৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মহালয়া

ই একটানা দিন পনেরো ওঁরা ছিলেন আমাদের আশেপাশেই মানে ওনাদের প্রিয়জনদের বাড়ি ঘরদুয়ারে, বাগানে, বারান্দায় লেপটে। আত্মিক সম্পর্ক বলেই বুঝি এমন থাকাথাকি! কেমন যেন মনে হয় অনুভব করছি। কেমন যেন মনে হয় সাড়া পাচ্ছি। কেমন যেন মনে হয় তাঁদের ওঠাবসা, পায়ের শব্দে আমাদের বাড়ির আনাচকানাচ ভরে রয়েছে ক'টাদিন। কবে দেখেছি সকলকে মনে নেই তবে এঁরা আমার খুব আপনারজন।

আশ্বিনের পূর্ণিমার পর থেকে যে কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয় তা হল পিতৃপক্ষ । মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও প্রতিপদ থেকে দেবীপক্ষের শুরু । হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুসারে পিতৃলোক থেকে আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা তখন অবতরণ করেন স্বর্গ্য লোক থেকে মর্ত্যে । অর্থাত আমাদের আশেপাশে তাঁরা বিরাজ করেন । তাই আমরা এই সময় তাঁদের তুষ্ট করি তর্পণের মাধ্যমে । একপক্ষকাল অর্থাত গণেশ চতুর্থীর পর যে পূর্ণিমা তার পরদিন থেকে এই কৃষ্ণপক্ষ চলে মহালয়া অবধি । আর এই পক্ষকাল আমরা বাস করি আমাদের পরম আত্মীয় পূজনীয় বন্ধুদের স্মৃতিতর্পণ করে ।
মহালয়ার পরদিন মা দুর্গা স্বর্গলোক থেকে অবতরণ করেণ মর্ত্যলোকে এবং পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের শুভ সূচনা হয় তখনি ।
আশ্বিনমাসে সূর্য তুলারাশিতে প্রবেশ করে। হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয়, মরণোত্তর আত্মারা তখন পিতৃলোক ছেড়ে যার যার উত্তরসুরী আত্মীয়ের ঘরে বাস করেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন তাঁদের এই বসবাসের ডিউরেশান ঠিক একমাস, যতক্ষণ না পর্যন্ত সূর্য আবার তুলারাশি থেকে বৃশ্চিকে প্রবেশ করে। ঠিক মহালয়ার অমাবস্যার একমাস পরে আসে ভূত চতুর্দশীর অমবস্যা। কার্তিকমাসে বাড়ির ছাদে ছাদে আকাশপ্রদীপ জ্বালানো হয়। আত্মারা যাতে নিজনিজ গৃহ থেকে আবারো পথ চিনে স্বর্গলোকে পৌঁছতে পারেন সেই কারণে এই পথনির্দেশিকা ।
মহালয়ার অমাবস্যা তিথিতে দেবদেবীরা জাগ্রত হ'ন এবং মাদুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তিতে ঐ দিন চক্ষুদান করা হয় ।
মহালয়াতে সমাপ্ত পক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়। আজও মর্ত্যলোকের মানুষদের দ্বারা মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে প্রণতি জানানো হয়। পিতৃপক্ষে তর্পণাদি শ্রাদ্ধ করে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের খাদ্যদ্রব্যাদি উৎসর্গ করা হয় । প্রকৃতপক্ষে এটি পিতৃপুরুষের ঋণস্বীকার ছাড়া আর কিছু নয় ।
আমার প্রিয় ঠাম্মা, দাদা, দিদিমা, দাদামশাই, জ্যাঠামশাই, মাসীমা, জ্যেঠিমা, মামা, আমার স্বর্গতঃ শ্বশুরমশাই.....সকলেই কি সত্যি আছো এখন আমার সাথে? আমাদের বাড়িতে?
মনে পড়ে ঠাম্মা তুমি মহালয়ার দিনে কেমন পোলাও-মাংস রাঁধতে? দিদা মনে পড়ে তোমার কেমন যত্ন করে তুমি ভেটকিমাছ দিয়ে ফুলকপি রান্না করতে? আজ আমি অনেক রাঁধি কিন্তু তোমাদের মত হয়না কেন বলবে গো???


শ্মশান অনলে দগ্ধসি পরিত্যক্তোসি বান্ধবৈঃ
ইদং নীরং, ইদংক্ষীরং অত্র স্নাহি ইদং পিব
আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়
অত্র স্নাত্বা, ইদং পীত্বা স্নাত্বা, পীত্বা সুখি ভব।  

(এই ব্যাপারে একটু দ্বিমত আছে। আমি একজায়গায় দেখেছি পূর্বপুরুষের আত্মারা একপক্ষকাল থাকেন আবার আরেক জায়গায় দেখেছি ওনারা একটিমাস পুরো থাকেন। তবে যাই হোক ওনারা মহালয়ার আগের পনেরোদিন অর্থাত একপক্ষকাল থাকেন আর সেটাই পিতৃপক্ষ সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। দেবীপক্ষ পড়লেও ওনারা থাকেন কিনা সেটা স্পষ্ট জানা নেই।)

1 টি মন্তব্য:

শাঁওলি বলেছেন...

খুব ভালো লাগল