২২ সেপ, ২০১২

জীবাশ্মে আর শ্বেতপাথরে




আমাদের টিকিট হাওড়া থেকে বিলাসপুর। জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে । রাতের ট্রেন ছাড়ল ভোর সাড়ে চারটেয় । বিকেল চারটে নাগাদ বিলাসপুর পৌঁছলাম । ভাড়ার গাড়িতে উঠে এবার যাত্রা শুরু অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলেবেলায় আমরা তখন অমরকন্টক থেকে আরো পশ্চিমে চলেছি ন্যাশানাল হাইওয়ে ১১ ধরে জবলপুরের দিকে । ডিন্ডোরি আর শা'পুর পেরিয়ে একটি মোড় থেকে বাঁদিকে ১৪ কিমি এগিয়ে চেয়ে দেখি ঘুঘুয়া ন্যাশানাল পার্কের বিশাল গেট । ভারতবর্ষের একমাত্র ফসিল পার্ক এটি ।আমেরিকার এরিজোনার পেট্রিফায়েড ফরেস্ট ন্যাশানাল পার্কের পর পৃথিবীতে বোধহয় এটাই একমাত্র পেট্রিফায়েড ফরেস্ট যা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে ফসিলাইজড হয়ে রকগার্ডেনে রূপান্তরিত হয়েছে । কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় জানা যায় এই স্থানের বিশাল ট্রপিকাল চিরসবুজ বৃক্ষের জঙ্গল ছিল । যার বয়স ৬৫ মিলিয়ন । তাই এই ন্যাশানাল পার্কের প্রবেশ দ্বারে রয়েছে কংক্রীটের বিশাল ডাইনোসরাস । 
 

তক্ষুণি মনে হল রাজোসরাস নর্মোডেনসাসের কথা । ইন্ডিয়ান অরিজিনের এই ডাইনোসরের ফসিল তো নর্মদার তীরেই আবিষ্কৃত হয়েছিল । ভারতবর্ষ যুগে যুগে রাজারাজড়ার দেশ বলে এখানকার ডাইনোসরের নামকরণেও সেই রাজকীয়তার ছোঁয়া । কে জানে হয়ত এই ঘুঘুয়াতেই ঘুরে বেড়াতো নর্মোডেন্সাসের পরিবার ।
                                 সরকারী কেয়ারটেকার । আমাদের ঘুরে ঘুরে সবটা পরিদর্শন করিয়েছিলেন যিনি 
১৯৮৩ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার ঘুঘুয়াকে ন্যাশানাল পার্কের সম্মান প্রদান করে। ঘুঘুয়া এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম উমারিয়া নিয়ে এই ফসিল পার্কের সমগ্র ব্যাপ্তি ২৭ হেক্টর জুড়ে । এখনো অবধি ৩১ টি প্রজাতির উদ্ভিদ সনাক্ত করা গেছে । প্রধানতঃ পাম ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ এরা । ইউক্যালিপ্টাস, খেঁজুর, কলা, রুদ্রাক্ষ, জাম, এই সব ট্রপিকাল সবুজ গাছকেই চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে । 
                                                          ইউক্যালিপ্টাস
সরকারী কেয়ারটেকার আমাদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন । কিছু শামুক জাতীয় অর্থাত খোলসযুক্ত বা মোলাস্কা পর্বের প্রাণীর ফসিল দেখা গেল । এর থেকে বোঝা যায় যে স্থানটি আর্দ্র ছিল এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিও হত এখানে । তারই ফলস্বরূপ চির সবুজ বৃক্ষের সমারোহ ছিল । 

                                  অপর্যাপ্ত ফসিলাইজড চিরসবুজ বৃক্ষের জীবাশ্মের সাক্ষী হয়ে আমরা 

স্থানীয় মানুষ এই অঞ্চলকে বলে "পাত্থর কা পেড়" অর্থাত পাথরের গাছ । আমি বলব গাছ-পাথর । কথায় বলে বয়সের গাছ-পাথর নেই । তার মানে এতদিনে বুঝলাম । যে কত পুরোণো হলে গাছ পাথরে রূপান্তরিত হয় । 
                                                     গাছ-পাথর

অমরকন্টকে এসে পৌঁছলাম বেশ রাত্তিরে । এম পি ট্যুরিসমের লাক্সারি টেন্টে থাকবার ব্যবস্থা । রাতের খাবার খেয়ে এসে বরাদ্দ তাঁবুতে সেরাতের মত আমরা আশ্রয় নিলাম ।



পরদিন ভোরে উঠে এবার আমাদের যাওয়া লাইমস্টোনের দেশে । বিখ্যাত জবলপুর মার্বেল রকস্‌ দেখতে । প্রথমে ভেরাঘাট । জবলপুরের ২২ কিমি দূরে নর্মদা নদী একটি গর্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এখানে । দুধসাদা পাথরের ওপর দিয়ে ঝরণার মত আছড়ে পড়ছে নর্মদা । এই গর্জটির দৈর্ঘ্য ৩ কিমি । নদীর কিনারা দিয়ে, বুকের ভাঁজে মিনারের মত সারে সারে উঠে এসেছে শ্বেতপাথরের স্তম্ভেরা । কি অপূর্ব সেই রূপ । আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের অনুভূতি সৃষ্টি করে । ভেরাঘাট পৌঁছে কেবলকারের টিকিট কিনে রোপওয়েতে যাওয়া হল মাঝ নর্মদায় ধূঁয়াধার জলপ্রপাতের এক্কেবারে গায়ের কাছে । কেবলকারের ঘেরাটোপে ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হতে লাগল আমার নর্মদা । চারিদিকে যেন ফোটোশপড নীল আকাশ । আর ক্যালসিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের গাঁটছড়া । কি অপূর্ব সেই রূপ ! আর নদীর উচ্ছলতায় পুরো পরিবেশটাই যেন ভিন্নস্বাদের । পুব থেকে পশ্চিমে বহতী নর্মদা । সাদা ফেনা হয়ে জল পড়ছে গর্জের মধ্যে আর পুরো জায়গাটি ধোঁয়াময় । 
 
এবার পঞ্চবটী ঘাটে এসে নৌকাবিহারে বান্দরকুঁদনী । দুপাশে মার্বল রক্‌স এর অলিগলি রাজপথের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নর্মদা নদী । নৌকো চড়ে ঘন্টাখানেক যেন ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ভাসমান হলাম । পাথরের কত রকমের রঙ । পরতে পরতে যেন সৃষ্টির প্রলেপ । নৌকার মাঝির স্বরচিত কবিতায় বলিউড থেকে টুজি স্ক্যাম সবই উঠে এল স্বতস্ফূর্ত ভাবে । দুপুর সূর্য্যি তখন মাথার ওপরে । আদুড় গায়ে ডাইভ মারছে স্থানীয় কিশোর নর্মদার বুকে ।

 বর্ষার পর যেন আরো ঝাঁ চকচকে পাথরের রং আর নর্মদাও যেন থৈ থৈ রূপ নিয়ে খুশিতে ডগমগ । লাইমস্টোনের স্তবকে স্তবকে গাম্ভীর্য আর নদীর হাসি মিলেমিশে একাকার । কে যানে পূর্ণিমার রাতে এখানকার নিসর্গ কেমন হয় ! কোজাগরীর রাতে আবার আসতে হবে এই বলে প্রণাম জানালাম মা নর্মদাকে । 


সকালবেলা, "ঘুরেআসি"  সংবাদপত্রে প্রকাশিত বৃহস্পতিবার,  ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১২ তে প্রকাশিত "সৃষ্টিপাথরের উপাখ্যান"   ঘুঘুয়া ফসিল ন্যাশানাল পার্ক এবং জব্বলপুর মার্বল রকস নিয়ে ভ্রমণ বৃত্তান্ত   

১৮ সেপ, ২০১২

প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা ২০১২ প্রকাশিত হল

 পটশিল্পীঃ আয়েষা ও বাবলু পটীদার
গ্রাম নানকারচক, পূর্ব মেদিনীপুর 

সেই বাংলা বছরের প্রথমদিনে প্যাপিরাসের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছিল ।

ততদিনে সুনীতা উইলিয়ামস ভেসে রয়েছেন এই মহাবিশ্বে, মহাকাশে । কিউরিয়োসিটি খোঁজ নিতে গেছে মঙ্গল গ্রহের জল-মৃত্তিকার খুঁটিনাটি কিম্বা একরত্তি জীবনের । এবারের অলিম্পিকও আমাদের একেবারে নিরাশ করেনি । স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন এক বাঙালি । উত্তরপ্রদেশের এক বাঙালী বৈজ্ঞানিক নোবেলের সমতুল্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন । “রিসেশন-ইনফ্লেশন” চাপানোতরের পাশাপাশি  সামাজিক দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় মাদুর্গাকে স্মরণ করেছি মনেমনে ।  আমাদের সকলের শুভকমনায় আর মাদুর্গার আশীর্বাদে ক্রিকেটের মাঠ আলো করে আবার যুবরাজ সিং ব্যাট হাতে ধরেছেন ।   অনেক গুণী মানুষকে আমরা হারিয়েছি এই কয়েকটা মাসে ।মনে মনে অনুভব করেছি..”একলা ঘরে হাতড়ে মরি, শিল্পী তোমার শূন্যতা” !



এই ছ’টি মাস প্যাপিরাসের নিরম্বু উপবাস । শুধু পাঠকমহলের আদর প্যাপিরাসের পাথেয় যুগিয়েছে । লেখক, কবি এবং সর্বোপরি পাঠকদের ভালোলাগা আর ভালোবাসাকে সাথে নিয়ে হৈ হৈ করে সেজেগুজে প্যাপিরাস সাজিয়েছে তার পুজোসংখ্যাটিকে ।
আমাদের এবারের সবচেয়ে বড়প্রাপ্তি হল চিলেকোঠার ঘর ঝেড়ে পাওয়া  স্বর্গতঃ শুভ্রেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একখানি কবিতার খাতা । পাতার রঙটা বাদামী হয়েছে যার সময়ের সাথে সাথে কিন্তু পেন্সিলে লেখা খাতাভর্তি কিছু দুষ্প্রাপ্য কবিতা আজো অমলিন । ১৯৪৪ সালে ছাত্রাবস্থায় মাত্র ১৭ বছর বয়সে লেখা কবিতাগুলির মধ্যে থেকে দুটি কবিতা এবারের প্যাপিরাসকে সমৃদ্ধ করেছে ।


বেশকিছু রন্ধন পটিয়সী “হোমমেকার” স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্যাপিরাসকে উপহার দিয়েছেন তাঁদের কিছু সেরা পূজোর রেসিপি । একাকীত্বের অবসাদ কাটিয়ে অনেক বছর বাদে কলম ধরেছেন খড়গপুরের বিশ্বজিত সরকার । রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর চাক্ষুষ অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন একদা বাংলা সাহিত্যের এই ছাত্র।  আমাদের কবিবন্ধুদের  জানাই মুঠোমুঠো শিউলিঝরা অভিনন্দন । এবারের শব্দসীমা লঙ্ঘন না করে অনেকেই লিখেছেন সুন্দর অণুগল্প, ছোটগল্প এবং ভ্রমণ বৃত্তান্ত ।


পাঠকদের অনুরোধে এবার থেকে প্যাপিরাসে রাখলাম একটি বিষয়ের ওপর ফোরাম বা আলোচনা চক্র  যার নাম দিলাম “চক্রবৈঠক” ।   সমাজের বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছিল আমন্ত্রণ মূলক লেখা, বিষয়টি ছিল “ইন্টারনেট”  । তাদের সাড়া পেয়ে প্যাপিরাস আপ্লুত এবং অনুভূত । এত ব্যস্ততার মধ্যে সকলে যে সুচিন্তিত মতামত পাঠিয়েছেন সে জন্য আরো একবার তাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই ।
এবার যেন “হেমন্তে শরত” এর পথ চাওয়া । তাই বুঝি অতিবৃষ্টি আর খরার টানাপোড়েনে আমরা কাবু না হয়ে একটু বেশি সময় হাতে পেয়েছি পুজোসংখ্যা প্রকাশের ।
জীবনের আলপথগুলো গুলো চলতে চলতে অনেক বন্ধু এল চারপাশে । একঘেয়েমি কাটল ফেসবুকের একচিলতে ব্যালকনিতে । চলতে থাকে জীবন। আলগোছে, আলতো পায়ে । মনের কার্ণিশ বেয়ে নিঃশব্দে উঁকি দেয়  এসেমেস। বেজে ওঠে মুঠোফোন ঝন্‌ঝন্‌ । আমার মনোবীণায় সে ঝঙ্কারে হয়ত সামিল হয় অচেনা কোনো পাখি ।   ইনবক্সে উড়ে আসে অচেনা মেল, হঠাত মেল । বলে প্যাপিরাসকে ভালোবাসার কথা ।
চলতেই থাকে জীবন ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার ঘ্রাণ নিয়ে.. অলস সময় পেরিয়ে যায় বৃষ্টিপথ, ভাবনার গদ্যেরা ভেসে যায় আপন খেয়ালিপথে, আলগোছে, আলতো পায়ে… প্যাপিরাসের হাত ধরে  ! মনে মনে বলে উঠি,তুমি মেঘ-রোদ-বৃষ্টি হলে আমার ড্র‌ইং বারান্দায়
তুমি আলো-আঁধারের খালপাড়ে, আমি ভরাবর্ষায় ।
বৃষ্টিফোঁটায় কবিতা হতে চেয়েছিলে তুমি
আর আমি তোমার কর্ণিকা ।
জড়িয়ে ছিলে দুচোখে, ভরেছিলে ভোরবেলা
দিয়েছিলে সন্ধ্যে, অনেক অনেক আনন্দে ।
তবু এখনো বর্ষা হতে পারলাম ক‌ই ?

কিন্তু “বর্ষা” হওয়ার চেষ্টা তো আমরা করতেই পারি তাই নয় কি ?  তাই তো গ্রামবংলার শিল্পকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার চেষ্টায়  প্যাপিরাসের পুজোসংখ্যার থিম  গ্রামবাংলার পটচিত্র । মেদিনীপুরের মেলায় এবছর আলাপ হয়েছিল এক পটু পটশিল্পী দম্পতির সাথে ।  খড়গপুরে তাদের আমরা আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে বেশ কিছু পটচিত্র আঁকিয়েছিলাম বাংলার এই শিল্পকে সম্মান জানানোর জন্য ।  বন্ধুবান্ধবের অনুরোধে তারা নানারকমের পটশিল্প সামনে বসে এঁকে  পট-ভিত্তিক আনুষাঙ্গিক ঘরসাজানো এবং ফ্যাশানের জিনিষ বিক্রি করে যারপরনেই খুশি হয়ে বাড়ি ফিরেছিল  তাদের লক্ষ্মীর ঝাঁপি নিয়ে  । সেই দম্পতিকে খুশি করতে পেরে আমরা, যারা  সেদিন তাদের পাশে  ছিলাম তারাও আপ্লুত হয়েছিলাম ।

এবারের প্যাপিরাস পুজোসংখ্যাতে সেই অভিনব লোক-শিল্পের ছোঁয়া লেগেছে । পূর্ব মেদিনীপুরের নানকারচক গ্রামের বাসিন্দা বাবলু পটিদার ও আয়েষা পটিদার অক্লেশে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাদের ২৫০ বছরের পুরোণো বংশ পরম্পরার ঐতিহ্য ।  মাদুর্গার কাছে প্রার্থনা করি তাঁরা যেন আরো বেশি প্রচারের আলোয় আসতে সক্ষম হন !


সকলের পুজো আনন্দে কাটুক ! প্যাপিরাসের লেখক ও পাঠকদের জানাই শারদীয়া শুভেচ্ছা।

প্যাপিরাস পড়ুন এবং পড়ান । আপনার মূল্যবান মন্তব্যটি ওখানে কমেন্ট ফোরামে লিখুন ।  

৮ সেপ, ২০১২

প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা



প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা আসছে !
এবারের প্যাপিরাস পুজোসংখ্যা ২০১২ আর কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হতে চলেছে । 
একগুচ্ছ মন ভোলানো কবিতা, প্রবন্ধ, ভিন্নস্বাদের একরাশ অণুগল্প, ছ'টি  দুর্দান্ত  ছোটগল্প,  মনকাড়া একঝাঁক পুজোর রেসিপি, আর তিনটি অসামান্য ভ্রমণ বৃত্তান্ত নিয়ে  সেজেগুজে হাজির হবে প্যাপিরাস সকলের কাছে ।  
আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের অপেক্ষা । 
বন্ধুদের লেখা পাঠানোর জন্য শিউলিভেজা শারদীয়া অভিনন্দন জানাই !  


২২ আগ, ২০১২

রুদ্ধসংগীতের লেখক-গায়ককে আমার প্রণাম !


দেবব্রত বিশ্বাসকে আরো জানতে দেখুন এই নাটক । পড়ুন ওনার লেখা এই ব‌ইখানি । অনেক না জানা কথা আছে ব‌ইটিতে অন্ত্ঃসলিলা ফল্গুনদীর মত বয়ে চলেছিলেন আপনমনে । শিল্পীর প্রতি আমার নীরব শ্রদ্ধা । 



 "কালিন্দী ব্রাত্যজন" নাট্যগোষ্ঠীর পরিবেশনায় ব্রাত্য বসু পরিচালিত "রুদ্ধসংগীত" নাটকটি শেষমেশ দেখা হল । এটি তাদের ৮৫তম পরিবেশন ছিল । যখন বিগত কয়েকবছর ধরে সমগ্র বাঙালী এর রস আস্বাদন করে নিয়েছেন আমি অবশেষে সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করলাম । আজ ৪ঠা নভেম্বর ক্যালকাটা ক্লাবে দেবব্রত বিশ্বাসের  শততম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে এই নাটক প্রদর্শন ছিল সঙ্গীতশিল্পীর উদ্দেশ্যে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য । দেবব্রত বিশ্বাসের রচনায় " ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত" ব‌ইটি কিছুদিন আগেই পড়েছিলাম । তাই দেখবার ইচ্ছেটা প্রবল ছিল । ব‌ইটিতে দেবব্রত বিশ্বাসের সাবলীল স্মৃতিচারণা এবং ওনার সাঙ্গীতিক জীবনের টানাপোড়েন অত্যন্ত স্বতস্ফূর্ত ।   অনেক না জানা তথ্য এবং বিশেষত বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের কর্তৃত্ত এবং যারপরনাই ওনার মত প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর প্রতি অযথা হম্বিতম্বি, ওনার রেকর্ডেড রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমালোচনা এবং  ওনার সুর এবং স্বরপ্রক্ষেপনের প্রতি কটুক্তি, যন্ত্রানুষঙ্গের ব্যাবহার ...এ সবকিছুই আছে ব‌ইটির মধ্যে । যে কঠোর সমালোচনায় দগ্ধে দগ্ধে শেষ হয়ে গিয়েও উনি হাল ছেড়ে দেননি এবং শেষজীবনে রুদ্ধ হয়েও কন্ঠ তাঁর রুদ্ধ হয়নি । রুদ্ধসঙ্গীত নাটকটি কিন্তু শুধুই এই ব‌ইটি নয় । এতে আছে কিছু নাট্যব্যক্তিত্ত্ব, নৃত্যশিল্পী, কবি, সঙ্গীতকার ও সুরকার  এবং সর্বোপরি সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস ওরফে তাঁদের সকলের জর্জদার প্রতিনিয়ত ওঠাবসা এবং আলপাচারিতা । গণনাট্যকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস্, সলিল চৌধুরী , ঋত্বিক ঘটক্, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত ব্যাক্তিত্ত্বদের সাথে একদা বাম আন্দোলনের শরিক দেবব্রতের কেমন করে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। উঠে আসে বেশ কিছু অজানা তথ্য এই সব ক্রিয়েটিভ মানুষদের জীবনে উঠে দাঁড়ানো নিয়ে । কেমন  করে বামপন্থী আন্দোলনে সামিল হয়েও এই সব মানুষ গুলি মেনে নিতে পারেননি তাঁদের ওপর দলের ছড়ি ঘোরানো বা ডিক্টেটরশিপ বা দলের মতে না চললে আননেসেসরি তাকে অপবাদ দিয়ে কোণঠাসা করে দেওয়া । 
জর্জদার স্নেহধন্যা নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকীর সহিত কথোপকথন, সুচিত্রা মিত্রের  জর্জ বিশ্বাসের গায়কীকে শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া ইত্যাদি আরো অনেক কিছু । 
সব মিলিয়ে নো প্যানপ্যানানি, নো মেলোড্রামাটিক কচকচানি, নো প্রেমপ্রেম খেলা, নায়কের ঘাড়ে মাথা রেখে নায়িকার ফুঁতফুতানি  । রিয়েলিস্টিক  নাটক । সত্যি ঘটনা । নেই আলাদিনের প্রদীপের চমক কিন্তু আছে স্পষ্টভাষণ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং সলিল চৌধুরীর গান রচনার প্রেক্ষাপট  এবং সর্বোপরি দেবব্রত বিশ্বাসের বহু বিতর্কিত গান গুলির গায়কী নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি শুনতে পাওয়া গেল সেই এইচএমভির সেই ৭৮ আরপিএম রেকর্ডের গানের অংশবিশেষ । তাই এই নাটক না দেখলে অনেক কিছুই না দেখা থেকে যাবে বলে আমার বিশ্বাস । আর দেবব্রত বিশ্বাসের ভূমিকায় দেবশঙ্কর হালদার আবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি কত বড় মাপের একজন শিল্পী ।     
http://www.youtube.com/watch?v=V7nJZjvfNA8

৬ আগ, ২০১২

ভূস্বর্গ কাশ্মীরে কয়েকদিন....

  ১৭ই মে ২০১২
প্রতিবার পাহাড় না সাগর এই বিতর্কে হেরে যাই আমি । গরমের ছুটির ফাঁদে পা দিলেই হিমালয় টেনে নিয়ে যায় তার কাছে । এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না ।
আমরা তিনজনে দিল্লী থেকে আবার শ্রীনগরের উড়ানে ।

ভূস্বর্গ কাশ্মীর কে তুলনা করা হয় ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে । কয়েকদিনের জন্যে না হয় তোলা থাক সে তুলনা । সুইস আলপ্‌সের স্মৃতি তোলা থাক এলবামে । ওরে হিমালয় যে আলপ্‌সের চেয়ে কিছু কম নয় ...এই বলতে বলতে এগিয়ে চললাম ফোটোশপড নীল আকাশের দেশে । এমন নীল যে কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি চলল হৃদয়পুরা দিয়ে । 
ঝাউগাছ আর লতানে গোলাপের গুল্মের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বারবার মনে পড়ছিল ওপি নায়ারের কাশ্মীর কি কলির গানের সিকোয়েন্স । 

স্লোপিং রুফের বাড়িগুলো দেখে মনে পড়ে গেল খবরের কাগজের তুষারপাতের কথা । পথে চাপদাড়ি যুবক, বোরখা ঢাকা যুবতী আর মোড়ে মোড়ে সিআর পিএফ জওয়ানদের ভ্যান গাড়ি দেখে অনুভব করলাম কাশ্মীরের প্রতিকূলতা । 

পথে পড়ল রাজবাগ পার্ক । ঝিলামকে দেখলাম একঝলক । একে বলে বিতস্তা । ড্রাইভার মুক্তেয়ার বলল "দরিয়া ঝালেম" । 
ঝিলাম সেতু পেরিয়ে ডাল ঝিলে এলাম আমরা । একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ । 

লেক যে এত বড় হয় আগে কখনো দেখিনি । শিলং এ বড়াপানি লেক দেখেছিলাম, সুইজারল্যান্ডের লুগানো লেক দেখেছিলাম । কিন্তু তাই বলে এত হৈ হৈ হাউসবোটের পসরা আর কূলে কূলে এত শিকারা ? 
 শিকারার সারি বাঁধা ডাল লেকের ধারে.......

 ডালঝিলের মধ্যে ভাসমান পোষ্ট অফিস দেখে যারপরনেই অবাক আমরা !
নেহরুগার্ডেনে অবতরণ গোলাপের বাগানে । একটু ছবি তোলা । 


  নেহেরু গার্ডেন থেকে ডাললেকের প্যানোরমিক লুক  !!!
ডাললেকে ভোরের আলোয় একরকম । 

আবার ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যের ঝুলে তার রূপ অন্যরকম । আবার রাতের বেলা যেন পরী সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে রঙীন আলোর হাউসবোটের পসরা নিয়ে সেই একই ডাললেক সুন্দরী  ।  

আবার ভাসমান শিকারায় । মাছ খেগো বক, সারস আরো কত কি সেই ডাললেকের জলে ।  

 আশপাশে ভাসমান সবজী বাগানের মধ্যে দিয়ে লিলিপুলের মধ্যে দিয়ে । 

 হাউসবোটের রোয়াক ঘেঁষে । 
১৮ই মে ২০১২ 
শ্রীনগরের ডাললেকের ধারে হোটেলের কামরা থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শব্দে ঘুম গেল ভেঙে । মেঘ না মৌসুমী ? কাঁচের জানলায় অন্ধকারের থাবা । ভূস্বর্গ বৃষ্টিস্বর্গে পৌঁছে গেল না কি ! মনখারাপের পার্টির শুরু । জানলার ভারী পর্দা সরিয়ে দেখি কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে । 

প্রথমে টুথব্রাশ তারপর চায়ের কাপ হাতে আমি চোখ রেখেছি পাহাড়ের মাথায় । কখনো মেঘ উড়ে গেলে তুষারশিখর মুখ বেরে করছে আবার মেঘের চাদর তার গায়ে । আমাদের মনের চাপা টেনশনে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে ততক্ষণে । রুম হিটার বন্ধ করলাম । হঠাত চানঘর থেকে এসে দেখি রোদ উঠেছে । পাহাড়ের চূড়ো হাসতে শুরু করেছে খিলখিল করে । সবজী পরোটা আর দৈ সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়া হল পহেলগামের উদ্দেশ্যে । হালকা ঠান্ডা তখন চিনার বনের মধ্যে । ঝিলামের ধারে ধারে চিনারের এই অভিভাবকত্ব মুঘল আমল থেকে । চিনারকে কেউ কুড়ুল মারতে পারবেনা । এই ইকোফ্রেন্ডলি চিনারকে নিয়ে কাশ্মীরিদের খুব গর্ব । 
এই সেই ঐতিহাসিক চিনার বৃক্ষ । সবুজতায় আর রাজকীয়তায় পূর্ণ !  চিনার পাতা কাশ্মীরের শিল্পকর্মের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত । 
পথে পড়ল পান্থচক । পাথরের সব কারখানা । কারিগরেরা সেখানে খুদে খুদে বানাচ্ছে শিল নোড়া, খলনুড়ি, হামান দিস্তা । কিনে ফেললাম একটা খলনুড়ি । বেশ অন্যরকম দেখতে । এটাই কাশ্মীরের ট্র্যাডিশানাল মশলা পেষার কল ।
লিডারভ্যালির ওপর দিয়ে চলেছি আমরা । মেঘ এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে কখনো ।
টোলবুথে পয়সা ফেলে বেলাবেলি পহেলগামে প্রবেশ করলাম ।

 দাঁড়কাকের কর্কশ স্বর নির্জনতাকে ছাপিয়ে দিল । রাখাল ভেড়ার পাল লয়ে যায় মাঠে । ঘোড়া সওয়ারি নিয়ে ঘন্টি নেড়ে হাঁটে । হোটেলে পিটস্টপ । মালপত্র রেখেই বিলেটেড লাঞ্চ । তারপরই দরদস্তুর করে ঝিরিঝিরি ঝাউয়ের মাথায় টুপটাপ বৃষ্টি নিয়ে আমাদের ঘোড়ায় চেপে বৈশরণ এডভেঞ্চার । তিনটে জবরদোস্ত ঘোড়া , দুই সহিস আর আমরা তিন মূর্তি । ঘন বাদামী আট বছরের বুলডোজার্, হালকা বাদামী দশ বছরের চেতক আর আমার সফেদ ঘোড়া মাত্র তিন বছরের বাদল । 
বৈশরণ এল বুঝি । পাইনগাছের সারি দিয়ে ঘেরা সবুজ প্রান্তর । দূর দিগন্তে নীল আকাশের পৃথিবী । পৃথিবীর নীচে ঐ প্রান্তর যার নাম সুইত্জারল্যান্ড পয়েন্ট । ছবি তুলে তফাত করা যাবেনা আল্পসের বরফচূড়ো আর হিমালয়ের বরফচূড়োয়। ভিউপয়েন্টও বটে । নো প্লাস্টিক জোন । পরিচ্ছন্ন চা-কফির ঠেক । ঘোড়া থেকে নেমে গরম চায়ে চুমুক । ননস্টপ ডিজিটাল ক্লিকে বন্দী হল ভারতের সুইস পয়েন্ট । 
 পহেলগামে  টিপিক্যাল কাশ্মীরি ডিনার হল এক পথ-হোটেলে । অসাধারণ সুস্বাদু কাশ্মীরি খানা । গরগরে, মশলাদার মাটন গুস্তাবা আর রিস্তা । সাথে গরম রুটি । গ্যাস্ট্রোনমিক আনন্দে উদরপূর্তি । 
 
১৯শে মে ২০১২
পাহাড়চূড়োয় বরফ । বরফচূড়োয় রোদ পড়েছে । মেঘমুক্ত আকাশ । গরমজলে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট আর তারপরেই বেরিয়ে পড়া মেঘমুক্ত আকাশের উদ্দেশ্যে । কখন আবার বৃষ্টির কবলে পড়ে যাই । আজ আমরা গাড়ি নিয়ে আবার লিডার উপত্যকায় বেড়াব । নদীকে ছুঁয়ে দেখব ; তার উষ্ণতায় আজ গরমদেশের মানুষের আহ্লাদে আটখানা হবার । 
 
 ২০শে মে ২০১২
কাশ্মীর ভ্যালি এল ।

 পৃথিবীর সর্বোচ্চ গল্ফকোর্স । ঠুকঠাক গলফ বল মারছে কোনো খেলাড়ি । গাড়ী সেই গল্ফকোর্স কে পাশ কাটিয়ে আরো আরো পাইন আর দেওদারের মধ্যে দিয়ে এসে পৌঁছাল মস আর ফার্ণ ঘেরা কাঠের হোটেল ঘরে । 
গুলমার্গ এডভেঞ্চার  শুরু !
২১শে মে ২০১২
গন্ডোলা অভিযান @ গুলমার্গ    ! লাইন দিয়ে গন্ডোলা রাইডের টিকিট কাটা হল । 

 কেবল কার রোপওয়ে দিয়ে উঠবে পাহাড়ের মাথায় । এখানে তাকে বলে গন্ডোলা রাইড । 
২২শে মে ২০১২
সোনমার্গ অভিযান  ! ছুঁতে হবে বরফকে । টবোগানিং ! অনাস্বাদিত রোমাঞ্চকর অনুভূতি হল । বরফ থেকে গড়িয়ে পড়ার । সেই উঁচু থেকে নীচে ।  
 শ্রীনগর থেকে সোনমার্গের পথ.....

৪ঠা আগষ্ট ২০১২, শনিবার   আনন্দবাজার পত্রিকার "ব্যাগ গুছিয়ে" বিভাগে প্রকাশিত   
২৩শে মে ২০১২ 

ডাল লেকের এক হাউসবোটে বন্দী হলাম আপাততঃ দুদিন, দুরাতের জন্য ।  হাউসবোটের মালিক কাশ্মিরী । তার নিজস্ব হাউসবোটের নাম "হোটেল ক্যালিফোর্ণিয়া" !

 সেই হাউসবোটের ডাইনিং টেবিলে বসে গুগল ম্যাপে খোঁজা হচ্ছে আমাদের হাউসবোটের অস্তিত্ব ।
 রাহুল সেই গৃহ নৌকার মধ্যে ঢুকেই বসে পড়েছে ব্লগ লিখতে..
আমার অন্তরে তখন বাজছে সেই গিটারের সুর... বহুযুগ আগে ঈগলস্‌ এর সেই বিখ্যাত গান ।   
কেশর, আখরোট, শিলাজিত, উইলোকাঠের ক্রিকেট ব্যাট আর কাশ্মিরী কাঠের কারুকার্য , শাল-আলোয়ানের এম্ব্রয়ডারি,  আর পশমিনার সম্ভারে এখানকার মানুষজন অনেক প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে বেঁচে রয়েছে । তবে মনে মনে এদের খুব গুমর কাশ্মীর কে নিয়ে, তার ঐশ্বর্য নিয়ে । আর কেনই বা হবেনা ?   

 
 
 



 
 
 

 

 
 





৩০ জুল, ২০১২

উচাটন

আবার সেই উচাটন
আবার একলা আমার মন 
আবার সেই পথচাওয়াতেই 
কাটবে আমার  সর্বক্ষণ !
আবার সেই শিউলিঝরা
কাশফুলেতে মাতবে মন 
দেখতে দেখতে শুনতে পাব 
পুজো শেষের শীত কাহন!
আবার তখন আসবে ওরা   
দলবেঁধে সব রেলকামরা 
নতুন ধানের পরব যখন
সেই তো ওদের আসার ক্ষণ ।      

১০ জুল, ২০১২

কর‌ লো দুনিয়া মুঠ্‌ ঠি মে......

প্রথমে বেড়ানো ছিল রেলগাড়ি করে । কুঝিকঝিক করতে করতে বিশাল ট্রেনকে টেনে নিয়ে যেত স্টিম ইঞ্জিন । তারপর এল ইলেকট্রিক ট্রেন । ডিজেল থেকে বিদ্যুত উত্পাদন করে তা দিয়ে ট্রেন যা আমরা এখনো চড়ছি । তবে স্থান কাল পাত্রভেদে ট্রেনের জার্ণি বড্ড আরামদায়ক হয়ে ওঠে যখন রিজার্ভড আসন থাকে এবং ট্রেনটি পরিচ্ছন্ন থাকে । আশপাশের অনবরত বদলে যাওয়া দৃশ্যপট এই যাত্রার আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে । সেই সবুজ ধানক্ষেত বা গ্রামের চালাঘর কিম্বা দূরের সেই তালদীঘি কেমন যেন নস্ট্যালজিক করে তোলে । এখন সময়ের অভাবে ট্রেনে না গিয়ে হয়ত প্লেনে যেতে হয় আমাদের কিন্তু যে যাই বলুক ট্রেনে চলার সাথে সাথে কেমন যেন গ্রাম্যগন্ধ ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে আর ষ্টেশন এলেই সেই চা'ওয়ালার ডাক কিম্বা নিষিদ্ধ সব ডিপফ্রায়েডের হাতছানি ? এখন চা ওয়ালার সফিষ্টিকেশন লেভেল অনেক ওপরে । ফোটানো চায়ের পরিবর্তে টিব্যাগ এসেছে । জনগণের কল্যাণার্থে, চা-কফির পাশে জায়গা করে নিয়েছে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল ও খনিজলবণ সমৃদ্ধ পানীয় জল । মনে মনে ভালোলেগেও যায় এই সব দেখেশুনে । নিজের দেশটাকে কে না ভালো দেখতে চায় !
প্লেনে কেমন যেন একটু বেশি শহর-শহর গন্ধ । চেনা শহরটা হুস করে পেরিয়ে যাবার আগেই একফালি বিকিনি জানলায় চোখ রেখে একচিলতে নীল নদীটাকে সি অফ করে চলা । শহরের আলুলায়িত নীলচে সবুজ নিকেল সালফেটের মত ল্যান্ডস্কেপটাকে টপকে টপকে মেঘের মধ্যে দিয়ে ভাসতে ভাসতে মনে হত এই যে নীচের শহরটাকে দেখছি সেখানে কোথাও একটা বিন্দুর মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমার বাড়ি । ভাবতে ভাবতেই নিমেষের মধ্যে হারিয়ে যেত আমার শহর, নীল নদী, সবুজ গড়ের মাঠ, সবুজ ঘেরা লেকের জল । মেঘের বাড়ির জানলা একে একে বন্ধ হয়ে যেত । পাইলট প্লেন ঘুরিয়ে দিত গন্তব্যের নিশানায় । আরবান ল্যান্ডস্কেপ, ব্যস্ত জীবনযাত্রা আমার চোখের আড়ালে তখন । প্রথম প্রথম প্লেনে উঠে মনে হ'ত সত্যি সত্যি এটা আমার শহর ছিল তো ! এছিল শেষ আশির দশকের ভাবনা ।
তারপর হাইরাইজ, শপিং মল আরো ঝকঝকে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ্, ম্যানিকিওর্ড টাউনশিপের সবুজ, তারমধ্যে একরত্তি সুইমিংপুলের নীল প্লেনের জানলায় ধরা দিল । এরোপ্লেনে উঠে ককপিটে গিয়ে পাইলটের কেরামতি দেখা হত । দক্ষিণদিকে যাবার সময় পাইলট আর কেবিন ক্রু'কে রিকোয়েষ্ট করা হত বঙ্গোপসাগর এলেই জানান দিতে, যেন পুরীর মন্দিরকে ওপর থেকে একটা ঢিপ করে পেন্নাম করে নিতে পারি কিম্বা উত্তর দিকে গেলে বেনারসের কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরকে । তখন পাইলটের দুনিয়া, প্লেন চালানোর কেরামতি আর ঐ এক স্কোয়ার ফুট জানলার মধ্যে দিয়ে নিজের দেশের খুঁটিনাটি ঐশ্বর্য্যটাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করাটাই ছিল বিরাট আনন্দের । আর রোদঝলমলে দিনে হিমালয়ের মাথায় রূপোর ঝালর ? সেটা দেখলে মনে হ'ত প্লেনে চড়ার পয়সা উশুল । মনে মনে বিজ্ঞানকে ধন্যবাদ দিতাম ।
মুঠোফোনের দুনিয়াটা কেমন ধীরে ধীরে বদলে দিল জীবনকে ।
এল বেশ গোদামাপের মুঠোফোন । তখন এয়ারপোর্ট পৌঁছে বাড়িতে সংবাদ দেওয়াটা ছিল আরো রোমাঞ্চকর ব্যাপার । তারপর প্লেন ছাড়ার ঠিক আগের মূহুর্তে সেলফোন অফ করার আগে আরেকবার ফোন করে জানানো...  
এ কথাই শেষ কথা নয়তো!
তারপর সংক্ষিপ্ত বার্তাবিনিময় বা এসেমেস চালু হল । আরো সুবিধে হল । কম খরচে যোগাযোগ । মনে মনে বিজ্ঞানের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই ।
এবার রঙীন সেলফোন । স্লিম এন্ড ট্রিম । ক্যামেরাও আছে । ছবি তুলে এমএমএস পাঠানো যায় । অপব্যবহারে বেশী কাটতি হলনা এই এমএমএস প্রযুক্তির । মনে মনে বিজ্ঞানকে কটাক্ষ করলাম । 

টেলিফোনে সেলফোন প্রযুক্তির দুটি দিক আছে । একটি হল হ্যান্ডসেটের প্রযুক্তি আন্যটি হল সেলফোন পরিষেবার প্রযুক্তি । এই দুটি প্রযুক্তির মেলবন্ধনে গ্রাহক নানারকম সুযোগ সুবিধে পেয়ে থাকেন । গোড়ার দিকে সেলফোন পরিষেবার যে প্রযুক্তি ছিল সেটি ভয়েস বা কথা বহন করতে পারত । সেই যুগের হ্যান্ডসেটের প্রযুক্তি তা কেবল একটি রঙ ( মোনো ক্রোম্যাটিক) অক্ষর এবং সংখ্যা ( আলফা নিউমারিক তথ্য ) স্ক্রিনে দেখাতে পারত । এর পরে পরিষেবার প্রযুক্তি উন্নত হয়ে 2G বাঅ দ্বিতীয় জেনারেশনে পৌঁছল । এই 2G পরিষেবা (GSM বা CDMA)কথার সঙ্গে ডেটা বা তথ্য বহন করতে পারল ।


হাতের তালুতে সেলফোনটি নিয়ে কেন জানি বারবার মনে পড়ে যায়, কোনো এক টেলিকম কোম্পানির একদশকের পুরোণো সেই বিখ্যাত শ্লোগানটিকে.... "কর‌ লো দুনিয়া মুঠ্ঠি মে"
সত্যি তো এই মুঠোফোন পুরো দুনিয়াটাকে হাজির করেছে আজ আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে । মোবাইলের জন্মলগ্নে তার আকৃতি ছিল বেশ বড়সড় । তারপর টেকনোলজির উন্নতির সাথে সাথে সেটিও স্লিম হতে শুরু করল ।
সেলফোন হল যন্ত্র । মোবাইল পরিষেবা তার যন্ত্রী । দুটিই উপচে পড়ছে কারিগরী কৌশলে । এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমাকে । এই দুটি প্রযুক্তির মেলবন্ধনে গ্রাহক নানারকম সুযোগ সুবিধে পেয়ে থাকেন ।
গোড়ার দিকে সেলফোন পরিষেবার যে প্রযুক্তি ছিল সেটি ভয়েস বা কথা বহন করত । পরিষেবাটি 1G বা প্রথম জেনারেশান । সেই যুগের হ্যান্ডসেটের প্রযুক্তি কেবল একটি রঙ ( মোনোক্রোম্যাটিক) অক্ষর এবং সংখ্যা ( আলফা নিউমারিক তথ্য ) স্ক্রিনে দেখাত । এরপরে পরিষেবার প্রযুক্তি উন্নত হয়ে 2G বা দ্বিতীয় জেনারেশনে পৌঁছল । এই 2G পরিষেবা কথার সঙ্গে ডেটা বা তথ্য বহন করল । সমতুল্য ভাবে হ্যান্ডসেট প্রযুক্তি একরঙা স্ক্রিন এবং অক্ষর ও অঙ্কের যুগপত গন্ডী পেরিয়ে কম্পিউটারের মতন গ্রাফিকাল আইকন ব্যবহার শুরু করল ।
কিন্তু যেহেতু পরিষেবা প্রযুক্তি তথ্য বহনে সক্ষম সেই কারণে কিছু নতুন সুযোগ সুবিধে পেল গ্রাহক । যেমন এসেমেস এবং সীমিতভাবে ইন্টারনেট ব্রাউসিং ।
এইভাবে আন্তর্জালের সাথে মোবাইল ফোনের গাঁটছড়া বাঁধা হল ; মুঠোফোন হ্যান্ডসেট নির্মাতারা নতুন সুযোগ সুবিধে দেওয়া শুরু করল যেমন ব্রাউসিং এর সাথে সাথে ইমেল বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । অসুবিধে হল একটাই । এই সব আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে গেলে যতটুকু তথ্য বিনিময় করতে হয় সেটি 2G পরিষেবা প্রযুক্তি সামাল দিতে পারল না । পরিষেবা প্রযুক্তি আরো একধাপ এগুলো ।
2G গন্ডী পেরিয়ে এইবার মাঠে নামল 3G বা তৃতীয় জেনারেশান মোবাইল পরিষেবা। 3G পরিষেবার বিশাল তথ্যবহনকারী ক্ষমতাকে উপযুক্ত কাজে লাগানোর জন্য হ্যান্ডসেট প্রযুক্তি উন্নত হল ; আইফোন এবং এন্ড্রয়েড ভিত্তিক মুঠোফোন বাজারে ছেয়ে গেল । এই আইফোন বা এন্ড্রয়েড ভিত্তিক স্মার্টফোনগুলি আদতে এক একটি ন্যানো কম্পিউটার যা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের তুলনায় কোনো অংশে কম নয় । 3G বা 2Gপরিষেবা ব্যবহার করে ইন্টারনেটের সমস্ত সুযোগ সুবিধে যেমন ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল ম্যাপস, গুগল সার্চ , জি মেল, ট্যুইটার ও অসম্ভব মনোরঞ্জন কারক গেম গ্রাহকের হাতের মুঠোয় পৌঁছে গেল । 3G তথ্যবহনকারী ক্ষমতার পরিষেবা থাকলে সুবিধা বেশী কিন্তু পুরোণো 2G তেও কাজ চলতে লাগল । এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পিউটারের দুটো অসুবিধে । তার ছোট স্ক্রিন আর ছোট কিবোর্ড । কিন্তু 'কুছ খোয়া কুছ পায়া' । কিন্তু কেয়া পায়া ?
যদি বলি "নখদর্পণ" ? কারণ কিবোর্ডের অভাবে এখন সমস্ত হ্যান্ড সেট নির্মাতারা অত্যাধুনিক টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি এনে দিয়েছেন যার ফলে আঙুলের একটুকু ছোঁয়াতেই নদী-পাহাড়-সমুদ্র আমাদের নখদর্পণে ।
প্রাচীনকালে যে অলৌকিক বিদ্যার সাহায্য নিয়ে কোনো দূরের বস্তু বা ব্যক্তির প্রতিবিম্ব নিজের নখে প্রতিবিম্বিত করে দেখার গল্প শোনা যায় সেই কি এই প্রযুক্তি ?
তুফানি আড্ডার ফাঁকে, সেদিনের তিথি নক্ষত্র নিয়ে তুমুল তর্ক বেঁধে গেলে, সন্দেহ নিরসনের কায়দায় এই মুঠোফোনটি পঞ্জিকার ভূমিকাও পালন করতে পারেল হিন্দু ক্যালেন্ডার এপ্লিকেশনটির কৃপায় ।
"ইউরেকা" বলে জিতে গিয়ে বলেও দিতে পারেন "হাতে পাঁজি মঙ্গলবার" !
বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রের ধারে সূর্যোদয় দেখার কাঙাল আমি । কিন্তু ভোরের ঘুমও যে ছাড়েনা দুচোখকে । তাই গুগল সার্চ করে টাইম এন্ড ডেট ডট কম থেকে সানরাইজ @ পুরী পেয়ে গেলাম আগের দিন রাতে । ঐ স্থানের সূর্যোদয়ের নির্ঘন্ট জেনে রেখে ঘড়িতে এলার্ম । ফলে সমুদ্রের ধারে গিয়ে ঘুমচোখে সূর্যদেবের আরাধনা করতে হ'লনা । আমি গেলাম সময়মত । উনিও টুক করে উঠে আমাকে দেখা দিলেন । রঙ ছড়াতে শুরু করলেন আকাশের ভাঁজে ভাঁজে । মনে মনে বললাম "ভাগ্যি স্মার্টফোন ছিলি আমার হাতে "!!!
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়, দিন আগত ঐ ! যদি ভারত সরকার সৌভাগ্যক্রমে 2G আইনিজট খুলতে পারেন তবে 4Gকে আমাদের স্বাগত জানাতেই হবে !!!