১৫ আগস্ট, ২০১০

সখী, স্বাধীনতা কারে কয়?



আমরা মনুষ্যজন্ম লইয়া পৃথিবীতে আসিয়াছি। ভুলেও ভাবিবেন না যে আমরা মানুষ হইয়াছি। আমরা নব্য সংস্কৃতির ধারা বহন করিতেছি মাত্র। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণধরা এই আধুনিক নগরসভ্যতার যাঁতাকলে পিষ্ট হইয়া যন্ত্রমানবের ন্যায় কর্মবীর হইয়া উঠিয়াছি। আমাদের সুদৃশ্য বাহ্যিক রূপোলী মোড়ক দেখিলে ভ্রম হয় , অভ্যন্তরের রক্তমাংসের মানুষটির এহেন অন্তঃসার শূন্য রূপ ? আমরা পাশ্চাত্যের নিকট প্যাকেজিং শিখিয়াছি, কিন্তু প্যাকেটের অন্দরমহলে "quality product" পুরিতে অক্ষম, সে মানুষই হোউক আর জিনিষই হোউক।
তৃতীয়বিশ্বের চতুর্থশ্রেণীর নাগরিকগণের নিকট ইহা অপেক্ষা অধিক আশা করাই বৃথা। স্বাধীনতার পরবর্তী কালে দেশনেতা সহ আপামর-জনসাধারণ বহুদিনের আকঙ্খিত স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়া উহার স্রোতে গা ভাসাইয়া দিল। ফলস্বরূপ অল্পদিনের মধ্যেই দেশের অভ্যন্তরে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হইল। দেশবাসী এতদিন ধরিয়া সম্মিলিত ভাবে বিদেশীশক্তির আধিপত্য মানিয়া লইতে পারিতেছিলনা |
এক্ষণে তাহারা ক্ষমতাশীল হইয়া একসূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াতো দূরের কথা, স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ এবং নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করিবার জন্য যাহা করণীয় তাহা লইয়াই ব্যস্ত হইয়া পড়িল।
ফলস্বরূপ মতভেদের বিভিন্নতা এবং দলের বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হল। ভিন্ন ভিন্ন দলের অগণিত মানুষ গণের বিচিত্র বুদ্ধি, বিভিন্ন মতামত প্রধান্য পাইতে লাগিল।। এহেন অরাজক পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তি 'বাবু' ব্র্যান্ডের তকমা আঁটিয়া বুক ফুলাইয়া সমাজের আনাচে-কানাচে ঘুরিতে লাগিল, কেবলই দলের 'ব্রান্ডেড বাবুদের' নিকট হইতে স্বার্থসিদ্ধির আশায়। স্বার্থান্বেষী ব্র্যান্ডেড বাবুরা ধীরে ধীরে দেশের আপামর -জনসাধারণকে 'রাজনীতি' নামক এক ছদ্ম ও অলীক ন্যায়শাস্ত্রের মুখোশ পরাইয়া দিল এবং ক্ষমতার অপব্যাবহার করিয়া অশিক্ষিত,মূর্খ অসহায় মানুষদের যেরূপ বুঝাইল তারা সেরূপই বুঝিল। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এক সুষুম্না-স্নায়ু অবশ করানো এক নঞর্থক মানসিকতায় পুষ্ট হইল।
এদিকে ব্যাপক বিশ্বায়নের ঢেউ আছড়াইয়া পড়িল ভারতবর্ষের তটভূমিতে। মনুষ্যগণ পাশ্চাত্যের সভ্যতারূপ দুগ্ধের নবনীটুকু গ্রহণ করিতে শিখিল না ,কেবল জলীয় অংশটুকু গ্রহণ করিয়া ভাবিল "কি না হনু"! প্রাচ্যের জলের সহিত পাশ্চাত্যের দুগ্ধের জলীয় অংশটুকুর মিশ্রণে আরো নিকৃষ্ট সভ্যতার তরল-গরল উদ্-গিরণ হইতে লাগিল সমাজের বুকে | প্রতিনিয়তঃ আমরা সেই গরলের আস্বাদ পাইতেছি।
গ্রামের মানুষ এ যুগেও অশিক্ষা ও কুশিক্ষার বাতাবরণে কালাতিবাহিত করিতেছে।। অনেক নিকটবর্তী গ্রামে মানুষ একালেও চিকিত্সার অভাবে প্রাণ হারাইতেছে। এমনকি শহরেও বিদ্যালয়,মহাবিদ্যালয় , বিশ্ব-বিদ্যালয় , হাসপাতাল, পথ-ঘাট, সর্ব ক্ষেত্রে সুচিন্তিত পরিকাঠামো এবং দেখভালের অভাবে ভাঙিয়া পড়িতেছে।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা, নেতাগণের স্বেচ্ছাচারিতা, 'বীরভোগ্যা' বসুন্ধরার সম্পদের যথেচ্ছাচার, সরকারী অর্থের অপব্যবহার ,মানুষের নেতিবাচক মানসিকতা , পূর্বতন নেতাগণের অযোগ্য উত্তরসুরি ....