২৪ অক্টো, ২০১৩

বিরিয়ানি, মুক্তো এবং পুজো


কোলকাতার ভীড়ভাট্টা ছেড়ে হায়দ্রাবাদে পুজোটা কাটাবো এবার এই ঠিক ছিল  । ছেলের ফাইনাল ইয়ারের ইন্টার্নশিপ চলছে এখানে । সে ছুটি পাবেনা তাই আমাদের একসাথে পুজোর ছুটি কাটাতে যাওয়া । সকাল
থেকে হাপিত্যেশ করে বসে থাকা তার জন্যে । কখন সন্ধ্যে হবে আর তার সাথে বেরুনো হবে । ভাবতে লাগলাম ছোট্টটির কথা । নাছোড় সেই বীরের কথা ।

তখন আমরা জামশেদপুরের বাসিন্দা । 
ওখানকার পুজোতে সেবার নবমীর দিন আগমনী গান গাইতে উঠেছি পুজোমঞ্চে, মাদুর্গার পাশে । নাম ঘোষণার পর স্টেজে উঠতেই  হৈ হৈ ।
আমার নাছোড় পুত্রের বাবা তাকে দর্শকাসনে বসানোর চেষ্টা করছেন আর সে মঞ্চে উঠবেই..
চারবছরের পুত্রটি ধীরে পায়ে এসে আমার পাশে টপ্‌ করে বসে পড়ল । আমি হতবাক!
অনুষ্ঠানের কতৃপক্ষদের সে বলল  মায়ের পাশে বসে রা'টিও কাটবেনা, তাকে বসতে অনুমতি দেওয়া হল ।
আমার  গান অবধি গম্ভীর হয়ে, হাতে ক্যাপবন্দুক নিয়ে  ঘটের মতন বসে র‌ইল চুপটি করে
মঞ্চ থেকে নেমে আসার সময় তাকে শুধালাম, এটা তুমি কি করলে? বাবার কাছে বসলেই পারতে..
সে বলল-  দুষ্টু অসুর যদি তোমার কোনো ক্ষতি করে ! বীরপুরুষ আবৃত্তির সময় তুমিই তো বলেছিলে তোমার পাশে এমনি করে থাকতে!
আমি মনে মনে আওড়ে নিলাম "ভাগ্যি খোকা ছিল মায়ের সাথে" !
....

দিন কয়েকের মত শিকেয় তোলা র‌ইল মহানাগরিক কোলাহল । কিন্তু তেলেঙ্গানা পৃথকীকরণের জেরে আর ধেয়ে আসা ঘূর্ণাবর্তের আশঙ্কায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারলাম না ।   একটু মনখারাপও হোল তবুও  ভালো লাগল ছুটির আনন্দে ।  ছুটি যেমনই হোক  আর পুজোর ছুটি  সব ছুটির থেকে অন্যরকমের । তবে খুব মিস করছিলাম  ঢাকের শব্দ ।  এবছর আশ্বিনের শারদপ্রাতে অকাল শ্রাবণের চোখরাঙানি এ শহরকেও তাড়া করে চলেছে । বৃষ্টি শরতের মুখে একরাশ কালি ঢেলে দিয়েছে ।  মনখারাপের বাঁধ ভেঙে কবিতায় পেয়ে বসল আমায় । 


দুর্গা তোমার দুচোখ জুড়ে বৃষ্টি কেন বলো ?
দুর্গা তোমার দৃষ্টি সুদূরে আঁধারে কিম্বা আলো ।
দুর্গা তোমার ঘামতেল আজ বিষণ্ণতার ছোঁয়া
ধুলোমুঠি শাড়ি মলিন আঁচল তবুও শিউলি ধোয়া ।
...

ছোটবেলায় ষষ্ঠীর ভোরে  মা'কে দেখতাম স্নান সেরে এসে প্রত্যেক দরজার মাথায় তেল-হলুদ-সিঁদুরের ফোঁটা দিতে । মা দুর্গাষষ্ঠীর ব্রতকথা পড়ে হাতে প্রসাদ দিতেন ।  সুদূরে বসে সেই স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই । সেই শুভসূচনার সাথে সাথে মায়ের আগমনের শুরু হয়ে যেত  । হোটেলের জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাচ্চাদের স্কুল যাওয়ার তাড়া । অফিসকাছারি যাবার কর্মব্যস্ততা ।  কোলকাতার সাথে কোনো তুলনা নেই এ শহরের পুজোর । হোটেলের ব্রেকফাস্ট ব্যুফেতে গিয়ে নিরামিষ ফলাহার সেরে নিলাম ষষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে ।
রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজো
 হোটেলের টেলিভিশনে ডিটিএইচ পরিষেবার মাধ্যমে আকাশবাণী কলকাতা পেয়ে দিব্যি খুশি হলাম । একে একে পুরোণোদিনের গান আর কলকাতার পুজোর আপডেট পেতে থাকলাম । প্যান্ডেল হপিং না করেই সেলেবদের খুচরো গসিপ আর বাংলা গান এর চেয়ে ভালো ছুটি কাটানো কিসে হতে পারে ? মাঝেমধ্যে ডিডিবাংলায় পুজো পরিক্রমা দেখে দুধের সাধ ঘোলে মেটালাম । আমার মনের ছুটির ঘন্টা আর ঢাকের বাদ্যি ততক্ষণে কোলকাতাকে এনে দিয়েছে চোখের সামনে । মায়ের আমন্ত্রণ, অধিবাস, বোধন চলছে ।
 সপ্তমীর শারদপ্রাতের সূচনায়  মনখারাপের মেঘ জমেছে । কলাবৌ স্নানের কোনো লক্ষণ নেই এ শহরে । হয়ত বা হচ্ছে তার প্রস্তুতি দূরে কোথাও , বহু দূরে । মনে পড়তে লাগল ঢাক, শাঁখের আওয়াজ.. ন'টি উদ্ভিদ চারা দিয়ে তৈরী কলা-বৌকে স্নান করিয়ে,  লাল পাড় সাদা শাড়ী পরিয়ে   মা দুর্গারূপে পুজো করা ।   
গোলকুন্ডা ফোর্ট

আমারা রয়েছি হায়দ্রাবাদের হাইটেক সিটির কাছে কোন্ডাপুরে । সেখান থেকে সপ্তমীর দিন গেলাম হুসেন সাগর নামে এক বিশাল লেকে । কি পরিচ্ছন্ন! 
 
হুসেন সাগরের বুদ্ধমূর্তি 

আর সেখানে ঐ বিশাল জলাশয়ের মধ্যে একটি অভিনব বুদ্ধমূর্তি দেখতে যাওয়া হল লঞ্চে করে । তারপর গোলকুন্ডা ফোর্ট ও চারমিনার ।
চারমিনার
 সপ্তমীর দিন আমাদের বাড়িতে খুব রান্নাবান্না হত ।   বিশেষ আমিষ পদ.. মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ফুলকপি দিয়ে ভেটকি মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, আরও কত কি! সেই  স্মৃতি নিয়ে পৌঁছে গেলাম   হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে পুরোণো রেস্তোঁরা প্যারাডাইসে । বিরিয়ানি   রায়তা ও কাবাব দিয়ে সপ্তমীর ভোজ সারা হল । সন্ধ্যের ঝুলে ডোমালগুডায় রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজো দেখতে গেলাম । সন্ধ্যারতির পর পোহা প্রসাদ পেলাম । 
হায়দ্রাবাদ বাঙালী এস্যোসিয়েশানের দুর্গাপুজো
 এবার পাশেই ইন্দিরা পার্কের উল্টোদিকে  হায়দ্রাবাদ বাঙালী এস্যোসিয়েশানের ৭২বছরের পুরোণো পুজো দেখতে গেলাম ।  ওখানকার পুজোতে গিয়ে পুরোণো বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা একটা বিরাট প্রাপ্তি ।   বাঙালী যেখানেই থাকুক ঠিক চেষ্টা করে যায় তার সাহিত্য-কলা-কৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে ।বিরিয়ানি আর মুক্তার শহর  হায়দ্রাবাদও তার ব্যাতিক্রম নয় ।  সেখানেও এক আকাশের নীচে সব বাঙালী মানুষ  গান, নাচ, নাটকের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোকে পালন করছে । তবে এদের কোনো পুজোতেই কোলকাতার মত অনিয়ন্ত্রিত ভীড় নেই বা অহেতুক সেলিব্রিটি প্রদর্শনের হিড়িক নেই । আর নেই থিম পুজোর জাঁকজমক ।  কোলকাতার এক একটি বারোয়ারি পুজো এখন ‘স্পনসর্ড’ পুজো— কোনও এক কোম্পানির সম্পত্তি, কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের কিনে নিয়েছে ওই পাঁচটি দিনের জন্য। প্রতিযোগিতার মাপকাঠিতে মা আসেন একটা প্যাকেজে! সেরা প্যান্ডেল, সেরা প্রতিমা, সেরা দর্শক শ্রীমতি, সেরা আরও কত কিছুর ভিড়ে কিন্তু আসল পুজো একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। সরে যাচ্ছে পুজোর মূল, অনাদি আবেদন। শুধু বেঁচে র‌ইল স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মহাষ্টমীতে সেরা পোষাকটি পরে অঞ্জলি দেওয়া । সারা বছরের মত মায়ের কাছে বাঙালীর যত কিছু চাওয়া  । "রূপং দেহি, জয়ং দেহি, যশো দেহি"... ইত্যাদি আরো কত কিছু । 

মহাষ্টমীর ভোরে স্নান সেরে নিয়ে  হায়দ্রাবাদেও নতুন শাড়ি । তারপর আবার রামকৃষ্ণ সারদা মঠের দুর্গাপুজোয় সামিল হলাম ।ঠিক বেলুড়মঠের মত একচালার হলুদ মূর্তি মা সহ তাঁর পরিবারের । মূল মন্দিরে  ঠাকুর রামকৃষ্ণ  টুকটুকে লাল দক্ষিণি পট্টবস্ত্রে, মা সারদা টুকটুকে লাল জরিপাড় মাহেশ্বরী শাড়িতে ও স্বামী বিবেকানন্দ গেরুয়া রঙের কাঞ্জিভরম ধুতিতে ।    চন্ডীপাঠের সকাল । মন্ত্রমুগ্ধ আবহ । স্তোত্রপাঠের পর  আরতি, পুষ্পাঞ্জলি ।  সবকিছুই বেলুড়মঠের রীতি অনুসারে । কিন্তু ভীড় কম বলে আরো যেন কাছে পাওয়া সেই দুর্গাপুজোকে । কোলকাতার পুজোতে যেন অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি বড্ড বেশি কৃত্রিম মনে হয় আজকাল । এরপর হোমযজ্ঞ । তারপর প্রসাদ বিতরণ । অভিনব ভোগপ্রসাদ । মাঠের ওপর পেতলের বিশাল হাঁড়িতে ঘিভাত বসেছে কাঠের জালে । আর সেই ঘিভাতের সাথে তেলুগু সবজী, চাটনী, পাঁপড়  ও মিষ্টি ডালপুরী । পরিতৃপ্তিতে ভরপুর মন ।  হোটেলে ফিরে এসে ডিডিবাংলায় সরাসরি বেলুড়মঠের সন্ধিপুজো দেখতে পেয়ে গেলাম ।
মনখারাপ হল তীব্র গতিতে ছুটে আসা ঘূর্ণিঝড়  পিলিন এর কথা শুনে । অন্ধ্র ও উড়িষ্যার উপকূলে ধেয়ে আসছে সেই ঘূর্ণাবর্ত । সে রাতে  অজানা আশঙ্কায় ঘুম এলনা দুচোখে ।
 বৃষ্টি কোলকাতাকে পুজোতে মুক্তি দেয়নি  কিন্তু শরতের আকাশের অনেকটা নীল দাক্ষিণাত্য মালভূমির এই শহরে  ধরা দিল । পিলিন অষ্টমীর রাতে ঊড়িষ্যার উপকূলে আছাড়ে পড়েছে এর‌ই মধ্যে । ততক্ষণে পিলিন শান্ত হয়েছে   অন্ধ্রে  । তবে ঊড়িষ্যায় বিপুল ক্ষতি করেছে ।  
সালার জাং মিউজিয়ামের বিখ্যাত ভেলড রেবেকা 
 নবমীর সকালে এ শহরের আরো এক মুখ্য আকর্ষণ সালার-জাং মিউজিয়ামে ঘুরে ঘুরে থকে যাওয়া আর নবমীনিশিতে আবার মন উচাটন কোলকাতার ধুনুচিনাচের জন্য । আর সেই সোনার প্রতিমা ভাসানের সুর যেন বেজে উঠল কানে কানে ।

 মনে মনে গেয়ে উঠলাম " নবমীনিশি রে তোর দয়া নাই! এত করে সাধিলাম ..."

নবমীর দুপুরে মাংস খাওয়ার রেওয়াজ সব বাঙালী বাড়িতে । কাবাব-বিরিয়ানি-তন্দুরীর শহরে তার জন্য হাপিত্যেশ নেই । অলিগলিতে মুখরোচক দোকান । ঐদিন এ শহরে নবরাত্রির সাজগোজ যেন একটু বেশিমাত্রায় নজরে এল ।  
দশমীর দুপুর থেকে বাড়িতে শুরু হয়ে যেত নিমকী-নাড়ু আর ঘুগনীর তোড়জোড় । কত মানুষ আসবে বাড়িতে । কিন্তু এখন কোলকাতায় সেই রেওয়াজ যেন অনেকটাই স্তিমিত । দল বেঁধে যাওয়া হত বিজয়া করতে । প্রবাসে বসে আরো যেন এইগুলো পেয়ে বসে আমাকে । মনে হয় আমি যেন দলছুট এক কোলকাতাইয়া । তবে হাইটেক সিটি ছেড়ে যেতে যেতে কেবল মনে হতে লাগল আমার শহরের কথা । হায়দ্রাবাদ কোলকাতা দুই পুরোণো শহর । কিন্তু এ শহরে শুধু শিল্পের জোয়ার । শেষদিন খেতে গেছিলাম এক রেস্তোঁরায় । সেখানে বাঁকুড়ার এক বাঙালী যুবক হোটেলে কাজ করে । সে বলল তার দুঃখের কথা । দেশ ছেড়ে পুজোর সময় তার মোটেও ভালো লাগছেনা কিন্তু বাঁকুড়ায় পড়ে থাকলে তার সংসার চলবেনা  তাই কাজের জন্য দলে দলে ছেলেরা বাঁকুড়া ছেড়ে হায়দ্রাবাদে পাড়ি দিয়েছে .. সে জানাল ।   আবারো মনটা ভারি হয়ে গেল তার কথাগুলো শুনে ।
দুর্গাপুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকুক কোলকাতার বাঙালী । যদি মাদুর্গা ভবিষ্যতে প্রসন্না হন তবে আমাদের এই শহরেও শিল্পের জোয়ার আসবে ।  সেই সুপ্ত বাসনা নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে ।   
আমাদের পরবর্তী  পিটষ্টপ ভাইজ্যাগ্-আরাকু ভ্যালিতে ।  ইষ্টকোষ্টের ধার ঘেঁষে  গোদাবরী এক্সপ্রেস ছুটে চলল ।  
আদরের নৌকায় প্রকাশিত  

২ অক্টো, ২০১৩

প্যাপিরাস ই-পত্রিকার পুজোসংখ্যা ২০১৩


মহালয়ার আগেই প্রকাশিত হল প্যাপিরাস ই-পত্রিকার পুজোসংখ্যা ২০১৩ । ধীরে ধীরে সকলের ভালোবাসায় প্যাপিরাস  তিনটে পুজো পার করতে চলেছে ।   আশাকরি সকলে পড়বে তোমরা ও তোমাদের বন্ধুদের জানাবে  প্যাপিরাসের কথা । আরো কেমন করে এই ওয়েবপত্রিকা  সুন্দর করা যায় জানালে খুশি হব । তোমাদের সুচিন্তিত মতামতের জন্য ইমেল ও প্যাপিরাসের কমেন্ট তো র‌ইলই । দুর্গাপুজোয় সকলে খুব ভালো থেকো । হৈ হৈ করে বেড়াতে যাও, ঠাকুর  দেখো । খুব আনন্দে খাওয়াদাওয়া করো সকলের সাথে । 
আবারো জানাই শারদীয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা । মহালয়ার আগমনীর সুরে সুরে থেকো সক্কলে মিলে ।   আবার  দেখা হবে  নতুন বছরে ।  

২১ সেপ, ২০১৩

ডালাস ডায়েরী

বিদেশের মাটিতে পা রেখেছিলাম অনেকদিন আগে । সেই নিয়ে আমার স্মৃতিচারণা আদরের ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে । 

৭ সেপ, ২০১৩

পর্বঃ রাজাবাজার


কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটির একলাফে ট্রানজিশান যেন একফোঁটা দস্যি ইলেকট্রনের গ্রাউন্ড লেভেল থেকে এক্সাইটেড স্টেটে ফার্স্ট ঝাঁপিয়ে পড়া । কত এনার্জি ওইটুকুনি ইলেকট্রনের ! চার্জড হয়ে তো আছেই সে ।
কো-এড বাতাবরণ । রঙীন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দ । হেদোর মোড়ে ফুচকা তদ্দিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে । বিধানসরণীর চাচার রোল তখন রাজাবাজারে ঊত্তীর্ণ ।
জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ততার বছর দুটো কেটেছিল রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে । বেথুন কলেজের রক্ষণশীলতার লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে সেই প্রথম কো-এড বাতাবরণে গা ভাসানো ।

সে ছিল বৃষ্টিভেজা শ্রাবণ সকাল । রাজাবাজারে ক্লাস শুরু হ'ল । রোজ সাড়ে দশটায় ক্লাস শুরু । দক্ষিণেশ্বর থেকে ব্রেকজার্নি । অধিকাংশ দিন শ্যামবাজারে নেমে লেডিস ট্রাম ১২ নম্বরে চড়ে বসতাম । তারপর সার্কুলার রোড ধরে ট্রাম আমাকে বয়ে নিয়ে পৌঁছে দিত সায়েন্স কলেজ । শুরু হ'ল প্রতিনিয়ত যাতায়াতের লড়াই । কিন্তু দুবছরে কোনোদিনো আমি ফার্স্ট ক্লাস মিস করিনি । যারা কাছে থাকত তারা বরং লেট করে পৌঁছাত । স্যার একদিন বলেছিলেন "একে দেখে শেখো, She is nearest to the God, farthest from the Church!"
থিয়োরি ক্লাসের পর লাঞ্চব্রেক । তারপর প্র্যাকটিকাল ক্লাস । রোজ সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ ক্লাস শেষ হত । তারপর অফিসের ভীড় ঠেলে বাড়ি ফেরা ।
কলেজে ক্লাস শুরুর ঠিক পরেপরেই চোখে নিদারুণ কনজাংটিভাইটিস সংক্রমণ হল । নতুন ক্লাস আর দ্বিতীয় কেউ নেই যে আমার পড়া বুঝিয়ে দেবে । ক্লাস-নোটসের ওপর ভিত্তি করেই পড়া আর পরীক্ষা দেওয়া । তাই শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি সেকেন্ড ইয়ারের দাদাদিদিদের "কোনো ক্লাস কামাই করবে না" । ইউনিভার্সিটিতে যারাই রক্ষক, তারাই ভক্ষক অতএব ক্লাসে যা পড়ানো হবে সেটা নিয়মিত ফলো করে গেলে আর তাকে ভিত্তি করে নিজে পাঁচটা জার্নাল আর ব‌ই ঘেঁটে নোটস বানিয়ে নিলেই ফার্স্টক্লাস অবধারিত । তাই নিদারুণ চক্ষুশূলেতেও বাসবদল করে আলমবাজার থেকে রাজাবাজারে গেছি ক্লাস করতে । ইউনিভার্সিটিতে প্রোমোশানের জন্য নতুন রোদচশমা চোখে সেদিন দুগ্গা দুগ্গা বলে কলেজে গেছি । ক্লাসরুমে ঢোকার মুখে আমার ক্লাসেরই একপাল ছেলে (তখনো আলাপ পরিচয় হয়নি তাদের সাথে ) তুমুল শব্দ করে উঠল । বুঝলাম যে আমাকে দেখে ওরা অমন করছে । চশমাটা কায়দা করে মাথায় তুলে তাদের দিকে চেয়ে বললাম " এই তো সবে ক্লাস শুরু হল, দুবছর তোদের সাথে ঘর করব কি করে! ক্লাসের বন্ধুকে তোরা আওয়াজ দিস বুঝি! বুঝতাম তোরা আমার সিনিয়ার তাহলেও নয় একটু আধটু raggingভেবে ক্ষমাঘেন্না করে দিতাম !"
সাথে সাথে আমার বন্ধুরা sorry বলেছিল । তারপর ওরা যে আমার কি ভালো এবং হেল্পফুল বন্ধু হয়ে উঠেছিল যে কি বলব ।
প্রতি শুক্রবার আমাদের থিয়োরি ক্লাস হত প্রেসিডেন্সি কলেজে । সেখান থেকে দল বেঁধে পায়ে হেঁটে ট্রাম রাস্তা, অলিগলি দিয়ে পার্সিবাগান লেন ও সব শেষে সায়েন্স কলেজে এসে প্র্যাকটিকাল ক্লাস করা । সেই ফাঁকে পরিচয় হল কফিহাউসের সাথে । ঐ দুটো বছর অনেক ভালো বন্ধু পেয়েছিলাম । কফিহাউস ছাড়াও সায়েন্স কলেজের ক্যান্টিন, সাহা ইনস্টিটিউট ও বোস ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিনে দুপুরের টিফিন খাওয়ার মজাটাই ছিল অন্য স্বাদের । ন্যাশানাল লাইব্রেরীতে পড়াশুনোও চলত সেই ফাঁকে ।

মনে পড়ে যায়...


দুপুরবেলার নিঝুম স্মৃতি, শান্ত পায়ে পথ চলা,
ক্লান্ত গায়ে কথা বলা রাজাবাজার কলেজ পারে,
ট্রামলাইনকে ক্রস করে, এপিসি রোড ছুঁতো শেষে
পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।

আমরা তখন স্নাতোকোত্তর, আমরা খোলা হাওয়া
স্বপ্ন নেশা চোখে মেখে, রঙীন হয়ে যাওয়া
খগেনদাদার চায়ের ঠেকে, ল্যাবের সেই কোণা
মিনিট পাঁচেক জিরেন, টেস্টটিউব হাতে নিয়ে...

সুলগ্নার বাসের প্রেমিক, কমলিকার দেখতে আসা,
সুদীপের স্বপ্ন দেখা,বিদেশ যাবার কত আশা !
অমৃতা আর সুমন জুটি, পাশাপাশি থাকত কেবল
গোপন প্রেমের কেমিস্ট্রিতে, গসিপ গিলি বন্ধু সকল..

সূয্যি ডোবে আঁধার নেমে আসে
কলিকাতা সাতলক্ষনয়, পার্শিবাগান লেনে ।
ফার্স্ট ইয়ারেই ভিসা পেল সুমন-অনীক-জয়দীপরা
হলনা কো অমৃতার সুমনের সাথে বাড়ি ফেরা..

র‌ইলো পথের ধূলোগুলো, উড়ে গেল কিছু
পার্শিবাগান চললে তুমি আমার পিছুপিছু
র‌ইলে নীরব প্রেমের তুমি , সাক্ষী হয়ে শুধু
রাজাবাজার, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।

আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ার, একশো কুড়ি জন
কফিহাউস, ব‌ইপাড়া, জটিল সমীকরণ ।
মাতাল হাওয়ায় উড়ে গেল, বুদবুদ উদ্বায়ী
হারিয়ে গেল ওরা যেন আজব পরিযায়ী ।

কফিহাউসের সাদা টেবিল লিনেনে
র‌ইল ছোঁয়া সাতাশি সালের ব্যাচ
র‌ইলে তুমি পড়ে পার্শিবাগান লেন
আর এপিসি রোড, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।

বিশুদ্ধ রসায়নের সিলেবাসের চাপে ঐ দুটো বছর কোথা দিয়ে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত হয়েছিল তা টের পাইনি । তখনো আমার সাহিত্যের ধারাপাত অধরা, অনবরত মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার টানাপোড়েনে ।
দিক্‌পাল সব কেমিষ্ট্রির অধ্যাপকের সান্নিধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যতের দিশা । একদিকে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স, অন্যদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এহেন আমি হাবুডুবু খেতে খেতে অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রিতে স্পেশালাইজ করলাম । ডাঃ অসীমা চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ জুলি ব্যানার্জি, ডাঃ অভিজিত্ ব্যানার্জি, প্রোফেসর তলাপাত্র, ডাঃ প্রিয়লাল মজুমদার, ডাঃ শিবদাস রায় এদের সাথে সর্বক্ষণের ওঠাবসা আমার জীবন রসায়নকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল । জৈব রসায়নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ন্যাচারাল প্রোডাক্টস নিয়ে পড়াশুনো করতে করতে আশ্চর্য্য হতে লাগলাম । সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে শুতে যাওয়া অবধি জৈব রসায়ন আমাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে এই কথা ভেবে । চায়ের মধ্যে ফ্ল্যাবোনয়েডস, তারপর প্রাতরাশের ফ্রুট প্ল্যাটার ভর্তি রঙীন সব এন্টি কার্সিনোজেনিক বিটা ক্যারোটিন ! পরণের সূতির কাপড়... সে ন্যাচারাল পলিমার ফাইবার, আবার সিন্থেটিক শাড়ি বা ড্রেস মেটিরিয়াল সে সিন্থেটিক পলিমার । এইভাবে অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি তখন আমার শয়নে, স্বপনে, জাগরণে । সিনথেটিক অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি আমাকে আবিষ্ট করে রাখত সে সময় । এন্টিবায়োটিক্স পড়াতেন প্রোফেসর কে এম বিশ্বাস । উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ছিলেন । ডাঃ শিবদাস রায় পড়াতেন হেটেরোসাইক্লিক কম্পাউন্ডস । ডাঃ প্রিয়লাল মজুমদার পড়াতেন নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স আর এরোমেটিক কম্পাউন্ডস । প্রতিটি ক্লাস ছিল ভীষণ উপভোগ্য । স্যারের সাথে আমার খুব দোস্তি হয়েছিল । বাবা চাকরী করতেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে । বাবাদের নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ হলেই সেই ওষুধের লিটারেচার নিয়ে স্যারের সাথে আলোচনায় বসতাম । স্যার শিখিয়েছিলেন ডক্টর কোনো ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেই ওষুধের কম্পোজিশান পড়ে নিতে । সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে আমার বাড়িতে । কাশির ওষুধ সেই যে বাড়িতে ব্যান করেছিলাম আজো তেমনি আছে । এফিড্রিন দেওয়া কাফ সিরাপ যে কত ক্ষতিকারক স্যার বোঝাতেন । এছাড়াও হলুদের কারকিউমিনের কত গুণ বা খয়েরের ক্যাটেচিন যে কতখানি ক্ষতিকারক সেগুলো জেনেছিলাম । সালফার ড্রাগে আমার চিরকাল এলার্জি । এন্টিবায়োটিক সালফার ফ্রি কিনা ডক্টর প্রেসক্রাইব করলে এখনো নেট ঘেঁটে দেখে নি । এভাবেই চলছিল আমার জৈব রাসায়নিক দোস্তি ।
সায়েন্স কলেজের শেষবছর অর্থাত ১৯৮৬ সালে আমরা চুটিয়ে দিল খেলেছিলাম সকলে মিলে । তখন বসন্তে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পাসপোর্ট যেন পাওয়া হয়েই যেত সরস্বতী পুজোতে । তারপরেই দোল । অতএব সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা পেয়ে গেছি । তাই সব কিছুতেই মায়ের সায় । দোলের আগের দিন ক্লাস শেষ হবার পর কলেজের মাঠে ছেলেমেয়ে একত্র হলাম । সাথে নানা রংয়ের আবীর এনে প্রথমে স্যারেদের ঘরে ঘরে ঢুকে পায়ে দিয়ে প্রণাম করে আসা হল । সেবার প্রচুর ফাগ খেলা হল একপাল ছেলে মেয়েতে মিলে । সেই প্রথম ছেলে বন্ধুদের সাথে দোল খেলে লালটুকটুকে হয়ে লজ্জায় সবুজ হয়ে মিনিবাসে বাড়ি ফেরা । তবুও আনন্দ আকাশে বাতাসে । কারণ মম যৌবন নিকুঞ্জে তখন পাখিডাকার শুরু হয়ে গেছে । মা বরং খুশিই হলেন । এই তো জগতের নিয়ম । প্রকৃতির গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে । আমগাছে মুকুল আসবে । বাদাম গাছের পাতা ঝরে গিয়ে লাল ফুল সর্বস্ব গাছ হবে এই তো বসন্তের নিয়ম ! মায়ের একরত্তি মেয়েটা কেমন বড়ো হয়ে গেল! কিন্তু পুরোটাই খুব সুন্দর ভাবে । শালীনতার মাত্রা অতিক্রম না করে । বছর দুয়েক আগে দোলের আগের দিন কোলকাতার এক নামী কলেজের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম । দেখলাম ছেলেগুলি মেয়েদের সিঁথিতে সিঁদুরে আবীর ঢেলে দিচ্ছে নিপুণ ভাবে তারপর সেই লাল টুকটুকে সিঁথিতে মেয়েটি ছেলেটিকে জাপটে ধরে মোটরসাইকেলে করে এক নিঃশ্বাসে অন্তর্হিত হল সেখান থেকে ।
এখন ফাগুনের ফুল ঝরতে না ঝরতেই চকোলেট-ডে, প্রোপোজ ডে, হাগ-ডে, কিসিং-ডে, ভ্যালেন্টাইনস-ডে পেরিয়ে দোল দে । দোলের আবীরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায় । দোলের রঙের গড়িয়ে পড়তে লাগল অর্কুট অলিন্দ দিয়ে । সেই রঙ গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে ।
এখন দোলের রঙের ওপরেও টেকশো ! রূপ সচেতন বঙ্গতনয়ারা স্কিনফ্রেন্ডলি রং চায় ! ইকোফ্রেন্ডলি আবীর, ভেষজ গুলালে ফ্যাশন ইন ! তাই ডিজিটাল দোল খেলো বাবা! নো হ্যাপা ! আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না, রং খেলবোনা !
ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে ! দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । দোলখেলার প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । এখন দোলখেলার বাতাস সোশ্যালনেটওয়ার্ক ময়তায় । ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলখেলা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই দোলখেলা । দোলের রং ঝরছে সর্বত্র । ফাগ উড়ছে অনাবিল আনন্দে ।
পড়াশোনোর চাপে আমাদের দোল ছিল প্রকৃত দোলের মতন । অন্যরকমের মাদকতা আর একটা বিশেষ ছুটির দিনে দোলকে দোলের মত করে পাওয়া ।
তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল ফোন অথবা হাজারো কেবল চ্যানেল । অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকি ! তবে মায়ের হাতে স্পেশ্যাল রান্না ছিল সেদিনের মুখ্য আকর্ষণ ।
বেথুন কলেজে যেমন দুই মহিলা চন্দ্রমুখী দেবী এবং কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর প্রথম স্নাতক হওয়ার শতবর্ষে আমি ছিলাম ঠিক তেমনি সায়েন্স কলেজে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদযাপনের সামিল হবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । ১৮৮৬ সাল থেকে ১৯৮৬ এই একশো বছরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কত নাম করা মানুষেরা কেমিষ্ট্রি পড়েছিলেন আর এহেন আমিও সেই ডিপার্টমেন্টের ১০০ বছরের একরত্তি ছাত্রী ! একসপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ও রাজাবাজারে সায়েন্স কলেজে কত সেমিনার, লেকচার, সিম্পোশিয়াম হয়েছিল তার ইয়ত্ত্বা নেই । আমি ছিলাম প্রথম দিনের রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ত্বে । তারপর শেষদিনের খাওয়াদাওয়া ও নাচাগানা । ল্যাবের মধ্যে বিশাল বিশাল বাক্স প্যাকিং । পাশেই হচ্ছে রান্নাবান্না । লুচি, মুর্গির মাংস সব প্যাকিংয়ের দায়িত্ত্বে আমরা । সবশেষে প্রত্যেকের জন্য কেসিদাসের রসোমালাইয়ের ছোট্ট হাঁড়ির ভার নিয়েছিলেন কেসি দাসের বাড়ির মেয়ে মল্লিকার ঠাকুমা । মল্লিকা আমার সহপাঠিনী । আমি গিয়ে হাসিমুখে ঠাকুমাকে একটি বিজ্ঞাপন দিতে অনুরোধ করেছিলাম । ঐ বাড়ির অনেকেই সায়েন্স কলেজের স্টুডেন্ট ছিলেন তাই এই কলেজের ভালোমন্দে ওনাদের একটু দুর্বলতা ছিল ।এই যজ্ঞির দুমাস আগে থেকে সারা কলকাতা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কোম্পানির থেকে বিজ্ঞাপন চেয়ে আনার দায়িত্ত্বও ছিল আমি সহ একটি টিমের । কোথায় পাস্তুর ল্যাব, কোথায় ক্যালকাটা কেমিক্যালস, কোথায় বেঙ্গল কেমিক্যালস, হিন্দুস্তান লিভার , রেকিট এন্ড ক্যোলম্যান ও নামীদামী ফার্মাসিউটিকালের অফিস থেকে শুরু করে কলেজ স্ট্রীটে ছোট বড় সব ল্যাব ইকুয়িপমেন্টসের অফিসে পায়ে হেঁটে হেঁটে, ট্রামে, বাসে দৌড়ে মরেছি আমরা পয়সার জন্যে । তবে সায়েন্স কলেজের নাম শুনে কেউ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করেনি সেটাই রক্ষে । আরো একটি কারণ হল এই সব কোম্পানিগুলোতে তখন সায়েন্স কলেজের পোষ্ট গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টরা চাকরীতেও জয়েন করতে যেত । তখন ছাত্রদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার ঢল এতটা নামেনি ।

কত বাদামী বিকেল পেয়েছিলাম আমরা । জন্মদিনের সন্ধ্যে হত সেখানে । পরীক্ষার ভালো ফলের পার্টি হত অথবা কারোর সফল কোর্টশিপ । সেদিনের কফির পেয়ালার বিকেল আজো রয়ে গেছে... একমুঠো রোদ ভর্তি সকাল গড়িয়ে নোট তৈরী হতে হতে বিকেলের চৌকাঠে পা দেওয়া ।
শিল্পীর ক্যানভাসেও ছিল সেই রঙ ! মেহগিনি টেবিলের ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ত সেই রং । কবিতার খোলাখাতায় টুপটাপ ঝরে পড়ত সাবলীল শব্দকণা সেই মেহগিনি টেবিলে । যার ওপরে ধূমায়িত কফিবিন্‌সের গুঁড়ো গুঁড়ো গন্ধ হাওয়া ভেসে বেড়াত অনবরত ।
আমার একভুবন আকাশ জুড়ে তখন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ আর কফিহাউসের আড্ডা ।
পেরেছ চিনতে বিকেল আমার?
একরাত স্বপ্ন নিয়ে, একসন্ধ্যে নেশা নিয়ে, একভর্তি হুল্লোড় নিয়ে
চেয়েছিলাম তোমায়, পেয়েওছিলাম তোমায়
রঙতুলির টানে সজীব হয়েছিল একরাশ চিন্তা-দৃশ্যপট !
আর সেই টেবিল ! সেই রাশিরাশি আড্ডা,
তুফানি তর্কের মুঠো মুঠো সংলাপ, যুক্তির খেল!
সেই সাদা নীলছোপ ধরা টেবিলক্লথ !
কত কাপ কফির উষ্ণতা !
কত ত্রিকিণমিতি, হাতে হাত ছুঁয়ে যাওয়া স্মৃতির পরিমিতি,
উপপাদ্যের ছেঁড়া পাতা, চিকেন কাটলেটের গন্ধ !
মনে পড়েছে তোমার ?
সেই পড়ন্ত বিকেলের ফুটপাথের ব‌ইপাড়া,
সেই আমাদের চলার সাক্ষী সব পুরোণো-নতুন ব‌ইয়েরা !
সেই রঙচটা, তার ছিঁড়ে দাঁড়িয়ে পড়া ট্রামেদের সারি।
কফির বাদামী গন্ধ কেড়ে নিয়েছিলে আমার থেকে,
নিয়ে গেছিলে সব রঙ তুমি ।
তবুও বেঁচে র‌য়ে গেলে সেই পুরোণো
রঙচটা ছাল ওঠা খোলসের শহরে..

সেই শ্রাবণের তুমি, ধরেছিলে বৃষ্টির রঙিন ছাতা,
কলেজবেঞ্চে থকে যাওয়া শীতের দুপুরে দিয়েছিলে
এককাপ ভর্তি অতিচেনা উষ্ণতা,
গ্রীষ্মের ল্যাব-পালানো চুপকথার গোপন দুপুর, আরো কত কি!

আমি আজও শুনতে পাই
সেই ভেঙে যাওয়া আড্ডা-বিকেলগুলোর কলকল শব্দ,
সেই ক্লান্ত একব্যাগ দুপুরের বয়ে চলার ফিসফিস
আর সেই টেবিলের চাদরের একটুকু ছোঁয়া লাগা কফির ধোঁয়ার ওম
সেই উর্দিপরা আমাদের আবদারের ক্লান্ত মানুষগুলো,
মাথার ওপরে পুরোনো গন্ধের পাখাদের বনবন শব্দকণারা
ঝরে পড়েছিল আমাদের কথাবৃষ্টির বর্ণমালার সাথে
মিশে গেছিল দুকূল ছাপানো কফির বাদামী গন্ধ নিয়ে..

আমি তখন ঊনিশ কুড়ির সাঁঝবেলা
তোমার আকাশ আমার আকাশকে
চিনিয়েছিল সেই বাদামী গন্ধ
আমি দাঁড়িয়ে র‌ইলাম সেই গন্ধ নিয়ে
সেই ওম নিয়ে, সেই রঙ নিয়ে


২ সেপ, ২০১৩

বেথুন জার্ণাল- পর্ব ৩

কলেজগেটের পাশে রোজ সকাল দশটা থেকে বিকেল সাতটা অবধি দাঁড়িয়ে থাকত মতিদা  ।

এ পাড়ার বিখ্যাত ফুচকাওয়ালা । তার ফুচকা যেমন বড়বড়, গোল্লা গোল্লা, ও মুচমুচে আর তেমনি সুস্বাদু তার যাবতীয় অনুপান। একদম ঠিকঠাক টক, ঝাল ও নুনের কম্বিনেশন । আমাদের অনেক গবেষণা হত সেই তেঁতুল জলের রসায়ন নিয়ে । বাড়িতে অনেক বকুনিও খেতাম রোজ রোজ ফুচকাখাওয়া নিয়ে । কিন্তু এক  মতিদা  মানুষটা আর দুই তার ফুচকার টানকে কিছুতেই এড়াতে পারতাম না ।  মতিদার ছিল একটাই শ্লোগান "ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো  মতিদাকা গুণ গাইও " "আমার ফুচকায় অসুখ করবে না । কলেজের ফিল্টারের জলে তৈরী এই তেঁতুলজল" । আমার দিদি তখন পড়ত অন্য কলেজে ।



দিদিকে বলতাম " একদিন তোকে  মতিদার ফুচকা খাওয়াব " তা সে আর হয়ে উঠত না । সেবার পয়লাবোশেখের ঠিক আগে মা নতুন জামাকাপড় কেনার টাকা দিলেন । আমরা দু'বোনে হাতিবাগান থেকে জামাকাপড় কিনে একটা চায়ের দোকানে এসে চা-জলখাবারের অর্ডার দিয়ে দেখি পার্সের সব টাকা শেষ। মাত্র একটা কয়েন পড়ে আছে । এদিকে প্রচন্ড খিদে পেয়েছে আর বাড়িও ফিরতে হবে । হাঁটা লাগালাম কলেজের দিকে| বাসে উঠব সে পয়সাও নেই কাছে । হাঁটতে হাঁটতে দুজনে পৌঁছলাম কলেজ অবধি । সেখানে  মতিদা  তখনো দাঁড়িয়ে । দিদিকে দেখামাত্রই  মতিদা  যথারীতি তার স্লোগান আওড়ালো "ইয়ে ফুচকা খাইয়ো তো  মতিদাকা গুণ গাইও "

 "আমার ফুচকায় অসুখ করবে না । কলেজের ফিল্টারের জলে তৈরী এই তেঁতুলজল"

 দিদিকে কথা দিয়েছিলাম একদিন ফুচকা খাওয়াব । মতিদা  শালপাতা ভাঁজ করে এগিয়ে দিল আমাদের সামনে ।

 আমি বললাম " না, মানে একটা কথা ছিল  মতিদা  ,"

 মতিদা  বলল " খাও খাও , কিচ্ছু হবে না "

 আমি বললাম " না না সে কথা নয় "

 মতিদা  বলল "মা বকবে ?” আমি বললাম " না না পয়সা ফুরিয়ে গেছে যে "

 মতিদা  বলল "কাল দিও, আগে তো খাও "

 আমি বললাম " বাড়িফেরার পয়সাও নেই "

 মতিদা  বলল " আমি দিচ্ছি, কাল দিও "

 আমরা পেট পুরে ফুচকা খেলাম । এত ভাল বোধ হয় আগেও লাগেনি কখনো । আরো যেন বড়বড়, গোল্লাগোল্লা, মুচমুচে ফুচকা ! আরো পার্ফেক্ট টক-ঝাল-নুনের কম্বিনেশন !

 দু'জনের বাসের ভাড়াও চেয়ে নিলাম  মতিদার কাছ থেকে ।



আমরা তখন বেথুন কলেজ, আমি তখন শাড়ি
কেমিষ্ট্রিল্যাব, লেকচার হল, আর মিনিবাসে বাড়ি ।।
কেমন যেন দিনগুলো সব হঠাত ফুরিয়ে এল
হেদোর ধারে ফুচকা-আচার সায়েন্স কলেজ গেল !!!

৩১ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-৩

-->


তারকেশ্বর পশ্চিমবাংলার শৈবতীর্থের অন্যতম তারকেশ্বর । হুগলীজেলার এই দেবভূমি হাওড়া স্টেশন থেকে মাত্র ৩৬ মাইল দূরে । আমার চলেছিলাম বর্ষণমুখর এক কাকভোরে । গাড়ি নিয়ে সোজা উত্তরে নিবেদিতা সেতু পেরিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে সিঙ্গুরের পর বাঁদিকে ঘুরতে হবে । তারপর স্টেট-হাইওয়ে ২ ধরে গেলেই পড়বে তারকেশ্বর । গাড়ি রাখবার চমতকার জায়গা আছে মন্দিরের বাইরে । চমত্কার রাস্তা । বহু মানুষ শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত রেলপথে যাতায়াত করে থাকেন । স্বনামখ্যাত স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গ আছেন এখানে যাঁর কলিযুগের নাম বাবা তারকনাথ । এবার আসি প্রতিষ্ঠাতার কথায় ।
তারকেশ্বর তীর্থস্থান থেকে প্রায় মাইল তিনেক দক্ষিণ-পূর্বে কানানদীর তীরে রামনগর গ্রাম । সেখানে রাও ভারামল্ল নামে এক রাজপুত রাজা রাজত্ব করতেন । রামনগরের স্থানীয় অধিবাসীদের উপর জোর জবরদস্তি করে রাজস্ব আদায় সহ নানাবিধ অত্যাচার শুরু করলেন । রামনগরের নিকটবর্তী গ্রাম বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল । তারা মুর্শিদাবাদের নবাবকে সেকথা জানালে নবাব রাজারূপী ঐ দস্যুগণকে মুর্শিদাবাদে বন্দী করে পাঠাতে বললেন । এদিকে রাজা ভারামল্ল ও তার ভাই বিষ্ণুদাসকে দেখে নবাব বুঝলেন এরা কেবলমাত্র ভিনদেশী দুই রাজপুত । যাদের ব্যবহার অত্যন্ত ভালো এবং যারা ব্যবসার কারণে বাংলায় থিতু হয়েছে। নবাব তাদের রামনগরে থাকতে আদেশ দিলেন ।
রাজা ভারমল্লের একটি গোশালা ছিল । কপিলা নামে একটি হৃষ্টপুষ্ট গোরু সেখানে প্রচুর দুধ দিত । একদিন হঠাত দেখা গেল রাজার দুধ কমে গেছে । গোরক্ষকের ওপর ভার পড়ল সেই রহস্য উদঘাটন করার জন্য । সে গিয়ে দেখতে পেল জঙ্গলের অনেক গরুর মধ্যে কেবলমাত্র কপিলা একটি চকচকে পাথরের মধ্যে খোদিত একটি গর্তে স্তন রেখে সেখানেই দুধ দিচ্ছে । রাজাকে জঙ্গলের মধ্যে এনে সেই দৃশ্য দেখালেন গোরক্ষক । আশপাশের গ্রামের মানুষ দেখতে লাগল সেই দৃশ্য । তারা জানালো সেই পাথরটির ওপর বহুদিন ধরে তারা ধান ঝাড়ে কিন্তু এরূপ দৃশ্য তারা কখনো দেখে নি । আর এই পাথরটি হল সেই স্বয়ংভূ লিঙ্গ যিনি তারকনাথ রূপে পূজিত হন ।

শ্রাবণ মাসে প্রচন্ড ভীড় হয় তাই শ্রাবণ মাস পড়ার আগেইভাগেই ভোর ভোর আমরা পৌঁছেছিলাম আর পুজো দিয়ে নিয়েছিলাম । আছে সেই বিখ্যাত দুধপুকুর যেখান থেকে জল নিয়ে বাবার পুজোসামগ্রী কিনে পুজো করার ব্যবস্থা আছে । কথায় বলে দুধপুকুরে স্নান করলে সর্ব ব্যাধি বিনাশ হয় ।   তারকনাথের সেবার জন্য বাবার গদিতে দানের সুবন্দোবস্ত আছে । রসিদের বিনিময়ে দান গ্রহণ করা হয় সেখানে । জলযোগ ও দুপুরের খাওয়ার ভালো হোটেল ও আছে আর আছে কাশী বিশ্বনাথের মত অজস্র অলিগলি ও সেখানে দন্ডায়মান ষাঁড় । মোটের ওপর বাড়ির কাছাকাছি বেশ ভালো তীর্থস্থান এই তারকেশ্বর ।

২৬ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-২

ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার 
সম্প্রতি  আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি  sms poll এ দেখছিলাম জানতে চাওয়া হয়েছে "বাংলা কি বেকার ভাষা?" এই উক্তির পক্ষ একেবারেই না নিয়ে বলতে চাই বাংলা আজ বেকার ভাষা হলে সেই ভাষাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের রুজিরোজগার এবং তাও আবার ঐ পত্রিকাকে ঘিরে । এমন জনপ্রিয় একটি সংবাদপত্রের ট্যাগলাইন হোল "পড়তে হয় নয়ত পিছিয়ে পড়তে হয়" ।  এই দৈনিক পত্রিকাটি বাংলাভাষায় বলেই হয়ত এতটা জনপ্রিয় এবং তার সুষ্ঠু সম্পাদনাকে ঘিরে আজ কোলকাতা সহ পশ্চিমবাংলার অনেক মানুষই সাকার ।  তাই বুঝি সুদীর্ঘ ৯০টা বছর পার করেও তার পাঠককুল সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন । আবার নয় নয় করে তার পাঠক সংখ্যা ৯লাখে পৌঁছায় । 
 তবুও অবাক হ‌ই যখন বাংলাকে 'বেকার ভাষা' বলে ভোট নিতে চান দেখে । হয়ত বা আমার ভুল এই ভাষাকে কেন্দ্র করে এই বেকারত্বকে ঘিরে । কিম্বা হয়ত পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাভাষার গুরুত্ব যাচাই করার জন্য এই ভোট । সে যাই হোক কিছুদিনের মধ্যেই দেখি সেই ভোটের ফল প্রকাশিত । আকাশতলে অনিলে জলে, দিকে দিগন্তলে ৮৮ শতাংশ মানুষ এই বাংলাভাষাকে ভালোবেসে "ভালোভাষা" বলে জানিয়েছেন । 
এই ভোটাভুটির মাঝামাঝি কোলকাতায় আয়োজিত হল এক আলোচনাচক্র । ইন্টারনেটে বাংলাভাষার প্রসার, প্রচারকে ঘিরে নেটসাহিত্যের অগণিত পাঠক, লেখক ও সম্পাদকদের আনুকুল্যে । যার নাম "ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার"  । বাংলাভাষায় সাহিত্য রচনা করতে ভালোবাসেন অনেকেই । এবং এই ভাষাকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয় অনেক অনেক ই-পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিন ।   আর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির রমরমায় বাঙালীর ঘরে ঘরে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের অধিক্যে সেই সাহিত্য এখন এককথায় হাতের মুঠোয় ।  তাই এরূপ একটি সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা এই মূহুর্তে খুব জরুরী ছিল । সৃষ্টি, ইচ্ছামতী এবং ও-কোলকাতা এই তিনটি ওয়েব পত্রিকা এবং ব্লগজিনের  আতিথেয়তায় আমিও হাজির ছিলাম গত ১২ই অগাস্ট ২০১৩ বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাঘরের ঐ আলোচনাচক্রে । 
  


ব্লগ লেখা শুরু করি ২০০৮ এর গোড়ার দিকে । ততদিনে বাংলা লেখার সফটওয়ার ও ইউনিকোডের জয়জয়াকার । এরপর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও ব্লগার বন্ধুদের সাথে ঘনিষ্ঠতায় ব্লগের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে । সোনারতরী ছিল আমার নিজের ব্লগ ।
অর্কুটময় দুনিয়ায় তখন বন্ধুদের সাহিত্যরস উপচে পড়ছে দেখে ভাবতাম এগুলি আমার ব্লগে একত্রে রাখলে তো মন্দ হয়না ।
কবি তো বলেইছেন "সেই সত্য যা রচিবে তুমি' ....সেই ভাবনা নিয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধুকে বাংলা লেখা শিখিয়েও ফেলেছিলাম অনলাইন । কিন্তু ব্লগ খুলতে তারা নারাজ অথচ নিজের লেখা নেট-সাহিত্যে দেখতে খুব উদগ্রীব । সেই ভাবনা নিয়ে সোনারতরী থেকে প্রথম আত্মপ্রকাশ হয় "অর্কুট আগমনী পাঁচালী' ।
সেটাই ব্লগ থেকে আমার সম্পাদনায় ওয়েবম্যাগের জন্মলগ্ন, ২০১০ সালে পুজোতে । জনপ্রিয়তা দেখে ২০১১ তে "দোলছুট" ও ১লা বৈশাখে "পয়লা সাহিত্য পার্বণ" প্রকাশিত হল ।
তখুনি মেটামরফোসিস। ছিল রুমাল, হল বেড়াল । সোনারতরী র‌ইল আমার লেখার জন্য কিন্তু প্যাপিরাসের জন্ম হল ২০১১ পুজোতে । এইভাবে ব্লগ-বৈতরণী পার হতে গিয়ে কত লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হল প্যাপিরাস । পরিচিতি বাড়তে থাকল ।
গুণমানের উত্কর্ষতার কথা চিন্তা করে বছরে দুটি উত্সব সংখ্যা বের করি আমরা । পুজোসংখ্যাটি একটু বিস্তারিত হয়, একগুচ্ছ গল্প, কবিতার নোটবুক , ভ্রমণকাহিনী, নিবন্ধ ও হোমমেকারের হেঁশেলের রেসিপি দিয়ে । আর ২০১২ থেকে শুরু হল একটি আলোচনাচক্র বা ফোরাম যার নাম "চক্রবৈঠক"। সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয়ের ওপর মতামত সংগ্রহ করে সেটিকে প্যাপিরাসের পাতায় উপস্থাপিত করা হয় । ধারাবাহিক স্মৃতিচারণা থাকে একটি বিভাগে, যে পাতাটির নাম 'স্মৃতিকণা'   । 'ধরণীর পথে পথে নামে' ভ্রমণের পাতা থাকে একটি । কখনো অণুগল্প থাকে ডজন খানেক অথবা নির্দ্দিষ্ট থিমে ছোটগল্প স্থান পায় । 


 আমাদের ওয়েবম্যাগাজিনের ঠিকানা হল papyrus.sonartoree.com
 
আপনারা পড়ুন ও পড়ান সকলকে আর আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় র‌ইলাম । 
চোখ রাখুন আমার প্রেজেনটেশানে :
http://yweb2.blogspot.com 


১৬ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা- পর্ব ১

অলীক সুখ 
শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটির হ্যাট্রিক ! দেখেছি এদের আগের ছবিদুটিঃ ইচ্ছে ও মুক্তধারা । খুব বাস্তববাদী কাজ করেন এরা । আর নতুন রকমেরো ।  আমার পছন্দের লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাহিনী। পছন্দের অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদারকে নায়করূপে প্রথম দেখা। আর সোহিনীকে নতুন করে কিছু বলার নেই । চন্দ্রবিন্দুর অনিন্দ্যকে আরো একবার Hats off! দারুন লিরিকস আর দারুন সুর। আর জয় সরকারের অনবদ্য সঙ্গীত আয়োজন ।পুরোটাই পাওয়ার সুখ না হলেও অনেকটাই সুখের ।  
দেবশঙ্কর হালদার (ছবিতে ডাঃ কিংশুক গুহ)  তাঁর বিয়ের তারিখে নিজের "সুখ"/ইচ্ছাপূরণের জন্য  একমাত্র বৌকে উপহার দিলেন কোলকাতার বুকে এক স্বপ্ন-বাড়ি যার নাম ফ্ল্যাট । আর সেই সুখ পূরণ করতে গিয়ে কেড়ে নিলেন সোহিনীর জীবন । সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়ে সোহিনীর প্রেতাত্মা কুরে কুরে খেতে লাগল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ( রম্যাণি, ডাক্তারবাবুর স্ত্রী )কে । সেও সন্তান সম্ভবা হল কিন্তু তার যখন মিসক্যারেজ হল তখন ডাক্তারবাবু বুঝতে পারলেন সেই "সুখ" পূরণের কি মাহাত্ম্য । তার আগে নয় ।
তবে কোলকাতার ডাক্তারবাবুদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নপূরণের ইচ্ছা আর ডাক্তারী পাশ করে শপথ গ্রহণের মূহুর্তটা একতু প্রকট করে দেখালে আরো ভালো লাগত । আজ কোলকাতার সরকারী-বেসরকারী সব হাসপাতাল/নার্সিংহোমের কি অবস্থা তা আমরা খুব ভালো করেই জানি । খবরের কাগজে প্রতিনিয়তঃ দেখতে পাই, টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পাই নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের সুচিকিত্সা বা যথাসময়ে করণীয় চিকিত্সার অভাবে মৃত্যু কিন্তু উচ্চমধ্যবিত্তরাও সমান ভাবে ভুক্তভোগী । এত সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল হচ্ছে কিন্তু ডাক্তারবাবুরা কি ঠিকমত কর্তব্য পালন করছেন? কেন আমরা কোলকাতার মানুষেরা এই মেট্রো সিটি  ছেড়ে অন্যত্র যাব আর কেনই বা ডাক্তারবাবুরা আরো সহৃদয় হবেননা এ শহরের মানুষদের জন্য ?  এই শূণ্যস্থানগুলি নন্দিতা-শিবপ্রসাদরা আরো একটু প্রকট করে তুললে ভালো হত বোধহয় । 
আর মাঝেমাঝে দেবশঙ্করের অতি নাটকীয় চিত্কার বড্ড প্রকট লেগেছে । উনি নাট্যমঞ্চের ব্যাক্তিত্ত্ব বলে বোধহয় তেমনটি হয়েছে । কিন্তু সব মিলিয়ে বাংলাছবির বাজারে বেশ নাম করবে বলে মনে হল । 

সব মিলিয়ে রোবাবরের বিকেল + প্রিয়া সিনেমা + অলীক সুখ = টোট্যালি পয়সা উশুল ছবি । সাথে বোনাস হল বিশ্বনাথ + নন্দিতা + শিবপ্রসাদের সাথে প্রিয়ার সিঁড়িতে করমর্দন !!!
এই হল কলকাতার মানুষজনের অলীক সুখ । বাঙালী বেশ আছি আমরা বেঁচে বরতে ...কি বল ? বাইরে বেরিয়ে দেখি একজন ব্যাগ ভর্তি আচার নিয়ে চেঁচাচ্ছে " ও মা একটা প্যাকেট আচার নিয়েই দেখুন না ! ওদিকে ন্যানোর কারখানা হলে সে সিঙ্গুরে গিয়ে সেই আচারের ব্যাগ পুরোটাই হয়ত বিক্রি করে আসতে পারত । অন্যথায় যারা আচার তৈরী করা শেখালো তারা সেই আচারের বিশ্বব্যাপী মার্কেটিং করে আজ ক্রোড়পতি। আজ তারাই এই শহরটাকে গ্রাস করে ফেলল । তাই তো ন্যানো ওদের দেশে ।আমাদের অলীকসুখ আছে বাবা। আমরা এই নিয়ে দিব্য আছি বেঁচে । আমাদেরই বা সুখ কম কিসের?

৮ আগ, ২০১৩

খোলাচিঠি রবিঠাকুরকে....

রবিঠাকুর
তুমি না কি স্কুল পালিয়ে ছবির খাতায় আঁকো  ?
গোল্লাছুটের দুপুরগুলোয় কাব্যি করে লেখো?
রবিঠাকুর তোমার নাকি  খুনসুটির এই ভোর
গান লিখতে  সিঁড়ি ভেঙে চিলেকোঠার দোর ।
রবিঠাকুর তুমি চেনো মেঘের কোলে রোদ ?
জীবনভর তোমার দেনা কেমনে করি শোধ ? 
ছোট্টবেলায় মা চেনালো রবিকবির আলো
সেইতো আমার হাতেখড়ি গান-বিকেলের ভালো ।
রবিঠাকুর তোমায় যদি সেলফোনেতে পেতাম
এসেমেসের বৃষ্টি ফোঁটা উজাড় করে দিতাম ।
রবিঠাকুর জানো তুমি মাল্টিপ্লেক্সের ঢল্‌ ?
তোমার গল্প-গানছবিতে মাতাল শপিংমল ।
রবিঠাকুর দেখবে তুমি ফ্লাইওভারের ধারে
হোর্ডিং ওলা রঙিন ছবি শিল্পী সারেসারে ।
দেড়শো তোমার পূর্ণ হ'ল পুজোয় মাতে লোক
প্রভাতফেরী গানের ভেরী দেড়শো মানার ঝোঁক ।
রবিকবি তুমি না কি ফেসবুকেতে আছো?
স্টেটাসে তে কাব্যি ঝরাও মনের সুখে বাঁচো ।
রবীন্দ্রনাথ আছো তুমি যন্ত্রজালে বন্দী
ট্যুইট দেখি মাঝেসাঝে বুঝি নাকি ফন্দী ?
রবিঠাকুর রবিঠাকুর খোলা খেরোখাতা
ছিটেফোঁটা দাওনা লিখে মনের দুটো কথা ।

৩০ জুল, ২০১৩

ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার

বন্ধু
আগামী ১২ই আগস্ট,  ২০১৩ সন্ধ্যে ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাঘরে সকল সাহিত্যপ্রেমী এবং লেখক-পাঠককে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ জানাই ।  বাংলাভাষায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি ওয়েব ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ইতিমধ্যে । এক আকাশের নীচে সেই ওয়েবম্যাগাজিনের সম্পাদক মন্ডলী এবং গুণিজনের ভীড়ে, বন্ধু আপনার উপস্থিতি একান্ত কাম্য । 
সাথে র‌ইল আমন্ত্রণের ই-পত্র ।  


২৩ জুল, ২০১৩

বেথুন জার্নাল (২)


আমার বেথুন কলেজ নিয়ে সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হল ফড়িয়াপুকুরের টাউন স্কুলের পাশে স্যারের বাড়িতে সপ্তাহে একদিন করে পড়তে যাওয়াকে ঘিরে । আমরা বেথুনের সাত-আটজন প্রতি শনিবার কলেজ ছুটির পর হাঁটতে হাঁটতে হেদো থেকে বিধান সরণী হয়ে পৌঁছাতাম টাউন স্কুলের সামনে । আমাদের পথ-গল্পের মুচমুচে গসিপ আর রূপবাণী সিনেমা হলের উল্টোদিকের ভুজিয়াওয়ালার কুড়মুড়ে সাড়ে বত্রিশভাজা চলত মুঠো থেকে মুঠোর পরে । অনার্সের পড়ার চাপে আর কলেজ যাতায়াতের ক্লান্তি যেন শনিবারের নিয়মিত পথচলায় এক দমকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আনত । আমাদের স্যার মানে প্রোফেসার বিবেক চ্যাটার্জি তখন জয়পুরিয়া কলেজের কেমিষ্ট্রির অধ্যাপক । নিঃসন্তান বিবেকবাবু ও ওনার স্ত্রী (আমাদের কাকীমা) যেন আমাদের সকলের পরিবারের দু'জন হয়ে উঠেছিলেন । জীবনের ভালোলাগা, মন্দলাগা, সাহিত্যচর্চা থেকে সিনেমা রিভিউ, পিকনিক যাওয়া থেকে হর্টিকালচারে সদলবলে ফ্লাওয়ার শো সবকিছুর সঙ্গী ছিলেন এই দুজন মানুষ । আমরা পড়তে যেতাম ইনর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি বা বাংলায় যাকে বলে অজৈব রসায়ন । স্যারের ঐটি স্পেশ্যালাইজেশান । কলেজের সবচেয়ে বোরিং ক্লাসগুলো বিবেকস্যারের কৃপায় যেন সবথেকে ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠত । ওই বিষয়গুলো পড়তে ইচ্চে করত না যতক্সণ না স্যার বুঝিয়ে দিতেন গল্পের মত করে আর কোথা থেকে কতটুকুনি পড়তে হবে বলে দিতেন । বিশাল সিলেবাসের মধ্যে স্যারের পরামর্শ পেলে পড়তে আনন্দ হত । স্যার বলতেন " যে খাতা বা নিজের তৈরী করা নোটটা থেকে পড়তে শুরু করবে সেই নোটটাই পরীক্ষার শেষ দিন অবধি দেখে যাবে তবে মনে গেঁথে থাকবে ।
আমরা দলবেঁধে গল্প করতে করতে যেতাম স্যারের বাড়ি । কোনো কোনো দিন যেতে যেতে খিদে পেয়ে যেত খুব । টাউন স্কুলের নীচেই একটা মাদ্রাজী দোকানে অথেন্টিক দোসা পাওয়া যেত । দোসা খেতাম হৈ হৈ করে । তারপর শ্যামপুকুর স্ট্রীট দিয়ে স্যারের বাড়ি পৌঁছে আবার কাকীমর হাতের আচার অথবা পড়ানোর ব্রেকে স্যারের আনানো কচুরী-আলুরদম । বৃষ্টি পড়লেই আমাদের বরাদ্দ ছিল মোড়ের মাথার বিখ্যাত একটা দোকানের তেলেভাজা-মুড়ি । সেদিন আর পড়া হত না । ভূতের গল্প শুনতে বসতাম । কাকীমাও যোগ দিতেন আমাদের আসরে । এইভাবে চলত আমাদের কেমিষ্ট্রি টিউশান আর ফাঁকে ফাঁকে আমাদের অনাবিল আনন্দের মূহুর্তেরা ।
ইনর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রির বোরিং লেকচারগুলো অনায়াস মনসিঁড়ি বেয়ে গেঁথে যেত মাথায় । বিবেকস্যারের অপত্যস্নেহে আর বৈচিত্রে সেই বোরিং লেকচারগুলো যেন ভালোলাগায় পরিণত হত । একটু পড়া একটু গান অথবা একটু খাওয়াদাওয়ার অনুষঙ্গ যে রেগুলার পড়াশোনায় কতটা জরুরী সেটা উপলব্ধি করেছিলাম কলেজে পড়াকালীন ।
১৯৮৫ এ ইন্দিরা গান্ধী যখন নিহত হলেন সারা কলকাতা জুড়ে কি অবস্থা । পথরোখো, বাস বন্ধ । আমাদের ফিজিক্স প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা ছিল । মনে আছে বাস টবিন রোড অবধি গিয়ে বলল আর যাবেনা । পরীক্ষা দিতে হবে বলে পায়ে হেঁটে টবিন রোড থেকে বিডন স্ট্রীট পৌঁছেছিলাম । ফেরার সময় শিয়ালদহ অবধি হেঁটে তারপর লোকাল ট্রেনে দক্ষিণেশ্বর ফিরে মনে হয়েছিল রাজ্য জয় করেছি । মনে মনে একদিকে যেমন পায়ে ব্যথার জন্য এ শহরকে কটাক্ষ করেছি আবার বাসের বিকল্প ট্রেনের সান্নিধ্যে এসে মনে হয়েছিল কি সুন্দর এই শহরের যাতায়াতের নেটওয়ার্ক ।
আরেকবার ৫ই জুন ১৯৮৪ । কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট ওয়ান শুরু । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরীক্ষা । সংস্কৃত কলেজে সিট পড়েছিল আমাদের । ৪ঠা জুন থেকে অবিরাম বর্ষণে শহর কলকাতা বিপর্যস্ত । আমাদের মফঃস্বলও জলমগ্ন ।
সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরুলাম । একটি ৩২ নম্বর বাস শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড়ে নামিয়ে দিল । বিধানসরণীতে হাঁটু জল । সেন্ট্রাল এভিনিউ আর সার্কুলার রোডও তথৈবচ । একটি টানা রিক্সা ৫০টাকায় কলেজ স্ট্রীট পোঁছে দিতে রাজী হল । বাবার সাথে রিক্সায় চড়ে বসলাম । রিক্সার পাদানীতে থৈ থৈ জল । তখন না আছে সেলফোন না আছে ইন্টারনেট । এমন বন্যা কবলিত হয়ে আশা করেছিলাম অন্তত সংবাদের মাধ্যমে পরীক্ষা বন্ধের আদেশ দেবেন কর্তৃপক্ষ । কিন্তু সেখানে পৌঁছে অগণিত ছাত্রছাত্রী পরিবেষ্টিত আমি... কিছুটা ধিক্কার দিয়েছিলাম এ শহরকে । দশটা থেকে বারোটা বেজে গেল কিন্তু কোনো খবর এলনা । প্রশ্নপত্র পৌঁছায়নি তখনো আর আমরা ব্‌ইপত্র উল্টে চলেছি । বারাসাত, বসিরহাট থেকে যারা এসেছে তারা তখন ফিরে যাবার তোড়জোড় করছে । অশনি সঙ্কেতের মত প্রশ্নপত্র হাজির হল । বলা হল বেলা দুটোয় পরীক্ষা শুরু হবে । আমরা সেই না খাওয়া দাওয়া স্টেজে ম্লান মুখে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে দেখি কোনো বিজলীবাতি নেই । অতিবৃষ্টিতে ইলেকট্রিক কেবল জলের নীচে । মোমের আলোয় জীবনের প্রথম এবং কঠিন অনার্সের পরীক্ষা দিতে দিতে সোজা প্রশ্নের উত্তর গুলোও মনে পড়ছিলনা ঠিকঠাক । এভাবে চার ঘন্টা পার করে বাইরে এলাম । বাড়ি ফেরা হল আমার সেই বন্ধু মল্লিকার গাড়িতে ; ফিরে এসে দূরাদর্শনের সংবাদে ঘোষণা হল সেদিনের পরীক্ষা বাতিলের কথা । এত কাঠখড় পোড়ানো সেই পরীক্ষা বাতিলের খবরে খুব রাগ হয়েছিল এ শহরের ওপর আর পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের ওপর । এমন নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় ! তার কি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ! আমারো তখন ভোটাধিকারের বয়স । আমিও তো এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এক জনমত । কিন্তু এ কি হাল আমার শহরের !
কলকাতার নামকরা মিষ্টি কেসিদাসের বাড়ির মেয়ে মল্লিকার বাড়িতে আমাদের ছিল নিত্যি আনাগোনা । বাগবাজারের নবীন ময়রার বিখ্যাত সেই বাড়িটা ছিল আমাদের নিজের বাড়ির মত । কতবার যে ওর সাথে আমরা ঐ বাড়িতে গেছি তার ঠিক নেই । মল্লিকা খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল । ও বেশি কথা বলত না কিন্তু বলত তোরা বলে যা আমি শুনে মন্তব্য করব । কলেজ ছুটি থাকলে মল্লিকার সাথে আমার চলত পত্র বিনিময় । আমার লেখার ভীষণ ভক্ত ছিল সে । আমাকে সমানে মল্লিকা বলত "তুই কিন্তু লেখাটা চালিয়ে যা" আমি কোনো গুরুত্ব দিতামনা । মল্লিকার বাবা-মায়ের ২৫ বছরের বিয়ের তারিখে আমাকে কবিতা লিখতে বলেছিল । কুড়িবছরের সেই আমি ছাই তখন বিয়ের কি বুঝি !
যাইহোক লিখে ফেললাম একখানা। সেটা আবার ছাপিয়ে অতিথিদের হাতে হাতে বিলি করা হয়েছিল । আমার কাছে সেটা বিশেষ পাওনা । ওদের বাড়িতে যাওয়া মানেই এক থালা নানা রকম মিষ্টি ও নোনতা সহযোগে জলযোগ । কলেজজীবনের আনন্দটা আরেক কাঠি বেড়ে যেত সেই আতিথেয়তায় । তারপর মল্লিকা বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে মাস্টারস করল বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে আর আমি গেলাম পিওর কেমিস্ট্রি পড়তে রাজাবাজারে ।

১৬ জুল, ২০১৩

বেথুন-জার্নাল -১

-->

আমরা একপাল মেয়ে জড়ো হয়েছিলাম ১৯৮২ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাসের পর কোলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী মেয়েদের রক্ষণশীল কলেজে । সকলের মধ্যে দুটি বিষয় অন্ততঃপক্ষে কমন ছিল । এক হল সকলের কেমিস্ট্রি অনার্স আর দুই সকলেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেশ কনফিডেন্ট পড়াশুনোর ব্যাপারে । আমাদের অনেকের আবার আরো একটা জিনিস কমন ছিল সেটা হল কেমিস্ট্রি অনার্সের সাথে ম্যাথস আর ফিজিক্স । 
 

সেই ছাব্বিশ নম্বর ঘরটা ! কাঁচের সার্শি সরিয়ে, পুরোণো গন্ধ বুকে নিয়ে, খড়খড়ির দরজা ঠেলে অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিলাম হুড়মুড় করে । কিছুটা উচ্চাশা নিয়ে আর কিছুটা দুরুদুরু বুকে । ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই পচাডিমের হাইড্রোজেন সালফাইডের সেই চেনা উচ্চমাধ্যমিক গন্ধটা অবশ করে দিল সুষুম্না স্নায়ুগুলোকে ।

ব্যাক্তিত্ত্বময়ী জ্যোত্স্নাদি এসেছিলেন । অনেকটা সেই মূর্তিমতী করুণায় শ্রদ্ধা উপছে উঠেছিল । তারপর রেডক্স ইক্যুয়েশান ব্যালেন্সিংয়ের দাপটে কেমন যেন সব ওলটপালট ! আবার হাতীবাগানের ড্রেসের ঝুলে সব যেন উথালপাথাল... কিছুটা অনাস্বাদিত মুক্তির আস্বাদে, কিছুটা শেষ ঊণিশ-কুড়ির ভালোলাগায়, ফুচকার তেঁতুলগোলা জলে ...

কিন্তু মনের মধ্যে একটু আধটু খচখচানি সেই ছাব্বিশ নম্বরের । আমি অ-পাঙক্তেয় ন‌ই তো সেখানে ? আমার জীবন রসায়নের সাথে রসায়নের দোস্তি সত্যি হবে তো?
বরানগর থেকে প্রথম একা বেরুলাম বেথুন কলেজে ভর্তি হয়ে । বাবা কলেজে ভর্তি করে চেনালেন পথঘাট, দোকানপাট । ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর । ১৭ বছরের আমি । মফস্বলী শহর আলমবাজার থেকে নিয়মিত শুরু হল আমার কলকাতা অভিযান । ছোটবেলায় শ্যামবাজার যেতে হবে শুনলেই বাবা বলতেন "কোলকাতা" যেতে হবে । আমি ভাবতাম অনেক দূর বুঝি! কোলকাতা যাওয়া মনেই এটা ওটা সেটা । শ্যামবাজার থেকে ড্রাই ফ্রুটস, ফড়িয়াপুকুরের অর্ফ্যানের চা পাতা, অমৃত'র লাল দৈ, জলোযোগের প্যাটিস আরো কত বলব ! ঠাকুমার জাফরাণী জর্দা, ঘোষকাজিনে চোখ দেখিয়ে চশমা করতে দেওয়া কিম্বা কুমার্স কনসার্ণ থেকে আঁকার স্কুলের রঙ-তুলি ! বাবা চেনাতেন পথঘাট । পাঁচমাথার মোড়ে পাঁচটা বড় রাস্তা কোন্‌টির কি নাম ও তারা সব শেষে কোথায় গিয়ে পড়েছে । পঞ্চমুন্ডির আসনে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে নেতাজী সুভাষের ইতিবৃত্ত ! কিছুটা অজানা আনন্দ আর সাথে কিছুটা অচেনা ভয় নিয়ে শুরু হল কলেজ জীবন । এতদিন ছিল মা-বাবার হাত ধরে শখের বাজার । এখন সেটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হল ।
কলেজ কেটে রূপবাণী সিনেমায় দু একবার সিনেমা ও হাতীবাগানের স্টার থিয়েটারে মায়ের সাথে সুপ্রিয়া দেবীর "বালুচরী" দেখেছি । ফেরার পথে সিলভার ভ্যালী রেস্তোরাঁয় কবিরাজী কাটলেট ভুলতে পারিনি এখনো । হাতীবাগানে একটা পেন সারানোর দোকান ছিল । নাম "পেন কেবিন্" । আমরা ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতাম । তাই ভালো মন্দ নানা পেনের নিব বদলানো লেগেই থাকত । এখনকার মত "ইউস এন্ড থ্রো" এর বাতাবরণ ছিলনা । কলেজ বান্ধবী মল্লিকা তখন টেনে নিয়ে যেত ওর বাড়ি । রসোগোল্লা আবিষ্কারক নবীন চন্দ্র দাসের বাগবাজারের বাড়িতে । বহুবার গেছি আর কে সি দাসের লোভনীয় সব মিষ্টিতে উদরপূর্তি করে বাড়ি ফিরেছি । কি আতিথেয়তা তাঁদের !
বিবেকানন্দের সিমলে স্ট্রীটের পাশে বিডন স্ট্রীটের ওপর জন ডিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের কলেজে।উল্টোদিকে হেদুয়ার সরোবর আর স্কটিশচার্চ কলেজ । বৈকুন্ঠ বুক হাউসে অনার্সের প্রথম ব‌ইট‌ই কেনা ; কলেজ ফেরত স্বাস্থ্যকর সুখাদ্যের হ্যাবিট ধরানোর জন্য সিমলেপাড়ার বিখ্যাত আইসক্রিম সন্দেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন অভিভাবক । দক্ষিণেশ্বর-বাবুঘাট, মিনিবাস রুট নং ১৫৮ তে চড়ে রোজ কলেজ যেতাম । কোনোদিন আবার আড়িয়াদহ-বাবুঘাট, মিনিবাস রুট নাম্বার ১৮১তে চড়ে শ্যামবাজারে নেমে বিধান সরণীর ট্রামে করে । বিধান সরণীর নাম ছিল একসময় কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট । তখন আলমবাজার থেকে বিডন স্ট্রীট যেতে মিনিবাসে লাগত ১টাকা ৫ পয়সা । সেই ৫ পয়সা আজ অবলুপ্ত আর মিনিবাসের সেই চেহারাও বদলেছে । প্রায়শ‌ই বাসে উঠত বরানগর বাজার থেকে কাশীপুরের সুমিত্রা অথবা বাসবী ।
কোলকাতার পথঘাট চিনেছি কলেজবেলায় । প্রায়শই পাঁচমাথার মোড়ে জ্যাম থাকার দরুণ আরজিকর রোড দিয়ে বাস ঘুরে দীনেন্দ্র স্ট্রীট দিয়ে বেরিয়ে বিধানসরণী ধরত । বুক ধড়পড় করত অচেনা জায়গা দিয়ে যখন বাস যেত কিন্তু ঐ ভাবে এঁকে বেঁকে বাস যখন আমাকে বেথুন কলেজের সামনে নামিয়ে দিত তখন এই শহরটার ওপর বেশ অদ্ভূত ভালোলাগায় আবিষ্ট হতাম ।
ভরতবর্ষের প্রথম মহিলা কলেজ বেথুন কলেজ । প্রতিষ্ঠাতা জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন । সেযুগে আমাদের দেশে নারীশিক্ষা প্রসারে যাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য । ১৮৪৯ এ তিনি স্থাপন করেন বেথুনস্কুল ও পরে ১৮৭৯ এ বেথুন কলেজ নির্মিত হয় । আমাদের সময় বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন শ্রীমতী দীপ্তি ত্রিপাঠী । কলেজে ভর্তির পর শুনেছিলাম আরো অনেক মহিয়সীর নাম যাঁরা এখান থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ।এঁদের মধ্যে সুখলতা রাও অন্যতম । আমাদের বাংলাভাষায় হাতেখড়ি হবার সাথে সাথে যাঁর অ, আ ক, খ'র ছড়ার ব‌ই পড়ে আমাদের স্কুল যাবার ভিত তৈরী হয়েছিল । বেথুনে পড়েছিলেন মহিলা কবি কামিনী রায় যাঁর কবিতা আমাদের একাধিকবার সিলেবাসের মধ্যে ছিল । এছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রীতিলতা ওয়াদেদার পড়েছিলেন এই কলেজে । নেতাজী সুভাষচন্দ্রের খুব কাছের বন্ধু, সে যুগের রাজনৈতিক এবং সমাজসংস্কারক লীলা রায় (আগে নাগ ছিলেন ) সে যুগে বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোল্ড-মেডেল পেয়ে ছিলেন । এছাড়াও রয়েছেন পদ্মাবতী স্মর্ণপদক প্রাপ্তা সরলা দেবীচৌধুরাণী , শ্রীমতী সীতাদেবী, ডাঃ দীপ্তি ত্রিপাঠী, বৈজ্ঞানিক ডাঃ অসীমা চট্টোপাধ্যায়, থিয়েটার ও ছায়াছবি ব্যাক্তিত্ত্ব শোভা সেন, সঙ্গীতজ্ঞা পূরবী মুখোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকী, বাচিকশিল্পী ব্রততী বন্দোপাধ্যায় যাঁরা এই বেথুন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশান করেছিলেন । বেথুন কলেজের দুজন প্রথম গ্র্যাজুয়েট হলেন ডাঃ কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং শিক্ষাবিদ চন্দ্রমুখী বসু । ১৮৮৩ সালে এঁরা বেথুন কলেজ থেকে পাশ করেন । গ্র্যাজুয়েশানের পর কাদম্বিনী দেবী কলকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারী পড়েন । আর চন্দ্রমুখীদেবী বেথুন কলেজে লেকচারার পদে যোগ দেন । আমার ১৯৮৩ সালে বেথুন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার । সেবছর এই প্রথম দু'জন মহিলার গ্র্যাজুয়েশানের শতবছর উদ্‌যাপন মহা আড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল । নানারকম বর্ণময় অনুষ্ঠান এবং খাওয়াদাওয়ার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়েছিল সেই সেন্টিনারি । বেথুন কলেজের গ্র্যাজুয়েট হবার সুবাদে আর ঠিক ঐ বছরেই স্টুডেন্ট হিসেবে উপস্থিত থাকার সুবাদে আমিও খুব গর্বিত ।