১৫ জানু, ২০১৬

অঘ্রাণে সাগরস্নানে

 

শীত পড়লেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। খেজুরের গুড়, পাটালী , জয়নগরের মোয়া, কড়াইশুঁটি, নবান্ন, পিঠেপুলি আর লেপ বালাপোষ মনে করিয়ে দেয় আরো দুটি অনুষঙ্গ, পৌষপার্ব্বণ আর মকরসংক্রান্তি  যার নাম।  সূর্য তার নির্ঘন্ট মেনে ধনুরাশি থেকে মকরে প্রবেশ করবে।  উষ্ণতার পারদ নামবে চড়চড় করে। জাঁকিয়ে শীত পড়বে তবেই তো হবে মকরস্নান। আর সেই স্নান হবে মোহানায় অর্থাত গঙ্গা যেখানে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। ছোট্টবেলা থেকে শুনে আসছি সেই মোহানার কথা। বছরে একটিবার সেই পয়েন্টটি হয় খবরের কাগজের শিরোনাম। মিডিয়ার ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার কুয়াশামাখা ছবি, দূর দূর থেকে আসা তীর্থযাত্রীদের আসা যাওয়ার গল্প, সরকারী রক্ষণাবেক্ষণ, পুছতাছ কেন্দ্র আরো কতকিছু খবর। লাইমলাইটে আসে বছরে একটিবার এই সাগরদ্বীপ। মেলাময় হয়ে ওঠে সমুদ্রপাড়। বালুকাবেলায় পায়ের ছাপ পড়ে অগণিত মানুষের ।  আশ্রম সংস্কৃতির সনাতন ফল্গুধারা, তীর্থময়তার সাথে কীর্তণের অণুরণন,  আর কপিলমুণি-সগররাজা-ভগীরথের গঙ্গাপ্রীতি সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় সাগরপাড়ে।  সূর্যের দিকে তাকিয়ে আবক্ষ জলে নিমজ্জিত লাখ লাখ মানুষ সোচ্চারিত হয় মন্ত্রোচ্চারণে...
শৈশবে  উদাসীনতা । কৈশোরে তীর্থভ্রমণে অনিচ্ছা। যৌবনে কোলাহলভীতি । চুলোয় যাক পৌষমেলা। শিকেয় থাক মকর স্নান। গঙ্গার উত্সমুখ দেখলাম আর তার বৈচিত্র্যময় বহমানতা দেখলাম কত শহরে আর তার সাগরে এসে আত্মসমর্পণ দেখবনা? আর তাও আবার কলকাতার কাছেই যে সঙ্গম।  তাই অঘ্রাণেই নিরালায় পাড়ি দিলাম এক ভোরে। বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুন্ডলা আর রবিঠাকুরের দেবতার গ্রাস স্মৃতি তাড়িয়ে নিয়ে চলল আমায়।  মৈত্রমশায়ের মত আমাদেরো সাগরসঙ্গমে যাবার জন্য সঙ্গী জুটে গেল এক পড়শী দম্পতি। 
মকরসংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে যখন লাখে লাখে মানুষ সমুদ্রে জমায়েত হয় তখন বুঝি এই নিরবচ্ছিন্ন শূণ্যতা পায়না তারা। কিছুটা হুজুগে, কিছুটা পুণ্যিলাভের আশায় ঠিক ঐ সময়েই যাওয়াটাই যাদের কাছে বড় কথা তারা বুঝি সে রসে বঞ্চিত ।  কিন্তু আমার চাই শূণ্যতা। শহরের  ভীড় ছেড়ে দুদন্ড জিরেন। সূর্য যখন আপনমনে রং ছড়াতে ছড়াতে বলে ওঠে, পুবের ভোর ভরেছো দুচোখে? সাগর বলে ওঠে, ঐ দ্যাখো ঢেউ। একটা দুটো শামুক-ঝিনুক পেলেও পেতে পারো। আর মন্দির বলে আমি আবহমানকালের  মহাস্থবির জাতক।  বসে আছি তোমার দেশের কিম্বদন্তীর দলিল সাজিয়ে ।
এ এক মহাতীর্থক্ষেত্র যেখানে এখনো হোটেল গড়ে ওঠেনি, শহরায়নের হিড়িক নেই তেমন। এ এক অভিনব মিলনক্ষেত্র যেখানে গেলেই ঊষা আর সন্ধ্যের ব্রাহ্ম মূহুর্তে শোনা যায় সম্মিলিত শাঁখের আওয়াজ, খোল কর্তাল, খঞ্জিরা, মঞ্জিরায় কীর্তণের অণুরণন । অগণিত মহাপুরুষরা নিজ নিজ আশ্রম গড়েছিলেন সাগরপাড়ে। মন্দির তুলেছিলেন আরাধ্যা দেবদেবীর। এখনো তাঁদের উত্তরসুরীরা সেখানে ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছে । স্থান দিচ্ছে তীর্থযাত্রীদের। প্রসাদ বিতরণ করছে। সন্ধ্যেয় তুলসীতলায় প্রদীপ থেকে ভোর চারটেয় মঙ্গলারতি কিছুই বাদ পড়ছেনা সেখানে। এক স্বর্গীয় আবহ যেন। ঘুম ভাঙতেই শুনি এক মন্দিরের শঙ্খধ্বনি দিয়ে শুরু মঙ্গলারতি, তা শেষ হতে হতেই আরেক মন্দির থেকে ভেসে আসে ঘন্টাধ্বনি। হিমেল বাতাসে, হালকা স্বরে ভজন শুরু হয় তারপর । সেই ভজনের সুর কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করতেই মনে পড়ে শহরে ফেরার কথা।



।। নারায়ণ পরাবেদা, নারায়ণ পরাক্ষরা, নারায়ণ পরামুক্তি, নারায়ণ পরাগতি।। 

কোন মন্তব্য নেই: