১৪ এপ্রি, ২০১১

একটি কুকুরের বদলে যাবার গল্প : মুরাদুল ইসলাম



ফুটপাতের ধারে প্রায়ই  দেখা যেত কুকুরটাকে।ব্যস্ত নগরের ব্যস্ত পয়েন্ট।সবসময় মানুষের আনাগোনা।যানবাহনের হর্ণ এবং যানযট লেগেই আছে।এই ব্যস্ত পয়েন্টের ফুটপাতের পাশে কুকুরটাকে দেখা যেত।কখনো নিরব নিস্তেজভাবে হাটছে,কখনো লেজমুড়ি দিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শোয়ে আছে,কখনো দৌড়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক।গায়ের হলদেটে লোম রাস্তার ধুলা ময়লার আস্তরণের নিচে পড়ে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে কিছুটা।তবে কুকুরটার আশ্চর্য সুন্দর দুটি চোখ ছিল।কখনো মনে হত গাঢ় নীল,কখনো বাদামী,কখনো বা ধূষর।চোখের দিকে তাকালে বোঝা যেত অপূর্ব প্রানের স্বতস্ফুর্ত স্পন্দন খেলা করছে কুকুরটির দু চোখে।

সম্ভবত এই অনিন্দ্যসুন্দর নীল চোখদুটো দেখেই সদ্য বিদেশ ফেরত  ভদ্রলোক কুকুরটাকে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে গেলেন।ভদ্রলোকের কুকুর পোষার শখ ছিল অথবা কুকুরের প্রতি একটা দরদ ছিল তা বলা যায়।তারওপর এই কুকুরটির চোখের সৌন্দর্যে তিনি নিশ্চয়ই বিমোহিত হয়েছিলেন।ভদ্রলোকের কুকুর পোষার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ভাবলেন প্রথমে এর গায়ের নোংরা দূর করতে হবে।তিনি অনেক ভেবেচিন্তে একটি স্বণামধন্য কুকুর প্রসাধনী প্রস্তুতকারক কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করলেন।কুকুরটির আশ্চর্য সুন্দর চোখের কথা বলার পর স্বণামধন্য কুকুর প্রসাধনী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডগস বিউটি সোপ এন্ড টয়লেট্টিজ লিমিটেড কুকুরটির জন্য বিনামূল্যে সাবান সরবরাহ করতে রাজি হল।কিন্তু এর জন্য কুকুরটির পশ্চাতদেশে ডগস বিউটি সোপ এন্ড টয়লেট্রিজ লিমিটেড এর লেবেল লাগাতে হবে।
বিদেশ ফেরত  ভদ্রলোক এতে রাজি হলেন।উন্নতমানের সুগন্ধী সাবানের মাধ্যমে কুকুরটিকে উত্তমরূপে ধৌত করা হল।অতঃপর কুকুরটির পশ্চাতদেশে লিখে দেয়া হল ডগস বিউটি সোপ এন্ড টয়লেট্টিজ লিমিটেড।
 ধৌত করার সমস্যার সমাধানের পর দেখা দিল কুকুরের খাবারের সমস্যা।এক্ষেত্রে কুকুরের বর্তমান মালিক অর্থাৎ সেই বিদেশ ফেরত ভদ্রলোক তার এক পরিচিত কুকুরের খাবারের কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করলেন।তারাও কুকুরটির জন্য যাবতীয় খাবার সরবরাহ করতে রাজি হল।তবে এজন্য কুকুরের পেটে তাদের কোম্পানীর লোগো “ডগস হেলথি ফুড লিমিটেড” লাগাতে হবে।
কুকুরের মালিক ভদ্রলোক এতেও সানন্দে রাজি হলেন।কুকুরটিকে পর্যাপ্ত পুষ্ঠিকর খাবার খাওয়ানো হল।তারপর তার পেটে “ডগস ফুড লিমিটেড” এর লোগো সেটে দেয়া হল।
এরপর কুকুরের মালিক বিদেশ ফেরত ভদ্রলোক কুকুরটির স্বাস্থ্যের দিকে দৃষ্টি দিলেন।ডগস হেলথ ইন্সটিটিউট তাদের লেবেল কুকুরটির পিঠে লাগিয়ে বিনামূল্যে মেডিকেল চেক আপ করে দিল।
“ডগস আই কেয়ার” নামের কুকুরের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ঘটিত একটি প্রতিষ্ঠান কুকুরটির চোখের রঙ বদলানো কে একটি মারাত্বক রোগ বলে অবিহিত করলেন।কুকুরের মালিক ভদ্রলোক ঘাবড়ে গিয়ে তাদের কাছে এ রোগমুক্তির উপায় জানতে চাইলে তারা জানাল, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রস্তুতকৃত জিরো পাওয়ারের সানগ্লাস ব্যবহার করলে কুকুরটি ভাল থাকবে।অতঃপর ডগস আই কেয়ারের লেবেল সাটা জিরো পাওয়ারের সানগ্লাস কুকুরটির অনিন্দ্য সুন্দর চোখজোড়া ঢেকে দিল।
এরপর মাসখানেক ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে কুকুরটির কোন খোজখবর নিতে পারি নি।একমাস পরে ওই বিদেশ ফেরত ভদ্রলোকের বাসায় গেলাম।ভদ্রলোক আয়েশ করে বসে পান করছিলেন।আমাকে দেখেই বললেন,কুকুরটাকে দেখতে আসছেন তো? আসেন। ভদ্রলোক আয়েশী অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে তার বাসার সামনে লম্বা উঠানের মত জায়গাটায় নিয়ে গেলেন।
প্রথমে দেখে আমি কুকুরটাকে চিনতেই পারি নি।এটা যে কোন প্রাণী তা ই ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল।পুরো শরীর জুড়ে বিভিন্ন কোম্পানীর লেভেলিং।মাথায় ডগস ক্যাপের লেভেল লাগানো ক্যাপ,পায়ে ডগস ফুটওয়্যারের লেভেল লাগানো জুতা,পিটে ডগস ওয়েল,পেটে ডগস ফুড,নাকে,মুখে,চোখে প্রায় সবখানেই এরকম ছোট বড় লেভেল লাগানো। বিচিত্র রঙের লাল নীল সবুজ হলুদ রঙের লেভেলের চাপে কুকুরটি জীবিত কি মৃত তা বোঝা যাচ্ছিল না। কুকুরটির আশ্চর্য সুন্দর চোখদুটিও ঢাকা পড়ে ছিল জিরো পাওয়ারের চশমার আড়ালে।
এককালের স্বাধীন এবং দু চোখে প্রাণ প্রাচূর্যে ভরপুর কুকুরটি এভাবেই একটি জীবন্মৃত লেভেলের স্তুপে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

মুরাদুল ইসলাম
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র










[ ১ম পাতায় ফেরত ]

আমাকে আমার মতো থাকতে দাও : রেখা মিত্র


বাসে যেতে হবে এক ঘন্টার পথ।পেছনের চারজন বসার লেডিস সিটে বসেছি ভালো করে।পা রাখার জায়গাটা এই অংশটাতে বাড়তি পাওনা।অন্য সিটগুলোয় বেশীক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে থাকায় সত্যিই খুব অসুবিধে।ভাবলাম অনেকদিন বাদে আজ বেশ একটা সুন্দর অবকাশ পাওয়া গেল।এতোটা সময় দারুণ কাটবে,মাঝেমাঝে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে,মাঝেমাঝে মনের গভীরে ডুব দিয়ে।নিজের মনকে তেপান্তরে ছোটাবার মতো এমন অবকাশ আজকাল আর মেলে কই ?টার্মিনাসে দাঁডিয়ে থাকা শূন্য বাসটায় উঠে আমি বেছে নিয়েছিলাম সবচেয়ে সুবিধাজনক আসনটি।তারপর এক-এক করে যাত্রীরা উঠতে থাকলেন।একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলাম।হঠাৎ চমক ভাঙলো সুতীব্র চিৎকারে ! “আমি অনেকদিন ধরেই দেখছি,আমার কথা শোনার জন্য তোমার হাতে পাঁচটা মিনিট সময়ও থাকছে না”।আমার গা ঘেঁষে বসে পড়ে মেয়েটা।উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে তার সারা দেহ। বসেই সে চিৎকার করে উঠলো, “আমি কোনো কথা শুনতে চাই না”।কয়েক মিনিটের মধ্যে গোলগাল ‘স্নেহময়ী’ মার্কা একজন এলেন এবং ধপাস করে আসন নিলেন প্রেমিকার পাশটিতে।ইতিমধ্যে রাগী প্রেমিকার চোখে অশ্রুবাদল নেমেছে।সে বাঁ-হাতে মোবাইল আর ডানহাতে রুমাল ধরে তার বক্তব্যের পরবর্তী অংশে প্রবেশ করেছে।অনেকবারের চেষ্টার পর মেয়েটির পার্শ্ববর্তিনী ‘স্নেহময়ী’ মোবাইলের অন্যপ্রান্তের সাড়া পেলেন।তিনি তার সি-সার্পে মেলানো গলায় বলে উঠলেন, “ও সোনা,তুমি ফোনটা ধরছিলেনা কেন ?সেই তখন থেকে যতোবার করছি বেজেই যাচ্ছে।তুমি জানোনা সোনা এতে আমার কী ভীষণ টেনশন হয়?....সে যাই হোক আমি তোমায় বলছি তুমি স্যুপটা গরম করে এখুনি খেয়ে নাও...... ও মা,সে কি কথা সোনা !আ-হা-হা তোমাকে কি গ্যাস জ্বালতে হবে ?মাইক্রোতেই তো করে নিতে পারবে......

বাস ছুটছে।রাগী প্রেমিকার ফর্সা মুখ এখন চোখে পড়ার মতো রক্তিম।মেয়েটি অতি-স্পষ্ট উচ্চারণে ‘শালা’ বললো।আমার কানে যেন হাতুড়ির ঘা পড়লো।এর আগে এই প্রেমিকার মতো পোশাকপরিচ্ছদে আপাদমস্তক রুচিশীলা কোনো মেয়েকে প্রকাশ্যে এই শব্দটি নিক্ষেপ করতে দেখিনি।নিজেকে এ-সব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করি বারবার।সফল হই না। কান পাতার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকলেও ওই ব্যক্তিগত কলহের এইপ্রান্তের প্রবল কল্লোল বারবার আমার আপন চিন্তাজাল ছিন্ন করে আমাকে সংক্রামিত করতে থাকে।ওদিকের স্নেহময়ীও দেখলাম ছাড়বার পাত্রী নন।তিনি সমানে তর্ক চালিয়ে যেতে থাকেন তার ‘সোনা-মোনা’র সঙ্গে।
আগে কতোবার এক ঘন্টার বাস বা ট্রেণ যাত্রায় একমনে নিজের প্রিয় বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে করতে গেছি।কথা বলেছি নিজের সঙ্গে।হঠাৎ মনে এসে গেছে কলেজজীবনের বন্ধুদের সাথে সেই পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মধুর স্মৃতি।
আজ এই দুই সহযাত্রিণীর আপন-আপন ব্যক্তিগত জীবনের এমন নিনাদমুখরিত প্রকাশ আমাকে কিছুতেই আমার মতো থাকতে দিচ্ছে না।
একদিনের কথা।আগের রাতে রান্না করে রেখেছি।ঘরদোর কাপড়চোপড় নিয়ে কোনো কিছু পেণ্ডিং নেই।আমার মনোগত বাসনা,আজ সারাদিন শুধু পড়বো।মারে হরি,রাখে কে?সাতসকালেই শুরু হয়ে গেল অখণ্ড হরিনামের ওয়ান ডে প্রোগ্রাম।গান যে এতোটাই ভয়ঙ্কর আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠতে পারে তা এলাকার এইধরণের প্রোগ্রাম বক্স ও চোঙাযোগে সারাদিন বাড়ির আনাচেকানাচে প্রবাহিত হবার অভিজ্ঞতা না থাকলে ধারণা করা শক্ত।সারাজীবন আপন-আপন কণ্ঠের প্রবল বেসুরো বেতালা ভাব বজায় রেখে এইসব অনুষ্ঠানের সিংহভাগ চিৎকারক আমাকে কোনোমতেই আপন ঘরে আমার মতো থাকতে দেয় না।কে আর মাপছে ওদের চিৎকারের ডেসিবেল মাত্রা !আমি হতাশ চোখে তারাশংকরের ‘আমার সাহিত্য জীবন’এ চোখ রাখি।অক্ষরগুলো আর হৃদয়ে প্রবেশ করে না।বুঝতে পারি আজ আর আমাকে আমার মতো থাকতে দেয়া হবে না।

রেখা মিত্র
মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক, বেঙ্গল স্টুডিও









[ ১ম পাতায় ফেরত ]

মহাদেবের আর্জি : মধুমিতা ভট্টাচার্য



স্থান- কৈলাশ, কাল- প্রত্যুষ, পাত্র- দেবাদিদেব মহাদেব. 

এটুকু বললেই যে ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হল ভোলেনাথ মহাদেব তাঁর অতি প্রিয় ব্যাঘ্রচর্ম আসনে বসে ধ্যান মগ্ন, নাগরাজ তাঁর গলায় ডিজাইনার গয়নার মত দোদুল্যমান, নন্দী-ভৃঙ্গী মাতোয়ারা হয়ে ব্যোম..ব্যোম.. শব্দে চারিদিক মাতিয়ে তুলেছে এবং বলাই বাহুল্য যে গঞ্জিকা ধূমের প্রতিক্রিয়ায় সকলেই আমোদিত। ভোলেনাথের গঞ্জিকা না হলে দিন ভালো যায়না, তাই ভোর বেলাতেই দু-এক ছিলিমের সেবা হয়ে গেলে পোয়াবারো। সারাদিন বুঁদ হয়ে থাকা যায় জাগতিক সুখসুবিধা আশা-নিরাশার পরোয়া না করেই। এমনিতেই কৈলাশের এই বরফ ঢাকা পাহাড়ি প্রান্তরে এন্টারটেইনমেন্ট এর কোনো ব্যবস্থা নেই, অপ্সরারাও কেবল দেবরাজ ইন্দ্রের সভাঘরে নৃত্যগীতের পারদর্শিতা দেখাবার জন্যে চুক্তিবদ্ধ ।এই ঠান্ডায় এবড়োখেবড়ো পাহাড়ে নাচা-গানা করার জন্যে তাদের ভারী বয়ে গেছে! তাই নন্দী ভৃঙ্গীর গালবাদ্যের যুগলবন্দী আর ভোলানাথের ডমরুধ্বনীই  ভরসা। মহাদেব অসাধারণ নৃত্যপটু কিন্তু তাঁর নৃত্যের অর্থ সমূহ বিপদ। প্রলয় নাচন শুরু হলে আর রক্ষা নেই। পৃথিবী যাবে রসাতলে। যতক্ষন তিনি গঞ্জিকাচ্ছ্ন্ন  হয়ে নিমীলিত নেত্রে ইষ্টনাম জপে মগ্ন থাকেন ততক্ষনই সবার পক্ষে মঙ্গল। মা দুর্গাও বারবার বলে দিয়েছেন কোনমতেই যেন মহাদেবের রক্তচাপ বৃদ্ধি না হয়। যদি হয়, তবে মা জননীর ত্রিশুলের খোঁচায় অথবা খড়্গাঘাতে নন্দী ভৃঙ্গীর মুন্ড কাটা পরবে। সে রিস্ক নিয়ে যে লাভ নেই, তাই এভাবেই দিন কাটানো শ্রেয়ঃ । 

কাল পয়লা বৈশাখ, ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো কোনো রাজ্যের মানুষ খুব ধুমধাম করে এই দিনটি পালন  করেন। তাদের মধ্যে বঙ্গপ্রদেশ অন্যতম। তবে সমস্যা সেটি নয়, সমস্যার কারণ আজ নীল পূজা। বাঙালি জাতির ধর্মপ্রাণা মহিলাকূল খুবই নিষ্ঠাভরে দিনটি পালন করেন শিবার্চনা করে। কিন্তু এবারের মুশকিলটা একটু অন্যরকম। বাবার মেজাজও তিরিক্ষি। দুচার দিন হল থানা পুলিশের চক্করে মনের শান্তি যার-পর-নাই ভ্রষ্ট।আজকালকার পুলিশ পেয়াদাগুলো লজ্জা-শরমের মাথা খেয়েছে।ঘুষ খেয়ে খেয়ে এতই অভ্যস্ত যে মহাদেব কেও রেহাই দেয়নি। ভোলানাথ ট্যাঁকে ক্যাশ  টাকা রাখেন না, তাই ওরা তাঁর শখের ছিলিমটি জব্দ করেছে। গন্ডারের সিং দিয়ে বানানো, খাস অসমের কাজিরাঙ্গা থেকে এনে এক ভক্ত উত্সর্গ করেছিল বছর কয়েক আগে।    

তা মোদ্দা কথায় আসা যাক। ওই যে বললাম আজ নীল পুজো, বাবার না হলেও, নন্দী ভৃঙ্গীর মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে চাল, কলা, ডাব, দুধ, গাঁজা, ভাঙ্গ ...ইত্যাদির নতুন সাপ্লাই আসবে ভেবে। কিন্তু আসল মানুষ, থুড়ি, দেবতার মেজাজ চটে আছে ওই পুলিশের চক্করে। ভোলেনাথ মুক্তপুরুষ, সোনাদানার ধার ধারেন না কস্মিনকালেও । রুদ্রাক্ষের গয়না, সাপের মালা...এই তাঁর সিগনেচার সাজ। পরনেও কেবলমাত্র বাঘছালের কটিবন্ধ। কৈলাশের এই ঠান্ডায় গায়ে একটি জামা পর্যন্ত দেন না। মা জননী এ নিয়ে কতই না গঞ্জনা করেছেন! রাগেদুঃখে সজল চোখে সারাদিন গোঁসাঘরে কাটিয়েও দেখেছেন, কা কস্য পরিবেদনা!...কোনো লাভ হয়নি।   

শুধু ছিলিম নয়, পুলিশের নজর বাবার বাঘছাল এবং গঞ্জিকার ওপরেও। এই দুটি জিনিসই বাবার সারাক্ষণের সঙ্গী, দেখতে সাধারণ মনে হলেও এদের কর্ম অসাধারণ।কটিবন্ধের বাঘছালটি  বাবার লাজ রাখনেওয়ালা  এবং মনমোহক গঞ্জিকার পুরিয়াটি দিব্যদৃষ্টি দেনেওয়ালা।তাও সে ব্যাটাদের প্রাণে সয়না! একদিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের  নিয়মকানুন অন্যদিকে নেশাদ্রব্য ব্যবহারের জন্যে আবগারী আইন...যাকে বলে সাঁড়াশি আক্রমণ। জেরবার করে দিচ্ছে নানারকম কমিশন টমিশন বসিয়ে এতেও রক্ষা নেই, পুজো উপলক্ষ্যে ঘটি ঘটি জল, দুধ আর ডাবের জলে স্নান করিয়ে সর্দিজ্বরের উপক্রম করেছে।সেগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে জায়গাতেই ঢালুক, এফেক্ট তো সোজা কৈলাশেই এসে হয়, তাও এই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়! মন মেজাজ ভালো থাকবে কি করে? তাই আজ বাবার কপালে ভাঁজ, তৃতীয় নয়নে  রোষের আভাস, আলুথালু জটাজাল, মস্তিষ্কে আগ্নেয়গিরি…।       

সন্ধ্যা অতিক্রান্ত, মহাদেব ধ্যান ভাঙতেই হুহুঙ্কার দিলেন..."সব তফাত যাও... (রেগে গেলে বাবা ভোলানাথ দেবভাষা ছেড়ে বাংলা ও দেবনাগরীর ককটেল বলেন) সবকো ভস্ম কর দুঙ্গা...ঠান্ডায় মেরা জান নিকাল রহা হ্যায় আউর তুমলোগ সারাদিন ধরকে পানী আউর দুধ ঢেলে আমাকে চান করাতা হ্যায়! এদিকে তেষ্টায় মেরা ছাতি ফাটতা হ্যায়, ও নেহি দেখতা! যতসব মর্কটকা দল...খতম কর দুঙ্গা সবকো....!... (এবার কিঞ্চিত নরম সুরে..)  দে ভাই, শান্তিসে একটু ব্যায়ঠনে!...আরে বাপ আমার, দেনা বাপু আমাকে থোড়া নিজের মত থাকতে,…ভাগো সব  হিঁয়াসে...খালি যাবার আগে ছিলিমটা দিয়ে যাস…!!!

মধুমিতা ভট্টাচার্য
হোমমেকার, লেখিকা  












[ ১ম পাতায় ফেরত ]

আপনমনে আমায় থাকতে দে : রমা চৌধুরী



চৈত্রের সকাল শান্ত। উদাসীন। রং-এর রসাতলে বসেও তার কোনো সর্বনাশ নেই। সে বৈরাগীটি আপনমনে ধুলোর ঘূর্ণি ওঠা পথে ঘুরে বেড়ায় । পলাশের বনে ছমছমে আগুন। দহনে বিষাদে বুক পুড়ে যায়। বুক ভেসে যায় ভালবাসায়। এর-ই নাম চৈত্র। 



আঁকড়ে ধরে বেয়াদবের মত। ছড়িয়ে ফেলে খামখেয়ালে। তার কি-ই বা যায় আসে! সে প্রেমিক শিল্পী, রং-এর পসরা নিয়ে তার কারবার। বিকোবার দায় নেই। সঞ্চয়ের স্বপ্ন নেই। কেবল ছড়িয়ে যাওয়া। বিলিয়ে দেওয়া। পথ ভোলা পথিককে কতজন ডাক দেয় রং-এর তাপ ছড়িয়ে। সুগন্ধী আঁচল মেলে। সে আলোর শরীর কামনায় জ্বেলে চলে যায় বেভুল। দিগন্তরের আলপথ ধরে সন্ধ্যের দিকে তার একলা হাঁটা। গোধূলি তখন লাল হলুদের উদ্দাম শংখ লাগিয়ে খেলা ভাঙ্গার খেলায় মেতে উঠেছে। একটু পরেই দীর্ঘ অন্ধকারের হাত মেলে আলো মুছতে মুছতে ফিরে যাবে আঁধার ঘরে। জ্বেলে দেবে সন্ধ্যেতারার আলো। ঘরে ফিরছে তখন যারা, তাদের জন্য অন্ধকার আকাশে শান্তি ছড়িয়ে নিকষ আঁচল জ্বলজ্বল করবে তার। জুঁই ফুলের মত স্বাতী অরুন্ধতী দূর থেকে স্নিগ্ধ চোখ মেলে তাকিয়ে থাকবে তোমার দিকে। তোমার একলা কুটিরে জোৎস্নার কাম নিয়ে শুয়ে থাকবে স্মিত চাঁদ। কালপুরুষ দৃপ্ত ভালোবাসা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে একা। সে কারও নয়। তবু তুমি চাইবে তাকে তুমুল প্রেমে। উদার শরীরে তার ঝলকে উঠবে তোমার মিনতি। আজ রাতে তাকে চাইতে পারো তুমি যে কোনো অভীপ্সায়।
এ বসত তোমার একার। পড়শি নেই। ঠিকানা নেই। জনহীন জানলায় তোমার চোখের দিগন্ত। ওপারে এসে দাঁড়িয়েছে অনন্ত রাত্রি। অকুণ্ঠ তার শরীর। বাদাম গাছে নতুন তামাটে পাতারা থরথর করছে হাওয়ায়। সে না কি মলয় বাতাস। এমনি এসে ভেসে যায়। কাঁপিয়ে দিয়ে, জাগিয়ে দিয়ে। তাসের দেশের রাজপুত্রের মত। ইচ্ছের খেয়াল তার অভিসার। তুমিও তো ইচ্ছেমতী। যখন তখন ঝাঁপ দাও আকাশ থেকে পাতালে। জলস্রোত বহে যায় পাগলের মত। কোনদিকে যে যাও তুমি! কাকে যে চাই তোমার! কি হবে তা জেনে? ভাসতে চাই তো ভাসতে চাই। ডুবলেই বা ক্ষতি কি! কোথাও তো নির্ঘাত আছেই সে সমুদ্র। তার উত্তাল শরীর নিয়ে। একদিন তো দেখা হবেই। আর না-ই যদি হয়, তাতেই বা কি। এই যে সে ডাকছে আমায়, আর আমি চলছি তার দিকে, এই তো বেশ। যাত্রাই যে আসল, ঠিকানা নয়, এ আর তুমি বুঝবে কবে প্রেমিক? যেতে যেতে এই ছুঁয়ে যাওয়া, কেড়ে নেওয়ার দস্যুতা, ফিরে চাওয়ার আকুতি, ছড়িয়ে ফেলার বাদশাহী মেজাজ, একেই বলে বেঁচে থাকা। এর-ই নাম জীবন। বুনো পায়রার মত একেবারে নিঃসীমে হারানো। কামুক পুরুষের মত দমবন্ধ আঁকড়ে ধরা। বেদুইন সুরের পিছু পিছু ঘূর্ণি ঝড়ের মত ছোটা। ভোরের ভৈরবী হয়ে বাজলেও দুপুরের বৃন্দাবনী সারং-এর কাছে নতজানু হওয়া কামনায়। বেলা-শেষ যখন কোমল মুখ তুলে ধরে সন্ধ্যের দিকে, তখন পূরবীর তান শুরু হোক। সন্ধ্যের ইমন তীব্র মধ্যমের ইশারায় আদর করুক। রাত্রির বেহাগ বাজুক শরীরে। তারপর নামবে অতল অন্ধকার। গহনে নির্জনে তুমি দেখা পাবে তার। সে যে তোমার এত কাছে ছিল কে জানত! হিয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকলে জানব-ই বা কি করে! ডুব-তল অন্ধকারে তার দরজা খোলা দু হাট করে। শুয়ে আছে সে একা। তার শরীরের গেরুয়া চাদরে বৈরাগের ঐশ্বর্য। যখন ফুল ফুটেছিল, কিছুই জানিনি। সে যে দূরে নেই কে জানত! সে যে শুধু আমার তাই বা জানা হল কবে! এ মাধুরী যে আমার হৃদয় উপবনে লুকিয়ে থেকে এমনি করে পাগল করবে আমায় বোঝা যায়নি তা-ও।
এখন আর যাওয়ার নেই কোথাও। অতন্দ্র অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকি আমার কামনায়। আমার বিশ্বাসে। আমার পরিত্রাণে। সামনে ধু-ধু মাঠ জ্যোৎস্নায় বানভাসি। অপার। অসীম। আমি একা। তাই আমি তার। আমি একা। তাই সে আমার। পথে চলে যেতে যেতে পরশ পাবার এই মুহূর্তে আমি থাকি আমার মতন। আমায় থাকতে দাও আপনমনে।


আমি রিনি । কাগজে কলমে রমা চৌধুরী ।  ছন্নছাড়া, খামখেয়ালি। প্রকৃতি আমার প্রাণ।  আমার প্রেমিক আমার ভগবান ।  আমি লিখি, গান গাই ।  মানুষের জগতের বদলে পশুপাখী, পোকামাকড়ের জগত আমার বেশি প্রিয় । আর কিছু বলার নেই । বাকি কথা বলবে আমার লেখা । 

মন : অদিতি ভট্টাচার্য


আমার সামনের রাস্তা যেভাবে এগিয়ে গেছে,
এঁকে  বেঁকে, নিশব্দে, হয়ত বা হারিয়েছে.
আমি  জানি  ওই  রাস্তার  ওপারেও  রাস্তা  আছে,
দেখেছি  তাকে  সবার  আড়ালে  মনের  মাঝে.        
আমি  সত্যি, তুমি  সত্যি, সবাই  সত্যি,
ওই  যে  রাস্তাটা  তার  অস্তিত্ব ও  সত্যি.
আমি আজ  দাড়াব ওই  রাস্তার  একেবারে  শেষে,
যেখানে  আর কেউ  যাবে  না  ভুলে, ভয়ে ও ভেবে.
শুকনো  পাতা, ফোটা  ফুল , উড়ে  আশা  পাখি,
মন  আজ  তুমি  তোমারই  মনের  মুখো-মুখি.
নেই  অভিযোগ, নেই  অনুযোগ নেই  কোনো  ক্ষোভ,
আছে  ভালো, আছে  মন্দ, মন  কর  তার  খোঁজ.
আজ  জানো  মন  সত্যি  করে  কে  তুমি, কেন  তুমি?
হয়ত  কঠিন  কিন্তূ  আমি  জানি  পাবে  তাকে  তুমি.
মেঘলা  দিনে  মেঘলা  আকাশ  মেঘলা  কি  এই  মন?
প্রকট  হবেই  আজ  মনে  সারা  জীবনের  শোধ-বোধ.
মেঘ আসে, মেঘ  সরে  যায়, আসে  রোদ  দামী,
তোমরা  জানো  না, জানে  আমার  উদ্ভ্রান্ত  আমি.



অদিতি ভট্টাচার্য
কনসাল্টেন্ট  আইবিএম, কলকাতা








[ ১ম পাতায় ফেরত ]

১০ এপ্রি, ২০১১

সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়ের শঙ্করপুর

দৈনিক স্টেটসম্যান, রবিবার  ১০ই এপ্রিল ২০১১  

পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরে বঙ্গপোসাগরের  সমুদ্রতট শঙ্করপুরে গিয়েছিলাম কালীপুজোর আগের দিন ।  অমাবস্যার ভরাকোটালের ঠিক পূর্ব মূহুর্তে পৌঁছেছিলাম আমরা । খড়গপুর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ । গাড়িতে যেতে সময় লাগে ঘন্টা তিনেক । কারণ বেশির ভাগ রাস্তাই গ্রামের মেঠো পথ । সকালে বেরিয়েছিলাম বেলা এগারোটায় । প্রথমে পেরোলাম গোপালি গ্রাম তারপর কাশীজোড়া, শংকরাচকের ভেতর দিয়ে বেনাপুর গ্রামে পৌঁছে লেবেল ক্রসিং পেরিয়ে ঊড়িষ্যার বালেশ্বর যাওয়ার বড় চওড়া রাস্তা ধরা হল । রাস্তার দুপাশে   সবুজ ধানক্ষেত যেন আমাদের জন্য সবুজ গালচে বিছিয়ে রেখেছিল  । কাঁচা আর পাকা দু'রকমের ধানের ফলনেই যেন পাগল হয়ে রয়েছে কার্তিকের বাংলা ।  কি জানি কেবলই মনে হতে লাগল মা দুর্গার  আগমনেই বুঝি   এবার বাংলার মাটির রঙে সবুজ আর হলুদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে । এবার ঐ বালেশ্বর যাওয়ার পথ থেকেই আমরা ধরে নিলাম গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারালের দক্ষিণ অভিমুখী শাখাকে । তখন আরো গতিশীল হল আমাদের যাত্রাপথ । অচিরেই পৌঁছলাম বেলদা ।বেলদা থেকে এক্সপ্রেস ওয়েকে বিদায় জানিয়ে গ্রামের মেঠো পথের রুক্ষতা নিয়ে চলতে হল । এই স্ট্রেচটি খুব খারাপ । এবড়োখেবড়ো রাস্তা। গাড়ির স্পীড কমে গেল । কিছুক্ষণ পর পৌঁছলাম এগরা । তখন গাড়ির অডিওতে বেজে চলেছে "আমাকে আমার মত থাকতে দাও...."  যেন রূপসী বাংলার মনের গোপন কথাগুলো   । গ্রামগুলির চেহারা পশ্চিমবাংলার আর পাঁচটা গ্রামের মত । কালীপুজোর চাঁদার জুলুমের খপ্পরেও পড়লাম বার দুয়েক । এ জায়গাটায় ধানক্ষেতও যেমন আছে তেমনি আছে  ভরাবর্ষার পর খালের জলে ফুটে থাকা সার সার কচুরীপানা, শাপলা-শালুক।   সূর্য তখন মাথার ওপর থেকে সরে পশ্চিম আকাশের গায়ে । পূর্ব মেদিনীপুরের পাণিপারুল গ্রামে এলাম । সেখান থেকে রামনগর ।  চম্পানদীর ব্রিজ পেরিয়ে  ঢুকলাম শঙ্করপুরে । এখানে  মাটির রঙ লাল, জলের রঙ নীল । গাঢ় সবুজ ক্যাসুরিনা ঝাউবনের করিডোর দিয়ে প্রবেশ করলাম শঙ্করপুরের নির্জনতায়। কম ও বেশী সবরকম বাজেটের  সুন্দর সুন্দর হোটেল আছে ।  হোটেলে মালপত্র রেখেই বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্রদর্শনে ।  যাবার সময় হোটেলে মাছ-ভাতের অর্ডার দিয়ে যাওয়া হল । শঙ্করপুরে এত সুস্বাদু ফ্রেস ওয়াটার বাগদা চিংড়ি পাওয়া যায় যে শুধু মাছ আর ভাত খেলেই পরিতৃপ্তি হয় আর হোটেলের রান্নাও খুব সুন্দর । সে কৃতিত্ত্ব বোধ করি মেদিনীপুর জেলার অভিজ্ঞ পাচকের । 
সাদাবালির চরে গিয়ে একলহমায় সমুদ্র তট দেখে মনে হল 
একটা বিকেল নেবে তুমি? 
দিতে পারি তবে, 
যার নোনা জলের সাদাফেনায় ছুটে আসা 
জলের ফোঁটার রঙ সাদা, 
যার সাদা উড়নি নোনতা স্বাদের, 
ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের আনাগোনায় 
আছড়ে পড়া বালির চরে আসর বসায় 
মুঠো মুঠো ঝিনুক, তারা মাছ, শঙ্কর মাছেরা, 
দলবেঁধে আসা বকের সারি উড়ে যায় 
ক্যাসুরিনার ফাঁক দিয়ে, 
খেয়ে যায় বাঁশপাতা মাছ সমুদ্রের তট থেকে, 
ঢেউ এসে নিয়ে যায় বিকেলের সূর্যাস্তের রং  । 
সব মনখারাপের দুপুরগুলো আছড়ে পড়ে সেই ঢেউতে । 
ক্লান্ত  সূর্য তখন আপন মনে রঙ ছড়িয়ে চলেছে পূর্ব মেদিনীপুরের পশ্চিম আকাশের গায়ে, রং ছড়াতে ছড়াতে অবসর নিতে চলেছে সেদিনের মত ।  বিশাল সমুদ্র তট ; কাছেই  দীঘার চেয়ে অনেক পরিষ্কার আর মন্দারমণির চেয়ে অনেক বেশি প্রাকৃতিক শংকরপুরের বিচ । সমুদ্রের জলে নেমে পা ভিজিয়ে জল আর স্থলের দৃশ্য উপভোগ করলে তো আর পেট ভরে না । তাই হোটেলে ফিরে সেই অর্ডার দেওয়া চিংড়িমাছ আর গরম ভাত খেয়ে নিয়েই আবার ফিরে এলাম বঙ্গোপসাগরের তটে ।  ঝিলিক দেওয়া জলের মধ্যে চকচক করা ঝিনুক ঝাঁকে মুক্তো খুঁজে বেড়াই আবার ।  ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যেবেলা । ছমছমে সমুদ্রতটে শুধু ঢেউয়ের গর্জন । কোটালের ভয়াবহতা জানি । জল ফুলতে থাকে ক্রমশ:  । তবুও যতক্ষণ সুয্যি র‌ইল আকাশের বুকে ততক্ষণ পা ডুবিয়ে জলখেলা হল । আমাদের সাথে ছিল একটি বছর চারেকের বাচ্ছা । সে তো জল থেকে উঠতেও চায় না । তাকে টেনে হিঁজড়ে তোলা হল তখন সমুদ্রতট অন্ধকার । সারসার মাছের নৌকা (ট্রলার)  তখন মাঝ দরিয়ায় যাচ্ছে জাল ফেলতে, অমাবস্যার কোটালে মাছের প্রাচুর্য্যকে উপেক্ষা না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দেয় তারা ।  ভোর রাতে নৌকাগুলি তীরে এসে নোঙর করে । জেলেরা তখন মাছ বোঝাই নৌকা থেকে মাছ গুলো বিক্রি করে বাজারিদের কাছে । দেওয়া নেওয়ার টানাপোড়েনে কত রকমের সামুদ্রিক মাছ পড়ে যায় প্রতিদিন সমুদ্রের বালিতে আর জল সরে গেলে সে গুলি পড়েই থাকে তেমনি করে শুকনো বালুকাবেলায় । ছোটদের নিয়ে গেলে তারা মজা পাবে । দেখে উপভোগ করবে কত স্টার ফিস, বাঁশপাতা মাছ, লম্বা লেজ ওয়ালা শংকর মাছ, গায়ে সাদা কালো টিপ ওয়ালা বোয়াল মাছের মত গড়নের নাম না জানা মাছ  আর সেই সাথে নানা রকমের ঝিনুক কুড়োনোর মজা আছে শংকরপুরে  । অন্ধকার ভোরে কত রকমের শাঁখ আসে ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে । আর সূর্যাস্তের সময় ঘন নীল আকাশের গায়ে লাল, কমলা গোলাপি আভা ছিটিয়ে সূর্য যখন অস্তে চলে তখন সাক্ষী হয়ে থাকে সেই অভিনব ক্যাসুরিনা ঝাউবন । আদি অনন্ত কাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে তারা । প্রতিদিন সূর্যের এই অবসর নেওয়ার মূহুর্তে ঝাউবনে  পাখ-পাখালির ঘরে ফেরার  কলরব আর বালির চরে ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ,  নিঝুম নিসর্গকে নতুন করে পৌঁছে দেয় মনের আঙিনায় ।  সূর্যাস্তে শঙ্করপুর একরকম । আর সূর্যোদয়ে অন্য রকম ।  
রাতে হোটেলে ফিরে ছাদে গিয়ে আবার সমুদ্র, কালো সমুদ্র, শব্দমুখর সমুদ্রকে চুপিচুপি দেখে আসি ।  পরদিন ভোরে সাড়ে চারটের সময় এসে হাজির হ‌ই সমুদ্রের বালুকাবেলায় । অন্ধকার আকাশে উত্তরদিকে তখনো ধ্রুবতারা আর পশ্চিম আকাশে শুকতারা জ্বলজ্বল করছে । ঢেউয়ের আনাগোনা দেখি,  সমুদ্রের বুকে জন্ম নেয় নতুন ঢেউ আর তীরে এসে ভাঙে সেই ঢেউ । দেখতে দেখতে পুব আকাশের গায়ে রঙ ছেটাতে আসে প্রত্যূষের বালক সূর্য । আকাশ চিরে চিরে লাল, নীল, গোলাপী রঙের দাগ আর লুকোচুরি খেলতে খেলতে সেই আবীর রঙা আকাশের কোল থেকে উঁকি মারে সে । ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে । শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দাপট দেখাবে বলে । তখন ঠিক পৌনে ছটা বাজে । অনেক সূর্যোদয় দেখেছি । শঙ্করপুরের নিরিবিলির সানরাইজ মনের ক্যানভাসে ধরে রাখতে পেরেছি ঠিক মত ।  পুজোর পর থেকেই উইকএন্ডে ভীড় হয়ে যায় শঙ্করপুরের সি বিচ পিকনিক পার্টির আক্রমণে । নষ্ট হয় এর ইকোফ্রেন্ডলি প্রাকৃতিক সম্পদ, দূষিত হয়ে যায় ঝাউবন আর পর্যাপ্ত প্লাস্টিকে পূর্ণ হয়ে যায় সমুদ্রতট।  তাই উইকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে মাত্র চব্বিশটা ঘন্টা হাতে নিয়ে ঘুরে আসা যেতেই পারে শঙ্করপুর !

১ এপ্রি, ২০১১

টুসিরে..


রাজা আর রাণী ওদের বাবা আর মায়ের নাম । খুশির সংসার । ওরা দুই বোন । আমি নাম দিয়েছি টুসি আর টুনি । । সারাটাদিন বালির ওপর খেলে বেড়ায় ওরা । কখনো পড়ে যায় । আবার খুনসুটি করে । মা এসে দু'ঘা দিয়ে যায় । পালিয়ে আমার কাছে চলে আসে । ঝুল ঝুল করে চেয়ে থাকে ওরা আমার দিকে । মায়ের ওপর অনেক অভিযোগ নিয়ে .. যেমন আজ মা খাবার বন্ধ করে দিয়েছে কিম্বা পাশের বাড়ির টমির মাংসের হাড়ে ভাগ বসিয়েছিলুম তাই মা নখ দিয়ে আঁচড়ে দিয়েছে । যত নালিশ আমার কাছে । আর আমাকে ব্ল্যাকমেল করে আজ দুধ-ভাত কাল কলা, পরশু ডিমের ডানলা-ভাত আদায় করে । খেয়ে দেয়ে চৌবাচ্চার নীচের ফুটো দিয়ে গড়িয়ে আসা জলে মুখ পুঁচে কাঁঠালগাছের ছায়ায় বিশ্রাম করে । টুসি আর টুনির গায়ের রঙ কালো । বাবা মা কারোর মত হয়নি বলেই মা বাবার অত রাগ ওই দুটির ওপর । অন্ততঃ টুসির তাই বিশ্বাস । কিন্তু রঙ নিয়ে কি হবে ? টুসি আর টুনির চোখের ওপর দুটো ডিমের মত সাদা দাগ আছে । তাই আমার কেবলই গুলিয়ে যায় কে টুসি আর কে টুনি এই নিয়ে |একদিন দুটোকে কাছে দাঁড় করিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলুম । দুজনেরই তেল চকচকে কালো লেজ  । চোখের ওপর তেরচা করে সাদা ডিম । দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ বিলকুল সমান । কিন্তু একজনের কালো লেজের আগাটা ধবধবে সাদা । ব্যস ! তাকে আমি  টুসি বলে মনে করে রাখলাম কারণ টুসির "স" ফর "সাদা" অথবা টুনির "ন" ফর "নেই" । কি জানি এই সাদা ল্যাজের আগার জন্য টুসিই বোধহয় আমার একটু বেশি এটেনশন পায় আজকাল ।  আমার সংসারে বাড়তি কলাটা, মূলোটা, পার্টির লেফটওভার, তরকারির ঝোল-আলু   আমি বেড়ার ফাঁক দিয়ে টুসিকে আসতে দেখলেই উঠোনে গিয়ে খাইয়ে আসি । টুনি সে কথা বুঝতেও পারেনা ।  আমি যে ইচ্ছে করে এমন পক্ষপাতিত্ব করি তা কিন্তু  টুসি বোঝে । আমি যখন পাশের দোকানে দুধ, পাঁউরুটি  কিনতে যাই সারাটা পথ ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আমার সাথে যায় আর যেতে যেতে কুঁই কুঁই করে কি সব বকে চলে । আমি ভাবি, কি জানি  খিদে পেয়েছে বোধ হয় । কিন্তু একদিন দেখি পেট ভরে খাবার পরও এমন আওয়াজ করছে  । নাঃ ! বুঝলাম এটা আমাকে আদরের বহিঃপ্রকাশ ।   
তা মন্দ লাগেনা আমার । মানুষের চেয়ে এরা অনেক ভালো বন্ধু হয় ...সে কথা সর্বজনবিদিত । তাই আমিও খুব প্রশ্রয় দি ওকে । কেবল ভাত পরিষ্কার করে না খেলে আর জল দিয়ে মুখ না আঁচালে তাকে একেবারে কচুকাটা করে বকুনি দি । একদিন দেখি বিকেলে টুসি বাইরে খুব ডাকছে । গিয়ে দেখি ওদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে বলে সকলের বাগানের চারিদিক দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া লাগানো হচ্ছে  । যাতে টুসি, টুনি রাজা রাণী কেউ আর বাগানে ঢুকতে না পারে । এখানে প্রত্যেকের কোয়ার্টারের সাথে লাগোয়া বাগান ও জমি আছে যেখানে টুসি-টুনিরা অহোরাত্র দাপিয়ে বেড়ায় মনের খুশিতে । সেদিন টুসিকে বললাম । তুই আর কোথাও যাস্‌না টুসি । আমার বাগানেই পড়ে থাক । টুসি ঘাড় ঘুরিয়ে টুনিকে দেখালো ।  আমি বললাম " এই বাজারে একটা টুসিই আমার থাক না " টুনি না হয় অন্য সংসারে যাক । তাতে দুজনেই ভাল থাকবি । ল্যাজ নাড়তে নাড়তে টুনি ওদিক দিয়ে পাশের বাড়ির বাগানের দিকে চলে গেল । বোধহয় মনে মনে বলে গেল " এ আর নতুন কথা কি! " আমি ঠিক জানতুম একদিন তুমি এমনটিই বলবে "  সেদিন আমার বিকেলের জলখাবারের এক প্লেট চাউমিন এনে টুসিকে দিলাম । টুসি  তো মহাখুশি । এখন বড় হচ্ছে, জিভের স্বাদ হয়েছে, মুখের তার বোঝে । ম্যাগি বোঝে, সস বোঝে, গোলমরিচের ঝাল বোঝে ।  


মাটনের হাড়ে সময় বেশী লাগে , চিকেনের হাড়ে সময় কম লাগে । খেলার তাড়া থাকলে মাংসটা কি পরখ করে দেখে নিয়ে চৌবাচ্চার আড়ালে রেখে চলে যায় । এসে আবার সময়মত খেয়ে নেয় । মাংস,মাছ যেমন খায় আমার উপোস, বারব্রতর  দিনে ফল , টকদৈয়ের ফলার দিব্যি খেয়ে নেয় চেটেপুঁটে । আমি মনে মনে বলি " সব কিছুর অভ্যেস  ছোট্ট থেকে করলে সব হয় " । যত বড় হচ্ছে টুসি  আমি তত‌ই অবাক হ‌ই ওকে দেখে আর বলি " ভগবান ! জল ঝড়, সাপ-খোপ, মৌমাছি-বোলতা সকলের হাত থেকে রক্ষা কোরো আমার টুসিকে"  বড্ড মায়া পড়ে গেছে আমার এই একরত্তি টুসির ওপর ! খুব বাধ্য টুসি আমার । আমার হাতে লাগানো সাতটা বেগুণ চারা, পাঁচটা লঙ্কাগাছ, একটা লাউ,  আর গোটা দশেক মোটে ভিন্ডি গাছ আছে । ওরাও টুসির মত ক্রমে ক্রমে বেড়ে উঠছে । প্রথম যখন চারা লাগাই দামাল টুসি-টুনি  একেবারে চেলে ফেলে দিয়েছিল বাগানটা। পরদিন ভোরে উঠে দেখি কোন চারাটা শুয়ে পড়েছে, কোনটা  বেঁকে গেছে আর ভিন্ডিতো অর্ধেকের ওপর  থেঁতলে গেছে । খুব বকুনি দিয়ে ছিলাম আর বলেছিলাম " একদম বের করে দেব্, আর কক্ষোনো খেতে দেব না ...কথা না শুনলে"  কি জানি তারপর থেকে টুসি-টুনিই কিন্তু আমার ঐ ছোট্ট রসুই-বাগানের পাহারাদার| ভুলেও ধারেকাছে যায় না ।  গা ঘেঁষে ধীরে ধীরে ঐটুকু বাগানের পাশ দিয়ে চলে যায় । বরং একটা দুষ্টু কাঠবেড়ালি  আছে তাকে পারলে দৌড়ে গিয়ে তাড়া করে সেখান থেকে বের করে দেয় ।  কাঠবেড়ালিটা সুযোগ পেলেই উপু হয়ে বসে তার বিশাল লেজটিকে শূন্যে  খাড়া করে দুহাত দিয়ে কুটুর কুটুর করে কচিপাতা আর বেগুণ গাছের গোড়ায় ছোটছোট পোকা খেতে যায় যে ! আর ঐ পোকা খাওয়ার নাম করে লাউগাছটার কচি ডগা, বেগুণ গাছের কচিপাতার মধ্যে ছোট্ট বেগুণি রঙের ফুলও খুঁটতে থাকে যে! ভারি রাগ ধরে টুসির তখন !  
 এখন অবিশ্যি শুধুই টুসিই আমার রসুই-বাগানের সর্বক্ষণের গ্রুপ ফোর সিকিউরিটি ।  আজ সকাল থেকেই কেমন গরম গরম লাগছিল । কাল বিকেলে একটু কালবোশেখি হয়ে গেল । তা সত্ত্বেও আজ রোদের তাপ জানান দিচ্ছে গরম পড়ে  গেল । ইতিমধ্যে টুসি আর টুনি খুব কায়দা করে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙোতে শিখেছে । আশপাশের গ্রাম থেকে  কেউ ওদের ত্রিসীমানায় এসে পড়লে তাকে তাড়িয়ে বাইরে বার করে দেওয়া অবধি লড়ে যায় ।    ক'দিন ধরে দেখছি খুব হাঁচছিল টুসি । কি জানি সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে বোধ হয় জ্বর এসেছিল । কিচ্ছু খাচ্ছিলও না । রাণী এসে একটু  আদর করে দিয়ে গেল । রাজা এসে ক'টা গাছের পাতা রেখে গেল চৌবাচ্চার ধারে । বোধহয় বাচ্ছার অসুখ করেছে তাই ওষুধ । আমি ভাবলাম  এই সময়  এপ্রিল মাসে, সিজন চেঞ্জে  আমাদের বাচ্ছাদেরও তো খাওয়াদাওয়ায় অরুচি হয় তেমনটিই হয়েছে ।   আমি ভাবলাম দাঁত উঠেছে তো দাঁত সুলোচ্ছে । একটু কড়মড়ে কিছু দি টুসিকে । টুসি তাহলে ঠিক খাবে ।  পরিষ্কার করে ধোয়া  চৌবাচ্চার পাশটা খুব ঠান্ডা থাকে ।আজ ও ও শুয়েছিল সকাল থেকে । মনটা যেন খারাপ খারাপ । গান করছে না । কুঁইকুঁই করছে না । আমাকে দেখে ল্যাজ নাড়ছে না । একখানা মুচমুচে বিস্কুট আর একটা গরম স্লাইস ব্রেড টোস্ট করে ওকে দিয়ে এলাম । যেই মাত্র দেওয়া অমনি কচমচ করে খেয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে চলে যাচ্ছে আমি বললাম "কিরে মুখ আঁচালিনা জল দিয়ে? রোজ যেমন ধুস " তার কোনো বিকার নেই ।  
সেদিন ছিল পয়লা এপ্রিল ; আর তারপরই আমার খেয়াল হল অরে এতো টুসি নয় এতো টুনি ! আমাকে এপ্রিল-ফুল করলি তুই???  পরদিন মর্নিং ওয়াকে গিয়ে শুনলাম টুসিকে  ধরে নিয়ে গেছে ওরা.. বড়গাড়িতে করে লোহার  সাঁড়াশি নিয়ে যারা আসে আর পাঁচটা টুসিদের ধরতে ।  তক্ষুণি বুঝলাম আমার টুসিটা টুনির মত চালাক ছিলনা  | নয়ত এপ্রিল-ফুলের দিন টুনি আমাকে বোকা বানায় !  

১৭ মার্চ, ২০১১

১২য়ারি বসন্তের কবিতা," দোলছুট-২০১১"


আমরা সকলেই কবিতা বা ছড়া লিখি । প্রায়ই দেখি অর্কুট বা ফেসবুকের আঙিনায় ফুটে ওঠে সেই কবিতা বা ছড়ার ফুল আর অচিরেই কালের স্রোতে ভেসে যায় সেই সৃষ্টি, আর শুকিয়ে যায় সেই ফুল। এবার দোলে আমার সেই সব বন্ধুদের নিয়েই  না হয় ভাসিয়ে দিলাম আমার ছিন্নপাতার খেয়া খানি । সোনার তরীর পালে এবার বসন্তের হাওয়া বয়ে আনল একরাশ বন্ধুত্বের দোলা । আর যন্ত্রজালে ভাসতে ভাসতে খেয়াখানি পাড়ি দিল কোন্‌ সুদূরে !!!  
ফন্ট সাইজ ছোট লাগলে Ctrl++  করুন আর ফায়ারফক্স বা গুগ্‌ল ক্রোমে দেখুন





রেখা মিত্র
উত্তরপাড়া

মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক
বেঙ্গল স্টুডিও 
লাগলো যে দোল  (১)

পলাশ দেখে থেকে থেকে কেমন করে মন
অনেক পলাশ ঘর করেছে শান্তিনিকেতন,
সেই নিকেতন অনেক দূরে, পলাশ থেকো ভালো!
দোলের দিনে মনে আমার পাঠিও রঙের আলো।
তোমার আমার মাঝখানেতে পথটা যে দুস্তর
কেমন করে পার হবো এই কঠিন তেপান্তর !
একটু সবুর পলাশ তুমি, একটু বাঁধো মন
পরের বারে আমার বাসা হবে পলাশ বন।

লাগলো যে দোল  (২)

কে যেন চমকে দ্যায় 'এসেছি রে আঁখি তোল'
দেখি চেয়ে আঁখি মেলে "স্থলে জলে বনতলে"
লাগলো লাগলো দোল !
আবার হৃদয় ছুঁলো কানে তার কলরোল
"রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত আকাশে
নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল
দ্বার খোল দ্বার খোল "


হোলি

আজ তো হোলি,রঙ খেলব না আমরা? তুমি খেলবে?
আর বাকীরা খেলবে না বুঝি -রবি,কানু,বালা,বাকী সব্বাই
হঠাৎ করে ছুঁড়ে দেবে মুঠো মুঠো রঙ? চমকে দেবে বুঝি?
চোখ বন্ধ করে নিতে হবে?

