৩১ জুল, ২০১০

ওরা চলে গেল

আজ খুব ভোর থেকে উঠে দেখছি রাস্তাঘাট জলে থৈ থৈ । গত রাতের বৃষ্টি সারা শহরকে যেমন আপাদমস্তক ভিজিয়েছে, আমার মনের ঈশানকোণের জমে থাকা একফালি কালো মেঘও অবিরত বর্ষণ করে চলেছে ।  দুচোখের পাতায় বন্যা নেমে এসেছে । এক চোখে স্বপ্নের আনন্দাশ্রু আর একচোখে বিদায়ের কান্না । ভোরে উঠেছি, বৃষ্টি থেমেছে তখন । একটা টানা রিকশা নিয়ে জলের মধ্যে দিয়ে চলেছি । কেন তা জানিনা তবে এইটাই আমার এই মূহুর্তে সবচেয়ে ভাল লাগছে । আকাশ আমার মত মন খারাপ করে রয়েছে । বাতাসও গত রাতের বৃষ্টিতে ভারী হয়ে গেছে আদ্রতায় । শহরের কারো ভাল লাগছে না এত বৃষ্টি । আর আমার তো ভাল লাগছিল না বলেই এই ভোরে বেরিয়ে পড়া  । রিকশাওয়ালাকে বললাম যত টাকা চাও তত দেব শুধু আমাকে পার করে নিয়ে চল অন্য কোথাও ।  জলের ওপর দিয়ে হাঁটলে তো অসুস্থ হয়ে পড়ব  আর রিকশাওয়ালার ও এই মূহুর্তে প্রয়োজন কিছু অর্থের । সেই ভেবে আমার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া । আর জলের ওপর দিয়ে চললে জলের আওয়াজে আমার মনের  একলা হবার , আমার মনখারাপের ভার আর থাকবে না; জল আর তার আশপাশের দৃশ্যাবলী আমাকে বেশ পার করে দেবে এই সময়ের খেয়া । 

কিন্তু ওরা চলে গেল । ওরা গেল ওদের ভালর জন্য ।  ওদের সকলের উন্নতির জন্য । আমাদের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য । দেশের কিছু কাজে লাগার জন্য । কাল বিকেলের রাজকীয় ট্রেনটি এসে যখন ইঞ্জিনটা লাগাল তার সামনে তখন আমরা পৌঁছে গেছি স্টেশনবাড়ি। মানের রেলগাড়ি থামে যেখানে,  রেলগাড়ি ছাড়ে যেখানে ।  যখন ইঞ্জিন এসে রেলের সামনে লাগে তখন একটা বিকট আওয়াজ হয় আর সেই আওয়াজে আমার ভেতর থেকে উঠে আসে না বলা কান্নার দলা পাকানো সব শব্দমালারা । আমার মত আবেগ প্রবণের না যাওয়াই ভাল স্টেশনে কারোকে সি অফ করতে কিন্তু  উপায়ও থাকেনা  না গিয়ে  । আমি কান পেতে র‌ই ; রবিঠাকুরের গান শুনতে পাই মনের ভেতরে "বিদায় করেছ যারে নয়নের জলে" ; ইঞ্জিনের ক্যাঁচকোঁচ, হকারদের ক্যাচরম্যাচর  আর ওদের কলকলানি । কিন্তু তবুও ওদের যেতে হবে এখুনি । ট্রেন ছেড়ে দিল কিছু পরেই । আবছা হয়ে গেল বাতানুকুল কোচের কাঁচের জানলা  । একটা একটা করে মুখ গুলো সরে যেতে লাগল দৃষ্টির অগোচরে । একরাশ মন খারাপ , আর সেই সাথে  ভার নিয়ে ফিরলাম বাড়ি ।
ওদের হাসি ওদের প্রাণ খুলে গল্প শুনে মনে হল ওরা ভাল ই আছে । ওরা ভাল থাক । ওরা আরো উন্নতি করুক । যাবার সময়ে ও বলল " মা তুমি কিন্তু কাঁদবে না, আমার জন্যে "  আমি ওখান থেকে তোমার ওয়েব সাইটের কাজ করে দেব । আর স্কাইপ, জি-টক তো র‌ইল । আর র‌ইল আমাদের ফেসবুক , ট্যুইটার । কারোর মা তো এমন কাঁদে না । তুমি কেন কাঁদো মা ? আমি শুধু একটাই কথা বললাম । "ঠিক আছে আর কাঁদব না রে " 

তখন সে বলল "না, না কেঁদো তুমি" । "আমার মা কাঁদে বলেই তো লিখতে পারে, আর কারো মা পারেনা "    
আবার মনে পড়ে গেল রবিঠাকুরকে " আমার ব্যথা যখন আনে আমায় তোমার দ্বারে, তখন আপনি এসে দ্বার খুলে দাও ডাকো তারে " 
আবার ওদের আসার সময় হবে । বর্ষা যাবে শরত আসবে , শরত যাবে শীত পড়বে । নতুন ধান কাটার সময় হবে । উত্তুরে হাওয়া দেবে। গাছের পাতা ঝরে যাবে । আবার ওরা চলে আসবে বাড়ি । 

৩০ জুল, ২০১০

আছে বন্ধ কর্মনাশা এমন ছুটি সর্বনাশা !!!


আবার একটা ফুল ওয়ার্কিং ডে ...আমরা বন্ধ করেছি চাকা ! আমি কোন দল বন্ধ ডেকেছে কি কারণে বন্ধ ডেকেছে সেটা আলোচনা করছিনা এখন । একটা কাজের দিনে মানুষ কে এভাবে ঘরে বন্দী করে রেখে দিলে কি সব সমস্যার সমাধান হবে? বন্ধই কি প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা ? স্কুল, অফিস, হাসপাতালের রোগী সকলের হয়রানির একশেষ । যাদের দূরপাল্লার ট্রেনের টিকিট কাটা রয়েছে তাদের কথা একবার ভাবুন তো ! আজ আমাদের এক পরিচিতের বাড়িতে একটি অনুষ্ঠান ছিল তার সেই নিমন্ত্রিতদের এক এক করে টেলিফোন করে সেই অনুষ্ঠান ক্যানসেল করতে হল কারণ তার কেটারার জানিয়ে দিয়েছিল যে বন্ধের দিনে সে কাজ করতে পারবে না । বলুন তো কেমন হল তার হয়রাণি ! আমার বাড়িতেই ধরুণনা আমার কর্তার খড়গপুরে সি আই আই এর একটি কনফারেন্সে লেকচার দেবার কথা ছিল, তার প্রস্তুতি, স্লাইড শো সব কিছু তাড়াতাড়ি তৈরী করল সে । তারপরই জানতে পারল বন্ধ ডাকা হয়েছে ফলে সি আই আই এর মিটিংও ক্যান্সেল । আমার ভাই পুণায় সায়েন্টিস্ট । সে জানাল তাদের অফিসে ফরেন ডেলিগেট আসার কথা ছিল আজ । বলুন তো এভাবে কোনো সভ্য দেশের সায়েন্টিষ্ট কে যদি জানাতে হয় " না ভাই আজ এস না, আজ আমাদের এখানে সব কিছু বন্ধ থাকবে" এতে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য রক্ষা ই বা হবে কি করে আর একদিনের বন্ধে সারাদেশের কতটা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় সে তো আমরা জানি । আমরা হলাম গিয়ে জ্ঞানপাপী । কালিদাসের মত যে ডালে বসি সেই ডালেই কুড়ুল মারি । কথায় বলে না ? আপন ভাল পাগলেও বোঝে, কিন্তু আমরা জানি সব বুঝি সব কার্যকালে দেখাই না । একটা লং উইকেন্ড সেলিব্রেট করছি.... বাড়ি বসে খাচ্ছিদাচ্ছি, ব্লগিং করছি, মাংসভাত খেয়ে দিবানিদ্রা যাচ্ছি । আহা কি আরামেই না আছি ।


এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, বনধ্‌ পালনে ওস্তাদ সে যে আমার জন্মভূমি !!!

২১ জুল, ২০১০

ছুটির সহজপাঠ

ক এ ছুটি কুমোর পাড়া
খ এ খোয়াই হাট
গ ছুটি গোলামচোরে
ঘ এ ঘুমের মাঠ |
চ এ ছুটি চাঁদের পাহাড়
ছ এ ছবি তোলা
জ এ ছুটি জামাজুতো
ঝ এ কাঁধে ঝোলা |
ট এ ছুটি টাপুর টুপুর
ঠ এ ঠাম্মার কোল
ড এ ছুটি ডানপিটে তোর
ঢ এ বাজা ঢোল |
ণ এ ছুটি নতুন নতুন 
ত এ তরুণ মন
থ এ ছুটি থামিস নে তুই
দ এ দস্যি পন |
ধ এ ছুটি ধামসামাদল
ন এ নাচি নাচ
প এ ছুটি পড়ছে বাদল
ফ এ ফাটুক কাঁচ |
ব এ ছুটি বৃষ্টি ঝরুক
ভ এ ভরুক প্রাণ
ম এ ছুটি মামার বাড়ি
য এ যাবার টান |
র এ ছুটি রোববার তোর
ল এ লজেন্স মুখ
ব এ ছুটি ব্যাডমিন্টন
শ এ শপিং সুখ |
ষ এ ছুটি ষাঁড়ের গুঁতো
স এ সহজপাঠ
হ এ ছুটি হজমিগুলি
পেরোই ছুটির মাঠ|

১৯ জুল, ২০১০

খোলাখাতা

রোদ্দুর এসে বলল "পূবের জানলা খুলে দাও, পাবে বন্ধুত্বের উষ্ণতা, সম্পর্কের তাপ"
আমি নিলাম তুলে...
হাওয়া এসে ডাক দিল, "দখিনের দরজা খোল, উড়িয়ে দাও নৈরাশ্যের শৈত্যতা, হতাশার বাষ্পকে"
আমি দিলাম খুলে...
শিশির এসে ভিজিয়ে দিল ছাদ, সবুজ ঘাস, বলল "ভিজিয়ে নাও খোলামন, ধুয়ে দাও গ্লানি"
আমি এলাম খালি পায়...
আকাশ বলল "চেয়ে দেখ আমায়, ভাব একটু বড় করে, দেখ একটু বিরাট করে"
আমি তাকালাম ওর দিকে...
বৃষ্টি এসে গান শোনাল ঝিরঝির করে, ঝমঝম করে, বলল "দেখ আমি কেমন দিতে পারি"
আমি ভিজলাম বৃষ্টির সাথে...
জোছনা এসে চুঁইয়ে পড়ল আমার বাগানে, বলল "মেখে নাও সারা গায়"
আমি ভিজিয়ে নিলাম দুচোখের পাতা...
...............।
আর? আমার ভাবনার খোলাখাতা
ব্যথার বর্ণমালা, সুখের শব্দকণারা টুপটাপ করে ঝরে পড়ল খোলাখাতায়
আমার আকাশের একমুঠো রোদ্দুর নিয়ে, বৃষ্টি ভেজা একরাশ বাতাস নিয়ে
শিশির ঝরা ভোর আর জোছনালেপা রাতকে নিয়ে
................. 

১৭ জুন, ২০১০

ভুবনমোহিনী ভুটান ভ্রমণ ২

 আজ ১৩ইজুন । গতকাল রাতে ওয়াংডির ড্রাগন নেষ্ট হোটেলে ইন্টারনেট কানেক্সান পেয়ে আমরা   তিন জনেই যারপরনাই খুশী হলাম। রাতে ইন্ডিয়ান ফুড খেলাম,  গরম গরম  চাপাটির সাথে পনীর বাটার মশালা । সবশেষে ফ্রুট প্ল্যাটারে আম দেখে আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লাম । ডিনার খেয়ে ঘরে ফিরে ফিফার উন্মাদনা । সকাল হতেই স্নান খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়া । আজ গেলাম ওয়াংডির বাজারে ।বাজারে শুঁটকি মাছ বিক্রি হচ্ছে তার গন্ধে টেঁকা দায় ।   সেখান থেকে ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফোর্ট্রেস দেখতে। রবিবার বলে মন্দির বন্ধ ছিল কিন্তু খুব প্রাচীন এই জ্ং টি পরিদর্শন করে ভাল লাগল । আজ বেশ গরম ছিল । আর বিরাট সেই নদী পুনাটাং চু পাশে বলেই খুব হিউমিড ওয়েদার পেলাম এই স্থানটির  । পাহাড় পরিবেষ্টিত নদীর ধার মনে করিয়ে দিল ১৯৮৯ এ জার্মানির রাইন নদীর কথা । তবে রাইনের ধারে প্রচুর গ্রেপ ভিনিয়ার্ডস দেখেছিলাম । এখানে  কোনো ফ্রুট অর্চার্ড দেখলাম না  । সিনিক বিউটি জার্মানির তুলনায় কোনো অংশে কম নয় সেখানে জার্মান আল্পস আর এখানে ইস্টার্ন হিমালয়ান মাউন্টেন রেঞ্জ ।  সেবার রাইনক্রুজ নিয়েছিলাম । কিন্তু এখানে কোনো রিভার ক্রুজের ব্যবস্থা নেই দেখে বিস্মিত হলাম । নদীর ধারে তৈরী হচ্ছে ওয়াংডিফোদরং শহরের নিউটাউনশিপ । নদীর ওপর তৈরী হচ্ছে হাইডেল পাওয়ার স্টেশন ।  চাষ-আবাদ, টুরিজম, পাওয়ার স্টেশনে কাজ, গাড়িচালানো এই সব করেই জীবিকা নির্বাহ হয় এদেশের মানুষের । হোটেলে ফেরার পথে এক জায়গায় দুটি নদীর সঙ্গম স্থলে এক অভিনব রঙয়ের খেলা দেখলাম পো চু আর মো চু এই দুই নদীর রঙ দু রকম ; একটি  জল নীলাভ, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার আর একটির রঙ ঘোলা । একটা নিদ্দির্ষ্ট পয়েন্টে দুজনের রঙকে পরিষ্কার তফাত করা যায় । খুব সুন্দর ছবি নিল পৃথ্বীশ । 


বাতাসীয়া ওয়াংডুফোদরং শহরে মাঝরাতে হয় বৃষ্টি আর ভোরে মিষ্টি রোদ ওঠে। এবার মজা হল, বেলা বাড়ার সাথে সাথে শুরু হয় হাওয়ার নাচন । মেতে ওঠে ওয়াংডি শহরতলী  সেই হাওয়ায় । আর সেই সাথে মেতে ওঠে শান্ত নদীটি, পটে আঁকা ছবিটি !  হাওয়া লাগে নদীর জলে, জ্যৈষ্ঠমাসে ফাগুন হাওয়ায়  আমরা বিকেলে  হাঁটতে গেলাম পাহাড়ের ধারে। ধুলো-বালি চোখে মুখে মেখে হোটেলে ফিরলাম সন্ধ্যের আগেই । মধ্যরাতে জানলার পর্দা সরিয়ে দেখি হাওয়ার নাচন কোঁদন  সব শেষ ।

  পরদিন ১৪ইজুন  সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়েই বেরিয়ে পড়ার তাড়া কারণ ওয়াংডি থেকে সেদিন আমাদের যাত্রা ভুটানের অন্যতম শহর পারোর দিকে । সাড়ে তিনঘন্টার পথ  । যাত্রাপথের শুরুটা আমাদের চেনা কারণ ঐ পথেই আমরা এসেছিলাম পুনাখা থেকে ওয়াংডির দিকে । তার পরেই অচেনা রাস্তা শুরু হল থিম্পুর দিকে যেতে গিয়ে। পাহাড়ের এক এক রকম রং লক্ষ্য করলাম । কাছের পাহাড় গুলো হালকা সবুজ আর দূরের গুলো ঘন সবুজ কার্পেটে যেন মোড়া। এই জায়গাটায় কোনো বড় সাইপ্রাস গাছগুলো চোখে পড়ল না । উঁচু পাহাড়ের মাথায় মেঘের দলেরা যথারীতি আমাদের সাথে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল ।  পথে পড়ল সিমটোকা জ্ং । দূর থেকে প্রণাম করলাম ।থিম্ফু শহরকে পাশ কাটিয়ে কিছুটা পথ গেলাম ওয়াংচু নদীর উপত্যকা দিয়ে , ধানের ক্ষেতে, রোদের ছাওয়ায় । ভ্যালির দুপাশে শুধু সবুজ  ধান ক্ষেত , ভুট্টার ক্ষেত আর বাক-হুইট এর ক্ষেতের পাশ দিয়ে । রেড রাইসের সাথে এই বিশেষ গমটিও এদেশের মানুষের  স্টেপল ফুড, জানলাম ড্রাইভার বন্ধুর কাছ থেকে । ছোটবেলায় ভূগোল ব‌ইতে পড়েছিলাম ধান-গম চাষের উপযুক্ত জমি হল নদীর ধার  মিলে গেল । এর পরেই এল পারো চু নদী কেউ বলে পা চু । বুঝলাম পারো শহরের খুব কাছেই আমরা । 
 বিশাল নদী তবে বর্ষার জল পেলে ফুলে ফেঁপে উঠবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না । খরস্রোতা পারো নদী বয়ে চলেছে সমতলে দূরে পাহাড়ের কোলআলো করা দিগন্তরেখা । নদীর নীলচে সবুজ জল, পাহাড়ের ঘন সবুজ আর আকাশের নীলে মিলেমিশে একাকার পারোর প্রকৃতি। পথে পড়ল সাবা আর্মি ক্যাম্প। তার পরেই রাহুল চেঁচিয়ে উঠল দুটি সমান্তরাল পাহাড়ের মাঝখানে দ্রুক এয়ারের উড়োজাহাজ কে ভাসতে দেখে । কাছ থেকে এত সুন্দর আকাশ-পাহাড়-মাটীর বুকে এরোপ্লেনের গতিময়তায় থমকে গেলাম আমরা । পাহাড়ের গা দিয়ে নামছিল সে  | দমদম-বারাসতের পথে দেখেছি এ দৃশ্য বহুবার কিন্তু সেখানে পাহাড় ক‌ই? 

এর পরেই পৌঁছে গেলাম আমাদের ট্যান্ডিলিং রেসর্টে । একরাশ বাহারী মরশুমি ফুলের মধ্যে কটেজ আমাদের । এ দেশে ফুলেদের যত্ন করতে । শুধু বীজ বা চারা লাগিয়ে দিলেই হল; আপন খেয়ালে ফুলেরা ফুটে এলিয়ে দেয় নিজেদেরকে পারোর পার্বত্য উপত্যকায় । ওয়াংডি গ্রামে হাওয়ার সাথে কথা হয়েছে, হাওয়ার সাথে পথ চলেছি, হাওয়ার সাথে  ভেসে এসেছি । পারোয় খেলছি ফুলেদের সাথে, কথা বলছি, হাসছি , আর মাখছি গায়ে ফুলের রেণু।
১৫ই জুনের ভোরে উঠে দেখি ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে । এদিকে আমাদের যাওয়ার কথা টাক্সং পাহাড়ে । ঘোড়ায় করে কিম্বা পায়ে হেঁটে পাহাড়ের মাথায় বহু পুরোণো এক মন্দির দেখতে ।  মনটা খারাপ হলেও আকাশের গায়ে পূবের সূয্যির আলো একটু একটু করে ফুটতে দেখে তাড়াতাড়ি  টোষ্ট-অমলেট-চা খেয়ে সাড়ে সাতটার সময়   রওনা দিলাম আমরা তিনজনে টাক্সং পাহাড়ের উদ্দেশ্যে  । পারো নদীর ব্রিজ পেরিয়ে রোদ ঝলমলে নীল আকাশ সঙ্গে নিয়ে পৌঁছালাম পাহাড়ের নীচে গাড়ী করে ।  প্রচুর টুরিস্টের আগমনে ঘোড়া পাওয়া গেলনা  । অগত্যা পা'যুগলই ভরসা আমাদের । লাঠি সাথে নিলাম। আপেল অর্চার্ড পেরিয়ে পাগলা ঝোরাদের কলকল হাসি আর অজানা পাখিদের কূজনকে সঙ্গে নিয়ে খাড়াই পাহাড়ে চড়া শুরু হল । এক ধারে পাহাড় অন্যধারে সাইপ্রাসের ঘন জঙ্গল , নীচে তাকানো যায়না এত গভীর।  কিছুটা ওঠার পরেই শ্বাস কষ্ট শুরু হল আমার । তবুও আমি হাল ছাড়ার পাত্রী নই ।


তাপমাত্রাও কমতে লেগেছে ইতিমধ্যে । কিন্তু  রোদের তাপ বাড়তে শুরু করায় গায়ে গরম জামাকাপড় খুলতে শুরু করলাম আমরা । হঠাত চোখে পড়ল ঘন অরণ্য আলো করে দূর থেকে হাতছনি দিচ্ছে আমার অতিপ্রিয় রডোডেনড্রণ পুষ্প গুচ্ছ।  কোথাও টুকটুকে লাল কোথাও গাঢ় গোলাপী, কোথাও হালকা বেবি পিঙ্ক কোথাও বা হলুদ রঙের । শুনেছি ১৩ রকমের ভ্যারাইটি আছে এই ফুলের । বসন্তে আসিনি তাই ভেবেছিলাম এর দেখা পাবনা । 

 রডোডেনড্রণের  অপ্রত্যাশিত দর্শনে  আপ্লুত হয়ে আমি উঠতে শুরু করলাম অবলীলাক্রমে। প্রায় ৩কিলোমিটার চড়াই অতিক্রম করে পৌঁছালাম পাহাড়ের মাথায় ভিউ পয়েন্টে সেখানে টাক্সং কাফেতে কফি খেয়ে বিশ্রাম নিলাম । তার চেয়ে আর ও ওপরে মন্দিরে চড়ার মত অবস্থা ছিলনা আমার যদিও রাহুল আর পৃথ্বীশ খুব উতসাহী ছিল কিন্তু আমার জন্য বেচারীদেরও যাওয়া হল না ।  তখন সময় সাড়ে দশটা । এবার নীচে নামার পালা । তখন আর শ্বাস কষ্ট নয়, পায়ের পেশীতে টান পড়ছিল । যাক প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে উতরাই পথে নেমে এলাম নীচে।  গাড়িতে ফিরে এসে আবার হোটেল । গরম ভাত-মুসুরডাল-ফ্রেঞ্চফ্রাই সহযোগে লাঞ্চ সেরে সোজা এসে শয্যা নিলাম আমি ।   

 ১৬ই জুন একটু দেরী করে ঘুম ভাঙল । আগের দিনের হাইকিংয়ের ফলে শরীরের ট্রমা ভাব ঘুমিয়ে কেটে গেছে তাই রক্ষে । অবশ্য আমি বেশী হাঁটাহাঁটি হলেই প্যারাসিটামল খেয়েনি  সেফ গার্ড হিসেবে যাতে পরের দিন ব্যথা না বাড়ে। আজ কোনো তাড়া নেই । স্নান-প্রাতরাশ সেরে নটায় বেরিয়ে পড়লাম । প্রথমেই পারো নদীর ব্রিজের ওপর গিয়ে শান্ত-স্নিগ্ধ নদীটির  ছবি নিলাম কারণ আগের দিন মেঘ ছিল আকাশে । নদীর জলে মেঘের ছায়া পড়লে নদীর ছবি ভাল হয়না  । আজ পারোয় আমাদের শেষ দিন ও রাত তাই বুঝি পারো সুন্দরী মেঘমালাদের মানা করে দিয়েছিল তার ত্রিসীমানায় আসতে। নদীতীরকে শেষবারের মত দেখে নিয়ে গেলাম কিচু মন্দিরে । সপ্তদশ শতাব্দীর এই মন্দিরটি ইন্ডিয়ান সাধু পদ্মসম্ভবের (যিনি ভুটানের গুরু রিংপোচি নামে খ্যাত)   স্মারক হিসেবে  নির্মিত। মন্দিরটি অতি প্রাচীন, তা দেখলেই বোঝা যায় | মন্দির চত্বরে কমলালেবু গাছে ভর্তি লেবু ধরে আছে ।  মন্দিরের ভিতরে গুরুর প্রায় ৩০ফুট লম্বা ধাতব মূর্তি । মন্দিরের বাগানে বহু পুরোণো ফলন্ত একটি ওক গাছ এবং প্রচুর আপেল গাছ । সব মিলিয়ে মন্দিরটির অন্দরে ও বাইরে কিছু মাহাত্ম্য অনুভব করলাম । এরপর গেলাম পারোনদীর অপর পারে অবস্থিত তা জ্ং পরিদর্শন করতে ; তা জংটি একটি অতি প্রাচীন  এবং অভূতপূর্ব একটি ফোর্ট্রেস যেটি একটি চোঙাকৃতি আটতলা কাঠ ও পাথর দিয়ে তৈরী বাড়ি । ১৭১৪ সালে ভুটানের ১৫দিন ব্যাপী ভয়ংকর ভূমিকম্পেও তার গায়ে আঁচ পড়েনি  । এই তা জ্ংটি বর্তমানে  ন্যাশানাল মিউজিয়াম অফ ভুটান  হিসেবে  ব্যবহৃত হচ্ছে । 
 এখানে ভুটানের ঐতিহ্য থেকে শুরু করে  বুদ্ধের অসাধারণ সব মূর্তি , মহাকালীর মূর্তি,  যমরাজের বিশালাকার একটি মুখোশ, প্রাচীনতংখা, ফ্রেস্কো, বাসন পত্র, পূজার সামগ্রী, ভুটানের পুরুষের পোশাক "ঘো" আর মহিলাদের পোশাক " কিরা", রূপোর অলঙ্কার সুন্দর ভাবে রক্ষিত । গোলকধাঁধার মত এই  মিউজিয়াম । ঘুরতে খুব ভাল লাগল ।  জ্ংএর ৬তলায় রাখা রয়েছে  চারটি ধর্মীয় ধারার গুরুদের মূর্তি ; একটি স্থাপত্যকীর্তির মাধ্যমে  সেটিকে দেখানো হয়েছে, যেটিকে বলে  Tshogzing  ।    মিউজিয়ামের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ।  মিউজিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতা প্রশংসার দাবী রাখে।
মিউজিয়াম দেখে মন ভরে গেল আমাদের । সেখান থেকে আমরা গেলাম পারো জং পরিদর্শন করতে। কিন্তু আমাদের ড্রাইভার বন্ধুটি হঠাত খেয়াল করল পাহাড়ের নীচে সমতলে আর্চারী ট্যুর্নামেন্ট হচ্ছে। ধনুর্বিদ্যা এখানকার জাতীয় স্পোর্টস । রাহুল আর সেখান থেকে নড়তে চাইল না । অগত্যা গাড়ি ঘুরিয়ে সেখানেই যাওয়া হবে স্থির হল ।  বিরাট একটা ইভেন্ট হচ্ছে। এদেশের কলির কর্ণ-অর্জুনেরা হাইটেক ধনুক নিয়ে তীর  ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করছে । এই ধনুক অর্জুনের গান্ডীব নয় বা রামের হরধনু নয়, সফিস্টিকেটেড ধনুক যাতে আমাদের দেশের দোলা ব্যানার্জিও সাবলীল  । একজন ধনুর্ধর লক্ষ্যভেদে সফল হলে সমগ্র টিম তাকে অভিবাদন জানাল জংখায় গান ধরে আর সাথে আমাদের মাদলের মত সম্মিলিতভাবে তালে তালে নেচে   । আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা হল। 

 সেখানে এক স্থানীয় মহিলার কাছ থেকে গার্ডেন ফ্রেস পিচ ফল কিনলাম । মহিলার ছবি নিলাম । সে বেজায় খুশি হয়ে আমাকে আরো ক'টি পিচ ফল উপহার দিল । এবার পারোর বাজারের দিকে গেলাম। মা অনেকদিন ধরে আম কেনবার জন্য ব্যস্ত হয়েছিলেন । তাই বাজারে ঢুকে প্রথমে বেজায় দামে ল্যাংড়া আম কেনা হল । তারপরে বেকারী শপে এসে কেক কেনা হল । টুকটাক কেনাকাটির পরে আমরা গেলাম একটি হ্যান্ডিক্রাফ্ট শপে । সেখানে ইয়াকের হাড় দিয়ে তৈরী একটি বুদ্ধ মূর্তি কিনে ফেললাম। এবার লাঞ্চ খাবার পালা । খুব সুন্দর রেস্তোঁরায় স্যুপ, চাউমিন আর চিলি চিকেন দিয়ে লাঞ্চ সেরে হোটেলে ফেরা হল । এবার বিশ্রাম নিয়ে গুছোনোর পালা ; পরদিন ভোরেই রওনা হলাম ফুন্টশোলিংয়ের পথে, দেশের দিকে, আমাদের জার্নির শেস ধাপ ডুয়ার্সের পথে হাসিমারার কাছে চিলাপাতা রেসর্টে ।

৩০ মে, ২০১০

ঋণি

আবার তোকে চাইছি কিশোরবেলা,
নদীর ধারে ভাঙা পাড়ে সেই যে বকুলতলা
আমি তখন দশ-এগারো, শিউলিফুলের ভোর
আম-কাসুন্দী, লুকোচুরি, চোখে স্বপ্নের ঘোর
কাঠবেড়ালির পেয়ারা চুরি, ভাঙা কিছু কাঁচের চুড়ি
পেরিয়ে গেলি কিশোর সিঁড়ি, বসন্তে তোর দোলপিঁড়ি

আমি তখন ঊনিশ-কুড়ি, পুতুল বিয়ে ভোলা
কফিহাউস, অন্ত্যাক্ষরী আর, তর্কে তুফান তোলা
নিউমার্কেট, চৈত্রসেল, দু একটা টিউশানি
লাইব্রেরি, মেগাসিরিয়াল আর, “মহীনের ঘোড়া” শুনি
শীতের রোদে পিঠ তোর, উলকাঁটার উল্টোসোজা
সহজপাঠ শেষ হোলনা কো, শুরু রাস্তাখোঁজা

আবার তোক চাইছি কলেজবেলা
গানসিঁড়িটির ধার ঘেঁষে আয় আমার মেয়েবেলা
গানের ইস্কুল, বর্ষামঙ্গল ফিরিয়ে দেব তোকে,
মুঠো মুঠো শিউলি দেব,  কাঁচের চুড়ি পরিয়ে দেব
পয়লাবোশেখ, ফ্রকের ঝালর, জরির ফিতের ফাঁকে।

২৩ এপ্রি, ২০১০

খোলাচিঠি — মাকে

 আজ আমার মায়ের জন্মদিন!  তাই মায়ের জন্য আমার লেখা এই কবিতাটি দিলাম। আমার ব্লগার  বন্ধুরা এবং পাঠকরা পড়লে খুশি হব। 

"খোলাচিঠি — মাকে "

“মা” তোমাকে দুদিন দেখিনি, মনে হচ্ছে দু’যুগ
এলোমেলো কিছু কাজের পাহাড় আমার সকাল
ঊনিশ-কুড়ির মত গুগুল দ্বীপে কাটে দুপুর |
বিকেলগুলো এখন “নয়নতারা”য় ফোটা,
খুব রঙীন না হলেও ছন্দ মধুর ;
দেখো মা, কত লক্ষ্মী হয়েছি আমি,
সিঁড়িভাঙার অঙ্কখাতায় আর কানমোলায়
ইতিহাস-ভূগোলের অগোছালোতায় আর নেই আমি।
চালডালের ফুটন্ত খিচুড়ির টগবগতায়,
থোড়-বড়ি-ডাঁটার জঞ্জালে আমার কলম চলছে
শেষপাতে পরমান্নের মত!
তোমার জুঁইগাছে জল, গীতা-গায়ত্রি-গঙ্গা,
তুলসীতলায় সাঁঝবাতি সব‌ই বাধ্যতার তালিকায়,
ধোপা-নাপিতের হিসেবের রোজনামচায়|
গরমের ছুটির খুনসুটির দুপুরগুলো, 

আমায় অঙ্ক কষায় আর ছবি আঁকায় ;
আমার অঙ্ক এখনো মেলেনি মা…
রোয়াকের রাইবেলের গন্ধ, বৃষ্টিবাদল-আড্ডায়, 

বর্ষামেঘের কাজরী গান শোনায় |

ফুলতলায় ঘর বেঁধেছিলাম আমরা…
শিউলিফোটার গন্ধবৃষ্টি পাবো বলে,
লক্ষ্মীপূর্ণিমার কোজাগর রাতের আকাশের 

সেই বাঁধভাঙা হাসি মনে পড়ে?
কার্ত্তিকমাসের আকাশপ্রদীপ দেখে মনটা ডুকরে ওঠে
দুরের তারার পানে চেয়ে ভাবি তোমার গানের কথা
বসন্ত দূরে, তবুও কোকিলটা জ্বালিয়ে মারে..
মন ভালো করা এসএমএস গুলো নিয়ে
মিসডকল গুলো দেখে বাঁচতে চেয়েছিলাম
আমি চলতে চলতে অন্ত:সলিলা ফল্গুনদী
রিক্ত হতে হতে শূন্যতায় পৌঁচেছি,
তবুও মুক্তি মেলেনি।
ভুলবোঝাবুঝির টানাপোড়েনে স্মৃতির ক্যানভাসকে
নতুন রঙতুলির টানে জিইয়ে রাখছি
সেদিনের গোধূলির গোগ্রাসে আমার ডুরে শাড়ির লালটুকু
আমার সীমন্তে লেগেছিল, হয়েছিলাম সুমঙ্গলীবধু !
আজও শুনতে পাই অতীতের কোলাহল
সম্বোধনের প্রতিধ্বনি, সম্মোহনের গান ।
আমি নীল পাহাড়ের কোলে একটা সাদা শহরে
শুনতে পাই সেই সব অকিঞ্চনের ছন্দ,
ছন্দপতনের শব্দ আর শুনি শব্দবন্ধনের হাতছানি।
সেই গুগুলদ্বীপের আমি এক নির্বাসিত অতিথি,
তবুও এই বেশ ভালো, আমার সব পেয়েছির দেশ !
পাগলের মত ধরেছি তাকে, শান্তিসাগরে ঘর বেঁধেছি
পিঠটা দেয়ালে ঠেকার আগেই ধরে ফেলেছি তাকে
তবুও বেঁচে র‌ইলাম আমার কবিতার অমরাবতীতে!





"খোলা চিঠি-মাকে" কবিতাটি আসামের করিমগঞ্জের দৈনিক পত্রিকা "দৈনিক জনকন্ঠ"র রবিবারের পাতা "জনমজলিশে" প্রকাশিত হয়েছে ২৫ শে এপ্রিল ২০১০

২০ এপ্রি, ২০১০

ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয়

ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।    
মনে পড়ে যায়...
দুপুরবেলার নিঝুম স্মৃতি
শান্ত পায়ে পথের চলা 
ক্লান্ত গায়ে কথা বলা 
রাজাবাজার কলেজ পারে  
ট্রামলাইনকে ক্রস করে  
এপিসি রোড ছুঁতো শেষে
ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় । 
আমরা তখন স্নাতোকোত্তর..
আমরা খোলা হাওয়া
স্বপ্ন নেশা চোখে মেখে
রঙীন হয়ে যাওয়া  
খগেনদাদার  চায়ের  ঠেকে,
ল্যাবের সেই কোণার মাঝে
মিনিট পাঁচেক জিরেন হত
টেস্টটিউব টা হাতে নিয়ে
ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।
সুলগ্নার বাসের প্রেমিক,
কমলিকার দেখতে আসা,
সুদীপের স্বপ্ন দেখা
বিদেশ যাবার কত আশা !
অমৃতা আর সুমন জুটি
পাশাপাশি থাকত কেবল
গোপন প্রেমের কেমিস্ট্রিতে
গসিপ গিলি সবাই তখন
সূয্যি ডোবে আঁধার নেমে আসে
ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।
ফার্স্ট ইয়ারেই ভিসা পেল
সুমন-অনীক-জয়দীপরা
হলনা কো অমৃতার 
সুমনের সাথে বাড়ি ফেরা 
র‌ইলো পথের ধূলোগুলো   
উড়ে গেল কিছু
র‌ইলে নীরব প্রেমের তুমি
সাক্ষী হয়ে শুধু
ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।
আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ার
একশো কুড়ি জন 
কফিহাউস, ব‌ইপাড়া, জটিল সমীকরণ 
উতল হাওয়ায় উড়ে গেল
টেষ্টটিউবের রঙীন জলে
না বলা কথারা র‌ইল পড়ে
কফিহাউসের সাদা টেবিল লিনেনে
র‌ইল  ছোঁয়া  সাতাশি সালের ব্যাচ
র‌ইলে তুমি পড়ে
ছ'নম্বর পার্শিবাগান লেন, কলিকাতা সাতলক্ষনয় ।  

১৪ এপ্রি, ২০১০

"সোনার তরী" র সকল পাঠকবন্ধুকে জানাই নববর্ষের অভিনন্দন !!

 শুভ ১৪১৭
এসো বোশেখ, বস ! তুমি বাজাও আমি শুনি
এসো বোশেখ, বস ! তুমি দাও আমি গুনি
পারলে দিও বৃষ্টির বর্ণমালা  একমুঠো
একটা কি দুটো কালবোশেখি,
পারলে  নিও আমার তাপের ভার
তবুও তুমি না এলে হয়ত পূর্ণ হবেনা একরাশ আশা,
এক ভর্তি জলভরা মেঘেদের ভেলায় চড়ে ভাসা.. 
সেদিন যেমন এসেছিলে তুমি 
কালবোশেখির কোলে চেপে, 
মধ্যদিনে আঁধার করে  
ঠান্ডা হাওয়া জাপটে ধরে.... 
এসো তুমি বোসো তুমি  ! 
কাল বিকেলে চৈত্রের আগুণ সূর্যের ভাসান
গঙ্গাতীরে, সে কি আলো!  
একটু বাদেই মনে পড়ে গেল
আজ তোমার আসার কথা   
চৈত্রের বিদায়বেলায় সেই খেয়া চলে গেল দূরে, বহুদূরে ..
রেখে গেল সেই সারি গান, ভাটিয়ালির ঝিমধরা নেশা, 
আবার স্বপ্ন জাল বোনা শুরু হবে 
জ্বলে উঠবে কত আশার রং দেশলাই  
কত নিরাশার ফুলঝুরিরা ছিটকে সরে যাবে দূরে, অনেক দূরে ..
মেঘের ঢাকনা খুলে বেরিয়ে আসবে একরাশ হাসি,  
এক মুঠো রোদের কণা ঝরে পড়বে প্রথম সকালে 
আর টুপটাপ ঝরে পড়বে জলের কণারা  বিকেলমেঘ থেকে


৪ এপ্রি, ২০১০

ছুটি

১৯১৪ সালে পূজোর ছুটির পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গয়া থেকে বেলা যাবার পথে রেলওয়ে ওয়েটিংরুমে বসে লিখলেন পথের গান


"পান্থ তুমি পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কন্ঠে তোমারি গান গাওয়া"

জানি বিদায়ী ফাগুণের গায়ে এখন চোখঝলসানো চৈতী আগুণ কিন্তু ছুটির অমোঘ আকর্ষণ আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল গুডফ্রাইডের ভোরে খড়গপুর থেকে বোলপুরের পথে... "তোমায় নতুন করে পাবো বলে" |    দেখা হয়েচে বহুবার চোখ মেলে, তবুও ঘর থেকে দুপা ফেলেই আবার হাঁটি চেনা পথে, আবার নতুন করে আবিষ্কার করি গ্রামবাংলাকে।পথের আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ি বারবার, কালের গাড়ি আরোহন করে। লিখে চলি পথের পাঁচালী । ভোর ৬টায় শুরু করি যাত্রা, সঙ্গে একথার্মোস চা, কিছু কুকিস, মাফিন  আর কয়েকটা কচি শশা নিয়ে ।




ন্যাশানাল হাইওয়ে ৬০ ধরে পূবের আলোয় পশ্চিম মেদিনীপুরের পথে, শহর মেদিনীপুরকে পাশ কাটিয়ে জঙ্গলমহলের রাস্তা ধরে । একে একে পড়ল সারি সারি শালগাছ অধ্যূষিত গোদাপিয়াশাল, শালবনী, গড়বেতা ইত্যাদি  গ্রামগুলি, পেরোলাম কংসাবতী আর শীলাবতী নদী । শুনেছি মাওবাদীদের জায়গা এই জঙ্গলমহল ।  সকালের মিষ্টিরোদ এসে পড়েছিল তখন শালবনের মাথায়, বসন্তের কচি সবুজপাতায় । চেনাপথ যেন আরো নবীন সজীবতায় ভরে উঠছিল । 




গড়বেতা পার হয়ে বিষ্ণুপুরের পথে পা বাড়ালাম । এই রাস্তা নাকি  হাতি পার হবার করিডোর  ...বালুচরীর জন্মস্থান, টেরাকোটার ঘোড়ার দেশ, গ্রামবাংলার চালার অনুকরণে তৈরী অত্যন্ত সুন্দর সব  মন্দিরের হাট এই বিষ্ণুপুরে। কত নাম না জানা মন্দির যত্রতত্র বিরাজমান ;  পোড়ামাটির নিখুঁত  স্থাপত্য মন্দিরের গায়ে এখনো শোভা পাচ্ছে । এইখানে হাতি দেখা কাপালে থাকতে হয় ; যাই হোক ভয়ে ভয়ে আমরা নিলাম প্রথম হল্ট,  ধূমায়িত চা আর মাফিন দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। আবার শুরু পথচলা। এবার বাঁকুড়ার রাস্তা ধরে কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেট হাইওয়ে ৯ ধরে বড়জোড়ার পথে.. আবার পেরোলাম শাল-ইউক্যালিপটাসের বন, হাতি পার হওয়ার করিডোর । শুনেছি বরজোড়ার "মন্ডা"  নাকি একটি বিখ্যাত মিষ্টি তবে এখন অনেক নকল বেরিয়েছে তাই সে পথে পা বাড়ালাম না । কিংবদন্তীর আড়ালে লুকিয়ে আছে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন তৈরী হবার সময়কার চিতাবাঘের গল্প।   এখন সেখানে শুধু মেজিয়া পাওয়ার প্ল্যান্টের  ধূসর  ফ্লাই-এশ বহনকারী ট্রাকের সারি। নগরায়ন তথা বিশ্বায়ন তো দূরের কথা এখন শিল্পায়নে ব্রতী হয়ে আমরা  "অরণ্যমেধ"  যজ্ঞে সামিল হয়েছি।


পর্যাপ্ত  ধূসর উড়ন্ত ছাইকে সবুজ পথের সাথী করে আমরা পেরোলাম  দ্বারকেশ্বর আর গন্ধেশ্বরী নদীর সেতু।এই দ্বারকেশ্বর নদী সাহিত্যের পাতায় জনপ্রিয়  বিদ্যাসাগরের জন্য । মায়ের কাছে পৌঁছেছিলেন রাতারাতি দ্বারকেশ্বর সাঁতরে বাঁকুড়া থেকে মেদিনীপুর । বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি চিরস্মরনীয় ।  সেই কারণে দ্বারকেশ্বর পেরোতেই স্মরণ করলাম তাঁকে।
এরপর  গোল্ডেন কোয়াড্রি ল্যাটারালের কোলকাতা-দিল্লী শাখায়  ওরফে শেরশাহ সুরীর তৈরী গ্র্যান্ড- ট্রাঙ্ক-রোডে  পড়ে  পানাগড় অবধি গিয়ে মোরগ্রাম হাইওয়ের বাঁকে ঘুরে  ইলামবাজারের জঙ্গলে গিয়ে পড়লাম। মধ্যে পেরোলাম অজয় নদী। তারপরেই কবিগুরুর কর্মভূমিতে,  ছাতিম, শিমূল, পলাশের শহর শান্তিনিকেতনে।  বসন্ত নেই এখন আছে চৈতীর চোখ ঝলসানি রোদ আর রাতে একটু ঠান্ডা হাওয়া ।শ্র্রীনিকেতন, বিশ্বভারতীর আশ্রম পেরিয়ে বনপুলক, শ্যামবাটি, তালতোড়কে  সরিয়ে রেখে আমরা দুপুর সূর্যকে মাথার ওপরে রেখে পৌঁছলাম  প্রান্তিক। আমাদের "সোনারতরী" ফেজ ১, আবাসনের ক্ষুদ্র বাগান বাড়ি যার নাম "কৃষ্ণকলি" । রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ভাবতে পারিনা এখানকার কোনোকিছুকেই তাই বাড়ির নাম করণেও রাবিন্দ্রীক হয়ে পড়েছিলাম।


বাড়ির পাশেই ক্যানালের জল বয়ে চলেছে । যদিও ভরাবর্ষায় এই জলের অমোঘ আকর্ষণ আমাকে আরো টানে। সোনাঝুরির ছায়ায় প্রান্তিকের বনবীথি যেন ঘুরে ফিরে নতুন করে ধরা দেয় আমার কাছে। অনতিদূরে কংকালিতলায় মাকালীর মন্দিরের আকর্ষণও দুর্নিবার ।  ৫১ সতীপিঠের একটি এটি; দক্ষযজ্ঞের সময় সতীর খন্ড দেহাংশের কাঁখাল অর্থাত কোমরের অংশ বিশেষ পতিত হয় এখানে ...একটি কুন্ডে। আর পাশে উত্তরমুখে প্রবাহিনী কোপাই নদী সংলগ্ন এলাকায় শ্শ্মশান । আমি এই জায়গায় এলে কিছু মাহাত্ম্য অনুভব করি।  


প্রতি শনিবারে খোয়াইয়ের পথে হাট বসে । এটি ও আর কোথাও দেখিনি। সূর্যাস্তের ঠিক ঘন্টা দুয়েক আগে থেকে বসে এই হাট। কত শিল্পীরা নিজ নিজ শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন সেখানে আর সাথে থাকে বাউলের গান । রাঙামাটির পথ ধরে আমরাও পৌঁছে যাই সেখানে । ডোকরার গয়না, কত রকম ফলের বীজ দিয়ে তৈরী গয়না, কাঁথার কাজের বাহার, পটশিল্প,  বাউলগানের আনুষাঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র, তালপাতা, পোড়ামাটির কাজ, বাটিকের কাজ আরো কত কিছু এনে তারা বিক্রি করে । কিন্তু অন্ধকার হবার পূর্বমূহুর্তেই পাততাড়ি গোটাতে হয় তাদের ।  


এই নিয়ে আমাদের ২৪ বার যাওয়া হোল শান্তিনিকেতন । তবুও সে পুরোণো হয় না। আমি কিন্তু কোলকাতার হুজুগের  আম জনতার মত পৌষমেলায় কিম্বা বসন্ত উত্‌সবে আসি না এখানে । কারণ ভীড় আমার ভালো লাগেনা । দু একবার দেখেছি পৌষমেলা, গেছি বসন্ত উত্‌সবে । কিন্তু আমাদের চিরসখা "নিরালা" কে তখন পাইনা,  কাব্যের উঠোনে হোঁচট খেতে হয়,  ব্লগের আঙিনায়  নতুন পোষ্টের জন্য কল্পলোকের ইশারা থাকেনা । এখানে আসি লিখতে, ভাবতে, লেবু ফুলের গন্ধ নিতে, পলাশের একটুকু লালকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে আর সর্বোপরি মাস তিনেকের বাঁচার রসদ আর শ্বাসবায়ু নিতে।  আমার ছোট্টবাগানের ফুলেদের সাথে কথা বলে আসি । পাখিদের সাথে গান গেয়ে যাই ।  আর খবর নিয়ে যাই কৃষ্ণকলির, তাকে ভালো থাকতে বলি,  সবুজে আর নীলে মিশে সুন্দর থাকতে বলি ।

২৯ মার্চ, ২০১০

সহেলী-সমালি-সমাচার


সহেলী:                                                      
শহরের প্রাণকেন্দ্রে, তিনতারা হোটেলে,
আলো-আঁধারের ডিস্কোথেকে, 
এসে শোনাই গান রঙিন পোশাকে, 
আজও এসেছি..
কিন্তু কোনোদিন এমন হয়না,
ভুলে থাকি গানে,
লাস্যময়ি হাস্যময়ী শ্রীময়ী রূপে...
আমি এখন মিস্‌ সহেলী, নিইনা পদবী, 
জানি না তোর নাম আমি,
কৃষ্ণা, কেয়া কিম্বা করবী। 
কিন্তু কোথায় যেন দেখেছি তোকে?
শুধাই নিজের মনে নিজেকে..
সমালী:
কেন খালি চেয়ে থাকো?
কলেজে পড়ি সেকেন্ড ইয়ার,
নাচতে পারিনাকো!
তোমার গলা চেনা নয়,
তবু গায়ের গন্ধ কেন চেনা মনে হয়!
সহেলী:
আজ কেন আমার নাচের তাল কেটে যায়... 
বারবার কেন স্বররূদ্ধ হয়ে যায়,
চেনাগানের কলিও অকারণে হরিয়ে যায় অবচেতনে
আমি খালি চেয়ে র‌ই তোর মুখপানে...
কি নাম তোমার? থাকোই বা কোথায়?
আছো কেন একা বসে এই সন্ধ্যায়?
সমালী:
আমি সমালী, মায়ের দেওয়া নাম কমলিকা,
বন্ধুরা আসবে এখুনি, ততক্ষণ বসে একা, 
জন্মদিন আমার আজ ..
তুমি কি গান গেয়ে মাতাবে আজকের সাঁঝ?
সহেলী:
সোমত্ত মেয়ে তুমি একা কেন এলে? 
সন্ধ্যাবেলা শহরের এই হোটেলে...
সমালী:
আমি তো অনাহুতা, রবাহুতা, অবাঞ্ছিতার দলে 
বাঁচিয়ে রাখার ঋণে আমি চিরঋণি গৌতমীমার কাছে,
নিয়েছে কোলে তুলে অভগিনী এই শকুন্তলাকে, 
তবুও পাইনি সুখের খোঁজ, দেখিনি সৌভাগ্যের মুখ! 
ছিল যে জন্মলগনে আস্তাকুঁড়ের  অভিশাপ!
সহেলী:
কেন তুমি দাও না ধরা মোরে,
কেন রাখো? না বলা কথা বুকের মাঝে ধরে ?
সমালী:
বাবার ব্যবসা জানি, তবে মা যে নয় নিজের আমার,
পাড়ার লোক বলে তাই ;
কোনো এক শীতের ভোরে, বাবা এনেছিল আমায় বাড়ি,
চট জড়ানো ন্যাকড়া গায়ে, ঠিক যেমন করে পড়ে থাকে
নেংটি ইঁদুর, কুকুর ছানা অবহেলায় পথের ধারে...
গাড়ি চেপে এলো বাড়ি, এলো সেই মেয়ে,
ফুটলো কমল কপাল জোরে,
কমলিকা নাম দিল সে, 
বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে, যত্নে, সুখে মানুষ করে...
স্কুল পাঠিয়ে বড় করে,
কিন্তু কেন জানি কৃত্তিমতার স্পর্শ অনুভূত হয় সেই বাত্‌সল্যে? 
কেন জানি সম্পর্কের গভীরতায় প্রবেশ করতে পারিনা..
তোমায় কেন এত কথা বলে নষ্ট করি তোমার সময়,
চেনা চেনা মুখ, ডাকে কাছে আয়..
বলো না কে তুমি?
বন্ধুরা এসে পড়লো বলে...
সহেলী:
আজ আর গাইব না গান আমি,
তোর ডান গালের ঐ কালো জড়ুল,
বুঝিয়েছে মা তুই যে আমার,
আমার প্রাণের প্রথম প্রেমের তুই যে ফসল,
যৌবনের‌ই রঙিন জলে, ভেসেছিলেম দুজন মিলে,
ভাবিনি যে ফিরে পাবো, আবার দেব ভুলের মাশুল ! 
সমালী:
বেশ তো, তবে চলো আমার সাথে,
ভুলের মাশুল দিয়োখনে সেথায় আজ রাতে,
সহেলী:
না সে হয়না সমালী, না কমলিকা,
কেউ মানবে না আজ আমার কথা আমি যে আজ একা !
কেনই বা করবি ক্ষমা ?
পারেনি যে মা দিতে তোরে কোল একদিন,
বাধেনি তার একটুকুও ছুঁড়ে ফেলে দিতে,
সেই কঠিন পথের ধূলার পরে,
নরম শিশুর কান্না ঝরে!
সমালী:
যদি আমি বলি তাদের, যদি আমি সাক্ষী দিই, 
মায়ের সেই মেয়ে হয়ে যদি পরিচয় দি‌ই,
যদি একবার ডাকি মা বলে..
ভুলে যাই সব, ভুলে যাও সব,
বাঁচি মোরা দুজনে আবার নতুন করে । 

