কাপুর। ক্যান্ডি থেকে গুরুলাপোথা পৌঁছতে সময় লাগে ঘণ্টা দুয়েকের কম। কিংবদন্তী বলে সবুজ পাহাড়, ঝর্ণা আর ছোট ছোট নদী ঘেরা অপূর্ব সুন্দর এই স্থানে রাবণের রাণী মন্দোদরীর প্রসাদ ছিল। আকাশ পথে সীতা কে নিয়ে যাবার সময় রাবণ এই প্রাসাদে তাকে কিছুদিন রাখেন। তারপর আবার বিশ্রাম নিয়ে অশোক বনের দিকে যাত্রা করেন। এই কারণে এই জায়গার নাম সীথা কটুয়া বা সীতা দুর্গ।
নিকুম্ভিলা ( গায়ত্রী পীঠ) 

সীতা মন্দির 

নুয়ারা এলিয়ার আরেকটি অন্যতম পীঠস্থান হল গায়ত্রী পীঠ বা গায়ত্রীদেবীর জাগ্রত এক মন্দির। সেখানে গায়ত্রীদেবীর মন্দিরে পুজো হয় নিয়মিত। এই অঞ্চল ছিল লঙ্কার অন্যতম এক উপবনাঞ্চল, রামায়ণে উল্লিখিত নিকুম্ভিলা। এই স্থানের ঐতিহাসিক আরেক মাহাত্ম্য আবিষ্কার করলাম মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করে। রাবণের পুত্র মেঘনাদ রাম-লক্ষমণের সঙ্গে যুদ্ধের পূর্বে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করেছিলেন এই স্থানে। মেঘনাদের বরটি এমনি ছিল যে যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলেই তিনি অজেয় হবেন। তাই পরপর দুবার তিনি যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে ধরাশায়ী করেন লক্ষ্মণ কে । লক্ষ্মণ পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন জানতে পেরে আবার মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ সম্পাদনা করতে যান। এদিকে বিভীষণ তার গুপ্তচর মারফৎ সেই সংবাদ পেয়ে রামকে সতর্ক করেন। কারণ যজ্ঞ সম্পূর্ণ হলে মেঘনাদ অজেয় হয়ে যাবেন। বিভীষণ লক্ষ্মণকে যজ্ঞাগারে নিয়ে যান। যজ্ঞাগারে মেঘনাদ অস্ত্র স্পর্শ করতেন না। তিনি প্রথমে যজ্ঞের বাসন ছুঁড়ে লক্ষ্মণকে অচেতন করে দেন। কিন্তু অস্ত্রাগারে যাওয়ার সময় পান না। তার পূর্বেই লক্ষ্মণের জ্ঞান ফেরে এবং তিনি নিরস্ত্র মেঘনাদকে হত্যা করেন।

বস্তুত এটি লঙ্কার উল্লেখযোগ্য শক্তিপীঠ। পীঠনির্ণয়তন্ত্রে আছে

“লঙ্কায়াং নূপুরশ্চৈব ভৈরবো রাক্ষসেশ্বরঃ
ইন্দ্রাক্ষী দেবতা তত্র ইন্দ্রোণোপাসিতা পুরা ।।

বিষ্ণুচক্রে খণ্ডিত হয়ে সতী দেবীর পায়ের নূপুর এখানে পতিত হয়। দেবীর নাম ইন্দ্রাক্ষী। তাঁর ভৈরবের নাম রাক্ষসেশ্বর। পণ্ডিতেরা এই নিকুম্ভিলা দেবীকে সেই শক্তিপীঠের দেবী মানেন। কিন্তু শাস্ত্রে লঙ্কার শক্তিপীঠের দেবীকে ইন্দ্রাক্ষী বলা হয়। বৃত্রাসুরের হাতে রাজ্য হারিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র দেবতাদের সঙ্গে এখানে এসে দেবী ভগবতী বা গায়ত্রীদেবীর তপস্যা করেছিলেন । গায়ত্রী হলেন দৈব নারীশক্তির পুঞ্জীভূত নারীশক্তির প্রকাশ। লঙ্কায় এই দেবীর মন্দির এখনও আছে। তবে এটি শক্তিপীঠ রূপে পরে স্বীকৃতি পায় নি । ভয়ংকরী, আসুরিক দেবী নিকুম্ভিলা সাধারণের পূজিতা হয়ে উঠতে না পাড়ায় ধীরে ধীরে গায়ত্রী পীঠে পরিণত হয়েছে এই স্থান।

কৃত্তিবাসী রামায়ণেও আছে নিকুম্ভিলার কথা।

বিভীষণ বলে শুন রাজীব- লোচন ।
সামান্যেতে ইন্দ্রজিৎ না হবে পতন ।।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করে দুষ্ট নিশাচর ।
করিয়াছে যজ্ঞকুণ্ড লঙ্কার ভিতর ।।

আদ্যাস্তোত্রে পাই

পাতালে বৈষ্ণবীরূপা সিংহলে দেবমোহিণী
সুরসা চ মনিদ্বীপে লঙ্কায়াং ভদ্রকালিকা ।

সেসময় সিংহল আর লংকা কে পৃথক স্থান বলা হত। পরে এই দুই অঞ্চল কে এক মনে করা হয়।

তবে শক্তির উপাসক পরম শৈব রাবণের আরাধ্যা দেবী যে ছিলেন এই ভদ্রকালী সেকথা বলাই বাহুল্য ।

আমরা ভারত মহাসাগরের তটরেখা ধরে চলেছিলাম শ্রীলংকার অন্যতম সৈকত শহর বেন্টোটা থেকে মিরাস্যা । যাবার পথে পড়ে গল্‌ নামে এক বিস্তীর্ণ শহর। রামায়ণের জন্য বিখ্যাত এই গল্‌ শহরের অন্তর্গত রুমাস্যালা পর্বত। হনুমান হিমালয় থেকে শক্তিশেলে বিদ্ধ অচৈতন্য লক্ষ্মণের জন্য ভেষজ জরিবুটি বিশাল্যকরণী খুঁজতে গিয়ে পুরো গন্ধমাদন পাহাড় টিকেই নাকি তুলে এনেছিলেন এই গল্‌ অঞ্চলের উনাওয়াটুনাতে Unawatuna। যেখানে পাহাড়ের পাদদেশ অবিরত স্পর্শ করে ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ। নীল আর সবুজে মাখামাখি এই সমুদ্রতট।

হাকগালা রক 
হনুমানের পায়ের ছাপ 

রামায়ণের স্পর্শে ধন্য শ্রীলংকার ইতিহাস ভূগোল যেন আরও কাছের বলে মনে হয় আমাদের। বাকীটা মানুষের বিশ্বাস। তবে যাহা রটে তাহা কিছু তো বটে, এই বিশ্বাসে এগিয়ে চলি আবারো কলম্বো এয়ারপোর্টের দিকে। মহানাগরিক ভীড়ে মিশে যাই। কানে তখনও বাজতে থাকে সীথা মাইয়ার ভজন। রামায়ণ তবে মিথ না মিথ্যে? এ নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই আর। আপাতত মাথায় ঘুরতে থাকল সীতায়ণের ইতিহাস। অথবা রাবণায়নের প্রেক্ষাপট।  
রামবোডা ওয়াটার ফলস 
প্রবন্ধ টি প্রকাশিত যুগশঙ্খ সংবাদপত্রের রবিবারের বৈঠকে ১৬ র পাতায় 

২০ নভে, ২০১৯

মোচা নামচা

ভোর ভোর হাঁটতে গিয়ে ১০টাকার এক বান্ডিল ধবধবে দুধসাদা বকফুল কিম্বা সদ্য কমল মুকুলদল উন্মোচিত কুমড়োফুল কিনে ফেলতে পারলে গিন্নীমায়ের সেদিন দুপুরের মেন্যু করতে মোটেও অসুবিধে হয়না। বাড়ি এসেই কাজের মাসীকে সমানুপাতে বেসন, চালের গুঁড়ো মিশিয়ে নিতে বলে।
- মনে করে এক টুসকি লংকাগুঁড়ো, আধ চামচ হলুদ, নুন, দু'চামচ পোস্ত আর একটু কালোজিরে ছড়িয়ে  বেশ করে ফর্ক দিয়ে ঘেঁটে ফ্রিজে রেখে দিও কিন্তু। যা রাঁধো বাপু আজকাল! পোলাও, কালিয়া, মুর্গি, মাটন বাদ দিয়ে পিঁয়াজ, ধনেপাতা দিয়ে পাতলা মুসূরডাল চাপাও তো দেখি।
এদিকে গিন্নীমা টিভিতে গান শুনতে শুনতে একে একে মোচার খোলস ছাড়াতে ছাড়াতে একবার বাটার টোস্টে কামড় আর একবার লাল চায়ে চুমুক দেন। মোচার খোলস ছাড়াতে গেলেই মনে পড়ে নিজের জীবনের কথা। একটা করে মেরুন খোলা যেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা মনে করায়। ছোটবেলায় মানুষ চিনতে পারেনা কেউ। বড় হতে হতে মেরুন খোলায় হালকা হলুদ রঙের ছোঁয়া ধরতে শুরু করে। বুদ্ধি আর বয়স সমানুপাতে চলে।
- কি গো বৌদি? সব খোলা ফেলে দিলে আর পড়ে র‌ইল কি?
-আহ! দিচ্ছি বাপু। একটু রোসো দিকিনি। গান শুনতে দাও।আমি জানি হলুদ অংশ ফেলতে নেই।
ভেতর থেকে শুধুই পুষ্টিতে ঠাসা হলদে মোচাটুকুনি বেরিয়ে আসে। জীবনের সারাত্সার যেন। অভিজ্ঞতার পারদ চড়তে চড়তে নধরকান্তি মোচার এডিবল পার্টটুকুনি মনে করিয়ে দেয় জীবনের কথা। পরমহংসের কথা। সারটুকুনি নিয়ে অসারটুকুনি ফেলে দেয় সেই প্রজাতির হাঁসেরা। কত বুদ্ধি তাদের।
-দাও বৌদি, আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে কিন্তু
- আমি তো তবু ছাড়িয়ে দিচ্ছি, কোন্‌ বাড়ির বৌদিরা ছাড়িয়ে দেয় বলতো?
- তা ঠিক বৌদি। তবে এবার ছোট ছোট কলাগুলো দাও এদিকে। ওগুলোতেই সময় লাগে বেশি।
- দিচ্ছি বাবা। আমি অনেকটা কাজ সেরে রেখেছি তোমার। ন্যানো কলাদের প্ল্যাসটিকের জ্যাকেট ফেলে দিয়েছি। তুমি কেবল ওদের ভেতর থেকে কাঠির মত গর্ভদন্ডটা ফেলে দাও। হাতের তেলোয় রাখো। যেমন আমায় রেখেছে এবাড়ির লোকজন আর আমি রেখেছি  তোমাকে। একসঙ্গে চাপ দিয়ে টেনে বের করে ফেল। তাড়াতাড়ি হবে। কতবার বলব? একটা একটা করে বের করলে সময় বেশি লাগে।
মোচার পরত খুলতে খুলতে জীবনের গল্পেরা ভীড় করে গিন্নীমায়ের ঘাড়ে।
ছোট্ট ছোট্ট ন্যানো কলাগুলো যেন জীবনের প্রতি মুহূর্তের ছোট ছোট কর্মফল, তাইনা? ওদের আর গর্ভাধান হলনা  এজন্মে। খসেও গেলনা বাকী জীবনটা। ঝরেও পড়েও মরতে পারত গাছের নীচে, মায়ের কোলে। মোচার পরতে পরতে কেউ যেন চেপে গলা টিপে ওদের বিকাশ টা রুখে দিল জন্মের মত। অ্যাবরশান করে দিল ন্যাচারালি। অত ফুল কি হাবে ফুটে? অত কি হবে জন্মের? ঘেটি ধরে আবারো জাঁতা কলে  পিষতে হবে তাকেও। জীবন যুদ্ধ সবার জন্য নয়।
- আজ নিশ্চয়ই গল্প ফাঁদছ তুমি!
- ঠিক ধরেছ, এই না হলে তুমি!

১৭ নভে, ২০১৯

নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে কিছু মূহুর্ত












নবনীতাদির সঙ্গে এবছর পয়লাবৈশাখের আগে কৌশিক গুড়িয়া সম্পাদিত, বহরমপুর থেকে প্রকাশিত রবিবার পত্রিকার বিশেষসংখ্যার জন্য জানতে চেয়েছিলাম তাঁর ছোটবেলার নতুন বছরের স্মৃতি নিয়ে। বলেছিলেন, হোয়াটস্যাপে লিখে জানাবেন সময়মত। দিয়েওছিলেন দু একদিনেই। সেটাই আমার প্রাপ্তি। 

সাহিত্যিক নবনীতা দেব সেনের ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখ কাটত শান্তিনিকেতনের বর্ষবরণের উত্সবে।
 "তখন বিদ্যালয়ের ছুটি হয়ে যেত বলে রবীন্দ্র জন্মোত্‌সব পয়লা বৈশাখেই উদ্‌যাপিত হতে দেখেছি। মা, বাবা ওখানেই যেতেন পয়লা বৈশাখে। আমার নতুন জামা, জুতো হত। আমার ভালো লাগত মাটির বড় জালা ভরা ঠাণ্ডা শরবত দেখে।সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল নন্দলাল বসুর স্ত্রীর শালপাতায় ফুল সেলাই করে অপূর্ব গয়না বানানো। নতুন বছর উপলক্ষে আনন্দনাড়ুও হত। উপাসনা ঘরে প্রার্থণা হত। নতুন বছরের অনেক গান থাকত। এইসব ভালোলাগা গুলো জড়িয়ে থেকে গেল আজো আমার সঙ্গে। আমার হৃদয়ে মাখামাখি হয়ে। কত গান, কত স্বাধীনতা, ছোটদের সঙ্গে ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ। মা কোনোদিনো আটকাতেন না আমাকে। সব মিলিয়ে খুব রঙ্গিন এখনো সেইসব স্মৃতি"

১ নভে, ২০১৯

ছট পুজো ভার্সেস যমপুকুর ব্রত


আজ আমার ঘর থেকে দেখতে পাচ্ছি পন্ডিতিয়া পুকুর টি। আসন্ন ছট পুজোর সুবিধার্থে বানিয়ে দিলেন আমাদের সবার প্রিয় দেবা দা। যিনি সারাবছর ধরে প্রচুর সমাজ কল্যাণ মূলক কাজ করেন। আমি তার সাক্ষী আছি। আজ এই দীঘি ভরা জল করে টলমল দেখে অনেক কিছু মিল খুঁজে পেলাম আমাদের বাঙালীর ব্রতর সঙ্গে তাই এই লেখা।

কার্তিকমাসের শুক্লা ষষ্ঠীতে ছটপুজো সূর্যের পুজো হলেও মূলতঃ এটি গঙ্গাদেবী বা মা অন্নপূর্ণার পুজো। আন্নপূর্ণা দুর্গার আরাধনা শুক্লাষষ্ঠীতেই হয় তাই বুঝি ষষ্ঠ>ষট> ছট কথাটি প্রচলিত। কারো মতে ছট্‌ অর্থাৎ ছটা বা সূর্যরশ্মির পুজো । কারো মতে সূর্যের দুই স্ত্রী ঊষা এবং প্রত্যুষা কে স্মরণ করা হয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আবারো সেই নারীশক্তির আরাধনা। এবং মা ষষ্ঠীর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া।এবার বাংলার বারোমেসে ষষ্ঠী নিয়ে একটি বড় কাজ করতে গিয়ে দেখলাম ছট মাঈ অর্থাত এটিও আমাদের ষষ্ঠীদেবীর মত, বিহারের ব্রত। কি অদ্ভূত মিল! শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতেই তিনি আরাধ্যা আমাদের সব ষষ্ঠীর মতোই। আবার সূর্যের দুই স্ত্রী'র উদ্দেশ্যে প্রণতি জানানো দেখে মনে পড়ে যায় আমাদের আসন্ন কৃষি উত্সব নবান্ন বা হেমন্ত লক্ষ্মীর কথা। বিদেশেও হবে থ্যাংকসগিভিং অর্থাত কৃষিদেবতা সারাবছর ধরে ভরে দেন মনুষ্য জীবনযাপনের খোরাকি। বিনিময়ে আমরা কি‌ই বা দিতে পারি তাঁকে? তাই "অনেক দিয়েছ নাথ" এই বলে স্মরণ করে কৃষকরা, বরণডালা সাজিয়ে নিবেদন করে। আমাদের ইতুপুজো‌ও কিছুটা তেমনি। তবে গত যে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া থেকে আগামীকাল ষষ্ঠীর দিনে বহু প্রাচীন যমপুকুর ব্রতের অদ্ভূত এক সংযোগ পাওয়া যায়। যমের বোন যমী ভাইয়ের মঙ্গলকামনায় ভাইফোঁটা দিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই যমের জন্য পুকুর কাটিয়ে এই কার্তিকেই হয় যম পুকুর ব্রত।

ভ্রাতৃদ্বিতীয়া হল যমরাজের পুজো । অবিভক্ত বাংলার গ্রামে গ্রামে পালিত হত যম পুজো। মেয়েরা পড়ত যমপুকুর ব্রতকথা। আজও আছে ব্রতকথার বইতে। গোটা কার্তিক মাস ধরেই আত্মা বা মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা পার্বন হয়। শুধু আমাদের ই নয় বিদেশেও অল সোলস ডে বা হ্যালোউইনের অনুরূপ। কার্তিক অমাবস্যায় শ্মশানে বিচরণকারী দেবী কালীর পুজো, আগের দিন ‘ভূত চতুর্দশী’ এবং কার্তিক মাসেই আমাদের মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মাদের পথ চেনানোর উদ্দেশ্যে বাড়ির ছাদে ‘আকাশপ্রদীপ' জ্বালার চল । ঘটিবাড়িতে কালীপুজোর প্রদোষে ‘অলক্ষ্মী’ বিদায় করে দীপান্বিতা লক্ষ্মীর পুজো হয়। সেই ভাবনাও আসলে ভুত-প্রেত-অশরীরী আত্মা জাতীয় ‘অলক্ষ্মী’ বা নেগেটিভ শক্তি ঘর থেকে বিদায়ের রীতি হয়ত।
এই কালীপুজোর পরদিন থেকেই গ্রাম বাংলায় শুরু হয় ‘যমপুকুর ব্রত’। বিহারেও ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার চার দিন পর পালিত হয় ছট পুজো।সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় অব্ধি সূর্যকে দেখে ছটমাঈয়ের ব্রত পালন শুরু করে ব্রতীরা।কারও মতে সূর্যের পুত্রই হলেন যম। গ্রাম বাংলার কুমারীরা এইসময় পালন করে যম পুকুর ব্রত ।কি অদ্ভুত এই মিল!

গবেষিকা রীতা ঘোষের মতে বাড়ির উঠোনে এক হাত পরিমান চৌকো পুকুর কেটে বা চিত্র এঁকে তার চারদিকে চারটি ঘাট বানিয়ে, দক্ষিণ দিকে যমকে বসিয়ে ব্রত পালিত হয়। যমের সঙ্গে থাকেন যমরানি এবং যমের মাসী। অন্য ঘাটগুলিতে (উত্তরে) থাকেন জেলে-জেলেনী, (পুর্বে) ধোপা-ধোপানী, শাকওয়ালা-ওয়ালী, পশ্চিমে কাক, বক, হাঙ্গর ও কচ্ছপ। নানা জীবজন্তু রেখে ‘বৈতরণী’ পার করার মত কঠিন কাজের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পুকুরে রাখা হয় বা আঁকা হয় কলমি, হিংচে, কচু, ও হলুদ গাছের চারা। তারপর পুকুরে জল ঢেলে ব্রত শেষ করার আগে মন্ত্র বা ছড়া পড়া হয় --
“শুষনি-কলমি ল-ল করে
রাজার ব্যাটা পক্ষী মারে
মারণ পক্ষী শুকায় বিল,
সোনার কৌটা রূপার খিল
খিল খুলতে লাগলো ছড়
আমার বাপ-ভাই হোক লক্ষেশ্বর।“
বাপ-ভাই কে লক্ষেশ্বর করার কামনা করার পর শেষে বলেন – “লক্ষ লক্ষ দিলে বর/ ধনে পুত্রে বাড়ুক ঘর।“ অর্থাৎ, কেবল ধনী করাই নয়, যমের কাছে সন্তান-সন্ততিও কামনা করেন তারা। আর এখানেই যম কেবল মৃত্যুর দেবতা না থেকে হয়ে যান জীবনের দেবতা – যিনি না চাইলে কারও মৃত্যু হবে না। 

আজকের খবরের কাগজে আমাদের Panditia Pond সহ শহরে আরো বেশ কিছু পুকুর কাটানো দেখে মনে পড়ে গেল কতকিছু। বাংলার ব্রতে পরিবেশের কারণে উদ্যোগী হতেন তখনকার মানুষ। পুকুর বোঁজানো তো দূর অস্ত বৃষ্টির আশায় বৈশাখে পুণ্যিপুকুর ব্রত, ভাদ্রে চাপড়া ষষ্ঠীতেও সেই পুকুর খাটানোর গল্প আবার কার্তিকেও যমপুকুর ব্রত। প্রচুর জল ঢেলে ছটপুজোর জন্য পুকুর খোঁড়া হয়েছে। এগুলি অস্থায়ী। সেটাই দুঃখের। এত খরচাপাতি করে যখন করাই হল তখন পুকুরগুলি থাক না। আরো গভীর করে খুঁড়ে দেওয়া হোক। গঙ্গার ধারে পুকুরে জলের অভাব হবেনা।

১৩ অক্টো, ২০১৯

কে তবে আসল লক্ষ্মী?


আমি বাংলার আদি অনন্ত সংস্কৃতি অর্থাত বারব্রত, পুজোআচ্চ্চা, স্ত্রী আচার কে মান্যতা দিয়ে থাকি বলে সবাই ভাবে আমি বুঝি খুব পুজোআচ্চা করি। বিশ্বাস করুন আমি হিপোক্রিসির ঊর্দ্ধে। আমার যেগুলি মনে হয় ন্যায়সঙ্গত সেটুকুনি‌ই পালন করি। আমার কাছে সনাতন ধর্মের সংজ্ঞাটা অন্যরকম। বারেবারে আমার লেখায় পুরাণ, পুজো, বারব্রত উঠে আসে তাই। এগুলি জানতে ভালো লাগে। মানুষকে জানাতে ভালো লাগে। তাই বলে আমি দীক্ষা, গুরু মানা কিম্বা নাক টিপে জপতপের ঘোর বিরোধী।
সক্কাল সক্কাল বন্ধুরা ফোন করে বলছে, " কি গো? আজ তোমার বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় যেতে বললে না?" আমি তো অবাক! আমাদের ঘটিবাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হয়না। আমার বাবার বাড়িতে খুলনা কানেকশন থাকায় চিঁড়েমুড়কি, তালের ফোপল দিয়ে মা ছবিতে মালা দেন। ব্যাস ঐ টুকুনিই। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে আমার আধুনিকা শাশুড়িমাতার লক্ষ্মীপুজো নৈব নৈব চ। বরং সরস্বতী পুজোর নেমকম্মোটুকুনি আমি‌ই চালু করেছি। কারণ সরস্বতীর হাত ধরেই আমাদের গৃহে লক্ষ্মীর আগমন।প্রতি বেস্পতিবারে আমপল্লব দিয়ে, ক্যাঁঠালি কলা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে ঘট পাতার রেওয়াজ আমাদের বাড়িতে নেই। তবে কেউ ভালোবেসে খিচুড়ি ভোগ খাওয়ালে নাচতে নাচতে যাই। অঞ্জলি দেবার স্কোপ থাকলে ভরপেটেই পূর্ণচাঁদের মায়ায় নিজেকে উজাড় করে দিতে খারাপ লাগেনা বৈকি।
তবে আজ মাংসের ঝোল ভাত খেয়ে গুমনামীর প্ল্যান। রাতে লাইভ হব। নব্য পাঁচালি পড়ব। কানে ঢোকাতে হবেনা? এত কষ্ট করে গুরুচন্ডালী আমাদের নব্য লক্ষ্মীর পাঁচা৯ প্রকাশ করেছেন । সেখানে আমরা কবি সাহিত্যিকরা সবাই বেশ প্রতিবাদী হয়ে নবীকরণ করেছি মান্ধাতা আমলের সেই মানসিকতার। পদে পদে যেখানে মেয়েরাই আবহমান কাল ধরে দুলে দুলে পড়ে সে পাঁচালি তার বদল হওয়া দরকার সেই তাগিদেই লেখা এই পাঁচালী। মেয়েরাই মেয়েদের বিপদ ডেকে আনে। মেয়েরা না বুঝে পুরুষতান্ত্রিক লেখকদের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বটতলার এই পাঁচালিটি পড়ে। স্বামীজি কে মনে পড়ে? বলেছিলেন, অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর নারীজাতির বিকাশ না হলে এসমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই এ আমাদের সমাজ সচেতনতার এক প্রয়াস।

আমাদের বাড়িতে কালীপুজোর দিনে লক্ষ্মীর সঙ্গে অলক্ষ্মীর পুজো হতে দেখেছি। অলক্ষ্মীর পুজো করে তবেই লক্ষ্মীর পুজোয় হাত দেবার রীতি। খুব ভালো কিন্তু এক আসনে নয় কেন? বাড়ির বাইরে, খোলা নর্দমার ধারে কলার পেটোতে পিটুলির তৈরী অলক্ষ্মী গড়ে এক খাবলা সিঁদুর দিয়ে মাথা আঁচড়ে চুলের নুড়ি আর গোবরের ওপর ভাঙা মোমবাতি জ্বেলে তাকে নামকোয়াস্তে দুটুকরো ফল, বাতাসা দিয়ে পুরুত যেন বিদেয় করতে পারলেই বাঁচে। লক্ষ্মীর পুজোয় শাঁখ ছাড়া কিছুই বাজেনা কিন্তু অলক্ষ্মী বিদেয় কালে চাটাই পেটানো হয় আর বলা হয় অলক্ষ্মী দূর হ', ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই থাক। এই বলে অলক্ষ্মীকে ত্যাগ দিয়ে লক্ষ্মীর প্রধান পুজোয় সামিল হতেন সবাই। সেখানে মহা ধুম। ষোড়শ উপচার। আমার খুব কষ্ট হত সেই অলক্ষ্মীর বিদেয় বেলায়। ভাবতাম সমাজে, ঘরে ঘরে এমন কত মেয়েরাই অনাদরে কাল কাটায়। অছ্যুত, নীচু, ঝিমাগী, পাগলী, ডাইনি, বাঁজা আর বিধবা এরা কি তবে সবাই একঘরে? অলক্ষ্মীর দলে? কেন এমন হবে? কেউ উত্তর দিতে পারত না বিশ্বাস করুন। আমার মতে সবাই তো আমরা কন্যাশ্রী। শ্রী শব্দের অর্থ লক্ষ্মী। তার সঙ্গে বাচ্ছা হল কি না হল বা স্বামী মারা গেল কি না গেল জাতপাঁত কি হল এসব কেন দেখব? সধবাই কেন সিঁদুর খেলবে? বিধবারা কেন সিঁদুর দেবেনা? টিপ পরবে না? মাছ খাবেনা, লাল পরবে না এসব দোলাচলে জর্জরিত হতে হতে এই অবধি এসেছি।

এবার আসি আজকের যুগে দাঁড়িয়ে অলক্ষ্মীর সত্যি ডেফিনিশনে।

আচ্ছা বলুন তো আজকের সমাজে যে মেয়েগুলো বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে পান থেকে চুন খসলে মিথ্যে ৪৯৮ এর মিস ইউজ করে? ফাঁসিয়ে দেয় শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেককে? ভেঙে ফেলে সংসার আর আইনের কারসাজিতে টাকা আদায় করে বিয়ের বন্ধনে রণে ভঙ্গ দেয় তারা কেমন লক্ষ্মী?
শাশুড়িমা বা নিজের মা'কে যারা "জ্যান্তে দেয় না দানাপানি, মরার পরে ছানাচিনি" টাইপ হয়ে বৃষোতসর্গ করে শ্রাদ্ধশান্তি করে? ত্সেসব লক্ষ্মীরা ঘরের কুল-অলক্ষ্মী। "রাণু মন্ডলের মেয়ের মত" যারা জীবনে নিজের মা বা শাশুড়ি কে একথালা ভাত বেড়ে দেয় না কিন্তু মা বা শাশুড়ির সোশ্যাল স্ট্যেটাস বাড়লে কিম্বা পোস্টাল কেভিপি কিম্বা এনএনসি ওথবা ব্যাঙ্ক এফডি ম্যাচিওর করলেই মায়ের কথা যাদের মনে পড়ে সেইসব অজ্ঞাতকুলশীল অলক্ষ্মীদের মাথায় পড়ুক বাজ!
আবার উল্টোটাও সত্যি। সমাজ সংসারে সেইসব শাশুড়ি বা ননদরা ? যারা নববিবাহিত বধূটির প্রতি অত্যাচার করে তাদের বাধ্য করে ঘর ছাড়তে? কিম্বা পণ না দিলে তাদের পুড়িয়ে মারে দেবযানী বণিকের মত? তাদের প্রকৃতপক্ষেই অলক্ষ্মীর আসনে বসাই আমি।
আনাচেকানাচে সত্যি রেপকেসের ফাঁকেফাঁকে যেসব মেয়েরা মিথ্যে ধর্ষণের অভিযোগ এনে গ্রামেগঞ্জে unnecessary হ্যারাস করে পুরুষকে? সেগুলোর কথা ভাবব না আজ? সেই মেয়েগুলো কি লক্ষ্মীমেয়ে?
আর সারাজীবন কপাল ঢেলে সিঁদুর পরে, লক্ষ্মীর ঘট পেতে দুলে দুলে পাঁচালী পড়া সেই মেয়েগুলো? যারা ঘরে শান্তশিষ্ট স্বামীনামক গৃহপালিতের চোখে ধুলো দিয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে স্বামীর প্রতি বেইমানি করে? ওপরে সাজানো সংসার আর নীচে পরকীয়ার কেত্তন গায়? নিজের স্বার্থসিদ্ধির আশায়? এরাও মা লক্ষ্মী? যে মেয়েগুলো "মি টু" বদনাম দিয়ে আপিসের বসের কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা দাবী করে চাকরী থেকে ইস্তফা দেয়? সেই মেয়েরাও লক্ষ্মী ? আর ওপরে শান্তশিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট সেই রমণী? যার পরণে লাল পাড় শাড়ি, কপালে সিঁদুর, লক্ষ্মীপুজো করে সে গদগদভাসি। ঘরের লক্ষ্মী শ্বাশুড়িমা কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে অথবা সপরিবারে বেড়াতে চলে যায় শাশুড়িমা কে একটি ঘরে জল, বিস্কুট দিয়ে তালা বন্ধ করে রেখে? সে ও মা লক্ষ্মী তো? আর গ্রামেগঞ্জের মেয়েরা তো আজকাল শহরের এককাঠি ওপরে । ৪৯৮ বাদ দিন। বিয়ের একবছরের মধ্যে বাচ্ছা পেটে না এলে নীরিহ গোবেচারা বরটিকে " ধ্বজভঙ্গ" বলে ফাঁসিয়ে লক্ষটাকা দাবী করে বসে। শুধু বাপেরবাড়ির মা লক্ষ্মীটির প্ররোচনায়? এরাও মা লক্ষ্মী কি?
আর সর্বোপরি যে মেয়েগুলো শ্বশুরবাড়ির প্ররোচনায় বোকার মত নিজের পেটের কন্যাভ্রূণটিকে চুপুচুপি ওষুধ খেয়ে ন্যাকড়া জড়িয়ে বনের মধ্যে বা নর্দমায় ফেলে আসে? সেই মেয়েগুলো কেমন লক্ষ্মী? এদের নিজেদের কোনো সম্বিত নেই? কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? এযুগে দাঁড়িয়ে এই সব ধরণের অলক্ষ্মীদের আজ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তাই মা লক্ষ্মীর কাছে এইসব অলক্ষ্মীদের শুভবুদ্ধির জন্য প্রার্থনা করছি।