কি রঙ খেলবে ওরা ? লাল,গোলাপী,সবুজ?
কতটা সবুজ?
আর মিষ্টি? মিষ্টি আনবে না বুঝি আমাদের জন্য?
রঙমাখা হাতেই মিষ্টি খাব,
তুমি বকবে জানি,তবুও

আজ মিশে যাব আমি আর তুমি
কানু, বালা, টিপু, আমরা সব্বাই
খেলা তবু থামবে না, ঢেউ খেলব ছলাৎ ছল
দেখব, তুমি কত ঢেউ তুলতে পার
তবু খেলব, হার মানব না তো আজ -

আমি তো রঙ চিনি না
তবে তুমি যখন বল, তখন আমি ঠিক বুঝতে পারি
কালো রঙ ছাড়াও অন্য রঙ আছে
ভালদাদু, আমি কবে রঙ দেখতে পাব?
আমরা সবাই কবে রঙ দেখতে পাব?


অভ্র পাল
কলকাতা

সফ্যটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার
টাটা কনসাল্টেন্সি সার্ভিসেস 

মধুমিতা ভট্টাচার্য
তেজপুর

হোমমেকার, লেখিকা

পলাশ বনে একা (১)

পলাশেরা গান গায় বসন্তের পূর্নিমা রাতে
ভোর এলে ঝরে যায় কঠিন ভূমিতে,
সে গানের কিছু রেশ থেকে যায় মনের গভীরে
তবু ওরা প্রতিদিন গান গায়,
ঝরে যায় সবার অগোচরে...
আজ পলাশের রাগ হয়েছে তাইতো ধুলোয় শুয়ে,
মাথার দিব্যি, বলছি আমি তোর গায়ে হাত দিয়ে
আর যাবনা শিমুল বনে, সবার সাথে আড়ি-
করব এবার, কেবল তোকেই ডাকব আমার বাড়ি

পলাশ বনে একা (২)

মর্মে যে রং আছে
সে রং ছড়িয়ে দিয়ে বনে
আকাশে বাতাসে আর
পৃথিবী প্রাঙ্গনে..
সে রং নিও আপন করে
তোমার বাউল মনে
যে রং ছড়িয়ে ছিল বনে 
পলাশ বিলাস আমার মনে
হালকা হাওয়ায় ঋতু ফাল্গুনে
বন্ধু এসো আমার ঘরে
যে আছো দূরে অনেক দূরে


রক্ত-পলাশ আমার ঘরে....

আয়না পলাশ আমার ঘরে 
ধুলোয় কেন আছিস পড়ে!
সাজিয়ে ডালি রং ফাগুনে
রাখব তোকে মনের কোণে,
যতন করে আবির লালে
মাখাবো তোর লাজুক গালে
কিম্বা আকাশ নীলের সাথে
মেঘ দেবো এক সুপ্রভাতে
তোর আঁচলে রক্ত-পলাশ
ছোঁয়াবো আজ রঙ্গিন আভাস,
চল মেতে যাই, কাজ ভুলে যাই
নাচের তালে মাদল বাজাই
পাগলা হাওয়ার ঘোড় সওয়ারে             
আয়না পলাশ আমার ঘরে... 
আয়না পলাশ আমার ঘরে...!


জার্ণাল    


(১)
 শীতের ছোঁয়া মিলিয়ে গেল আস্তে
ফাগুন এলো আবার ভালবাসতে
হাসছে পলাশ রঙিন হাসি হাসছে
আনলো খবর হোলির দিন যে আসছে
(২)
যেই না আমার পড়লো মনে সেই সে ফাগুন
সে'জন বলে, কি কাজ হবে অতীত ভেবে?
আজকেও সে একই চোখে আমায় দ্যাখে
হয়তো আমায় একই ভাবে ফাগ মাখাবে
হয়তো আমার কানে-কানে গান শোনাবে
মুগ্ধ হয়ে তার চোখেতে যেই তাকাবো
চাউনি আমার তার মনেতে পথ হারাবে
(৩)
এই নাও রঙ",বললো পলাশ মলিন মুখে
অনেক ব্যথার শেল বিঁধেছে ওদের বুকে
খবর দিলো বাতাস তাদের আজকে প্রাতে
দশটা পলাশ-ভাই মরেছে অপঘাতে
চায় না যারা দেখতে পলাশ রঙের ধারা
পলাশ মেরে বসতবাড়ি তুলছে তারা
পলাশের কবিতারা ঘাসের 'পরে,
একটু-একটু করে শুধুই ঝরে।
(৪)
সেই কবিতায় চোখ রেখেছে আকাশ,
কাব্যে বিভোর আজ তার অবকাশ।
পলাশের কবিতায় কে গো দেবে সুর ?
হবে তার প্রাঙ্গণ গানে ভরপুর।


কল্যাণবন্ধু মিত্র
উত্তরপাড়া

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের 
 বিধি নির্দেশক দফতরের বিশেষ দায়িত্ত্বপ্রাপ্ত অফিসার 

শুভেন্দু দাস
ভবানীপুর

কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট, আইবিএম  করপোরেট কমিউনিকশন 

বসন্ত আবার জাগ্রত

বসন্ত আবার জাগ্রত এই ডামাডোলের বাজারে,
পলাশের দাম কমছে, কমছে শিমূলেরও লাল
তুচ্ছ আজ পুচ্ছ নেড়ে মস্তানি করে
"দলদাস" হয়ে ঐতিহ্যেরা গুমরে মরে
প্রেমিকার জন্য রঙ নয়, টাকা চায় থলে ভরে
তবুও বসন্ত জাগ্রত !!
বসন্ত আবার জাগ্রত কি ভীষণ রূপে,
এত ভয় করে লাল আগুণের গ্রীষ্মের আগে শুধু
শুধু কিছুটা দখিণা হাওয়া আপাত শান্ত এ রাজ্যে ,
কি জানি কারা আবার ছড়িয়ে দেবে ঘুরে ঘুরে,
আমি থাকতে চাই, তোমরাও চাও,
আমরা সবাই চাই শান্তিতে থাকতে
কিন্তু সন্ত্রাসবাদী বসন্ত শুনলে তো সে কথা !!
বসন্ত , আবার জাগ্রত
ছোট্ট মেয়েটা, মিষ্টি মেয়েটা, কালো গভীর চোখে
দুটো হাত যার অঞ্জলি ভরে
পলাশ একটা ধরে রেখেছে প্রত্যাশা নিয়ে ,
কেউ যদি ... কেউ যদি ভয় না দেখায় ,
তাহলে উচ্ছ্বাসে মাতবে
হে পলাশ, হে শিমূল, হে বসন্তের দূত তেরা
"পচা লাশ" আর বয়ে এনোনা, গন্ধে পৃথিবী গেছে ভরে
এখন ছোট্ট মেয়েটা না হয় "রাজ" করুক !!!



বসন্ত-বন্দনা

চলার পথের ধারে দেখি লালফুলের বাহার
শুধাই আমি, নাম জানো কি তার?
উত্তর না পাই, নামটি থাকে অজানাই
তবু তার রং মনে-প্রাণে আনে বসন্ত
আকাশে-বাতাসে ছড়ায় যেন আবিরের সুগন্ধ
বসন্ত আর প্রেম কোনো এক নিবিড় সুত্রে বাঁধা
গাছের ডালে কোকিলের তাই কুহুস্বরে গলা সাধা
আমিও এবার শোনাতে পারি বসন্ত-বন্দনা
গলা ছেড়ে গাইব তবে বাহার রাগে তারানা
তাইতো আমায় ঠাই দিও ভাই আনন্দ-সভার মাঝে
এলাম আবার বার্তা নিয়ে বসন্ত-সভার মাঝে
মন যে আমার অশোক, পলাশ, শিমুল রঙ্গে সাজে




বর্ণালী কর
কলকাতা 

ইঞ্জিনিয়ার,
গেস্ট ফ্যাকাল্টি,
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়  

সংঘমিত্রা নাথ
গড়িয়া

ইংরেজি শিক্ষিকা ,
গড়িয়া হরিমতি দেবী 
উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় 

আজ বসন্ত

শুষ্ক,জীর্ণ ঝরা মাঘ বেয়ে
তুমি যে নিঃশব্দে চলে এসেছ -
সে কথা তো বলে গেছে
উতল ফাল্গুনি হাওয়া।

একটা কোকিল এসে সেদিন-
দিয়ে গেছে তোমার চিঠি,
গেয়ে গেছে তোমার গান
আম ডালে দোল খেয়ে।

নিশান উড়েছে তোমার চারদিকে
আম পেয়ারা লেবুর ডালে ডালে,
পেয়েছি তোমার বার্তা
সবুজের, নবীনের জয়সাজে।

সজ্‌নের ফুলে আমের বোলে
তোমার গন্ধে আসে সব পাখি,
বলে যায় ‘এসেছে বসন্ত,
শীতকে দিয়েছে ছুটি’।


আবার বসন্ত

পথের ধারে হলুদ হয়ে ওঠা গাছগুলো
জানিয়ে দিয়েছে তুমি এসেছ মহাসমারোহে-
পলাশ,কৃষ্ণচূড়া ঝুঁটিতে বেঁধে,
আবীর মেখেছ লাল,মেতেছ বসন্ত নৃত্যে।

বনে বনে আজ জীবনের নবদোলা,
ফুলের পাপড়িতে রঙেরই আলপনা
এসেছে রঙের উৎসব আবার
দুয়ার রুদ্ধ আর রেখো না।




দোল লাগে মনে 

বাইরেটাকে রাঙিয়ে দিলে 
তোমার রাঙা আবীরে, 
ভিতরটাকে ছুঁয়ে গেলে 
মনের অনেক গভীরে! 
ফাগুণ তো আজ আগুণ রঙীন 
মনে  জাগায় সাড়া, 
বাইরে দোল, ভিতরে দোলা 
মন যে পাগলপারা !!





ডাঃ অমরজ্যোতি গুপ্ত
বারাসাত

মেডিক্যাল অফিসার,
ওয়েষ্ট বেঙ্গল হেলথ সারভিস

সুশান্ত কর
 তিনসুকিয়া

বাংলার অধ্যাপক,
 তিনসুকিয়া কলেজ, আসাম



দোল কারে কয়?

কেউ কি এবারে পলাশ দেখেছো, ফাগুন মাসে ফোটে?
যেদিকে তাকাই ভোটের পতাকা আকাশ ফুঁড়ে ওঠে।
কেউ কি শুনেছো দোল কারে কয় ? সাজিয়ে থুয়েছো আবির?
রাজীব ভবনে বোমা ফুটেছে, মরে গেছে মিঞা সাবির।
কৃষ্ণ গেছে কুরুক্ষেত্রে , রাই হয়েছে বুড়ি।
কত বসন্ত ফিরে গেছে এসে, হিসেব রেখেছে থুড়ি!


হোলি


এক একটা দিন যেন
সুর্য্যের থেকেও লাল,
সুড়কির রাস্তা অথবা
 তোমার সিঁদুরের চেয়েও ।
এইসব দিন নিয়ে রাতভোর ঘুমোই ......
 ঘুমের ভেতর হেঁটে যাই
শাড়ীর আঁচল থেকে অসহায়ের মত
খুঁটে ফেলি কিছু লোহিতকণিকা।
সব চোরকাঁটা বেছে তোলা
বোধহয় সহজ নয়।
কিছু কিছু চিরকাল বিঁধে থাকে অগোচরে
ক্যালেন্ডার মাফিক বসন্ত চলে এল আবারও
ফাগুন হাওয়ায় কাঁপে শিরা উপশিরা
এবার নিদেনপক্ষে কিছু শিমূল কিংবা
পলাশ ফোটানো যাক্‌ ।




সুতপা ভট্টাচার্য বারুই
যাদবপুর

নেশা -- লেখালেখি
পেশা -- ব্যবসা [বুটিক]



ইন্দিরা মুখার্জি
খড়গপুর

ব্লগার 

আজ দোল

দোল ছিল এক পশলা আটপৌরে ভালোলাগা
ফুটকড়াই-মুড়কি-মঠের ছোট্ট ভাঙা আগা
রঙনিকোনো মনের উঠোন উপচে চাঁদের আলো
লুকোনো প্রেম, রঙীন বুকে ছবি আঁকার ভাল
দোল এখন পোশাকি প্রেম, মন্দবাসার পিঁড়ি
দোল আজকে ভালোবাসার শপিংমলের সিঁড়ি !
এসেমেসের ঠান্ডা বাতাস, দু এক কুচি কলি
চ্যাট, ই-মেল ইনবক্সে  বোঝাই গ্রিটিংস খুলি|

যাই হোক আজ দোল !

প্রতিপক্ষের সেই একসূতো চাঁদ আজ ষোলকলা পূর্ণ করল
ফাগুণের পাতাঝরায়, কৃষ্ণচূড়ার লালে.. দোল ফিরে এল
সাথে কত রঙ !  মোরামের রাস্তায় ঝরা পলাশের কুঁড়ি
আমের মুকুল, বাদাম গাছের পাতাঝরা  গুঁড়ি!
নীলচে আকাশ, কমলা অশোক সবাই ঘুরে এল
শিমূল তলার সেই মেয়েটা  কোথায় জানি গেল !
শিমূল-তলায় মেয়ের বাড়ি, পলাশ-উঠোন ভরা
অশোক-দালান পেরিয়ে পাবে কৃষ্ণচূড়ার সাড়া
মেয়ের ছিল  পলাশ উঠোন থৈ থৈ লাল বন্যা
শিমূল তলা পেরিয়ে গেলে  দোলকে পেত কন্যা
সজনেফুলের গন্ধ বাতাস, শিমূলরাঙা মাটি
পলাশবৃষ্টি  মেঘের বাড়ি, রঙীন ধূলোমুঠি !
ফাগ উড়িয়ে মেয়ে চলল দোলের খেলাঘর
রামধনু রং, আসমানি রং, পিচকারি তুই ভর ।

সেই মেয়েটার দোল

মেয়েটার একটা রঙীন ফাল্গুন ছিল বুকে ।
কবিতার খাতা নিয়ে ঝুঁকে পড়েছিল,
শিমূল-বারান্দা তখন স্বপ্নময় ।
ভাবনার পাতা উলটে চলেছিল একে একে..
পলাশ ঝরেছিল কার্নিশে,
কমলা রঙের পলাশ, বাদামী তার বোঁটা,
উঁকি দিয়ে চলে গেছিল
বসন্তের একচিলতে রোদগোলা সকাল ।
মেয়েটার মনের ধারাপাতে তখন বসন্ত এসেছিল ।
সেদিনও ঝরেছিল একমুঠো পলাশ ,
কমলা রঙের পলাশ, বাদামী তার বোঁটা,
পাতা ছিল না একটাও তার আশেপাশে ।



 ফিরে এস

তোমার ঐ খর-দৃষ্টি সহজ হয়না
ভস্ম করবে কি এই দহন যন্ত্রণা?
মুক্তির আশায় ছুঁতে যাই অন্যখানে
হয়ত তোমারি অমোঘ আকর্ষণে..
মেঘ  জমেছিল,  মনের আকাশে
তোমায় খুঁজেছিলাম, ছিলেনা পাশে
সবাই এল, চলেও গেল
ক‌ই তুমি এলেনা তো!
হিমেল হাওয়া, ঝরে পড়া ধান
এই বুঝি তোমার দান?
আজ স্বীকার করার সময় এসেছে
ধূসর মেঘে আলোর ছোঁয়া লেগেছে
আমি শুনেছি তোমার আসার শব্দ
অনুভবে জেনেছি  তুমি অনন্য
তুমি এসো বসন্ত, তোমায় দরকার বড়
আমাকে ভরিয়ে তোলো, আমায় পূর্ণ কর
রিক্ত আমায় সাজিয়ে তোল রক্ত পলাশে
আনমনা চাই থাকতে অশোকের পাশে
আমি সাজব তোমার স্পর্শে,
সবটুকু আবেগ নিয়ে ভরা উচ্ছ্বাসে
তুমি ফিরে এসো বসন্ত, তুমি অনন্ত,
তুমি চির সুন্দর, আমি তোমার অনুগত
দাও না আমায় রেখে শুধু তোমারি করে
কক্ষনো ফিরে না যাবার আজীবন অঙ্গীকারে!





 অদিতি ভট্টাচার্য 
কলকাতা 

কনসাল্টেন্ট  
আইবিএম, কলকাতা 




মহাশ্বেতা রায়
কলকাতা

ওয়েব ডিজাইনার, 
কন্টেন্‌ট্‌ রাইটার আর
ইচ্ছামতীর দেখাশোনা করি

কলকাতায় বসন্ত

গড়িয়াহাটার মোড়ে,
মহানাগরিক ভীড়ে,
একটা পলাশ গাছ,
হটাত ফাগুন ভোরে,
ধূসর নীল আকাশ
(আর )মৃদু দখিনা বাতাস
পটভূমিতে রেখে,  আঁকে
লাল-কমলা আভাস।
বাসে  বা  ফুটপাথে
ব্যস্ত চলার পথে,
বসন্তরাজ সহযাত্রী
নতুন পাতার রথে।
সাত রঙা বেলোয়াড়ি
ফাগুন-ফেব্রুয়ারি,
ইচ্ছেমতন সাজিয়ে তোলে
ধূলি ধূসর নগরী।




দোল-ফাগুণে

 দে দোল দোল, দে দোল দোল
সকল মনের দুয়ার খোল;
রামধনুতে রঙিয়ে দিয়ে
মন আঙিনার আগল খোল
রঙ বেরঙের আবীরে আজ
বুকের মাঝে বাজুক মাদল !
শিমূল, পলাশ কৃষ্ণচূড়ায়
ভালোবাসার আগুন লাল...
পূর্ণ চাঁদের আলোক ধারায়
খুশির বানে দুঃখ ভোল ।










ছন্দা নন্দী
কলকাতা

হোমমেকার