"সহেলী-সমালী-সমাচার"  এই কাব্যনাট্যটি তিনসুকিয়া কলেজ অসম থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা "প্রজ্ঞান" ২০১০ মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে

৯ মার্চ, ২০১০

"আজও বেঁচে আছি রে"

তোর মন ভালকরা এস.এম.এস
আমার অক্সিজেন,
তোর মিসডকল আমার ওয়েসিস
তোর হাতের ওপর হাত রেখে
আজও শুনতে পাই কত কান্না ছিল
একসময় তোর বুকে...
তোর মায়ের ক্যানসারের যন্ত্রণা
তোর ভায়ের কম্পার্টমেন্টাল
তোর বাবার শেয়ার মার্কেটের লস
তোর দজ্জাল শ্বশুরবাড়ির ষড়যন্ত্র,
আয় তুই বল আমার কাছে, 
আমিও আজ তোর মত ইনসমনিয়ায়
বন্ধুত্ব আজ কুইনাইন
ঝর্ণাকলমের কালি বন্ধ্যা কাগজে 
কবিতার ভ্রূণ সঞ্চার করতে আজ অক্ষম 
দ‌ইবেচার কত সুখ অমল বোঝেনি সেদিন
আমি কিন্তু বুঝেছি,
কফিহাউসের অমলের মত
কত অপ্রকাশিত কবিতারা
আজও আমার গলার মধ্যে দলা পাকিয়ে 
কিন্তু আজও বেঁচে আছি রে  

২৮ ফেব, ২০১০

WISHING YOU ALL A VERY "HAPPY HOLI"


বসন্ত মানেই কৃষ্ণচূড়া , পলাশ, শিমূল ও অশোকের রেঙে ওঠা প্রকৃতি। বসন্ত মানেই সেই আগুণে মেতে ওঠা, দখিনা বাতাসের উড়নী গায়ে জড়িয়ে আবীরে মাখামাখি, বসন্ত মানেই মনের দোলা, ফাগুনের সকালে দোল খেলার পালা। আজ আমাদের দোল একটু ভিন্ন স্বাদের । একালের দোল আর সেকালের দোলে আকাশ্-পাতাল তফাত। আজ আমাদের দোলে পাড়ার কচি-কাঁচারা দোল খেলেনা,বরংএকটু ছুটির আমেজে দেরি কোরে ঘুম থেকে উঠে হোমওয়ার্ক করার প্রস্তুতি নে য়। কারন এখনকার দোলে সব স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলতে থাকে। তাই তাদের কোন উপায় থাকে না। ছোট বেলায় বাড়ীতে সত্যনারায়্ণ পূজো হতে দেখেছি। ভোর থেকেই পূজোর গোছগাছ, স্নান সেরে ফাঁকে ফাঁকে একেওকে আবীর দেয়া, গুরুজনদের পায়ে আবীর দেয়া ও গৃহদেবতার ছবিতে আবীর দিয়ে প্রণাম করা ..

কিন্ত কোথায় আজ আমাদের দোল? আমদের দোলে আজ ফুট্-কড়াই-মুড়কি-মঠ এর স্থান নেই; ছেলেরা বাজারে গিয়ে রঙীন মঠ কেনার বায়না করে না। বরং এগরোল, বার্গার বা পিত্জা চায়।

আজ আমাদের দোলে সান্ধ্য অধিবেশনে ফাগফাগুয়ার খেলা চলার পর সাদা পাথরের গ্লাসে সিদ্ধির সরবতের বদলে স্থান করে নিয়েছে সুদৃশ্য কাট্-গ্লাসের সুরাপাত্রের রেড্-ওয়াইন। আমাদের প্রজন্ম দোলের মাহাত্ম্য বোঝে কিনা জানিনা তবে বিশ্বায়নের আবীর গায়ে মেখে কেবল্ টিভি , মোবাইল ফোন্, আইপড্, এফ্-এম রেডিও এবং যন্ত্রজালে  প্রচুর গবেষ
ণা চালিয়ে যচ্ছে।

এখন আবীরের রং এর বিভিন্নতা ও প্লাস্টিক পিচকারির বৈচিত্র্য দেখে ছোটোবেলার জন্য মন কেমন করে কিন্ত আমাদের রং এ ছিল আরো উজ্জ্বলতা ও গন্ধে ছিল আরো মাদকতা।

আমরা ছোট ছোট নিউক্লিয়ার পরিবারের সদস্য, দোল উপভোগ করবই বা কার সংগে ? র্ংই বা দেব কার গায়ে? আমার গায়ে রং দেবে এমন সময়ই বা আছে কার্? র্ং খেলে সময় নষ্ট না করে কিশোররা এখন নেট সার্ফিং করে, "সোশাল নেটওয়ার্কিং" সাইটে ঢুকে র্ং খেলে, বন্ধুকে ই-গ্রিটিংস পাঠায় দোলের জন্য ; বা এস্-এম্-এস্-এ হোলির শুভেচ্ছা জানায়। আরো পাকা-পোক্তো হলে মাল্টিপ্লেকসে ঘুরে বেড়িয়ে চাড্ডি ফাস্ট ফুড খেয়ে দেয়ে দিব্যি করে বাড়ী ফেরে। দোল কেবলই ছুটির দিন একটা।

যেসব বাড়ীতে দোলের বৈঠকী বসে তারা অবশ্যই এর ব্যতিক্রম। সেখানে গানের আড্ডা বসে সকাল থেকে, যেখানে ব্রজগোপীদের র্ং খেলা থেকে শুরু করে গৌর আবির্ভাব্, পুরাতনী, রবীন্দ্র্নাথ্, নজরুল সকলকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে। আজ আমাদের দোলের আগের রাতে ন্যাড়া-পোড়া হাতে গোনা যায়। পর্যাপ্ত প্লাসটিক পূর্ণ পরিবেশে ন্যাড়া-পোড়া নিষিদ্ধ। বিদায়ী বসন্তের সাথে সাথে পুরানো আবর্জ্জনার দহন পরিবেশকে কিছুটা মুক্ত করে "মুছে যাক্ গ্লানি" , ঘুচে যাক্ মলিনতার সংগে নতুন বছরকে "এসো হে বৈশাখের" বার্তা শোনাতে পারত, কিন্ত আজকের দিনে ন্যাড়া-পোড়া আযোজন করবে কে? কোথায় বা আছে খোলা মাঠ?

এখনকার ট্রেন্ডি-টিনরা এসব নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায়না। আমরা কত উন্নত ও যান্ত্রিক হয়েছি আজ। Motion-এর চাপে সব Emotion উবে গেছে কর্পূরের মত ।দোল প্রতি বছর পরিযায়ী পাখীর মত আসবে আবার চলেও যাবে। কিন্ত দোল খেলায় থাকবেনা মাতামাতি, রং খেলায় হবে না কোন চ চাঞ্চল্য । বরং পরিশীলিত এবং মার্জিত রূচিবোধের অভাবে রং খেলা হলে , হবে খুনোখুনি কিংবা রংএর বদলে রক্ত গঙ্গা বইবে। মোটর সাইকেলে ট্রিপল ক্যারি করে বন্ধুকে নিয়ে কানে আই-পড লাগিয়ে বিকট চিত্কার করে দোল খেলা চলবে বহুত রাত অবধি, কো-এড কলেজে আবীরের বদলে সিঁদুর চলবে, অথবা দোলখেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধু-বন্ধুতে ঝগ্ড়া এমন পর্য্যায় চলে যাবে যা থেকে অয্থা প্রাণ হারাবে একটি বন্ধু অপর বন্ধুর গুলিতে। কত স্বামী-স্ত্রী তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদের পরে স্মরণ করবে তাদের একটুকরো দোলের "একটুকু ছোঁয়া লাগে"র সুখস্মৃতি;

আজকের কালের আবর্তণে ঘুরন্ত পৃথিবীর ছুটন্ত মানুষের উত্তেজনা, উদ্দীপনা-বহুল দোল মানে হাতে বিয়ারের ক্যান কিংবা শপিংমলে কিছুক্ষণ !!!

২৪ ফেব, ২০১০

তুলনাহীনা রে

 (পর্ব ৪)

আমার কল্পনাট্যের কুশীলব শ্রেয়সী- সোহম সে ফাগুনের এক ভোরে 
বায়ুপথে পাড়ি দিল ডালাস থেকে নিউইয়র্ক 
সেখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে সোজা ওয়াশিংটন ডিসির রাজপথে.. 
ডিসির রাজপথ হোয়াইট হাউসের রাজকীয় শুভ্রতায় কি অসাধারণ শন্তিময়তা 
বাইরের সবুজ লনে কি সুন্দর সজীবতা সাথে গেরুয়া মরশুমি ফুলের উজ্জ্বলতা 
এই তিন রঙ মনে করিয়ে দিল শ্রেয়সী কে তার নিজের দেশমাতৃকার কথা, 
মনে মনে সে প্রনাম জানাল তার নিজের ত্রিরঙা কে 
ক্যাপিটল হিলের কাছে লিংকন মেমোরিয়াল 
চির শুভ্রতায় জ্বাজ্জল্যমান  এব্রাহাম লিংকনের স্মৃতি নিয়ে,  
সেখান থেকে তারা গেল ন্যাশানাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে 
সেই বহু বিতর্কিত এবং অভিশপ্ত হোপ ডায়মন্ড দেখে আসে তারা 
ন্যাশানাল গ্যালারি অফ আর্ট থেকে এয়ার এন্ড স্পেস মিউজিয়ামে এল 
তারা ঝুলন্ত ছোট বড় কত কত উড়োজাহাজের মডেল, আর তার বিবর্তন 
তার মধ্যে থেকেই উঠে এল স্মৃতির মণিকোঠা থেকে 
রাইট ব্রাদার্সের হাতে তৈরী প্রথম প্লেনের মডেল 
ক্লাস নাইনের ফিসিক্স ব‌ইয়ের সেই ছবি 
আজ ত্রিমাত্রিক মডেল হয়ে ঝুলছে চোখের সামনে 
শ্রেয়সী-সোহম বাকরূদ্ধ হয়ে যায় " এও দেখা হয়ে গেল তাহলে!"
ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশানাল গ্যালারী অফ আর্ট এ এসে পৌঁছায় তারা 
সোহমের বহু প্রতিক্ষীত ভাবনালোকের রূপসাগর
সোহমের মুখ থেকে শুনে শুনে শ্রেয়সীও ডুব দিল সেই রূপসাগরে 
ইম্প্রেশানিস্ট, স্যুরিয়ালিস্টিক সবরকমের পেন্টিংয়ের সাথে হাতেখড়ি হল তার ! 
Matisse, Rennoir, Claude Monet, Van Gogh, Paul Gauginর গল্পে 
মাত হয়ে গেছিল আর্ট গ্যালারির প্রতিটি করিডোর ! 
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হোল Da Vinciর আর এক বিরল সৃষ্টি দেখে 
যা মোনা লিসার থেকে কোন অংশে কম নয় 
মোনালিসার হাসি নেই তাতে কিন্তু সেই ভয় মিশ্রিত গাম্ভীর্য্য 
অনবদ্য লাগল তাদের 
বিদায়ের সময় শ্রেয়সীর মনে হল 
ডিসি তুমি দিগবসনা, সবুজ আঁচল শুভ্ররাজবেশে ছড়িয়ে দিয়েছো নীলের দিগন্তে 
সৌন্দর্য তোমার অলংকার, রাজকীয়তা তোমার মজ্জাগত, নিয়ম শৃঙ্খলা তোমার সহজাত, 
বেঁচে থাকো ডিসি তোমার অমলিন স্বর্গীয় রাজকীয়তা নিয়ে

২১ জানু, ২০১০

মধুরাতি হবে ভোর


পর্ব ১

প্রেমের জোয়ারে 
 

১৯৮৯ র ফাল্গুন, ২৩য়ের উদ্ভিন্নযৌবনা শ্রেয়সী,
বিয়ের অষ্টমঙ্গলা সেরে মধুচন্দ্রিমা...
সুদূর ডালাসে পাড়ি দেওয়া,
অপরিচিত, অজানা অথচ অতি কাছের
জীবনের প্রথম প্রেমিকের সাথে,
বহু প্রতীক্ষিত বায়ুপথে ভ্রমণ..
বিমানবন্দর থেকে একে একে চোখের বাইরে চলে গেল
মা, বাবা আর ভাইয়ের ছলছল চোখ,
শ্রেয়সীর চোখে তখন ব‌ইছে আনন্দাশ্রু,
নিমেষে কষ্ট উধাও হয়ে গেল, 
হাত ধরল কাছের মানুষটি,
অনাবিল আনন্দে হারিয়ে গেল তারা । 
 

বিশ্বভরা প্রাণ 

আমেরিকার মাটিতে পা দিয়েই শ্রেয়সীর মনে হল
ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য এই দেশ,
কত সুন্দর সৌজন্যবোধ মানুষের, সুন্দরের সত্য পূজারী তারা,
তারা কত রুচিশীল, সত্যিই তারা গড়তে জানে নিজেদের
আর ভালবাসে তাদের দেশকে, 
রক্ষা করতে পারে ভগবানের সৃষ্টিকে,
আর নিজেদের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করে,
উজাড় করে দিতে পারে বিশ্বের দরবারে;
তুমি বলবে কৃত্রিমতা এ শতাব্দীর অভিশাপ
শ্রেয়সী তা বিশ্বাস করেনা,
কৃত্রিমতা যদি উন্নতি ঘটায় তাহলে বাধা কোথায়?
বিজ্ঞান যদি কাজের বন্ধু হয় তাহলে আপত্তি কিসে ?
সৃষ্টিসুখের উল্লাসে আমরা বাঁচিনা একটু সহজ করে, সাবলীল ভাবে!
আসলে যে দেশের নাগরিকের চিন্তাধারা সুস্থ, যারা সভ্যতায় পরিপুষ্ট,
বিধাতাপুরুষ বোধ হয় দুহাত তুলে তাদের আশীর্বাদ করেন..
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যে, প্রাকৃতিক জলবায়ুর মিষ্টতায় 
দেশের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে রোজ তারা প্রণাম জানায় দেশমাতৃকাকে|


পর্ব ২
ধরা দিয়েছি গো  
 
ভোরবেলা শ্রেয়সীর কিচেনের ব্লাইন্ডস সরিয়ে
ক্লিফব্রুক কন্ডোমিনিয়ামসের পার্কিং লটে তাকিয়ে থাকা
সার সার গাড়ির ছাদে দুধসাদা বরফের চাদর
তার সাথে সূর্যের আলোর মাখামাখি,  
সেই জানলা দিয়েই রোজ সোহম্‌কে বাই করা,
২৭য়ের সুপুরুষ সোহম্‌ ম্যানেজমেন্ট স্কুলে তখন,
দুপুরবেলা বান্ধবীদের সাথে শপিংমলের হাতেখড়ি  
একরাশ বিদেশী পারফিউমের গন্ধ নিয়ে ফিরে আসা,
বিকেল হলেই নতুন জলখাবার তৈরী আর সোহমের জন্য প্রতীক্ষা...
তারপর শ্রেয়সী রোজ চোখ রেখেছে অপার বিস্ময়ে,
কখনো ডালাস ডোমের মাথায় গরম কফি হাতে,  
কখনো টাইলার রোজ গার্ডেনের গোলক ধাঁধায়,
কখনো নেচে উঠেছে তার প্রাণ টার্নার ঝোরার ধারে,
গুহার ভেতর জাপটে ধরেছে তার সঙ্গী মনের মানুষটিকে,
গেয়ে উঠেছে মুক্তির আনন্দে, নেচে উঠেছে ঝোরার জলের ছন্দে,
ল্ংড্রাইভে এল্.বি.জে এক্সপ্রেস ওয়ের ওপর
কতবার ছুটেছিল তাদের সাদা মাজদা ৬২৬
শ্রেয়সীর খোলাচুল উড়ে এসে পড়েছিল তার প্রিয় পুরুষটির কাঁধে
ডালাসের ফাগুনে সেদিন ছিল শ্রেয়সীর প্রেমের আগুণ, প্রাণের মূর্ছনা   
রিচার্ডসনের রাস্তা, প্লেনোর পথঘাট সে ফাগুনে দেখেছিল নতুন বসন্ত  (ক্রমশঃ)