২৬ আগস্ট, ২০১৮

পোকামন (অণুগল্প)



ভাদ্র মাস পড়ে গেছে। তবে আর কি? কুকুরের ভালোমাস, ইন্দিরের সব্বোনাশ। এই শেষ হল ছাদ বাগানের সব ঘাস ফুল, তৃণমূল, লিলিফুল গাছের পাতা খেয়ে সাফ করা শুঁয়োপোকার । বেশী খায় এরা। কচি সবুজ পাতা কচকচ করে। লার্ভা থেকে পিউপা হায়েই ফুড়ুত প্রজাপতি হয়ে। ততক্ষণ খাচ্ছে খাক। সেসব গাছে মালী স্প্রে করে দিয়েছে তাই রক্ষে।
ইন্দির ঠাকরুণ রোদ খাইয়েছেন বেশ কিছু কাপড়চোপড়ে। বেলা বাড়তেই সোনাগলা রোদ্দুর দেখেই মনে হল ব‌ইয়ের আলমারি গোছাতে হবে। নানা কাজের ফাঁকে, লেখার চাপে ভারি অযত্নে পড়ে আছে ভাল ভাল ব‌ইগুলি। শাশুড়িঠাকরুণের বিয়েতে উপহার পাওয়া বিশ্বভারতী প্রকাশনার প্রথম সংস্করণ রবীন্দ্ররচনাবলী। আরো সব দুষ্প্রাপ্য গল্পের ব‌ই। শ্বশুরমশাইয়ের পাঁচখণ্ডের কথামৃত, যুগনায়ক বিবেকানন্দ। পি লাল মহাশয়ের গীতার ইংরেজী অনুবাদ। তারাশঙ্করের রাধা, সুনীলের রাধাকৃষ্ণ, সমরেশ বসুর শাম্ব। দীপক চন্দের পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ। ছেলের পৈতের উপহার সেরা সত্যজিত, ফেলুদা সমগ্র, হ্যারি পটার সিরিজ। পরশুরাম সমগ্র, শরদিন্দু অমনিবাস এমন আরো অরো কত ব‌ই। ব‌ইয়ের পাহাড়ের কোলে ইন্দির। অজস্র পোকা পাতায় পাতায়। একে বর্ষা তায় আলমারী বন্দী সব। পাতা গুলো খুলতেই বেরিয়ে এল সিলভারফিশ। রূপোর মত চকচকে আর কি লালিত্য তাদের। ইন্দিরের মনে হল সংসার করার মহা জ্বালা। একদিকে হিট স্প্রে কর অন্যদিকে আবারো পোকা বেরোয়। তার চেয়ে পড়েই থাক। কিন্তু মন মানে না। সর্বাঙ্গে ব্যথা। ওষুধ দেব কোথা? ওষুধ দেয় সে ব‌ইয়ের মলাটে, পাতায় পাতায়। আলমারীতে কোণায় কোণায় রাখে ন্যাপথলিন বল, ওডোনিল। আর ভাবতেই থাকে পোকার বারমাস্যা। আলমারীতে নিজের ঢাকাই, বালুচরীর ভাঁজে দু একটা কাপড় কাটার দুমুখো পোকা পেয়েছে আজ সে। সকালে উচ্ছে কাটতে গিয়ে দানার মধ্যে ঘুমন্ত সাদা সাদা পোকা দেখেছে। কাজের মেয়েটা জলখাবারের ময়দা মাখতে গিয়ে বলেছে, ও বৌদি পোকা লেগেছে। পুরোটা চেলে রোদে দি? ইন্দির বলেছে, দেখিস বাপু বেশি গুমশুনি গন্ধ হলে ফেলে দিস ও ময়দা। আটা মাখ তার চেয়ে। ইলিশমাছের ঝাল রাঁধতে গিয়ে রান্নার বৌ চেঁচিয়েছে, ও বৌদি জন্মে শুনেছ হলুদ গুঁড়োর বয়ামে পোকা? পোকা মারতে হলুদ গুঁড়ো দেয় শুনেছি। বলেই রান্নার বৌ পুরোটা বয়াম খালি করে বড় ছাঁকনিতে ছেঁকে হলুদ এ রোদ খাইয়েছে। ইন্দির ভাবে সংসার করার মহা জ্বালা। সর্ষের মধ্যেই ভূত। হলুদ খেতে বলছে সকলে। পেটে পোকা হবেনা। ক্যান্সার হবেনা। সেই হলুদেও পোকা? ব‌ইয়ের আলমারীটা আগেকার বার্মার টিক দিয়ে তৈরী। সেটার একপাশেও উইপোকা চেষ্টা চালিয়েছিল। তারপর বিফল মনোরথ হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। আরেকটি ব‌ইয়ের আলমারীর তাকে ঘুণ ধরেছে। স্প্রে করেছে ইন্দির কিন্তু তার আগেই তার মধ্যে থেকে ঘুণপোকাটা ফড়ফড় করতে করতে বেরিয়ে এসেই ফুড়ুত। ব‌ইয়ের সমুদ্রে বসে হঠাত নিজের মাথাটা চুলকে উঠল। উকুন নয়ত? সব‌ই সম্ভব পোকার দুনিয়ায়। সেবার নর্থ বেঙ্গল থেকে ঘুরে এসেই উকুন হয়েছিল তার মাথায়। তবে লাইসিলের দাপটে উকুন উধাও হয়েছিল বটে। ব‌ইয়ের আলমারীর চাবি বন্ধ করতে গিয়ে দেখে চাবি দেবার গর্তে বোলতা না ভীমরুলের বাসা। মাটি দিয়ে তা বন্ধ। তাকে খুঁচিয়ে পরিষ্কার করে আবার হিট স্প্রে। বাপ্‌রে বাপ্‌! সংসার যেন আদাজল খেয়ে ইন্দিরের পেছনে লেগেছে। এবার রান্নাঘরে এগুতেই তার মডিউলার কিচেনের ছুরিকাঁচি, কাঁটা চামচ রাখার ট্রে গুলো থেকে বিন বিন করে কুট্টি কুট্টি আরশোলা বেরুতে দেখল ইন্দির। আবারো মনখারাপ হযে যায়। এত চেষ্টা করে আনাচকানাচ পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করে। গতমাসেই সব ধুয়েমুছে ওষুধ দিয়েছে। আবারো আরশোলা ডিম পেড়েছে। ছাদময় কাপড়চোপড় ছুটির দিনে। ভাদ্রের সোনাগলা রোদ্দুরে ইন্দিরের বাড়ি আজ ভাটিখানায় পরিণত। মেঘ ডেকে উঠল গুড়গুড় করে। কাজের মেয়ে বলল, বৌদি ঐ দেখ, উত্তরদিকে কেমন কালো আকাশটা। বলতে না বলতেই দুচার ফোঁটা গায়ে। দুদ্দাড় জামাকাপড় চালান ঘরের মধ্যে। ইন্দির আজ সকালে দেখেছিল বটে একটা বড়সড় ফড়িং ঘরের মধ্যে ঘুরতে। তখনি হাতের মুঠোয় গুগল ওয়েদারে দেখেছিল আজ বৃষ্টি হবেই। মিলে গেল সে কথা।
কাজ করতে করতে খিদে পেয়েছিল ইন্দিরের। একটা পাকা পেয়ারায় কামড় বসিয়েই কি মনে হল। চেয়ে দেখে পেয়ারার মধ্যে থেকে গদ গদ করে বেরিয়ে আসছে সাদা কুচো কৃমির মত লকলকে পোকা সব। ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে ভাবে নাহ! আজ কোনও পোকা তাকে ছাড়বেই না।
সংসারের সব পোকা আস্টেপিস্টে বেঁধে ফেলেছে ইন্দির কে। এর হাত থেকে আমৃত্যু নিস্তার নেই তার। সবকিছুতেই এমন। সর্বস্তরে এমন। বন্ধুত্বে, রাজনীতিতে, সম্পর্কে, সংসারে, জীবনযাপনে সব পোকার বাস। পোকা দেখতে ছোট কিন্তু সব্বনাশ অতি বড়।
ভাগাড় কাণ্ডের পর মাছ, মাংস, ফল সবজী কিছুতেই আর বিশ্বাস নেই । সদা ভয় হয়, হারাই, হারাই। মাছভাজার সেই ভিডিওটা মনে পড়ে তার। হোয়াটস্যাপে একজন শেয়ার করেছিল। দেখতে তাজা মাছ । গরম তেলে ছাড়তেই ওপর থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে আসছিল সাদা সাদা জ্যান্ত পোকা। তারপর থেকে জিওল মাছ ছাড়া কেনে না সে। পাড়ায় নাকি কুকুর কমেছে। তাই মাংসের দোকানেও যায় না আজকাল আর। তবে কুকুর ভাদ্রমাসে প্রচুর দেখা যাচ্ছে। অতএব আবারো যাওয়াই যায় মাংসের দোকানে। কিন্তু পাঁঠার গায়ে আবার কুকুরের এঁটুলি থাকবে না তো? সঙ্গদোষে কি না হয়? সাতপাঁচ, ছাইপাঁশ ভাবনায় জল ঢেলে দেয় সে। মনে পড়ে যায় লোপামুদ্রার সেই গানখানি।
মেঝেতে গর্ত ছিল এদিক সেদিক নানান মাপের। কিনেছি কার্পেট তাই সস্তাদামের সঠিক মাপের।
সংসারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গর্ত এমন। ইন্দির কত জায়গায় আর কার্পেট পাতবে? ভাবতে ভাবতেই পায়ের কাছে যেন একটা কালচে রংয়ের ছোট্ট ছারপোকা। ঠিক দেখছে তো সে? হাতে টিপে মেরেই গন্ধ নিল নাকে। হ্যাঁ, যা ভেবেছে সে তাই। ল্যাবরেটরির চেনা পরিচিত বেঞ্জ্যালডিহাইডের গন্ধ। স্যার বলেছিলেন্, আইডেন্টিফাই করা সোজা। বিটার আমণ্ডের মত অনেকটা গন্ধ। সেই গন্ধ যুগ যুগ ধরে লেগে আছে ছারপোকাদের গায়ে।

কোন মন্তব্য নেই: