৭ নভে, ২০১০

"লালমাটির পথে পাঁচ সতীপিঠ "

দৈনিক স্টেটসম্যান ৭ই নভেম্বর ২০১০, রবিবারের ক্রোড়পত্র বিচিত্রায়  ভ্রমণ কাহিনী
"লালমাটির পথে পাঁচ সতীপিঠ "  


১৯১৪ সালে পূজোর ছুটির পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গয়া থেকে বেলা যাবার পথে রেলওয়ে ওয়েটিংরুমে বসে লিখলেন পথের গান
"পান্থ তুমি পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কন্ঠে তোমারি গান গাওয়া"
রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বীরভূম-রাঙামাটির অমোঘ আকর্ষণে বেশ কয়েকবার পা বাড়িয়েছি । কখনো বিদায়ী ফাগুণের ভোরে, কখনো শ্রাবণী পূর্ণিমার মেঘমালাদের সঙ্গী করে, কিম্বা শীতের অলস দুপুরে |শেষ বসন্তের রেশ নিয়ে চোখঝলসানো চৈতী আগুণই হোক বা পৌষালির কনকনানি কাঁপুনিই হোক কিম্বা শরতের সোনালী রোদ ঝলমলে আকাশ ; বোলপুরের প্রকৃতির রঙ এক এক সময় এক এক রকম । ফুলের বৈচিত্রে পাতাবাহারের রঙিনতায় গ্রামবাংলার এই রাঙামাটি বোধহয় একসময় কবিগুরুকে আকৃষ্ট করেছিল ।আর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী না থাকলে সাধারণ মানুষ এই অঞ্চলের প্রতি টান অনুভব করত না । শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের আশপাশগুলিও বুঝি এত জনপ্রিয়তা পেত না । এই লালপাহাড়ির দেশ, রাঙামাটির বেশে আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে তার শক্তিপীঠের পাঁচ-পাঁচটি বরণ ডালা ।কিংবদন্তী সতীপীঠের সত্যতা যাচাই করার ধৃষ্টতা আমার নেই তবে যেমন বৌদ্ধধর্মের মহাপুরুষের রেলিকস ও তাকে কেন্দ্র করে স্তূপ তৈরী হয় হিন্দুধর্মের সতীর দেহত্যাগের পর সতীর দেহাবশেষকে কেন্দ্র করে ৫১টি শক্তিপীঠ রয়েছে | আর বীরভূমে রয়েছে এই ৫১ পীঠের পাঁচটি| বীরভূমের এই পাঁচটি সতীপীঠ হল কঙ্কালিতলা, নলহাটি, ফুল্লরা, সাঁইথিয়া আর বক্রেশ্বর ।তারাপীঠও বীরভূমের একটি পুণ্য শক্তিপীঠ কিন্তু এটি সতীপীঠ নয় ।শান্তিনিকেতন ছাড়াও এই পীঠের আকর্ষণে বারবার ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে কোলকাতা থেকে বোলপুরের পথে... "তোমায় নতুন করে পাবো বলে" | দেখা হয়েচে বহুবার চোখ মেলে, তবুও ঘর থেকে দু'পা ফেলেই আবার হাঁটি চেনা পথে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করি গ্রামবাংলাকে। সবথেকে ভালো হয় যদি বোলপুর থেকে প্রথমে প্রান্তিক হয়ে কঙ্কালিতলা, তারপর ফুল্লরা ও সাঁইথিয়া দেখে তারাপীঠে গিয়ে রাতে কোনো হোটেলে থাকা যায় । পরদিন সকালে তারাপিঠ মন্দির ঘুরে, পুজো দিয়ে নলহাটি ও সেখান থেকে বক্রেশ্বর দেখে বোলপুরে ফিরে আসুন । যদি সময় থাকে তবে নলহাটি থেকে আকালিপুরও ঘুরে আসা যাবে ।

পথের আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ি বারবার, কালের গাড়ি আরোহন করে। লিখে চলি পথের পাঁচালী । দু'চারদিন ছুটি চাই শুধু ।হাওড়া থেকে গণদেবতা, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস, শহীদ এক্সপ্রেস,, ইন্টার সিটি এক্সপ্রেস, বিশ্বভারতী এক্সপ্রেস, আর সরাইঘাট এক্সপ্রেস ; এই এতগুলি ভিন্ন সময়ের ট্রেন আছে বোলপুর বা প্রান্তিক পৌঁছবার জন্য । আর কোনো অপরিকল্পিত ছুটির পিকনিক হলে শীতকালে গাড়ি নিয়ে সদলবলে বেরিয়ে পড়লেই হল । শেরশাহ সুরীর মধ্যযুগীয় রাস্তার ওপর ইংরেজ তৈরী করেছিল গ্র্যাণ্ড ট্র্যাঙ্ক রোড এবং সেটিকে এনএইচ-২ আখ্যা দিয়ে ভারত সরকার গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারালের কোলকাতা দিল্লী শাখা তৈরী করে।
স্বর্ণালী-চতুর্ভুজ-সড়ক-যোজনার সার্থকতায় ভ্রমণের আনন্দ ছাপিয়ে যায়। মনে হয় কে বলে বাংলা আমার নি:স্ব? মানুষ রীতিমত টোল ট্যাক্স দিয়ে গাড়িতে ভ্রমণ করছে এখন । ধন্যবাদ বিশ্বায়ন ! ন্যাশানাল হাইওয়ে অথরিটি অফ ইন্ডিয়া(NHAI) মেন্টেন্যান্স করছে ! ধন্যবাদ NHAI ! চারলেনের রাস্তায় স্রোতের মত নিয়ম মেনে গাড়ি চলছে ঠিক বিদেশের মত ; মাঝখানের ডিভাইডারে দৃষ্টিনন্দন বোগন-ভোলিয়া, করবী আর কলকে ফুলের বাতাসীয়া দোলা দেখে কৃতজ্ঞতা জানাই NHAI ইঞ্জিনিয়ারের রুচিশীলতাকে । গাড়িতে যাবার কথা বললাম এই কারণে । আর বললাম এভাবে গেলে কোনো প্ল্যান ছাড়াই বেরোনো যায় । ট্রেনের টিকিট কাটা, স্টেশন যাওয়া, সময় মত ট্রেন ধরার হ্যাপা নেই । আর ব্যস্ততার জীবনে হঠাত মনে করলেই বেরিয়ে পড়া যায় এইসব কাছে পিঠের জায়গায় । কোলকাতা থেকে গাড়ি করে গেলে বোলপুর পৌঁছতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টা । ভোর ভোর বেরুলে অনেক বার ঘন্টা তিনেকের মধ্যেও পৌঁছে গেছি ।  মাঝে শক্তিগড়ে দাঁড়িয়ে প্রাতরাশ সেরে নেওয়া যায় গরম কচুরি আর চা দিয়ে । এন এইচ-২ ধরে সোজা যেতে হবে পানাগড় অবধি|পানাগড়ের ভাঙা ট্রাকের সারি পেরিয়ে তারপর ডান দিকে পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের বাঁকে ঘুরে, অজয় নদী পেরিয়ে পেরোতে হয় শাল ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল | ইলামবাজারের ঘন জঙ্গলমহল | পথের সাথী সকালের মিষ্টিরোদ এসে পড়ে তখন শালবনের মাথায়, কচি সবুজপাতায় ।চেনাপথ যেন আরো নবীন সজীবতায় ভরে ওঠে । বৃক্ষরাজির এভ্যিনিউ সুসজ্জিত গভীর অরণ্যের করিডোর |শিল্পায়নে ব্রতী হয়ে আমরা "অরণ্যমেধ" যজ্ঞে সামিল হয়েছি তবুও বাংলার সবুজ এখনো যা আছে তা অনেক রাজ্যের ঈর্ষা আর আমাদের গর্ব | তারপরেই কবিগুরুর কর্মভূমিতে, ছাতিম, শিমূল, পলাশের শহর শান্তিনিকেতনে। শ্র্রীনিকেতন, বিশ্বভারতীর আশ্রম পেরিয়ে রতনপল্লী, বনপুলক, শ্যামবাটি, তালতোড়কে সরিয়ে রেখে দুপুর সূর্যকে মাথায় নিয়ে বোলপুর বা প্রান্তিক পৌঁছে সেরে নেওয়া যেতে পারে দুপুরের খাওয়া।বোলপুর বা প্রান্তিকে অনেক হোটেলে আছে থাকার ব্যাবস্থা। কলকাতা থেকে বুক করে এলেই হল ।
শ্যামবাটির মোড়ে সেচ দপ্তরের ক্যানালের জল বয়ে চলেছে । ভরাবর্ষায় এই জলের অমোঘ আকর্ষণ আমাকে আরো টানে। প্রতি শনিবারে ক্যানালের ধারে খোয়াইয়ের হাট বসে । এটি আর কোথাও দেখিনি। সূর্যাস্তের ঠিক ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে বসে এই হাট। কত শিল্পীরা নিজ নিজ শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন সেখানে আর সাথে থাকে বাউলের গান । রাঙামাটির পথ ধরে আমরাও পৌঁছে যাই সেখানে । ডোকরার গয়না, কত রকম ফলের বীজ দিয়ে তৈরী গয়না, কাঁথার কাজের বাহার, পটশিল্প, বাউলগানের আনুষাঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র, তালপাতা, পোড়ামাটির কাজ, বাটিকের কাজ আরো কত কিছু এনে তারা বিক্রি করে । কিন্তু অন্ধকার হবার পূর্বমূহুর্তেই পাততাড়ি গোটাতে হয় তাদের । সোনাঝুরির ছায়ায় প্রান্তিকের বনবীথি যেন ঘুরে ফিরে নতুন করে ধরা দেয় আমার কাছে। প্রান্তিকের অনতিদূরে বোলপুর থেকে ৯কিমি দূরে বোলপুর-লাভপুর রোডের ওপর কংকালিতলায় মাকালীর মন্দিরের আকর্ষণও দুর্নিবার । দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর খন্ড দেহাংশের কাঁখাল অর্থাত কোমরের অংশ বিশেষ পতিত হয় এখানে ...একটি কুন্ডে। আর পাশে উত্তরমুখে প্রবাহিনী কোপাই নদী সংলগ্ন এলাকায় শ্শ্মশান । আমি এই জায়গায় এলে কিছু মাহাত্ম্য অনুভব করি।কঙ্কালিতলার মায়ের মন্দিরের সামনেই রুরু-ভৈরব শিবের মন্দির । অগণিত বাউলের গানের মূর্ছনায় জমজমাট কঙ্কালিতলার প্রাঙ্গণ । ঐ পথেই অনেক দূর এগুলেই পড়বে ময়ূরাক্ষী নদীর সমতলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান লাভপুর যার অনতিদূরে অবস্থিত ফুল্লরা বা সতীপীঠ অট্টহাস । এখানে সতীমায়ের অধর ওষ্ঠ পড়েছিল । মন্দিরের পাশে বিরাট পুকুর । কথিত আছে রামচন্দ্র যখন দুর্গাপুজো করেছিলেন তখন হনুমান ১০৮টি নীলপদ্ম এই পুকুর থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন রামচন্দ্রের পূজার জন্য । অট্টহাসে দেবী ফুল্লরার ভৈরব হলেন বিশ্বেশ ।সেখান থেকে ঘুরে আসা যায় অপর একটি পীঠ সাঁইথিয়া যেখানে সতীর গলার গহনা পড়েছিল । সাঁইথিয়ার নন্দীকেশ্বরী মায়ের অপর নাম নন্দিনী ।ভৈরব হলেন নন্দীকেশর । সাঁইথিয়া স্টেশন থেকে দেড় কিমি দূরে এই মন্দির ।এরপর রামপুরহাট থেকে ৬কিমি দূরে দ্বারকা নদীর ধারে তারাপীঠও ঘুরে আসা যেতে পারে । একদিকে কিংবদন্তীর সাধক বশিষ্ঠ মুনির তপস্যায় আর অন্যদিকে ইতিহাস খ্যাত সাধক বামাখ্যাপার তন্ত্রসাধনায় "তারাপীঠ" আজ একটি জাগ্রত পীঠ । বামাখ্যাপা তারাপীঠের মহাশ্মশানে তন্ত্র সাধনা করে তারামায়ের দর্শন পেয়েছিলেন । ভোর চারটের সময় তারাপীঠের মন্দির খোলে ।রাতে এখানে একটি হোটেলে থেকে, ভোরে পুজো দিয়ে মন্দির দর্শন করে চা জলখাবার খেয়ে পরদিন বেরিয়ে পড়া যেতে পারে পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ের ধারে নলহাটির পথে যেখানে সতীপীঠ "নলহাটেশ্বরী"র মন্দির । এখানে সতীমায়ের গলার নলী বা ভোকাল কর্ড পতিত হয় ।ছোট্ট টিলার ওপরে রাণি ভবানীর তৈরী নলাটেশ্বরী মন্দির রামপুরহাট থেকে ১৬কিমি দূরে এবং শান্তিনিকেতন থেকে ৯১ কিমি দূরে । নলাটেশ্বরী দেবীর নাম কালিকা আর তাঁর ভৈরব হলেন যোগেশ । সেখানে সকালে পৌঁছে গেলে মায়ের ভোগের ব্যাবস্থাও পাওয়া যায় । পানাগড়- মোরগ্রাম হাইওয়ের থেকে বেরিয়ে ঘুরে আসা যায় বক্রেশ্বরে যেখানে সতীর "মন" পড়েছিল । বক্রেশ্বর নদীর ওপর "নীল-নির্জন" ড্যাম যা একটি ট্যুরিষ্ট স্পটও বটে | এই জলাধারটি বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুত কেন্দ্রের জল সরবরাহ করে । এবার আসি বক্রেশ্বরের মাহাত্ম্যে । সত্যযুগে লক্ষ্মী-নারায়ণের বিবাহের সময় ইন্দ্র সুব্রত নামে এক মুনিকে ভীষণ অপমান করেছিলেন । যার ফলে সেই সুব্রত মুনির শরীরে আটটি ভয়ংকর ভাঁজ পড়ে যার জন্য তার নাম হয় "অষ্টাবক্র" মুনি । এই অষ্টাবক্র মুনি বহুদিন শিবের তপস্যা করার পর শিবের আশীর্বাদে মুক্তি পান । তাই এই বক্রেশ্বর শিব খুব জাগ্রত । এখানে দশটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে যাদের জল গড়ে ৬৫ থেকে ৬৬ডিগ্রি সেলসিয়াস । সতীর "মন" বা ভ্রুযুগলের মধ্যবর্তী অংশ পতিত হয় । আপাত অনাড়ম্বর মহিষমর্দিনি মায়ের মন্দিরে দাঁড়ালে বেশ ছমছমে অনুভূতি হয় । আর সাথে বক্রেশ্বরের শিবমন্দিরটিও দেখে ঘোরা যায় । কত প্রাচীন এইসব মন্দির তা মন্দিরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় । বক্রেশ্বরের উষ্ণপ্রস্রবণে স্নানের ব্যাবস্থাও আছে । সেখান থেকে সময় থাকলে যাত্রা করা যায় আকালিপুর ভদ্রপুরের উদ্দেশ্যে । এটি রামপুরহাট থেকে ২৫কিমি দূরে । মহারাজা নন্দকুমারের প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দির আছে এখানে ।
অসাধারণ সুন্দর এই ছয়কোণা মন্দিরের স্থাপত্য । আর সুন্দর প্রতিমার বিগ্রহ । আকালীপুর যাওয়ার পথে পড়বে "একচক্রাগ্রাম" যেখানে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্মস্থান । কথিত আছে মহাভারতের পান্ডবরা তাদের অজ্ঞাতবাসের সময় এখানে কিছুদিন বাস করেছিলেন ।
কেন্দুলি এবং নানুর এই দুটি জায়গার জন্যও বীরভূম প্রসিদ্ধ। গীতগোবিন্দের রচয়িতা জয়দেবের জন্মস্থান কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি আর বৈষ্ণবপদাবলীর রচয়িতা চন্ডীদাসের জন্মস্থান নানুর । শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র ১৮ কিমি দূরে অজয় নদী ও ময়ূরাক্ষী নদীর মধ্যবর্তী সমতলে অবস্থিত নানুর । পানাগড় থেকে গেলে ইলামবাজারের একটু পরেই বাঁদিকে ঘুরে কেঁদুলির পথে যাওয়া যায়।মকর-সংক্রান্তির সময় বিরাট মেলা বসে কেঁদুলিতে ।গ্রামবাংলার চালার অনুকরণে তৈরী অত্যন্ত সুন্দর সব মন্দিরের হাট এই কেঁদুলি | অপূর্ব সুন্দর টেরাকোটার ভাস্কর্যের রাধাবিনোদ মন্দির যা আবারো মনে করিয়ে দেয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে, পোড়ামাটির নিখুঁত স্থাপত্যে রামায়ণের কাহিনী লিপিবদ্ধ করা আছে মন্দিরের গায়ে ।
কাজেই শুধু বিশ্বভারতী পৌষমেলা বা বসন্ত উতসব নয় পুজোর ঠিক পরথেকেই রাঙামাটির বাতাসে থাকে মৃদু ঠান্ডার স্পর্শ যার রেশ চলে বসন্তের শেষ অবধি । ঐসময়গুলি বাদ দিলেও ক্ষতি নেই । নিরিবিলিতে আর শান্তিতে ঘুরে আসা যায় দর্শনীয় স্থানগুলি । তিন থেকে চারটি দিন বার করে নিলে একটু আরামে দেখা যায় সব ক'টি জায়গা । আর কোলকাতার এত কাছে এতগুলি জায়গা থাকতে পুজোর পর মনখারাপ কাটাতে সস্তায় ঘুরে আসা যেতেই পারে বোলপুর ।আর যদি উইকএন্ডে যান তবে ভুলে যাবেন না যেন শনিবারের খোয়াই হাটের কথা |
ফুলেদের সাথে কথা বলে, পাখিদের সাথে গান গেয়ে যাই । আর খবর নিয়ে যাই সবুজ আর নীলের | ভালো থাকতে বলি , বেঁচে থাকতে বলি বাউলকে আর মনের একতারায় বেঁধে নিয়ে যাই বাউলের দোতারার সুর |আবার আসি ফিরে গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথের ধূলায় সতী মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ।

২১ অক্টো, ২০১০

আজ যে জন্মাষ্টমী


সকালে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম আমার সাথে কথা বলা সব ফুলেদের হাসিমুখ,
পাতাবাহারের বৃষ্টিফোঁটার ওপর আলোর প্রতিসরণ দেখব বলে ।
হঠাত কাছের বস্তি থেকে আওয়াজ ভেসে এল...
সাদা পদ্ম, রজনীগন্ধায় মোড়া, টুকটুকে লাল বেনারসীর চেলি জড়ানো,
মাথা ভর্তি সিঁদুরের আর ফর্সা টুকটুকে আলতা পরা দুটি পায়ের দিকে চোখ পড়ল
সস্তার ধূপের গন্ধে রাস্তাটা যেন ম ম করে উঠল ।
আর পেছন থেকে একটা ছোট্ট ছেলে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল
"মা, তুমি কোথায় যাচ্ছো? মা আমার টিফিনের পয়সা? আমার লাটাই,
আমার গুলি ? আমি তোমায় আর জ্বালাবোনা দুপুরে মা"
তবু সকলে নিয়ে চলে গেল তাকে, পুরোণো গঙ্গার দিকে,
যেদিকে সকলে যায় এই সময়ে,
খোল-কর্ত্তাল বাজিয়ে, মহাধূম করে তাকে পার করে দিল তারা
আমি ততক্ষণে পৌঁছে গেছি সেই সমুখ-শান্তি-পারাবারে...
বস্তি থেকে ছুটে এসে কয়েকজন মেয়েছেলে বলে উঠল আজ বেস্পতিবার,
কি পুণ্যাত্মা বিল্টুর মা ! কেমন এয়োস্ত্রী চলে গেল । জম্ম এয়োতি !
বিল্টু খালি পায়ে দৌড়েছে এর মধ্যে...
আর বিল্টুর বাবাকে মুক্তি দিয়েছে সেই পুণ্যবতী!
কালকের রাতের বাসি-পান্তাগুলোর জল ফেলে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানালো বুড়িগঙ্গাকে ।
একটা নিষ্কর্মা, শিরদাঁড়াহীন পুরুষের অবয়ব নিয়ে,
ওদের নেই সত্কার সমিতির বিলাস, ওদের নেই কনভয়,
নেই ওদের রাশি রাশি পুষ্পস্তবক, তাঁবেদার
তবুও ওকে চলে যেতে হল ।
বিল্টুর মায়ের একরত্তি ভরা সংসারে একমুঠোচাল বাড়তি হল
অলক্ষী এত দিনে বিদায় হল !
বলে উঠল "আমাকে তো আর কম জ্বালায়নি !"
হা গোবিন্দ আমার ! পুজো দিতে যাব কেমনে?
কতগুলো পয়সা জমিয়ে এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে ফলমিষ্টি কিনলুম রে !
"তা মল্লি তো আজকেই মত্তে হয় ? আজ যে জন্মাষ্টমী!"
পড়ে র‌ইল কাঁসার ডাবর, পানের ডিবে, রান্নাঘরে পেতলের পরাত,
আটামাখার কাঁসি, কুয়োপাড়ের পেতলের বালতি,
ঠাকুরঘরের নারায়ণপুজোর পাঁচপো সিন্নিমাখার গামলি,
তামার পুষ্পপাত্তর, পিদিম-পিলসূচ
এ সব কিছু বিল্টুর বাবার দানের বাসন ।
"কিছুই চায়নি" বিল্টুদের বাড়ি থেকে,
তবুও দিয়েছিল তারা, দিতে হয় বলে
"আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে"... তাই
তবুও তাদের মেয়েটা চলে গেল আজ ।
যাবার সময় হাত থেকে খুলে নিয়েছিল সোনার রুলি দুগাছি তারা ।
ফেনা ওঠা মুখ পুঁছিয়ে ওরা চোখে দিয়েছিল দুটো তুলসিপাতা
আর কপালে এঁকে দিয়েছিল চন্দন ; ঠিক যেন বিয়ের কনে !
হাতের মুঠোয় তখনো ছিল তার সেই ডায়জিপামের ছেঁড়া স্ট্রিপ ।
আজ যে জন্মাষ্টমী ! বিল্টুর ইস্কুল ছুটি আর তার বাবারো ।
কোনো তাড়া নেই বিল্টুর মায়ের ।

২ অক্টো, ২০১০

সেই কাশফুলেরা


আবার তোমার আসার সময় হয়ে গেল । কিন্তু তুমি কি বোঝ যে তোমার জন্য সারাটা বছর চেয়ে থাকি, তোমার পথ চেয়ে ...তুমি কি জান আকাশের কত রঙ হয় শরতে? তুমি কি কখনো দেখেছ একরাশ কালোমেঘের দল যখন ভিন আকাশপুরে পাড়ি দেয় তখন পেঁজা-তুলোট মেঘভাসি আকাশে রঙধনুর বন্যা বয়ে যায় । তোমার জন্যে কাশফুলেরা হেসে গড়াগড়ি খায় । শিউলি উঠোন, পদ্মপুকুর থৈ থৈ সুখবৃষ্টি নিয়ে চকচক করে । কিন্তু তুমি কি দেখ এসব ?
  
আগমনীর ঢেউ বাতাসী-পুকুরে । মেয়েলি আলপনায় স্থলপদ্মে শিশির আঁকে তুলি দিয়ে । দুব্বোঘাস সবুজের শব্দ শোনায় । তুমি কি শুনতে পাওনা ? 
 
আমি বসে বসে শুনি তোমার নূপুরের শব্দ । ঢেউ গুনি বাতাসে আর নীল আকাশে তোমার জন্য রোজ পাঠাই পদ্মপাতায় মোড়া একটা চিরকুট। তুমি কি সে চিঠি পেলেনা আজো? গানপুকুর পাড়ে, সুর সিঁড়ির ধারে তোমার জন্যে একলাটি আমি বসে থাকব কিন্তু। ধানক্ষেতে তোমার সবুজ দুপুর নিয়ে, শিউলির কমলা সকাল নিয়ে আর কাশ-কিশলয়ের রূপোলী বিকেল নিয়ে ... 
 
পেয়েছিলে আমার পদ্মপাতায় মোড়া চিরকুট খানি ? আমি তো সেই মেয়ে যে তোমার আগুণ নিয়ে মেতে উঠি, তোমার ছায়ায় আমার ছায়াকে আবিষ্কার করি, তোমার আলো নিয়ে খেলা করি, তোমার আকাশে আমার শুকতারা ফুটিয়ে তুলি, তোমার ছন্দে আমার সুরের তুলি আঁকি মনের ক্যানভাসে ।
আজ তোমার কাশফুলেরা কথাবন্ধু আমার !
আজ তোমার শিউলিঝরণায় আমার কথাবৃষ্টি পড়ুক ঝরে, আমি তবু চাই তোমাকে আবার নতুন করে...

সেই শাপলা-শালুকের গোলাপী ডানায়, পদ্মপরাগ অনুরাগে, সেই উচ্ছ্বসিত আবেগে কাশেদের অভ্র-শুভ্র শীষে, তোমার নতুন ধানের ক্ষেতে, রোদের বাঁশির লুকোচুরি আমার সাথে, আজ শরতের একলা ভোরে
সেই কাশফুলেদের সুরে
তুমি চিঠি লিখো আমায়
সেই শিউলিফুলের মালাগাঁথায় , শিশির আঁকা শরত কথায় , কাশ-পদ্ম বনের ওপারে দেখা করো আমার সাথে ! 
 

১০ সেপ, ২০১০

ডাকপাড়ি


Lyrics: The Call by Regina Spektor: Chronicles of Narnia: Prince Caspian
অনেকদিন ধরে গানটি শুনে একটি কবিতার রূপ দিতে চেষ্টা করছিলাম । তোমরা প্লিজ ভিডিওটা শুনে আমার লেখাটি পড়ো । কারোর মতামত থাকলে জানিও|


এক টুকরো ছোট্ট অনুভূতি মনের কোণা বেয়ে বেয়ে
একটা ছোট্ট আশায় পরিণত হল,
ছোট্ট আশার চারাগাছ বুকের মাঝে ঢেউ তুলল এক শান্ত চিন্তার ।
জন্ম নিল একটি কথাগাছে, কথাগাছের শব্দলতারা ডালপালা মেলে
বিস্তার করল ভাষার মধ্যে,
বুকের মাঝে কথার কথায় সোচ্চারিত হল কথাটি
বার বার অনুরনিত হল কথাদের প্রতিধ্বনি শব্দকণায়, গানের মালায় ।
আমি আবার আসব ফিরে কথায় কথায়, গানের সুরে,
যখন তুমি ডাকবে মোরে,
শুধু বিদায় বোলোনা, বিদায়ের কোনো চিহ্ন রেখো না |

দেখ পাল্টেছে সবকিছু, কিন্তু তাই বলে ভেবোনা আগে এমন ছিল না

শুধু চিনতে চেষ্টা করো বন্ধুদের
যখন জীবনযুদ্ধে নামবে তুমি
সুদূর অন্ধকার দিগন্তে একটি তারার আলোকে অনুসরণ করে
পথ চলো, পিছু নাও তার
আর ফিরে এসো তখন যখন শেষ হবে তোমার কাজ
শুধু বিদায় বলো না, বিদায়ের কোনো চিহ্ন রেখো না |

আর ঐ যে শুরুতে বলেছিলাম সেই টুকরো অনুভূতির কথা,

তারা হয়ত জানেনা যে আমি বুঝি
আর তারা বোঝেনা বলে ভেব না অমি বুঝি না
তোমার স্মৃতিকণাগুলি তীক্ষ্ণ হতে তীক্ষ্ণতর হোক শুধু চাই এইটুকু |
যতক্ষণ তারা তোমার চোখের সামনে এসে ধরা দেয়
তুমিও এসে ধরা দিও যখন তোমাকে ডাকবে তারা
শুধু বিদায় বলো না, বিদায়ের চিহ্ন মুছে দিও |

৬ সেপ, ২০১০

অর্কুট-আগমনী-পাঁচালী



সোনারতরীর পক্ষ থেকে সকলকে জানাই আগমনী শারদীয়ার অভিনন্দন 
 
 শুভেন্দু দাস
মন উদাসী 
মন চলে যায় দিগন্ত উড়ে..
বহুদূরে, অদ্রিজার হাত ধরে..
কোন ঠিকানায় কোন সে পারে..
অকূল আমি বুঝি নারে..
তবুও চলি, অদ্রিজার পায়ে পায়ে..
 ...
মন উদাসী, হাওয়ায় ভাসি,
এলোমেলো আগুণ 
বর্ষা নেই ভরসা নেই
সুদ চড়ছে দ্বিগুণ 

এলো খরা, মাথা ভরা
ফুটিফাটা চারধার
নেই আকাশে, মুখ ফ্যাকাশে
বন্ধ কাজ-কারবার  

এল আশ্বিন, বুকে নিযে ঋণ
চাষি খুজে ফেরে দেশলাই
হয়নিকো জামা কষ্ট যে জমা
দুর থেকে ডাকে রোশনাই 

মা যে আসেন, (মোদের) ভালোওবাসেন
(তবু) সবখানে কেনো হাসি নেই
এমনো তো হয় আনন্দেতে রয়
সক্কলে মিলে... সব্বাই !         

সুশান্ত কর
 শিশির ভেজা শিউলি তলে
রোদের লুটোপুটি;
পুজো মানেই ভিড়ের ট্রেনে
জানালা তোলা ছুটি

পুজো মানেই ঘরের টানে
বাঁধন যত ছেঁড়া;
কাশের বনে পথ হারিয়ে
ছেলে বেলায় ফেরা।

পুজো মানেই সে কবেকার
প্রেমতলার মোড়;
তনুদীপুর সাথে সেবার
মিশন রোডে ভোর

ছোট বৌদি চায়ের কাপে
কত দিনের পর;
পুজো মানেই, কোথায় থাকে
তরুণিমার বর?

এবং তারপর...

বিসর্জনে ঢাকের কাঠি
বেলুন সাদা লালে;
স্টেশন জুড়ে ধোঁয়া এবং
টোল পড়ে না গালে। 
 
 সঙ্ঘমিত্রা নাথ
এই শরতে
বৃষ্টিশেষে নীল আকাশে,
আলো হাসে শরত কাশে
।
শিশিরভেজা শিউলিবোঁটা,
প্রভাতবেলা উদ্ভাসিতা
।
এই শরতে প্রাণের মেলায়,
ভাসব আমার গানের ভেলায়
।
ছেলেবেলার ফুল কুড়োনোর দিন,
দুর্গাপুজোর আনন্দে রঙীন
।
শরত তোমার পুজোর গন্ধে,
ফিরে যাই কৈশোর আনন্দে
।  
ইন্দিরা মুখার্জি
আমি বৃষ্টিভেজা বিকেল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জেনো,

তুমি শিশির ভেজা পায়ে এসে আমার শব্দ শোনো,

আমি আগমনীর সুর তুলেছি শরত্‌ আলোর প্রাতে,

তুমি সেই সুরে যে সুর মেলালে আমার সাথে সাথে।

আমি অস্তরাগের রাগ-রাগিনী তোমার কান্না হাসি,

তুমিই আমার ইমন-বেহাগ তোমার কাছে আসি,

আমি তোমার দুখে দুখী, সুখের নতুন পাখী,

তুমিই আমার সুখের দোসর দুখ ভোলাতে ডাকি।

আমি অবাক হয়ে ভাবছি বসে আসছো তুমি রাণী,

তুমি সাজো নিজে, সাজাও আমায় ওগো আগমনী
বর্ণালী কর
শরত আলোর সকালবেলা শিউলিফুলের সুবাস ঢালা
কমলা সাদা রঙের মেলা শুরু হল তবে নেটের খেলা
দারুন ভালো লাগছে এমন কবিতাতে খেলা
যদি এমন করেই কেটে যেত আমার সকল বেলা
সুর বসিয়ে এ সব কথায় হতেই পারে গান
দরাজ গলায় গাইতে হবে জুড়ায় যেন প্রাণ
কল্যাণ মিত্র
কোন এক বিরহিণীর প্রতি শিউলি যখন হাসে
তখন তোমার চোখেতে জল আসে।
শিউলি মানেই তোমার বুকে জমাটবাঁধা ব্যথা -
সোনার আলো হারিয়ে যাওয়ার কথা।
শিউলি তোমায় নিজের সাথে সে-সব কথা বলায়,
চুপিসাড়ে তাই কি আসো শিউলিগাছের তলায় ?
...
পূজো এলে ছেলেদের যায়-যায় জান ,
সবুর সয় না বউ শাড়িগত প্রাণ ।
শাড়িতেই শেষ নয় হাত ধরে টানে –
শাড়ির ম্যাচিং জামা আছে কোনখানে ?
দিন কতো বদলায় চোখ মেলে চাই,
শাড়ি-গয়নার খিদে একই আছে ভাই !
কবিতা-কবিতা খেলা দেখ বেশ চলছে।
সবাই সবার কথা সবাইকে বলছে।
চলুক না এই খেলা এতো নয় মন্দ,
সব কবিতায় আছে পূজো-পূজো গন্ধ।
শরতের ওই হাসি চারধারে ঝরছে-
মিল-মিল এই খেলা ঝিলমিল করছে ।
...
পূজো ভীরু পায়ে আসছে।
হঠাৎ-হঠাৎ বৃষ্টিতে নেয়ে
পথঘাট সব ভাসছে।
এবার পূজোর থিম কি তাহলে
দেরি করে আসা বর্ষা ?
কলকাতা হলে জল কলকল
সব আনন্দ ফরসা !
কি খেল্ দেখাবে আকাশ এবারে ?
আঁটছে কি যে সে ফন্দি !
একগলা জলে একাকী প্রতিমা ?
দর্শক ঘরবন্দী ?
জলতরঙ্গে পূজো মাটি হলে
করার নেই তো কিছুর-ই!
শরৎকালের বর্ষা জমাতে
ঘরে-ঘরে হবে খিচুড়ি
অঝোর বারি নামছে
তাই অতএবমেজাজ গরম
কাব্যটাব্য থামছে!!
জলের ভেতর পা ডুবিয়ে
কেনাকাটায় কাঁটা
বলছে সবাই বৃষ্টিকে
তোর মুখে মারবো ঝাঁটা
কে কে রাজি ?ধরতে বাজি?
দেখবো কেমন দূরদৃষ্টি !
পূজোর দিনে রোদ থাকবে?
না কি ঝরবে ভারী বৃষ্টি?
দারুণ মজায় দিনগুলো সব
ফুচকা-রোলে লাগবে মিঠে?
না কি শাড়ি চুড়িদারে
উঠবে পথের কাদার ছিটে?
ফেলে আসা দিন হয়তো রঙিন
পথ যে অনেক বাকি,
ভ’রে মনপ্রাণ গাই তাই গান
এসো একসাথে থাকি।

আমরা এখানে স্বজন সবাই
একসুরে বাঁধা তার,
দূরে রাখি সব হতাশা-বিষাদ
মানি নাকো তাই হার,
হাতে ধরে হাত আমরা চলেছি
একপালকের পাখি।
 পূর্ণেন্দু চক্রবর্তী
শিউলিফুলের গন্ধ মানেই বাজলো পূজোর ঘন্টা
কাশ দুলিয়ে শরৎ এলো ভিজিয়ে দিলো মনটা
নড়বড়ে দাঁত কোমর ব্যাথা বুকের মধ্যে চিন চিন
পূজোর মধ্যে সেই ছেলেটা নাচবে তবু চারদিন ।।
মাগো এবার সামলে এসো , আবহাওয়াটা নয়কো ভালো
বর্ষাকালে খটখটে রোদ , শরৎকালে আকাশ কালো
জিনিপত্র বেজায় আগুন , এবার মাগো কি ভোগ নিবি
হাত পেতেছি তোর দুয়ারে , দু চার মুঠো ভাত তো দিবি ।।
ভয় নেই ভয় নেই বৃষ্টিতে ভাসবে
মেঘ জল থৈ থৈ তাই নিয়ে আসবে
ঢাক ঢ্যাম কুর কুর ঢং ঢং বাদ্যি
ধেই ধেই বাদ দেয় নেই কারো সাদ্ধি
আইস্ক্রিমের সাথে ফুচকাও জমবে
প্যান্ডেলে রোশনাই কলকাতা বোম্বে
ঝির ঝির ঝর ঝর ঝরছে তো ঝরছেই
এইবার রোদ্দূর মন মন করছে ।
...
সবাই বলে চিনি চিনি ক'জন পারে চিনতে
মুক্তো মানিক ছড়িয়ে আছে ক'জন পারে কিনতে ?
সবার মাঝে ঘুরে বেড়ায় তবু সবার নজর এড়ায়
"মুখের গড়ন দুর্গা যেন শিউলিছোপা শাড়ি
ও মেয়ে তুই কোথায় থাকিস কোনখানে তোর বাড়ি"
মধুমিতা ভট্টাচার্য
কাশ বনে হাওয়া খেলা দেখেছি সে কবে ...
মনে নেই আজ আর সেরকম ভাবে!
এখন সে খোলা মাঠে, নদির কিনারে
কাশ নয়, শুধু যে আকাশ চুম্বি খেলা করে ;
তবু করি করজোরে মায়ের বোধন
শিউলি গন্ধ ঢেলে পূজা আয়োজন
সোনালী শর্ত এল আবার জীবনে
দিব্য সুরের রেশ আগমনী গানে....
বাতাসে আজ শিউলি ফুলের গন্ধ
আকাশ জুড়ে শর্ত মেঘের আলো.
মা আসবেন, সেজেছে তাই ধরা
বাজাও শঙ্খ, লক্ষ প্রদীপ জ্বালো.
উঠোনে শিউলি পুকুরে পদ্ম কলি
কাশ বনে আজ হালকা বাতাস ছোটে
হৃদয়ে পুজোর আগমনী সুর বাজে
ভোরের আকাশে সোনালী সূর্য্য ওঠে
মহাশ্বেতা রায়
ওষ জড়ানো শরত ভোরে জানলা আধেক বন্ধ
বাগান থেকে ডাক দিয়ে যায় ভোরের শিউলি গন্ধ,
বড় হয়ে বদলাতে হয় চেনা জীবন ছন্দ
কিছু জানলা খোলা, আর কিছু জানলা বন্ধ।
মনের দরজা হয়ত খোলা, হয়ত আধা বন্ধ
ছোট্টবেলা ফিরিয়ে আনে সাঁঝের শিউলি গন্ধ।

অধরা মাধুরী
ও মেয়ে তুই থাকিস কোথায়, কোনখানে তোর বাড়ি?
মুখের গড়ন দূর্গা যেন শিউলিছোপা শাড়ি।
ও মেয়ে তোর এই অবেলায় চোখে কিসের জল
কাশের বনে নদীর কাঁপন করিস নে আর ছল।
ও মেয়ে তোর বুক গুড়গুড় মেঘলা আকাশ ডাকে
আয় তো দেখি বোস এখানে পদ্মবনের পাঁকে।

সিক্তা দাস
কৈ কৈ শরত কৈ মেঘজল সব থৈ থৈ
 ইন্দিরা মুখার্জি
দেখেছিস মা তুই কখনো মহালয়ার ভোর ?
সেই আদ্যিকালের বাদ্যিবাজা  শিউলিফুলের ঘোর! 
শিউলিছোপা দশহাতি তোর কমলা রঙের শাড়ি!
মা তোর কাশের ঝালর ঢাকের গায়ে পেঁজাতুলোর বাড়ি !
দেখেছিস মা তুই কখনো মহালয়ার ভোর ?    
সেই মাঝরাতের ঐ আগমনী-ভৈরবীর ঐ দোর !
শিশিরফোঁটায় দুব্বোঘাসে সবুজ কথা তোর 
খালিপায়ে একরত্তি মেয়ের  কত জোর ?
দেখেছিস মা তুই কখনো মহালয়ার ভোর ?

৪ সেপ, ২০১০

ফুলেদের কথা


একটা নিবিড় বন্ধুত্বের হাতছানিতে কাছে এসেছিল সাতজন ।
কি জানি কেমন করে কাছে এসে গেছিল এরা ।
হয়ত প্রকৃতির চালচিত্রের বদলানো রঙয়ের খেলায় মেতে উঠবে বলেই
কিম্বা সাতজনের মনে কিছু মিল হয়ত ছিল,
হয়ত বা ছিল পূর্বজন্মের কোনো ঋণ !
ত্রিতালের ঝঙ্কারে আগুণ তুলেছিল তারা সেই ফাগুণে,
সপ্তসুরের অণুরণনে কম্পিত হয়েছিল বোকাবাক্সের পর্দা !
সৃষ্টিসুখের উচ্ছ্বাসে, সুরসৃষ্টির উল্লাসের জোয়ারে,
তাদের মনোবীণায় বেজে উঠেছিল একটিমাত্র তান,
যা বলে দেয় প্রাণের কথা সেই গানের বার্তায় ।
হঠাত একটা তাল কেটে গেছিল ।
আজকের তিনটিকে ফেলে ঝরে গেছিল বাকী ফুলেরা।
কত বিনিদ্র রাত, কত অসহায়তার স্বীকার হয়েছিল তিনটিতে মিলে ।
কত ঝড়, কত বৃষ্টি দেখেছিল তারা ! 
তিল তিল করে বাঁচিয়ে রেখেছিল ফুলটির কুঁড়িকে
কেউ দিয়েছিল আড়াল, কেউ করেছিল আপন,
কেউ বাড়িয়েছিল অনুকম্পার হাত ।
আগলে রেখেছিল তারা তিনজন তিনফুল ।
আজ ছেঁড়া তার জোড়া হল আবার |
গোল ভূমন্ডলের একই মানচিত্রের অঙ্গনে,
অ-তিথি ছিল সেদিনের বাদলকালোয় ঝরাফুলেরা  
আর তিথি মেনে এসেছিল সেই বাকী তিনফুল
তাজা ফুলের মত, তারা হয়ে ।
সাক্ষী হয়ে র‌ইল লাল ফিতে, চিকন কাগজে মোড়া সেই অমূল্য রতন,
সেই শোধ না হওয়া পূর্ব জন্মের ঋণ !!!


১ সেপ, ২০১০

জন নায়ক শ্রীকৃষ্ণ



মহাভারতের ইতিহাস, পুরাণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ও ভারতীয় জ্যোর্তিবিজ্ঞানের সজ্গে তথ্যগুলিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করলে দেখা যায় যে মহাভারতের যুদ্ধ হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব ৩০৬৭ তে। এই সালটি তাত্পর্য পূর্ণ ও ভারতের ইতিহাসের কালঘন্ট নিরূপণে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য । মহাভারতের যুদ্ধের দিন স্থির করার প্রথম ধাপ হল পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তারিখ নির্নয় করা। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, ভাদ্রপদ মাসের কৃষ্ণাষ্টমীর পুণ্যলগ্নে যখন সোমশুভ্র চন্দ্র, রোহিণী নক্ষত্রে পদার্পণ করেছে, সময় তখন মধ্যযাম, প্রকৃতি তখন ভরাভাদ্রের অনাবিল আনন্দে রোরুদ্যমানা; মহামানবের আগমনবার্তা ঘোষণার তাগিদে অবিরাম বর্ষণ করে চলেছে আনন্দাশ্রু | তখনই জন্ম নিলেন শ্রীকৃষ্ণ যার বৃষরাশিস্থ লগ্নে চন্দ্র ছিল বিরাজমান। জন্মের পূর্ব মূহুর্তে অন্যান্য গ্রহগুলির মধ্যে পাঁচটি তাদের তেজোদৃপ্ত রূপ প্রদর্শন পূর্বক তুঙ্গস্থানগুলিতে এবং বাকী দুটি যেন নিজেদের মহিমা দীপ্তি অবগুন্ঠন করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে আশ্রয় নিল। কেউ একটু শীঘ্র, কেউ একটু বিলম্ব করল তাদের আবর্তনের গতি। এর ফলস্বরূপ মহামানবের সম্মিলিত গ্রহ-নক্ষত্রের জন্মকালীন অবস্থান অর্থাত সম্পূর্ণ ছকটি হল এক ও অদ্বিতীয়। লগ্ন এবং চন্দ্র ৫২ ডিঃ ১৫মিঃ রোহিণী নক্ষত্রে বৃষ রাশিতে । দেবগুরু বৃহস্পতি ৯১ডিঃ১৬মিঃ পুনর্বসু নক্ষত্রে, কর্কট রাশিতে । মহাদ্যুতি সম্পন্ন নক্ষত্ররাজ ভাস্কর ১৪৮ডিঃ১৫মিঃ উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্রে সিংহ রাশিতে । শশীসুত, বালখিল্য, সৌম্যমূর্ত্তি বুধ ১৭২ডিঃ৩৩মিঃ কন্যা রাশির হস্তা নক্ষত্রে। ভৃগুর পুত্র, সর্বশাস্ত্রজ্ঞ, দৈত্যগুরু শুক্র ১৮০ডিঃ১৫মিঃ তুলা রাশিস্থ চিত্রা নক্ষত্রে । রবির ঔরসজাত, ছায়ার গর্ভসম্ভূত, গ্রহরাজ শনি ২০৯ডিঃ৫৭মিঃ তুলা রাশিস্থ বিশাখা নক্ষত্রে। ধরণীর গর্ভসম্ভূত কুমারমঙ্গল ২৭০ডিঃ০১মিঃ মকর রাশিস্থ উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রে। রাহু মেষরাশিতে ১৬ডিঃ০১মিঃ ভরণী নক্ষত্রে এবং কেতু তুলা রাশিতে। শ্রীকৃষ্ণের জন্মসময় হল রাত ১১টা ৪০মি, শুক্রবার , ইংরাজি ২৭ জুলাই খৃষ্টপূর্ব ৩১১২ তে।[*]


মহাভারতের কাহিনীর আদিপর্বের শেষে আমরা কৃষ্ণের দেখা পাই দ্রৌপদীর স্বয়ংবরার বিশেষ শুভক্ষণেইতিমধ্যে কৃষ্ণ কংস নিধন করেছেন, যাদবরা কংসের শ্বশ্রুপিতা প্রবল পরাক্রমশালী জরাসন্ধের শত্রু হয়ে উঠেছে। যমুনার তীর থেকে বিতাড়িত যাদবরা, সমুদ্রতটে দ্বারকানগরীতে রাজ্য স্থাপন করেছে। যেখানে স্বয়ং দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ রাজত্ব করছেন। দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় রাজা রাজড়া উপস্থিত হয়েছেন। হাজির হয়েছেন দ্বারকারাজ শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর দাদা বলরাম---- দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবগত হওয়ার তাগিদে। এদিকে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন ব্রাহ্মণবেশী পঞ্চ পাণ্ডব। যদিও আত্মীয়তার সূত্রে কৃষ্ণ আবদ্ধ এদের সাথে,তবুও দরিদ্র ব্রাহ্মণের বেশভূষা দেখে এদের প্রথমে চিনতে পারেন নি তিনি। এবার তদানীন্তন ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর অর্জুনের শর নিক্ষেপের সাফল্যে উদ্বেলিত কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পরিচিতি বুঝতে পারলেন। ঠিক এমনটি ই যেন চেয়েছিলেন তিনি। প্রাণাধিক পার্থ'র জন্য কৃষ্ণা দ্রৌপদী ই তো নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। কিন্তু দ্রৌপদীর এত বিশাল সৌভাগ্য! না, পর্ণকুটিরে ফিরে এসে মাতৃ আজ্ঞাবহ পঞ্চপাণ্ডব একটি ফলের ন্যায় ভাগ করে নিলেন অর্জুনের পরম আকাঙ্খিত ,প্রিয়তমা নবোঢ়া কে। দ্বারকাধীশ, পিতৃস্বসা পৃথা কে শুভকামনা জানিয়ে পুনরায় ফিরে এসেছেন দ্বারকায়। শুধুমাত্র ক্ষণেকের উপস্থিতি, শুধু একটুকু ছোঁয়া দিয়ে দ্রুপদের রাজসভায় ক্ষণিকের অতিথি শ্রীকৃষ্ণ, সামান্য কৃপার দ্বারা বদলে দিলেন পাঁচ দরিদ্র ব্রাহ্মণভ্রাতার জীবন। পাঞ্চালী কে লাভ করে তাঁরা জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন। নির্মাণ হল ইন্দ্রপ্রস্থের রাজনগরী, রাজন্যবর্গের মধ্যে পঞ্চপাণ্ডব ,তাঁদের বীরত্ব, সততা, সাহস, সুকর্মের দ্বারা এবং সর্বোপরি রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে বিপুল খ্যাতি অর্জন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের জোগালেন শুভবুদ্ধি,চালনা করলেন শুভপথে। কিন্তু পাণ্ডবদের প্রতি কৌরবপক্ষের আমরণ অসূয়া এবং শ্রীকৃষ্ণের পাণ্ডবদের জন্য সদা ব্যাকুলিত হৃদয়, কৌরবদের ঈর্ষাকে উত্তরোত্তর বাড়িয়ে দিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ ভারতবর্ষের ইতিহাসে রচনা হয়ে গেল ভয়াবহ সেই ঘটনাবহুল যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্রের প্রাঙ্গণে দীর্ঘ আঠারো দিন ব্যাপী বয়ে চলল শোণিতের স্রোত, আর শ্যেন-শকুনের সোরগোলে সরগরম রণক্ষেত্রে কেবল পড়ে রইল শৃগালের অট্টহাসি, স্বামীহারানো নারীদের ক্রন্দন, আর পুত্রহারা ময়েদের বিলাপবহুল আর্তনাদ। শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে দূত রূপে অবতীর্ণ হয়ে পাণ্ডব ও কৌরবদের শুভবুদ্ধি উজ্জীবিত করে এই ভীষণ যুদ্ধকে এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু উভয়পক্ষের সমঝোতা হ্'ল না। অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ সর্বশাস্ত্রজ্ঞ , ভবিষ্যতদ্রষ্টা কৃষ্ণ বুঝেছিলেন যে যুদ্ধ বিনা গতি নেই। তাই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অনুঘটক রূপে কাজ করে ছিলেন তিনি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সকলের উদ্দেশ্যে প্রক্ষিপ্ত "মা ফলেষু কদাচন" --এই বাণীর সত্যতা ব্যর্থ হয়ে যাবে । সেখানেই তাঁর সার্থকতা একজন কূটনৈতিক রাজনীতিবিদ হিসাবে।

কিন্তু কি লাভ হ'ল? যুদ্ধের পরিনামে শ্মশানের শ'য়ে শ'য়ে জ্বলন্ত চিতার লেলিহান শিখায় পুড়ে ভস্মীভূত হ'ল অধোগতি মানুষের কলঙ্কিত,পঙ্কিল,পরশ্রীকাতরতা,ঈর্ষাপরায়ণতা, কলহপ্রবণতা, নীচতা,মূর্খতা আর যা কিছু ঘৃণ্য সবকিছু। শাস্ত্রকারের ভাষায়, ধর্মগ্লানি হলে অধর্মকে বিনাশ করার জন্য,ধর্মকে পুনরায় স্থাপন করার উদ্দেশ্যে ভগবান, অবতারের রূপ ধরে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে থাকেন | অবতার ভগবানের একটি অংশ মাত্র। বিশেষ বিশেষ যুগে বিশেষ বিশেষ ধর্মগ্লানি হয়। তাই যুগের প্রয়োজনে ,ভিন্ন ভিন্ন রূপে তিনি অবতীর্ণ হ'ন এবং তাঁর বিচিত্র রূপ ও শক্তির প্রকাশ ঘটানোর উদ্দেশ্যে।

মহাভারতের রচয়িতা বিশালবুদ্ধি ব্যাসদেব কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকে কেবলমাত্র অবতার বলে অভিহিত করেন নি। শৌর্য,বীর্য,ত্যাগ,প্রেম,অনাসক্তি এবং অন্যান্য দিব্যগুণে বিভূষিত কৃষ্ণকে 'কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং' [#] বলে চিহ্নিত করেছেন।

সাধারণ মানুষের কৃষ্ণচরিত্র সম্বন্ধে যে ধারণা আছে অর্থাত গোপিনীদের প্রেমিক কৃষ্ণ ,বংশীধারী,রাখালবালক রূপী কৃষ্ণ --এ সবের চেয়ে কৃষ্ণচরিত্র অনেকটাই ঊর্ধে। সকল অবতারত্বের সারটুকু দিয়ে তৈরী তিনি, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্বজনীন নেতা। জগতের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত প্রাণ তাঁর। যাঁর জন্য ধৃতরাষ্ট্রের পরামর্শদাতা সঞ্জয় উজাড় করে দিয়েছিলেন একরাশ স্তবকুসুমাঞ্জলি। যার অনুরণনে ধৃতরাষ্ট্রের সভাগৃহ একদিন হয়ে উঠেছিল কৃষ্ণ-স্তবস্তুতির এক মন্দির।

তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ বলে 'বসু'ও দেবের ও কারণ বলে 'দেব' অর্থাত বাসুদেব, তিনি বিশ্বের বিস্তার বলে বিষ্ণু, মায়াকে দূর করেন বলে মাধব, মধু নামক দৈত্যের হন্তারক বলে মধুসূদন, 'কৃষ্' মানে সত্তা আর 'ণ্' এর অর্থ হল আনন্দ-- এই দুয়ের সমারহে তিনি কৃষ্ণ । শ্বেতপদ্মের ন্যায় আঁখি বিশিষ্ট বলে তিনি হলেন পুণ্ডরীকাক্ষ, 'জন' নামক অসুরের দমনকর্তা বলে জনার্দন, সত্ত্বগুণ থেকে বিচ্যুত নয় বলে সাত্ত্বত। আবার যশোদা কর্ত্তৃক দাম অর্থাত রজ্জু দ্বারা উদরে আবদ্ধ হয়েছিলেন বলে তিনি দামোদর, নরগণের মুক্তির স্থান বলে নারায়ণ, পুরুষের শ্রেষ্ঠ বলে পুরুষোত্তম | তিনি ই সব বলে সর্ব,সত্যে প্রতিষ্ঠিত বলে 'সত্য' ।

যাঁর সহস্র কিরণের ছটায় একদা আলোকিত হয়েছিল সনাতন ভারতভূমি। যিনি ধর্মরাজ্য স্থাপনের বাণী প্রচার করেছিলেন সমগ্র ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে। তাঁর পাঞ্চজন্যের বজ্রনিনাদে অনুরণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধপ্রান্তর চতুর্দিকে অধর্মের বিনাশ আর ধর্মের উত্থানের কম্পন অনুভব করলেও তা ছিল সাময়িক। নতুন ধর্ম রাজ্যের নবজাগরিত মনুষ্যগণের রাজা হলেন জ্যেষ্ঠ পান্ডব যুধিষ্ঠির ,যিনি আজন্মকাল ধর্মরাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন , কিন্তু সত্যি ই কি ধর্মরাজ্য স্থাপিত হয়েছিল ভারতবর্ষে? যা হয়েছিল তা হল নিতান্ত ই এক শূন্যতায় পূর্ণ অলীক কল্পনামাত্র। যার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং | যুদ্ধের পরে পড়ে রইল কিছু ক্ষমতাহীন প্রতিবন্ধী মানুষ, কিছু ক্ষমতাশীল, ছদ্ম গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ আর কিছু নপুংসক,মেরুদণ্ডহীন পুরুষ যারা রাজনীতির ভন্ডামিকে পাথেয় করে ,'মাত্সন্যায়' এর নীতিকে আঁকড়ে ধরে বুজরুকির ভেলকি দেখিয়ে সমগ্র জাতির কান্ডারী হল। ফলে সামাজিক অবক্ষয় হতে শুরু হল, মানুষ আরো অন্ধকারের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে বেঁচে রইল। এইখানেই কলিযুগের সূচনা । এক মূহুর্ত কালবিলম্ব না করে কলিযুগ নির্দিষ্ট সময়েই হাজির হল। ভগবান কৃষ্ণও স্বয়ং পারলেন না সেই কালচক্রের অমোঘ গতিকে রুদ্ধ করতে। এখানেই তাঁর মতো রাজনৈতিক অবতারের ব্যার্থতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনো আমরা তাঁকে স্মরণ করি কেন? কারণ পৃথিবীতে কেউ কেউ সেই অলৌকিক শক্তি র অধিকারী হয়ে মাঝে মাঝে এসে ধরাধামে অবতীর্ণ হ'ন, সাধুদের পরিত্রাণ আর দুষ্কৃতদের বিনাশ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের ত্রাণকর্তা রূপে।

বাস্তবিক জীবনে আমরা শুনেছি দুটি বিশ্ব যুদ্ধের কথা,দেখেছি তার ফল, এখন তৃতীয়টির অপেক্ষায় দিন গুনছি। কিন্তু একদা অন্ধকারের মধ্যে আলো দেখিয়েছিলেন যিনি সেই প্রবাদপুরুষ পার্থসারথির বাণী কে পাথেয় করে এখনো আমরা সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করে এগিয়ে চলেছি । কারণ কর্ম ই জীবন।। ফলের আশা করবো না, সর্বতোভাবে আত্মনিয়োগ করবো কর্মযজ্ঞে। শ্রীমদ্ভাগবত্গীতার শাশ্বতবাণী কে মাথায় করে ,"আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা চল রে"-এই মন্ত্রে দুর্গমগিরি,দুস্তর মরুপ্রান্তর লঙ্ঘন করবো।



(*) “The Date of the Mahabharata War”, K Srinivas Raghavan, 1969, Srinivas Gandhi Nilayam, Srigam Press, Madras 18. Available at Adyar Library Chennai.

[#] উদ্যোগপর্ব (৬৬/৪৭)

২৯ আগ, ২০১০

"নয়নভোলানো নিউ অর্লিন্স"

২৯শে আগস্ট ২০১০,  দৈনিক স্টেটসম্যান (বাংলা) র রবিবাররের ক্রোড়পত্র বিচিত্রায় প্রকাশিত "নয়নভোলানো নিউ অর্লিন্স"

আমেরিকার অনেক নাম করা শহর যেমন নিউইয়র্ক ,ফ্লোরিডা, নিউজার্সি,  বস্টন, ক্যালিফোর্নিয়া, লস এন্জেলেস নিয়ে আমরা পত্র-পত্রিকায় অনেক গল্প, ভ্রমণকাহিনী, পড়ে থাকি । এই শহর গুলি আমাদের না ঘোরা হলেও নামগুলির সাথে আমরা অত্যন্ত পরিচিত । কেউ আমেরিকা যাচ্ছে শুনলেই আমাদের এই সব চিরাচরিত  শহর গুলির কথা প্রথমেই মাথায় আসে ।  কিন্তু আজ আমি এমন একটি শহরের নাম করব তা হয়ত অনেকের চেনা আবার অনেকের কাছেই অচেনা  । বহু পুরোনো শহর এটি । আমেরিকার একটি গুরুত্ব পূর্ণ পোর্ট আর পাঁচমিশেলি ঐতিহ্যবাহী এই শহরটির নাম নিউ-অর্লিন্স । লুইসিয়ানা স্টেটের বন্দর শহর ।  মিসিসিপি নদীর ধারে  অবস্থিত এই শহরে আমার যাবার অভিজ্ঞতা এবং সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৮৯ সালে । ডালাস শহর থেকে গাড়ি করে এক ভোরে আমরা পাড়ি দিয়েছিলাম নিউ-অর্লিন্সের দিকে ।   টেক্সাস স্টেট আর লুইসিয়ানা স্টেটের  মধ্যবর্তী ইন্টারস্টেট হাইওয়ে ধরে মাজদা ৬২৬ গাড়ি নিয়ে আমাদের যাত্রা হল শুরু । সাথে এক থার্মোস কফি, ইন্স্ট্যান্ট কেক মিক্স  দিয়ে বানানো কেক , কুচো নিমকি আর আইসবক্সে "কোল্ড-কার্ট" (স্যান্ডুইচ এর মাংসের স্লাইস ) , স্যান্ডুইচ ব্রেড আর কয়েকটা কোক ক্যান । ডালাস থেকে নিউঅর্লিন্স প্রায় ৮০০ কিলোমিটার । রাস্তাঘাট ভাল, পথে ছোট বড় ফুড জয়েন্টেরও অভাব নেই   কিন্তু স্টুডেন্টের পকেটমানিতে কথায় কথায় রেস্তোরাঁয় থামতে হলে নিউঅর্লিন্সে পৌঁছে মেমেন্টো কেনার সামর্থ্য হবে না তাই খাবার দাবার খানিকটা নিয়ে যাওয়া এই আর কি ।
গাড়ি করে লংড্রাইভে যেতে যেতে দেখেছি আমেরিকার রাস্তাঘাটের  বৈচিত্র্য । নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে বিধাতা পুরুষ ছপ্পর ফুঁড়ে দিয়েছেন এদের, দু হাত তুলে সর্বক্ষণ আশীর্বাদ করে চলেছেন আর দেশের মানুষগুলিও সর্বদা প্রাণ দিয়ে  নিজের দেশ কে আরো সজীব, আরো সুন্দর করার ব্রতে ব্রতী  ।  এত পরিচ্ছন্নতা, এত পর্রিকল্পনাময় পরিকাঠামো দেখে বারবার মনে হয়েছে ভগবানের নিজের দেশ বোধ হয় এটি । তাই বোধ হয় এত সুন্দর । তাই নিউঅর্লিন্স যাবার সময় ও বারেবারে মনে হয়েছে "তোমার গান গাওয়া শেষে রেখে যেও তব হাতের কোমল স্পর্শ , আমি আবার ফিরে এসেছি হেথায় পেরিয়ে আলোকবর্ষ"  টেক্সাসের সবুজ আর লুইসিয়ানার নীল নিয়ে চললাম । গাড়ি ছুটে চলল হাইওয়ের ওপর দিয়ে, গাড়ির অডিওতে বাজতে লাগল রাবিঠাকুরের গান "পথ দিয়ে কে যায় গো চলে " যত এগোই তত মনে হয় সবুজে-নীলে মিশে প্রকৃতি একাকার । এখানকার আকাশ বোধ হয় আরো নীল আর ধানক্ষেতের সবুজ যেন আরো বেশি সবুজ ।  গ্রাম, ভুট্টার ক্ষেত, গম ও ধানের ক্ষেত, ছোট ছোট খাল-বিল আর বক, সারস তো চললই আমাদের সাথে । ঘন্টা দুয়েক চলার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে কফি আর কেক খেয়ে আবার চলা ।হাতে একটা ম্যাপ নিয়ে পাশের ড্রাইভার ভদ্রলোকটিকে ন্যাভিগেট করতে করতে চললাম |তখন মার্চ মাস, গরম একদম নেই । বাতাসে হালকা ঠান্ডার রেশ । শেষ বসন্তের  একটুকু ছোঁয়া ।   রাস্তার ধারে বড় বড় গাছেদের পাতা ঝরে গিয়ে নতুন কচি পাতা । কোনো গাছে পাতা নেই ফুল সর্বস্ব । কত রঙ তাদের... কখনো হলুদ, কখনো বেগুনী  । বাদাম গাছের মত কোনো একটা গাছ কমলা রঙের কচি পাতাদের উদ্ধত গ্রীবা মেলে ধরেছে আকাশের সীমায়,  কখনো পেরোলাম গাছেদের সুশীতল ছায়াময় এভিনিউ ।   আমেরিকার বসন্ত বোধ করি সব জায়গায় একই রকম । আরো নীল, ঘন নীল, কচি কলাপাতা সবুজ, গাঢ় সবুজ  ।  মনে হল দোল খেললাম প্রকৃতির সাথে ।
বেলা গড়িয়ে দুপুর সূর্য যখন মাথার ওপর তখন একটা ছায়ায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে স্যান্ডুইচ বানালাম গাড়ির মধ্যে বসেই । কোক আর স্যান্ডুইচ দিয়ে সারলাম দুপুরের খাওয়া । পাশের একটা গ্যাস স্টেশনে তেল ভরে ফ্রেশ হয়ে আবার  শুরু করলাম যাওয়া । ইতিমধ্যে টেক্সাস কে ফেলে লুইসিয়ানা ঢুকে পড়েছি । প্রকৃতিগত দিক থেকে বৈচিত্র কিছু চোখে না পড়লেও ছোট,  বড় সব নদীর দেশে এসেছি মনে হল । নদীর পাড়, সেতু সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণ দেখে নিজের দেশের জন্য বড় মায়া হতে লাগল ।  সবশুদ্ধ প্রায় ন' ঘন্টা লাগল  নিউঅর্লিন্স পৌঁছতে । বিকেল প্রায় তিনটে তখন ।
পৌঁছলাম সাউথ-ইস্টার্ন লুইসিয়ানার অন্যতম শহর নিউ অর্লিন্সে । ভারতবর্ষে গ্রেটব্রিটেনের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি যেমন রাজত্ব করতে এসে কোলকাতায় গড়েছিল তাদের রাজধানী ঠিক তেমনি ৭ই মে, ১৭১৮ সালে ফ্রেন্চ মিসিসিপি কোম্পানি আমেরিকায় এসে নিউঅর্লিন্স শহরের গোড়াপত্তন করেছিল । তারপর নেপোলিয়ান    এই শহরের আশপাশের এলাকা লুইসিয়ানা স্টেটকে বিক্রি করেন ১৮০৩ সালে । আমেরিকার  দক্ষিণে অবস্থিত বলে ক্রীতদাস প্রথা বহু যুগ ধরে চালু ছিল এখানে তাই জনসংখ্যার বেশিরভাগ ই কৃষ্ণাঙ্গ । তবে শহরে পা দিয়ে ই মনে হল প্রাচীন ঐতিহ্যের ছোঁয়া এখানে, পুরোণো বাড়িদের, পুরোণো ট্রামেদের সারি ,ফুটপাথ ঘেঁষা গথিক স্টাইলের স্থাপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা স্বমহিমায় ।  কেমন একটা মন কেমন করা পুরোণো পুরোণো গন্ধ পেলাম । পরে আমেরিকার অন্য শহর গুলিতে গিয়ে যা পায়নি । ঠিক আমাদের নিউমার্কেট, এস্প্ল্যানেডের গলি আর কলেজ স্ট্রীট কফি হাউসের মাদকতার স্পর্শ অনুভব করলাম ।   তবে মেন্ট্যানেন্স আর পরিচ্ছন্নতা দেখে আবার কেঁদে উঠল প্রাণ  পুরোণো কলকাতার জন্যে ।
ডিউক অফ অর্লিন্স, ফিলিপ-ডি-অরলিন্সের  এর নামে এই শহরের নাম হয় নিউ অর্লিন্স ।    মিসিসিপি নদীর বদ্বীপে অবস্থিত এই শহরের পুব আর পশ্চিম জুড়ে শুধু তরঙ্গায়িত মিসিসিপির নীল জলরাশি আর দক্ষিণে রাজকীয় হ্রদ লেক পনচার্ট্রেন ।  অমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ বন্দর এটি আর অফশোর এবং অনশোর পেট্রোল এবং ন্যাচারাল গ্যাস উতপাদনে পঞ্চম বৃহত বন্দর এই নিউ অর্লিন্স ।   ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে আমাদের কোলকাতায় যেমন এক সময় ফরাসী, ওলন্দাজ সহ বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল নিউ অর্লিন্সে এসে ঠিক তেমন মনে হল । এই শহরটি আমেরিকার এক অনন্য শহর যেখানে নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের  মাঝে এক মাল্টিলিঙ্গুয়াল এবং ক্রস কাল্চারাল হেরিটেজের সংমিশ্রণ ঘটেছে  । আর বহুমুখী ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে নিউঅর্লিন্স বাকী আমেরিকা থেকে যেন বিছিন্ন । নতুন আমেরিকার শপিংমলের গন্ধ নেই এখানে , নেই মোড়ে মোড়ে পিত্জা জয়েন্ট বা বার্গার পয়েন্ট, নেই এক্সপ্রেস ওয়ের চাকচিক্য। বরং ইওরোপীয় সংস্কৃতির অনন্দাধারা ব‌ইছে সেখানে ।    
একটি মোটেলে গিয়ে উঠলাম আমরা । মালপত্র রেখে স্নান করে বাকি কফিটুকুর সদ্ব্যবহার করে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে ।প্রথমে ই দেখলাম লাল রঙয়ের ঝকঝকে ট্রাম একখানা । ফুটপাথথেকে নেমে ট্রামস্টপেজে গিয়ে উঠে পড়লাম ট্রামে । ওখানে বলে স্ট্রীটকার ।  পাঁচমিনিটের মধ্যে ট্রাম আমাদের নিয়ে গেল নিউ অর্লিন্সের সেন্ট্রাল বিজনেস পয়েন্ট জ্যাকসন স্কোয়ারে । উইকের মাঝামাঝি ; যথারীতি ডালহৌসি স্কোয়ারের মত ব্যস্ত রাজপথ  । অফিস পাড়া বা ডাউনটাউন নিউঅর্লিন্স । সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তখন । নিরাপত্তাহীনতার ভয় হয়ত নেই নিউইয়র্কের মত কিন্তু  পথের ক্লান্তি রয়েছে সাথে তাই সেখানে বেশিক্ষণ না থেকে ফিরে এলাম আবার ট্রামে করে । রাতে হোটেলে ফিরে ডিনার খেয়ে ঘুমোলাম । পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে প্রথমেই গেলাম  "vieux carre" নিউ অর্লিন্সের প্রাণ কেন্দ্র, পুরোণো নিউঅর্লিন্সের ফ্রেঞ্চকোয়ার্টার ছিল এককালে, তাই ফরাসী ঐতিহ্য বহমান এখনো রাস্তার মাঝে |এই শহরই নাকি জ্যাজ মিউজিকের পীঠস্থান বলে জনপ্রিয় । বিখ্যাত জ্যাজ শিল্পী লুই আমস্ট্রং এখানকার ই লোক জানলাম । পথে ঘাটে অণুরণিত হচ্ছে জ্যাজ টিউন ।    রাস্তার ধারে ধারে বাদ্যশিল্পীর জ্যাজ অনুশীলনবিশালকার স্যাক্সোফোন নিয়ে সঙ্গীত চর্চা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম । এ শহরের আকাশে বাতাসে জ্যাজ; আমি জ্যাজের কিছুই বুঝি না কিন্তু   নিষ্ঠাবান কৃষ্ণকায় এই মানুষ গুলির সঙ্গীতচর্চায় ডেডিকেশন দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হলাম ।
চোখে পড়ল ক্ষুদে চিত্রশিল্পীদের শিল্পকলা রাস্তার ফুটপাথে ছবি আঁকার ,রঙ, তুলি নিয়ে বিছিয়ে বসেছে । যেমন   আমাদের কলকাতা ব‌ইমেলা বসে ছবি এঁকে কত বিক্রি হয় সুন্দর সুন্দর ছবি ।  দাড়িওয়ালা এক বড় শিল্পী কিছু দূরে তার ইজেল নিয়ে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে ছবি এঁকে চলেছে । ফ্রান্সের পথে পথে এমন হয় জানতাম কিন্তু এ শহরে দেখে বড় ভাল লাগল ।ফুটপাথের ধারে প্রাসাদোপম অট্টালিকার আধুনিক বুটিকে রূপান্তকরণ যেন অধুনা অমুক নং বালিগঞ্জ প্লেস অথবা তমুক নং ল্যান্সডাউন টেরেসে নামজাদা ডিজাইনার বুটিক!  ঐতিহ্যময় বাড়ি গুলির এত সুন্দর রক্ষণাবেক্ষণ দেখে মনে হল এরা সত্যি গড়তে জানে বেশি ভাঙতে জানে কম ।  নয়নভোলানো সব আর্টগ্যালারি দেখলাম  । এ শহর যে শিল্প-গীত-বাদ্য-কলার সনতন পীঠস্থান সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই ।   মজার শহর নিউঅর্লিন্স সকলে নিজের খেয়ালখুশিতে চলে । কোনো সময়ের অভাব নেই, নেই কোনো একঘেয়েমি । কোনোবাড়ির পোর্টিকোতে গীটারে জ্যাজ বাজায় তরুণ, কোথায় আবার বিউগল বাজিয়ে ভিক্ষা চাইছে যুবক, কোথাও আবার একর্ডিয়ানে সুর তুলতে ব্যস্ত কোনো শিল্পী । মনে হল  ল্যাটিন কোয়ার্টার "Vieux Carre" আজও ফরাসীয়ানায় অমলিন।
সুন্দর বাঁধানো ফুটপাথ,  রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি, সাবেকি স্ট্রীটল্যাম্প আর টুকটুকে লাল ট্রামগাড়ি সব মিলিয়ে এ শহর বারেবারে  মনে করিয়ে দিল আমাদের তিলোত্তমার কথা.... একদা ভারতের রাজধানী পুরোণো কলকাতার কথা  । গেলাম সেন্টপিটার্স স্কোয়ারে ।  সেন্ট পিটার্স ক্যাথিড্রাল দেখলাম । বাকি আমেরিকার মত প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেল বেল্ট নেই এখানে । প্রধানত ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী এ শহরের মানুষ । একটা ছোট্ট বুকলেট কিনলাম শহর সম্বন্ধে জানার জন্য । এই শহর বিখ্যাত তার প্রাচীন ঐতিহ্যময়তায় । ফ্রেন্চ আর স্প্যানিশ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে বিখ্যাত "mardi gras"ফেস্টিভাল এখানে হয় জানলাম ।  সেন্টপিটার্স স্কোয়ারেও নামা-অনামা কত শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনী চলছে, যেন  ফ্রান্স শহরের পুরোনো সাবেকিয়ানা  ব‌ইছে  নিউঅর্লিন্সের কোণায় কোণায় |
গেলাম সাহেবি পাড়া ব্যস্তময় বুরবন স্ট্রীটে ।   বর্ণময় রাস্তার ধারের একটা পাবে ঢুকে এখানকার বিশেষ পানীয় "টেকিলা উইথ মার্গারিটা" খেলাম । লাঞ্চ সারলাম বুর্বন স্ট্রীটের এক পুরোণো হোটেলে ।   সেদিন প্লেটে সুসজ্জিত কেজুন রাইস আর ক্রফিস কারি নিয়ে পৌঁছে গেছিলাম পার্কস্ট্রীটের চাইনিস রেস্তোরাঁয়, এক নস্টালজিয়ায়....     লুইসিয়ানার খাবারে ক্রেওল এবং কেজুন এই দুই অভিনব ঘরানার সংমিশ্রণ ঘটেছে। স্থানীয় রেডাইন্ডিয়ানদের কুইসিন কে বলে ক্রেওল আর কেজুন হল গাল্ফ অয়েষ্টার, স্টীমড বা বয়েল্ড ক্রফিশ রেড বিনস আর স্মোকড রাইস হল এই দুই   মিশ্র খাবারের প্রধান অঙ্গ । ক্রফিশ আমাদের বাগদা চিংড়ির মত কিন্তু লবস্টার  বা কাঁকড়ার মত দাঁড়া আছে  । ট্রাইবাল কুইজিন তো কি সার্ভ করার ধরণ ধারণে সাহেবিয়ানার স্পর্শ । একটা প্লেটে স্মোকড রাইসের মাঝখানে বড় গর্ত করে ক্রফিশ কারি ঢালা রয়েছে । সে ভাবেই সকলে খাচ্ছে মাছভাত মেখে চামচ আর কাঁটা দিয়ে । সবশেষে খেলাম এখানকার অথেন্টিক সুইটডিশ "প্রালিন"| এটি এক প্রকার মিষ্টি, ক্যান্ডি জাতীয় যা তৈরী হয়  ব্রাউনসুগার, পাউডার্ড হোয়াইট সুগার, ক্রিম, মাখন আর "পেকন" বা আখরোটের মত একটি শুকনো ফল দিয়ে ।  
গেলাম নিউঅর্লিন্সের কলেজ পাড়ায় । সেন্ট চার্লস এভিনিউতে দুটি বিখ্যাত কলেজ দেখলাম । লয়োলা এবং টিউলেন ইউনিভার্সিটি । রাস্তায় একটা আর্ট এন্ড কিউরিও শপে গিয়ে কিনলাম বিখ্যাত নিউঅর্লিন্স শহরের মুখোশ , পোর্সেলিনের তৈরি এই মাস্ক । সব প্রাচীন শহরেই থাকে এমন কোনো না কোনো কিউরিও । যেমন ভুটানের ড্রাগন মাস্ক, পুরুলিয়ার ছৌ নাচের মুখোশ বাঁকুড়ার টেরাকোটার ঘোড়া আর শান্তিনিকেতনের ডোকরা ।
এবার গেলাম মিসিসিপি নদী দেখতে । ভূগোল পড়ার  সাক্ষী হয়ে চিরকাল যে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে তাকে স্বচক্ষে দেখে আত্মহারা হয়ে গেলাম । নদীর ওপর রিভার ক্রুজের ব্যবস্থা রয়েছে । খুব একটা ব্যয় বহুল ও নয় । আম-আদমী সকলেই যাচ্ছে । আমরাও চড়লাম এক মস্ত জাহাজে ।  মিসিসিপি বক্ষে ভেসেছিলাম সেদিন দুজনে.. আমার ভূগোল ব‌ইয়ের ইতিহাস সামনে দিয়ে বয়ে চলল ।
স্রোতের সুর তুলে নীলঘাগরার কুঁচি লুটিয়ে, মিসিসিপির ডেকে বসে দেখেছিলাম সূর্যাস্তের লাল রঙ ওপারের সেন্ট পিটার্স ক্যাথিড্রালও সাক্ষী হয়ে দেখেছিল সে বিকেলের সূর্যাস্তের লাল-কমলার কত খেলা!
মিসিসিপিকে বিদায় জানাতে বড় কষ্ট হয়েছিল মনে মনে বলেছিলাম "ঠিক এমন করেই থেকো তুমি যেমন আজ আছো,তোমার আকাশ আমার আকাশের চেয়েও নীল দেখে যাচ্ছি তোমার জলের রং আমার চোখের তারায় ধরে নিয়েছি তোমার আকাশে সেদিন দেখেছি পড়ন্ত সূর্য়ের লাল-কমলার খেলা
জলের ওপরে সেই ছায়া আর তার ওপরে আমাদের ছবি তা তুমিও কিন্তু রেখো ধরে সুন্দর করে.. শহর নিউঅর্লিন্সকে বলেছিলাম যদি তুমি হারিয়ে যাও একদিন যদি কোনো বিধ্বংসী ঝড় এসে তোমায় গ্রাস করে নেয় তোমার ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না, তুমি হয়ত তলিয়ে যাবে
কিন্তু আমার মনের ক্যানভাসে তুমি বেঁচে থাকবে চিরসুন্দর হয়ে"
২৯শে আগস্ট ২০০৫ এর এক বিধ্বংসি সাইক্লোন,  গাল্ফ অফ মেক্সিকো থেকে উড়ে এসে  আছড়ে পড়ে | কুখ্যাত এই সাইক্লোন  এখানে "হারিকেন ক্যাটরিনা" নামে পরিচিত। এর আঘাতে  মিসিসিপি নদীর বাঁধ ভেঙে  যায় এবং সমুদ্রের জলের উচ্ছ্বাসে সারা নিউ অর্লিন্স শহর গভীর জলে নিমগ্ন হয় । ১০০০ এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় অসংখ্য বাড়িঘর ভেঙে পড়ে এবং ব্যাবসা বাণিজ্যের বিপুল ক্ষতি হয় । পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব এখনো মুছে যায়নি নিউ অর্লিন্স থেকে, তার অর্থনীতি থেকে ও শহরের মানুষের মন থেকে  । "vieu carre" তে হয়ত এখনো বাজছে সেই জ্যাজ টিউনের সুর কিন্তু এ এক করুণ বিরহের সুর কারণ এখানকার দুটি ফর্চুন ৫০০ কোম্পানির মধ্যে একটির আজ কোনো অস্তিত্ব নেই |ঝড়ের ধাক্কায় কাবু হয়ে সে নিজেকে বেচে দিয়েছে দূর দেশের অন্য কোম্পানির মালিককে|
 
 

২৫ আগ, ২০১০

ঝাঁপ

 টাইমস অফ ইন্ডিয়ার "উদিতা" ম্যাগাজিনের আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০১০ সংখ্যায় প্রকাশিত "ঝাঁপ" কবিতাটি  
বড়‌ই বেশি ভালবেসেছিলি
তাই আমি আজ "আমি" হয়েছিলাম
বলেছিলাম বাঁচতে শিখতে তোকে,
বড় বেশি বাঁচতে চেয়েছিলাম তোকে পেয়ে, তোকে নিয়ে
তাই সব স্বপ্নগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে আমার
বেঁচে থাকার, হৈ হৈ সব রসদেরা, মন খুশির রঙীন পসরা
আজো সব থরে থরে সাজানো রয়ে গেল।
তার মাঝে ভুলে গেলাম তোর পদবী,
তোর চিবুকের কালো জড়ুল,
ছায়া ঘেরা স্বপ্নের কুয়াশায়
এখনো দাঁড়িয়ে তোর আমার শিরীষতলা, ক্যাসুরিনা
তোর রোদ্দুর হতে চাওয়া, আমার বৃষ্টিগানের হাওয়া
ছিঁড়ে গেছে সেতারের তারগুলো
জীবনের কাছে আবার বেড়াতে যাব আমরা,
যাবিতো তুই আমার সাথে এবার ?
ব্রীজের নীচে দাঁড়িয়ে আবার দেখব
গঙ্গার ভাঙা পাড়ে রাঙা আকাশের সূর্যাস্ত
মাঝগঙায় তোর সাঁতার কাটা ;
ডুব সাঁতার আর নয় এবার
আমিও এবারে তোর সাথে ডুবতে রাজী আছি !

২৪ আগ, ২০১০

ভুবনমোহিনী ভুটান ভ্রমণ

 ২৫ শে জুলাই ২০১০,   দৈনিক স্টেটসম্যানের রবিবারের ক্রোড়পত্র "বিচিত্রা"য় প্রকাশিত ভ্রমণ কাহিনীটি  "থান্ডার ড্রাগনের দেশে" এই নামে কভার স্টোরি রূপে 
৭ই জুন ২০১০, কোলকাতা ছেড়েছি, এসেছি প্রথমে ফ্লাইটে বাগডোগরা ও সেখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে আমরা চারজন মিলে রওনা দিয়েছি ভুটানের পথে । চারজন বলতে আমার স্বামী পৃথ্বীশ, ছেলে রাহুল, আমার শাশুড়ি মা আর আমি । কোলকাতা থেকে সবকিছু ব্যবস্থা করেছেন আমাদের ট্র্যাভেল এজেন্ট ইউনিকর্ন । কোলকাতার বহু প্রতিক্ষীত মৌসুমি বায়ু আর তার দোসর বর্ষা সুন্দরী অবশেষে আমাদের পিছু নিল । প্রথম বর্ষা ধুয়ে দিল ফুন্টশোলিং যাবার রাস্তা, মহানন্দার শুষ্ক কোলে তখন চরা পড়ে..দুচোখের চাহনিতে প্রখর তাপের রুক্ষতা । মনমরা মহানন্দায় বৃষ্টির আশির্বাদ ঝরে পড়ল । তারপরে বাঁদিকে তিস্তার কোল ঘেঁষে আর ডানদিকে পাহাড়কে ছুঁতে ছুঁতে গাড়ি ছুটে চলল ...কখনো তিস্তার অববাহিকায় বৃষ্টি নেই কখোনো চা বাগানের আঙিনায় গোধূলির কনে দেখা মেঘ চা পাতার ওপরে রঙ খেলছে । যাই হোক রোদ-বৃষ্টির এই লুকোচুরি খেলার সাথেসাথে পেরোলাম আমাদের ছোট নদী , বড় নদী, আরো নদী..ড্রাইভার বন্ধুটির কাছ থেকে নাম জানলাম সব চিল, মাঝালি, চেইল, মুরতি নদী রা আমাদের পথ দেখাল । বিকেলের শেষে তরাইয়ের জঙ্গলমহল পেরিয়ে ডুয়ার্সের রাজকীয় করিডোর পেরোলাম আমরা । আবার নদী! খরস্রোতা ডায়নায় তখন জল থৈ থৈ ! ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তখন ডায়নার বুকে নাচ করে চলেছে| সুয্যি ডোবার মূহুর্তে আমরা চা খেলাম সিঙারা সহযোগে। কিছু পরেই ভুটানগেট, এ প্রান্তে ভারত ও প্রান্তে ভুটানের ফুন্টশোলিং শহর ; ফুন্টশোলিং এ রাত কাতালাম সেন্টিনিয়াল ২০০৮ হোটেলে নাতিশিতোষ্ণ জলবায়ু রাতে চিকেন হীন চাইনিজ খেলাম চিলি মাটন এর সাথে । বার্ড ফ্লু' র জন্য ভুটানের রাজার আদেশ, চিকেন ব্যান্ড সমগ্র ভুটানে !!! ভোরে উঠেই পাহাড় পাহাড ছবি, দুচোখে মেখেনিলাম, প্রথম বর্ষার গন্ধমাখা, বৃষ্টিগন্ধ পাহাড়ের গায়ে;




৮ইজুন ভোরে হোটেলে পুরী-সবজী দিয়ে ব্রেকফাস্ট ও গরম চা খেয়ে আমরা গেলাম Royal Government of Bhutan এর immigration Office.যেখানে বহিরাগতদের জন্য পরিচয়পত্র দেখে ফোটো তুলে ভুটান শহরে প্রবেশের ভিসা প্রদান করা হয় । প্রথমে আবেদন করলাম আমরা চারজনে পারমিটের জন্য ঘন্টা খানেক পরে অনুমতি পত্র হাতে পেয়ে আবার চললাম ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে । ফুরিয়ে গেল ফুন্টশোলিং !
মেঘের কোলে রোদ আর রোদের গায়ে মেঘের উড়নিকে সঙ্গে করে মেঘের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি চলতে লাগল । পথে পড়ল ল্যান্ডস্লাইড। চড়াই-উতরাই দুর্গম এই পথ । একধারে গভীর খাদ অন্যধারে পাহাড়ের গা । এই সব বন্ধুর পথে আমাদের গাড়ির গতি কিছুটা কমে গেল। পাগলা ঝোরা দের কলকল হাসিভুলিয়ে দিল পথের বন্ধুরতা। পাহাড় গুলো যেন আরো সবুজ হতে শুরু করেছে এর মধ্যে। আর বৃষ্টির জল পেয়ে নানারকম ফুলেরা কথা বলে উঠল। আমরা পাহাড়ের ওপরে আর মেঘেরা ততক্ষণে আমাদের নীচ দিয়ে ভেসে চলেছে । পথেই পড়ল তরুণী তোর্সা । কি অপূর্ব তার রূপ লাবণ্য ! তোর্সা তবুও নবযৌবনা । ছোট্টবেলার ভূগোল ব‌ইয়ের সেই তোর্সা আমার ! আপন খেয়ালে তরঙ্গায়িত তোর্সার জলোচ্ছ্বাস নুড়িপাথরকে অবিরত চুম্বন করে চলেছে । সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে তোর্সা নেমে চলে গেল আমাদের নীচে। তখন কোনিফেরাস আর ডেসিডুয়াস বৃক্ষরাজি আমাদের অভিবাদন জানাল । মেঘের বাড়ি, মেঘের বাড়ি আর মেঘের বাড়ি পথ দেখা যায়না পথ চলা ই দায় । ইতিমধ্যে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে । তখন ১৪ ডিগ্রি সেল্সিয়াস । পথে টেক-চেইন জ্যাম নদী আর চুখা নদী যার ওপর বিখ্যাত চুখা হাইডেল পাওয়ার প্ল্যান্ট। বুনাগায়ে চিজ মোমো দিয়ে লাঞ্চ সারলাম । আবার নদী। রাজার নামে ওয়াংচু রিভার, সাথে রোদ ঝলমলে আকাশ | বিকেল ৪টের সময় ঝকঝকে রৌদ্র করোজ্জ্বল আকাশ আর মেঘ্মুক্ত বৃষ্টিহীন বাতাস নিয়ে পৌঁছালাম থিম্পুতে । 




রাজধানী শহর থিম্পু ইস্টার্ণ হিমালয়ের কোলে সাজানো ঝকঝকে শহর, উচ্চতা প্রায় ৮০০০ ফুট । জুনের ঠান্ডা কোলকাতার ডিসেম্বরের শুরুর মত অতি মনোরম। ৯ইজুন সকালবেলায় মেঘমুক্ত আকাশকে সঙ্গে করে হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার আমরা বেরিয়ে পড়লাম থিম্পুর দর্শনীয় স্থান গুলি দেখতে । প্রথমেই গেলাম একটি মেমোরিয়ালে। ১৯৭৪ সালে যেটি বানিয়েছিলেন রাজা ওয়াংচুর মা । ওয়াংচু মাত্র ৪৫ বছরেই মারা যান তাই তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে তার মা এই বিশাল বুদ্ধ মন্দির টি বানিয়ে দেন । সেখান থেকে গেলাম টেক্স্টাইল মিউজিয়াম , ভুটান হ্যান্ডিক্রাফটস এম্পোরিয়াম । অসাধারণ ক্রাফটম্যানশিপ, নিখুঁত , দৃষ্টিনন্দন সব আর্টিফ্যাক্টস কিন্তু দাম আমাদের নাগালের বাইরে। জানিনা ইউরোপিয় টুরিস্টদের ভীড় বলে জিনিসের দাম এত বেশী কিনা । কিন্তু সাধ ও সাধ্যের নাগালে কোনো জিনিসই কেনার মত খুঁজে পেলাম না সেখান থেকে আমরা গেলাম সারবেথাং এ বোটানিকাল গার্ডেন এ । কিছুক্ষণ ফুল, আর গ্রিন হাউসে সময় কাটল । খুব সুন্দর করে সাজানো এই গার্ডেন ; আমাদের শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেনের মত বিশালতা নেই তবে বেশ কিছু নাম না জানা ফুল দেখলাম । সেখান থেকে গেলাম পেন্টিং এন্ড স্কাল্পচার স্কুল দেখতে। কলেজের ছাত্ররা তাদের ওয়ার্কশপে বানাচ্ছে কাঠের তৈরি বিখ্যাত ভুটান মাস্ক, ড্রাগন ইত্যাদি। ধৈর্য আর নৈপুন্যের সঙ্গে বানাচ্ছে ও শিখছে তারা । কোথাও স্কাল্পচারের ক্লাস হচ্ছে । তারা মূর্তি বানাচ্ছে মোম ও ধাতু দিয়ে । হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সেরে একটু নেট ব্রাউসিং এর সময় পেলাম যদিও খুব কম সময় তার মধ্যেই আগের দিনে লিখে রাখা আমার ট্র্যাভেলগ  আপডেট করলাম । একটু রেস্ট নিয়ে ই আবার বিকেলের হালকা রোদ কে সাথী করে গেলাম টাকিন প্রিসার্ভে। টাকিন ভুটানের জাতীয় পশু । একে গোট এন্টিলোপ বলে । শাকাহারি এই পশুটি ছাগল ও গোরুর মাঝামাঝি কিন্তু কান দুটো বিশাল আর গায়ে সোনালী লোম । ঘন পাইন বনের ওপোরে তাদের রাখা হয়েছে, উঠলাম সেখানে আর তার ছবিও নিলাম । 

তারপর গেলাম পাহাড়ের মাথায় থিম্পু ভিউপয়েন্টে একঝলকে থিম্পুর মনোরম ভিউ দেখলাম । সব শেষে একটি বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রিতে । পাহাড় থেকে নেমে এসে হেঁটে ঘুরলাম থিম্পু ডাউনটাউন । রাতের খাওয়া সারলাম বিখ্যাত এক সুইস বেকারীতে । এটি মিড সেভেনটিস এ তৈরি হয়। এখনো ঠাটটি বজায় আছে। আমাদের কোলকাতার ফ্লুরিস এর কথা মনে করিয়ে দেয়। অতি সুস্বাদু সব স্যান্ডুইচ, প্যাটি আর কেক দিয়ে ডিনার সারলাম । রাতে হোটেলে ফিরে পরদিন যাবার তোড়জোড় শুরু হল। 

১০ই জুন স্নান ও প্রাতরাশ সেরে থিম্ফুর ফুন্টশোপেলরি হোটেলকে বিদায় জানিয়ে, পুনাখা ও ওয়াংডু শহরের পাস হাতে নিয়ে সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম পুনাখার পথে। এতক্ষণ একটা কথা বলতেই ভুলে গেছি, আমাদের ভারতীয় সময়ের সাথে ভুটানের ব্যাবধান আধঘন্টার । ভুটান এগিয়ে আছে এই একটা বিষয়ে । পুনাখার পথে পড়ল দোছুলা পাস, বেশ সুন্দর রমনীয় স্থান এটি। আরা পড়ল ওয়াংডি চু , বাতা চু নদী । "চু" শব্দটির অর্থ হল জল । গাড়ি ততক্ষণে নীচে নামতে শুরু করেছে । নদীর ওপরে লম্বা লম্বা গাছের থেকে ঝুলছে সার সার রঙিন ধ্বজা বা পতাকা যার ওপরে পালি স্ক্রিপ্টে লেখা তিব্বতীদের ধর্মের বাণী । আকাশে , বাতাসে মিশে যাচ্ছে সেই সব ধর্মের অমোঘ কথা, শান্তির বাণী, আদার্শতার কথা, অহিংসার কথা ; নদীর জল, বাতাস সেই বাণীর ধারক ও বাহক ...এই তাদের বিশ্বাস ! লোবেসা নামক গ্রামে পৌঁছে আমরা লাঞ্চ সারলাম থুকপা এবং চিজ মোমো দিয়ে । এবার আবার চলার পালা । কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছালাম পুনাখাতে। 

পুনাখার কাছেই ওনাখা গ্রামে পুনাটাংচু নদীর ধারে মনোময় কটেজ ; আমাদের হোটেলের নাম জাংডো পেলরি । নদীটি বিশাল লম্বা । আমাদের বারান্দায় বসে নদী দেখা যায় । পুনাখায় ঠান্ডা খুব কম । দুপুরে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে হেঁটে গেলাম নদীর ধারে। পাহাড়ের কোল আলো করে নদী অনর্গল বয়ে চলেছে নিজের খেয়ালে, গেয়ে চলেছে অবিরাম । স্বচ্ছ নদীর জলের ওপরে ছোট্ট ছোট্ট ঊর্মিমালারা কুঁচি দুলিয়ে নেচে চলেছে | সাদা বালির চর সাদা নুড়ি পাথরের সমাবেশ দেখে বুঝলাম বর্ষায় এই চর জলে থৈ থৈ করে। নদীর অতিশীতল জলে পা ডোবালাম । ভুটানে আসা পর্যন্ত চিকেনের সাথে আড়ি চলছে বলে রাহুল একটু মনমরা হয়েছিল কিন্তু নদীর জলে নামতে পেরে সে দুঃখটা ভুলে গেল ! রাতের খাওয়া সারলাম হোটেলে আজ টিপিক্যাল ভুটানিজ কুইজিন খেলাম । এসপারাগাস স্যুপ, এমা ডাটসি( লম্বা লম্বা কাঁচা লঙ্কা ও চিজ দিয়ে বানানো) , সামু ডাটসি (মাশ্রুম উইথ চিজ ) আর চাউমিন দিয়ে | পুনাখায় দিন বড় তাই সন্ধ্যে নামল রাত আটটায়। ডিনার খেয়ে এসে কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে নদীর ধারে, পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট বাড়ির সব আলো জ্বলা দেখে মনে হোল
"তোমার সবুজ অন্ধকারে জোনাক জ্বলে ঘরে ঘরে,
নদীর সুরে সুর মিলিয়ে আমি এলাম তোমার দ্বারে
পাহাড় তোমার মাদকতায়, নদীর স্রোতের উচ্ছলতায়
পেলাম তোমায় আবার আমি আপন করে নতুন করে" 


১১ইজুন ভোরে কোনো তাড়া নেই । আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে বেরুলাম ন'টা নাগাদ । প্রথমে গেলাম নেচার পার্কে স্থানীয় একটি স্কুল সেটি মেনটেন করে । পো চু এবং মো চু নদীর কনফ্লুয়েন্সে (সঙ্গম স্থল) তৈরী বিশালাকার দুর্গ যার নাম পুনাখা জঙ। এই জঙ বা Dzongএর অর্থ হল দুর্গ । পুনাখা জঙ তৈরী হয়েছিল গুরু রিংপোচি র ভবিষ্যত বাণী অনুযায়ী । গুরুর কথা অনুযায়ী এই দুর্গটি তাঁর কাল্পনিক বসত বাটি জ্যাংটোপেলরির অনুকরণে তৈরী । জ্যাংটোপেলরির অর্থ হল copper clad mountain তাই সেই কথা মাথায রেখে বানানো ; স্থাপত্য শিল্পের এক অসাধারণ এবং অভাবনীয় রূপ দেখলাম এই দুর্গে। পো চু আর মো চু নদীর দোয়াবে অবস্থিত এই দুর্গে আছে ভুটান সরকারের অফিস, গুরু রিংপোচির সমাধি আর বুদ্ধের ৩৩ ফুট লম্বা একটি মূর্তি । ভুটানের রাজার তথা সরকারের দুটি সমান্তরাল ভূমিকা আছে। একদিকে তিনি দেশের রাষ্ট্র নেতা এবং দেশ সামলান ও অন্যদিকে তিনি সমগ্র দেশের ধর্মীয় গুরু ( যদিও এখন তিনি চেষ্টা করছেন ভ্যাটিকান মডেল ছেড়ে ইংল্যান্ডের গণতান্ত্রিক মডেল দেশে আনার ) এই রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার দ্বিভাজন পরিষ্কার বোঝা গেল পুনাখা জং এ প্রবেশ করে । নদীর ওপোরে কাঠের সেতু পেরিয়ে জং এর প্রবেশ দ্বার । সেখান দিয়ে ঢুকে একধারে সারেসারে সরকারি অফিস অন্যধারে বিশাল বুদ্ধের মন্দির আর মধ্যিখানে গুরুর সমাধি ক্ষেত্র । দুর্গ তথা মন্দিরের রাজকীয় দরজা গুলি বহুধাতুর সমন্বয়ে নির্মিত এবং মন্দিরের দেযালে কাঠের ওপরে রংবেরংয়ের চিত্রকল্প অতীব দর্শনীয়।

ফিরে এসে আবার গাড়ি করে গেলাম পোচু নদীর ওপর ভুটানের সবচেয়ে দীর্ঘতম হ্যাংগিং ব্রিজ যা ৬৫০ফুট লম্বা ও মাত্র ৫ফুট চওড়া । হাওয়ায় দুলে ব্রিজের ওপর হেঁটে এ মাথা থেকে ওমাথা গেলাম । রাহুল সাথে সাথে নদীতে পাথর ফেলে ও পাথর পতনের সময় মোবাইল ফোনের স্টপওয়াচে নোট করে নিউটোনিয়ান মেকানিক্সের সূত্র (1/2 gt2)ধরে জল থেকে ব্রিজের উচ্চতা মাপল নিমেষের মধ্যে ৩১ মিটার (আন্দাজ); নদীর ধার দিয়ে হেঁটে আসার পথে ঝোপের মধ্যে একধরণের পোকাদের সমবেত ঐক্যতান শুনে তাক লেগে গেল । ফেরার পথে পুনাখার বাজারে দাঁড়িয়ে ভাদিলাল আইসক্রিম খেলাম আমরা ।
 ১২ইজুন রোদঝলমলে পুনাখার পরিষ্কার আকাশ। সকালে উঠেই দেখি আগের রাতের বৃষ্টিবাদল গেছে টুটে। আগের দিন রাতেই হোটেলের কাঠের কটেজের চালে আমি বৃষ্টির টুপটাপ শুনতে পেয়েছিলাম । যাক বৃষ্টি যে আমাদের সঙ্গের সাথী হয়নি সেই রক্ষে ; নয়ত পাহাড়ে বৃষ্টি অতি মন্দ ব্যাপার একটা । সে অভিজ্ঞতা সিকিম যাবার সময় হয়েছিল। ভুটানে আমরা চিকেন বিরহে কাতর ছিলাম । নিষিদ্ধমাংস বিফ আর পোর্ক এর প্রতি দুর্বলতা আমাদের নেই । কিন্তু প্রচুর চিজ পাওয়া যায় এখানে । তাই চিজ এর প্রেমে পড়ে গেছিলাম । সকালে চিজ অমলেট আর টোষ্ট সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বেরিয়ে পড়ার পালা । এবার যাত্রা আর একটা গ্রাম ওয়াংডির দিকে। সেখানে হোটেল বুক করা আছে । মিনিট পনেরো চলার পরেই প্রথম পিটস্টপ নেওয়া হল একটি জায়গায় যেখানে আমাদের ড্রাইভার বন্ধুটি পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।প্রায় দু কিলোমিটার হাইকিং করে পাহাড়ের মাথায় অতি জাগ্রত একটি বৌদ্ধমন্দিরে। বেশ নতুন অভিজ্ঞতা । বেশ খানিকটা ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে সরু সমতল রাস্তা ,তারপরেই চড়াই, আবার খানিকটা উতরাই এই ভাবে অনেকটা উঁচুতে উঠে মন্দির দর্শন হল। মা গাড়িতে বসে র‌ইলেন । পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে প্রচুর ধান চাষ হয় এই জায্গাটায় । আর নদীর জল আছে বলে জলের সমস্যাও নেই । রেড রাইস ভুটানের স্টেপল ফুড। তবে আমি হোটেলে খেয়ে কোনো তফাত করতে পারিনি আমাদের পরিচিত রাইসের থেকে কেবল রঙটা একটু লালচে । মন্দির দেখে এসে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে গাড়িতে ফিরে এলাম । আবার চলা শুরু । কিছুক্ষণের মধ্যেই পুনাটাংচু নদীর ধারে আমাদের ড্রাগন নেষ্ট হোটেলে এসে পৌঁছালাম। একদম নদীর ধারে হোটেল অসাধারণ নদীর ভিউ ,ঘরথেকে দেখা যায়। আর ওয়াংডি বড় বাতাসীয়া জায়গা। অতি মনোরম জলবায়ু ।
হাওয়ার গতি, মাতায় মতি,
পাহাড় ঘেরা, নদীর ঘোরা
নেইকো ঘরে ফেরার তাড়া
ফিফার সাথে চা-পকোড়া
আলসেমিতে ? নেইতো ক্ষতি !
আজ ১৩ইজুন । গতকাল রাতে ওয়াংডির ড্রাগন নেষ্ট হোটেলে ইন্টারনেট কানেক্সান পেয়ে আমরা   তিন জনেই যারপরনাই খুশী হলাম। রাতে ইন্ডিয়ান ফুড খেলাম,  গরম গরম  চাপাটির সাথে পনীর বাটার মশালা । সবশেষে ফ্রুট প্ল্যাটারে আম দেখে আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লাম । ডিনার খেয়ে ঘরে ফিরে ফিফার উন্মাদনা । সকাল হতেই স্নান খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়া । আজ গেলাম ওয়াংডির বাজারে ।বাজারে শুঁটকি মাছ বিক্রি হচ্ছে তার গন্ধে টেঁকা দায় ।   সেখান থেকে ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফোর্ট্রেস দেখতে। রবিবার বলে মন্দির বন্ধ ছিল কিন্তু খুব প্রাচীন এই জ্ং টি পরিদর্শন করে ভাল লাগল । আজ বেশ গরম ছিল । আর বিরাট সেই নদী পুনাটাং চু পাশে বলেই খুব হিউমিড ওয়েদার পেলাম এই স্থানটির  । পাহাড় পরিবেষ্টিত নদীর ধার মনে করিয়ে দিল ১৯৮৯ এ জার্মানির রাইন নদীর কথা । তবে রাইনের ধারে প্রচুর গ্রেপ ভিনিয়ার্ডস দেখেছিলাম । এখানে  কোনো ফ্রুট অর্চার্ড দেখলাম না  । সিনিক বিউটি জার্মানির তুলনায় কোনো অংশে কম নয় সেখানে জার্মান আল্পস আর এখানে ইস্টার্ন হিমালয়ান মাউন্টেন রেঞ্জ ।  সেবার রাইনক্রুজ নিয়েছিলাম । কিন্তু এখানে কোনো রিভার ক্রুজের ব্যবস্থা নেই দেখে বিস্মিত হলাম । নদীর ধারে তৈরী হচ্ছে ওয়াংডিফোদরং শহরের নিউটাউনশিপ । নদীর ওপর তৈরী হচ্ছে হাইডেল পাওয়ার স্টেশন ।  চাষ-আবাদ, টুরিজম, পাওয়ার স্টেশনে কাজ গাড়িচালানো এই সব করেই জীবিকা নির্বাহ হয় এদেশের মানুষের । হোটেলে ফেরার পথে এক জায়গায় দুটি নদীর সঙ্গম স্থলে এক অভিনব রঙয়ের খেলা দেখলাম পো চু আর মো চু এই দুই নদীর রঙ দু রকম ; একটি  জল নীলাভ, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার আর একটির রঙ ঘোলা । একটা নিদ্দির্ষ্ট পয়েন্টে দুজনের রঙ কে পরিষ্কার তফাত করা যায় । খুব সুন্দর ছবি নিল পৃথ্বীশ ।