১৬ আগ, ২০১৫

মনসুন মোমেন্টস-১


ফিরে এসে ঘরময় সেই ডিওডেরেন্টের হালকা চেনা গন্ধটা আমার স্নায়ুগুলোকে অবশ করে দিল। বাথরুমের দরজার হুকে রেখে  যাওয়া কমলারংয়ের বাটিকের পাঞ্জাবীটাতেও সেই পরিচিত ঘামের গন্ধ।  ভিজে তোয়ালেটাও তুলে মেলে দিলাম খাটের ওপর থেকে।  আর ব‌ইয়ের র‍্যাক থেকে সেই বিশালাকার ব‌ইখানা? যার শিরদাঁড়াতে জ্বলজ্বল করে, বোল্ড করে লেখা সেই পরিচিত অক্ষরত্রয়  "GRE" আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল।  একটা বছর আগে এই  গুরুত্বপূর্ণ  ব‌ইটি  জায়গা করে নিয়েছে আমাদের বাড়িতে। একটামাস সেই ব‌ইখানির সাথে লেপটে র‌ইল।  আর মাত্র একমাসের মধ্যেই ফুরিয়ে গেল তার কাজ। আর কেউ সেই ব‌ইখানি খুলেও দেখেনা। তারপরেই শুরু হয়েছিল চিঠি লেখালেখি...তারপর খোঁজ খোঁজ ভালো কোন ইউনিভার্সিটিতে কোথায় কি পড়ানো হয়....তারপর অনিশ্চয়তা...মা আমি স্কল পাবো তো ?  ইমেল, এস-ও-পি লেখা, রেকো যোগাড়, ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠানো....কত্ত কাজ তার! তারপর চুপচাপ বেশ কিছুদিন। হঠাত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি উড়ে এসেছিল দরকারি ইমেলখানি। খুশির ইমেল, আনন্দের ইমেল....সফলতার ইমেল, পিএইচডি স্কল  ।
লাস্ট একটা বছর  কলকাতার চাকরীটাও বেশ ছিল। ডেটা-সায়েন্টিস্ট, রিসার্চ এসোসিয়েট যাই বলো।   ফ্যাটি পে প্যাকেট। তবুও মন যে মানেনা।  রাতবিরেতে ক্লায়েন্ট কল...আবার লেখো প্রোগ্র্যাম...কোডিং করো..দুনিয়ার ডেটা নিয়ে কাজ এহেন সায়েন্টিষ্টের । সেক্টরফাইভ থেকে ফিরেই ডিনার খেতেখেতেই কানে হেডফোন লাগিয়ে কন-কল ...কি ব্যস্ততার জীবন !
কিছুদিন পরেই কর্মজীবন স্ট্যাগনেন্ট কিন্তু! বাবা বলল, ডক্টরেটটা করা থাকলে অনেক সুবিধে। 
তাই তো ফুরিয়ে গেল একটা বছর হুড়মুড় করে। এবার? 

ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস এস্যোসিয়েশান...পাসপোর্ট-আই টোয়েন্টি ভিসা--এয়ার টিকিট.. ক্যাব বুকিং..... গুচ্ছের ইমিউনাইজেশান, ফরেক্স,  সেলফোনের জন্য ডেটাকার্ড...যত দিন বদলাচ্ছে তত‌ই যেন প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে। কাজটাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।  এয়ারপোর্ট। তারপরেই  চেক-ইন-ইমিগ্রেশন-সিকিওরিটি চেকিং ...আমাদের ছাদের ওপর দিয়ে হয়তবা উড়ে গেল উড়োজাহাজ খানি। মেঘের মধ্যে দিয়ে ঠিক ঐ সময়ে যেন পেলাম একটা রামব্লিং সাউন্ড। 

ঠিক যেন কালবৈশাখীর আগে থম মেরে যাওয়া আকাশটার মত। গাছের পাতা কাঁপছেনা মোটেও। নিস্পন্দ, নিথর একটা পরিস্থিতি।  সব যেন ফুরিয়ে গেল মনে হচ্ছে। আশপাশটা ফিকে গোলাপী কুয়াশার মত‌ই অস্পষ্ট । চাপা একটা উত্তেজনা তবুও অসাড়।  আমি কি হারিয়ে গেলাম?

২৮ জুল, ২০১৫

অন্য অহল্যা

Photo Courtesy : Google
 অভিধানে অহল্যা শব্দটির অর্থ হলঃ লাঙল চালনার অযোগ্য এমন ভূমি  আর সংস্কৃতে ন-হলা বা যা হলকর্ষণযোগ্য নয় ।  এই অহল্যা নাম্নী নারীটি অযোনিসম্ভবা অর্থাত কোনো নারীর থেকে তার সৃষ্টি হয়নি।  সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নিজ হাতে গড়া  অমন তিলোত্তমা অন্য কোনো পুরুষের হয়ে উঠুক সেটিও বোধ হয় ব্রহ্মা মনেপ্রাণে মানতে পারেননি তাই বুঝি অহল্যা ছিলেন চিরকুমারী।  এবং সেখানেই তার  নামটি সার্থক। আবার অভিশপ্ত পাথরে রূপান্তরিত অহল্যা সত্য সত্য‌ই হলকর্ষণযোগ্য নয়  এবং নিষ্ফলা । সেদিক থেকেও নামের আক্ষরিক অর্থটির সাথে সাজুয্য রয়েছে।  

সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সৃষ্ট অহল্যা নামে নারী চরিত্রটি পৌরাণিক উপাখ্যানে স্বনামধন্য হয়ে আছে অনেকগুলি কারণে।
১) তাঁর রূপ ( সৃষ্টিকর্তার খেয়াল  )
২) বুদ্ধি (বৃদ্ধস্বামীকে মানিয়ে নেওয়া ও এক‌ইসাথে দেবরাজ ইন্দ্রকেও খুশি করা) 
৩) বৃদ্ধ স্বামীকে মেনে নেওয়া  (পিতা ব্রহ্মার কথা লক্ষ্মী মেয়ের মত মেনে নেওয়া )
৪) অসাধারণ সিডিউসিং পাওয়ার  (বৃদ্ধ, যুবক সকলকেই পটিয়ে ফেলা )
৪)ইন্দ্রের সাথে পরকীয়ার কারণে অভিশপ্ত পাথরে রূপান্তরিত হয়ে প্রকৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থেকে যাওয়া (চিরন্তন ভারত-নারীর ত্যাগ ) 
৫) রামায়ণের রামকে অতিথি সত্কারের দ্বারা অভিভূত করে অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া  (কঠোর তপস্যার জন্য, আর কিছুটা  গৌতমমুণির ক্ষমতা প্রদর্শণ) 
এবং এইসবগুলি কারণে পঞ্চকন্যার আখ্যা পাওয়া ।

"অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তদা, পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহা পাতক নাশনম্‌।।" 

এবার দেখি মূল অহল্যা-গৌতম-ইন্দ্র উপাখ্যান কি বলে ? 

 ব্রহ্মা যতগুলি মানসকন্যা সৃষ্টি করেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্কৃষ্টা এবং তিলোত্তমা ছিলেন এই অহল্যা।     সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নাকি স্বর্গের নর্তকী ঊর্বশীর রূপের দেমাক খর্ব করার জন্য‌ই এই অবর্ণনীয় সুন্দরী অহল্যাকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। অহল্যা পেলেন ব্রহ্মার কাছ থেকে চিরযৌবনবতী থাকার আশীর্বাদ।
গৌতমমুণির কামনার স্বীকার হলেন যৌবনবতী অহল্যা। ধ্যানের বলে ব্রহ্মা জানতে পারলেন সে কথা।    কিন্তু ব্রহ্মা ঘোষণা করলেন, যে সারা পৃথিবী পরিক্রমা করে সর্বাগ্রে তাঁর সামনে আসবে তার সাথেই তিনি অহল্যার বিবাহ দেবেন। 
সেই কথা শুনে সমগ্র দেবকুল এবং মুণিঋষিরা সকলেই যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রাশেষে আশ্রমে ফেরার মুখে মহর্ষি গৌতম একটি গোরুর বাছুর জন্ম নেওয়া লক্ষ্য করলেন। সেটি ছিল কামধেনু বা দৈব গোরু। সৃষ্টির এরূপ প্রকাশ লক্ষ্য করে গৌতম সেই গোবত্স্যের চারিপাশে প্রদক্ষিণ করে সেই পরিধির মধ্যিখানে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করলেন। 
ব্রহ্মা দৈববলে সে কথা জানতে পেরে গৌতমমুণিকে বললেন যে একটি গাভীর সন্তানের জন্ম দেওয়া হল পৃথিবী সহ সপ্তদ্বীপের উত্পত্তির সমতুল্য।  এবং সেই গোবত্স্যটি প্রদক্ষিণ করে তার মধ্যে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হল সারা পৃথিবী ভ্রমণের সমান। গৌতমের এরূপ কঠোর ধৈর্য দেখে ব্রহ্মার মন ভিজল।  তিনি গৌতমমুণির সাথে অহল্যার বিবাহে সায় দিলেন।  অসামান্যা সুন্দরী অহল্যা হলেন বৃদ্ধ গৌতম মুণির যুবতী ভার্যা। ব্রহ্মা নবদম্পতিকে উপহারস্বরূপ "ব্রহ্মগিরি" দান করলেন। ব্রহ্মগিরি  হল নবদম্পতির আশা আকাঙ্খা পূরণের সর্বোচ্চ স্থান।
বিবাহের পর ঈর্ষায় কাতর হলেন সমগ্র দেবকুল এবং মুণিঋষিরা। দেবরাজ ইন্দ্রেরো খুব রাগ হল । তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন অহল্যাকে। তখনি তিনি ফন্দী আঁটলেন মনে মনে। 
প্রতিদিন সূর্যোদয়ের পূর্বে গৌতমমুণি স্নান ও তপস্যার কারণে আশ্রমের বাইরে যেতেন।  দেবরাজ ইন্দ্র সেই সময় চন্দ্রের তপস্যা করে চন্দ্রকে বুঝিয়ে বললেন একটি মোরগের রূপ নিতে এবং গৌতমমুণিকে আরো ভোরে জাগিয়ে দিতে। সেদিন মোরগের ডাকে গৌতমমুণির ঘুম গেল ভেঙে। মোরগের ডাক শুনে গৌতম ভাবলেন ভোর হয়ে গেছে। তিনি আশ্রম থেকে নির্গত হলেন মাঝরাতে।

 দেবরাজ ইন্দ্র সুযোগের সদ্ব্যাবহার করে অহল্যার কাছে এলেন   তাকে আহ্বান করলেন।  অহল্যা সম্মত হল।  যুবতী অহল্যা মহাখুশি। দেবরাজ ইন্দ্র সুদর্শন । বৃদ্ধ স্বামীর তরুণী পত্নীও যারপরনেই  দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে নিজেকে উজাড় করে দিতে পেরে মহাখুশি হলেন। শৃঙ্গার, সম্ভোগ পর্ব মিটতেই অহল্যা ইন্দ্রকে তখুনি চলে যেতে বললেন কারণ গৌতমমুণির আশ্রমে ফেরার সময় আসন্ন। 
নিজের ভোগলালসায় তৃপ্ত হয়ে ইন্দ্র সেই স্থান থেকে বেরিয়ে আসবার সময় গৌতমমুনির সাথে তার সাক্ষাত হয়ে গেল। গৌতম সব অবগত হলেন। তাই চন্দ্রে কলঙ্ক চিরস্থায়ী হয়ে গেল।   গৌতমমুণি অহল্যাকে অভিশাপ দিয়ে  বললেন,    "ছিঃ অহল্যা! আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তোমার রূপের দেমাক ধুলি ধূসরিত হল আজ থেকে। তোমাকে আমি চিরকালের মত অদৃশ্য করে দিলাম পৃথিবী থেকে। আজ থেকে সামান্য একটি পাথরে পরিণত হলে তুমি ।  যদি কখনো বিষ্ণু মনে করেন তিনি‌ই একমাত্র তোমাকে শাপমুক্ত করতে পারবেন।"

তাই বুঝি  ব্রহ্মা স্রষ্টা আর বিষ্ণু পালনকর্তা ।  ( Brahama, the Creator, Bishnu, the Preserver, Shiva, the Destroyer ).....  ভগবানদের মাহাত্ম্য কীর্তণে শুনতে পাই ।

অহল্যা হল প্রস্তর আর ইন্দ্র হলেন সহস্রযোনীপ্রাপ্ত এক তৃতীয় লিঙ্গের জীব। 

শোকে, অনুতাপে প্রকৃতির কোলে অহল্যা বেঁচে থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। 
পরে রামায়ণে পাই রামকে তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ করে আর কঠোর তপস্যার দ্বারা অহল্যা শাপমুক্ত হন এবং পুনরায় মানবদেহ লাভ করেন। তাই অহল্যা পঞ্চকন্যার প্রথম স্থানে। 

ভীল উপজাতিদের রামায়ণে বলে  সপ্তর্ষিদের যজ্ঞাগ্নির ছাই থেকে উঠে এসেছিল অহল্যা।   ভাগবদ্‌পুরাণে বলে অহল্যা নাকি চন্দ্রবংশীয় রাজা মুদ্‌গলের কন্যা । 

 এ হল অহল্যা নিয়ে আমাদের তথাকথিত ধর্মীয় উপাখ্যান। 

এবার আসল আলোকপাত "কহানী" খ্যাত পরিচালক সুজয় ঘোষের মাত্র ১৪ মিনিটের এপিক থ্রিলার "অহল্যা"র ওপর।
এও এক নতুন কহানী। কিছুটা  পুরাণকথা থেকে বেরিয়ে আবার কিছুটা তাকে রেখে দিয়ে। আর নামধাম অনুষঙ্গ সবকিছুই অটুট। ব্রহ্মা অনুপস্থিত এই অহল্যা কাহিনীতে কিন্তু গৌতম সাধু, ইন্দ্র সেন ও অহল্যা এই তিন মূল চরিত্র বেশ মিলেমিশে একাকার। এমনকি আর্টিষ্ট গৌতম সাধুর দেওয়া পরশপাথরটিও বেশ প্রতীকি। শিল্পী গৌতমের "বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা" অহল্যার সিডাকশান, পুলিশ ইন্সপেক্টর ইন্দ্র সেনের অহল্যার সাথে সেই শরীরিখেলায় মেতে ওঠা । অহল্যা গৌতমের সাথেও সাবলীল আবার তরুণ ইন্দ্রের (টোটা রায়চৌধুরী) সাথেও। রামায়ণ প্রসঙ্গ, পাথর অনুষঙ্গ, ঠিক আমাদের মূল উপাখ্যানের মত। কিন্তু যে ব্যক্তি হঠাত করে শিল্পীর কাছে আসেন আর ফিরে যান না তিনি। আর পাথর স্পর্শ করলেই তিনি পুতুলে পরিণত হন। সেটি বুঝি গৌতমমুণির অহল্যাকে অভিশাপ দেবার মত এক কঠিন শাস্তিপ্রদান। কিন্তু একটা খটকা থেকেই গেল। গৌতমরা  যুগে যুগে  তাঁর স্ত্রী অহল্যাকেই বারেবারে শাস্তি দিচ্ছেন এভাবে
কিন্তু কেন যে সুজয় ঘোষের অহল্যাকে "এপিক থ্রিলার" আখ্যা দেওয়া হল তা বুঝলামনা। অনবদ্য সৃষ্টি, নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় প্রেক্ষাপট, দুর্দ্দান্ত সিনেম্যাটোগ্রাফি, আর সবচেয়ে ভালো মাত্র ১৪ মিনিটের মধ্যে একটা কিছুকে কংক্রীট দাঁড় করানো।   
ভাবতে কষ্ট হল এই ছবিতে গৌতম সাধু(সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)  বারেবারে তাঁর যুবতী স্ত্রীয়ের কাছে ঋণি থেকে গেলেন কারণ তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টির পেছনে নাকি তাঁর এই স্ত্রীরত্নটির অপরিসীম অবদান। আর তাই বুঝি বারেবারে অহল্যা (রাধিকা আপ্টে)  মোবাইলটি নীচে ফেলে চলে যায়। গৃহে কোনো আগন্তুক এলেই তাকে পাথর ছোঁবার অছিলায় বৃদ্ধ শিল্পী গৌতম সাধু সেই আগন্তুককে পুতুল বানিয়ে ফেলেন। সব কিছুই ঠিক ছিল যদিনা অহল্যার মূল কাহিনীর সাথে গুলিয়ে না ফেলি।
সব কিছুই ঠিক আছে তিনি সুজয় ঘোষ মহাশয় বলে। সবকিছুই ঠিক আছে যদিনা একজন ফেসবুক বন্ধু এই ছবিকে সত্যজিত রায়ের "প্রোফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুলের্" সাথে তুলনা না করতেন। তাহলে কি সুজয় ঘোষ "কপি পেস্ট" করলেন  কোন্‌টির থেকে (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)? পুরাণের গৌতমমুণি-অহল্যা-ইন্দ্রের গল্প থেকে না কি সত্যজিত রায়ের ঐ ছবিটি থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ভাবায় আমাদের সফল ছোটগল্পের মত। শেষ হয়েও যা শেষ হয়না।   ওহ্‌! আরেকটা কোশ্চেন! গৌতমমুণি সে যুগে স্ত্রীকে শাস্তি দিয়ে, অভিশাপ দিয়ে প্রস্তরীভূত করেছিলেন কারণ পরকীয়া।  এযুগের গৌতম সাধু বেশ মেনে নিয়েছেন তাঁর যুবতী স্ত্রীয়ের অন্য পুরুষকে সিডিউস করা, কিছুটা যেন উসকেই দিয়েছেন তাকে পরকীয়ায় মেতে উঠতে কারণ নিজের অক্ষমতা ( যা তিনি স্বীকার ও করেছেন ) ।  এইযুগে মোবাইল ফোন, ম্যাগাজিনে স্বাছন্দ্য আধুনিকা অহল্যাকে বর্তমানের গৌতম সাধু কিন্তু বেশ প্যামপার করেন। সেটাই যুগোপযোগী পরিবর্তন কিন্তু অহল্যা-গৌতম-ইন্দ্রের প্রত্যাবর্তন নয়। 



ও কলকাতা ব্লগজিনে প্রকাশিত 

১৭ জুল, ২০১৫

নেত্রদান


কারো আষাঢমাস, কারো যগ্যিমাস! এক‌ইসাথে ঈদের শপিং, হাঁড়ি চেঁচেপুঁছে কিঞ্চিত হালিম, জগাদার প্রোফাইল বদল আর ছাপ্পান্নভোগের যগ্যি, রথের ঝাড়াপোঁছ । 
আজ জগাদার নেত্রদান-উত্সব। মানে উনি কারোকে আই ডোনেট করছেন না । ওনার নবকলেবরে চোখ উঠবে আজ। না, না, কংজাইটিভাইটিস নয়। নতুন শরীরে নতুন চোখ প্রতিস্থাপনা। না, না আই ট্রান্সপ্লান্টও নয়। শিল্পী চোখ আঁকবেন তাঁর নতুন কলেবরে। 
গতকাল ব্রহ্মবস্তু  সানন্দে ট্রান্সফার হয়ে গেছে ওনার আত্মার সাথে। আজ চোখ আঁকা হলেই রথের পূর্ব মুহূর্তের প্রস্তুতি শেষ।  তাঁদের চোখে, ঠোঁটে নাকি রাসায়নিক বর্জিত রং দেওয়ার প্রথা। মানে যাকে বলে ইকোফ্রেন্ডলি, ভেষজ রং । আর কেন‌ইবা তা হবেনা? এই শরীরের রং নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে দিনের পর দিন, যতক্ষণ না আবার নবকলেবর হয়।  
আয়ুর্বেদগুণ সম্পন্ন হরিতাল(হত্যেল, হলুদ রং), হিঙ্গুলা( টুকটুকে লাল পারদের প্রাকৃতিক যৌগ, যাকে বলে সিনাবার)  সোনার প্রদীপ জ্বালিয়ে তার ভুসোকালি (কালো রং),  শাঁখের গুঁড়ো থেকে সাদা রং, আবার সোনার গুঁড়ো‌ও  মিশিয়ে জগাদা এন্ড কোম্পানিদের সং সাজানোর পালা। 
পুরো বিউটি স্যালোনে তিনমূর্তি এখন। দারুব্রহ্মের নতুন অঙ্গ মার্জনা, ফেসিয়াল, পর্বের ইতি। কুড়চি-কদম্ব-কেতকীর স্নিগ্ধ জলে স্পা পর্ব শেষ। বাকী শুধু আই মেকাপ। ব্যস! রেডি টু বোর্ড অন রথ। টাইমেই আছে গজেন্দ্রগমন। শুধু ছাড়ার অপেক্ষা আর আমাদের দেখার!!! 

১৩ জুল, ২০১৫

সুবর্ণলতার সেকাল ও একাল

(আশাপূর্ণা  দেবীর ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

১৩ই জুলাই আশাপূর্ণাদেবীর মৃত্যু দিবস। আসুন তাঁকে বারেবারে স্মরণ করি। বরণ করি তাঁর চিন্তাধারাকে। পালটে ফেলি আজকের সুবর্ণলতাদেরো। 

আশাপূর্ণাদেবীর কলমে প্রথম-প্রতিশ্রুতির সত্যবতী এবং তারই ভাবমূর্তির মূর্ত প্রতীক তার কন্যা সুবর্ণলতা চরিত্রটি আজো আমার মনে চির সমাদৃতা । দুটি উপন্যাস পড়েছিলাম বারোক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে । তখন নারীমুক্তি, নারী সংরক্ষণ নিয়ে এতটা মাতামাতি শুরু হয়নি কিন্তু ঘোমটা পরিবৃতা বঙ্গনারীর উত্তরণ ততদিনে হয়ে গেছে সালোয়ার-কুর্তায় এবং জিনস-টিশার্টে । ঘরের বন্দিনী নারী বাইরের জগতে পা রাখার প্রোমোশানও পেয়ে গেছে । কিন্তু পাল্টায়নি পারিবারিক বোঝাপড়া বা সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিত্র, উড়ে যায়নি রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ । যে যুগে সত্যবতী সুবর্ণলতার মধ্যে সঞ্চার করেছিল স্ত্রী স্বাধীনতার ভ্রূণ, সেদিনের থেকে সমাজের চিত্র পাল্টে গেছে অনেকটাই কিন্তু বিবাহিতা নারীর লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও অপমানের বোঝা বোধ হয় এখনও হালকা হয়নি । সে সময় সুবর্নলতা পড়ে মনে হয়েছিল আমি সত্যবতী তথা সুবর্ণলতার সকলরসের ধারক ও বাহক হলাম । আমি আমার প্রাকবৈবাহিক জীবনে এইরূপ প্রতিবাদী মানসিকতা নিয়েই ঘর সংসার করব এবং "আমারে দাবায়ে রাখতে পারবা না" এই ভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাব । কিন্তু কার্যকালে অতটা অন্দোলন প্রবণ না হয়েও বরিষ্ঠনাগরিকজনের মুখনিঃসৃত বাক্যমালাকেও আপ্তবাক্য রূপে মেনে নিতে পারিনি ।

মেয়েদের মনকে বুঝতে পেরেছিলেন আশাপূর্ণা । বিভিন্ন বয়সে মেয়েদের বয়সের মনের গঠনকে খুব অন্তর দিয়ে লক্ষ্য করলে যা বোঝা যায় । নারীমনের বয়স এবং তার সঙ্গে নানাবিধ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। যখন সে কন্যা তখন তাকে দিতে হবে অনেক কিছু, গড়তে হবে, শাসন করতে হবে, সোহাগও করতে হবে সেই সাথে । তাকে যোগ্য সম্মান দিতে হবে । তবেই তার কাছ থেকে সম্মান পাওয়া যাবে । সুবর্ণলতাকেও আশাপূর্ণার সত্যবতী এই ভাবেই গড়ে তুলছিল কিন্তু তার শাশুড়ি এলোকেশীর জেদের কাছে হার মানতে হয়েছিল আত্মসম্মানবোধ সম্পন্না সত্যবতীর । বেথুন স্কুলে পাঠরতা দশ অনুত্তীর্ণা সুবর্ণকে কেমন করে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তার ঠাকুমা নিয়ে চলে এলেন আর তার মায়ের অনিচ্ছায় বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলেন তা আমরা দেখেছি । এলোকেশী বামনির কাছে পুত্রবধূর মতামত অপ্রয়োজনীয় । তিনি সত্যবতীকে মানুষ বলেই মনে করেন নি তাই এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিলেন । নিজের ছেলেকে তিনি যারপরনাই বৌয়ের বশীভূত বলতেও কুন্ঠিত হন নি । সে যুগে একজন মেয়ে মানুষ কিরূপে আর একজন মেয়েমানুষকে পায়ের তলায় অর্থাত নিজের অধীনে রাখার চেষ্টা করত তা এহেন লজ্জাকর বিবাহ দেখে আমরা শিক্ষা লাভ করি । বৈধব্যের একাকীত্বে উপনীত এলোকেশীর এহেন নিন্দনীয় সিদ্ধান্তে তার পুত্রও মনে মনে অখুশী হলেও প্রতিবাদী হননি কারণ সেই মেরুদন্ডের কাঠিন্য তার ছিলনা । "মা রাখি না বৌ রাখি" তো সব বিবাহিত পুরুষেরই জীবন যুদ্ধের অন্যতম পর্যায় । কিন্তু যে পুরুষটি সেই কাজ বুদ্ধির বলে করতে পারে সে তো রাজা ।

সুবর্ণলতা শিক্ষালাভ করে যে অপমানের স্বীকার হয়েছিল তা বোধ হয় এখনকার সুবর্ণদের কল্পনাতীত । বরং সংসারের স্বাচ্ছল্যতার কারণে এই শিক্ষালাভ শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে । এখনকার স্বাধীন নারী সানন্দে চাকরীর দায় ভার গ্রহণ করে যারপরনাই খুশি; বৌমাটি রোজগেরে বলে শাশুড়িমা কিন্তু মনে মনে গর্বিতা কিন্তু অন্দরমহলে তার নিত্য অনুপস্থিতি সংসারে সূত্রপাত ঘটায় নিত্যি কলহের । ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছি সুবর্ন পড়তে ও লিখতে পারত বলে তা মহা অপরাধ বলে গণ্য হত আবার বাড়িতে কোনো চিঠিপত্র এলে তাকে দিয়ে সেটি পড়িয়ে নেওয়াটি কোনো অপরাধ বলে মনে করা হত না ।

তখনকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমরা লক্ষ্য করেছি স্বৈরাচারীর ভূমিকায় এলোকেশী নামক বিধবা রমণীকে । আবার সেই একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে সুবর্ণলতার সংসারে । সেখানে সুবর্ণলতার বিধবা শাশুড়ি মুক্তকেশী তার চারপুত্রের কারোকেই মানেন না । তাঁর সংসারে তিনিই সর্বময় কর্ত্রী এবং স্ত্রী নায়িকার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। সত্যবতী এবং সুবর্ণলতা উভয়ের সংসারেই এই শ্ব্শ্রূমাতা স্বরূপিণী কর্তা ব্যাক্তিটির অত্যাচারের চরম মূহুর্তে ঘটেছে নিত্যি অশান্তি এবং গল্পদুটি পড়তে পড়তে কেবলই মনে হয়েছে ইতিহাসের মাত্‌সন্যায় যুগের কথা অর্থাত দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার । কি আনন্দই না পেয়েছেন এই দুই মহিলা দুটি কন্যাসমা অবলা পুত্রবধূর ওপরে মানসিক অত্যাচার করে ! এ যেন নবপরিণীতা বধূটির উপর ইচ্ছকৃত কর আরোপ করা । তাহলে প্রশ্ন জাগে পুত্রের বিবাহের প্রয়োজনীয়তা কি শুধুই দাসী আনার জন্যই? আর শাশুড়ি মা টি কি সব কাজকর্ম ফেলে ছোট সেই বালিকাবধূটিকে গালমন্দ করার জন্যই গৃহে এনেছিলেন বরণ করে?তিনি একথা ভুলে যান বারবার যে পুত্রবধূটিকে আপন করতে না পারলে তিনি ও তাঁর পুত্রের থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন ।কিন্তু তাতে কি আসে যায় ! ভবি ভোলবার নয় ।

নারীশিক্ষার প্রসার হয়েছে আমাদের দেশে । বালিকা আর বধূ হয় না শিক্ষিত সমাজে । শাশুড়িমাও কিন্তু শিক্ষিতা আজকের যুগে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়ায় উভয়ই হিমশিম খান আজকের যুগেও । অবশ্যি এর ব্যতিক্রমও থাকে । এক হাতে তালি না বাজিয়েই বলছি আজ দুইপক্ষের কেউই বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র জায়গা ছাড়েন না এই সংসারে । "যে সহে সে রহে" এই অমোঘবাণীকে মাথায় করে যে বধূটি চলতে পারে সে আদর্শ গৃহবধূ আর "কারো দোষ দেখো না" এই নীতির অনুগামিনী হয়ে যে শাশুড়িমা কাল কাটাচ্ছেন বহাল তবিয়তে, তিনিই ভাল শাশুড়ির সংবর্ধনা পান প্রতিবেশী, আত্মীয় পরিজনের কাছ থেকে । কিন্তু তবুও এই শাশুড়ি-বৌ মানিয়ে চলার কারণে ভেঙে যাচ্ছে কত যৌথ পরিবার । সে যুগেও আমরা দেখেছি স্বাধীনচেতা সত্যবতীর স্বামীকে নিয়ে শ্বশুরভিটে পরিত্যাগ করে ভাড়াবাড়িতে এসে সংসার করতে । আর এযুগে শিক্ষিত, চাকুরীরতা নারীর তো কথাই নেই । সে তো আরো স্বাধীন, আরো বেশী সচেতন ;
শাশুড়িমায়েরও ভুলে গেলে চলবে না যে তিনিও একদা ছিলেন বধূ বেশে । তাঁরও অনেক শখ, অনেক স্বপ্ন পূরণ হয়নি বিয়ের পরে কিম্বা তাঁরও ইচ্ছা করত একান্তে স্বামীটিকে পাবার, স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার কিন্তু তাই বলে তাঁর পুত্রবধূটির ওপর তো তিনি সেই সব নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন না বা তিনি পাননি বলে পুত্রবধূটিও তা থেকে বঞ্চিত হোক এতো মেনে নেওয়াও যায় না । যেমন ধরা যাক তখন কার কালে ঘোমটা মাথায় দেওয়া ছিল ম্যান্ডেটরি । কিন্তু এখন তা সভ্য সমাজে লুপ্তপ্রায় । তখন বাড়িতে ম্যাক্সি বা হাউসকোটের চল ছিলনা কিন্তু এখন তা আমাদের ঘরে ঘরে চালু হয়ে গেছে । এবার যিনি নতুন বৌমাটিকে এখনও ঘোমটা দিতে বাধ্য করছেন তিনি কিন্তু তাঁর অন্দরমহলে নিজের সুবিধার্থে ম্যাক্সি বা হাউসকোট পরে আধুনিকা হয়ে ঘুরে বেড়চ্ছেন ।"আমাদের সময়ে এমন হত না, আমরা অনেক সংযত ও বাধ্য ছিলাম" "আমাদের কালে এমন দেখলে লোকে ছি ছি করত" কিন্তু একবারও কি তিনি ভাবেন না যে তেনাদের কালে তাকে এমন হাউসকোট বা ম্যাক্সি পরিহিতা দেখলে তাঁর শ্বশুরভিটার গুরুজনেরা ভিরমি খেতেন ! আবার ধরা যাক বাপের বাড়ি থাকা নিয়ে বৌমাটিকে শুনতে হয় প্রচুর কথা । কিন্তু শাশুড়িমা যখন বৌ ছিলেন তখন তিনিও থাকতেন বাপের বাড়ি গিয়ে আর তাঁর মেয়েটির বেলায় তো তিনি এ ব্যাপারে রা'টি কাড়েন না ।

তিনি বয়সে বড় বলে "do what I say, don't do what I do"অথবা "a king can do no wrong" এই আপ্তবাক্যটিকে মেনে নিতে বাধ্য করেন। বধূরাও আজকের দিনে শিক্ষিত সুশীল সমাজের কর্ণধার । সত্যবতী বা সুবর্নলতার ধারাপাতে কিছুটা পুষ্ট । তারা আজকালকার নিউক্লিয়ার পরিবারের সদস্যা এবং সর্বোপরি শিক্ষার আলোয় জ্বাজ্জল্যমান এক একটি তারকা ; তার মা-বাবার স্নেহের সুধারসে লালিত ওয়ান এন্ড ওনলি কন্যারত্ন । তাই চট করে কিছুকে মেনে নেওয়াও তার পক্ষে কঠিন হয় । আর শাশুড়িমাটি কিন্তু ভিতর-বাহিরে, অন্তরে অন্তরে সুপ্ত এলোকেশী, প্রচ্ছন্ন মুক্তকেশী স্বরূপিণী । তাই ছলে বলে কৌশলে বধূটিকে আঘাত করতে বা অন্তরটিপুনি দিতেও কুন্ঠিত হন না ।

তবে এও স্বীকার করে নিতে বাধ্য হই যে আশাপূর্ণার সত্যবতীর আমলে শ্বশুর ঘরে যাওয়ার পূর্বে কন্যাকে কিন্তু অনেক সতর্ক করে দেওয়া হত যাতে মেয়েটি সভ্যতা, শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে, গুরুজনদের মান্যি করে, সকলকে যত্নআত্যি করে; এখনকার যুগে সেই কন্যাটি কে সেই মত কোনো সতর্কীকরণ করাও হয়না তার প্রধান কারণ সে এখন সত্যবতীর মত অবলা বালিকা নয় । সে রীতিমত উচ্চ শিক্ষিতা ও সাবালিকা । তার নিজস্ব মতামতকেই আজীবন কাল তার বাড়ির লোকেরা প্রাধান্য দিয়ে এসেছে অতএব সে তো সেই সতর্কীকরণ বার্তা শুনতেও চাইবে না । তবে এর ব্যাতিক্রমও আছে ।

সে যুগের সুবর্ণলতার তার ঠকুমার গুরুদেবের আদেশে হঠাত বিবাহ স্থির করা , সুবর্ণলতার সংসারে তার দুই দেবরের অমানবিক আচরণ এবং সুবর্ণলতার স্বামীর পুরুষ সিংহের কোনোরকম বিকাশ লক্ষ্য না করে ভেবেছিলাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের ক্ষমতার এহেন অপব্যবহার যেন আমাদের যুগে না হয় কিন্তু হায় রে বিধাতা এখনো পুরুষ বোধ হয় পুরোপুরি পুরুষ হননি । এ যুগেও অনেক পুরুষদ্বারা আজকের সুবর্ণলতারা লাঞ্ছিত হন সামান্য কারণে যেমন ধরুণ পণপ্রথা মেনে নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যান বরবেশে আর পণের অঙ্কটি মন:পুত না হলে কনের "দেবর" রূপী বন্ধুটি কিন্তু অমানবিক আচরণ করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হন না । ঈশ্বরের স্বপ্নাদেশের মত মিথ্যের অজুহাতে সে যুগের শাশুড়িমাটি বন্ধুর প্ররোচনায় ছেলেকে নিজের কাছে শুতে বলে কারণ বৌয়ের সাথে এক সঙ্গে শুলে নাকি ছেলের অকল্যাণ হবে । এ যুগেও ধর্মের নামে ভুচুংভাচুং দিয়ে আধুনিকা শাশুড়িরা এরূপ মিথ্যার আশ্রয় নেন কিনা সে ঘটনা আমার জানা নেই তবে প্রাকবৈবাহিক ঘনিষ্ঠতাও কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আপত্তিজনক হয় তার কারণ একটাই তারা একত্রে থাকলে তাদের বন্ধন যদি আরো সুদৃঢ় হয়ে যায় !

মনে হয় সমাজের পরিকাঠামো বদলানো প্রয়োজন । আমেরিকার অগ্রসর-সমাজ কত যুগ আগে যা অনুধাবন করেছিল তাদের সমাজচেতনার মাধ্যমে;আমাদের দেশে সেই গঠনের বোধ হয় একান্ত প্রয়োজন তাতে রক্ষা পাবে উভয় পক্ষ । ভাঙবে না সংসার । মা-বৌ এই টানাপোড়েনের হাত থেকে বাঁচবে অবলা সেই পুরুষপ্রাণীটি । যাকে সহ্য করতে হবে না বৌয়ের কাছ থেকে অহেতুক গালমন্দ, "কাপুরুষ", "মেরুদন্ডহীন" এই সব বিশেষণ আর মায়ের কাছ থেকেও শুনতে হবে না "বৌয়ের আঁচল ধরা", "ভেড়ো", "স্ত্রৈণ" এহেন কটুক্তি।

আমার কাছে মেয়েদের মনকে "গ্লাস ইনসাইড, হ্যান্ডল উইথ কেয়ার" এই রূপ ভাবে প্রতিপালন করা উচিত । মেয়েটি যখন স্কুল যাচ্ছে তখন থেকে শুরু করে সে যখন শাশুড়ি মা তে পদার্পণ করেছে, তখন পর্যন্ত এবং তারপর সেই মা'টি যখন একাকী কালাতিবাহিত করছেন অর্থাত বৈধব্যের স্বীকার হয়েছেন । আর প্রয়োজন ঘরোয়া কাউন্সেলিং অর্থাত সংসারের প্রতিটি সদস্যের সামনে বসে একটা মিমাংসা বা সমাধানের সূত্র খোঁজা । নয়ত "বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনীর" ন্যায় চলতে থাকবে উভয় পক্ষের কোঁদল আর কখনো কখনো যার পরিণতি ঘটবে ডিভোর্সের ডিসিশনে । মেয়েটি যখন সাবালিকা তখন তার নিজস্ব মতামত , তার চিন্তাধারাকে সম্মান জানাতে হবে আবার বেচাল কিছু দেখলে তার বাবা-মাকেই শাসনের শাণিত অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে এবং তাও তাদের কন্যাটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আর বিবাহের পরে পুত্রটিকে মায়ের পাশে থেকে বুদ্ধি করে মাকে ও শাসন করতে হবে যাতে যে তিনি যাতে তার প্রিয়তমা স্ত্রীরত্নটিকেও আঘাত না দেন তাহলে সব থেকে বেশী দুঃখ ছেলেটিই পাবে । তাকে নিতে হবে বিচারকের ভূমিকা । সে পিঠ বাঁচিয়ে চলবে মায়ের সামনে আর রাতের আঁধারে প্রেয়সী স্ত্রীটির বিরহে কাতর হবার ভান করবে তা যেন না হয় ।

এখনকার মেয়েরা যখন বধূরূপে বরণ হয়ে পা দেন শ্বশুর গৃহে তখন তাদের মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয় কারণ তারা তখন তো সেকালের সত্যবতী-সুবর্ণলতার মত কচি নন । আর তাই বলে নাবালিকা ঘরে আনাও তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর সবশেষে এখনকার সুবর্ণলতাদের বলি অন্যায় মেনে নিতে হবে না কিন্তু নিজের মাটি শক্ত করে শাশুড়িমাটিকেও একটু বোঝার চেষ্টা করে দেখুন না যাতে সাপ ও মরে লাঠিও না ভাঙে। আপনিও তো একদিন শাশুড়ি হবেন ।

আর সর্বকালের সকল এলোকেশী বা মুক্তোকেশী রূপিণি শাশুড়ি মায়েদের উদ্দেশ্যে বলি আপনারাও একটু ভেবে দেখুন না । ছেলেটি তো আপনার; তার অর্ধাঙ্গিনীকে একটু ভালবাসতে চেষ্টা করুন না । সেই মেয়েটি তো আপনার পরিবারেরই একজন, সে আপনার "মেয়ের মত" কেন ? মেয়ে হয়েই থাক না সে আপনার কাছে, পাক না একটু পক্ষপাতিত্ব । আপনারও ভুলে গেলে চলবেনা যে "আপ ভি কভি বহু থি" !
আজকের দিনেও মিডিয়া সোচ্চার প্রতি পলে পলে, দন্ডে দন্ডে । তাই বুঝি সেলিব্রিটিদের দিয়েও অবগুন্ঠনা বিয়ের কনেকে শৌচালয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে দেখি আমরা। কিন্তু হায় আমার গ্রাম্যবধূ! তোমার শ্বশুরকুল তোমাকে ঘোমটা দিতেও বাধ্য করবে আবার খোলা স্থানে শৌচকর্ম‌ও করতে বলবে। আজকের সুবর্ণলতাদের কি সুদিন আসবেনা?  মদ্যা কথা তোমাকে অবদমিত করেই রাখবে তারা সেই মাত্সন্যায় যুগের মত অথবা কলেজের ragging period এর মত।  দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলছে ও চলবে। কিন্তু সুবর্ণলতারা যথেষ্ট সবলা আজ। তাই প্রতিবাদী মন নিয়ে এগিয়ে আসি আমরা। ঘরে ঘরে সব সুবর্ণরা স্বেচ্ছাচারিতা, স্বাধীনতার সীমারেখা আর IPC র 498Aর যথেচ্চাচার না করেই  সুবর্ণলতা হয়ে উঠুক.. আশাপূর্ণা দেবীর মৃত্যুদিনে আমাদের সমাজের কাছে এই হোক প্রথম প্রতিশ্রুতি। 




উত্তরবঙ্গ সংবাদ, শনিবার ১১ই জুলাই ২০১৫ 

১৭ এপ্রি, ২০১৫

বুড়ির ভোট, ভোট বুড়ির।


সব শেষ গো বাবু! সব শেষ! এতক্ষণে দুদন্ড শান্তি। ওদের চেঁচামেচি আর নিতে পারছিনা গো বাবু। আই-টি-ইউ থেকে আই-সি-ইউ এসেছি এবারে..বুড়ীটা হাউমাউ করে ডুকরে উঠল।
  • বললাম, কেন গো কি হল তোমার আবার? 
বুড়ী বলতে শুরু করল.. 
কত ডাক্তারবাবুর কত মত! কি ঝগড়া তাদের নিজেদের মধ্যি ! চীতকার, চেঁচামেচি সব শেষ। এবার কালকের রাত পুইলেই পরীক্ষ্যে! তারপর সব রিপোর্টগুলো আসতে শুরু করবে। একে একে জানতি পারবা আসল রোগ কোথায়। তখন বুঝেসুঝে আবার আমাকে আবার না আই-সি-ইউ থেকে  আই-সি-সি-ইউ তে ট্রান্সফার করে দেয়  । ততক্ষণ চলুক আমাগো গীতাপাঠ, চন্ডীপাঠ!

  • বললাম, খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে তুমি! 
বুড়ি বলল..
আমি যত না অসুস্থ ওরা আরো আমাকে রোগে কাবু করে দিতেছে।  জয় বজরংবলী! বাঁচিয়ে দাও এবারের মত। আর অনিয়ম করব না।  জয় মা দক্ষিণা কালী! বাঁচিয়ে দাও এবারের মত।  জয় নাস্তিকস্য মুনিঃ মাতা ! এবারটার মত আর আমাকে আই-সি-সি-ইউতে ট্রান্সফার কোরোনা। একে আমার দেনা গলা অবধি। তারপর আর আই-সি-সি-ইউর যা খরচ!  পারবোনি বাপু পারবোনি অত  ! একেই গুচ্চের টেষ্ট করাতে করাতে ফতুর । শরীলের কোনো অংশ বাদ নেই গো বাবু।
  • বললাম, দাঁড়াও , দাঁড়াও সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে আমার! কেন ভর্তি হলে হাসপাতালে? 
বুড়ি বলল.. 
ভর্তি? আমি তো হ‌ই নি বাবু। ওরাই তো জোর করে আমারে ভর্তি করিয়েই দিলে!  পাঁচবছর অন্তর অন্তর আমাকে নিয়ে বেকার টানাহ্যাঁচড়া। চামড়াটা ফুটিয়ে ফুটিয়ে শেষ। বলি তোমরা কি আমার নতুন চামড়া করে দিতি পারবা? তোমাদের না হয় হৃদয় বলে কিস্যু নেই। আমার হৃদয়টাতো গেল বাপু, তোমাদের ভালোবাসার চোটে! তোমরা এদ্দিনে বুঝতি পারলে? আমার মাথার অসুখটা কোনোকালে ছিলনা? অযথা মাথায় ফুটো করে, নল ঢুকিয়ে ব্যথা দিলে! এবার বলদিকিনি সত্যি করে, আমার রোগ সারাতে পারবে কিনা? আমার কিডনি দুটো পার্ফেক্ট ছিল। তোমরা বললে, পাথর হয়েচে। অপারেশন করে একটা কিডনি বাদ দিয়েই দিলে! জীবনে একটা বিড়ি-সিগারেট খাইনি। তোমরা টেষ্ট করে বললে ফুসফুসে কালো প্যাচ আমার। আমার নাকি  ফুসফুসে ক্যান্সার শুরু হয়েছে সবেমাত্র। দুটো কেমো দিয়ে দিলে!কেমো নিয়ে সে কি কষ্ট আমার! আমি যে আর ধকল নিতে পারছিনা বাবু!
  • বাপ্‌রে! এ কি অবস্থা তোমার! বলে উঠলাম 
বুড়ি বললে..
এবার বল তো আমাকে নিয়ে আর কত খেলবে? আমি জেনে গেছি গো বাবু, আমার এ রোগ সারার নয়। তোমরা কেউ পারবেনা আমাকে আগের মত সুস্থ করে দিতে। তাহলে? তাহলে কেন আমার ওপর এত অত্যাচার? মুক্তি দাও না আমায়! আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এসি কেবিনে রেখে দিয়ে লোককে দেখাচ্ছো আমাকে তোমরা কত্ত ভালোবেসে চিকিতসে করাচ্ছো। এর শেষ কবে হবে বাবু? কবে হবে এই ছিনিমিনি খেলার শেষ?  আমি যে বড্ড অসুস্থ বাবু! আর নিতে পারছিনে তোমাদের এই লোক দেখানো আদিখ্যেতা!

বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের কোণা মুছতে লাগল। আমি হতভম্ভের মত চেয়েই র‌ইলাম ওর দিকে। আমি আজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বুড়িকে বাঁচানোর ক্ষমতা নেই আমার মত একরত্তির।  বুড়ির আছে লোকবল। আমার আছে বুড়ি। কিন্তু আমারো তো দায় বুড়িকে বাঁচানোর। তবুও.... বুকের মধ্যে চাপ অনুভূত হল প্রচন্ড।
মনে হল বলি

"চলো তো বুড়িমা। হাসপাতালের বন্ডে স‌ই করে তোমাকে আজ ছাড়িয়ে নিয়ে যাই!" 

৭ এপ্রি, ২০১৫

সুচিত্রা সেন তোমাকে...



এই চিঠিখানা লিখে রেখেছিলাম অনেকদিন ধরে। ভেবেছিলাম রেখে আসব তোমার লেটার বক্সে। আমার বাড়ির খুব কাছেই ছিলে এদ্দিন কিন্তু সময় হয়নি। তাই আরো একটু মনের কথা লিখে পাঠিয়ে দিলাম শূন্যের মাঝে, শান্তির বুকে, যেখানে তুমি আছো এখন... c/oসেই ঠিকানায় ।

সত্যি বলতে কি জানো ? সিনেমার বড় একটা ভক্ত আমি ন‌ই। তবে বাংলা সিনেমাকে ভালোবাসতে শেখা উত্তম-সুচিত্রার হাত ধরে। মা জোর করে পড়ার ব‌ই, গল্পের ব‌ই আর অঙ্কের খাতা থেকে মুখটা ঘেঁটি ধরে খানিকটা ঘুরিয়ে দিতেন রোববারের দূরদর্শনের ইভনিং শোয়ে। আর মাঝেমধ্যেই টিকিট কেটে সেই বেকার হোমমেকারকে ম্যাটিনী শোয়ের কম্পানি দিতে দিতে চিনে গেলাম সেই সিনে আইডল, বাংলাছবির গ্রেটা গার্বোকে। মনে মনে তারিফও করলাম সেই অতি প্রচলিত "নাক মাটামাটা চোখ ভাসা, সেই মেয়ে খাসা " প্রবাদটির। আলগা চটক, লালিত্য, ব্যাক্তিত্ত্ব এই সব শব্দগুলো সদ্য যৌবনা আমার জীবনের ধারাপাতে তখনো অধরা জানো? শিখতে লাগলাম।

মা-মাসীরা নাকি রফ্ত করত তোমার চলন-বলন, কথা বলার সময় কম্বুকন্ঠীর সূক্ষকৌণিক গ্রীবা হেলন আর সর্বোপরি তোমার গুরুগম্ভীর চাহনি। আমার এক মাসী ছিল জানো? তিনি তো আজীবন তোমার মত রামগড়ুরের ছানা হয়েই থেকে গেল। আমৃত্যু হাসলোনা একটুও! এই ছদ্ম গাম্ভীর্য্য নাকি রূপের একটা আলাদা মাত্রা এনে দেয়। তুমি কি সেই কারণে অত্ত গম্ভীর থেকেছ আজীবন? এখন মনে হয় আরেকটু চটুল তুমি হলেও হতে পারতে ! দা ভিন্সির মোনালিসার মত এক টুসকি হাসিও দেখতে পেলামনা আমরা । জাস্ট ভাবা যায়না! তুমি হাসছ তাও বিনিপয়সায়? মানে এমনি এমনি! এটাই বোধহয় জাদুকাঠি বা ট্রাম্পকার্ড যা ছিল তোমার হাতে। কি ঠিক বললাম তো? রহস্যময়ীর রসিকতা আবার পছন্দ হবেনা হয়ত! প্লিজ, রাগ কোরোনা। আমি কিন্তু মস্ত ফ্যান তোমার! শুধু একটু যদি বাইরে আসতে। ধরা দিতে! পথে হল দেরীর সেই সূক্ষ্ম, সি-থ্রু ডেক্রণ শাড়ি আর সাথে এয়ারহোষ্টেস ব্লাউজ! আমরাতো পলিমারের যুগের মানুষ! সে সময়ের ডেক্রণ আর এসময়ের পলিয়েষ্টারে আকাশ পাতাল ফারাক। মায়েরা সকলে কিনে ফেলল নিউমার্কেটে গিয়ে। বানিয়ে ফেলল তোমার স্টাইলে ব্লাউজ! আমি সেই ব্লাউজ টেঁকে নিয়ে কলেজ কেটে রূপবাণীতে "পথে হল দেরী" দেখতে বন্ধুদের সাথে! সাগরিকার বোট-নেক ব্লাউজ? আর দীপ জ্বেলে যাই ছবির শাড়ির পাড়-আঁচলে ছিটকাপড়ের প্যাচ ওয়ার্ক আর ম্যাচিং ব্লাউজ ? এখনকার নায়িকারা তোমাকে নকল করছে ভাবলেও সুখ হয় । ভাবো তোমার ব্র্যান্ড!

পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ায় আগুণ জ্বালিয়ে দিলে তুমি সেই ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত ! কিন্তু ঐ পর্দার আড়ালেই। ফোটোগ্রাফের সেই মুখ মানুষ সামনাসামনি দেখবে বলে কত কসরত করল! তবুও তুমি সামনে এলেনা একটিবার। তোমার জীবন রসায়ন আজো অধরাই থেকে গেল তোমার হার্টথ্রবদের কাছে । কিন্তু তা তো হবার ছিলনা । সিলভার স্ক্রিনের সাক্ষ্য ও অলক্ষ্যের তুমিকে তো পাওয়া হলনা আমাদের!

আমি তখন ক্লাস এইট । দত্তা দেখেছিলাম। মোর বীণা ওঠে কোন্‌ সুরে বাজি গানের সাথে পর্দা উড়ছিল আর মধ্যে দিয়ে ঢেউ তুলে হেঁটে চলেছিলে তুমি লিপ দিতে দিতে। অত রাবিন্দ্রিক আর কারোকে মনে হয়নি । আমাদের স্কুলের অফ পিরিয়ড তখন ভরপুর সেই চাল-চলন নকলের মধ্যে দিয়ে। আমরা গাইছি, হাসছি ঠোঁটদুটো একটুকু ফাঁক করে আর কল্পনার রাজ্যে ভেসে ভেসে প্রত্যেকে সেই মহানায়িকার আসনে নিজেকে বসিয়ে চলেছি। তারপর দেবীচৌধুরাণী। দৃপ্ততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার সেই রূপ, আর আমাদের মুগ্ধতা।

আমার শাশুড়িমায়ের মুখে শুনেছিলাম, "হারাণো সুর দেখতে দেখতে ওনার লেবার পেন উঠেছিল। উনি সেই আসি আর যাই যন্ত্রণা চেপে রেখেও গুণগুণিয়ে উঠেছিলেন "তুমি যে আমার" এর সাথে। বসুশ্রী সিনেমা হল থেকে সোজা শিশুমঙ্গলে ভর্তি হয়েছিলেন সেরাতে। পুরোটা সিনেমার কিছু বাকী ছিল। তারপর সেযাত্রায় খালাস হওয়ার পর সদ্যপ্রসূতির সন্তান বাত্সল্য উথলে উঠবে কি তার তখন কি মনখারাপ হারাণো সুর শেষ হয়নি বলে। সেদিন তুমি চলে যাবার পর আবারো দেখলেন হারাণো সুর আর গল্প বলছিলেন তারিয়ে তারিয়ে।

আমার মায়ের মুখে শুনেছি আরেক গল্প। দক্ষিণেশ্বরে কালীমন্দিরের পাশেই মামার বাড়ি ছিল আমার। মায়েদের বন্ধুরা খুব সিনেমা দেখত হলে গিয়ে কিন্তু বাড়ির রক্ষণশীলতাকে ফাঁকি দিয়ে মায়েদের মাট্যিনি বায়োস্কোপ সেই অর্থে ব্রাত্য। এদিকে বন্ধুবান্ধবরা গল্প বলে উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখে এসে, ফ্যাক্টস এন্ড ফিগার্স তাদের নখদর্পণে কিন্তু মায়েরা চার বোন যেন লজ্জায় সেই কথোপকথনে অংশ নিতে পারেনা। দিদিমার মাধ্যমে দাদুর কানে তুলতে লাগল কানাঘুষো। দক্ষিণেশ্বর থেকে বরানগরে সিনেমা দেখতে যাওয়া মনে বিগ প্রজেক্ট। এদিকে উত্তম-সুচিত্রা জুটি কাঁপিয়ে তুলছে বাংলার আকাশ বাতাস! সিনেমা আসে, সিনেমা চলে যায়। কখনো কোনো হলে চলতেই থাকে গৌরবময় দশ-বারো-কুড়ি সপ্তাহ। দাদুও বুঝতে পারেন যে আর মেয়েদের আটকে লাভ নেই । সকলেই এখন মুক্ত ! হঠাত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এগিয়ে আসে। সিনেমাহলের পাসপোর্ট পেয়ে মায়েদের কপালে সুপারডুপার হিট অগ্নিপরীক্ষার টিকিট আসে দাদুর মারফত, ড্রাইভারের হাতে করে। মায়েরা তো আহ্লাদে ন'খানা ! থুড়ি! নয়জনা...তুতো বোনেদের ফোন করে আনিয়ে সকলের কানে কানে তখন গানে মোর ইন্দ্রধনু !

তারপর একে একে সাড়ে চুয়াত্তর, সবার উপরে, গৃহপ্রবেশ, দীপ জ্বেলে যাই, সাগরিকা । রেডিওতে অনুরোধের আসরে ফিল্মিগানের নোটেশন অব্যাহত থাকে।

মা সেবার ফার্স্ট ইয়ার। গরমের ছুটির ভোরবেলায় দাদু দক্ষিণেশ্বর গঙ্গায় স্নান করে এসে মায়েদের সংবাদ দিলেন

" কালীমন্দির চত্বরে তিল ধারণের জায়গা নেই, তোদের সুচিত্রা সেন এসেছে বিকাশ রায়ের সাথে কি যেন এক বাংলাছবির শুটিং চলছে সেখানে"

মায়েরা একপ্রকার নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে একছুটে মন্দিরে। গিয়ে শোনে উত্তর ফাল্গুনীর শুটিং চলছে। বিদেশ থেকে তখন সদ্য ফিরেছেন সুচিত্রা, সাত পাকে বাঁধার জন্য পুরষ্কৃত হয়ে। তাই খুব ভীড়। কালীমন্দিরের সিঁড়ির সামনে বিকাশ রায় ও তিনি তখন পুজো দিয়ে নেমে আসছেন মায়ের চোখের সামনে । দুহাত দূরে তিনি। কিন্তু ঐ মুখে একটুও হাসি নেই। সেই ছদ্ম গাম্ভীর্য ভরা সুখ চোখে মুখে আর উপছে পড়া ব্যাক্তিত্ত্ব গড়িয়ে পড়ছে সারা শরীর দিয়ে । তবে তাঁর মুখে হাসি থাক আর না থাক মায়েরা তো ফিদা সেই অর্থে!

এমন ফিল্মি নবজাগরণ তুমিই আনতে সক্ষম হয়েছিলে। কনসার্ভেটিজমের লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে মধ্যবিত্ত যুবতীদের মনে সেই আঁধি আনলে ! কিন্তু সব ছিল ভালো যদি শেষটুকুনি আরো ভালো হত। সেযুগের আরো এক মহানায়িকা ঊমাশশী বা থিয়েটারমঞ্চ কাঁপানো নটী বিনোদিনীর মত সেই যে আড়ালে চলে গেলে অর এলেনাকো! কেউ বলল, তোমার নাকি আধ্যাত্মিক চেতনা এসেছে। কেউ বলল, তুমি সংসার জগতের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছ। কেউ আবার বলল তোমার শেষ ছবি প্রণয়পাশার বিফলতা তোমাকে হতাশ করেছে বলে তুমি আর ফিরতে পারলেনা। তদ্দিনে উত্তম-সুচিত্রা জুটি ভেঙে খান খান। তাই চলচিত্র জগতের ওপর বীতরাগ । তাই বলে যে দর্শক তোমাকে এত দিল তাদের জন্য একটি বার সাড়া দিলেনা তুমি! এ তোমার কেমন মহান আদর্শ! তুমি কি এমনি মহতী? জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে চলে বিলীন হয়েছ চিতার আগুণে । আত্মা অবিনশ্বর তাই তুমিও সর্বভূতে বিলীন হলে ঠিক‌ই কিন্তু আমার চোখে বহুদিন আগেই তুমি নিরালম্ব, নিরাশ্রয় আত্মার মত সেই কিংবদন্তী রূপসী হয়ে র‌ইলে । তোমার চলার পথ যদি এভাবে না শেষ হত!

আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার জীবনের সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়. সূর্য ডোবার পালা যদি আরো অন্যরকমভাবে আসত !

তুমি না হয় রহিতে কাছে, কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে !

ইতি

...

২৮ মার্চ, ২০১৫

রামায়ণ না কি সীতায়ণ ???


চৈত্রমাস নাকি মধুমাস। কারণ রামায়ণের হিরো রামের জন্মমাস।আজ শুক্লা চৈত্রনবমীতে রামচন্দ্রের জন্মদিন? যে মানুষটা গণতান্ত্রিক স্বার্থে বৌকে ত্যাগ দিয়েছিল ? রাবণের ঘরে সীতার দিনযাপনকে কলঙ্কিত করে সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বাধ্য করেছিল তার জন্য ঘটা করে জন্মদিন? মানতে বড় কষ্ট হয়। আদর্শবান পুরুষচরিত্র হয়েও সীতার দুঃখ বুঝতে পারেনি সে হেন পুরুষনায়কের জন্য ছেলের মায়েরা রামনবমীর উপবাস করেন। ভাবতে কষ্ট হয়। মনে মনে বলি, রামের চৈত্রমাস, সীতার সর্বনাশ।
কৈ সীতার আত্মত্যাগের জন্য কেউ তো সীতার জন্মদিন পালন করেনা? রামকে নিয়ে কত ভজন গান হয়। কিন্তু সীতার জন্য ক'জন ভজন গান? এমনকি "পঞ্চকন্যা"... অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা ও মন্দোদরীর সাথে এক আসনেও সীতা স্মরেণ্যা ও বরেণ্যা নন। রাম নাকি দ্বাপরে কৃষ্ণের অবতার। তাই তার সাতখুন মাপ? এই রাম রাবণকে যুদ্ধে হারিয়ে বধ করবে বলে ধনুকভাঙা পণ করেছিল। মা দুর্গার স্তব করেছিল। আর শরতকালে দুর্গাপুজো করবে বলে দেবতাদের ঘুম পর্যন্ত ভাঙিয়েছিল অকালবোধন করে। রাম ঘরের সম্মান রাখতে পারলনা অথচ নিজের স্বার্থে দুর্গা নামে আরেক শক্তিশালী নারীর পুজো করতেও পিছপা হলনা!
হায়রে! হিপোক্রেসি ভারতের ধর্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নিজের প্রয়োজনে এক নারীর পায়ে একশো আট পদ্ম দিয়ে পুজো হল অথচ রাবণ বধ করে সীতাকে লাভ করে অন্যের কথায় বৌকে ত্যাগ দিল! সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে বাল্মীকির আশ্রমে পাঠাতে যার একটুও বুক কাঁপলনা !

এ হেন রামের অয়ন অর্থাত গমন পথকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছিল আমাদের মহাকাব্য রামায়ণ। কিন্তু সীতার পাতাল প্রবেশ কিম্বা অগ্নিপরীক্ষা কি তাকে মনে রাখেনা? সীতা মাটির কন্যা আবার মাটিতেই মিশে গেছিলেন। তাই সীতায়ণ (কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর দেওয়া এই নাম, আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করে মনে মনে বলি) বা সীতার গমন পথও তো হতে পারত এই মহাকাব্যের নাম।
 মাটির কন্যা সীতা লাঙ্গলের ফলা বা "সীত" থেকে উঠে এসেছিলেন। আবার অত্যাচারে, লাঞ্ছনায় অতিষ্ঠ হয়ে বসুন্ধরার কোলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাই  নিজের জীবনচক্র তো নিজেই সমাপ্ত করলেন। তাই সীতার গমন পথ নিয়ে নতুন রামায়ণ লিখলে হয়না??? রাম কে এত প্যাম্পার করে, আদর্শের মুন্ডপাত করে হোক না সীতায়ণ!!!  

৪ মার্চ, ২০১৫

বাসন্তী ধৌতিকরণ ও দোল

ইগোর দ্বন্দ। কিসের ইগো?  বাপ্-বেটার ইগো। কেন ইগো? এ হল ধর্মান্ধতার ইগো।   বাপ হলেন স্বৈরাচারী দৈত্য রাজা হিরণ্যকশিপু আর ব্যাটা হল বিষ্ণুর আশীর্বাদ ধন্য প্রহ্লাদ। আর বাপ হলেন গিয়ে anti-বিষ্ণু।  বাপ রাজা তাই can do no wrong। ব্যাটা ঠিক উল্টো। বিষ্ণুর সমর্থক, বিষ্ণু অন্ত প্রাণ।
 কশ্যপমুনির স্ত্রী দিতির দুই পুত্র। দৈত্য হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সমগ্র দেবকুল তখন সন্ত্রস্ত  । বিষ্ণু বধ করলেন হিরণ্যাক্ষকে।  এবার হিরণ্যকশিপু ভ্রাতৃহন্তা বিষ্ণুর ওপর প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠল। মন্দার পর্বতে কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার বর পেল সে। দেব, দৈত্য, দানব কেউ তাকে বধ করতে পারবেনা। এইবার খেলার শুরু। 

  শুরু হল একুশে আইন। হিরণ্যকশিপুর আপন দেশে বলবত্‌ হল নয়া আইন। কেউ বিষ্ণুপুজো করতে পারবেনা। এদিকে তার ছেলেই তো পরম বৈষ্ণব। তাহলে? তাহলে আর কি মার ডালো। আবার যে কেউ মারতে পারবেনা তার ছেলে প্রহ্লাদকে। রাজ্যের সব বিষ্ণুভক্তকে তিনি শূলে চড়িয়ে মৃতুদন্ড দিয়েছেন। কিন্তু ছেলের বেলায় কি করবেন? বুদ্ধি খাটালেন বাপ। সুইসাইড বম্বার চাই তাঁর। কে হবে সেই আত্মঘাতী ঘাতক যে কিনা নিমেষে শেষ করবে তার পুত্রকে? বাপের দুষ্টু পাজী এক বোন ছিল। তার নাম হোলিকা। যুগে যুগে যেমন থাকে আর কি! সংসারে ভাঙন ধরায় তারা, দুষ্টু বুদ্ধিতে ছারখার করে ভাইয়ের  সংসার। হোলিকার কাছে ছিল এক মায়া-চাদর।  

 
তৈরি হল বিশেষ ঘর। সেই ঘরে হোলিকা প্রবেশ করল প্রহ্লাদকে নিয়ে।  হোলিকা ভাইপো প্রহ্লাদকে তার কোলে নিয়ে  বসবে। আগুণ জ্বালানো হবে এমন করে যাতে ঐ মায়া চাদর হোলিকাকে রক্ষা করবে আর প্রহ্লাদের গায়ে আগুণ লেগে সে পুড়ে মরে যাবে। কৌশল, ছলনা সবকিছুর মুখে ছাই দিয়ে মাহেন্দ্রক্ষণ এগিয়ে এল।  অগ্নি সংযোগ হল । মায়া চাদর হোলিকার গা থেকে উড়ে গিয়ে নিমেষের মধ্যে প্রহ্লাদকে জাপটে ধরল। হোলিকা পুড়ে ছাই হল আর প্রহ্লাদ তখনো অক্ষত। 

হোলিকা দহনের সময় আখের গায়ে সপ্তধান্য বা ধান, গম, যব, ছোলা এমন সাতরকম শস্যের গাছ বেঁধে অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়। প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন বলে অগ্নিদেবকে এই শস্যদান।  
পুরাণের এই হোলিকা দহন বা আমাদের আজকের ন্যাড়াপোড়া বা বুড়ির ঘর জ্বালানোর কারণ হল অশুভ শক্তির বিনাশ আর পরেরদিনে দোল উত্সবে আনন্দ সকলের সাথে ভাগ করে নিয়ে শুভ শক্তিকে বরণ করা। অথবা যদি ভাবি বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে? বছরের শেষে  পুরণো স্মৃতি, জীর্ণ, দীর্ণ সবকিছুকে জ্বালিয়ে দিয়ে নতুন বছরকে সানন্দে বরণ করার আগাম তোড়জোড়? কিম্বা বসন্তে ঋতু পরিবর্তনে রোগের বাড়াবাড়িকে নির্মূল করতে এই দহনক্রিয়া??? আর সামাজিক কারণ হিসেবে শীতের শুষ্ক, পাতাঝরা প্রাকৃতিক বাতাবরণকে পুড়িয়ে সাফ করে কিছুটা  বাসন্তী ধৌতিকরণ। যাকে আমরা বলে থাকি  spring cleaning। সে যাইহোক দোল পূর্ণিমার আগের রাতে খেজুরপাতা, সুপুরীপাতা আর শুকনোগাছের ডালপালা জ্বালিয়ে আগুণের চারপাশে ছোটছোট ছেলেমেয়েদের মহা উত্সাহে নৃত্য  করে করে গান গাওয়াটাই যেন আরো সামাজিক।
"আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরিবোল"
এবার সেই হরিবোলের সূত্র ধরে মনে পড়ে যায় মথুরা-বৃন্দাবন সহ ভারতের সর্বত্র দোলের পরদিন হোলি উত্সবের কথা। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা আর রং খেলার আনন্দে সব কালিমা , বৈরিতা মুছিয়ে দেওয়া আর বার্ষিক এই উত্সবের আনন্দ সকলের সাথে ভাগ করে নেওয়া। বাংলার দোলযাত্রা আরো একটি কারণে বিখ্যাত । নবদ্বীপে দোলপূর্ণিমার দিনে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বা শ্রীচৈতন্যদেব। তাই এই পূর্ণিমার অপর নাম চৈতন্যপূর্ণিমা। বাংলার ৮৯১ সনে, ১৪০৭ শকাব্দে ও ১৪৮৫ খ্রীষ্টাব্দে এই ফাল্গুনী পূর্ণিমায় নবদ্বীপের জগন্নাথ মিশ্রের স্ত্রী শচীদেবীর কোল আলো করে এসেছিলেন তিনি  । একটি প্রাচীন নিমগাছের নীচে জন্ম হল তাই নাম রাখা হল নিমাই। আবার গৌরকান্তির জন্য কেউ নাম দিল গৌরাঙ্গ। জগন্নাথ ডাকলেন বিশ্বম্ভর ও আত্মীয়েরা ডাকলেন গৌরহরি। এ যেন দুর্জনদের হাত থেকে সমাজকে বাঁচানোর তাগিদে কলিযুগের মাটিতে অবতার হয়ে জন্ম নেওয়া শ্রীকৃষ্ণের।  তাই নবদ্বীপে এই দোলযাত্রা আজো মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়।   

১৩ ফেব, ২০১৫

ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে




সুলতান লিখতেন কবিতা । রাণী গাইতেন গান । কবিতা আর গানের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার এক গল্প শুনতে মধ্যপ্রদেশের মান্ডু যাওয়া আমাদের । এখনো মধ্যপ্রদেশের মালওয়ার চারণকবিরা গেয়ে থাকেন কবি এবং রাজপুত্র বাজ বাহাদুর আর তার হিন্দুরাণী রূপমতীর প্রণয় গাথা ।




হোসং শাহের আমলে মান্ডু তার অর্থ, প্রতিপত্তি এবং ঐশ্বর্যে খ্যাতি লাভ করে । অনেক হাত বদলের পর ১৫৫৪ সালে বাজ বাহাদুর ক্ষমতায় আসেন । বাজ বাহাদুর ছিলেন মান্ডুর শেষ স্বাধীন সুলতান । সঙ্গীতের প্রতি তার ছিল অকুন্ঠ ভালবাসা । কুমারী রূপমতী ছিল এক অতি সাধারণ হিন্দু রাজপুত ঘরের অসাধারণ রূপসী তনয়া । তার গলার স্বরে ছিল এক অনবদ্য মিষ্টতা যা আকৃষ্ট করেছিল বাজ বাহাদুরকে । একদিন শিকারে বেরিয়েছিলেন বাজবাহাদুর । বাগাল, রাখাল বন্ধুদের সাথে রূপমতী গান গেয়ে খেলে বেড়াচ্ছিলেন সেই বনে । সুলতান তাকে দেখে তার সাথে রাজপুরীতে যেতে বললেন এবং তাকে বিয়ে করবেন জানালেন । রূপমতী একটি ছোট্ট শর্তে সুলতানের রাজধানী মান্ডু যেতে রাজী হলেন । রূপমতী রাজার প্রাসাদ থেকে কেবলমাত্র নর্মদা নদীকে দর্শন জানাবার বাসনা জানালেন । বাজ বাহাদুর সম্মত হলেন । সুলতান তার হবু বেগম রূপমতীর জন্য পাহাড়ের ওপরে বানালেন এক ঐশ্বরীয় রাজপ্রাসাদ যার নাম রূপমতী প্যাভিলিয়ন এবং যার ওপর থেকে রূপোলী সূতোর এক চিলতে নর্মদাকে রোজ দর্শন করে রাণী তবে জলস্পর্শ করতেন । নর্মদা ঐ পথে এঁকে বেঁকে পশ্চিম অভিমুখে আরবসাগরে গিয়ে পড়েছে । রাণীর জন্য তৈরী হল পুণ্যতোয়া নর্মদার জলে রেওয়া কুন্ড । হিন্দু এবং মুসলিম উভয় রীতি মেনে বিবাহ সম্পন্ন হল তাদের কিন্তু পরিণতি সুখকর হলনা । মোঘল সম্রাট আকবর দিল্লী থেকে অধম খানকে মান্ডুতে পাঠালেন শুধুমাত্র মান্ডু দখল করতেই নয় রূপমতীকে ছিনিয়ে আনতে । বাজ বাহাদুরের ছোট্ট সেনাবাহিনী পারবে কেন সম্রাট আকবরের সেনাদের সাথে ? বাজ বাহাদুর ভয়ে চিতোরগড়ে পালিয়ে গেলেন রাণীকে একা ফেলে রেখে । রূপমতী সেই খবর পেয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন । কবিতা আর গানের মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার এক রূপকথার ভয়ানক পরিসমাপ্তি ঘটল । এখনো রূপমতী প্যাভিলিয়নে হয়ত বা ঘুরে বেড়ায় রূপমতীর অতৃপ্ত আত্মা । চুপকথার চিলেকোঠায় চামচিকেরা আজো শুনতে পায় তার পায়ের নূপুরের শব্দ । দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় একটাই শব্দ যার নাম মেহবুবা । এখনো রাজপ্রাসাদের মধ্যে সেই ক্যানাল দিয়ে কলকল করে জল বয়ে চলেছে অবিরত । নর্মদাও রয়ে গেছে আগের মত শুধু রূপমতীই পারলেন না এই মহল ভোগ করতে । বাজ বাহাদুর রেওয়া কুন্ড নামে একটি জলাধার বানিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা পত্নী রূপমতীর জন্য । বাজবাহাদুরের প্রাসাদ এবং রূপমতী প্যাভিলিয়ন এর আফগান স্থাপত্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না। 
 

মান্ডু দেখা শেষ হল কিন্তু গাইডের বলা রূপমতী আর বাজ বাহাদুরের প্রেমের গল্প লেগে রয়ে গেল কানে । কিছুটা প্রতিধ্বনি, কিছুটা উদ্বায়ী আবেগ, কিছুটা এলোমেলো চিন্তার জটে সেই কাহিনী হোটেলে ফিরে এসে লিপিবদ্ধ করলাম ।


১২ জানু, ২০১৫

১২ই জানুয়ারি ! নমি গুরু বিবেকানন্দম্‌ !



খন্ডন ভব বন্দন জগ বন্ধন বন্দি তোমায় !!!

সেই একরত্তি বিলে থেকে পূর্ণযুবক নরেন ও সেখান থেকে সচ্চিদানন্দ বিবিদিষানন্দ বা স্বামী বিবেকানন্দ বলে আমরা যাঁকে জানি তিনি হলেন আধুনিক ভারতবর্ষের যুবজাগরণের পথিকৃত । সেই যুগনায়ক  মহাসন্ন্যাসী ভারতবাসীকে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছিলেন এক লহমায়..  হিন্দুত্বের দাবী নিয়ে, বেদান্তের প্রচার নিয়ে ।শিকাগো ধর্ম মহাসভায়  সকল ধর্মগ্রন্থের নীচে ভাগবদ-গীতার অধিষ্ঠানকে সকল ধর্মের ধারক রূপে ব্যখা করেছিলেন  । 
সমগ্র বিশ্বকে যিনি দেখেছিলেন এক ব্যয়ামাগার রূপে এবং মানুষকে সেই বিশেষ ব্যয়ামাগারে বলিষ্ঠ মানুষ হয়ে উঠতে বলেছিলেন ।
ছোটবেলা থেকে গরীবের দুঃখে যাঁর প্রাণ কেঁদে উঠত সেই বিলে আলনা থেকে মায়ের কাপড়চোপড় ভিখারীকে দান করেছিলেন সেইদিনই প্রমাণ হয়ে গেছিল তাঁর সারাটিজীবন ধরে "শিবজ্ঞানে জীবসেবা"র   অমোঘ বাণীটি কতটা সত্যি । 
 দুর্বার গতিতে দুরন্ত  ঘূর্ণির পাকে সমাজের রং বদলে যায় । স্বামীজির অগ্নিমন্ত্রের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে । 
নারীজাতিকে সম্মান করার কথা বলেছেন স্বামীজি । বেলুড়মঠে দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীতে কুমারীপূজার প্রচলন করেন তিনি । কিন্তু আমরা এই শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সেই কুমারীদের অবহেলা করি । কন্যাভ্রূণ হত্যা করে চলি । ধর্ষণে, অপমানে লাঞ্ছনার স্বীকার কন্যারা।  
স্বামীজি অশিক্ষা এবং কুশিক্ষাকে সমাজের অগ্রগতির প্রধান বাধা বলেছিলেন ।  কিন্তু আমরা এখনো বুঝি দূর করতে পারলামনা অশিক্ষা ও কুশিক্ষার প্রসার । তাহলে আজকের দিনটিতে সার্ধশতবর্ষের জন্মদিনে কি উপহার দেব তাঁকে ? 
"জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর"   কিন্তু কোথায় মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা? কোথায় বা মানুষের কর্মযোগ । স্বামীজি বিলেত-আমেরিকায় যে প্রকান্ড কর্মকান্ড দেখে এসেছিলেন সেই   কর্মোদ্দীপনার বীজ ছড়িয়েছিলেন সারা ভারতের মাটীতে  এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই বীজকে মহীরুহে পরিণত করতে চেয়েছিলেন । তিনি সফল । স্বামীজি কিন্তু নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য মিশন প্রতিষ্ঠা করেননি । প্লেগরোগীদের দুদর্শা, অনাহারী, আর্ত মানুষের  দুঃখ   মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন । সেবায় নিয়োজিত  করেছিলেন নিজেকে । জীবে প্রেম ও জীবের সেবা করার উদ্দেশ্যই কেবল  লক্ষ্য ছিল তাঁর । তাই শুধু সন্ন্যাসী নয় গৃহীদের ওপরেও ভার দিয়েছিলেন সেই সেবার । তাঁর ধর্ম নিষ্ক্রিয় বেদান্ত ছিলনা । ফলিত বেদান্তে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি । হাতেকলমে বেদান্তের প্রচার চেয়েছিলেন তিনি । তাঁর মূল কথা ছিল কি গৃহী অথবা সন্ন্যাসী সকলকেই কাজ করে যেতে হবে দেশের উদ্দেশ্যে, দশের সার্বিক উন্নয়নে ।   তাঁর  মিশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অধ্যাত্ম চেতনার নতুন দিশা দেখতে পেয়েছে ভারতবাসী । কিন্তু আজ বড় বেশি করে মনে হয় তাঁর মত দেশ নেতা এবং কর্মযোগী এক মানুষের এই মূহুর্তে খুব প্রয়োজন ছিল আমাদের । তিনি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে তা আমাদের বাংলার তথা দেশের জন্য মঙ্গলকর হতে পারত । তিনি যা চেয়েছিলেন তার কিছুটা হয়ত সার্থক ভাবে রূপায়িত হয়েছে কিন্তু আমাদের প্রকৃত মানুষ হবার খুব প্রয়োজন ছিল এই মূহুর্তে । কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ এবং রাজযোগের সারকথা পুঁথিতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেল । আমরা না হতে পারলাম তাঁর উপযুক্ত উত্তরসুরী না পারলাম উপরের চারটি  যোগের একটিরো আলোকবর্তিকা বহন করতে । শুধু রামকৃষ্ণ-মিশনের দীক্ষা নিয়ে, ১২ইজানুয়ারীর প্রভাতফেরী করে আর বিবেকমেলা প্রাঙ্গণে হাজির হলেই তো প্রকৃত মানুষ হওয়া যাবেনা ।
 পাশ্চাত্যের সারটুকু নিয়ে প্রাচ্যে বিলিয়েছিলেন তিনি । এই দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধনে আমরা যেন হারিয়ে গেলাম । আমরা কি পারলাম দেড়শো বছর পর তাঁকে  উপহার দিতে এমনি এক দেশকে যেখানে দারিদ্য নেই, হাহাকার নেই, ধর্মের ভেদাভেদ, হানাহানি নেই ?
তিনি বলে ছিলেন "উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত, প্রাপ্যবরাণ নিবোধত"  প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই নিহিত থাকে অফুরান শক্তি  শুধু তাকে জাগ্রত করার অপেক্ষায় । তাই মানুষের কুলকুন্ডলিনী যেদিন সদবুদ্ধি দিয়ে জাগ্রত হবে সেদিন হবে সত্যিকারের  জয় ।   কিন্তু সত্যি কি আমরা উঠে দাঁড়াবো কিম্বা জাগব ? কোথায় যাবো আমরা ? কি আমাদের উদ্দেশ্য ?  রামকৃষ্ণ মিশনের লক্ষ্য তো সঞ্চারিত হতে পারত দেশের প্রতিটি কোণে কোণে, মানুষের চরিত্র গঠনে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে । তাহলে সমগ্র দেশ ঐ মিশনের অনুগামী হত হয়ত । স্বার্থত্যাগী দেশনেতা কি আছেন যিনি সেই সর্বত্যাগী অমিতবীর্য মহাসন্ন্যাসীর মত দুইটি ডানা দিয়ে আগলে থাকবেন সমগ্র দেশবাসীকে, অভয় দেবেন আর ভালোবাসা দিয়ে জয় করবেন মানুষকে। কাজ করবেন নিজের দেশের জন্য, ভাববেন দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য । যাতে দেশটা দেখে  পাশ্চাত্যের সূর্যোদয় । যে সূর্যটা আকাশে সাতটি রং ছড়ায় কিন্তু একটি মাত্র একতার সূর্যরশ্মি দিয়ে মানুষকে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে ।  সমগ্র দেশের "ভালো"র স্বার্থে মানুষ সেই একরজ্জুতে  বাঁধা হয়ে এককাট্টা থাকেন ।  
তাই আবারো স্বামীজির কথায় বলি " Arise, awake and stop not till the goal is reached " 
বারে বারে ফিরে আসুক আমার প্রিয় স্বামীজির জন্মদিন, ১২ই জানুয়ারি।


৯ জানু, ২০১৫

মৃগদাব গড়চুমুকে, পিকনিক ২০১৫

সেদিন ছিল রোদ গলে পড়া শীতভোর। সেদিন ছিল নদীর জলের ঠান্ডা ভোর। পোষের পিঠে চড়ে রোদ এসে নেমেছিল গড়চুমুকে। মৃগদাব গড়চুমুকে। আমাদের চড়ুইভাতির সকাল তখন অমৃতকমলার দেশে পাড়ি দিয়েছে। সাদাসাদা ফুলকো লুচি আর নতুন আলুর সাদা চচ্চড়ির গন্ধে মাত গড়চুমুকের নদীর ধার। আমরা একদল শহুরে গিয়ে হাজির হলাম। শীতের সব অনুষঙ্গ যেমন নলেনগুড়, কমলালেবু, মটরশুঁটি, লেপ-বালাপোষ, পশমিনা-পুলওভার নিমেষে উধাও চড়ুইভাতির আনন্দে। শুধুই  শান্তি জলের ধার। শুধুই শান্তি নীল আকাশ। নীল আকাশ গিয়ে চুমু খেয়ে নিল দামোদরের পাড়কে।  নদের জল উছলে উঠল ছলাত করে। একটু ছুঁয়ে নিল নদের পাড়ের ক্যাসুরিনার নুয়ে পড়া সবুজ পাতা ভরা ডালকে। এখানেও সেই পোষমাস। যা এসেছে আমাদের শহরেও। এখানেও সেই শীত যা আছে আমাদেরো। এখানেও পারদ নামে প্রতিবারের মত। শীত আসে, শীত যায়। চড়ুইভাতি ফুরিয়ে যায়। আমরাও পরিযায়ীর মত ঘরে ফিরে যাই । শীতঘুমিয়ে ফুরিয়ে যায় শীত।

ভাগীরথী ও দামোদর মিশেছে হাওড়া জেলার গড়চুমুকে।   ৫৮ গেট বলে জল ধরে রাখার ও ছাড়ার বিশাল স্লুইসগেট। ডিয়ারপার্ক। জমপেশ উদরপূর্তি,গানের লড়াই,কুইজ,খেলা । সবমিলিয়ে শীতের অমৃত কমলার দুপুর জমজমাট!


৬ জানু, ২০১৫

কার্তিকেয় বৃত্তান্ত

কার্তিকঠাকুর আসলে কে ?
কেউ তাঁকেে বলে স্কন্দ, কেউ বলে মুরুগন আবার কেউ ডাকে সুব্রহ্মণ্য বলে। তিনি আসলে দেব সেনাপতি, যুদ্ধের দেবতা । আমাদের কাছে জনপ্রিয় কার্তিকেয় বা কার্তিক নামে, শিব ও পার্বতীর পুত্র রূপে। দেবলোকে যেখানেই যুদ্ধ হয় সেখানেই কার্তিকের ডাক পড়ে।
পুরাণ অনুসারে হলুদবর্ণের কার্তিকের ছটি মাথা। তাই তাঁর অপর নাম ষড়ানন। যুদ্ধের দেবতা বলে নাকি তাঁর ছটি মাথা। চারিদিক থেকে তাঁর লক্ষ্য অবিচল। পাঁচটি ইন্দ্রিয় অর্থাত চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক ছাড়াও একাগ্র মন দিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। । তাঁর হাতে থাকে বর্শা-তীর-ধনুক।
আবার কারো মতে মানব জীবনের ষড়রিপু- কাম(কামনা), ক্রোধ (রাগ), লোভ(লালসা),মদ(অহং), মোহ (আবেগ), মাত্সর্য্য (ঈর্ষা)কে সংবরণ করে দেব সেনাপতি কার্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে সদা সজাগ থাকেন। এই ষড়রিপু মানুষের জীবনের অগ্রগতির বাধা তাই জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করতে গেলেও কার্তিকের মত সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
পুরাণমতে তিনি তরুণ সদৃশ, সুকুমার, শক্তিধর এবং সর্বসৈন্যের পুরোভাগে অবস্থান করে । তাই মাদুর্গার যুদ্ধযাত্রায় এমন শৌর্যবীর্য সম্পন্ন পুত্র সঙ্গী না হয়ে যায় কোথায় !
বলতো কেন কার্তিকের বাহন ময়ূর?

কার্তিকের বাহন আমাদের জাতীয় পাখী আলস্যহীন ময়ূর । ময়ূরের পায়ে একটি সাপ অর্থাত অহংবোধ ও কামনা বাসনা বলি দিয়ে তিনি যুদ্ধ করতে ব্যস্ত। ময়ূর অত্যন্ত সজাগ এবং কর্মচঞ্চল পাখী । সৈনিক কার্তিকের সবগুণগুলি সে বহন করে ।
কোনো কোনো মতে রণ-দেবতা কার্তিক হলেন আকুমার ব্রহ্মচারী। আবার কোনো কোনো পুরাণ মতে কার্তিকের পত্নী হলেন ইন্দ্রের কন্যা দেবসেনা বা লক্ষ্মীরূপিণী ষষ্ঠী।
তাঁর নাম কার্তিক কেন ?
কৃত্তিকা নক্ষত্রে তাঁর জন্ম হয়েছিল এবং ছয় কৃত্তিকার দ্বারা তিনি পুত্ররূপে গৃহীত ও প্রতিপালিত হন বলে তাঁর নাম কার্তিকেয় বা কার্তিক। তাঁর আরো অনেক নাম আছে যেমন গুহ, পাবকি, মহাসেন, ষন্মুখ,কুমার, কুমারেশ, গাঙ্গেয়, বিশাখ, মহাসেন, কুক্কুটধ্বজ, নৈগমেয়।
কেন তাঁকে আমরা পুজো করি জানো?
ব্রহ্মার বরে মহাবলী তারকাসুরের নিধনের জন্যই নাকি অমিতবিক্রম যোদ্ধা কার্তিকের জন্ম হয়েছিল। কেউ বধ করতে পারছিলনা তারকাসুরকে। তার অত্যাচারে দেবকুল অতিষ্ঠ । আর দৈববলে অজেয় শক্তি সম্পন্ন এই দেবশিশু কার্তিকেয় তারকাসুর নিধন করেছিলেন ।
আর এই তারকাসুর নিধন করে দেবকুলে কার্তিক গেলেন দেবসেনাপতি। তাই কার্তিকের পুজো হয় মহাসমারোহে।
দেবতারূপে কার্তিক একসময়ে সারা ভারতীয় উপমহাদেশেই খুব জনপ্রিয় ছিলেন। ভারতীয় পুরাণগুলির মধ্যে স্কন্দ পুরাণে কার্তিকের বিষয়ে সবিস্তারে লেখা আছে। তাছাড়াও মহাভারতে এবং সঙ্গম তামিল সাহিত্যে কার্তিকের নানা বর্ণনা রয়েছে। আমাদের জাতীয় যাদুঘরে ( ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে) বারোটি হাত যুক্ত কার্তিকের একটি অভিনব মূর্তি রক্ষিত আছে।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উত্তর ভারতে কার্তিকের প্রভাব কমে আসে। আরাধ্য দেবতা রূপে কার্তিক উত্তর ভারতীয়দের থেকে অনেক বেশি জনপ্রিয় দক্ষিণ ভারতে। তামিলদের কাছে তিনি মুরুগন নামে, আর অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটকে তনি সুব্রহ্মণ্য নামের পুজিত হন। তামিলদের কাছে মুরুগন প্রধান আরাধ্য দেবতাদের মধ্যে একজন। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে যেখানেই তামিলদের সংখ্যা বেশি, যেমন শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মরিশাস- সেখানেই মুরুগন পরিচিত এবং সাড়ম্বরে পুজিত হন।
আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে কার্তিক ঠাকুর পুজো নিয়ে খুব বেশি হইহুল্লোড় হয় না। দুর্গাপুজোর পরেপরেই কিছুদিনের মধ্যেই কার্তিকমাসের সংক্রান্তিতে হয় কার্তিকের পুজো। কোন কোন প্রাচীন পরিবারে ধারাবাহিকভাবে, এবং এক-দুটি বিশেষ অঞ্চলে খুব হইচই করে এই পুজো হয়; কিন্তু সর্বজনীন পুজো হিসাবে কার্তিকপুজো বাঙালি সমাজে এখন আর সেরকম জনপ্রিয় নয়।
সেই কমে আসা উৎসাহ থেকেই সম্ভবতঃ মুখে মুখে তৈরি হয়েছে এই ছড়া -

"কার্তিক ঠাকুর হ্যাংলা,
একবার আসেন মায়ের সাথে,
একবার আসেন একলা।"

এটা কিন্তু খুব অন্যায়। একলা কার্তিকই খালি দুবার আসেন নাকি? মা-দুর্গার বাকি ছেলেমেয়েরাও কি আলাদা করে আরেকবার আসেন না?



ইচ্ছামতীতে প্রকাশিত 

১৪ ডিসে, ২০১৪

আমার শারদীয়া ২০১৪

১৭ নভে, ২০১৪

কার্তিক কান্ড!

কার্তিক কান্ড!
তারকাসুরের অত্যাচারে সমগ্র দেবকুল অতিষ্ঠ। কে বধিবে তারে? দরকার হল অমিত পরাক্রমশালী এক যোদ্ধার যে কিনা অনায়াসে বধ করবে তাকে এবং দেবতাদের রক্ষা করবে।
ব্রহ্মার আদেশ মাথায় নিয়ে ভোলাবাবা পার্বতীকে নিয়ে মহাসুখে দরজায় খিল আঁটলেন। চলতে লাগল সম্ভোগ পর্ব। ওদিকে হর-গৌরীর বিলম্বিত রতিক্রিয়ায় অধৈর্য হয়ে দেবগণ মদনদেবকে প্রথমে পাঠালেন তাদের বেডরুমে তলব করতে। ভোলেবাবা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে মদনকে বাণ মেরে ভস্মীভূত করলেন। আবারো দরজায় খিল। এবার পাঠানো হল অগ্নিকে। শিবের অবস্থা তখন নালে-ঝোলে। পার্বতীকে ইমপ্রেগনেট করা তো দূরের কথা মৈথুনরত শিবের রেতঃ স্খলিত হল অগ্নির সম্মুখে। অগ্নি তা নিয়ে গঙ্গায় ফেলে এলেন।
এবার সেখান থেকে দেবশিশু স্কন্দের জন্ম হল। তাই গঙ্গা হল কার্তিকের জন্মদাত্রী জননী।
এবার কে দেখবে এই সদ্যোজাতকে?গঙ্গার তো অবৈধ শিশু কার্তিক। উপায় ও হল সাথে সাথে.... ছ'জন কৃত্তিকা, মানে আয়ার সমতুল্য ঐ শিশুকে স্তন্যদান করে পালন করতে লাগলেন। পার্বতী জানতে পেরে রেগে অগ্নিশর্মা।ছেলে বলে কথা!!! যেহেতু ঐ পুত্র শিবের ঔরসজাত ঐ পুত্রের মা হবেন তিনিই । তাই তো মাদুর্গা না বিইয়ে কানাইয়ের থুড়ি "কার্তিকের মা" হয়ে গেলেন। আর তারকাসুর বধ করে ফেমাস হয়ে গেলেন দেবসেনাপতি বা দেবলোকের আর্মির মেজর জেনারেল ।
টেকনিক্যালি গঙ্গার গর্ভে জন্ম তাই কার্তিকের এক নাম গাঙ্গেয়। থিওরিটিকালি কৃত্তিকারা মায়ের মত পালন করেছিল তাই আরেক নাম কার্তিকেয় ।
আর বেসিকালি মহাদেবের পুত্র তাই আরেক নাম শিবসুত ।
( abridged মত্স্যপুরাণ )

৬ নভে, ২০১৪

রাস, c/o ভাগবত

রাস, c/o ভাগবত
আমাদের জীবন তো একটা রঙ্গমঞ্চ। সেখানে আমরা আসি, দেখি, জয় করি, চলে যাই। রাসলীলা কিছুটা তেমনি। বৈষ্ণবদের কাছে রাস কথাটি গুঢ় অর্থ বহন করে। 'রস' থেকেই রাস কথাটির উত্‍পত্তি। রস অর্থে সার, নির্যাস, আনন্দ, আহ্লাদ, অমৃত ও ব্রহ্ম বোঝায়। শ্রীকৃষ্ণকে ঘিরেই পালিত হয় রাস উত্‍‌সব। এই কারণে কার্তিক পূর্ণিমার অপর নাম রাস পূর্ণিমা।শ্রীকৃষ্ণ কার্তিক পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনে যমুনার তীরে গোপিনীদের আহ্বান করেন এবং তাঁদের বিশ্বাস ও ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে সঙ্গদান করেন। তাই বৈষ্ণবদের কাছে রাস আসলে ভক্ত ও ভগবানের মিলন উৎসব।পৌরাণিক মতে একজন নট যখন বহু নটীর সঙ্গে নৃত্য করেন তখন সেই যৌথ নৃত্যই  “রাস নৃত্য” বলা হয় । রাসে জীবাত্মা আর পরমাত্মার মিলন ঘটেছিলো । শ্রীকৃষ্ণ হলেন পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা আর গোপিনীগণ জীবাত্মা । জীবাত্মা যখন পরমাত্মায় মিশে যায় তখন সেটাই হয় “মহারাস” । এইসব জটিল তত্ত্বের সাক্ষাৎ প্রতিভূই  ভগবান শ্রীকৃষ্ণের “রাসলীলা”। 
"তোমরা আমাকে ভালোবাসা দাও, আমি তোমাদের ভালোবাসা দেব" এমনটিই বুঝি ছিল কৃষ্ণের মহামন্ত্র। গোপিনীদের সঙ্গে তাঁর আবাল্য সখ্য, একান্ত নিবিড় সম্পর্ক...গোপবালারা এক সে বড় কর এক সুন্দরী, অদ্বিতীয়া প্রেমিকা আর সারাক্ষণ কৃষ্ণপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া বৃন্দাবনের কিছু রমণী। যারা ভক্তিযোগে তাঁদের কানুকে পাবার জন্য আমরণ চেষ্টা করে গেছেন। রাধার সঙ্গে  কানুর পিরীতি তাদের বুকে শেল হয়ে বাজত। রাধা একাই কেন পাবে কৃষ্ণকে? তাদের যুগলে দেখতে পেলে ঝলসে যেত গোপিনীদের চোখ, ফেটে যেত বুক। এহেন কূটনৈতিক কানু যাদবের চিন্তা হল। এত কষ্টের তৈরী ব্র্যান্ড। যুগে যুগে সেই ব্র্যান্ডকে বাজিয়েই চলেছে আম আদমী। কিন্তু বৃন্দাবনের গোপিনীরা কানুর পিরীতি থেকে বঞ্চিত থেকে যদি সেই আদি অনন্ত দুধ সাদা ব্র্যান্ডে কালি ছিটিয়ে দেয়? অগত্যা মধুসূদন। কানু যাদব ফন্দী আঁটলেন। শারদীয়া উত্সবের পরপর আম আদমীর মনখারাপ থাকে।গোপিনীদেরো ঘরের কাজকর্মে একটু ঢিলাঢালা ভাব থাকে। উত্সবের হ্যাঙ ওভার কাটতে না কাটতেই কার্তিকের পূর্ণিমায় আয়োজন করবেন রাস উত্সব... এই ছিল বুঝি প্ল্যান। তিনিই স্বয়ং ইভেন্ট ম্যানেজার। c/o ভাগবত !
অতএব সতীলক্ষ্মী সব গোপিনীদের সঙ্গে কানুদার একান্তে গেট টুগেদার হল রাসলীলা। আর তাই তো কানুদা হলেন রাসবিহারী। এ হল দ্বাপরের বেত্তান্ত। তারপর কলিতেও সেই ট্র্যাডিশন অব্যাহত। বৃন্দাবনের আনাচেকানাচে কানুগত প্রাণ গোপিনীদের হৃদয়যন্ত্রে সেদিন বেজে উঠেছিল ভালোবাসার সেই সুর যা ৫০০০ বছর বাদেও  হৃদয়ঙ্গম করছেন সারা দেশের মানুষ। কৃষ্ণের সঙ্গে বৃন্দাবন বিলাসিনী রাইয়ের একটু বেশিই ঘনিষ্ঠতাই নাহয় ছিল তাই বলে কৃষ্ণের দাপুটে ব্র্যান্ডে কেউ কালি ছেটাতে পারেনি। 
ঠিক যে মূহুর্তে গোপিনীরা "নাহ্‌, ঐ বাঁশী শুনে আর কাজ নাই" ভাবল তখনি কানুদা রাসলীলার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলেন। মানে একপ্রকার গোপিনীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই বসলেন বিচক্ষণ কানুদা। আগে বাজাতেন ভৈরবী, ইমন, শুদ্ধ বিলাবল, ভূপালী এইসব রাগ-রাগিনী। এখন বাজালেন আহির ভৈরব, পুরিয়া ধ্যানেশ্রী, আশাবরী ...যত করুণ রসে সিঞ্চিত সুরের ঝর্ণা তত‌ই পাগলপ্রায় গোপিনীদের অবস্থা। অভিসারের কথা না জানিয়েই ছুটে যেতে ইচ্ছে হল প্রাণ। সবকিছু দিতে ইচ্ছে হল কানু-দয়িতের জন্যে।
কেউ তখন দুধ দুইছিল, কেউ দুধ জ্বাল দিচ্ছিল, কেউ রাঁধছিল খিচুড়ি। কেউ নিজের সন্তানকে দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত ছিল। কেউ স্বামীকে দফতরে পাঠানোর জন্য দেখভাল করছিল। যে যেমন অবস্থায় ছিল ঠিক তেমন অবস্থায় সবকিছু ফেলে রেখে ছুটল সেই বাঁশীর পিছুপিছু।
"কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মন-প্রাণ"
একজন গোপিনী স্নানের পর চন্দন দিয়ে অঙ্গরাগ করতে ব্যস্ত ছিল। একজন পরছিল কাজল। একজন সবেমাত্র কাঁচুলি পরেছে, ভুলে গেল উত্তরীয় পরিধানের কথা। একজন আবার এক কানে কুন্ডল পরেই দৌড়ল। "উথালিপাথালি ওদের বুক, মনেতে নাই সুখ রে, আমায় ডুবাইলি রে , আমায় ভাসাইলি রে"
লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে কানুর কুঞ্জবন রূপ বৈঠকখানায় ছুটল তারা।
চুলোয় যাক্‌ সংসার! রসাতলে যাক স্বামী-পুত্র! "রইতে নারে, বাঁশীতে ডেকেছে যারে"
বাঁশীওয়ালার ডাকে সাড়া দিয়েও বিপদ হল গোপিনীদের। কানু বাঁশীওয়ালা পরীক্ষা নেন সতত‌ই। গোপিনীরা পূর্ণিমার রজতশুভ্র জ্যোত্স্নায় বৃন্দাবনের কুঞ্জে এসেছে সব ছেড়েছুড়ে। এর মধ্যে কে কানুকে সত্যি ভালোবাসে আর কে লোক দেখানো সেটা যাচাই করতে তিনি বললেন, ভয়ঙ্কর রাতে, বনে বাদাড়ে হিংস্র বন্যপ্রাণী আছে। অতএব তোমরা ঘরে ফিরে যাও। গোপিনীরা বলল, চাঁদের আলোয় আঁধার তো দিন হয়েছে আর বৃন্দাবনের জন্তু জানোয়ার বন্ধুপূর্ণ অতএব আমরা আজ ফিরবনা এরাতে। কানুদা আবারো বললেন, তোমাদের পরিবারের লোকেরা কি বলবে? তাদের অহেতুক চিন্তা বাড়িওনা। কিন্তু গোপিনীরা নারাজ। "রহিল মোর ও ঘর দুয়ার".... কেষ্টারে লয়েই থাকবেন তেনারা।
নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করতে লাগল" আজ সব ছেড়ে চলে এলাম তার জন্যে, আর এখন কিনা তিনি বলছেন ফিরে যেতে?" এদিকে প্রেমের অনুঘটক রূপে কাজ করল কার্তিকের মৃদুমন্দ হিমেল বাতাস, আকাশে রূপোর থালার মত পূর্ণচন্দ্র, আর ভেসে এল নানা ফুলের গন্ধ।
দিশেহারা হয়ে গেল সতীলক্ষ্মী গোপিনীরা। তন্ময় হয়ে গেল কানুচিন্তায়। ভুলে গেল দেহ-গেহ। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তারা একদৃষ্টে চেয়ে কেমন যেন সম্মোহিত হয়ে গেল একে একে। কানুর রূপ, বাঁশীর সুর, প্রেমের অনুকূল প্রকৃতি সবকিছু মিলেমিশে একাকার তখন। তাদের পরপুরুষের হাবভাব, চালচলন, চটূল হাসি, অকপট অনুরাগ, মধুর বাক্যালাপ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগে ব্যস্ত তারা।
"ভিতর বাহিরে, অন্তর-অন্তরে আছো তুমি, হৃদয় জুড়ে"
তারা যারপরনাই হারিয়ে ফেলল নিজ নিজ পৃথক সত্ত্বা। প্রগাঢ় প্রেমে বুঝি এমনটিই হয়ে থাকে। পাগলপ্রায় গোপিনীরা উচ্চৈস্বরে গাইতে লাগল গান... "হরিনাম লিখে দিও অঙ্গে"

কানুর দুষ্টুমি শুরু হল তখন। অশোক, নাগকেশর, চাঁপা গাছের আড়ালে চলে গিয়ে পরখ করতে লাগলেন তাদের প্রেমের আকুতি। লুকোচুরি চলল কিছুক্ষণ। কানুর প্রিয় ছোট ছোট ফুলগাছ, কুর্চি, মালতী, জাতি। এদের কাছে গিয়ে গোপিনীরা জিগেস করল তারা... কানুকে দেখেছ ?
এভাবে চলল কিছুক্ষণ। অবশেষে বৃন্দাবনের তরুলতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে তারা লক্ষ্য করল কানুর খালিপায়ের ছাপ। ওরা ভাবল আবারো বুঝি কানু সেই রাধার সাথে দেখা করতে চলে গেছে। খুব অভিমান হল তাদের। হঠাত তারা দেখল কিছুদূরেই রাধা মূর্ছিত হয়ে পড়ে আছে। তা দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হল গোপিনীদের। সখীদের সেবায় রাধার জ্ঞান ফিরল। তাকে নিয়ে গোপিনীরা চাঁদের আলোয় যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায় ততদূর গেল। তন্ন তন্ন করে খুঁজল কানুকে। তবু তার দেখা নাইরে। তার দেখা নাই। তারপর কানুর স্তুতি শুরু হল।
তারপর কিছুটা মান-অভিমানের পালা। যার জন্য আমাদের সব ছেড়ে চলে আসা, যার বাঁশীর শব্দে আকৃষ্ট হয়ে আমরা এই গভীর বনে চলে এলাম, যার কষ্টে আমরা এতদিন কষ্ট পেলাম, যাকে ভালোবেসে আমরা সকলের কাছে খারাপ হলাম সেই কানু কিনা আমাদের বুঝলনা? অতএব কানু একজন শঠ ব্যক্তি। তিনি মিথ্যাচার করেছেন। তিনি কপট। কানু বেচারা তখনো ইনভিজিলেটরের ভূমিকায়। পরীক্ষা তিনি নিয়েই চলেছেন।
আচমকা অতর্কিতে কানু বেরিয়ে এলেন বনের মধ্যে থেকে। গলায় বনমালা আর পরণে পীতাম্বর পট্টবস্ত্র। আকস্মিক মৃত সঞ্জীবনীর কাজ হল। গোপিনীরা প্রাণ ফিরে পেলেন যেন। এবার শুরু প্রকৃত লীলার ।
সংস্কৃত গোপী শব্দটির অর্থ হল রাখালি বালিকা যাঁরা গো-সেবা করেন। কেউ বলেন গোপিনী, কেউ আবার বলেন গোপীকা। এঁরা হলেন ভক্তিমার্গে বিচরণকারী ব্রজের রমণী। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন কৃষ্ণের একশো আটজন সখী...এঁরা হলেন বৃহত্তর বলয়ের নিবিড় সাথী... চন্দ্রাবলী এঁদের মধ্যে অন্যতম। আরো নিবিড়তর বলয়ের অষ্টসখী হলেন চম্পকলতা, চিত্রা, ইন্দুলেখা ,রঙ্গদেবী, সুদেবী, তুঙ্গবিদ্যা, ললিতা, বিশাখা.......। আর সবচেয়ে কাছের এবং অন্যতমা হলেন শ্রীরাধিকা। শ্রীকৃষ্ণচরিতামৃত অনুযায়ী সব মিলিয়ে বৃন্দাবনে তখন কৃষ্ণের সাথে ষোলোহাজার গোপিনী সঙ্গ করেছিলেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দূত ছিলেন তাদের প্রভুর। কেউ কেউ ছিলেন পরিচারিকা বা সেবাদাসী।
শ্যামলী তার চন্দনচর্চিত বাহুদুটি দিয়ে কানুকে জড়িয়ে ধরল। চন্দ্রাবলী বিনয়ের সাথে হাতজোড় করে প্রেমের পরিচয় দিল। শৈব্যা অঞ্জলিপুটে কানুর চর্বিত পান গ্রহণ করল।পদ্মাবতী নিজের বুকের মধ্যে কানুর চরণযুগল রাখল । ললিতা অনিমেষ নয়নে কানুর শ্রীমুখ দর্শন করতে করতে বিহ্বল হয়ে পড়ল। বিশাখা কানুকে নিজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করে চোখ বুঁজে পরম তৃপ্তি লাভ করল। আর যে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে কানু আমার, আমি কানুর ন‌ই সেই রাধিকা অভিমানে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। বৃন্দার কানুকে দেখে পাগলপ্রায় অবস্থা। বিদ্যুত্লতার মত দেহবল্লরী নিয়ে চম্পকলতা স্থানুবত দাঁড়িয়েই র‌ইল। কখন প্রভু কৃপা করে তার হাতটা ধরবেন একটু! একটু হবে স্পর্শসুখ। বহু প্রতিক্ষীত একটুকু ছোঁয়া লাগা স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাবেন আবার গৃহকাজে।
অতঃপর প্রাণে খুশীর জোয়ার এল। কেঁপে কেঁপে উঠল গোপবালারা। সায় দিয়েছে কানুর মন। বিরহের অবসান হল। দেবতারা বিমানে চড়ে উপস্থৈত হলেন স্বর্গলোকে। পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। দুন্দুভি বেজে উঠল। রাসমন্ডল শতশত ব্রজবালার নূপুরের সিঞ্জিনী, বলয়ের কিঙ্কিনীতে তোলপাড় হতে লাগল। এ যেন এক স্বর্গীয় লীলাখেলা। সকল গোপিনীরাই অনুভব করল যে কানু তাদের দুহাত দিয়ে কন্ঠ আলিঙ্গন করছেন। নিজের মহিমাবলে কানু তখন একই অঙ্গে বহুকৃষ্ণে লীলা করতে লাগলেন তাদের সাথে। প্রত্যেকেই খুশি তখন। সম্মোহন শক্তিতে আপ্লুত তারা। সকলের মনে হল কৃষ্ণ শুধু তার্, আর কারো নয়। নিজের নিজের কাছে প্রিয়তমকে দেখে সকলেই উদ্বেলিত তখন। ব্রজবালারা কটিবন্ধের চাদর কষে বেঁধে নিলেন। কঙ্কন-বলয়ে রোল তুলে, মল-নূপুর, বিছুয়া বাজিয়ে উদ্দাম নৃত্য করতে লাগলেন সেই একমেবাদ্বিতীয় কৃষ্ণকে ঘিরে। গাইতে লাগলেন শ্রুতিমধুর গান। কানু নিজের গলা থেকে মল্লিকাফুলের মালা ছুঁড়ে দিলেন গোপিনীদের দিকে। দীর্ঘায়ত হল সে রাত। নক্ষত্রমন্ডল রাস দেখতে দেখতে বিস্মৃত হল অস্ত যেতে।
এখন আমাদের প্রশ্ন হল শ্রীকৃষ্ণ কেন পরস্ত্রীদের সঙ্গে এহেন পরকীয়ায় লিপ্ত হলেন? আদৌ কি এ পরকীয়া প্রেম না কি অন্যকিছু? না কি দেবতা বলে তাঁর সাতখুন মাপ? ভাগবত অনুযায়ী তিনি মায়ায় বশ করেছিলেন। নিজের সঙ্গেই নিজে খেলা করেছেন। যে ব্যক্তি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁকে একান্ত আপনার করে পেতে চায় তাঁর সাথে তিনি এমন লীলাই করেন। গোপবালারা উপলক্ষ্য মাত্র। শ্রীধর স্বামী তো বলেইছেন
"রাসলীলায় শৃঙ্গাররস ছলনামাত্র। আসলে এই লীলা মুক্তিপ্রদায়িনী।" আর তাই তো তিনি এখনো বৃন্দাবন তথা সমগ্র বিশ্বের একমেবাদ্বিতীয় ব্র্যান্ড এম্বাস্যাডার!!!

আর মহামিলনের জন্য‌ই কি এমন ঢালাও আয়োজন চলে আসছে প্রত্যেক পূর্ণিমা তিথিতে ? ঠিক তাই। বছরের তিনটে বিশেষ পূর্ণিমাতে হয় রাধাকৃষ্ণের তিন লীলা-উত্সব বা যাত্রা । ফাল্গুণী পূর্ণিমায় দোলযাত্রা, শ্রাবণী পূর্ণিমায় ঝুলনযাত্রা আর কার্তিক পূর্ণিমায়  রাসযাত্রা। আর এই  মিলনোৎসবে আজও কেন সামিল হাজার হাজার মানুষ ? বছরের এই বিশেষ দিনগুলোতে তিথিক্ষণ মেনে কেন আমরা এখনো জমায়েত হ‌ই মেলা প্রাঙ্গণে?
আর কেন‌ই বা ঝুলনযাত্রার শেষে রাখী বেঁধে দিয়ে মিষ্টিমুখ করায় আমার বন্ধু ? রাধাকৃষ্ণ, ঝুলন সাজানো, এসব তো মানুষের মনগড়া । আসল তো মাঝেমাঝে সম্পর্কটাকে ঝালিয়ে নেওয়া। কৃষ্ণ স্বয়ং সেকথাও বুঝেছিলেন। হঠাত হঠাত মথুরা থেকে বৃন্দাবন, সেখান থেকে দ্বারকা ...তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক  সদাব্যস্ত কর্মসূচীর টানাপোড়েনে  শ্রীরাধার সাথে সম্পর্কটা যায় যায় হয়ে দাঁড়াতো। তাই তো এই উতসবের মধ্যে দিয়ে আবারো মধুর সম্পর্কটা টিঁকিয়ে রাখার চেষ্ট করে যাওয়া। একান্তে দিনকয়েক কাছের করে পাওয়া। দুজনের কত শৃঙ্গার, ভৃঙ্গারে  গল্পমুখর দিনরাত এক হয়ে যাওয়া।