এই ষড়রিপু দেশের মানুষকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধিয়া , দেশের অর্থনৈতিক,সামাজিক, নৈতিক সর্বক্ষেত্রে ঘুণ ধরাইয়া দিল । স্বাধীনমানুষ মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়া সভ্য হইল। রাজনৈতিক নেতাগণ কেহ চাকরি, কেহ বসতবাড়ি , কেহ পদমর্যাদা ....এইসব মহত্স্বার্থে গণতন্ত্ররক্ষার বৃহত্-কর্তব্যে অবহেলা করিল।। আমরা শিখিলাম বহুতল ফ্ল্যাট-কালচার, লেট্-নাইট পার্টি-কালচার , ডিস্কোথেক কালচার । কম্পিউটারাইজেশন হইল | শুরু হইল কেব্-ল্-টিভি , ইন্টারনেট , মোবাইলফোন , ইত্যাদি অত্যাধুনিক পরিষেবা | আরো সভ্য হইলাম । শিশু হারাইল শৈশব। এবং যৌবনের পূর্বেই যৌবনের দায় লইতে পারিয়া যার-পর-নাই কৃতার্থ হইল। প্রৌঢ়েরা পাত্তা না পাইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে শিঙ ভাঙিয়া বাছুরের দলে প্রবেশ করিল | বৃদ্ধেরা উত্যক্ত হইয়া ব্যাপক বিশ্বায়নের ঊর্মিমালায় খাবি খাইতে খাইতে বাণপ্রস্থ লইয়া বৃদ্ধাশ্রমে বাস করিতে লাগিল। সমাজের অলিগলি দুষ্কৃতি দুরাত্মাদিগের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হইল। শিক্ষক অধ্যাপক এবং চিকিত্সক হারাইল মূল্যবোধ । নর-নারীগণ লাজ-লজ্জা জলাঞ্জলি দিয়া একাধিক অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হইল।
এরূপে শুরু হইল সমাজের সর্বস্তরে অবক্ষয়।স্বাধীনতার আনন্দে সমাজে হইল বহু নায়ক... পুরুষ নায়ক, স্ত্রী নায়ক, শিশু নায়ক |
মানুষ গোষ্ঠীভুক্ত হইয়া পড়িল এবং নিজেদের মধ্যে কলহ বাধাইয়া ফেলিল দেশব্যাপী 'সভ্য' হইবার হিড়িক পড়িয়া গেল কিশোর উপেক্ষা করিল কৈশোরকে আর অচিরেই পদার্পণ করিল যৌবনে | সহসাগত যৌবনের আস্বাদ গ্রহণ করিয়া নবীন প্রজন্ম আগলহীন নব্য-সংস্কৃতির বোরখা পরিয়া লইল অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে একালেও প্রাথমিক বিদ্যালয় , বিদ্যুত এ সব বিরল একান্নবর্তীপরিবার বিভাজিত হইয়া এককোষী পরিবারে পরিণত হইল |
স্বাধীনতার প্রাক্কালে যখন দেশশুদ্ধ মানুষ যখন প্রাণ ঢালিয়া স্বাধীনতা দিবস উদ্-যাপনে ব্রতী হইয়াছে তখন মনে হয় কিসের জন্য তাহাদের এত উত্সাহ? পাড়ায় পাড়ায় তরুণ-তরুণী স্বাধীনতা পালন করিতেছে, মাননীয় নেতাগণ বীরবিক্রমে কন্ঠনালী ফুলাইয়া গগনভেদী চিত্কার করিয়া বাতাস ভারী করিতেছেন, প্রচারমাধ্যমগুলি প্রতি পলে পলে স্বধীনতার সংগীত , প্রতি দন্ডে দন্ডে স্মৃতিচারণ , সকালে স্বাধিনতা সংগ্রামের উপর তথ্যচিত্র তো বিকালে ছায়াছবি, প্রদর্শন করিতেছে | কখনো বিরলকেশ ,বর্ষীয়ান নেতাকে বহুকষ্টে উপস্থিতপূর্বক তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আমাদিগকে পরিবেশন করিতেছেন ,শহীদ-স্মৃতি ফলক শ্বেত-পুষ্পের অবগুন্ঠনে চলিয়া গিয়াছে, ব্রিগেডের মৃত্তিকা পুষ্পবৃষ্টিতে ছয়লাপ হইয়াছে,শহীদমিনারের পাদদেশে লক্ষ মানুষ ভীড় করিয়া নেতাগণের জ্বালামুখী বক্তৃতা শুনিতেছে, সারাদেশের আকাশে বাতাসে স্বাধীনতার পাঞ্চজন্যের বজ্রনিনাদ অনুরণিত হইতেছে তখন স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে , কেনই বা এই উত্সব? কি জন্য পাইয়াছিলাম স্বাধীনতা? আমরা কি স্বাধীনদেশের যোগ্য উত্তরসুরী?




২টি মন্তব্য:

dida বলেছেন...
এই মন্তব্যটি একটি ব্লগ প্রশাসক দ্বারা মুছে ফেলা হয়েছে।
Bunny বলেছেন...

ekdom moner kothagulo knadhe haat rekhe jano bole gele tumi,sottyi i amra jogyo uttorsuri hoye uthte parini.