৩১ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-৩

-->


তারকেশ্বর পশ্চিমবাংলার শৈবতীর্থের অন্যতম তারকেশ্বর । হুগলীজেলার এই দেবভূমি হাওড়া স্টেশন থেকে মাত্র ৩৬ মাইল দূরে । আমার চলেছিলাম বর্ষণমুখর এক কাকভোরে । গাড়ি নিয়ে সোজা উত্তরে নিবেদিতা সেতু পেরিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে সিঙ্গুরের পর বাঁদিকে ঘুরতে হবে । তারপর স্টেট-হাইওয়ে ২ ধরে গেলেই পড়বে তারকেশ্বর । গাড়ি রাখবার চমতকার জায়গা আছে মন্দিরের বাইরে । চমত্কার রাস্তা । বহু মানুষ শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত রেলপথে যাতায়াত করে থাকেন । স্বনামখ্যাত স্বয়ংভূ শিবলিঙ্গ আছেন এখানে যাঁর কলিযুগের নাম বাবা তারকনাথ । এবার আসি প্রতিষ্ঠাতার কথায় ।
তারকেশ্বর তীর্থস্থান থেকে প্রায় মাইল তিনেক দক্ষিণ-পূর্বে কানানদীর তীরে রামনগর গ্রাম । সেখানে রাও ভারামল্ল নামে এক রাজপুত রাজা রাজত্ব করতেন । রামনগরের স্থানীয় অধিবাসীদের উপর জোর জবরদস্তি করে রাজস্ব আদায় সহ নানাবিধ অত্যাচার শুরু করলেন । রামনগরের নিকটবর্তী গ্রাম বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল । তারা মুর্শিদাবাদের নবাবকে সেকথা জানালে নবাব রাজারূপী ঐ দস্যুগণকে মুর্শিদাবাদে বন্দী করে পাঠাতে বললেন । এদিকে রাজা ভারামল্ল ও তার ভাই বিষ্ণুদাসকে দেখে নবাব বুঝলেন এরা কেবলমাত্র ভিনদেশী দুই রাজপুত । যাদের ব্যবহার অত্যন্ত ভালো এবং যারা ব্যবসার কারণে বাংলায় থিতু হয়েছে। নবাব তাদের রামনগরে থাকতে আদেশ দিলেন ।
রাজা ভারমল্লের একটি গোশালা ছিল । কপিলা নামে একটি হৃষ্টপুষ্ট গোরু সেখানে প্রচুর দুধ দিত । একদিন হঠাত দেখা গেল রাজার দুধ কমে গেছে । গোরক্ষকের ওপর ভার পড়ল সেই রহস্য উদঘাটন করার জন্য । সে গিয়ে দেখতে পেল জঙ্গলের অনেক গরুর মধ্যে কেবলমাত্র কপিলা একটি চকচকে পাথরের মধ্যে খোদিত একটি গর্তে স্তন রেখে সেখানেই দুধ দিচ্ছে । রাজাকে জঙ্গলের মধ্যে এনে সেই দৃশ্য দেখালেন গোরক্ষক । আশপাশের গ্রামের মানুষ দেখতে লাগল সেই দৃশ্য । তারা জানালো সেই পাথরটির ওপর বহুদিন ধরে তারা ধান ঝাড়ে কিন্তু এরূপ দৃশ্য তারা কখনো দেখে নি । আর এই পাথরটি হল সেই স্বয়ংভূ লিঙ্গ যিনি তারকনাথ রূপে পূজিত হন ।

শ্রাবণ মাসে প্রচন্ড ভীড় হয় তাই শ্রাবণ মাস পড়ার আগেইভাগেই ভোর ভোর আমরা পৌঁছেছিলাম আর পুজো দিয়ে নিয়েছিলাম । আছে সেই বিখ্যাত দুধপুকুর যেখান থেকে জল নিয়ে বাবার পুজোসামগ্রী কিনে পুজো করার ব্যবস্থা আছে । কথায় বলে দুধপুকুরে স্নান করলে সর্ব ব্যাধি বিনাশ হয় ।   তারকনাথের সেবার জন্য বাবার গদিতে দানের সুবন্দোবস্ত আছে । রসিদের বিনিময়ে দান গ্রহণ করা হয় সেখানে । জলযোগ ও দুপুরের খাওয়ার ভালো হোটেল ও আছে আর আছে কাশী বিশ্বনাথের মত অজস্র অলিগলি ও সেখানে দন্ডায়মান ষাঁড় । মোটের ওপর বাড়ির কাছাকাছি বেশ ভালো তীর্থস্থান এই তারকেশ্বর ।

২৬ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা পর্ব-২

ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার 
সম্প্রতি  আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি  sms poll এ দেখছিলাম জানতে চাওয়া হয়েছে "বাংলা কি বেকার ভাষা?" এই উক্তির পক্ষ একেবারেই না নিয়ে বলতে চাই বাংলা আজ বেকার ভাষা হলে সেই ভাষাকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের রুজিরোজগার এবং তাও আবার ঐ পত্রিকাকে ঘিরে । এমন জনপ্রিয় একটি সংবাদপত্রের ট্যাগলাইন হোল "পড়তে হয় নয়ত পিছিয়ে পড়তে হয়" ।  এই দৈনিক পত্রিকাটি বাংলাভাষায় বলেই হয়ত এতটা জনপ্রিয় এবং তার সুষ্ঠু সম্পাদনাকে ঘিরে আজ কোলকাতা সহ পশ্চিমবাংলার অনেক মানুষই সাকার ।  তাই বুঝি সুদীর্ঘ ৯০টা বছর পার করেও তার পাঠককুল সাতেও থাকেন, পাঁচেও থাকেন । আবার নয় নয় করে তার পাঠক সংখ্যা ৯লাখে পৌঁছায় । 
 তবুও অবাক হ‌ই যখন বাংলাকে 'বেকার ভাষা' বলে ভোট নিতে চান দেখে । হয়ত বা আমার ভুল এই ভাষাকে কেন্দ্র করে এই বেকারত্বকে ঘিরে । কিম্বা হয়ত পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাভাষার গুরুত্ব যাচাই করার জন্য এই ভোট । সে যাই হোক কিছুদিনের মধ্যেই দেখি সেই ভোটের ফল প্রকাশিত । আকাশতলে অনিলে জলে, দিকে দিগন্তলে ৮৮ শতাংশ মানুষ এই বাংলাভাষাকে ভালোবেসে "ভালোভাষা" বলে জানিয়েছেন । 
এই ভোটাভুটির মাঝামাঝি কোলকাতায় আয়োজিত হল এক আলোচনাচক্র । ইন্টারনেটে বাংলাভাষার প্রসার, প্রচারকে ঘিরে নেটসাহিত্যের অগণিত পাঠক, লেখক ও সম্পাদকদের আনুকুল্যে । যার নাম "ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার"  । বাংলাভাষায় সাহিত্য রচনা করতে ভালোবাসেন অনেকেই । এবং এই ভাষাকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয় অনেক অনেক ই-পত্রিকা বা ওয়েব ম্যাগাজিন ।   আর বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির রমরমায় বাঙালীর ঘরে ঘরে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের অধিক্যে সেই সাহিত্য এখন এককথায় হাতের মুঠোয় ।  তাই এরূপ একটি সেমিনারের প্রয়োজনীয়তা এই মূহুর্তে খুব জরুরী ছিল । সৃষ্টি, ইচ্ছামতী এবং ও-কোলকাতা এই তিনটি ওয়েব পত্রিকা এবং ব্লগজিনের  আতিথেয়তায় আমিও হাজির ছিলাম গত ১২ই অগাস্ট ২০১৩ বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাঘরের ঐ আলোচনাচক্রে । 
  


ব্লগ লেখা শুরু করি ২০০৮ এর গোড়ার দিকে । ততদিনে বাংলা লেখার সফটওয়ার ও ইউনিকোডের জয়জয়াকার । এরপর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও ব্লগার বন্ধুদের সাথে ঘনিষ্ঠতায় ব্লগের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে । সোনারতরী ছিল আমার নিজের ব্লগ ।
অর্কুটময় দুনিয়ায় তখন বন্ধুদের সাহিত্যরস উপচে পড়ছে দেখে ভাবতাম এগুলি আমার ব্লগে একত্রে রাখলে তো মন্দ হয়না ।
কবি তো বলেইছেন "সেই সত্য যা রচিবে তুমি' ....সেই ভাবনা নিয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধুকে বাংলা লেখা শিখিয়েও ফেলেছিলাম অনলাইন । কিন্তু ব্লগ খুলতে তারা নারাজ অথচ নিজের লেখা নেট-সাহিত্যে দেখতে খুব উদগ্রীব । সেই ভাবনা নিয়ে সোনারতরী থেকে প্রথম আত্মপ্রকাশ হয় "অর্কুট আগমনী পাঁচালী' ।
সেটাই ব্লগ থেকে আমার সম্পাদনায় ওয়েবম্যাগের জন্মলগ্ন, ২০১০ সালে পুজোতে । জনপ্রিয়তা দেখে ২০১১ তে "দোলছুট" ও ১লা বৈশাখে "পয়লা সাহিত্য পার্বণ" প্রকাশিত হল ।
তখুনি মেটামরফোসিস। ছিল রুমাল, হল বেড়াল । সোনারতরী র‌ইল আমার লেখার জন্য কিন্তু প্যাপিরাসের জন্ম হল ২০১১ পুজোতে । এইভাবে ব্লগ-বৈতরণী পার হতে গিয়ে কত লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হল প্যাপিরাস । পরিচিতি বাড়তে থাকল ।
গুণমানের উত্কর্ষতার কথা চিন্তা করে বছরে দুটি উত্সব সংখ্যা বের করি আমরা । পুজোসংখ্যাটি একটু বিস্তারিত হয়, একগুচ্ছ গল্প, কবিতার নোটবুক , ভ্রমণকাহিনী, নিবন্ধ ও হোমমেকারের হেঁশেলের রেসিপি দিয়ে । আর ২০১২ থেকে শুরু হল একটি আলোচনাচক্র বা ফোরাম যার নাম "চক্রবৈঠক"। সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে কোনো বিষয়ের ওপর মতামত সংগ্রহ করে সেটিকে প্যাপিরাসের পাতায় উপস্থাপিত করা হয় । ধারাবাহিক স্মৃতিচারণা থাকে একটি বিভাগে, যে পাতাটির নাম 'স্মৃতিকণা'   । 'ধরণীর পথে পথে নামে' ভ্রমণের পাতা থাকে একটি । কখনো অণুগল্প থাকে ডজন খানেক অথবা নির্দ্দিষ্ট থিমে ছোটগল্প স্থান পায় । 


 আমাদের ওয়েবম্যাগাজিনের ঠিকানা হল papyrus.sonartoree.com
 
আপনারা পড়ুন ও পড়ান সকলকে আর আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় র‌ইলাম । 
চোখ রাখুন আমার প্রেজেনটেশানে :
http://yweb2.blogspot.com 


১৬ আগ, ২০১৩

মনসুন সোনাটা- পর্ব ১

অলীক সুখ 
শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটির হ্যাট্রিক ! দেখেছি এদের আগের ছবিদুটিঃ ইচ্ছে ও মুক্তধারা । খুব বাস্তববাদী কাজ করেন এরা । আর নতুন রকমেরো ।  আমার পছন্দের লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাহিনী। পছন্দের অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদারকে নায়করূপে প্রথম দেখা। আর সোহিনীকে নতুন করে কিছু বলার নেই । চন্দ্রবিন্দুর অনিন্দ্যকে আরো একবার Hats off! দারুন লিরিকস আর দারুন সুর। আর জয় সরকারের অনবদ্য সঙ্গীত আয়োজন ।পুরোটাই পাওয়ার সুখ না হলেও অনেকটাই সুখের ।  
দেবশঙ্কর হালদার (ছবিতে ডাঃ কিংশুক গুহ)  তাঁর বিয়ের তারিখে নিজের "সুখ"/ইচ্ছাপূরণের জন্য  একমাত্র বৌকে উপহার দিলেন কোলকাতার বুকে এক স্বপ্ন-বাড়ি যার নাম ফ্ল্যাট । আর সেই সুখ পূরণ করতে গিয়ে কেড়ে নিলেন সোহিনীর জীবন । সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়ে সোহিনীর প্রেতাত্মা কুরে কুরে খেতে লাগল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ( রম্যাণি, ডাক্তারবাবুর স্ত্রী )কে । সেও সন্তান সম্ভবা হল কিন্তু তার যখন মিসক্যারেজ হল তখন ডাক্তারবাবু বুঝতে পারলেন সেই "সুখ" পূরণের কি মাহাত্ম্য । তার আগে নয় ।
তবে কোলকাতার ডাক্তারবাবুদের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নপূরণের ইচ্ছা আর ডাক্তারী পাশ করে শপথ গ্রহণের মূহুর্তটা একতু প্রকট করে দেখালে আরো ভালো লাগত । আজ কোলকাতার সরকারী-বেসরকারী সব হাসপাতাল/নার্সিংহোমের কি অবস্থা তা আমরা খুব ভালো করেই জানি । খবরের কাগজে প্রতিনিয়তঃ দেখতে পাই, টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পাই নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের সুচিকিত্সা বা যথাসময়ে করণীয় চিকিত্সার অভাবে মৃত্যু কিন্তু উচ্চমধ্যবিত্তরাও সমান ভাবে ভুক্তভোগী । এত সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল হচ্ছে কিন্তু ডাক্তারবাবুরা কি ঠিকমত কর্তব্য পালন করছেন? কেন আমরা কোলকাতার মানুষেরা এই মেট্রো সিটি  ছেড়ে অন্যত্র যাব আর কেনই বা ডাক্তারবাবুরা আরো সহৃদয় হবেননা এ শহরের মানুষদের জন্য ?  এই শূণ্যস্থানগুলি নন্দিতা-শিবপ্রসাদরা আরো একটু প্রকট করে তুললে ভালো হত বোধহয় । 
আর মাঝেমাঝে দেবশঙ্করের অতি নাটকীয় চিত্কার বড্ড প্রকট লেগেছে । উনি নাট্যমঞ্চের ব্যাক্তিত্ত্ব বলে বোধহয় তেমনটি হয়েছে । কিন্তু সব মিলিয়ে বাংলাছবির বাজারে বেশ নাম করবে বলে মনে হল । 

সব মিলিয়ে রোবাবরের বিকেল + প্রিয়া সিনেমা + অলীক সুখ = টোট্যালি পয়সা উশুল ছবি । সাথে বোনাস হল বিশ্বনাথ + নন্দিতা + শিবপ্রসাদের সাথে প্রিয়ার সিঁড়িতে করমর্দন !!!
এই হল কলকাতার মানুষজনের অলীক সুখ । বাঙালী বেশ আছি আমরা বেঁচে বরতে ...কি বল ? বাইরে বেরিয়ে দেখি একজন ব্যাগ ভর্তি আচার নিয়ে চেঁচাচ্ছে " ও মা একটা প্যাকেট আচার নিয়েই দেখুন না ! ওদিকে ন্যানোর কারখানা হলে সে সিঙ্গুরে গিয়ে সেই আচারের ব্যাগ পুরোটাই হয়ত বিক্রি করে আসতে পারত । অন্যথায় যারা আচার তৈরী করা শেখালো তারা সেই আচারের বিশ্বব্যাপী মার্কেটিং করে আজ ক্রোড়পতি। আজ তারাই এই শহরটাকে গ্রাস করে ফেলল । তাই তো ন্যানো ওদের দেশে ।আমাদের অলীকসুখ আছে বাবা। আমরা এই নিয়ে দিব্য আছি বেঁচে । আমাদেরই বা সুখ কম কিসের?

৮ আগ, ২০১৩

খোলাচিঠি রবিঠাকুরকে....

রবিঠাকুর
তুমি না কি স্কুল পালিয়ে ছবির খাতায় আঁকো  ?
গোল্লাছুটের দুপুরগুলোয় কাব্যি করে লেখো?
রবিঠাকুর তোমার নাকি  খুনসুটির এই ভোর
গান লিখতে  সিঁড়ি ভেঙে চিলেকোঠার দোর ।
রবিঠাকুর তুমি চেনো মেঘের কোলে রোদ ?
জীবনভর তোমার দেনা কেমনে করি শোধ ? 
ছোট্টবেলায় মা চেনালো রবিকবির আলো
সেইতো আমার হাতেখড়ি গান-বিকেলের ভালো ।
রবিঠাকুর তোমায় যদি সেলফোনেতে পেতাম
এসেমেসের বৃষ্টি ফোঁটা উজাড় করে দিতাম ।
রবিঠাকুর জানো তুমি মাল্টিপ্লেক্সের ঢল্‌ ?
তোমার গল্প-গানছবিতে মাতাল শপিংমল ।
রবিঠাকুর দেখবে তুমি ফ্লাইওভারের ধারে
হোর্ডিং ওলা রঙিন ছবি শিল্পী সারেসারে ।
দেড়শো তোমার পূর্ণ হ'ল পুজোয় মাতে লোক
প্রভাতফেরী গানের ভেরী দেড়শো মানার ঝোঁক ।
রবিকবি তুমি না কি ফেসবুকেতে আছো?
স্টেটাসে তে কাব্যি ঝরাও মনের সুখে বাঁচো ।
রবীন্দ্রনাথ আছো তুমি যন্ত্রজালে বন্দী
ট্যুইট দেখি মাঝেসাঝে বুঝি নাকি ফন্দী ?
রবিঠাকুর রবিঠাকুর খোলা খেরোখাতা
ছিটেফোঁটা দাওনা লিখে মনের দুটো কথা ।

৩০ জুল, ২০১৩

ওয়েব ম্যাগাজিন সেমিনার

বন্ধু
আগামী ১২ই আগস্ট,  ২০১৩ সন্ধ্যে ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাঘরে সকল সাহিত্যপ্রেমী এবং লেখক-পাঠককে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ জানাই ।  বাংলাভাষায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি ওয়েব ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ইতিমধ্যে । এক আকাশের নীচে সেই ওয়েবম্যাগাজিনের সম্পাদক মন্ডলী এবং গুণিজনের ভীড়ে, বন্ধু আপনার উপস্থিতি একান্ত কাম্য । 
সাথে র‌ইল আমন্ত্রণের ই-পত্র ।  


২৩ জুল, ২০১৩

বেথুন জার্নাল (২)


আমার বেথুন কলেজ নিয়ে সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হল ফড়িয়াপুকুরের টাউন স্কুলের পাশে স্যারের বাড়িতে সপ্তাহে একদিন করে পড়তে যাওয়াকে ঘিরে । আমরা বেথুনের সাত-আটজন প্রতি শনিবার কলেজ ছুটির পর হাঁটতে হাঁটতে হেদো থেকে বিধান সরণী হয়ে পৌঁছাতাম টাউন স্কুলের সামনে । আমাদের পথ-গল্পের মুচমুচে গসিপ আর রূপবাণী সিনেমা হলের উল্টোদিকের ভুজিয়াওয়ালার কুড়মুড়ে সাড়ে বত্রিশভাজা চলত মুঠো থেকে মুঠোর পরে । অনার্সের পড়ার চাপে আর কলেজ যাতায়াতের ক্লান্তি যেন শনিবারের নিয়মিত পথচলায় এক দমকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আনত । আমাদের স্যার মানে প্রোফেসার বিবেক চ্যাটার্জি তখন জয়পুরিয়া কলেজের কেমিষ্ট্রির অধ্যাপক । নিঃসন্তান বিবেকবাবু ও ওনার স্ত্রী (আমাদের কাকীমা) যেন আমাদের সকলের পরিবারের দু'জন হয়ে উঠেছিলেন । জীবনের ভালোলাগা, মন্দলাগা, সাহিত্যচর্চা থেকে সিনেমা রিভিউ, পিকনিক যাওয়া থেকে হর্টিকালচারে সদলবলে ফ্লাওয়ার শো সবকিছুর সঙ্গী ছিলেন এই দুজন মানুষ । আমরা পড়তে যেতাম ইনর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি বা বাংলায় যাকে বলে অজৈব রসায়ন । স্যারের ঐটি স্পেশ্যালাইজেশান । কলেজের সবচেয়ে বোরিং ক্লাসগুলো বিবেকস্যারের কৃপায় যেন সবথেকে ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠত । ওই বিষয়গুলো পড়তে ইচ্চে করত না যতক্সণ না স্যার বুঝিয়ে দিতেন গল্পের মত করে আর কোথা থেকে কতটুকুনি পড়তে হবে বলে দিতেন । বিশাল সিলেবাসের মধ্যে স্যারের পরামর্শ পেলে পড়তে আনন্দ হত । স্যার বলতেন " যে খাতা বা নিজের তৈরী করা নোটটা থেকে পড়তে শুরু করবে সেই নোটটাই পরীক্ষার শেষ দিন অবধি দেখে যাবে তবে মনে গেঁথে থাকবে ।
আমরা দলবেঁধে গল্প করতে করতে যেতাম স্যারের বাড়ি । কোনো কোনো দিন যেতে যেতে খিদে পেয়ে যেত খুব । টাউন স্কুলের নীচেই একটা মাদ্রাজী দোকানে অথেন্টিক দোসা পাওয়া যেত । দোসা খেতাম হৈ হৈ করে । তারপর শ্যামপুকুর স্ট্রীট দিয়ে স্যারের বাড়ি পৌঁছে আবার কাকীমর হাতের আচার অথবা পড়ানোর ব্রেকে স্যারের আনানো কচুরী-আলুরদম । বৃষ্টি পড়লেই আমাদের বরাদ্দ ছিল মোড়ের মাথার বিখ্যাত একটা দোকানের তেলেভাজা-মুড়ি । সেদিন আর পড়া হত না । ভূতের গল্প শুনতে বসতাম । কাকীমাও যোগ দিতেন আমাদের আসরে । এইভাবে চলত আমাদের কেমিষ্ট্রি টিউশান আর ফাঁকে ফাঁকে আমাদের অনাবিল আনন্দের মূহুর্তেরা ।
ইনর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রির বোরিং লেকচারগুলো অনায়াস মনসিঁড়ি বেয়ে গেঁথে যেত মাথায় । বিবেকস্যারের অপত্যস্নেহে আর বৈচিত্রে সেই বোরিং লেকচারগুলো যেন ভালোলাগায় পরিণত হত । একটু পড়া একটু গান অথবা একটু খাওয়াদাওয়ার অনুষঙ্গ যে রেগুলার পড়াশোনায় কতটা জরুরী সেটা উপলব্ধি করেছিলাম কলেজে পড়াকালীন ।
১৯৮৫ এ ইন্দিরা গান্ধী যখন নিহত হলেন সারা কলকাতা জুড়ে কি অবস্থা । পথরোখো, বাস বন্ধ । আমাদের ফিজিক্স প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষা ছিল । মনে আছে বাস টবিন রোড অবধি গিয়ে বলল আর যাবেনা । পরীক্ষা দিতে হবে বলে পায়ে হেঁটে টবিন রোড থেকে বিডন স্ট্রীট পৌঁছেছিলাম । ফেরার সময় শিয়ালদহ অবধি হেঁটে তারপর লোকাল ট্রেনে দক্ষিণেশ্বর ফিরে মনে হয়েছিল রাজ্য জয় করেছি । মনে মনে একদিকে যেমন পায়ে ব্যথার জন্য এ শহরকে কটাক্ষ করেছি আবার বাসের বিকল্প ট্রেনের সান্নিধ্যে এসে মনে হয়েছিল কি সুন্দর এই শহরের যাতায়াতের নেটওয়ার্ক ।
আরেকবার ৫ই জুন ১৯৮৪ । কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট ওয়ান শুরু । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পরীক্ষা । সংস্কৃত কলেজে সিট পড়েছিল আমাদের । ৪ঠা জুন থেকে অবিরাম বর্ষণে শহর কলকাতা বিপর্যস্ত । আমাদের মফঃস্বলও জলমগ্ন ।
সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরুলাম । একটি ৩২ নম্বর বাস শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড়ে নামিয়ে দিল । বিধানসরণীতে হাঁটু জল । সেন্ট্রাল এভিনিউ আর সার্কুলার রোডও তথৈবচ । একটি টানা রিক্সা ৫০টাকায় কলেজ স্ট্রীট পোঁছে দিতে রাজী হল । বাবার সাথে রিক্সায় চড়ে বসলাম । রিক্সার পাদানীতে থৈ থৈ জল । তখন না আছে সেলফোন না আছে ইন্টারনেট । এমন বন্যা কবলিত হয়ে আশা করেছিলাম অন্তত সংবাদের মাধ্যমে পরীক্ষা বন্ধের আদেশ দেবেন কর্তৃপক্ষ । কিন্তু সেখানে পৌঁছে অগণিত ছাত্রছাত্রী পরিবেষ্টিত আমি... কিছুটা ধিক্কার দিয়েছিলাম এ শহরকে । দশটা থেকে বারোটা বেজে গেল কিন্তু কোনো খবর এলনা । প্রশ্নপত্র পৌঁছায়নি তখনো আর আমরা ব্‌ইপত্র উল্টে চলেছি । বারাসাত, বসিরহাট থেকে যারা এসেছে তারা তখন ফিরে যাবার তোড়জোড় করছে । অশনি সঙ্কেতের মত প্রশ্নপত্র হাজির হল । বলা হল বেলা দুটোয় পরীক্ষা শুরু হবে । আমরা সেই না খাওয়া দাওয়া স্টেজে ম্লান মুখে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করে দেখি কোনো বিজলীবাতি নেই । অতিবৃষ্টিতে ইলেকট্রিক কেবল জলের নীচে । মোমের আলোয় জীবনের প্রথম এবং কঠিন অনার্সের পরীক্ষা দিতে দিতে সোজা প্রশ্নের উত্তর গুলোও মনে পড়ছিলনা ঠিকঠাক । এভাবে চার ঘন্টা পার করে বাইরে এলাম । বাড়ি ফেরা হল আমার সেই বন্ধু মল্লিকার গাড়িতে ; ফিরে এসে দূরাদর্শনের সংবাদে ঘোষণা হল সেদিনের পরীক্ষা বাতিলের কথা । এত কাঠখড় পোড়ানো সেই পরীক্ষা বাতিলের খবরে খুব রাগ হয়েছিল এ শহরের ওপর আর পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের ওপর । এমন নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় ! তার কি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ! আমারো তখন ভোটাধিকারের বয়স । আমিও তো এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এক জনমত । কিন্তু এ কি হাল আমার শহরের !
কলকাতার নামকরা মিষ্টি কেসিদাসের বাড়ির মেয়ে মল্লিকার বাড়িতে আমাদের ছিল নিত্যি আনাগোনা । বাগবাজারের নবীন ময়রার বিখ্যাত সেই বাড়িটা ছিল আমাদের নিজের বাড়ির মত । কতবার যে ওর সাথে আমরা ঐ বাড়িতে গেছি তার ঠিক নেই । মল্লিকা খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল । ও বেশি কথা বলত না কিন্তু বলত তোরা বলে যা আমি শুনে মন্তব্য করব । কলেজ ছুটি থাকলে মল্লিকার সাথে আমার চলত পত্র বিনিময় । আমার লেখার ভীষণ ভক্ত ছিল সে । আমাকে সমানে মল্লিকা বলত "তুই কিন্তু লেখাটা চালিয়ে যা" আমি কোনো গুরুত্ব দিতামনা । মল্লিকার বাবা-মায়ের ২৫ বছরের বিয়ের তারিখে আমাকে কবিতা লিখতে বলেছিল । কুড়িবছরের সেই আমি ছাই তখন বিয়ের কি বুঝি !
যাইহোক লিখে ফেললাম একখানা। সেটা আবার ছাপিয়ে অতিথিদের হাতে হাতে বিলি করা হয়েছিল । আমার কাছে সেটা বিশেষ পাওনা । ওদের বাড়িতে যাওয়া মানেই এক থালা নানা রকম মিষ্টি ও নোনতা সহযোগে জলযোগ । কলেজজীবনের আনন্দটা আরেক কাঠি বেড়ে যেত সেই আতিথেয়তায় । তারপর মল্লিকা বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে মাস্টারস করল বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে আর আমি গেলাম পিওর কেমিস্ট্রি পড়তে রাজাবাজারে ।

১৬ জুল, ২০১৩

বেথুন-জার্নাল -১

-->

আমরা একপাল মেয়ে জড়ো হয়েছিলাম ১৯৮২ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাসের পর কোলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী মেয়েদের রক্ষণশীল কলেজে । সকলের মধ্যে দুটি বিষয় অন্ততঃপক্ষে কমন ছিল । এক হল সকলের কেমিস্ট্রি অনার্স আর দুই সকলেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বেশ কনফিডেন্ট পড়াশুনোর ব্যাপারে । আমাদের অনেকের আবার আরো একটা জিনিস কমন ছিল সেটা হল কেমিস্ট্রি অনার্সের সাথে ম্যাথস আর ফিজিক্স । 
 

সেই ছাব্বিশ নম্বর ঘরটা ! কাঁচের সার্শি সরিয়ে, পুরোণো গন্ধ বুকে নিয়ে, খড়খড়ির দরজা ঠেলে অন্ধকার ঘরে ঢুকেছিলাম হুড়মুড় করে । কিছুটা উচ্চাশা নিয়ে আর কিছুটা দুরুদুরু বুকে । ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই পচাডিমের হাইড্রোজেন সালফাইডের সেই চেনা উচ্চমাধ্যমিক গন্ধটা অবশ করে দিল সুষুম্না স্নায়ুগুলোকে ।

ব্যাক্তিত্ত্বময়ী জ্যোত্স্নাদি এসেছিলেন । অনেকটা সেই মূর্তিমতী করুণায় শ্রদ্ধা উপছে উঠেছিল । তারপর রেডক্স ইক্যুয়েশান ব্যালেন্সিংয়ের দাপটে কেমন যেন সব ওলটপালট ! আবার হাতীবাগানের ড্রেসের ঝুলে সব যেন উথালপাথাল... কিছুটা অনাস্বাদিত মুক্তির আস্বাদে, কিছুটা শেষ ঊণিশ-কুড়ির ভালোলাগায়, ফুচকার তেঁতুলগোলা জলে ...

কিন্তু মনের মধ্যে একটু আধটু খচখচানি সেই ছাব্বিশ নম্বরের । আমি অ-পাঙক্তেয় ন‌ই তো সেখানে ? আমার জীবন রসায়নের সাথে রসায়নের দোস্তি সত্যি হবে তো?
বরানগর থেকে প্রথম একা বেরুলাম বেথুন কলেজে ভর্তি হয়ে । বাবা কলেজে ভর্তি করে চেনালেন পথঘাট, দোকানপাট । ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর । ১৭ বছরের আমি । মফস্বলী শহর আলমবাজার থেকে নিয়মিত শুরু হল আমার কলকাতা অভিযান । ছোটবেলায় শ্যামবাজার যেতে হবে শুনলেই বাবা বলতেন "কোলকাতা" যেতে হবে । আমি ভাবতাম অনেক দূর বুঝি! কোলকাতা যাওয়া মনেই এটা ওটা সেটা । শ্যামবাজার থেকে ড্রাই ফ্রুটস, ফড়িয়াপুকুরের অর্ফ্যানের চা পাতা, অমৃত'র লাল দৈ, জলোযোগের প্যাটিস আরো কত বলব ! ঠাকুমার জাফরাণী জর্দা, ঘোষকাজিনে চোখ দেখিয়ে চশমা করতে দেওয়া কিম্বা কুমার্স কনসার্ণ থেকে আঁকার স্কুলের রঙ-তুলি ! বাবা চেনাতেন পথঘাট । পাঁচমাথার মোড়ে পাঁচটা বড় রাস্তা কোন্‌টির কি নাম ও তারা সব শেষে কোথায় গিয়ে পড়েছে । পঞ্চমুন্ডির আসনে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে নেতাজী সুভাষের ইতিবৃত্ত ! কিছুটা অজানা আনন্দ আর সাথে কিছুটা অচেনা ভয় নিয়ে শুরু হল কলেজ জীবন । এতদিন ছিল মা-বাবার হাত ধরে শখের বাজার । এখন সেটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হল ।
কলেজ কেটে রূপবাণী সিনেমায় দু একবার সিনেমা ও হাতীবাগানের স্টার থিয়েটারে মায়ের সাথে সুপ্রিয়া দেবীর "বালুচরী" দেখেছি । ফেরার পথে সিলভার ভ্যালী রেস্তোরাঁয় কবিরাজী কাটলেট ভুলতে পারিনি এখনো । হাতীবাগানে একটা পেন সারানোর দোকান ছিল । নাম "পেন কেবিন্" । আমরা ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতাম । তাই ভালো মন্দ নানা পেনের নিব বদলানো লেগেই থাকত । এখনকার মত "ইউস এন্ড থ্রো" এর বাতাবরণ ছিলনা । কলেজ বান্ধবী মল্লিকা তখন টেনে নিয়ে যেত ওর বাড়ি । রসোগোল্লা আবিষ্কারক নবীন চন্দ্র দাসের বাগবাজারের বাড়িতে । বহুবার গেছি আর কে সি দাসের লোভনীয় সব মিষ্টিতে উদরপূর্তি করে বাড়ি ফিরেছি । কি আতিথেয়তা তাঁদের !
বিবেকানন্দের সিমলে স্ট্রীটের পাশে বিডন স্ট্রীটের ওপর জন ডিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের কলেজে।উল্টোদিকে হেদুয়ার সরোবর আর স্কটিশচার্চ কলেজ । বৈকুন্ঠ বুক হাউসে অনার্সের প্রথম ব‌ইট‌ই কেনা ; কলেজ ফেরত স্বাস্থ্যকর সুখাদ্যের হ্যাবিট ধরানোর জন্য সিমলেপাড়ার বিখ্যাত আইসক্রিম সন্দেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন অভিভাবক । দক্ষিণেশ্বর-বাবুঘাট, মিনিবাস রুট নং ১৫৮ তে চড়ে রোজ কলেজ যেতাম । কোনোদিন আবার আড়িয়াদহ-বাবুঘাট, মিনিবাস রুট নাম্বার ১৮১তে চড়ে শ্যামবাজারে নেমে বিধান সরণীর ট্রামে করে । বিধান সরণীর নাম ছিল একসময় কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট । তখন আলমবাজার থেকে বিডন স্ট্রীট যেতে মিনিবাসে লাগত ১টাকা ৫ পয়সা । সেই ৫ পয়সা আজ অবলুপ্ত আর মিনিবাসের সেই চেহারাও বদলেছে । প্রায়শ‌ই বাসে উঠত বরানগর বাজার থেকে কাশীপুরের সুমিত্রা অথবা বাসবী ।
কোলকাতার পথঘাট চিনেছি কলেজবেলায় । প্রায়শই পাঁচমাথার মোড়ে জ্যাম থাকার দরুণ আরজিকর রোড দিয়ে বাস ঘুরে দীনেন্দ্র স্ট্রীট দিয়ে বেরিয়ে বিধানসরণী ধরত । বুক ধড়পড় করত অচেনা জায়গা দিয়ে যখন বাস যেত কিন্তু ঐ ভাবে এঁকে বেঁকে বাস যখন আমাকে বেথুন কলেজের সামনে নামিয়ে দিত তখন এই শহরটার ওপর বেশ অদ্ভূত ভালোলাগায় আবিষ্ট হতাম ।
ভরতবর্ষের প্রথম মহিলা কলেজ বেথুন কলেজ । প্রতিষ্ঠাতা জন ইলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন । সেযুগে আমাদের দেশে নারীশিক্ষা প্রসারে যাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য । ১৮৪৯ এ তিনি স্থাপন করেন বেথুনস্কুল ও পরে ১৮৭৯ এ বেথুন কলেজ নির্মিত হয় । আমাদের সময় বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন শ্রীমতী দীপ্তি ত্রিপাঠী । কলেজে ভর্তির পর শুনেছিলাম আরো অনেক মহিয়সীর নাম যাঁরা এখান থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ।এঁদের মধ্যে সুখলতা রাও অন্যতম । আমাদের বাংলাভাষায় হাতেখড়ি হবার সাথে সাথে যাঁর অ, আ ক, খ'র ছড়ার ব‌ই পড়ে আমাদের স্কুল যাবার ভিত তৈরী হয়েছিল । বেথুনে পড়েছিলেন মহিলা কবি কামিনী রায় যাঁর কবিতা আমাদের একাধিকবার সিলেবাসের মধ্যে ছিল । এছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রীতিলতা ওয়াদেদার পড়েছিলেন এই কলেজে । নেতাজী সুভাষচন্দ্রের খুব কাছের বন্ধু, সে যুগের রাজনৈতিক এবং সমাজসংস্কারক লীলা রায় (আগে নাগ ছিলেন ) সে যুগে বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে প্রথম হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোল্ড-মেডেল পেয়ে ছিলেন । এছাড়াও রয়েছেন পদ্মাবতী স্মর্ণপদক প্রাপ্তা সরলা দেবীচৌধুরাণী , শ্রীমতী সীতাদেবী, ডাঃ দীপ্তি ত্রিপাঠী, বৈজ্ঞানিক ডাঃ অসীমা চট্টোপাধ্যায়, থিয়েটার ও ছায়াছবি ব্যাক্তিত্ত্ব শোভা সেন, সঙ্গীতজ্ঞা পূরবী মুখোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকী, বাচিকশিল্পী ব্রততী বন্দোপাধ্যায় যাঁরা এই বেথুন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশান করেছিলেন । বেথুন কলেজের দুজন প্রথম গ্র্যাজুয়েট হলেন ডাঃ কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং শিক্ষাবিদ চন্দ্রমুখী বসু । ১৮৮৩ সালে এঁরা বেথুন কলেজ থেকে পাশ করেন । গ্র্যাজুয়েশানের পর কাদম্বিনী দেবী কলকাতা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারী পড়েন । আর চন্দ্রমুখীদেবী বেথুন কলেজে লেকচারার পদে যোগ দেন । আমার ১৯৮৩ সালে বেথুন কলেজে সেকেন্ড ইয়ার । সেবছর এই প্রথম দু'জন মহিলার গ্র্যাজুয়েশানের শতবছর উদ্‌যাপন মহা আড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল । নানারকম বর্ণময় অনুষ্ঠান এবং খাওয়াদাওয়ার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়েছিল সেই সেন্টিনারি । বেথুন কলেজের গ্র্যাজুয়েট হবার সুবাদে আর ঠিক ঐ বছরেই স্টুডেন্ট হিসেবে উপস্থিত থাকার সুবাদে আমিও খুব গর্বিত ।

৯ জুল, ২০১৩

ঘটি-বাঙালের কাজিয়া শুনে বড় হয়েছি যে...


-->

এহেন "আমি"র শিরা-উপশিরায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বাঙাল রক্ত ও বাকী পঞ্চাশ ভাগ ঘটি রক্ত বহমান । আমার মায়ের বাবা এবং বাবার মা দুজনের বাংলাদেশের খুলনাজেলার সাতক্ষীরায় জন্ম । তাই এহেন "আমি" সেই অর্থে হাফ বাঙাল ও হাফ ঘটি । অন্তত: আমার শ্বশুরালায়ের মন্তব্য তাই । ইলিশ আর চিংড়ি দুইয়ের সাথেই আমার বড় দোস্তি । যেমন রাঁধতি পারি ঝরঝরে ভাত তেমন ভাজতি পারি ফুলকো ফুলকো নুচি। তবে ঘটির ওপর আমি পক্ষপাতদুষ্ট । কারণ রক্ত ।
উপাদেয় পোস্তর বড়ার স্বাদ পেতে আমাকে ছুটতে হয় বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার বন্ধুর বাড়িতে । আর নারকোল-বড়ি দেওয়া মোচার ঘন্ট খাবার জন্যে আমাকেই ছুটতে হয় রান্নাঘরে । আমাদের ঘটি বাড়ির হেঁশেল আবার একটু বেশি মিষ্টি তাই বেশির ভাগ রান্নাবান্নাই শর্করায় পুষ্ট । কুটিঘাটের মেয়ে আমার দিদিমা ছিলেন খাস ঘটিবাড়ির মেয়ে । বিয়ের পরদিন বাঙাল শ্বশুরবাড়ির রান্নায় চিনি ছড়িয়ে খেয়েছিলেন । তাই বোধহয় আমার ঠাকুরদাদার মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনেছি । সব ক্রিয়াপদে এলুম, গেলুম, খেলুম মার্কা কথা । আমাদের বন্ধুরা হেসে বলত এই এল হালুম-হুলুম করতে । কি আর করি ! জন্ম-দোষ যে!
স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুরা সকলে ভাত খেত আর আমরা খেতাম লুচি-পরোটা বা রুটি কিন্তু দুবেলা ভাত নৈব নৈব চ ! কি আর করে বন্ধুরা! ওদের মা ময়দার কাজে মোটেও পটু নন, ভাতের রকমারিতে পটু তাই ঘটির বৈকালিক জলযোগের ময়দা বুঝি ওদের কাছে অধরা ।
ওদের সেই চিতলামাছের মুইঠ্যা একবগ্গা মাছের এক্সোটিক ডিশ ফর গ্যাস্ট্রোনমিক তৃপ্তি । আর কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়া ইশে... সেই বাদলা দিলে কাদলা মাছের পাদলা ঝোল না খেয়ে কাতলার ক্রোকে, দৈ-মাছ, কোর্মা, মাছের পোলাও, মাছের কচুরী, চপ আরো কত বলব ! ঘটি হেঁশেলে শুঁটকি ফুটকির নো এন্ট্রি ! একবার বাঙাল-ঘটির কাজিয়ায় আমার ঠাকুর্দা তার এক বাঙাল বন্ধুকে বলেছিলেন "কচুরী আর রাধাবল্লভীতে যে বিস্তর ফারাক সেটাই জানোনা? আর কি করেই বা জানবে "ময়দার" ব্যাপারে তোমাদের তো হাঁটুতে খঞ্জনী বাজে। চাড্ডি ভাত চাপিয়েই খালাস তোমরা । জমিয়ে মিষ্টি মিষ্টি নাউ-চিংড়ি খাও মশাই। দেখবে মনের কাদা সাদা হয়ে গেছে । এট্টু চিনি ছড়িয়ে কড়াইয়ের ডাল আর ঝিঙেপোস্ত খাও । দিল খুশ হয়ে যাবে । মিষ্টি কথা কি এমনি কৈতে পারি? মিষ্টি মিষ্টি ব্যবহার কি এমনি পারি! সবের মূলে ঐ ঘেটো মিষ্টি"
বাজার গেছি একবার জ্যাঠামশাইয়ের হাত ধরে । সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছি তখন । পুলিশে কর্মরত জ্যাঠামশাই তাঁর চাঁচাছোলা ভাষায় গঙ্গার ঘাটে তাঁর এক পুরোণো সহপাঠীকে বলছেন :
"তোমরা হলে গিয়ে, ইশে "অরিজিনাল দেশি" তাই বলে আমরা এবরিজিনাল দেশি ন‌ই গো দাদা ! এট্টু ঘুসোচিংড়ির বড়া খেয়ে দ্যাখেন মশাই ! অথবা কষে চিনি দিয়ে ছোলারডাল আর ঐ আপনাগো "ময়দা" মানে আমাগো "নুচি" । চিল্লোতে পারিনা আমরা, আট ডেসিবেল কি সাধে ক্রস করিনা? ভেতরটা সত্যিসত্যি মিষ্টি হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে"
জ্যাঠামশাইকে আমরা জ্যাঠা বলতাম । খুব রসিক মানুষ ছিলেন । আর বাঙাল দেখলেই তাকে কচুকাটা করে দিতেন, কেন তা জানিনা। ওনার অফিসে একজন পেটরোগা কন্ষ্টেবল ছিল । প্রায়ই সে কাজে আসতে লেট করত । লোকটির পেটের ব্যারাম ছিল । সে জ্যাঠামশাইকে দেখলেই সেলাম করত ভয়ে ভয়ে আর তখুনি জ্যাঠা নিজের পেটটা বাজিয়ে তাকে বলত "প্যাটের ভিতর গেস হৈসে, চুয়া চুয়া ডেকুর মারে?"
একবার ওনার এক বাঙাল কনস্টেবলের ছেলে পরীক্ষায় পাশ না করে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পুলিশে বেয়ারার চাকরীর জন্য দরখাস্ত দিয়েছে । জ্যাঠামশাইকে আগেই তার বাবা বলে দিয়েছে "স্যার, আমার ছেলেটা সব লিখেছিল কিন্তু ইংরেজীটায় মোটে চোদ্দ পেয়ে গেল এবার, তাই আর পাশ করতে পারলনা"
সে ছেলেকে প্রশ্ন করার আগেই জ্যাঠা হাসতে হাসতে বলে বসল "কি ল্যাখসি জানিনা তবে চোদ্দ পাসি"
আরেকটা গল্প জ্যাঠা প্রায়ই বলতেন আমাদের । একজন কানহার জঙ্গলে বাঘ দেখে এসে ভয়ানক অত্যুক্তি করে বলছে । যত না বাঘ দেখেছে তার চেয়ে অতিরঞ্জিত তার বাঘের দৈর্ঘ্য । লোকটির গিন্নীও তার সঙ্গে গেছিল তাই সে প্রকৃত দৈর্ঘ্য সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল । বারবার লোকটি অমন বাঘের গল্প শোনায় আর তার বৌ ভাবে এমন মিথ্যা বলে কেন তার স্বামী ! তারা তো ছোট্ট একটা বাঘের ল্যাজের দিকটা একটু দেখেও ঠিক মত দেখতে পায়নি , ভারি লজ্জা হত বৌটির । বৌ বলেছে দ্যাখো, এবার তুমি যখন তোমার বন্ধুদের ঐ গল্প আবার শোনাবে আমি পাশের ঘর থেকে জোরে জোরে কাশব আর তুমি তখন বাঘের সাইজটা কমাবে কিন্তু। লোকটি বলতে শুরু করেছে আট-দশ-বারো.. হাত যেই বলেছে তার বৌ কেশে উঠেছে । খুব কাশছে বৌটি । তখন লোকটি বলছে "গিন্নী, তুমি কাইস্যা কাইস্যা মৈরা গ্যালেও আমি দশ হাতের নীচে নামুম না "
এভাবেই আমি এলুম, দেখলুম, ছিলুম বলে । একবার জ্যাঠামশাইয়ের স্পেশাল ব্রাঞ্চের আপিস গেলুম, আমের সময় মিষ্টি আঁব খেলুম, হ্যান্ডলুম পরলুম ! এতে লজ্জার কিছু নেই । আমাদের রান্নার সোশ্যাইটি জুড়ে, হেঁশেলের ঝুলকালিতে শুধু একটাই কথা :

শুক্তো, ঘন্ট, ছ্যাঁচড়া, সাথে অম্বল আমড়া ।
চিনির রসে হাবুডুবু ঘটির প্রাণে খুশি
ঝাল-ঝাল-টক-টক-মেছো শুঁটকি বাসি ।
নাউ-নঙ্কা-নেবু-নুচি-নেপ-নাট্টু-নাটাই
বিঘা বিঘা ধানজমি আর তালদীঘিটা নাই।
রামদা নিয়ে, চোখ পাকিয়ে আসি নাকো তেড়ে
ঝগড়া করার জোর যে নাই লড়ব কেমন করে ?

১ জুল, ২০১৩

স্মৃতিরূপেণ-১


মামারবাড়ি দক্ষিণেশ্বরে মায়ের ডেলিভারি পেন উঠেছিল ।  তখন পৌষমাসের ঠান্ডায় মা নাকি দাপুটে ব্যাথায় ঘেমে নেয়ে সারা । পাড়াপড়শীর মতে ছেলে হওয়াটাই স্বাভাবিক । তবুও ছেলে হতে হতে মেয়ে । কি কুলুক্ষুণে জানিনা!

যাইহোক, উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের নার্সিংহোমে ঘুমবিছানার বেবিকটে  প্রথম আলো দেখা... প্রথম কান্নার সাথে হাতেখড়ি ।

সকলে মা'কে বলেছিল "প্রথম মেয়ে সন্তান হোলো"?

মা বলেছিল  "কেন? আমার বন্ধু হবে, রুটি বেলে দেবে, আর আমরা সিনেমা যাব একসাথে "

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা বঙ্কিমের "ইন্দিরা" পড়েছিলেন  । সেই থেকে ঐ নামের ওপর ভালোলাগা ।

তবুও ১৯৬৫ সালেও নাক সিঁটকোনো ভাবসাব বাড়ির সকলের । বাবা  কিন্তু সিস্টারদের বখশিস দিয়েছিলেন "মেয়ে" হবার খবরটা জানানোর জন্য ।

দিদা বলেছিল "আমাদের বাড়ির মত রং পেলনা"

মা বলেছিল "হীরের আংটি, আবার বেঁকা !  যেমন তেমন মেয়ে বিয়োবো, বয়সকালে গুণ দেখাবো"

কি গুণ যে মা দেখালেন জানিনা তবে আমার গ্রুমিংটা সম্পূর্ণ মায়ের জন্য সম্ভব হয়েছিল । আড়িয়াদহে গঙ্গার তীরে বাবাদের ভাগের বাড়িতে এসেছিলাম মুখেভাতের সময় । পাশে পুকুর, পেছনে ঘন সিংহি বন আর পুরোণো বাড়ির ফাটল থেকে উঁকিঝুঁকি দেওয়া তেঁতুলে বিছে । বাবা জমি কিনে বাড়ি করলেন  কিছুদূরে আলমবাজারে ।  বাড়িতেই আমার পড়াশোনা শুরু হল মায়ের কাছে । আর রোজ দুপুরে, রাতে শোয়ার আগে গল্প পড়ে শোনানো শুরু মায়ের । বাবা বলত যুদ্ধের গল্প, পশুপাখীর গল্প । মা পড়ে শোনাত রুশ দেশের উপকথা, উপেন্দ্রকিশোরের মহাভারতের গল্প । নিজে নিজে পড়তে শুরু করলাম কিছুপরে । পাঁচবছরের জন্মদিনে দাদু উপহার দিলেন "আবোলতাবোল" ।  বাবা দিলেন পুতুল । 

সুকুমার-সাহিত্য মজ্জাগত হতে হতে হাতে এল "ছোটদের বুক অফ নলেজ" । সে ব‌ই আমার চেয়েও ভারী । সেই ব‌ইকে বালিশে রেখে আমি বসতাম খাটে আর উল্টে যেতাম পাতাগুলো । হঠাত সেই পাতা উল্টোতে গিয়ে এসে পড়ল ইস্কুলবেলা । সাথে গানভাসি হল কৈশোর । 

স্কুলে ভর্তির আগেই মোটামুটি দ্বিতীয়শ্রেণীর পাঠ কমপ্লিট । মুখে মুখে আর লিখে লিখে । মফস্বলের নাম করা মেয়েদের স্কুল বরানগর রাজকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে সেই ভর্তি হওয়া পাঁচবছরে ক্লাস টু'তে । পুরোণো কোলকতার মেয়েদের স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম । প্রথম চালু হয়েছিল বিজ্ঞান শাখা । আর ছিল কেতাদুরস্ত ল্যাবরেটারি । লাইব্রেরীতেও ছিল বিশাল ব‌ইয়ের সম্ভার । ছিল খেলার মাঠ । একটা প্রকান্ড চেরী গাছ আর তার পাশে লিলিপুল । মাঠের একদিকে ছোটমোট গ্রিণ হাউস । অনামা সব ফুলেল ক্যাকটাস থাকত সেই গ্রিণহাউসে। স্কুলের দুটো গেট । একটা কেবল সকালে খুলত প্রাথমিক সেকশানের জন্য আর দুপুরে খুলত দুটোই  । দুই গেটের মাথায় জুঁইফুলগাছের আর্চ আর দুই গেট পেরিয়ে স্কুল অফিসে ঢোকার মুখে দুপাশে গোলাপের কেয়ারি । কি সুন্দর পরিবেশ !  রাজকুমারীদেবীরা ক্রিশ্চান ছিলেন ।   স্কুলের মধ্যে ছিল একটা সেমেটারি ।  সেমেটারীতে বসে টিফিন খেতাম আমরা ।

স্কুলের বাতাবরণ রবীন্দ্রগানে উদ্বুদ্ধ করেছিল । প্রতিবছর স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান আর বর্ষাশেষে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত ছিল বারোটা বছর ।

বাড়িতে হত ক্লাসিক্যাল গানের চর্চা । জ্যাঠামশাই ছিলেন বেতারশিল্পী, তারাপদ চক্রবর্তীর ছাত্র । মায়ের কাছে কীর্তনে নাড়া বেঁধে নেওয়া খুব ছোট বয়সে । মা ছিলেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্রী ।

গ্রীষ্মের   ছুটির পরেই  বৃক্ষরোপণ উত্সবের তোড়জোড়  । দস্তুর মত রিহার্সাল কমন রুমে । বনমহোত্সবের একটা স্ক্রিপট বছর বছর হয়ে আসছে । একটু রদ বদল করে কয়েকটা গান এদিক ওদিক করে নৃত্যনাট্য দাঁড় করানো হয়। সবুজ গাছ লাগানো হয় । খুব উত্সাহে মেয়েরা নাচ গান প্র্যাকটিস করে প্রতিবছর । অনুষ্ঠান শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গান 'আয় আমাদের অঙ্গনে, অতিথিবালক তরুদল ' দিয়ে আর শেষ হয় 'মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও, এ শূন্যে ওড়াও ওড়াও হে প্রবল প্রাণ' দিয়ে ।   প্রথম দৃশ্যে একদল মেয়ে নেচে নেচে মঞ্চে এসে প্রবেশ করে আর শেষ দৃশ্যে তারাই আবার প্রত্যেকে হাতে একটা করে সবুজ চারা গাছ নিয়ে  মঞ্চ থেকে নেমে এসে খোলা স্কুল মাঠের ধার দিয়ে নেচে নেচে চলে । গাইতে থাকে বাকি সকলে যারা এতক্ষণ ধরে গান পরিবেশন করছিল । নাচের মেয়েদের মেঘ রংয়ের শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায় । গানের মেয়েরা কচিকলাপাতা রঙের শাড়ি আর মেঘ নীল ব্লাউজে । আগে থেকে স্কুলের মালি যেখানে যেখানে নতুন গাছ পোঁতা হবে তার জন্য মাটি খুঁড়ে নির্দ্দিষ্ট ব্যাবধানে গর্ত করে রাখে । নাচের মেয়েরা  নাচ করতে করতে একে একে  গাছগুলি সেইখানে রেখে দেয় আর গানের মেয়েরা জলঝারি দিয়ে জল দান করে সেই নতুন গাছের চারায় ।  এভাবেই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ।

 

৫ মে, ২০১৩

অক্ষয় তৃতীয়া


বৈশাখমাসের ব্রত/ বর্ধমান সমাচার   

বৈদিক মতে বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিটি বিশেষ শুভ।  এর নাম অক্ষয় তৃতীয়া।কোনও শুভারম্ভের দিন হিসেবে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অক্ষয় শব্দটির অর্থ হল যার কোনও ক্ষয় নেই অর্থাৎ চিরস্থায়ী। এই তিথিতে কোনও কাজে হাত দিলে তার শুভ ফল অনন্ত কাল ধরে চলতে থাকে। কারও মতে বেদব্যাস এই দিনে মহাভারত লেখায় হাত দেন। কেউ বলেন শ্রী কৃষ্ণ এইদিনে দরিদ্র বন্ধু সুদামা ও দ্রৌপদীকে অক্ষয়পত্র হাতে তুলে দিয়ে ধনসম্পদে ভরিয়ে দিয়েছিলেন। 


মহাভারতে আছে সূর্যদেব এইদিনে পাণ্ডবদের অক্ষয় পাত্র দান করেছিলেন। অক্ষয় পাত্র এমনি এক মন্ত্রপূত পবিত্র পাত্র যা ঘরে থাকলে কোনোদিন অন্নাভাব হয়না। 

এই দিন বর্ধমান সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্মী নারায়ণ এবং কুবেরের পুজো হয়।মানুষের অগাধ বিশ্বাস এই তিথির ওপর। শুভ মহরত বা সর্ব সিদ্ধ মহরত হবে এই আশায়। কারও হয় সেদিন দোকানের হালখাতা খোলা। 
পুরাণে বলে সত্য এবং ত্রেতা যুগের সূচনা হয়েছিল এই তিথিতে। জৈনদের মতে এই দিন আখের রস খেয়ে তাঁর এক বছরের উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন তীর্থঙ্কর ঋষভ। স্বর্গের দেবতা ধনপতি কুবের এই দিন তার হৃতসম্পদ ফিরে পেয়েছিলেন। 

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির একবার  মহামুনি শতানিককে অক্ষয় তৃতীয়া তিথির মাহাত্ম্য কীর্তন করতে বললেন ।
শতানিক বললেন পুরাকালে খুব ক্রোধসর্বস্ব, নিষ্ঠুর এক ব্রাহ্মণ ছিলেন । ধর্মকর্মে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলনা । একদিন এক দরিদ্র ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ তার নিকট অন্ন এবং জল ভিক্ষা চাইলেন । রণচন্ডী হয়ে ব্রাহ্মণ কর্কশ স্বরে তাঁর দুয়ার থেকে ভিখারীকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন  আর বললেন যে অন্যত্র ভিক্ষার চেষ্টা করতে ।
ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর ভিখারী চলে যেতে উদ্যত হল ।
ব্রাহ্মণ পত্নী সুশীলা অতিথির অবমাননা দেখতে না পেরে  দ্রুত স্বামীর নিকট উপস্থিত হয়ে ভরদুপুরে অতিথি সত্কার না হলে সংসারের অমঙ্গল হবে এবং গৃহের ধন সমৃদ্ধি লোপ পাবে, একথা জানালেন ।  
স্বামীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে  ভিখারীকে তিনি ডাক দিলেন এবং ভিখারীর অন্যত্র যাবার প্রয়োজন নেই সে কথা জানালেন । সুশীলা ত্রস্তপদে তার জন্য অন্নজল আনবার ব্যবস্থা করলেন । কিছুপরেই তিনি অতিথি ভিক্ষুকের সামনে সুশীতল জল এবং অন্ন-ব্যঞ্জন  নিয়ে হাজির হলেন । ভিখারী বামুন অতীব সন্তুষ্ট হলেন এবং সে যাত্রায় সুশীলাকে আশীর্বাদ করে সেই অন্নজল দানকে অক্ষয় দান বলে অভিহিত করে চলে গেলেন ।
বহুবছর পর সেই উগ্রচন্ড  ব্রাহ্মণের অন্তিমকাল উপস্থিত হল । যমদূতেরা এসে তার শিয়রে হাজির ।  ব্রাহ্মণের দেহপিঞ্জর ছেড়ে তার প্রাণবায়ু বের হ'ল বলে। তার শেষের সেই ভয়ঙ্কর সময় উপস্থিত । ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তার কন্ঠ ও তালু শুকিয়ে গেল । তার ওপর যমদূতেদের কঠোর অত্যাচার । ব্রাহ্মণ তাদের কাছে দুফোঁটা জল চাইল এবং তাকে সে যাত্রায় উদ্ধার করতে বলল ।
 যমদূতেরা তখন একহাত নিল ব্রাহ্মণের ওপর ।
তারা বলল " মনে নেই ? তুমি তোমার গৃহ থেকে অতিথি ভিখারীকে নির্জ্জলা বিদেয় করেছিলে ?"
বলতে বলতে তারা ব্রাহ্মণকে টানতে টানতে ধর্মরাজের কাছে নিয়ে গেল ।

ধর্মরাজ ব্রাহ্মণের দিকে তাকিয়ে বললেন " এঁকে কেন আমার কাছে এনেছ্? ইনি  মহা পুণ্যবান ব্যক্তি । বৈশাখমাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে এনার পত্নী তৃষ্ণার্ত অতিথিকে অন্নজল দান করেছেন ।  এই দান অক্ষয় দান ।   
সেই পুণ্যে ইনি পুণ্যাত্মা । আর সেই পুণ্যফলে এনার নরক গমন হবেনা । ব্রাহ্মণকে তোমরা জল দাও । এনার প্রাণবায়ু নির্গত হতে দাও । শীঘ্রই ইনি স্বর্গে গমন করবেন "এমনও হত সেই পিতৃতান্ত্রিক যুগে? সতীর পুণ্যে পতির পুণ্যলাভ। 
আমাদের ঘটি বাড়ীতে দেখেছি অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে কালো সরষে জলে ধুয়ে তা শুকিয়ে নিয়ে শুকনো বাটতে। সদ্য ওঠা কাঁচা আম ছাড়িয়ে থেঁতো করে নুন হলুদ মাখিয়ে রোদে দিতে। তারপর কাঁচের শিশিতে ভরে নেওয়া হত সেই জারানো আম, সরষে গুঁড়ো, তেঁতুলের ক্বাথ, চিনি আর সর্ষের তেল । দিন কয়েক রোদে ফেলে রাখলেই তৈরী হত আম কাসুন্দি। চলতি কথায় বলে আমের কাসন। 

২৮ এপ্রি, ২০১৩

ইহারা জাদু জানে ! কিন্তু শেষরক্ষা করিতে জানেনা ।


এ বি সি ডি গ্রুপ..... ইত্যাদি নানা নামের স্বল্প আমানত প্রকল্পে যোজনা করিবার আহ্বান  আসিল । গ্রামে গঞ্জে, শহরে, মফস্বলে স্বাক্ষর মেয়েদের কাজে লাগানো হ‌ইল ঘরদুয়ার হ‌ইতে মাসিক কিস্তি আদায় করিবার উদ্দেশ্যে । তাহারা আপিস খুলিয়াছে কলিকাতার একপ্রান্তে আর এজেন্ট যাইতেছে আরেকপ্রান্তে । কোম্পানির হাবভাব, বিনিয়োগের পলিসি, সুদের হার, টাকা লগ্নী করিবার নিয়ম ইত্যাদি সম্বন্ধে পাখীপড়া করিয়া পাঠানো হ‌ইতেছে । স্বল্প শিক্ষিত শহুরে এজেন্ট ঘর গেরস্থালীর সামাল দিয়া পান চিবাইতে চিবাইতে ব্যাগ বগলে ল‌ইয়া বস্তিবাসীদিগের উন্নয়নে তার কোম্পানির ভূমিকা হ‌ইতে শুরু করিয়া কত টাকা কয় বত্সরে দ্বিগুণ বা চতুর্গুণ হ‌ইবে অবধি জ্ঞান দিয়া মগজ ধোলাই করিতেছে ।
এ বি সি ডি ইত্যাদি গ্রুপের নামকরণের জন্য অভিধানের বিপুল ভান্ডারে সর্বক্ষণ নানাবিধ আর এন্ড ডি চলিতেছে । কোন্‌ নামেতে বাঙালীমন চট করিয়া টুপি পরিবে কিম্বা কোন্‌ নামের প্রলোভনে পড়িয়া এজেন্টের কথার চিঁড়ে অচিরেই ভিজিবে তাহাই গবেষণার বিষয় । আর করিবে নাই বা কেন ? উহাদের নিজ নিজ ক্যাচ লাইনেও চমক রহিয়াছে । কেহ আস্থার যোগান দেয় । কেহ ভরসা দেবার প্রতিশ্রুতি অথবা আজীবন সাথে থাকার অঙ্গীকার। এতসব বিচার করিয়া কাহার সথিত যাইবেন আমজনতা? কাহার উপর ভরসা করিয়া তাহার হার্ড আর্নড মানি গচ্ছিত রাখিবেন ?
উহারা কৃষিজ দ্রব্য হ‌ইতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা হ‌ইতে ভ্রমণ, সংবাদপত্র প্রকাশনা হ‌ইতে টেলিভিশন চ্যানেল, ফিশারি হ‌ইতে জুয়েলারি, বাতের ওষুধ হ‌ইতে জন্মনিরোধন, সিমেন্ট হ‌ইতে ঝরণার জল সবকিছুই দশভুজার মত মেলিয়া ধরিয়াছেন । যৌবনকে ধরিয়া রাখিবার তথা হৃত যৌবন পুনরুদ্ধার করিবার ক্ষমতা রাখে তাহাদের ঔষধ । উহারা পারে না এমন কিছুই নাই । ইকোপার্ক হ‌ইতে হসপিটাল গড়িতে পারে । সূর্যরশ্মিকে কাজে লাগাইতে পারে । লাভ-লোকসান পরের কথা । উহাদের বিজ্ঞাপনের জৌলুসে টিভি চ্যানেলের কুশীলবের চাকচিক্য নিষ্প্রভ হ‌ইয়া পড়িতেছে ।
সাধারণ মানুষ বলিতেছে হাওয়া পরিবর্তন হ‌ইল বটে! সকালবেলায় পথপার্শ্বে কত সংবাদ! কত রঙীন সংবাদপত্রের বিকিকিনি! দোকানে বাজারে নূতন নূতন এগ্রো কোম্পানির চাল, ডাল, আটা, ময়দা, সুজি, বেসন হ‌ইতে শুরু করিয়া মশলাপাতি, পাঁপড় এমন কি ইসবগুল পর্যন্ত থরে থরে সাজানো ! টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিতেছেন । অতএব টাকা লগ্নী করাটা গৃহস্থের পক্ষে কতটাই নিরাপদ! উহারা ভ্রমণ পিপাসু বাঙালীর জন্য বিলাসবহুল হোটেল খুলিয়াছেন । পেলিং হ‌ইতে পুরী, দীঘা হ‌ইতে দার্জিলিং যাইবার জন্য কত সুবন্দোবস্ত করিতেছেন ! ভ্রমণের সাথী স্বরূপ খাঁটি ঝরণার প্রাকৃতিক জল এবং প্রয়োজনীয় ঔষুধপালাও সরবরাহ করিতেছেন ।
কে বলিল বদলের বাঙ্গলায় শিল্প নাই! আবালবৃদ্ধবণিতার কর্ম সংস্থান হ‌ইতেছে এই "কালেকশানের" কৃপায় । যে মানুষগুলো প্রতিনিয়ত খাটিয়া খান তাঁদের কষ্টের অর্থ আলবাত বিনিয়োগ হ‌ইতেছে ঐ এ বি সি ডি ইত্যাদি কোম্পানিতে ! আর তাহারা ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঘাম ফেলিয়া আরো আরো এমন অর্থ আনিয়া কোম্পানির ভান্ডারে ফেলিতেছেন । দেশের মানুষের টাকা দেশের অভ্যন্তরেই ঘুরপাক খাইতে লাগিল । তাহার পর কোম্পানির লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাইল কি চাটিয়াই ছাড়িয়া দিল তা জানিবার প্রয়োজন নেই আমাদের ।
আমরা বাঙলার তাঁতী, তাঁত বুনিয়া খাই । আমার আত্মীয়ের মেধাবীছাত্র অন্যরাজে চাকরী ল‌ইল। আমার বন্ধুর পুত্র বিদেশে পাড়ি দিল । রিয়েল এষ্টেট হ‌ইতে সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল সব‌ই তো হ‌ইল কিন্তু পরিষেবা কিনিবে কে? যে প্রজন্মের ভোগ করিবার কথা তাহারাই পাততাড়ি গুটাইল বিদেশে ।
তাহা হ‌ইলে এত সংবাদপত্র পড়িবেই বা কে? এত শত কৃষিজ সামগ্রী কিনিবেই বা কে? বত্সরান্তে ভ্রমণে আকুল হ‌ইয়া পেলিং কিম্বা পুরী যাইয়া বিলাসবহুল হোটেলে রাত্রিযাপন করিবেই বা কে ?
পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে মাখিবার জন্য পড়িয়া রহিলেন কেবলি বরিষ্ঠ নরনারী । বঙ্গ আমার পরিণত হ‌ইল জেরিয়াট্রিক মহানগরে ।
তাঁহাদের চোখে ছানি । বাইফোকাল উঁচুনীচু করিয়া সংবাদপত্র পড়িতে হয় । কাজেই উপরোক্ত সংবাদপত্রের লেখক বেশী, পাঠক কম ।
তাঁহাদের ক্ষুধামান্দ্য । তাঁহারা স্বল্পাহারী । বাজারের অতসব কৃষিজ দ্রব্য খাইবার শক্তি নাই ।
তাঁহাদের একাকী ভ্রমণ করিবার শক্তি নাই অতএব বিলাসবহুল হোটেল তাঁহাদের কাছে অধরা ।
সুপার-স্পেশালিটি হসপিটাল তাঁদের কাজে আসিলেও আসিতে পারে কিন্তু ল‌ইয়া যাইবে কে ? দেখিবার কেহ নাই । পুত্রকন্যা বিদেশে । আর অত ব্যয়বহুল চিকিত্সার ভার বহন করিবার ক্ষমতাও তাঁহাদের নাই ।
উহাদের টিভি চ্যানেলের বকবকম শোনেন কেবল উহারাই । বৃদ্ধ মানুষগুলি কানেও ভালো শোনেন না আজকাল । অতএব চ্যানেলের কূটকচালি, নৃত্যগীতবাদ্যশৈলী মুষ্টিমেয় দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ র‌হিল ।
তাহারা একটা কাজ ভুলিয়াও করেন না । সেটি হ‌ইল সকল আমানতকারীর মাথার উপর যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা সেবি আছেন এবং সর্বাগ্রে তাহাদের পারমিশান ল‌ইতে হয় সেটি এ বি সি ডি প্রভূত কোম্পানিরা অনায়াসে এড়াইয়া যান । এর ফলে সাধারণ মানুষ যে তাহাদের অর্থ ফেরত পাইবেন সেরূপ কোনো আশ্বাস দিবার সম্ভাবনাও নাই ।
তাহারা জন্মাইল। জয় করিল । আর অচিরেই পলাইল । আমরা ভাবিলাম উন্নয়নের জোয়ার আসিল বুঝি । কিন্তু সে জোয়ার তো সুনামির ন্যায় ভাসাইয়া দিল কত মানুষের স্বপ্ন ।
তিন দশক পূর্বে এমন ঘটনা ঘটিয়াছিল । কিন্তু বাঙালী ভুলিয়া গেল । সেই ট্র্যাডিশান ফিরিয়া আসিল ।
বলিতে ইচ্ছা হয় : 
ইহারা জাদু জানে !  কিন্তু শেষরক্ষা করিতে জানেনা । 
অথবা
টাকা ল‌ইতে পারি কথার মারপ্যাঁচে কিন্তু ফিরাইতে পারিনা ।  
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে, রাজনৈতিক দলাদলিকে দোষারোপ না করিয়াই বলি বাঙালী কি ঘুমাইয়াই থাকিবে ? কে বলিয়াছে তাহাদের এত দুঃখ সহিতে? 

২৭ মার্চ, ২০১৩

দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান !








আমাদের দোল ছিল কিছুটা অন্যরকম । শহুরে দোল যেমন হয় । আগের দিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখতাম ন্যাড়াপোড়ার আয়োজন । ফাঁকা মাঠ থাকলেই শুকনো গাছপালা কেটে "যাক্‌ পুরাতন স্মৃতি, যাক্‌ ভুলে যাওয়া গীতি"  নতুন বর্ষবরণের আগে ধুয়েমুছে পুরোণো জঞ্জাল সাফ !
সূর্য্যিডোবার আগেই রেডি পাড়ার কচিকাঁচারা । তারপর ঝুপ করে সন্ধ্যে নামলেই আমরা বারান্দায় লাইন করে । কোন্‌ পাড়ার ন্যাড়াপোড়ার আগুণের লেলিহান শিখা কতদূর গিয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই ! বিখ্যাত সেই প্রাক্‌ দোলযাত্রার ট্যাগলাইন...
 "আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠবে বল হরিবোল! এ যেন ন্যাড়াপোড়ার রিয়েলিটি শো ! এখন অবিশ্যি না হওয়াই ভালো । নেই খালি মাঠঘাট, পলিথিনিক পথঘাট । পর্যাপ্ত প্লাসটিক পূর্ণ পরিবেশে ন্যাড়াপোড়া নৈব নৈব চ!
অতএব কচিকাঁচা-সবুজ অবুঝ সকলেই মজিনু নীল সেই একফুটের স্ক্রিণে, ভুলিনু ন্যাড়াপোড়া, খেলিনু ক্রুদ্ধ পক্ষী অথবা আপডেটিনু মুখব‌ই দেওয়াল ।
পরদিন সত্যনারায়ণের পায়ে ঢিপ করে পেন্নাম করে আবীর দিয়ে পিচকিরী, বালতি ভরে রঙের গোলা আর বারান্দা দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে রং ভর্তি বেলুন মারা ! আর কারোকে না পাও তো সাদা ধোপ দুরস্ত ফতুয়া পরা বাজার অভিমুখী বাবা, দাদাকেই দাও রং কিম্বা বেচারা কাজের মাসীকে একেবারে চুবিয়ে দাও রঙে । আর সাথে অবিরত মুখ চালানো । ঠাকুর ঘর থেকে ঠাম্মার পুজো করা ফুট কড়াই মুড়কির চূড়ো ক্রমশঃ নিম্নগামী হতে থাকে । হাতে রঙীন মঠ । তখন কেউ ফতোয়া জারিও করেনি মঠের রঙের ওপর । লাল মঠে এলিজারিন, হলুদে মেটানিল..এটা খেওনা, সেটা কোরোনা !

ক্রমে যখন স্কুল পেরিয়ে কলেজগেট, তখন দোল বেশ সিরিয়াস অনার্সের চাপে । তবে দোল ছিল প্রকৃত দোলের মতন । অন্যরকমের মাদকতা আর একটা বিশেষ ছুটির দিনে দোলকে দোলের মত করে পাওয়া ।
তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল ফোন অথবা হাজারো কেবল চ্যানেল । অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকি ! তবে মায়ের হাতে স্পেশ্যাল রান্না ছিল সেদিনের মুখ্য আকর্ষণ । সকালে পোলাও-মাংস কিম্বা রাতে লুচি আলুরদম ছিল দোলের স্পেশ্যালিটি কুইজিন ।
কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটির একলাফে ট্রানজিশান যেন গ্রাউন্ড লেভেল থেকে এক্সাইটেড স্টেটে ফার্স্ট ঝাঁপিয়ে পড়া । কো-এড বাতাবরণ । রঙীন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দ । হেদোর মোড়ে ফুচকা তদ্দিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে । বিধানসরণীর চাচার রোল তখন রাজাবাজারে ঊত্তীর্ণ । সেবার প্রচুর ফাগ খেলা হল একপাল ছেলে মেয়েতে মিলে । সেই প্রথম ছেলে বন্ধুদের সাথে দোল খেলে লালটুকটুকে হয়ে লজ্জায় সবুজ হয়ে মিনিবাসে বাড়ি ফেরা । তবুও আনন্দ আকাশে বাতাসে । কারণ মম যৌবন নিকুঞ্জে তখন পাখিডাকার শুরু হয়ে গেছে । মা বরং খুশিই হলেন । এই তো জগতের নিয়ম । প্রকৃতির গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে । আমগাছে মুকুল আসবে । বাদাম গাছের পাতা ঝরে গিয়ে লাল ফুল সর্বস্ব গাছ হবে এই তো বসন্তের নিয়ম ! মায়ের একরত্তি মেয়েটা কেমন বড়ো হয়ে গেল!
তখন বসন্তে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পাসপোর্ট যেন পাওয়া হয়েই যেত সরস্বতী পুজোতে । তারপরেই দোল । অতএব সেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসা পেয়ে গেছি । তাই সব কিছুতেই মায়ের সায় ।
লালগোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কোর্টশিপ চালু হতে না হতেই বিরহিনী যক্ষের মত দোল রঙীন হত নীল খামে পারফিউম মাখানো চিঠির ভাঁজে লিপষ্টিকের চুমু পাঠিয়ে সাগরপারে ।
কারণ  তখনো হিমেল বসন্তে ইমেল নেই । দোলের দিনে নীলখামে আর্চিস গ্যালারির একটুকরো চিরকূটের নীরব প্রতীক্ষা । বুক ফেটে যায় তো মুখ ফোটেনা । উদাসিনী বেশে বিরহিনী আমি দোলে পেলাম অপ্রত্যাশিত ভালোবাসার সেই নীল খাম । তারপর একে একে গায়েহলুদ, সপ্তপদী ও দোলের গালের লাল রং উঠল সিঁথিতে ।

এখন ফাগুনের ফুল ঝরতে না ঝরতেই চকোলেট-ডে, প্রোপোজ ডে, হাগ-ডে, কিসিং-ডে, ভ্যালেন্টাইনস-ডে পেরিয়ে দোল দে । দোলের আবীরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায় । দোলের রঙের গড়িয়ে পড়তে লাগল অর্কুট অলিন্দ দিয়ে । সেই রঙ গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে ।

এখন দোলের রঙের ওপরেও টেকশো ! রূপ সচেতন বঙ্গতনয়ারা স্কিনফ্রেন্ডলি রং চায় ! ইকোফ্রেন্ডলি আবীর, ভেষজ গুলালে ফ্যাশন ইন ! তাই ডিজিটাল দোল খেলো বাবা!  নো হ্যাপা !  আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না, রং খেলবোনা ! 

ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সাথে ! দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । দোলখেলার প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । এখন দোলখেলার বাতাস সোশ্যালনেটওয়ার্ক ময়তায় । ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলখেলা পেরয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই দোলখেলা । দোলের রং ঝরছে সর্বত্র । ফাগ উড়ছে অনাবিল আনন্দে ।

সারারাত ধরে অনলাইন চ্যাট করে রাতে আধোঘুমে স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কোথা দিয়ে বসন্তের দোলখেলার সকাল এসে পড়ে ! আর এই মোবাইলফোন ? সেও তো দোলের একটা দারুন পজিটিভ ক্যাটালিস্ট । কত সহজে একটা কথা মেসেজ করে জানিয়ে শুরু হয়ে যায় দোলের । মনের মানুষটির হাতের মুঠোয় দোলের ভালোবাসার দুটো কথা টুক করে চলে যায় । আঙুলে আঙুলে এমন চটপট প্রেম কিন্তু আগে ছিল না । এখন অনেক সহজ হয়েছে দুনিয়া ।বাজারে গ্রিটিংস কার্ডের হার্ডকপি ফুরোল, ভালোবাসার নটেগাছ লকলক করে ডালপালা বিস্তার করে দিল ওয়েব দুনিয়ায় ।
দোলের উপহারের তালিকায়  আইপড কিম্বা পেনড্রাইভের কাটতি বেশী । দোলের কবিতার খাতা লুকিয়ে থাকত বালিশের নীচে । আর এখন সেই কবিতা ঝরে ঝরে পড়ছে ফেসবুকের বারান্দায়, কার্ণিশে সর্বত্র । তবে দোল আছে দোলেতেই । একটু অন্য আঙ্গিকে ।  
তখন ছিল তরতাজা সত্যি গোলাপ । আর এখন তা ডিজিটাল । ছিল বসন্ত কেবিনে দুজনে মুখোমুখি দুটো ডিমের ডেভিল কিম্বা ফাউল কাটলেট । এখনো সেই সংজ্ঞা বদলায়নি কিন্তু চপ-কাটলেট থেকে প্রেম এখন বার্গার-মকটেলে আছড়ে পড়েছে অবিরত । দোলের দিনেও সেই হ্যাঙ আউট । শুধু বসন্ত কেবিন এখন বাসন্তী নীল ফেসবুকের কফিহাউস কিম্বা ডিজিটাল ঠান্ডাই শরবতি মেসেজ আদানপ্রদানে, আমাদের সাথে রঙবাজি করতে । আমরা দোলবাজি করি অন্যভাবে । কিছুটা ফেসবুকি দলবাজিতে অথবা ব্লগবাজির ঠেকে । দোলের সেই আনন্দ আর পাইনা খুঁজে । ফুটকড়াই মুড়কি মঠ হারিয়ে গেল । দোলের আটপৌরে আভিজাত্য হারিয়ে গেল ।স্মার্ট হোল দোলবাজি । দোলা লাগল ফেসবুক-বনে কিন্তু দোলের রং লাগল না মনে । দোলের ব্র্যান্ড ডাইলুশান হল !

মক্‌টেল থেকে চকোলেট, কফি থেকে কেক, সোনা থেকে জাঙ্ক সর্বত্র হিয়ার মাঝে লুকোনো হ্যাপি হোলি! হোলির ধামাক, হোলি বাম্পার, হোলি হ্যায় !
শপিং মলে, মেট্রোরেলে, সুইমিংপুলে, তন্ত্রেমন্ত্রে হোলি হ্যায় ! 
 
সেই কবে কবি বলেছিলেন ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত ! তারা পলাশ চিনুক না চিনুক আজ কিন্তু ভালোবাসার দোলের দিন আগতপ্রায় । দোলের রঙ লাগতে না লাগতেই ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করতে হবে... মন্দারমণির বালুকাবেলায় লিখিনু সে লিপিখানি প্রিয়তমারে । ঐ কূলে আমি আর এই কূলে তুমি মাঝখানে একরাশ ডিজিটাল ঢেউ বয়ে যায় !