১৪ জানু, ২০২০

টুসু আর পৌষলক্ষ্মী কি এক?

      
ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত 


"পোষ পরবে টুসু আসে বছরখানি ঘুইরা যায় 
ধনী শ্বশুর ঘরে ফি‌ইরা যায় 
এ টুসুকে ক্যামনে আনি গাঁয়? 
এ টুসুকে জলে দিব, জল টুসুকে চিনে লাও' 


পৌষমাসে  বর্ধমানের আসানসোল অঞ্চলে টুসু পুজোর ধুম। টুসু মূলতঃ মানভূম, ঝাড়খণ্ড, পুরুলিয়া, সাঁওতাল পরগণার উৎসব। ঘরের কন্যাশ্রী টুসু লৌকিক এক দেবী। কেউ বলে টুসুমণি। লোকগাথায় বলে, টুসু নামে এক স্থানীয় কন্যা নিজের প্রেমের নিষ্ফল পরিণতি স্বরূপ জলে ডুবে আত্মঘাতী হয় তাই তাঁকে প্রতিবছর স্মরণ করেই পুজো।  
পৌষ মাসে নতুন ধানের গন্ধে ঘর গেরস্থলি থৈ থৈ। পৌষসংক্রান্তি এগিয়ে আসা মানেই আমনে-বামনে বাঁধা আর নতুন চালের পিঠেপুলির তোড়জোড়।  সেই সঙ্গে একদিকে টুসু পরব অন্যদিকে পিঠে পার্বণের ঘটা। 
টুসু প্রধানতঃ আদিবাসীদের পার্বণ। কিন্তু দক্ষিণবাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে এই পরব মিলেমিশে একাকার হয়েছে । তাই মনে হয় তুষু বা টুসু যেন আমাদের ঘরের কুললক্ষ্মী। কৃষিভিত্তিক এই প্রাণের উত্সব যেন পূর্ণতা পায় শস্যের ভান্ডার ভরে উঠলে। সমগ্র রাঢ় বাংলার এই আরাধ্যা দেবী কিন্তু পৌরাণিক নয়। কোনো পঞ্জিকায় এই পুজোর নির্ঘন্ট মেলে না।  ধানের তুষ হল এই পুজোর প্রধান উপাচার। তাই বুঝি এই দেবীর নাম তুষু বা টুসু।   
টুসু হলেন আটপৌরে, চিরকুমারী আর এঁর পূজাও করেন কুমারী মেয়েরা। অঘ্রান মাসের শেষ দিন থেকে পৌষ মাসের শেষ দিন অবধি রাঢ় বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে এই টুসু পূজিতা । আর এই পুজোর রীতিও অন্যরকম। নিজের ঘরেই পোড়ামাটির টুসু প্রতিমা এনে মেয়েরা মিলে নানারকমের গান বাঁধেন টুসুকে ঘিরে।  টুসু কে ঘিরেই সেই গানের কথা। টুসুর সাধ আহ্লাদ, টুসুর জীবন যন্ত্রণা, টুসুর  মান অভিমান আর সব শেষে টুসু বিসর্জনের দিন মনখারাপের কথা উঠে আসে ।  মনে নতুন ফসল ওঠার আনন্দ আর টুসুকে ঘিরে গান বাঁধার স্বপ্নে তারা বিভোর থাকেন এই একটি মাস।  
সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, ওরাওঁ, ভুঁইয়া, কুর্মি, মাহাতো,বাউরী, বাগদী প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়রাই এই পুজো করেন।  বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশে টুসুকে অনেকে মকর পরব ও বলেন। পৌষ সংক্রান্তির পরে মাঘের প্রথম দিনে যেহেতু নতুন কৃষি বর্ষের সূচনা  তাই কেউ আবার টুসু কে বলেন ফসল ঘরে তলার উৎসব।  
কোনো চাওয়াপাওয়া নয়। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে এরা টুসুর কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখের টানাপোড়েনের কাহিনী শোনায় গানের মাধ্যমে। কোনো অভাব অভিযোগ নয় যেন ঘরেতে অতিথি এসেছে, তাকে বরণ করো গো, তার সঙ্গে দুটো মনের কথা ক‌ও গো।  

"গাঁয়ের কথা টুসু জানে, পেট খোরাকি জুটে লাই
পাথর ভাঙে পাথর গড়ে, চুলার খোলা ভরে লাই' 

অভাব অনটন যতই থাকুক সংসারে, যেমন করেই হোক টুসু কে তাঁদের ঘরে আনতেই হবে। তার সঙ্গে দিনযাপন করতেই হবে।  আর পৌষ সংক্রান্তির দিনে ধুমধাম করে টুসু বিসর্জনের সময় চোখের কোণে জল নিয়ে আবারো ওরা গেয়ে উঠবে 

" এ টুসু কে জলে দিব লাই, এ টুসু কে ক্যামনে রাখি গাঁয় 
লাল পায়েতে আলতা মাখা টুসুর চোখে কথা লাই 
পাথর ভেঙ্গে ধান তো ফলে লাই তবু টুসু জলে দিব লাই 
এ টুসুকে ক্যামনে আনি গাঁয়' 

 নদীতে টুসু বিসর্জন এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। এ যেন দোলের মত আরেক রঙের ভাসান  উৎসব।  একদিকে স্নান করে গ্রামের মেয়েরা রঙ্গীন পোষাকে অন্যদিকে বাঁশ কঞ্চির কাঠামোয় কত রঙের ছোঁয়া। রঙ বেরঙ্গের কাগজ দিয়ে মুড়ে রঙ্গীন পুতুল দিয়ে সাজানো হয় সেই চতুর্দোলা বা চৌডল।
অঘ্রাণ সংক্রান্তির  সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা টুসু পাতে। একটি পাত্রে চালের গুঁড়ো মাখিয়ে তার মধ্যে তুষ, ধান, গোবর, দূর্বা ঘাস, আতপ চাল, আকন্দ ফুল, গাঁদা ফুলের মালা প্রভৃতি রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ লাগিয়ে পাত্রটিকে কুলুঙ্গীর ওপর রেখে, ফুল ছড়িয়ে  টুসুকে প্রতিষ্ঠা করে । সন্ধ্যাবেলায় তারা দলবদ্ধ হয়ে টুসুর নিকট তাঁদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতা সুর করে গান বাঁধে ও দেবীর উদ্দেশ্যে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করেন।পাড়ায় এর  ওর মধ্যে কোঁদলও চির পরিচিত। এ বলে আমার টুসু ভাল, ও বলে আমার টুসু আরো ভাল। মকর সংক্রান্তির ভোরে টুসু ভাসানের দিন এর প্রতি ওর বক্রোক্তি আরো চরমে ওঠে। বাঁশের চতুর্দোলার মধ্যে থাকে টুসুর সরা। কেউ আবার মাটির কন্যা মূর্তিও রাখে।  টুসুকে সাজিয়ে নিয়ে  ভাসানো হয় নদীতে।  টুসু গানের করুণ সুর, টুসুর বিদায়ী গান চোখে জল এনে দেয়।  ধামসা মাদল, কাঁড়া, নাকাড়া, কাঁসর ঘণ্টা, ঢোল, তাসা বাজিয়ে বিসর্জনে  সামিল হয় গ্রামবাসী। টুসু বিসর্জন দিয়ে সকলে নতুন কাপড় পরে। কোথাও ধুম করে টুসু মেলা.বসে। টুসুর চৌডল নিয়ে বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখবার মত। 
পুরুলিয়ায় এই চৌডল নিয়ে প্রতিযোগিতাও চরমে ওঠে । 

আমরা কেউ মকর স্নান করে পুণ্যি কুড়োই আর আদিবাসীদের ঘরে টুসু পরবের গানের সঙ্গে মাদলের দ্রিমি দ্রিমি বেজে ওঠে। টুসু গানের মহড়ার পাশাপাশি  কেউ আবার  নতুন ধানের আউনি-বাউনি বেঁধে পিঠে বানাতে বসে। সেই পিঠে টুসু ঠাকুরকে দিয়ে তবে খায়। বাংলার এই পাব্বনী সংস্কৃতির মেলবন্ধন ভরিয়ে তোলে মন কে। মনে মনে বলে উঠি টুসুকে, "পুনরাগমনায় চ" ! 


কেউ ওড়ায় ঘুড়ি। আটপৌরে বাঙালীর এই পিঠে সংস্কৃতি যেন তাদের বাৎসরিক সংস্কার। 

এর মাঝে খুব প্রচলিত লক্ষ্মী পুজো। সদ্য ওঠা ধানের বেদীতে লক্ষ্মীর আসন। তার হাতের পেঁচা, কুনকে ভরা ধান, সিঁদুর কৌটো সবকিছুই পাতা ধানের বিছানায়। লক্ষ্মীর হাঁড়ির সারাবছরের ধান বদল করে নতুন ধান দিয়ে পূর্ণ করা হয়। ইনি হলেন পৌষলক্ষ্মী, ঘটিদের কুললক্ষ্মী। পৌষমাসের শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবারে অথবা সংক্রন্তির দিনে এই লক্ষ্মীপুজো হয় । নতুন চাল এবং নতুন গুড় দিয়ে পিঠেপায়েস বানিয়ে নিবেদন করা হয়। এর ব্রতকথাটিও বেশ ।

 এক গরীব বিধবা বামনী এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে  পৌষমাসের একদিন তার সচ্ছল ভাইয়ের সংসারে গেল। ননদকে দেখে তার ভাজ খুব অসন্তুষ্ট হল। কারণ হল পৌষমাসে বৃহষ্পতিবার নাকি কারো বাড়ি যেতে নেই। বামনী সরল মনে বলল ভাইয়ের বাড়ি যেতে কি দিনক্ষণ লাগে?  বাচ্ছারা মামাবাড়ির বায়না করল তাই সে এসেছে। তার ভাজ বলল সে তাদের ভাত খাওয়াতে অপারগ কারণ গৃহকর্তা অর্থাত বামনীর ভাই বাড়ি নেই। কিন্তু বামনীর খিদের জ্বালা। সে বলল, যা হোক কিছু খেতে দিতে। ভাজ দুটি ক্ষুদ দিয়ে বলল এগুলো সেদ্ধ করে খেতে । বামনী দেখল তাদের মাচায় ডগডগে লাউশাক। চারটে লাউপাতা চাইতে তার ভাজ রেগে গিয়ে বলল ঐ পাতায় হাত দিলে নাকি তার স্বামী তাকে আস্ত রাখবে না। বামনী মনের দুঃখে ফিরে যাচ্ছিল। সেই দেখে ভাজ বলল যাবার আগে তার মাথার উকুন বেছে দিতে। বামনী লক্ষ্মীবারে উকুন তোলার নিষেধের কথা জানাল।  নির্দয় ভাজ তার ননদের আঁচল থেকে সব ক্ষুদ কেড়ে নিয়ে নিল। শুক্লপক্ষের বৃহষ্পতিবার ছেলেমেয়ের হাত ধরে বামনী ভাইয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল আর প্রতিজ্ঞা করল রাস্তায় যা কুড়িয়ে পাবে তাই রেঁধে খাওয়াবে ছেলেমেয়েকে। পথের ধারে একটা মরা কেউটে দেখতে পেয়ে সেটাই কুড়িয়ে নিল বামনী। কাঠকুটো জ্বেলে সেই সাপকে যত‌ই জাল দেয় তত‌ই তার থেকে সোনার ফেনা বের হয়। শেষে খানিকটা সোনার ফেনা নিয়ে ছেলেকে বাজারে বেচতে পাঠাল। আর তারপর তাদের অবস্থা আর দেখে কে?  একদিন তার ভাজ এসে ননদের কুঁড়েঘরটি দেখতে না পেয়ে অবাক হল। সেখানে মস্ত বাড়ি। কি করে এমন হল জানতে ননদকে একদিন তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। বামনী তার বাড়ি নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়ে বলল, যখন আমরা গরীব ছিলুম তখন আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলে আজ আমাদের অবস্থা ফিরে যাওয়ায় এত আপ্যায়ণ করছ?  ভাজ তখন লজ্জায় ননদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। এটি ঠিক আমাদের সংসারের চিত্র। এমন তো ঘরে ঘরে আমরা এখনো লক্ষ্য করি।  


কোন মন্তব্য নেই: