৩১ ডিসে, ২০০৯

হে নূতন !


কাল রাত বারোটা ;
সেন্টপলস্‌ ক্যাথিড্রালের ২০০৯ এর শেষ ঘন্টাধ্বনির
অনুরণন এখনো যেন লেগে র‌ইল কানে,
ভিক্টোরিয়ার পরী থমকে গেল কয়েক মূহুর্তের জন্যে,
সেকেন্ড হুগলী ব্রিজের সার সার গাড়ি নেমে এসে দাঁড়াল সিগন্যালে,
আলোর মালায় সাজানো পার্কস্ট্রীটে তখনো চলছে লেটনাইটের উদ্দামতা,
কোলকাতার আকাশে জমকালো ফায়ার ওয়ার্কস, বাজির শব্দ,
যেন সকলের ততপরতায় একটু তড়িঘড়ি...
বর্ষবিদায় আর নতুন বছরের আগমনীবার্তা ঘোষণা ....
আমরা সম্মোহিত ;
আমরা আবেগ তাড়িত হয়ে কুলো-বরণডালা সজিয়ে সকলে।

দূর থেকে দেখি দেবশিশু আসে ছুটে নিয়ে রঙমশাল ।
খিলখিল হাসি ঠোঁটে আলোর কণা চোখের কোণে তার;
নতুন ইশারা চোখের মাঝে ভুলিয়ে দেয় কতকিছু,
ব্যথার গায়ে সুখের প্রলেপ লাগিয়ে দিল তার নরম চাহনি,
কত কান্নাহাসির দোলদোলানো স্রোতে,
অচিরেই ভেসে চলে গেল ২০০৯য়ের আবর্জনা, জঞ্জালপূর্ণ,
একখানা ডিঙিনৌকো; ক্লান্ত তার চেহারা, করুণ তার চাহনি;
নতুন ভোরের নতুন সূর্য তখনো নবদিগন্তে উদিত হয়নি
অন্ধকারের উত্সারিত আলো দিশা দেখালো,
আমরা দেখতে পেলাম ২০১০ কে উঁকি দিছে জানলা দিয়ে,
পা রাখলাম নতুন বছরের দরজার চৌকাঠে;
কত চাওয়া পাওয়ার শেষ হল,
কত বেগ-আবেগের টানাপোড়েনের পরিসমাপ্তি ঘটল ।
কত না বলা কথারা আজও গলার কাছে দলা পাকিয়ে রয়ে গেল;
আবার নতুন করে পাওয়ার প্রত্যাশায় আমরা জাগি নতুন ভোরে,
খুলে দিই পূবের বদ্ধ জানলা, জাগি নতুন ভোরে,
এক কলসী জল ঢেলে দিই চৌকাঠে, আমরা যেন নতুন যুগের ভোরে,
শেষ ট্রেন চলে গেছে কাল রাতে, আবার উঠি নতুন ট্রেনে।


২৫ ডিসে, ২০০৯

"অবতার বরিষ্ঠায়"

২০০৯ শেষের মুখে... বিগত বছরের অনেক ঘটনার মত আরো একটি ঘটনা নাড়া দিল মনকে। ক্রিসমাস ইভ বর্নময় হয়ে উঠল,নতুন করে আবিষ্কার করলাম জেমস ক্যামেরুন কে। যখন টাইটানিকের ভরাডুবির মধ্যে যে মানুষটি বাঁচিয়ে তুলেছিলেন অনবদ্য এক প্রেমকাহিনী কে সেই মানুষটি আবার নতুন করে রচনা করলেন ইতিহাস। "অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি" সেই রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাহায্য নিয়ে বলি এক‌ই অঙ্গে এত রূপের মত অনেক কিছু পেলাম "অবতার " ছবিতে । নেই সস্তার মেলোড্রামা, নেই অহেতুক নাচাকোঁদা । নির্ভেজাল, সংক্ষিপ্ত, "একটুকু ছোঁয়া লাগা" প্রেমকাহিনী । অরণ্য-মঞ্জিলমাঝে একদল উপজাতির প্রকৃতির বুকে স্বাধীন ভাবে বাঁচা, প্রকৃতির অকৃপণ সম্পদকে আঁকড়ে ধরে স্বতন্ত্র অথচ সঙ্ঘবদ্ধভাবে জীবনযাপন এবং ঠিক তার পরেই ঘটমান বর্তমানে যা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে অর্থাত কোথা থেকে তাদের সুস্থ জীবন যাপনে এল এক ঘূর্নিঝড় ...একদল শত্রুপক্ষ চাইলো তাদের শেষ করে উদ্ধার করবে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আর একদল মিত্রপক্ষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে একজন প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্য দিয়ে অবিকল সেই উপজাতির মত অবতার তৈরী করে সেই জঙ্গলমহলে প্রেরণ করলো । রোবটের সাহায্য নিল শত্রুপক্ষ আর একধার থেকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের সাহায্যে অরণ্যের সবকিছু শেষ করতে চাইলো। অন্যথায় মিত্রপক্ষ যে অবতার কে প্রেরণ করলো সে অতি অনায়সেই মন জয় করে নিল সেই উপজাতিগোষ্ঠীর ... সহজ কয়েকটি পরীক্ষায় রাজা বলে ঘোষিত হল সেই বীরপুরুষ, প্রেমেও পড়ে গেল একটি মেয়ের | নাতিদীর্ঘ অথচ মনছোঁয়া এক রোমান্স | তবে সব থেকে মনকে নাড়া দিল এই অবতারটিকে যেখানে সে একটি পূর্নাঙ্গ মানুষ, নেই তার কোনো প্রতিবন্ধকতা , তার হৃদয়ের সকল কোমল মনোবৃত্তি তে সাড়া দিল সেই অরণ্য-তনয়া । কিন্তু কি করে হল তার এই অবতারত্বে পদার্পণ? একি সত্যি সফটওয়ারের খেলা নাকি সনাতন ভারতের আদি অকৃত্তিম প্রবাদ পুরুষ শঙ্করাচার্যের "পরকায়া প্রবেশ" ? যা এই ব্রহ্মচারী প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন দক্ষিণের পন্ডিত মন্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয়াভারতী কে । নিজের আত্মিকসত্ত্বা কে এক রাজার দেহে ধারণ করেছিলেন এবং নাবালক, ব্রহ্মচারী শঙ্কর গৃহীর মত তাঁর অনভিজ্ঞ অনাবিষ্কৃত যৌনজীবনকে বুঝে সেই বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করে মন্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয়াভারতীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন | কারণ মাত্র বার বছর বয়সে সকল শাস্ত্রে তিনি পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন ঐ একটি বিষয় ছাড়া ; তিনি হার স্বীকার করতে রাজী নন অথচ সেক্স সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান নেই ; তার উপায় বার করেছিলেন যা জেমস ক্যামেরুনের সফটওয়ারের ভাষায় "অবতার" আর শঙ্করাচার্যের "পরকায়া প্রবেশ" । শঙ্কর যা পেরেছিলেন ঐশ্বরিক মায়ার সাহায্য নিয়ে ক্যামেরুন তা প্রমাণ করেছেন বিজ্ঞানের সাহায্যে। মূল কথা "আত্মা অবিনশ্বর" ঠিক যেমন ছোট থেকে আমরা শুনে আসছি কৃষ্ণের দশ অবতারের গল্প । এক এক বার এক একটি কাজের জন্য এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন তাঁরা । ভাগবত গীতার সেই বিখ্যাত উক্তি "পরিত্রাণায় সাধুনাম বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে" আবার মনে করিয়ে দিল স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তার যৌক্তিকতা ।

১৯ ডিসে, ২০০৯

গীতাঞ্জলি শতবর্ষ পুরষ্কার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের শতবর্ষ পূর্ত্তি উপলক্ষে দ্বাদশ বেহালা ব‌ইমেলা প্রাঙ্গণে বাংলা কবিতা আর্কাইভের পক্ষ থেকে সদ্যপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ "মোর ভাবনারে" শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ রূপে নির্বাচিত হ'ল । গত ১৫ই ডিসেম্বর বড়িশা হাইস্কুলে ব‌ইমেলা প্রাঙ্গণে কবি বিষ্ণু দে-কথা সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ উপমঞ্চে ইন্দিরা মুখার্জি কে এই পুরষ্কার প্রদান করা হল।



১২ ডিসে, ২০০৯

রেখোনা আঁখিজলে



মনোরম উদ্যান, ম্যাডক্স স্কোয়ার, লিচুপার্ক যাই বলো তোমরা ।
প্রতিদিনের মর্নিংওয়াকের আর কেতাদুরস্ত সান্ধ্যভ্রমণের,
কিম্বা নিরিবিলির কিশোরপ্রেমের অথবা একান্ত আপনজনের প্রতীক্ষার বেঞ্চিপাতা;
কিছুটা গোলাপের কেয়ারি করা, কিছুটা রেলিং দিয়ে ঘেরা মরশুমি ফুল।
ঘিরে দিলেই মনে হয় প্রোটেক্টিং ইন্ডিয়া ফ্রম ইন্ডিয়ানস!
দম আটকে আসে, আবার খোলা হাওয়ায় দম নেয় অনেকে।

আমি এক অর্বাচীন! বুড়ো হাবড়াদের দলে,
তোমাদের কলরব মুখরিত এই পার্কের একপাশে, মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ ;
আজ শোকস্তব্ধ আমি !
বুঝি আমি রাত পোহালো, বুঝি যে পূবের আলো,
আমাকে তোমরা দিলে শহরের নরম মাটি, আভিজাত্যের আস্তানা
আমি তোমাদের দিয়েছি সন্ধ্যাফুলের মিষ্টি মধু,
দুপুর পাতার ঠান্ডা ছায়া, আর নিশুতরাতের স্তব্ধ মায়া ;
আমি স্বজাত্যের অহমিকা আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পার্কের এককোণে,
যেন দারিদ্রের অহঙ্কারে জর্জরিত ভিখিরী বুড়ির লোটা কম্বল সম্বল করে পড়ে থাকা ।
তবে এক লহমায় দেখে নিলে নজর কাড়ি সকলের ।
কিন্তু কথা ছিল ভেসে যাবো এই বাটে, তোমাদের কলকাকলিতে, হাসিতে,
পাখির গানেতে, পথের ধূলোতে, ধোঁয়াতে ;
আর তোমাদের খালি দিয়ে যাবো একরাশ প্রাণবায়ু,
আর হাত ভর্তি করে একমুঠো সবুজ ।

বিগত কত শতকের দোল-দুর্গোত্সব, কত মেলা, চড়ুইভাতি, সভা, মিটিং,
কত না বলা প্রেম, কত অপেক্ষার সাক্ষী হয়ে র‌ইল আমার মৌনতা !
আমি কাঁদলাম আর হাসলাম ;
জীবনপুরের পথিকের পসরা নিলাম ভাগ করে ।
আজ বৃষ্টি এসে মেশে আমার চোখের জলে, আজ শিশির এসে পড়ে আমার শুকনো ফলে,
একদিন নিষ্ঠুর নিয়তি এসে করাত চালাল আমার শরীরে, নবকিশলয় আজো আমার অঙ্গের ভূষণ ।
আমি পুরোটাই বাঁচতে চেয়েছিলাম তোমাদের মধ্যে,
আজ আমার একহাতে মুষ্ঠিবদ্ধ লোহার রেলিং আর এক হাতে আমার অঙ্গীকার !

ওগো তিলোত্তমা ! তোমার রূপের বড় অহংকার !
চেয়ে দেখ একটিবার !
আষ্টেপিষ্টে বেঁধেছি নিজেকে,
জড়িয়েছি ম্যাডক্সের মায়ায়, স্কোয়ারের কোণায়,
শুধু একটু বাঁচতে দাও আমায় !


২ ডিসে, ২০০৯

তুমি এলেনা


############################################################



ফোনটা বেজে গেল একবার, দুবার, তিন বার...
কেটেও গেল নিজে নিজে, তুমি ছুটে গিয়ে ধরলে না তো!
আমার ছেঁড়া ক্যানভাসে আমি নীরবে আজ এঁকে চলি
আমার অধরা প্রেমের মাধুরী ;
পথ আমাকে বয়ে নিয়ে চলে একঘেয়েমির রাস্তা,
সময়ের খেয়া আমাকে পার করে দেয়,
উল্টে দেয় ক্যালেন্ডারের পাতা,
প্রকৃতির ঋতুবৃত্ত সমাপ্ত হয় ঠিক সময়ে,
আমার কালের মন্দিরা আমি একলা বাজিয়ে চলি,
প্রতিদিনের রোজনামচার ফাঁকে ফাঁকে,
তুমি এসে ধরা দাও একবার করে ;
আনমনা বর্ষায়, উদাসী বসন্তে,
কখনো স্বপ্নের সূতো ছিন্ন করে ঘুম ভাঙা ভোরে,
কখনো কল্পনার ঘুঁড়ির সূতোয় রাতজাগা ঘরে,
আমি শেষ হেসেছিলাম,
যেদিন তোমার আকাশ আমার আকাশে
মিশিয়েছিল তার নীল,
আমি সাগরের সব জলটুকু দিতে চেয়েছিলাম তোমায় ;
ঘাসের সব সবুজটুকু দিয়ে হতে চেয়েছিলাম নতুন কবি,
শুধু তোমার জন্য।
ধানক্ষেতের সব হলুদটুকু জমিয়ে,
একখানা আটপৌরে শাড়ি কিনেছিলাম তোমার জন্যে,
দেওয়া হল না...
ফোনটা বেজে গেল একবার, দুবার বহুবার....

##############################################

Photograph by Ajoy De

২৭ নভে, ২০০৯

জয় গোস্বামীর নতুন ব‌ই "জলঝারি"


জয় গোস্বামীর নতুন ব‌ই "জলঝারি" পড়লাম। প্রথমবার জলঝারির ক'ফোঁটা জল আমার গায়ে পড়তে না পড়তে ই বাস্প হয়ে মিশে গেল হাওয়ায়। পরের বারে ঠান্ডা জলে সিক্ত হয়ে আমার একটু কাঁপুনি এল! শেষ বারের সবজলটুকু চেঁচে পুঁছে নিয়ে আমি মেখে নিয়েছি আমার মনের গায়ে । জলঝারির জল পড়ে ঝরাপাতা আজ নড়ে উঠেছে! হোক না সে বাগানের ঝোপের কোণে
পড়ে থাকা ফেলে দেওয়া এক জলঝারি, থাকনা তার মরচে পড়া বিবর্ণতা ! আমাদের মতো ঝরাপাতাদের দলে যারা তাদের জন্য এই জলঝারির পড়ে থাকা জলটুকু অনেক । কবি মুখবন্ধে নিজেই বলেছেন, যেসব সম্পর্ক নারী-পুরুষ কে প্রকাশ্যে আনতে পারেনা অথবা প্রকাশ্যে এলেই ঝড়-তুফানে তা ধ্বংসেই বিলীন হয়ে যায় সেই সব সম্পর্ক নিয়েই কিছুটা গদ্যে এবং কিছুটা পদ্যে লেখা এই "জলঝারি" ব‌ইটিতে জলঝারি কবিতাটি অনবদ্য! আমাদের মত যারা জীবনকে খানিকটা এযাবত্কাল দেখে এসেছে, বিশ্বাসের ভেলায় চড়ে ভেসে ভেসে খানিকটা উপলব্ধি করে এসেছে, সম্পর্কের টানাপোড়েনে যারা জীবনের জলছবি আঁকতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে তাদের জন্য এই জলঝারি ।

প্রথম গল্প "ভুলভুলাইয়া" নি:সন্দেহে শিউলির নস্টালজিয়াকে মনে করিয়ে দেয় নতুন করে, কিন্তু তার চেয়ে ও সুন্দর লেখকের শব্দ নিয়ে ভেলকি দেখানো, যেখানে তাঁর একদিকে প্রকৃতি প্রেম অন্যদিকে প্রেমের জোয়ারে ভাসমান অবস্থায় কিশোরীটির একদিকে ঝগড়া করতে পারা অন্যদিকে "শিউলি পারা", "উঠোন পারা", "ভোর পারা" এই ভাবে ভালোলাগা গুলিকে বর্ণনা করা খুব নতুন ধরনের । তারপরে যখন মেয়েটি আরো বড় হয়েছে সেই প্রেম তার ততদিনে উধাও। তাই সে বলে "আজ আমার ভোরও ঘটেনা, শিউলিও ঘটেনা, উঠোনও ঘটেনা" অর্থাত কিশোর প্রেমে এই গুলি ঘটতো | সে ও তখন প্রেম কে আঁকড়ে ধরে ভোর, শিউলি এবং উঠোন কে চাইতো ; এখন প্রেম না থাকায় তার জীবন ননরোম্যান্টিক জীবনে পর্যবাসিত হয়েছে ।

"আমাদের পাখিগুলি হবে" তে রাগ-রাগিনীর মধ্য দিয়ে যাত্রাপথের বর্ণনা নতুন ধরনের । যেমন "ভীমপলশ্রীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, পৌঁছবো পুরিয়া ধ্যানেশ্রীতে " এর থেকে আমরা পাই সঙ্গীতানুরাগী জয় গোস্বামীকে।

"চিহ্ননাম" শুরু একটি মনছুঁয়ে যাওয়া কবিতা দিয়ে শেষ কিছুটা গদ্যে । আবার আবিষ্কার করি কবিকে...মনে মনে বলি, "তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে" চিহ্ননামের ঘুড়ির সুতো ধরে পৌঁছে যাই গল্পগদ্যে। ব্যর্থপ্রেমের ভার বয়ে চলেছে কেউ একজন ; তার প্রেমিকা আজ বিবাহিতা। আর স্মৃতির ক্যানভাসের একটি করে পাতা ওলটায় সেই ব্যক্তিটি । রোমন্থন করে প্রেমিকার সাথে তার প্রথম প্রেমের সুখস্মৃতি । শালীনতা, রক্ষণশীলতার লক্ষণরেখা কে মুছে দিয়ে কেন তাদের প্রেম প্রকাশ্যে আসবে না সেই নিয়ে বিষাদসিন্ধুতে ভাসিয়ে দিলেন প্রেমিকাকে লেখা কবিতা ।

"কড়ি ও কোমল" গল্পে আমরা শান্তিনিকেতনের ভুবনডাঙা পেরিয়ে শান্তিনিকেতনের চেনা পথঘাট দিয়ে সাইকেলে দুই যুবক-যুবতীর আলাপচারিতা বেশ লাগে। রুদ্রপলাশ, পূর্বপল্লীর গেষ্টহাউস, রাঙামাটি হোটেল, গোয়ালপাড়ার পথ ধরে খোয়াই নদীর ধারে এসে খোয়াই কে নিজের করে চাওয়া ঠিক যেন আমার চাওয়ার মত । তবে মেয়েটির খোঁপাতে ধনেপাতা গোঁজাটা একটু অন্যকিছু হলে ভালো হ'ত। কারণ শক্তডাঁটি না হলে পাতা গুঁজবে কি করে? প্রান্তিকের ক্যানালের ধারে, তাদের প্রেমালাপ, অজয়নদরূপী উদাস বাউলের সাথে মেয়েটির ফ্যান্টাসি ভালো। তবে শুদ্ধ-কোমল স্বরের ব্যঞ্জনা খানিকটা একঘেয়েমি এনে দেয়। শান্তিনির সব নৈসর্গিক সম্পত্তি এমন কি গোয়াল পাড়ার ঢোলকলমি থেকে শুরু করে সোনাঝুরির সব পাতা তিনি দিতে চেয়েছেন প্রেমিকাটিকে উজাড় করে সেখানে মেয়েটির শুদ্ধাশুদ্ধ না আনলেও চলত। ভালোবাসা যদি নিখাদ হয় সেখানে শুদ্ধতা যাচাইয়ের তো প্রয়োজন নেই। অবশ্য এখানে তাঁর পোয়েটিক লাইসেন্সকে আমি অস্বীকার করি না ।

"কাঁটাতার" পড়ে মনে হ'ল এক অপূর্ব বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন কবি, লেখক শিল্পী জয় গোস্বামী । সব সম্পর্কের মধ্যে তিনফুট ছাড় রাখাটা যে কতটা জরুরী সেটা নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি আমি। দুটি মানুষের মধ্যে যেকোনো সম্পর্কের ইতি ঘটে কাঁটাতারের বেড়া লঙ্ঘনের জন্য..এই জীবন দর্শন অনবদ্য। সীমান্ত লঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে আমরা সকলেই সচেতন এবং অবৈধ সংসর্গের ক্ষেত্রে তার পরিসমপ্তি ঘটে আত্মহনন, বিচ্ছেদ ইত্যাদিতে । কৌতুহলের এবং জ্ঞান-উপদেশের তীর বিদ্ধ হয়ে, সমাজবৃত্তে থেকে একঘরে হয়ে হীনমন্যতার স্বীকার হতে হয়। তাঁর মতে এই সব পরকীয়া প্রেম কাঁটাতারের বেড়া লঙ্ঘন না করে "নো ম্যানস ল্যান্ডে" থেকে ও চলতে পারে ; দুদেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী জায়গায় দুদন্ড দাঁড়িয়ে মনের কথা বলে আবার যদি ধীরে ধীরে ফিরে যাওয়া যায় অর্থাত দুপক্ষের কেউ জানালো না কথাটা, কেবল সেই সম্পর্কের টানাপোড়েনে জর্জরিত মানুষদুটি ছাড়া। তাহলেও কিন্তু আমার মনে হয় "এই কুলে আমি আর ঐ কুলে তুমি"র মত মাঝখানে বিশ্বাসের সূতোটা আলগা হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, একথা স্বীকার না করে পারা যায় না, নিখুঁত লেখনীর বুনোটে "নো ম্যানস ল্যান্ডে" ডিঙি নৌকায় বসে কথা বলে চলে আসাটা নি:সন্দেহে উপভোগ্য।

"বিরহ" গদ্যে আমরা আবার নতুন করে আবিষ্কার করি প্রেমের বিরহ যন্ত্রণাকে, যা নাড়িয়ে দেয় পাঠকমন কে। সংসার কটাহ তলে জ্বলতে জ্বলতে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে ঘুমিয়ে পড়া প্রেমের মধ্যে থেকে নিভে যাওয়া বিরহের অবসর.. এ ধারণাও অসাধারণ ।।

জলঝারির অনবদ্য রঙীন প্রচ্ছদ অলংকরণের পুরো কৃতিত্বটুকু প্রাপ্য কৃষ্ণেন্দু চাকীর । ব‌ইটি সত্যি সত্যি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। জয় গোস্বামী আরও লিখুন আর আমাদের পাঠকমনকে নাড়িয়ে দিন এই কামনা করি ।
কিন্তু তিনি তো আজীবন শিল্পী, অবিসংবাদী কবি তাই তাঁর শেষ গদ্যের এই স্বীকরোক্তি "মধ্যবয়সের বিদ্বেষ চর্চার জ্বালা, প্রতিহিংসা বহন ও তার দাহ এসবের চেয়ে প্রেমের অভিশাপ বরং শ্রেয় " এই কথাটি মনে রাখার মত

১৩ নভে, ২০০৯

কালোমেয়ে

আমার উপন্যাসের নায়িকা শেষের কবিতার লাবণ্যের মত নয়,
আমার গল্পের নারী চরিত্র প্রথম প্রতিশ্রুতির সত্যবতীর মতও নয়,
আমার কল্পনার নারী অমরাবতীর ঊর্বশীরমত ওড়নায় মুখঢাকা কোনো দেহপসারিণী নয়,
কিম্বা রাঙামাটির পথ ধরে হেঁটে চলা আলুথালু বেশ, শুকনো কেশ কোনো নিষ্পাপ গ্রাম্যবালিকা নয় ;
কালবেলার মাধবীলতা নয়.. নয় সে নষ্টনীড়ের কুড়ানি।
আমি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা ; স্বপ্ন বেচি কাব্য লিখে। ঘুমের মাঝে গল্প লিখে ...
আমার রঙীন নেশার স্বপ্নের নায়িকা কৃষ্ণকলি ..
সে কালোমেয়ে তাই কৃষ্ণকলি বলি আমি তাকে।
জানো ? সে আমার মনের গহন বনে, লুকিয়ে থাকে আপনমনে,
রাত্রি শেষে ঘুমের মাঝে, ঘুমপাড়ানি গানের সুরে,
আমার কাছে দেয় সে ধরা, কোলে তোলে আপন করে ।
কৃষ্ণকলি পাশে বসে। আমায় দেখে মুচকি হাসে।
নয় সে কোনো বিম্ববতী, সুরধুনীতীরের কোনো বিরহিণী রাধারাণি ।
গাছ তলার নীচে চুঁইয়ে পড়া ক্ষীণ ঝোরার জলের শ্যাওলা পড়া পাথরের নীচে বসা,
কোনো আধফোটা কিশোরী নয়,
প্রকান্ড সোনাঝুরির ফ্যাকাসে কাঠের গুঁড়ির গায়ে হেলান দেওয়া প্রেমিকের জন্য প্রতীক্ষারত,
কোনো সদ্যকুসুমিত যুবতী নয় ।
সে একপিঠ কালোচুল এলো করে, সাঁঝের বাতি করে সাথী, চলে আসে রাতারাতি ।
কখোনো পূবের আলোর কনকোজ্জ্বল রক্তিমাভা দু কপোলে মেখে, কপালে মস্ত লাল সিঁদুরের টিপ এঁকে,
শোনায় ভোরের আগমনী ।
কম্বুকণ্ঠী কৃষ্ণকলি আমায় কবিতা শোনায়,
কাজলনয়না কৃষ্ণকলি আমাকে গান শোনায় ।
কখনো চাঁদের রূপোলী জ্যোত্‌স্না গায়ে মেখে, ছাদ আলো করে আমার পাশে এসে দাঁড়ায় ।
মিষ্টি হাসি হেসে আমায় বলে, আমি যে তোমায় বড্ড ভলোবাসি, তাই তো তোমার কাছে ছুটে ছুটে আসি।

২১ অক্টো, ২০০৯

মরুভ্রমণ যদিও অধরা তবুও মধুর!!!


আসলে সেই অর্থে মরুভ্রমণ হয়নি এবার। আমার ছেলে রাজস্থানের একটি কলেজে এই বছর ভর্ত্তি হয়েছে...তাই সে তো আসতে পারবে না ...তাই আমাদের যাওয়া..তবে কলকাতার ভীড় ছেড়ে পালিয়ে কিছু খারাপ লাগেনি..বরং একটু অন্যরকম দীপাবলী হল এবছর । ময়ূর, টিয়াপাখি, বকের সারি, নিম গাছের এভিনিউ, ঊটের সঙ্গে পথ হাঁটা, কাঠবেড়ালির পায়ে পায়ে লুকিয়ে পড়া, এই সব আর কি ...মাটি থেকে ২৫০ মিটার উঁচুতে সংকটমোচন মন্দির দেখতে গেলাম । বাজিপোড়ানো দেখলাম কলেজের ক্যাম্পাসে । প্রচুর আলো দিয়ে সাজানো কলেজের ঘড়ি-স্তম্ভ...আলো আলো আর শুধু আলোর রোশনাই ..কিন্তু সাথে নীরবতা..এক অপূর্ব নৈসর্গিক শান্ত প্রকৃতি। সকাল হলেই নতুন ঠান্ডা হাওয়ার ছোঁয়া আর কর্কশ কেকাধ্বনি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল আলস-লালস পসরা সাজিয়ে শীতের আগমনবার্তা । আমার ছোটবেলায় বাবা মায়ের সাথে রাজস্থান ঘোরা কিন্তু এই বয়সে স্বামী-পুত্রের সাথে ছোট্ট এই গ্রামের মাঝে দিন কয়েক ঘুরে এসে ...কত পাখির কলরব শুনে, কত বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মনে পড়ে গেল..আমি বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন করলাম !

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু!!!!

১৮ অক্টো, ২০০৯

আমার দীপাণ্বিতা


আকাশ-প্রদীপ জ্বলছিল কার্ত্তিকের কলকাতার কালো আকাশে। ভূত-চতুর্দশির রাতে চোদ্দ-প্রদীপ জ্বালিনি সেবার।
বিয়ের আগে আমার দীপাবলী ছিল এক রকমের ।
দীপাণ্বিতার পূজো, অলক্ষী বিদায় করে ধনতেরসের লক্ষীবরণ, কত জাঁকজমক করে মায়ের ভোগরান্না, কলাপাতার থালায় প্রসাদ বিতরণ, মজা করে ভাই বোনেদের সাথে ঘিয়ের সাদা সাদা লুচি, নতুনশীতের ফুলকপির ডালনা খাওয়া। তারপরে অন্ধকার ছাদে উঠে বাজি পোড়ানো, আর ছাদের প্যারাপেটে সার সার মোমবাতি দেওয়া। আমার দীপাবলী আমার ঘরের দীপাণ্বিতার আলোয় আলোকিত হয় প্রতিবারে।
বিয়ের পরে আমার দীপাবলী এক এক বার এক এক রকমের হয়েছে। কোনো বার কেটেছে শুধু বারান্দায় বসে আলো দেখে, বাজির মালা দেখে, বাজির আওয়াজ শুনে। কোনোও বারে শুধু ঘুরে বড় বড় প্যান্ডেলে কালীঠাকুর দর্শন করে খেয়ে দেয়ে হুল্লোড় করে।
এবছর মরুপ্রদেশের সীমান্ত ঘেঁষে আরাবল্লী ঘেরা ময়ূরের দেশে দেখে এলেম তারে, রেখে এলেম তারে। অনেক দূরে, মরুশহরের পাশে, ছোট্ট গাঁয়ের দেশে, যেথায় ক্লান্ত মরুজাহাজ চলেছে বালির পথের ধূলো উড়িয়ে, গজগামিনী ময়ূর চলে দুলে দুলে মরুসাহারার বাগান দিয়ে, পেখম ঝুলিয়ে, পুচ্ছ দুলিয়ে..
ঝিঁঝিঁর ডাকে, রাতের আকাশে দেওয়ালির আলোয় এ গ্রামের মানুষ আমাকে অনেক কিছু দেখিয়েছে এবার। আতসবাজির কলরব, আকাশের বুকে আলোর রোশনাই, কত রকমের, কত রঙয়ের বাজি! বড় কষ্ট হল হস্টেলের ছেলেদের জন্যে, যারা এবারে দেওয়ালীতে বাড়ি যেতে পারলোনা, যাদের মায়েরা কত রকম খাবার বানিয়ে, থালা সাজিয়ে বসেছিল ..

১২ অক্টো, ২০০৯

দীপালিকায় জ্বালাও আলো!


দীপান্বিতার দীপাবলী, আঁধার রাতে প্রদীপ জ্বালি,
অমানিশায় তোমায় পূজি, মনের মাঝে তোমায় খুঁজি,
তোমার রূপের কালোর আলোয়, মনের আশায় সকল ভালোয়
ত্রিনয়নের জ্যোতির ছটা, দূর করো সব অঘটন ঘটা।
লোলজিহ্বায় গ্রাস করে নাও, কপট-কলুষ-কালিমালিপ্ত,
অপারকরুণা বর্ষিয়ে তুমি মুছিয়ে ধরা কে করো যে শান্ত।

১ অক্টো, ২০০৯

সোনার তরীর পাঠকদের আমার শুভ বিজয়ার প্র্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই

শান্তিনিকেতনের প্রান্তিকের দুর্গাপূজার বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠে আমি এবং সুমন দাস বাঁশীতে

২৭ সেপ, ২০০৯

আজ মহানবমী



নবমী নিশি যেন আর না পোহায়,
তোকে পাবার ইচ্ছা মাগো কভু না ফুরায়,
রাত পোহালেই জানি আবার হবে দশমীর ভোর,
আবার তোকে পাবো মোরা একটি বছর পর |
মহা মায়ের মহামায়া, সোনার আলোয় কত পাওয়া
চারটি দিনের কত চাওয়া, ঊমাশশীর উতল হওয়া
কাঁদিস নে মা, আবার তোরে আসবো নিয়ে বছর পরে

২৬ সেপ, ২০০৯

আজ মহাষ্টমী


অষ্টমীতিথি সাঁঝের বাতিতে,
আলোকিত হল তোমারি আলোতে,
আজ হলে তুমি আরো সুন্দরী, !
ঘামতেল মাখা মুখপানে চাই,
আলোর পথেতে যেন পা বাড়াই,
তুই যেন মাগো আমাদের সাথে,
থাকিস পাশেতে প্রতি দিনেরাতে,
এইটুকু চাওয়া আর কিছু পাওয়া,
অষ্টমী পুজো শেষের বেলায়,
ভালো আরো বাসি পূজোর হাওয়া ।

২৫ সেপ, ২০০৯

আজ মহাসপ্তমী

সূর্যস্নাত সপ্তমী তিথি, নবপত্রিকায় তোমার আরতি,
ধন-ধান্যে বিপুলা প্রকৃতি, সবুজ ধরার পুন জাগৃতি,
নন্দিত তব চরণ পরশে, শস্যশ্যামলা সারাটি বরষে,
পূজি মাগো তোরে মনেরি হরষে, শুক্লা সপ্তমী তিথিতে
|

২৪ সেপ, ২০০৯

আজ মহাষষ্ঠী


মহা ষষ্ঠীর বোধন লগনে, ঢাকের বাদ্যি শুনি ক্ষণে ক্ষণে,
উদ্ভাসিত মৃন্ময়ী রূপ সোনার প্রতিমা বরণে,
চিন্ময়ী মাগো আনন্দরূপীণী, স্থল-জল শোনে বোধনের ধ্বনি,
আকাশ-বাতাস মুখরিত আজি বন্দিত তব শুভ আগমনী |